ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 43426
ডাউনলোড: 1850

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 43426 / ডাউনলোড: 1850
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

ফিকাহ্শাস্ত্র

ইসলামী জ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো ফিকাহ্শাস্ত্র। ফিকাহ্শাস্ত্র হলো কোরআন ,সুন্নাত ,ইজমা ও আকলের সাহায্য নিয়ে ইসলামের বিধিবিধান উদ্ঘাটন করা। ফিকাহ্শাস্ত্র ইসলামের অভিমত সম্পর্কিত জ্ঞান যা ফকীহ্ কোরআন ও হাদীস হতে উদ্ঘাটন করে থাকেন। এ দৃষ্টিতে হাদীসশাস্ত্রের সঙ্গে এর পার্থক্য রযেছে ,কারণ হাদীসশাস্ত্রে শুধু হাদীস মুখস্থ ও বর্ণিত হয়ে থাকে।

মুসলমানগণ প্রথম হিজরী শতাব্দী হতেই ইজতিহাদ শুরু করে। ইজতিহাদ ইসলামের সর্বজনীন ও সর্বশেষ ধর্মের অপরিহার্য অংশ । যেহেতু একদিকে এ ধর্ম কোন জাতি ,বর্ণ বা ভূখণ্ডের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট নয় এবং অন্যদিকে সর্বশেষ দীন হিসেবে কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে সেহেতু মানব সভ্যতার সঙ্গে এর অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক রয়েছে ও সকল পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতির জন্য এ উপযোগী।

কেউ কেউ ধারণা করেন ইজতিহাদের বিষয়টি আহলে সুন্নাতের মধ্যে প্রথম হিজরী শতাব্দীতে শুরু হলেও শিয়াদের মধ্যে তা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীতে প্রচলিত হয়। তাঁরা ফিকাহ্শাস্ত্রে ইজতিহাদের পথে অনুপ্রবেশে শিয়াদের বিলম্বের কারণ স্বয়ং আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণের উপস্থিতি বলে মত পোষণ করেন। কিন্তু আমরা ইজতিহাদ দার ইসলাম এবং ইলহামী আয শাইখুত তায়িফা শিরোনামের প্রবন্ধ দু টিতে267 এ মতকে খণ্ডন করেছি। সার্বিক নির্দেশনা ও মৌলনীতির ভিত্তিতে বিশেষ বিষয় ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে নির্দিষ্ট বিষয়ে ফতোয়া দানই হলো ইজতিহাদ। এ বিষয়টি ইসলামের প্রথম যুগ হতেই শিয়া ও সুন্নী উভয়ের মধ্যেই প্রচলিত ছিল। তবে ফিকাহর উৎস এবং কিয়াসের বৈধতার প্রশ্নে এই দু ফিরকার মধ্যে মৌল পার্থক্য রয়েছে।

আহলে সুন্নাতের দাবি অনুযায়ী সর্বপ্রথম মুসলমান যিনি ইজতিহাদ করেন তিনি হলেন রাসূল (সা.)-এর অন্যতম সাহাবী মায়ায ইবনে জাবাল যিনি রাসূলের পক্ষ হতে ইয়েমেনে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। মায়ায ইবনে জাবালের ইজতিহাদ সম্পর্কিত কাহিনীটি প্রসিদ্ধ।

আল্লামা সাইয়্যেদ হাসান সাদর তাঁর তাসিসুশ শিয়া গ্রন্থে লিখেছেন , শিয়া ফিকাহর প্রথম গ্রন্থ হযরত আলী (আ.)-এর সময়ে তাঁর বায়তুল মাল রক্ষক উবাইদুল্লাহ্ ইবনে আবি রাফে কর্তৃক লিখিত হয়। আমরা ইতোপূর্বে হাদীসশাস্ত্রের আলোচনায় উবাইদুল্লাহ্ ও তাঁর পিতা আবি রাফের হাদীস সংকলনের কথা উল্লেখ করেছি। ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরেস্ত গ্রন্থে আহলে বাইতের ইমামদের সমকালীন শিয়া গ্রন্থ রচয়িতা ও তাঁদের রচিত ফিকাহ্ গ্রন্থের একটি তালিকা ফোকাহাউ শশিয়া শিরোনামের আলোচনায় এনেছেন। ইমামদের সমকালীন শিয়া ফকীহ্দের মধ্যে ইরানীদের সংখ্যা স্বল্প।

মোটামুটিভাবে ইমামদের যুগ হতে কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত (সপ্তম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত) সময়ে অধিকাংশ শিয়া ফকীহ্ অ-ইরানী ছিলেন। প্রথম যুগের শিয়া ফকীহ্গণ যাঁদের গ্রন্থ এখনও বিদ্যমান ও ঐসব গ্রন্থ হতে তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি ও মত বর্ণনা করা হয় তাঁদের অধিকাংশই অ-ইরানী।

প্রথম যুগের শিয়া ফকীহ্দের মধ্যে আলী ইবনে হুসাইন ইবনে কুমী (প্রথম সাদুক) ,মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইন ইবনে বাবাভেই (দ্বিতীয় সাদুক) ,শেখ মুনতাজাবুদ্দীন রাযী (তিনিও হুসাইন ইবনে আলী ইবনে বাবাভেইয়ের বংশধর) ,শায়খুত তায়িফা আবু জাফর তুসী ,শেখ সালার ইবনে আবদুল আজিজ দাইলামী (মারাযিম গ্রন্থের রচয়িতা ,শেখ মুফিদ ও সাইয়্যেদ মুর্তাজার ছাত্র) , ওয়াসিলা গ্রন্থের লেখক আবু হামযা তুসী ,বিশিষ্ট মুফাসসির আয়াশী সামারকান্দী (ইবনুন নাদিম তাঁর ফেহেরেস্ত গ্রন্থে ফিকাহ্শাস্ত্রের গ্রন্থসমূহের আলোচনায় তাঁর নাম অনেক বার উল্লেখ করেছেন ও খোরাসানে তাঁর রচিত গ্রন্থের আধিক্য ও প্রচলনের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন) তৎকালীন ইরানী ফকীহ্দের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

এদের বিপরীতে সপ্তম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত অ-ইরানী শিয়া ফকীহ্দের মধ্যে রয়েছেন ইবনে জুনাইদ ,ইবনে আবি আকিল ,শেখ মুফিদ ,সাইয়্যেদ মুর্তাজা আলামুল হুদা ,কাযী আবদুল আজিজ ইবনে বাররাজ ,আবু সালাহ্ হালাবী ,আবুল মাকারেম ইবনে যাহরা ,ইবনে ইদরিস হিল্লী ,মুহাক্কেক হিল্লী ,আল্লামা হিল্লীসহ অন্যান্যরা । তৎকালীন সময়ে অ-ইরানীদের সংখ্যাধিক্যের কারণ হলো ইরানে সে সময় শিয়া অত্যন্ত সংখ্যালঘু ছিল। তাই ইরাক ,হালাব ,লেবানন ও অন্যান্য স্থানে ইরানের চেয়ে অধিক সংখ্যক শিয়া ছিল এবং তাদের অবস্থাও সুবিধাজনক ছিল।

সপ্তম হিজরী শতাব্দীর পর হতে বিশেষত গত চারশ বছরে শিয়া ফকীহ্গণের মধ্যে ইরানীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন যদিও এ সময়ে আরবদের মাঝে স্বনামধন্য ও বিশিষ্ট ফকীহর আবির্ভাব ঘটেছে। তন্মধ্যে শেখ জাফর কাশেফুল গেতা এবং জাওয়াহেরুল কালাম গ্রন্থের লেখক শেখ মুহাম্মদ হাসানের নাম উল্লেখযোগ্য।

এখানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর অন্তর্ধানের সময়কাল হতে এখন পর্যন্ত শিয়া ফিকাহ্ ও ফকীহ্দের সম্পর্কে আলোচনা করার প্রয়োজন মনে করছি। এর ফলে শিয়া ফিকাহ্শাস্ত্রে ইরানের অবদানের মূল্যায়নের সাথে সাথে ইসলামী সংস্কৃতির এই দিকটি কিভাবে সহস্রাধিক বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে তা স্পষ্ট হবে। ফিকাহ্শাস্ত্র গ্রন্থবদ্ধ হওয়ার সময় হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত এক হাজার একশ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ এগার শতক ধরে ফিকাহ্শাস্ত্র মাদ্রাসাসমূহে শিক্ষাদান করা হচ্ছে ,শিক্ষকরা এ শাস্ত্রে ছাত্রদের প্রশিক্ষিত করে আসছেন ,সেই ছাত্ররাও আবার নতুন ছাত্রদের প্রশিক্ষিত করছেন। এভাবে তা অব্যাহত রয়েছে বর্তমান সময় পর্যন্ত এবং শিক্ষক ,ছাত্র ও প্রশিক্ষণের এ ধারা কখনই থেমে থাকেনি।

তবে অন্যান্য জ্ঞান ,যেমন দর্শন ,যুক্তিবিদ্যা ,গণিতশাস্ত্র ,চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রভৃতির ইতিহাস আরো প্রাচীন এবং এ সকল বিষয়ে অনেক পূর্বেই গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তদুপরি এ সকল বিষয়ের কোনটিতেই সম্ভবত শিক্ষক ,ছাত্র ও প্রশিক্ষণের অবিচ্ছিন্ন যে ধারাটি ফিকাহ্শাস্ত্রে বিদ্যমান তা এভাবে ছিল না। একমাত্র ইসলামী বিশ্বে এরূপ একটি জ্ঞান এক হাজার বছরের অধিক সময় ধরে প্রাণবন্তভাবে কোন বিরতি ছাড়াই অব্যাহত রয়েছে। আমরা পরবর্তীতে অধিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্রের বিরতিহীন গতির বিষয়েও আলোচনা করব।

সৌভাগ্যক্রমে মুসলিম মনীষিগণ বিভিন্ন জ্ঞানের বিষয়ে যে সকল ব্যক্তি যুগ যুগ ধরে ধারাবাহিক অবদান রেখেছেন তাঁদের নাম ও অবদানের ক্ষেত্র সম্পর্কে লিখে রাখতেন। প্রথম এ রীতিটি হাদীসশাস্ত্রের ক্ষেত্রে শুরু হলেও পরবর্তীতে জ্ঞানের অন্যান্য শাখায়ও তা প্রচলিত হয়। জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় এরূপ গ্রন্থের সংখ্যা অনেক। যেমন ফিকাহ্বিদদের সম্পর্কে আবু ইসাহাক সিরাজীর তাবাকাতুল ফোকাহা ,চিকিৎসাবিদদের সম্পর্কে ইবনে আবি আছিবায়ার তাবাকাতুল আতেব্বাহ ,আরবী ব্যাকরণশাস্ত্রবিদদের সম্পর্কে আবু আবদুর রহমানের তাবাকাতুল নাহুইয়ীন এবং সুফীদের সম্পর্কে আবু আবদুর রহমান সালামীর তাবকাতুস সুফীইয়া ইত্যাদি।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য আমার জানা মতে আহলে সুন্নাতের ফকীহ্দের সম্পর্কে গ্রন্থ রচিত হলেও শিয়া ফকীহ্দের সম্পর্কে স্বতন্ত্র কোন গ্রন্থ রচিত হয়নি। তাই বিভিন্ন পর্যায়ের শিয়া ফকীহ্দের নাম জানতে হলে রেজালশাস্ত্র ও মাশায়েখগণের অনুমতিগ্রন্থে বর্ণিত হাদীস বর্ণনাকারীদের নামের মাঝে অনুসন্ধান চালাতে হয়।

