ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 44562
ডাউনলোড: 1887

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 44562 / ডাউনলোড: 1887
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

কালামশাস্ত্র

কালামশাস্ত্র ইসলামের একটি নিজস্ব জ্ঞান। কালামশাস্ত্র ইসলামের মৌলবিশ্বাস ও এর প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত গবেষণামূলক জ্ঞান। কালামশাস্ত্রে আল্লাহর একত্ববাদ ও গুণাবলীকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক (আকলী) জ্ঞান যেমন রয়েছে তেমনি ওহী ও হাদীসনির্ভর বর্ণনামূলক (নাকলী) জ্ঞানও রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ শিয়াদের দৃষ্টিতে ইমামত। সুতরাং কালামশাস্ত্র আকলী ও নাকলী জ্ঞানের সমন্বয়ে সৃষ্ট।

ইসলামের মতো ধর্মে যা স্রষ্টা ,সৃষ্টি ,পুনরুত্থান ও বিশ্বজগৎ সম্পর্কে বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে ও এ বিষয়ে বিভিন্ন বক্তব্য রেখেছে এরূপ একটি জ্ঞান বিদ্যমান থাকা আবশ্যকীয়। বিশেষত প্রথম শতাব্দীগুলোতে মুসলিম সমাজে জ্ঞানের প্রতি যে আগ্রহ ও উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল তাতে কালামশাস্ত্রের ন্যায় জ্ঞানের উদ্ভব ঘটা স্বাভাবিক ছিল।

পবিত্র কোরআন তাওহীদ ,নবুওয়াত ও আখেরাতের মতো আকীদা সংক্রান্ত বিষয়ে অনেক স্থানে দলিল উপস্থাপন করেছে এবং এর বিরোধীদেরকে যুক্তিপ্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানিয়েছে। যেমন বলেছে ,قل هاتوا برهانكم إن كنتم صادقين যদি তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাক তবে প্রমাণ উপস্থাপন কর। 285

নিঃসন্দেহে ইসলামী আকীদা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় ,যেমন সসীম ও অসীম ,স্রষ্টা ও সৃষ্ট ,স্থান-কালের ঊর্ধ্বে ও স্থান-কালের অধীন ,বাধ্যবাধকতা ,স্বাধীনতা (জাবর ও ইখতিয়ার) ,মৌলিকত্ব ও যৌগিকতা ও এরূপ অন্যান্য আলোচনা সর্বপ্রথম হযরত আলী (আ.) উপস্থাপন করেছেন। এ কারণেই শিয়াগণ বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানে অন্যদের চেয়ে অগ্রগামী ছিল।

ইসলামে ইরানীদের অবদানের আলোচনায় কালামশাস্ত্রে ইরানীদের ভূমিকার বিষয়টি শিয়া কালামশাস্ত্রবিদদের দিয়ে শুরু করছি।

1. প্রথম শিয়া কালামশাস্ত্রবিদ যিনি এ বিষয়ে গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি হলেন আলী ইবনে ইসমাঈল ইবনে মাইসাম তাম্মার। তাঁর পিতামহ মাইসাম হযরত আলীর বিশিষ্ট সাহাবী ও প্রসিদ্ধ বক্তা ছিলেন। তিনি বাহরাইনের হিজরের অধিবাসী হলেও বংশগতভাবে ইরানী ছিলেন। তাঁর পৌত্র আলী ইবনে ইসমাঈল ইবনে মাইসাম ,দারার ইবনে আমর ,আবুল হাযিল আলাফ ও আমর ইবনে উবাইদের সমকালীন ব্যক্তি ছিলেন। এরা সকলেই দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর কালামশাস্ত্রবিদ। তিনি এদের সঙ্গে কালামশাস্ত্রীয় আলোচনা করতেন।

2. হিশাম ইবনে সালেম জাওযাজানী: এই ব্যক্তি ইমাম সাদিক (আ.)-এর বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ সাহাবী। ইমাম সাদিকের কিছু সাহাবীকে ইমাম নিজে কালামশাস্ত্রবিদ বলে অভিহিত করেছিলেন ,যেমন হামরান ইবনে আইয়ান ,মুমিন আলতাক ,কাইস ইবনিল মাসের ,হিশাম ইবনে হাকাম প্রমুখ।286

কাইস ইবনিল মাসের ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন জয়নুল আবেদীন (আ.)-এর নিকট কালাম শিক্ষা লাভ করেছিলেন বলে কথিত আছে।

3. ফাযল ইবনে আবু সাহল ইবনে নওবাখত: তিনি নওবাখত বংশের। ইবনুন নাদিমের বর্ণনা মতে এ বংশটি শিয়া হিসেবে প্রসিদ্ধ ও তিন শতাব্দী ধরে তাঁদের মধ্য থেকে প্রসিদ্ধ আলেমের আগমন ঘটেছিল। ফাযলের পিতামহ নওবাখত একজন জ্যোতির্বিদ ও আব্বাসীয় খলীফা মনসুরের দরবারে কর্মরত ছিলেন।

একদিন নওবাখত তাঁর পুত্র আবু সাহলকে মনসুরের দরবারে নিয়ে নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন। মনসুর তাঁর নাম জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন , খুরশীদ মাহ তিমাযাহ মা বজারাদ বাদ খসরু না শাহ। মনসুর বলেন , এর পুরোটাই তোমার নাম ? তিনি বলেন , হ্যাঁ। মনসুর হেসে বলেন , তোমার বাবা তোমার কি অবস্থা করেছে! তোমার নামকে সংক্ষিপ্ত কর ,তিমাযা রাখ নতুবা আমার দেয়া আবু সাহল নামটি গ্রহণ কর। আবু সাহল এ নাম গ্রহণে রাজী হলেন।287 এর পরবর্তীতে নওবাখতীদের অধিকাংশের নাম আবু সাহল রাখার প্রচলন ছিল।