আমরা এখানে বিভিন্ন পর্যায়ের শিয়া ফকীহ্দের সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতে চাই না। আমরা কেবল বিশিষ্ট শিয়া ফকীহ্দের নাম তাঁদের গ্রন্থসহ উল্লেখ করব। এর মাধ্যমে বিভিন্ন

স্তরের ফকীহ্দেরও চেনা সম্ভব হবে।

আমরা শিয়া ফকীহ্দের ইতিহাস ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর স্বল্পকালীন অন্তর্ধানের (260-329 হিজরী) সময়কাল হতে শুরু করছি। দু টি কারণে আমরা তা করছি: প্রথমত ইমাম মাহ্দীর স্বল্বকালীন অন্তর্ধানের পূর্ববর্তী সময়ে স্বয়ং আহলে বাইতের ইমামগণ উপস্থিত ছিলেন। তাই তাঁরা তাঁদের প্রশিক্ষিত শিষ্যদের অনেককেই মুজতাহিদ বা ফকীহ্ হিসেবে ফতোয়া দানের জন্য উদ্বুদ্ধ করলেও স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা চান বা না চান ফতোয়া দানের ক্ষেত্রে ইমামদের সরাসরি প্রভাব তাঁদের ওপর ছিল এবং জনসাধারণও পবিত্র ইমামগণের শরণাপন্ন হওয়ার সুযোগ হতে বঞ্চিত হলে তাঁদের নিকট যেত। তবে প্রথমত তারা চেষ্টা করত স্বয়ং ইমামদের নিকট হতে ফতোয়া জানতে ,এমনকি ফকীহ্গণও যথাসম্ভব কষ্ট করে হলেও দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করে ইমামদের নিকট পৌঁছে এ সম্পর্কিত সমস্যার সমাধান নিতেন। সুতরাং শিয়া ফিকাহর লিখিত রূপটি ইমাম মাহদীর স্বল্পকালীন অন্তর্ধানের সময় হতে প্রচলন লাভ করেছে এবং এর পূর্বের ফকীহ্দের রচিত কোন গ্রন্থ এখন আমাদের হাতে নেই অথবা থাকলেও তা আমাদের জানা নেই।

কিন্তু আহলে বাইতের পবিত্র ইমামগণের জীবদ্দশায়ও স্বনামধন্য শিয়া ফকীহ্গণ ছিলেন এবং অন্যান্য মাযহাবের তৎকালীন ফকীহ্গণের সঙ্গে তাঁদের তুলনা করলে তাঁদের উচ্চ মর্যাদার পরিচয় পাওয়া যাবে। ইবনুন নাদিম তাঁর মূল্যবান ও বিশ্ব পরিচিত গ্রন্থ ফেহেরেস্ত -এর (যা ফেহেরেস্তে ইবনুন নাদিম নামে প্রসিদ্ধ) একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়ে শিয়া ফকীহ্দের নিয়ে আলোচনা করেছেন । সেখানে তাঁদের নামের সঙ্গে তাঁদের রচিত হাদীস বা ফিকাহ্ গ্রন্থের নামও উল্লেখ করেছেন। যেমন ফিকাহ্শাস্ত্রে হুসাইন ইবনে সাঈদ আহওয়াযী ও তাঁর ভ্রাতার মর্যাদা সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছেন , ফিকাহ্ ও হাদীসের ক্ষেত্রে তাঁরা তৎকালীন সময়ের আলেমদের গৌরব ছিলেন। আলী ইবনে ইবরাহীম কুমী সম্পর্কে বলেছেন , প্রসিদ্ধ ফকীহ্দের একজন। মুহাম্মদ ইবনে হাসান ইবনে আহমাদ ইবনে ওয়ালিদ কুমী সম্পর্কে বলেছেন , তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে ফিকাহ্ বিষয়ক পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ ছিল। এ সমস্ত ফকীহর গ্রন্থসমূহ বিভিন্ন অধ্যায়ে বিভক্ত ছিল এবং প্রতি অধ্যায়েই নির্দিষ্ট বিষয়বস্তুর আলোচনায় তাঁরা তদসংশ্লিষ্ট যে হাদীসের ওপর তাঁরা নির্ভর করে ফতোয়া দিয়েছেন তার উল্লেখ করতেন। তাই এ দৃষ্টিতে তাঁদের গ্রন্থসমূহ যেমন তাঁদের রচনা ছিল তেমনি হাদীস গ্রন্থ বলেও পরিগণিত হতো।

মুহাক্কেক হিল্লী তাঁর মুতাবার নামক গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন , যেহেতু আমাদের ফকীহ্দের সংখ্যা অনেক এবং তাঁদের রচিত গ্রন্থের সংখ্যাও প্রচুর সে কারণে তাঁদের সকলের মত বর্ণনা করা সম্ভব নয়। তাই আমি গবেষণার ভিত্তিতে প্রসিদ্ধ ও উত্তম মতসমূহই শুধু বর্ণনা করছি। এ ক্ষেত্রে তাঁদের গ্রন্থে বর্ণিত যে মত প্রমাণিত ও নির্ভরযোগ্য বলে প্রতিফলিত তা-ই গ্রহণ করেছি। পবিত্র ইমামদের সমকালীন ফকীহ্গণের মধ্যে যাঁদের নিকট হতে বর্ণনা করেছি তাঁরা হলেন হাসান ইবনে মাহবুব ,আহমাদ ইবনে আবি নাসর বাযানতী ,হুসাইন ইবনে সাঈদ আহওয়াযী ,ফাযল ইবনে শাজান নিশাবুরী ,ইউনুস ইবনে আবদুর রহমান ও অন্যান্য। পরবর্তী পর্যায়ের ফকীহ্দের মধ্যে মুহাম্মদ ইবনে বাবাভেই কুমী (শেখ সাদুক) ,মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব কুলাইনী ,আলী ইবনে বাবাভেই কুমী ,আসকাফী ,ইবনে আবি আকিল ,শেখ মুফিদ ,সাইয়্যেদ মুরতাজা আলামুল হুদা ,শেখ তুসী প্রমুখ। শেষোক্ত ছয়জন মুফতী হিসেবে পরিগণিত।

মুহাক্কেক হিল্লী প্রথম সারির ব্যক্তিদের মুজতাহিদ বলে মনে করলেও ফতোয়া দানকারী ফকীহর অন্তর্ভুক্ত করেননি। কারণ তাঁদের রচিত গ্রন্থসমূহ তাঁদের ইজতিহাদের ফল হলেও তা ফতোয়া আকারে বর্ণিত না হয়ে হাদীস গ্রন্থাকারে উপস্থাপিত হয়েছে। এখানে আমরা ইমাম মাহদীর স্বল্পকালীন অন্তর্ধানের সমকালীন প্রথম সারির মুফতিগণের নাম উল্লেখ করব :

1. আলী ইবনে বাবাভেই কুমী (মৃত্যু 329 হিজরী ,কোমে সমাহিত): তিনি শেখ সাদুক অর্থাৎ মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনে বাবাভেই (যিনি রেই শহরে সমাহিত)-এর পিতা। পুত্র মুহাদ্দিস এবং পিতা ফকীহ্ ও মুফতী। এ পিতা-পুত্রকে সাদুকাইন হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে।

2. আলী ইবনে বাবাভেই কুমীর সমসাময়িক বা কিছু পূর্বের একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ্ হলেন আয়াশী সামারকান্দী যিনি তাঁর তাফসীরের জন্যও প্রসিদ্ধ। তিনি উঁচু স্তরের জ্ঞানী ছিলেন। যদিও তিনি মুফাসসির হিসেবে প্রসিদ্ধ তদুপরি প্রথম সারির ফকীহ্দেরও অন্তর্ভুক্ত। তিনি ফিকাহ্সহ বহু বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরেস্ত -এ বলেছেন , তাঁর গ্রন্থ খোরাসানে ব্যাপকভাবে পরিচিত হলেও ফিকাহর বিষয়ে কোথাও তাঁর মত উল্লিখিত হয়নি। সম্ভবত তাঁর ফিকাহ্ সম্পর্কিত গ্রন্থ কোন কারণে বিলুপ্ত হয়েছে।

আয়াশী প্রথম জীবনে সুন্নী হলেও পরবর্তীতে শিয়া মাযহাব গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর পিতার নিকট হতে উত্তরাধিকারসূত্রে পর্যাপ্ত সম্পদ পান যার পুরোটাই গ্রন্থ রচনা ,সংকলন ,নকল ,ছাত্রদের শিক্ষা ,প্রশিক্ষণ ও ভাতার জন্য খরচ করেন।

অনেকে শেখ মুফিদের ফিকাহর শিক্ষক জাফর ইবনে মুহাম্মদ ইবনে কৌলাভেইকে আলী ইবনে বাবাভেইয়ের সমকালীন মনে করে স্বল্পকালীন অন্তর্ধানের সময়কার ফকীহ্ বলেছেন। কিন্তু যেহেতু তিনি সা দ ইবনে আবদুল্লাহ্ আশআরীর ছাত্র ও শেখ মুফিদের শিক্ষক এবং 367 বা 368 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন সেহেতু তাঁকে আলী ইবনে বাবাভেইয়ের সমসাময়িক বলা যায় না । অবশ্য তাঁর পিতা মুহাম্মদ ইবনে কৌলাভেইকে স্বল্পকালীন অন্তর্ধানের যুগের আলেম বলা যায়।

দীর্ঘকালীন অন্তর্ধানের সময়কার ফকীহ্গণ

3. ইবনে আবি আকিল আম্মানী: তিনি ইয়েমেনের অধিবাসী ছিলেন। আম্মান ইয়েমেনের সমুদ্র তীরবর্তী একটি অঞ্চল। তিনি দীর্ঘকালীন অন্তর্ধানের শুরুর প্রাক্কালের একজন আলেম। তাঁর মৃত্যুর সঠিক তারিখ জানা যায়নি।

বাহরুল উলুম তাঁকে জাফর ইবনে কৌলাভেইয়ের শিক্ষক বলে উল্লেখ করেছেন যিনি শেখ মুফিদের শিক্ষক ছিলেন। ইবনে আবি আকিলের নাম ফিকাহ্শাস্ত্রে প্রায়ই উদ্ধৃত হয়ে থাকে।

4. ইবনে জুনাইদ আসকাফী: তিনিও শেখ মুফিদের অন্যতম শিক্ষক। তিনি 381 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। কথিত আছে তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশটি। ইবনে জুনাইদ ও ইবনে আবি আকিলকে ফকীহ্গণ আল কাদিমাইন বলে সম্বোধন করে থাকেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর মত প্রায়ই বর্ণিত হয়।

5. শেখ মুফিদ: তাঁর প্রকৃত নাম মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে নোমান। তিনি ফকীহ্ ও কালামশাস্ত্রবিদ হিসেবে প্রসিদ্ধ। ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরেস্ত গ্রন্থের পঞ্চম প্রবন্ধের দ্বিতীয় আলোচনায় তাঁর নাম শিয়া কালামশাস্ত্রবিদদের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। তিনি তাঁর প্রশংসা করেছেন ও ইবনুল মুয়াল্লেম নামে তাঁকে অভিহিত করেছেন। তিনি 336 হিজরীতে জন্মগ্রহণ ও 413 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর গ্রন্থটি আল মুকান্নায়া নামে প্রসিদ্ধ। শেখ মুফিদ শিয়া বিশ্বে একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। শেখ মুফিদের জামাতা আবু ইয়ালী জাফরী বর্ণনা করেছেন ,শেখ মুফিদ রাত্রিতে খুব কম ঘুমাতেন। বাকী সময় ইবাদত ,নামাজ ,কোরআন তেলাওয়াত ,অধ্যয়ন বা লেখালেখির কাজে ব্যয় করতেন।

6. সাইয়্যেদ মুরতাজা: তিনি আলামুল হুদা নামে প্রসিদ্ধ। তিনি 355 হিজরীতে জন্ম এবং 436 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লামা হিল্লী তাঁকে ইমামিয়া শিয়াদের শিক্ষক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি জ্ঞানী ও পণ্ডিত ছিলেন । বহুবিধ শাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য ছিল ,যেমন সাহিত্য ,কালামশাস্ত্র এবং ফিকাহ্। তাঁর মতসমূহ ফকীহ্দের নিকট সম্মানার্হ। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ দু টি গ্রন্থ হলো ইনতিছাব জামালুল ইলম ওয়াল আমাল । তিনি ও তাঁর ভ্রাতা সাইয়্যেদ রাযী পূর্ণাঙ্গ নাহজুল বালাগাহ্ শেখ মুফিদের নিকট শিক্ষা নিয়েছেন।

7. শেখ আবু জাফর তুসী: তিনি শাইখুত তায়িফা নামে প্রসিদ্ধ এবং ইসলামী বিশ্বের উজ্জ্বল নক্ষত্রসমূহের অন্যতম। ফিকাহ্ ,উসূল ,হাদীস ,তাফসীর ,কালামশাস্ত্র ও রিজালশাস্ত্রে তাঁর প্রচুর রচনা রয়েছে। তিনি খোরাসানের তুসের অধিবাসী।

শেখ তুসী 385 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি 408 হিজরীতে (23 বছর বয়সে) তৎকালীন ইসলামী সংস্কৃতি ও জ্ঞানের সর্ববৃহৎ কেন্দ্র বাগদাদে হিজরত করেন এবং শেষ জীবন পর্যন্ত ইরাকেই ছিলেন। তাঁর শিক্ষক সাইয়্যেদ মুরতাজার ইন্তেকালের পর তিনি শিয়াদের জ্ঞান ও ফতোয়া দানের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। তিনি শেখ মুফিদের নিকটও পাঁচ বছর শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি দীর্ঘ সময় শেখ মুফিদের ছাত্র সাইয়্যেদ মুরতাজার তত্ত্বাবধানে পড়াশোনা করেছেন ও তাঁর নিকট জ্ঞান শিক্ষা করেছেন। তাঁর শিক্ষক সাইয়্যেদ মুরতাজা 436 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করার পরও তিনি 24 বছর জীবিত ছিলেন। তন্মধ্যে 12 বছর বাগদাদে ছিলেন। কিন্তু বাগদাদে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হলে তাঁর গৃহে ও গ্রন্থাগারে হামলা হয়। ফলে তিনি বাগদাদ হতে নাজাফে হিজরত করেন এবং সেখানে দীনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর নাজাফেই তিনি 460 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর কবর নাজাফে অবস্থিত।

ফিকাহ্শাস্ত্রে শেখ তুসীর রচিত গ্রন্থের নাম আন নেহায়া যা প্রাচীনকালে দীনী ছাত্রদের পাঠ্য ছিল। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর রচিত অপর একটি গ্রন্থ হলো মাবসুত । এ গ্রন্থটি ফিকাহ্শাস্ত্রকে নতুন অধ্যায় ও যুগে প্রবেশ করিয়েছে এবং তৎকালীন সময়ের শিয়া ফিকাহর সবচেয়ে ব্যাপক গ্রন্থ। খিলাফ নামেও তাঁর একটি ফিকাহর গ্রন্থ রয়েছে যাতে আহলে সুন্নাত ও শিয়া উভয় মাযহাবের ফকীহ্দের মত সন্নিবেশিত হয়েছে। এ ছাড়াও ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থ রয়েছে। এক শতাব্দী কাল পূর্বেও শিয়া আলেমগণ শেখের ফিকাহ্ বলতে শেখ তুসীর ফিকাহ্ বুঝতেন। আর যদি শাইখানের ফিকাহ্ বলতেন তবে শেখ মুফিদ ও শেখ তুসী বুঝা যেত। শিয়া ফিকাহ্শাস্ত্রের সব অধ্যায়েই যে সকল প্রসিদ্ধ ফকীহর নাম উচ্চারিত হয় শেখ তুসী তাঁদের অন্যতম। কয়েক শতাব্দী শেখ তুসীর বংশধারার বিভিন্ন ব্যক্তি ফকীহ্ ও আলেম হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুত্র শেখ আবু আলী যিনি দ্বিতীয় মুফিদ নামে পরিচিত- তিনি ছিলেন একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ্। মুসতাদরাকুল ওয়াসায়িল গ্রন্থে বলা হয়েছে তাঁর রচিত একটি গ্রন্থ হলো আমালী এবং তাঁর পিতার রচিত আন নেহায়া গ্রন্থটিও তিনি ব্যাখ্যা করেছেন।268 লুলুউল বাহরাইন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে শেখ তুসীর কন্যারাও বিশিষ্ট ফকীহ্ ছিলেন। শেখ আবু আলীর এক পুত্রের নাম শেখ আবুল হাসান মুহাম্মদ যিনি পিতার মৃত্যুর পর নাজাফের দীনী মাদ্রাসার প্রধান হন। ইবনে আম্মাদ হাম্বলী তাঁর শাযরাতুয যাহাব গ্রন্থে বলেছেন , এ মহৎ ব্যক্তির জীবদ্দশায় বিভিন্ন অঞ্চল হতে শিয়া দীনী ছাত্ররা তাঁর নিকট জ্ঞান অর্জনের লক্ষ্যে আসতেন। তিনি একজন দুনিয়াবিমুখ ও খোদাভীরু আলেম ছিলেন। 269 আম্মাদ তাবারী বলেছেন , যদি নবী ভিন্ন অন্য কারো ওপর দরুদ পড়া জায়েয হতো তবে আমি এ ব্যক্তির ওপর দরুদ পড়তাম। শেখ আবুল হাসান মুহাম্মদ 540 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

8. কাজী আবদুল আজিজ হালাবী: তিনি ইবনুল বারাজ নামে প্রসিদ্ধ এবং সাইয়্যেদ মুরতাজা ও শেখ তুসীর শিষ্য। তিনি শেখ তুসীর পক্ষ হতে স্বীয় ভূমি সিরিয়ায় প্রেরিত হন। আবদুল আজিজ বিশ বছর সিরিয়ায় তারবেলেসে (ত্রিপোলী) বিচারক ছিলেন। তিনি 481 হিজরীতে মুত্যৃবরণ করেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ দু টি গ্রন্থ হলো মুহাযযাব জাওয়াহের

9. শেখ আবুস সালাহ হালাবী: তিনি শামাতের অধিবাসী এবং সাইয়্যেদ মুরতাজা ও শেখ তুসীর ছাত্র। তিনি একশ বছর জীবিত ছিলেন। রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থে তাঁকে সালার ইবনে আবদুল আজিজেরও ছাত্র হিসেক্ষে উল্লেখ করা হয়েছে। যদি এ বক্তব্যটি সঠিক হয় তবে তিনি তিন ব্যক্তির ছাত্র ছিলেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি হলো কাফী। তিনি 447 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি 447 হিজরীতে ইন্তেকাল করলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর দু শ্রদ্ধেয় শিক্ষক হতে বয়ঃজ্যেষ্ঠ ছিলেন বলা যায়। শহীদে সানী বলেছেন , তিনি হালাবে সাইয়্যেদ মুর্তাজার খলীফা বা প্রতিনিধি ছিলেন।

10. হামযা ইবনে আজিজ দাইলামী: তিনি সালার দাইলামী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি 447 হিজরীতে মতান্তরে 463 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শেখ মুফিদ ও সাইয়্যেদ মুরতাজার ছাত্র ছিলেন। সালার ইরানের অধিবাসী ও তাবরীজের খসরুশাহে মারা যান। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থের নাম মারাসিম । যদিও তিনি শেখ তুসীর ছাত্র নন ;বরং সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব তদুপরি মুহাক্কেক হিল্লী তাঁর গ্রন্থের270 ভূমিকায় সালার ,ইবনুল বারাজ ও আবুস সালাহ এ তিনজন ব্যক্তিকে আতবাউস সালাসা (তিন অনুসারী) নামে অভিহিত করেছেন অর্থাৎ তাঁকে শেখ তুসীর অন্যতম অনুসারী বলেছেন। সম্ভবত তাঁর এ কথার উদ্দেশ্য এটি যে ,উপরোক্ত তিন ব্যক্তি পূর্বোক্ত তিনজনের (শেখ মুফিদ ,সাইয়্যেদ মুর্তাজা ও শেখ তুসীর) অনুবর্তী।

11. সাইয়্যেদ আবুল মাকারেম ইবনে জুহরাহ: সাইয়্যেদ আবুল মাকারেম মধ্যবর্তী এক ব্যক্তির সূত্রে শেখ তুসীর পুত্র আবু আলী হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন এবং ফিকাহ্শাস্ত্রে মধ্যবর্তী কয়েকজন শিক্ষকের মাধ্যমে শেখ তুসীর পরোক্ষ ছাত্র। তিনি সিরিয়ার হালাবের অধিবাসী ও 585 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থের নাম হলো গানিয়াহ্ । সেখানেই ফিকাহর পরিভাষায় হালাবীয়ান বলা হয় তা আবুস সালাহ্ হালাবী ও ইবনে জুহরাহ হালাবী এ দু ব্যক্তির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়। আর যদি হালাবীউন বলা হয় তবে উপরোক্ত দু ব্যক্তি ছাড়াও ইবনুল বারাজ হালাবীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মুসতাদরাকুল ওয়াসায়িল গ্রন্থে শেখ তুসীর পরিচিতি পর্বের আলোচনায় বলা হয়েছে ,ইবনে জুহরাহ ইবনিল হুসাইনের (ইবনুল হাজেব হালাবী নামে প্রসিদ্ধ) নিকট শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। ইবনে হাজেব এ গ্রন্থটি নাজাফে আবু আবদুল্লাহ্ যাইনুবাদীর নিকট ,তিনি তা শেখ রাশিদুদ্দীন আলী ইবনে সিরাক কুমী ও সাইয়্যেদ আবি হাশিম হুসাইনীর নিকট ,তাঁরা গ্রন্থটি শেখ আবদুল জাব্বার রাযীর নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। শেখ আবদুল জাব্বার শেখ তুসীর ছাত্র ছিলেন। এই বর্ণনানুসারে ইবনে জুহরাহ মধ্যবর্তী চার ব্যক্তির সূত্রে শেখ তুসীর পরোক্ষ ছাত্র।

12. ইবনে হামযা তুসী: তিনি ইমাদউদ্দীন তুসী নামে পরিচিত। তিনি শেখ তুসীর ছাত্রদের ছাত্রের সারির একজন ফকীহ্। তবে কেউ কেউ তাঁকে আরো পরের বলেছেন। বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে। তাঁর মৃত্যুর বছর সঠিকভাবে জানা যায়নি। সম্ভবত ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে তিনি মারা যান। তিনি ইরানের খোরাসানের অধিবাসী। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর সুপরিচিত একটি গ্রন্থ হলো ওয়াসিলাহ্

13 ইবনে ইদরিসহিল্লী: তিনি শিয়া পণ্ডিত ও আলেমগণের মধ্যে বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি আরব বংশোদ্ভূত। শেখ তুসী তাঁর মাতার পিতামহ। ইবনে ইদরিস স্বাধীন চিন্তাশীল ব্যক্তি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। কোন কোন ক্ষেত্রে তাঁর রক্তসম্পর্কীয় প্রপিতা শেখ তুসীর ভাবমূর্তিকেও ক্ষু ণ্ণ করেছেন ( তাঁর মতের তীব্র সমালোচনা করে ) । তিনি পূর্ববর্তী আলেমদের মতের আক্রমণাত্মক সমালোচনা করতেন। তিনি 598 হিজরীতে 55 বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর একটি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো সারাইর । কথিত আছে ইবনে ইদরিস সাইয়্যেদ আবুল মাকারেম ইবনে জুহরার শিষ্য ছিলেন। কিন্তু ইবনে ইদরিস তাঁর আল ওয়াদিয়া গ্রন্থে আস সারাইর গ্রন্থ সম্পর্কে যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে বুঝা যায় ইবনে জুহরাহ তাঁর সমসাময়িক ছিলেন ও ফিকাহর কিছু বিষয়ে ইবনে জুহরার সঙ্গে তাঁর পত্র বিনিময় ও সরাসরি আলোচনাই শুধু হয়েছে।

14. শেখ আবুল কাসেম জাফর ইবনে হাসান ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ হিল্লী (মুহাক্কেক হিল্লী নামে প্রসিদ্ধ): উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রচুর গ্রন্থ রয়েছে ,যেমন মাআরিয ,মুতাবার ,আল মুখতাছার ,আন নাফে প্রভৃতি। মুহাক্কেক হিল্লী মধ্যবর্তী এক শিক্ষকের সূত্রে ইবনে জুহরাহ ও ইবনে ইদরিস হিল্লীর পরোক্ষ ছাত্র। আল কুনী ওয়াল আলকাব গ্রন্থে ইবনে নামার জীবনী আলোচনায় উল্লিখিত হয়েছে , মুহাক্কেক কুরকী মুহাক্কেক হিল্লীর প্রশংসায় বলেছেন ,তিনি আহলে বাইতের ফিকার পণ্ডিতগণের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ শিক্ষকগণ হলেন মুহাম্মদ ইবনে নামায়ে হিল্লী ও ইবনে ইদরিস হিল্লী।

সম্ভবত মুহাক্কেক কারকীর এ কথার উদ্দেশ্য হলো ইবনে নামার শিক্ষক হলেন ইবনে ইদরিস হিল্লী এবং সেই সূত্রে তাঁকে তিনি ইবনে ইদরিসের পরোক্ষ ছাত্র বলেছেন। কারণ ইবনে ইদরিস 598 হিজরীতে মারা যান এবং মুহাক্কেক হিল্লী 676 হিজরীতে। তাই স্বাভাবিকভাবেই মুহাক্কেকের পক্ষে ইবনে ইদরিসের ছাত্র হওয়া সম্ভব নয়। রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থে বলা হয়েছে , মুহাক্কের হিল্লী তাঁর পিতা ,পিতামহ ,সাইয়্যেদ ফাখার ইবনে মায়াদ মুসাভী এবং ইবনে জুহরাহর নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। ইবনে জুহরার নিকট মুহাক্কেকের শিক্ষাগ্রহণের বিষয়টিও সঠিক নয়। কারণ ইবনে জুহরা 865 হিজরীতে মারা যান। তাই নিশ্চিতভাবে তিনি ইবনে জুহরাহর ছাত্র ছিলেন না। তবে তাঁর পিতা ইবনে জুহরাহর ছাত্র হতে পারেন।

মুহাক্কেক হিল্লী আল্লামা হিল্লীর শিক্ষক ছিলেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে কাউকেই তাঁর ওপর প্রাধান্য দেয়া হয় না। ফিকাহ্শাস্ত্রে মুহাক্কেক পরিভাষাটি নাম হিসেবে শুধু তাঁর জন্যই ব্যবহৃত হয়ে থাকে। বিশিষ্ট দার্শনিক ও গণিতশাস্ত্রবিদ খাজা নাসিরুদ্দীন তুসী হিল্লায় তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর ফিকাহর ক্লাসে অংশগ্রহণ করেছেন। মুহাক্কেকের রচিত বিভিন্ন গ্রন্থ বিশেষত শারায়ে নামক গ্রন্থটি দীনী ছাত্রদের পাঠ্য ছিল এবং এখনও আছে। অনেক ফকীহ্ই মুহাক্কেক হিল্লীর গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন অথবা তাতে টীকা সংযোজন করেছেন।

15. হাসান ইবনে ইউসুফ ইবনে আলী ইবনে মুতাহ্হারী হিল্লী (আল্লামা হিল্লী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি তৎকালীন সময়ের একজন বিরল প্রতিভা। তিনি ফিকাহ্ ,উসূল ,কালামশাস্ত্র ,যুক্তিবিদ্যা ,দর্শন ,রিজালশাস্ত্র ও অন্যান্য বিষয়ে পুস্তক রচনা করেছেন। বর্তমানে তাঁর লেখা একশ টি গ্রন্থ হস্তলিখিত অথবা ছাপানো অবস্থায় বিদ্যমান। ঐ গ্রন্থসমূহের কোন কোনটি যেমন তাযকেরাতুল ফোকাহা তাঁর বিরল প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করছে।

আল্লামা হিল্লীর ফিকাহ্ বিষয়ক প্রচুর গ্রন্থ রয়েছে। যার অধিকাংশই পরবর্তী সময়ের ফকীহ্দের দ্বারা ব্যাখ্যা ও টীকা সংযোজিত হয়েছে। আল্লামা হিল্লীর প্রসিদ্ধ ফিকাহর গ্রন্থসমূহ হলো ইরশাদ ,তাবছেরাতুল মুতাআল্লেমীন ,কাওয়ায়েদ ,তাহরীর ,তাযকিরাতুল ফোকাহা ,মুখতালাফুশ শিয়া ও মুনতাহা। তিনি অনেকের নিকট শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তিনি ফিকাহ্শাস্ত্রের জ্ঞান তাঁর মামা মুহাক্কেক হিল্লীর নিকট অর্জন করেন। যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর ছাত্র ছিলেন। তিনি ফিকাহ্সমূহ অধ্যয়ন করেন। আল্লামা হিল্লী 648 হিজরীতে জন্ম ও 726 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন ।

16. ফাখরুল মুহাক্কেকীন: তিনি আল্লামা হিল্লীর পুত্র। তিনি 682 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং 771 সালে পৃথিবী হতে বিদায় নেন। আল্লামা হিল্লী তাঁর তাযকিরাতুল ফোকাহা গ্রন্থের ভূমিকায় এবং কাওয়ায়েদ গ্রন্থে তাঁর এ পুত্রের প্রশংসা করেছেন। কাওয়ায়েদ গ্রন্থের শেষে তিনি এ আশা ব্যক্ত করেছেন ,তাঁর পুত্র তাঁর অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করবে। ফাখরুল মুহাক্কেকীন ইয়াহুল ফাওয়াইদ ফি শারহি মুশকিলাতুল কাওয়ায়েদ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। এই গ্রন্থে তাঁর উপস্থাপিত মত পরবর্তী কালের ফকীহ্ ও আলেমদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

17. মুহাম্মদ ইবনে মাক্কী ( শহীদে আউয়াল নামে প্রসিদ্ধ): তিনি ফাখরুল মুহাক্কেকীনের ছাত্র ও শিয়া ফকীহ্দের প্রথম সারির একজন অর্থাৎ মুহাক্কেক ও আল্লামা হিল্লীর সমপর্যায়ের। তিনি দক্ষিণ লেবাননের জাবালে আমেলের অধিবাসী। জাবালে আমেল শিয়াদের অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র। শহীদে আউয়াল 734 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং 786 হিজরীতে মালেকী মাযহাবের এক আলেমের ফতোয়ার কারণে শহীদ হন। তিনি আল্লামা হিল্লীর ছাত্রগণের ছাত্র। শহীদে আউয়ালের প্রসিদ্ধ ফিকাহর গ্রন্থ হলো লোমআ যা তিনি জেলখানায় বন্দী থাকাকালীন সময়ে (মৃত্যুদণ্ড ঘোষিত হওয়ার পরবর্তীতে) লিখেছিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো দু শতাব্দী পর তাঁর এ গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ যিনি লিখেন তিনও তাঁর পরিণতি বরণ করে শহীদ হন ও শহীদে সানী বলে প্রসিদ্ধি লাভ করেন।

শারহে লোমআ শহীদ সানীর রচনা যা বর্তমানে ছাত্রদের ফিকাহর পাঠ্যগ্রন্থ। শহীদে আউয়ালের রচিত গ্রন্থসমূহ হলো দুরুস ,যিকরা ,বায়ান ,আলফিয়া ও কাওয়ায়েদ। তাঁর রচিত ফিকাহর সকল গ্রন্থই মূল্যবান। মুহাক্কেক হিল্লী এবং আল্লামা হিল্লীর ন্যায় তাঁর গ্রন্থসমূহেও পরবর্তী সময়ের আলেমদের দ্বারা ব্যাখ্যা ও টীকা সংযোজিত হয়েছে।

সপ্তম ও অষ্টম হিজরীতে এ তিন ফকীহর (আল্লামা হিল্লী ,মুহাক্কেক হিল্লী ও শহীদে আউয়াল) গ্রন্থসমূহই শিয়া ফকীহ্দের পাঠ্যপুস্তক হিসেবে গৃহীত হয়েছে এবং এগুলোর ব্যাখ্যাগ্রন্থও রচিত হয়েছে। অন্য কোন ফকীহর গ্রন্থের বিষয়ে এমনটি লক্ষ্য করা যায় না। এর পরবর্তী সময়ে কেবল শেখ মুর্তজা আনসারীর গ্রন্থের ক্ষেত্রেই তা ঘটেছে এবং এটি মাত্র শতাধিক বছর পূর্বের একটি গ্রন্থ।

শহীদ আউয়ালের পরিবারের সদস্যরা ফিকাহ্ ও অন্যান্য শাস্ত্রে বিশেষ জ্ঞানী ছিলেন। এই পরিবারের সদস্যরা বংশ পরম্পরায় আলেম হিসেবে স্বীয় সম্মান অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। শহীদে আউয়ালের তিন পুত্রই স্বীকৃত ফকীহ্ ও আলেম ছিলেন। তাঁর স্ত্রী উম্মে আলী ও কন্যা উম্মুল হাসানও ফিকাহ্শাস্ত্রে বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারিনী ছিলেন। শহীদ তাঁর নিকট আগত নারীদের ফিকাহ্গত সমস্যার জন্য এ দু রমণীর শরণাপন্ন হওয়ার নির্দেশ দিতেন। রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থে বলা হয়েছে ,কোন কোন ফকীহ্ ও আলেম শহীদে আউয়ালের কন্যা ফাতেমাকে শাইখা সিত্তুল মাশাইখ বা সাইয়্যেদাতুল মাশাইখ অর্থাৎ ফকীহ্দের নেত্রী উপাধি দিয়েছেন।

18. ফাযেল মিকদাদ: তিনি হিল্লীর অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম সুউর-এর অধিবাসী। তিনি শহীদে আউয়ালের বিশিষ্ট ছাত্র ছিলেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ যে গ্রন্থ মুদ্রিত অবস্থায় আমাদের হাতে রয়েছে তা হলো কানযুল এরফান । এ গ্রন্থে ইসলামের বিধিবিধান ও আহকাম সম্পর্কিত আয়াত সন্নিবেশিত হয়েছে অর্থাৎ কোরআনের যে সকল আয়াত হতে ইসলামের ফিকাহ্গত বিধান পাওয়া যায় (ইসলামী বিধিবিধানের দলিল উপস্থাপন করা যায়) তা উপস্থাপন করে ব্যাখ্যা করা হয়েছে ও প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। শিয়া-সুন্নী উভয় মাযহাবে আহকামের আয়াতসমূহ নিয়ে প্রচুর গ্রন্থ রচিত হয়েছে। তন্মধ্যে ফাযেল মিকদাদের কানযুল এরফান সবচেয়ে উত্তম। ফাযেল মিকদাদ 826 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তদুপরি তাঁকে নবম হিজরী শতাব্দীর আলেমদের মধ্যে ধরা হয়।

19. জামালুস সালেকীন আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনে ফাহদ হিল্লী আসাদী: তিনি 757 হিজরীতে জন্ম্ এবং 841 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি শহীদে আউয়াল ও ফাখরুল মুহাক্কেকীনের ছাত্র। তিনি যাঁদের নিকট হতে হাদীস বর্ণনা করেছেন তাঁরা হলেন- ফাযেল মিকদাদ ,শেখ আলী ইবনুল খাযেজ কাফী এবং শেখ বাহাউদ্দীন আলী ইবনে আবদুল কারিম।271 সম্ভবত তাঁর ফিকাহর শিক্ষকও এই তিন ব্যক্তি ছিলেন। ইবনে ফাহদের বেশ কিছু ফিকাহ্ গ্রন্থ রয়েছে। তন্মধ্যে মুহাক্কেক হিল্লীর মুখতাছারুন নাফে গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আল মুহাযযাবুল বারীঈ ,আল্লামা হিল্লীর আল মুকতাছের গ্রন্থের ব্যাখ্যা এবং শহীদে আউয়ালের আলফিয়াহ্ গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। ইবনে ফাহদ বিশেষত চরিত্র ও আধ্যাত্মিক চিন্তার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। আধ্যাত্মিক বিষয়ে তাঁর ইদ্দাতুদ দায়ী নামক একটি গ্রন্থ রয়েছে।

20. শেখ আলী ইবনে হেলাল জাযায়েরী: তিনি কোরআন ও হাদীসের ন্যায় নাকলী জ্ঞানে যেমন পণ্ডিত ছিলেন তেমনি দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক শাস্ত্রেও জ্ঞানী ছিলেন। তিনি একজন পরহেজগার ও দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি ছিলেন। অসম্ভব নয় ,ইবনে ফাহদের শিক্ষকগণই তাঁর শিক্ষক ছিলেন। তিনি তাঁর সমকালের শিয়া ফকীহ্দের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের কারণে শাইখুল ইসলাম নামে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর ছাত্র মুহাক্কেক কারকী তাঁকে শাইখুল ইসলাম সম্বোধন করে ফিকাহর ক্ষেত্রে তাঁর পাণ্ডিত্যের প্রশংসা করেছেন। বিশিষ্ট ফকীহ্ ইবনে আবি জামহুরও তাঁর নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেছেন।

21. শেখ আলী ইবনে আবদুল আলী কারকী: তিনি মোহাক্কেক কারকী ও মোহাক্কেক সানী নামে প্রসিদ্ধ। শেখ আলী লেবাননের জাবালে আমালের একজন ফকীহ্ এবং বিশিষ্ট শিয়া ফকীহ্দের একজন। তিনি ইরাকে ও সিরিয়ায় শিক্ষা লাভ করেছেন। অতঃপর সম্রাট প্রথম তাহমাসবের সময় ইরানে আসেন এবং ইরানে প্রথমবারের মতো একজন আলেমকে সম্মানিত করে শাইখুল ইসলাম উপাধি দেয়া হয়। তাঁর পরবর্তীতে তাঁরই ছাত্র ও শেখ বাহায়ীর শ্বশুর শেখ আলী মিনশার এ উপাধি পান। অবশ্য পরে শেখ বাহায়ীও এ উপাধিপ্রাপ্ত হন। শাহ তাহমাসব তাঁর প্রতি একটি পত্র লিখে সম্পূর্ণ অধিকার দান করেন ও তাঁকে প্রকৃত ক্ষমতার অধিকারী ঘোষণা করে নিজেকে তাঁর প্রতিনিধি বলে উল্লেখ করেন। শেখ আলীর ফিকাহর যে গ্রন্থটি প্রসিদ্ধ ও বিভিন্ন স্থানে উল্লিখিত হয় তা হলো জামেউল মাকাছেদ যা আল্লামা হিল্লীর কাওয়ায়েদ গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। তিনি এ গ্রন্থ ছাড়াও মুহাক্কেক হিল্লীর মুখতাছারুন নাফে শারায়ে এবং শহীদে আউয়াল ও আল্লামা হিল্লীর আরো কিছু গ্রন্থে টীকা ও ব্যাখ্যা সংযোজন করেছেন। মুহাক্কেক কারকীর ইরান আগমনের ফলে কাযভীনে প্রথম দীনি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। অতঃপর ইসফাহান ও অন্যান্য স্থানেও দীনি মাদ্রাসা স্থাপিত হয়। এ সকল মাদ্রাসায় বিশিষ্ট কিছু ছাত্র প্রশিক্ষিত হলে সাদুকাইনের পর দ্বিতীয় বারের মত ইরান শিয়া ফিকাহ্শাস্ত্রের অন্যতম কেন্দ্রে পরিণত হয়। মুহাক্কেক কারকী 937 অথবা 941 হিজরীতে মারা যান। তিনি আলী ইবনে হেলাল জাযায়েরীর ছাত্র ছিলেন এবং আলী ইবনে হেলাল ইবনে ফাহদ হিল্লীর শিষ্য ছিলেন। ইবনে ফাহদ ফাযেল মিকদাদের সূত্রে শহীদে আউয়ালের পরোক্ষ ছাত্র ছিলেন। মুহাক্কেক কারকীর পুত্র শেখ আবদুল আলী ইবনে আলী ইবনে আবদুল আলীও অন্যতম শিয়া ফকীহ্ ছিলেন। তিনি আল্লামা হিল্লীর ইরশাদ ও শহীদে আউয়ালের আলফিয়াহ্ গ্রন্থের ব্যাখ্যা-গ্রন্থ রচনা করেছেন।

22. শেখ যাইনুদ্দীন (শহীদে সানী নামে প্রসিদ্ধ): শেখ যাইনুদ্দীন বিশিষ্ট শিয়া ফকীহ্দের একজন। তিনি বহু বিষয়ে পণ্ডিত ছিলেন। তিনিও জাবালে আমালের অধিবাসী। তাঁর ষষ্ঠ পূর্বপুরুষ সালিহ আল্লামা হিল্লীর ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত তাঁর পূর্বপুরুষগণ ইরানের তুসের অধিবাসী ছিলেন । তাই কোন কোন স্থানে তিনি আত তুসুস শামী স্বাক্ষর করেছেন। শহীদে সানী 911 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন ও 966 হিজরীতে শহীদ হন। তিনি অনেক দেশে সফর করেছেন ও অনেক শিক্ষকের নিকট শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি মিশর ,দামেস্ক ,হেজায ,বাইতুল মুকাদ্দাস (ফিলিস্তিন) ,ইরাক ,ইস্তাম্বুল (তুরস্ক) ও অন্যান স্থানে গিয়েছেন। সকল শস্যক্ষেত্র হতেই তিনি শস্যদানা সংগ্রহ করেছেন। তাঁর সুন্নী শিক্ষকের সংখ্যা বারোজন বলে উল্লিখিত হয়েছে। এ কারণেই তিনি পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্র ছাড়াও দর্শন ,ইরফান ,চিকিৎসাশাস্ত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত পরহেজগার ও দুনিয়াবিমুখ ছিলেন। তাঁর ছাত্রদের অনেকেই উল্লেখ করেছেন ,তিনি তাঁর পরিবারের জীবিকার জন্য রাত্রিতে কাঠ সংগ্রহে যেতেন ও দিনের বেলা পাঠ দানের উদ্দেশ্যে মাদ্রাসায় আসতেন। তিনি বা য়ালা বাক্ক পাঁচটি মাযহাবের (জাফরী ,হানাফী ,মালেকী ,শাফেয়ী ও হাম্বলী) ফিকাহ্ পাঠ দান করতেন। তাঁর অসংখ্য রচনা রয়েছে। তাঁর প্রসিদ্ধ ফিকাহর গ্রন্থে শহীদে আউয়ালের লোমআ র ব্যাখ্যা ও টীকাগ্রন্থ এবং মুহাক্কেক হিল্লীর শারায়ে গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ যেটির নাম মাসালিকুল আফহাম । শহীদে সানী মুহাক্কেক কারকীর ইরান আগমনের পূর্বে তাঁর নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র পড়তেন। মায়ালিম গ্রন্থের লেখক শহীদে সানীর পুত্র এবং বিশিষ্ট শিয়া ফকীহ্দের একজন।

23. আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আরদেবিলী (মুকাদ্দাস আরদেবিলী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি তাকওয়া ও যুহদের (দুনিয়া বিমুখতা) ক্ষেত্রে প্রবাদ পুরুষ ছিলেন এবং শিয়া ফকীহ্ ও বিশেষজ্ঞদের প্রথম সারির একজন। মুহাক্কেক আরদেবিলী নাজাফে বাস করতেন। তিনি সাফাভী শাসকদের সমসাময়িক। সাফাভী শাসক শাহ আব্বাস তাঁকে ইসফাহান আসার আমন্ত্রণ জানালেও তিনি আসেন নি। শাহ আব্বাস চাইতেন মুকাদ্দাস আরদেবিলী তাঁর কোন খেদমত করার সুযোগ দিন। একবার এক ব্যক্তি ইরান হতে শাহ আব্বাসের ভয়ে পালিয়ে নাজাফে মুকাদ্দাস আরদিবিলীর শরণাপন্ন হয় ও তাকে শাহ আব্বাসের নিকট সুপারিশ করার আহ্বান জানায়। মুকাদ্দাস শাহ আব্বাসকে নিম্নোক্ত পত্র লিখে পাঠান: সাফাভী শাসক আব্বাসের জেনে রাখা উচিত ,এই ব্যক্তি প্রথম অত্যাচার ও অপরাধ করলেও এখন অত্যাচারের শিকার। যদি তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও তাহলে হয়তো মহান আল্লাহ্ তোমার কোন কোন অপরাধ ক্ষমা করে দেবেন। -শাহে বেলায়েত আহমাদ আরদেবিলী।

শাহ আব্বাস এর জবাবে লিখেন ,

আপনার অবগতির জন্য জানাচ্ছি ,শাহ আব্বাস আপনার নির্দেশকে আপনার অনুগ্রহ মনে করে পালন করেছে। আপনার এ ভক্তকে দোয়া করতে ভুলবেন না । - হযরত আলীর গৃহের প্রহরী কুকুর আব্বাস।272

মুকাদ্দাস আরদেবিলী ইসফাহানে আসতে অসম্মতি প্রকাশ করায় নাজাফের ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনটি পুনর্জীবিত হলো। যেমনিভাবে ইতোপূর্বে শহীদে সানী ,তাঁর পুত্র শেখ হাসান (মায়ালিম গ্রন্থের রচয়িতা) ইরানে হিজরত না করায় জাবালে আমাল ও সিরিয়ার ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দু টি পূর্বের ন্যায় প্রাণবন্ত থাকে। মায়ালিম মাদারিক গ্রন্থের লেখকদ্বয় ইরানে থেকে যেতে বাধ্য হওয়ার আশংকায় অত্যন্ত আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও মাশহাদে ইমাম রেযা (আ.)-এর কবর যিয়ারত হতে বিরত থাকেন।

আমার জানা নেই মুকাদ্দাস আরদেবিলী কার বা কাদের নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র অধ্যয়ন করেছেন। শুধু এতটুকু জানা আছে ,তিনি শহীদে সানীর ছাত্রদের নিকট ফিকাহ্ পড়েছিলেন। সম্ভবত তিনি মায়ালিম মাদারিক গ্রন্থদ্বয়ের লেখকদ্বয়ের নিকট ফিকাহ্ শিক্ষা লাভ করেছেন। জালাল উদ্দীন দাওয়ানীর জীবনীতে উল্লিখিত হয়েছে :

মোল্লা আহমদ আরদিবিলী ,মাওলানা আবদুল্লাহ্ শুসতারী ,মাওলানা আবদুল্লাহ্ ইয়াযদী ,খাজা আফজালউদ্দীন তারাকা ,মীর ফাখরুদ্দীন হামাকি ,শাহ আবু মুহাম্মদ সিরাজী ,মাওলানা মির্জা জান এবং মির ফাতহে সিরাজী খাজা জামাল উদ্দীন মাহমুদের ছাত্র ছিলেন এবং জামাল উদ্দীন মাহমুদ মুহাক্কেক জালাল উদ্দীন দাওয়ানীর শিষ্য ছিলেন।273

সম্ভবত মুকাদ্দাস আরদেবিলী খাজা জামাল উদ্দীন মাহমুদের নিকট দর্শন ও যুক্তিবিদ্যা পড়তেন ;ফিকাহ্ বা হাদীস নয়।

মুকাদ্দাস আরদেবিলী 993 হিজরীতে নাজাফে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর প্রসিদ্ধ দু টি ফিকাহ্ গ্রন্থ হলো শারহে ইরশাদ এবং আয়াতুল আহকাম । তাঁর সূক্ষ্ম ও যথার্য ফিকাহ্গত মত পরবর্তীকালের ফকীহ্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

24. শেখ বাহাউদ্দীন মুহাম্মদ আমেলী (শেখ বাহায়ী নামে প্রসিদ্ধ): শেখ বাহায়ী জাবালে আমালের অধিবাসী। তিনি তাঁর পিতা ও শহীদে সানীর ছাত্র শেখ হুসাইন ইবনে আবদুস সামাদের সঙ্গে শৈশবে ইরানে এসেছিলেন । তিনি বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। এ কারণেই তাঁর সৌভাগ্য হয়েছিল বিভিন্ন বিষয়ে বিভিন্ন শিক্ষকের নিকট শিক্ষাগ্রহণের। তিনি বিরল প্রতিভা ও যোগ্যতার অধিকারী ছিলেন। তিনি বহু বিষয়ে পণ্ডিত ছিলেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি একাধারে সাহিত্যিক ,কবি ,দার্শনিক ,গণিতজ্ঞ ,স্থপতি ,ফকীহ্ ও মুফাসসির ছিলেন। চিকিৎসাবিজ্ঞানেও তাঁর মোটামুটি জ্ঞান ছিল। তিনিই সর্বপ্রথম ব্যক্তি যিনি ফার্সী ভাষায় ফিকাহ্গত বিভিন্ন বিধানসম্বলিত গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থটি জামে আব্বাসী নামে প্রসিদ্ধ।

শেখ বাহায়ী যেহেতু ফিকাহ্শাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে অধ্যয়ন করেননি তাই তাঁকে প্রথম সারির ফকীহ্দের অন্তর্ভুক্ত মনে করা হয় না। অবশ্য তিনি অনেক ছাত্রকে প্রশিক্ষিত করেছেন। মোল্লা সাদরায়ে সিরাজী , বিহারুল আনওয়ার -এর লেখক আল্লামা মাজলিসীর পিতা মোল্লা মুহাম্মদ তাকী মাজলিসী (প্রথম মাজলিসী) ,মুহাক্কেক সাবযেওয়ারী , আয়াতুল আহকাম গ্রন্থের লেখক ফাযেল জাওয়াদ প্রমুখ তাঁর ছাত্র। পূর্বে আমরা শেখ বাহায়ীর শাইখুল ইসলাম উপাধি লাভের কথা শুনেছি। তাঁর শ্বশুর শেখ আলী মিনশার ইতোপূর্বে এ উপাধি পেয়েছিলেন। তাঁর স্ত্রী ও শেখ আলী মিনশারের কন্যাও একজন উচ্চ পর্যায়ের ফকীহ্ ও আলেম ছিলেন। শেখ বাহায়ী 953 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন ও 1030 অথবা 1031 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। শেখ বাহায়ী একজন পর্যটকও ছিলেন। তিনি মিশর ,সিরিয়া ,হেজায ,ইরাক ,ফিলিস্তিন ,আজারবাইজান ও আফগানিস্তানের হেরাতে সফর করেছেন।

25. মোল্লা মুহাম্মদ বাকের সাবযেওয়ারী (মুহাক্কেক সাবযেওয়ারী): তিনি সাবযেওয়ারের অধিবাসী। তিনি ফিকাহ্ ও দর্শনের কেন্দ্র ইসফাহানে শিক্ষা লাভ করেন। তাই তিনি আকল 274 নাকল 275 উভয় জ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন। ফিকাহ্ গ্রন্থসমূহে তাঁর নাম প্রায়ই উল্লিখিত হয়ে থাকে। তার লিখিত ফিকাহ্ বিষয়ক দু টি প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো যাখিরাহ কিফায়াহ । তিনি দার্শনিকও ছিলেন এবং ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থের ইলাহিয়াত অধ্যায়ের টীকা লিখেছেন। তিনি 1090 হিজরীতে মারা যান। তিনি শেখ বাহায়ী ও মুহাম্মদ তাকী মাজলিসীর ছাত্র ছিলেন।

26. আগা হুসাইন খুনসারী (মুহাক্কেক খুনসারী): তিনিও ইসফাহানের শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষা লাভ করেছেন। এ কারণে আকল নাকল উভয় জ্ঞানেই পণ্ডিত ছিলেন। তিনি মোল্লা মুহাম্মদ বাকের সাবযেওয়ারীর ভগ্নীপতি। তাঁর ফিকাহ্শাস্ত্রে রচিত গ্রন্থের নাম মাশারিকুশ শুমুস যা শহীদে আউয়ালের গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। মুহাক্কেক খুনসারী 1098 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি মোল্লা মুহসেন ফাইয কাশানী ও মোল্লা মুহাম্মদ বাকের মাজলেসীর সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। তাঁরা উভয়েই প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ছিলেন।

27. জামালুল মুহাক্কেকীন: তিনি আগা হুসাইন খুনসারীর পুত্র এবং আগা জামাল খুনসারী নামে প্রসিদ্ধ। তিনিও তাঁর পিতার ন্যায় বুদ্ধিবৃত্তিক (আকল) ও বর্ণনামূলক (নাকল) উভয় জ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন ,তিনি শহীদে সানীর শারহে লোমআ য় টীকা সংযোজন করে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থের প্রকৃতিবিজ্ঞানের অধ্যায়েরও ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আগা জামাল সাইয়্যেদ মাহ্দী বাহরুল উলুমের পরোক্ষ শিক্ষক (মধ্যবর্তী দু শিক্ষকের মাধ্যমে)। কারণ তিনি সাইয়্যেদ ইবরাহীম কাযভীনীর শিক্ষক। সাইয়্যেদ ইবরাহীম তাঁর পুত্র সাইয়্যেদ হুসাইন কাযভীনীর শিক্ষক এবং সাইয়্যেদ হুসাইন কাযভীনী বাহরুল উলুমের অন্যতম শিক্ষক।

28. শেখ বাহাউদ্দীন ইসফাহানী (ফাযেল হিন্দী): তিনি আল্লামা হিল্লীর কাওয়ায়েদ গ্রন্থের ব্যাখ্যা রচনা করেন এবং তাঁর গ্রন্থের নাম রাখেন কাশেফুল লিসাম । এ কারণেই তাঁকে কাশেফুল লিসাম বলা হয়। তাঁর চিন্তা ও মত ফকীহ্দের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ফাযেল হিন্দী 1137 হিজরীতে আফগানীদের দ্বারা সংঘটিত দাঙ্গায় নিহত হন। তিনিও বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক উভয় জ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন।

29. মুহাম্মদ বাকের ইবনে মুহাম্মদ আকমাল বেহবাহানী (ওয়াহিদ বেহবাহানী নামে প্রসিদ্ধ): ওয়াফিয়া গ্রন্থের ব্যাখ্যা রচয়িতা সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন রাজাভী কুমীর ছাত্র । তিনি সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন আগা জামাল খুনসারীরও ছাত্র।

ওয়াহিদ বেহবাহানী সাফাভী শাসনকালের পরবর্তী সময়ের আলেম ও ফকীহ্। সাফাভী শাসকদের পতনের পর ইসফাহানের দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তার অবস্থান হারায়। ইসফাহানে আফগানীদের হামলা ও দাঙ্গার কারণে অনেক আলেমই ,যেমন ওয়াহিদ বেহবাহানীর শিক্ষক সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন রাজাভী আতাবাতে চলে যান।

ওয়াহিদ বেহবাহানী কারবালায় যান ও দীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন । সেখানে অনেক প্রতিভাবান ছাত্রকে প্রশিক্ষিত করেন। যেমন সাইয়্যেদ মাহ্দী বাহরুল উলুম ,শেখ জাফর কাশেফুল গেতা ,মির্জা আবুল কাশেম কুমী (কাওয়ানীন গ্রন্থের লেখক) ,মোল্লা মাহ্দী নারাকী , রিয়ায গ্রন্থের লেখক সাইয়্যেদ আলী ,মির্জা মাহ্দী শাহরেস্তানী ,সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির শাফতী ইসফাহানী (যিনি হুজ্জাতুল ইসলাম নামে প্রসিদ্ধ) ,মির্জা মাহ্দী শাহীদ মাশহাদী , মিফতাহুল কারামাহ্ গ্রন্থের লেখক সাইয়্যেদ জাওয়াদ এবং সাইয়্যেদ মুহসেন আয়ারজী।

তদুপরি তিনি তৎকালীন সময়ের আখবারী প্রবণতার276 বিরুদ্ধে ইজতিহাদের সপক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখেছেন। আখবারীদের পরাজিত করে তিনি বেশ কিছু মুজতাহিদ তৈরি করেন। এ কারণে তাঁকে উঁচু স্তরের শিক্ষক বলা হয়। তাঁর নৈতিক চরিত্র তাকওয়ায় পূর্ণ ছিল। তাঁর ছাত্ররাও তাঁকে খুব সম্মান করতেন। ওয়াহিদ বেহবাহানী মায়ের দিক থেকে প্রথম মাজলেসীর বংশধর। প্রথম মাজলেসীর কন্যা ওয়াহিদ বেহবাহানীর মাতামহীর মাতা ,তাঁর নাম ছিল আমেনা বেগম। আমেনা বেগম মোল্লা সালেহ মাযেনদারানীর স্ত্রী এবং একজন ফকীহ্ ও মহীয়সী রমনী ছিলেন । যদিও তাঁর স্বামী মোল্লা সালেহ মাযেনদারানী একজন বড় আলেম ছিলেম তদুপরি কখনও কখনও ফিকাহর অনেক কঠিন সমস্যার সমাধানে স্ত্রীর শরণাপন্ন হতেন।

30. সাইয়্যেদ মাহ্দী বাহরুল উলুম: তিনি ওয়াহিদ বেহবাহানীর প্রতিভাধর ছাত্রদের একজন এবং একজন প্রসিদ্ধ শিয়া ফকীহ্। তিনি ফিকাহ্ বিষয়ে কবিতাগ্রন্থ রচনা করেছেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর মতামত অন্য ফকীহ্দের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বাহরুল উলুম ইরফান ও নৈতিকতায় উচ্চ মর্যাদা লাভের কারণে শিয়া আলেমদের নিকট বিশেষ শ্রদ্ধার পাত্র ও মাসুমের প্রতিচ্ছবি বলে পরিগণিত। তিনি অনেক কারামত দেখিয়েছেন। কাশেফুল গেতা (পরবর্তীতে তাঁর সম্পর্কে আলোচিত হবে) তাঁর পাগড়ির কিনারা দিয়ে বাহরুল উলুমের জুতা পরিষ্কার করে দিতেন। বাহরুল উলুম 1154 অথবা 1155 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং 1212 হিজরীতে মারা যান।

31. শেখ জাফর কাশেফুল গেতা: তিনি ওয়াহিদ বেহবাহানী ও সাইয়্যেদ মাহ্দী বাহরুল উলুমের ছাত্র। তিনি একজন আরব এবং ফকীহ্ হিসেবে খুবই দক্ষ ছিলেন। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো কাশেফুল গেতা । তিনি নাজাফে বসবাস করতেন। মিফতাহুল কারামাহ্ গ্রন্থের লেখক সাইয়্যেদ জাওয়াদ , জাওয়াহেরুল কালাম গ্রন্থের লেখক শেখ মুহাম্মদ হাসান তাঁর ছাত্রদের অন্যতম। তাঁর চার পুত্রই প্রতিষ্ঠিত ফকীহ্ ছিলেন। তিনি সম্রাট ফাতহ্ আলী শাহের সমসাময়িক। তিনি তাঁর কাশেফুল গেতা গ্রন্থের ভূমিকায় তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি 1228 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। কাশেফুল গেতা ফিকাহ্শাস্ত্রে গভীর ও সূক্ষ্ম জ্ঞান রাখতেন। তাই এ শাস্ত্রে তাঁকে সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করা হয়।

32. শেখ মুহাম্মদ হাসান: তাঁকে শিয়া ফিকাহর জ্ঞান ভাণ্ডার বলা হয়। বর্তমান সময়ের কোন ফকীহ্ই শেখ মুহাম্মদ হাসানের রচিত জাওয়াহেরুল কালাম গ্রন্থটির শরণাপন্ন না হয়ে পারেন না। এ গ্রন্থটি কয়েকবার লিথোগ্রাফী পদ্ধতিতে মুদ্রিত হয়েছে। বর্তমানে পঞ্চাশ খণ্ডে (প্রতি খণ্ড চারশ পৃষ্ঠা হিসেবে মোট বিশ হাজার পৃষ্ঠার) মুদ্রাক্ষরে বইটি ছাপা হচ্ছে। জাওয়াহেরুল কালাম ফিকাহ্শাস্ত্রে মুসলমানদের সর্ববৃহৎ গ্রন্থ এবং এর প্রতিটি পৃষ্ঠা যথেষ্ট সময় নিয়ে ও সূক্ষ্মদৃষ্টি দিয়ে পড়ার মতো। চিন্তা করুন বিশ হাজার পৃষ্ঠার এরূপ একটি গ্রন্থ রচনায় রচয়িতা কতটা শ্রম ও সময় দিয়েছেন! তিনি একাধারে ত্রিশ বছর পরিশ্রম করে গ্রন্থটি রচনা করেন। তাই এ গ্রন্থটি একজন মানুষের সাহস ,হিম্মত ,প্রতিভা ,একাগ্রতা ,ভালবাসা ,ঈমান ও দৃঢ় চিত্তের স্বাক্ষর। তিনি কাশেফুল গেতা এবং মিফতাহুল কারামাহ্ গ্রন্থের লেখক সাইয়্যেদ জাওয়াদের ছাত্র। তিনি নাজাফের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে প্রচুর ছাত্রকে প্রশিক্ষিত করেছেন। শেখ মুহাম্মদ হাসান আরব ছিলেন। তিনি তাঁর সময়ে মারজা (যে ফকীহর অনুসরণ করা হয়) ছিলেন। তিনি 1266 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

33. শেখ মুরতাজা আনসারী: তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী জাবের ইবনে আবদুল্লাহ্ আনসারীর বংশধর। তিনি ইরানের দেজফুলে জন্মগ্রহণ করেন। বিশ বছর বয়স পর্যন্ত স্বীয় পিতার নিকট পড়াশোনা করেন। অতঃপর পিতার সঙ্গে ইরাকের আতাবাতে চলে যান। সেখানে শিক্ষকগণ তাঁর মধ্যে তীক্ষ্ণ প্রতিভা লক্ষ্য করে তাঁর পিতাকে তাঁকে সেখানে রেখে যাওয়ার অনুরোধ করেন। তিনি ইরাকে চার বছর অবস্থান করেন এবং বিভিন্ন শিক্ষকের নিকট পড়াশোনা করেন। তাঁদের অনেকেই তৎকালীন সময়ে প্রসিদ্ধ ছিলেন। চার বছর পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনায় তিনি ইরানে ফিরে আসেন এবং দু বছর পর পুনরায় ইরাকে ফিরে যান। ইরাকে দু বছর অবস্থানের পর ইরানে প্রত্যাবর্তনের সংকল্প করেন। ইরানে আসার পর তিনি ইরানের বিভিন্ন আলেমের নিকট পড়াশোনা করেন। সর্বপ্রথম তিনি মাশহাদে ইমাম রেজার মাযার যিয়ারতে যান ও সেখান হতে কাশানে মুসতানাদুশ শিয়া গ্রন্থের লেখক মোল্লা আহমদ নারাকী ও তাঁর পুত্র মোল্লা মাহ্দী নারাকীর ( জামেয়ুস সায়াদাত গ্রন্থের রচয়িতা) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অতঃপর সেখানে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেন এবং তিন বছর তাঁদের নিকট শিক্ষাগ্রহণ করেন। এরপর পুনরায় মাশহাদে যান ও সেখানে পাঁচ মাস অবস্থান করেন। শেখ আনসারী ইসফাহান ও বুরুজেরদ সফর করেন। তাঁর এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল প্রখ্যাত শিক্ষকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ লাভ ও শিক্ষাগ্রহণ। 1252/1253 হিজরীতে তিনি ইরাকের আতাবাতে ফিরে যান ও শিক্ষা দান শুরু করেন। সেখানে অবস্থানকালেই তিনি শিয়াদের অনুসরণীয় শ্রেষ্ঠ ফকীহর (মারজা) পদ লাভ করেন।

শেখ আনসারীকে ফকীহ্ ও মুজতাহিদের অলংকার উপাধি দেয়া হয়। তিনি বিষয়ের গভীরতা ও সূক্ষ্মতা যাচাইয়ে বিরল প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। ফিকাহ্ ও উসূলশাস্ত্রকে তিনি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করিয়েছিলেন ও এ দু শাস্ত্রে তিনি এমন কিছুর উদ্ভব ঘটান যা অভূতপূর্ব। তাঁর প্রসিদ্ধ দু টি গ্রন্থ হলো রাসায়িল এবং মাকাসিব যা বর্তমানে দীনী ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তক। তাঁর পরবর্তী সময়ের আলেমগণ তাঁর চিন্তা ও মতেরই ছাত্র। ভিন্নভাবে বললে তাঁরই মানসপুত্র। পরবর্তীকালের আলেমগণ তাঁর গ্রন্থসমূহের সঙ্গে টীকা সংযোজন করেছেন। মুহাক্কেক হিল্লী ,আল্লামা হিল্লী এবং শহীদে আউয়ালের পর তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যাঁর গ্রন্থসমূহ পরবর্তী আলেমদের দ্বারা ব্যাখ্যা ও টীকা সংযোজিত করে প্রকাশিত হয়ে আসছে।

তিনি দুনিয়াবিমুখতা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রেও প্রবাদপুরুষ ছিলেন। শেখ আনসারী 1281 হিজরীতে নাজাফে মৃত্যুবরণ করেন ও সমাহিত হন।

34. মির্জা মুহাম্মদ হাসান সিরাজী: তিনি মির্জা সিরাজী বুযুর্গ নামে সুপরিচিত। প্রথম জীবনে তিনি ইসফাহানে পড়াশোনা করেন। অতঃপর নাজাফে যান । সেখানে শেখ মুহাম্মদ হাসানের ক্লাসে যোগদান করেন। তাঁর মৃত্যুর পর শেখ আনসারীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। তিনি শেখ আনসারীর বিশিষ্ট ছাত্রদের একজন। শেখ আনসারীর পর তিনি শিয়াদের মারজা হন। তিনি 23 বছর শিয়াদের একক মারজা ছিলেন। তিনিই ইংরেজ সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের তৎপরতাকে নষ্ট করার লক্ষ্যে ঐতিহাসিক তামাক আন্দোলন অর্থাৎ তামাককে হারাম ঘোষণা করে ফতোয়া দেন। তাঁর নিকট হতে অনেক ছাত্র প্রশিক্ষিত হয়েছেন ,যেমন আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাযেম খোরাসানী ,সাইয়্যেদ মুহাম্মদ কাযেম তাবাতাবায়ী ইয়াযদী ,আগা রেযা হামেদানী ,হাজী মির্জা হুসাইন সাবযেওয়ারী ,সাইয়্যেদ মুহাম্মদ ফাশারাকি ইসফাহানী ,মির্জা মুহাম্মদ তাকী সিরাজী এবং অন্যান্য অনেকেই। তাঁর কোন গ্রন্থই এখন বিদ্যমান নেই। তবে তাঁর কিছু মত এখনও ফকীহ্দের নিকট সমাদৃত। তিনি 1312 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

35. আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাযেম খোরাসানী: তিনি 1255 হিজরীতে মাশহাদের এক অপ্রসিদ্ধ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 22 বছর বয়সে তিনি তেহরানে হিজরত করেন। কিছু দিন সেখানে দর্শন শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর নাজাফে যান। তিনি দু বছর শেখ আনসারীর ক্লাসে অংশগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ সময় মির্জা সিরাজীর নিকট শিক্ষাগ্রহণ করেন। মির্জা সিরাজী 1291 সালে নাজাফ ছেড়ে সামেরায় চলে যান ও বসবাস শুরু করেন। কিন্তু আখুন্দ খোরাসানী নাজাফেই থেকে যান ও নিজেই পাঠ দান শুরু করেন। তিনি একজন সফল শিক্ষক ছিলেন। প্রায় বারোশ ছাত্র তাঁর নিকট শিক্ষা লাভ করেন যাঁদের মধ্যে দু জন পরবর্তীতে মুজতাহিদ ও ফকীহ্ হিসেবে স্বীকৃত হয়েছিলেন।

বিগত শতাব্দীর1 ফকীহ্দের অনেকেই ,যেমন সাইয়্যেদ আবুল হাসান ইসফাহানী ,শেখ মুহাম্মদ হুসাইন ইসফাহানী ,আগা হুসাইন বুরুজেরদী ,আগা হুসাইন কুমী ও জিয়াউদ্দীন আরাকী তাঁর ছাত্র ছিলেন। আখুন্দ খোরাসানীর পরিচিতি বিশেষত উসূলশাস্ত্রেই অধিক। তাঁর লেখা কিফায়াতুল উসূল একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যপুস্তক। এ গ্রন্থটির অনেক ব্যাখ্যা ও টীকাসম্বলিত গ্রন্থ ছাপা হয়েছে।

উসূলশাস্ত্রে তাঁর মতামত প্রায়ই উদ্ধৃত হয়ে থাকে ও তা দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ স্থান লাভ করেছে। আখুন্দ খোরাসানী সেই ব্যক্তি যিনি শাসনতান্ত্রিক বিষয়ে শর্তারোপের ফতোয়া দান করেন। ইরানের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলন তাঁর নিকট কৃতজ্ঞ। তিনি 1329 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

36. হাজী মির্জা হুসাইন নাইনী: তিনি চৌদ্দ হিজরী শতাব্দীর একজন প্রসিদ্ধ ফকীহ্ ও উসূলশাস্ত্রবিদ। তিনি মির্জা সিরাজী ও সাইয়্যেদ মুহাম্মদ ফাশারাকীর নিকট পড়াশোনা করেন। তিনি একজন প্রসিদ্ধ শিক্ষক ছিলেন। উসূলশাস্ত্রে তাঁর বিশেষ সুনাম ছিল। তিনি আখুন্দ খোরাসানীর বিপরীতে উসূলশাস্ত্রে কিছু মত দেন যাতে নতুনত্ব ছিল। বর্তমান সময়ের অনেক ফকীহ্ই তাঁর ছাত্র। তিনি ফার্সী ভাষায় মূল্যবান কিছু সংখ্যক গ্রন্থ রচনা করেছেন ,যেমন হুকুমাত দার ইসলাম যাতে ইসলামের মৌল ভিত্তি এবং রাষ্ট্র ও শাসন ব্যবস্থার (শাসনতন্ত্র সম্পর্কিত) পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি 1355 হিজরীতে নাজাফে মৃত্যুবরণ করেন।

সারাংশ ও মূল্যায়ন

আমরা এখানে ইমাম মাহ্দী (আ.)-এর স্বল্পকালীন অন্তর্ধানের সময় হতে চতুর্দশ হিজরী শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময় পর্যন্ত ফিকাহ্শাস্ত্রের ছত্রিশজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের পরিচয় প্রদান করলাম। আমরা ফকীহ্দের মধ্য হতে সেই সকল ব্যক্তিত্বকেই উপস্থাপন করেছি বর্তমান সময় পর্যন্ত উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্রে প্রসিদ্ধ হিসেবে গ্রন্থসমূহে যাঁদের মতামত উদ্ধৃত ও বর্ণিত হয়ে থাকে। উপরোক্ত আলোচনা হতে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো স্পষ্ট হয় :

প্রথমত তৃতীয় হিজরী শতাব্দী হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত শিয়াদের মধ্যে ফিকাহ্ প্রাণবন্তরূপেই অব্যাহত ছিল ও আছে। অর্থাৎ এগার শতকের অধিক সময় ধরে ফিকাহ্শাস্ত্র দীনী মাদ্রাসাগুলোতে সক্রিয়রূপে বিদ্যমান ছিল। এ সময়ব্যাপী কখনই ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ধারা বিচ্ছিন্ন হয়নি । উদাহরণস্বরূপ আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আয়াতুল্লাহ্ বুরুজেরদী হতে শুরু করে পূর্বক্রম অনুসরণ করলে ফিকাহ্শাস্ত্রের শিক্ষকতার ধারাটি পবিত্র ইমামগণের যুগের সঙ্গে সংযুক্ত হবে। সম্ভবত সাড়ে এগার শতাব্দীব্যাপী কোন একটি জ্ঞানের অব্যাহত ধারা কোন সভ্যতাতেই এরূপ নিরবচ্ছিন্নরূপে বিদ্যমান ছিল না ,এমনকি কোন সভ্যতা ও সংস্কৃতির অব্যাহত ধারার এরূপ উদাহরণ অভূতপূর্ব। একমাত্র ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতিই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিভিন্ন স্তরে পর্যায়ক্রমে অবিচ্ছিন্নভাবে এক প্রাণ ও আত্মার প্রভাবে পরস্পর সম্পর্কিত থেকে এর জীবনকে অব্যাহত রেখেছে। অন্যান্য সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আমরা স্বল্প সময়ের জন্য হলেও বিচ্ছিন্নতা ও স্থবিরতা লক্ষ্য করি।

এখানে উল্লেখ্য ,আমরা তৃতীয় হিজরী শতাব্দী হতে শিয়া ফিকাহ্শাস্ত্রের বিকাশের ধারা আলোচনা করলেও তার অর্থ এ নয় যে ,শিয়া ফিকাহ্ সে সময় হতে শুরু হয়েছে ;বরং এর কারণ হলো এর পূর্বে ইমামগণ সরাসরি উপস্থিত ছিলেন বলে শিয়া ফকীহ্গণ তাঁদের প্রভাবাধীন হিসেবে স্বাধীন ছিলেন না। তাই বলতে গেলে ইজতিহাদ ও ফিকাহ্শাস্ত্রের গ্রন্থ রচনা ও গবেষণার বিষয়টি শিয়াদের মাঝেও স্বয়ং সাহাবীদের সময়ে শুরু হয়েছিল। আমরা ইতোপূর্বে উল্লেখ করেছি ,ফিকাহ্ বিষয়ক সর্বপ্রথম গ্রন্থটি হযরত আলী (আ.)-এর বায়তুল মাল রক্ষক সাহাবী আলী ইবনে আবি রাফে রচনা করেন।

দ্বিতীয়ত কোন কোন ব্যক্তির এ ধারণা হয় ,শিয়া মাযহাবের জ্ঞান সম্পর্কিত গ্রন্থসমূহ বিশেষত ফিকাহ্ বিষয়ক গ্রন্থসমূহ ইরানী ফকীহ্দের দ্বারা লিখিত হয়েছে। এটি সঠিক নয়। বরং ইরানী

অ-ইরানী ফকীহ্রা সমবেতভাবে এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছেন। বিশেষত দশম হিজরী শতাব্দীর পূর্ববর্তী ফকীহ্গণের অধিকাংশই অ-ইরানী ছিলেন। দশম হিজরী শতাব্দীর পরবর্তীতে সাফাভীদের শাসনকাল হতে ইরানী ফকীহ্দের প্রাধান্য শুরু হয়।

তৃতীয়ত সাফাভী শাসনামলের পূর্বে ইরান ফিকাহ্শাস্ত্রের কেন্দ্র ছিল। পরবর্তীতে শেখ তুসীর মাধ্যমে নাজাফের দীনী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হলে তা ফিকাহর কেন্দ্রে পরিণত হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই লেবাননের জাবালে আমাল ও এর নিকটবর্তী ইরাকের হিল্লাতে ফিকাহ্ শিক্ষার দু টি কেন্দ্র স্থাপিত হয়। সিরিয়ার হালাবও কিছুদিন শিয়া ফিকাহর অন্যতম কেন্দ্র ছিল। সাফাভীদের শাসনামলে ইসফাহান শিয়া ফিকাহ্শাস্ত্রের কেন্দ্রে পরিণত হয়। অবশ্য একই মুহূর্তে নাজাফের ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি মুকাদ্দাস আরদিবিলী কর্তৃক পুনরুজ্জীবিত হয় ও বর্তমান সময় পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। ইরানের শহরগুলোর মধ্যে একমাত্র কোম তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথম দিকে আলী ইবনে বাবাভেই ও মুহাম্মদ ইবনে কৌলাভেই কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ফিকাহর কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যমান ছিল। তবে মধ্যবর্তী সময়ে তা স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং কাজার শাসনামলে মির্জা আবুল কাসেম কুমী কর্তৃক পুনর্জীবনপ্রাপ্ত হয়। সর্বশেষ 1340 হিজরীতে মরহুম শেখ আবদুল করিম হায়েরী ইয়াযদি কোমকে শিয়া ফিকাহর সর্ববৃহৎ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলেন।

সুতরাং কখনও বাগদাদ ,কখনও নাজাফ ,কখনও জাবালে আমাল ,হালাব (সিরিয়া) ,হিল্লা (ইরাক) ,ইরানের কোম ও ইসফাহান ফকীহ্ ও শিয়া ফিকাহর কেন্দ্র ছিল। অবশ্য ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে বিশেষত সাফাভী শাসনামলে ইরানের অন্যান্য শহরেও ,যেমন মাশহাদ ,হামেদান ,সিরাজ ,ইয়াযদ ,কাশান ,তাবরীজ ,জানযান ,কাযভীন ও ফেরদৌসীতে দীনী শিক্ষার বৃহৎ ও নির্ভরযোগ্য কিছু কেন্দ্র ছিল। অবশ্য ইসফাহান ,কোম ও কাশান ব্যতীত অন্য কোন শহরই ফিকাহ্শাস্ত্রের প্রথম শ্রেণীর কেন্দ্র বলে পরিগণিত হতো না। অবশ্য ইসলামী জ্ঞান ও ফিকাহ্শাস্ত্রের চর্চার কেন্দ্র হিসেবে এ শহরগুলোতে অবস্থিত বৃহৎ ও ঐতিহাসিক মাদ্রাসাসমূহ সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে যা তৎকালীন সময়ে দীনী ছাত্রদের কলোরবে মুখরিত হতো।

চতুর্থত জাবালে আমালের ফকীহ্গণ সাফাভী শাসকদের পথ নির্দেশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। প্রথমদিকে সাফাভী শাসকগণ তাঁদের প্রাচীন দরবেশী রীতির পথে চলছিলেন। যদি তাঁদের এ পথ জাবালে আমালের গভীর ফিকাহ্শাস্ত্রের জ্ঞান দ্বারা ভারসাম্য না পেত ,তাঁরা যদি ইরানে ফিকাহ্শাস্ত্রের ভিত্তি হিসেবে দীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন না করতেন তবে তাঁদের পরিণতি সিরিয়া ও তুরস্কের আলাভীদের (যারা হযরত আলীকে আল্লাহ্ মনে করে) ন্যায় হতো। অর্থাৎ জাবালে আমালের ফকীহ্দের প্রভাবেই ইরানের শাসক ও জনসাধারণ বিচ্যুতি হতে রক্ষা পায় এবং এরফানশাস্ত্র ইরানে ভারসাম্যপূর্ণ পথে বিকশিত হয়। জাবালে আমালের ফকীহ্গণ ,যেমন মুহাক্কেক কোরকী ,শেখ বাহায়ী এবং অন্যরা ইসফাহানের ফিকাহ্শাস্ত্রের কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে যে বড় দায়িত্ব পালন করেছেন সে কারণে ইরানী জাতি তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ।

পঞ্চমত যে সকল ব্যক্তি শিয়া মাযহাবকে ইরানীদের তৈরি বলে তা খণ্ডিত হয়েছে। শাকিব আরসালানের বর্ণনা মতে ইরানে শিয়া মতবাদের প্রসারের অনেক পূর্বেই জাবালে আমলে শিয়া ফিকাহর বিকাশ ও বিস্তার ঘটে অর্থাৎ জাবাল আমাল এ দিক থেকে ইরান হতে অগ্রগামী ছিল। অনেকে মনে করেন জাবালে আমাল ও লেবাননে শিয়া চিন্তা রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর বিশিষ্ট সাহাবী আবু যার গিফারী (রা.)-এর মাধ্যমে বিস্তৃত হয়। কারণ আবু যার গিফারী সিরিয়ায় অবস্থানকালে বেশ কিছুদিন এখানে ছিলেন এবং তিনি মুয়াবিয়া ও উমাইয়্যাদের বায়তুল মাল আত্মসাৎ ও সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণের বিরুদ্ধে সেখানকার অধিবাসীদের উদ্দীপিত করতেন। তিনি সেখানে পবিত্র শিয়া ধারার প্রচার করতেন।277