শিয়া কালামশাস্ত্রবিদদের অনেকেই নওবাখতী বংশের ,যেমন ফাযল ইবনে আবি সাহল ইবনে নওবাখত যিনি খলীফা হারুনের বায়তুল হিকমাহ্ নামক প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগারের দায়িত্বশীল ও ফার্সী হতে আরবীতে গ্রন্থসমূহ অনুবাদের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। তেমনি ইসহাক ইবনে আবি সাহল ইবনে নওবাখত ,তাঁর দু পুত্র ইসমাঈল ইবনে ইসহাক ইবনে আবি সাহল ও আলী ইবনে ইসহাক নওবাখত এবং পৌত্র আবু সাহল ইসমাঈল ইবনে আলী ইবনে ইসহাক সকলেই শিয়া কালামশাস্ত্রবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। বিশেষত আবু সাহল ইসমাঈল ইবনে আলী শিয়াদের মধ্যে শাইখুল মুতাকাল্লিমীন (কালামশাস্ত্রবিদগণের নেতা) উপাধি পান। তাঁর ভাগ্নেয় হাসান ইবনে মূসা নওবাখতীসহ ইরানী এ বংশটির আরো কিছু ব্যক্তি প্রসিদ্ধ শিয়া মুতাকাল্লিমদের

অন্তর্ভুক্ত।

4. ফাযল ইবনে শাজান নিশাবুরী: তিনি দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর শেষাংশ ও তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধের ব্যক্তিত্ব। তাঁর সম্পর্কে আমরা পূর্বে আলোচনা করেছি। ফাযল ইবনে শাজান ইমাম রেযা (আ.) ,ইমাম জাওয়াদ এবং ইমাম হাদী (আ.)-এর শিষ্য হিসেবে পরিগণিত। তিনি কালামশাস্ত্রে অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

5. মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে মামলাক জুরজানী ইসফাহানী: তিনি তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আবু আলী জাবায়ীর সমসাময়িক।

6. আবু জাফর ইবনে কুব্বা রাযী: তিনি তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর কালামশাস্ত্রবিদদের অন্যতম। তিনি ইমামতের বিষযে আবুল কাসেম কা ব বালখীর সঙ্গে পত্র বিনিময় ও বিতর্ক করেছেন।

7. আবুল হাসান সুসানগারদী: তিনি ইবনে কুব্বা রাযীর সমসাময়িক। কথিত আছে তিনি আবু সাহল ইসমাঈল ইবনে আলী নওবাখতীর দাস ছিলেন। তিনি পঞ্চাশ বার হেঁটে হজ্বব্রত পালন করেন।

8. আবু আলী ইবনে মাসকাভীয়ে রাযী ইসফাহানী: তিনি ইসলামের বিশিষ্ট কালামশাস্ত্রবিদ ,দার্শনিক ও চিকিৎসকদের অন্যতম। এ শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ দু টি গ্রন্থ হলো আল ফাউযুল আকবার ও আল ফাউযুল আসগার যা বর্তমানে মুদ্রিত ও ছাপা হয়েছে। তাঁর লিখিত তাহারাতুল আরাক ইসলামী নৈতিকতার বিষয়ে লিখিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ। তিনি প্রসিদ্ধ দার্শনিক ও চিকিৎসক ইবনে সিনার সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব এবং 431 হিজরীতে মারা যান।

শিয়া কালামশাস্ত্রবিদগণ ইরানী অ-ইরানী সব মিলিয়ে অনেক। আমরা শুধু উদাহরণস্বরূপ দ্বিতীয় হতে চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর কিছু সংখ্যক কালামশাস্ত্রবিদের নাম উল্লেখ করলাম। অবশ্য সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে মুসলিম কালামশাস্ত্রবিদদের মূল ভিত্তি হিসেবে শিয়া কালামশাস্ত্রবিদরাই মুখ্য।

বিশিষ্ট দার্শনিক ,কালামশাস্ত্রবিদ ,গণিতবিদ ও রাজনীতিক খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর আবির্ভাব ও আত তাজরীদ গ্রন্থ রচনার ফলে শিয়া কালামশাস্ত্র বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে এবং এর পরবর্তীতে শিয়া ও সুন্নী উভয় কালামশাস্ত্রই এই গ্রন্থকে কেন্দ্র করে আলোচনা উপস্থাপন শুরু করে।

সুন্নী কালামশাস্ত্রবিদগণ

আহলে সুন্নাতের অধিকাংশ কালামশাস্ত্রবিদই ইরানী।

1 ও 2. আহলে সুন্নাতের সবচেয়ে প্রাচীন কালামশাস্ত্রবিদ হলেন হাসান বাসরী। অতঃপর তাঁর ছাত্র ওয়াসেল ইবনে আতা গাজাল। এরা উভয়েই ইরানী। হাসান বাসরী প্রথম হিজরী শতাব্দীর শেষার্ধ হতে দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধের কিছুদিন পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। তিনি 110 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।288

ওয়াসেল ইবনে আতা তাঁর ছাত্র হলেও তাঁর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নতুন মতবাদের জন্ম দেন। তাঁর মতবাদ মুতাযিলা নামে প্রসিদ্ধ। তিনি 181 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।289

3. আবুল হাযিল আলাফ: এ ব্যক্তিও ইরানী। তাঁকে আহলে সুন্নাতের বুদ্ধিবৃত্তিক কালামশাস্ত্রের প্রবক্তা বলা হয়। তিনি দর্শন গ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং বিতর্কে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। একবার মিলাস নামের এক মাজুসী লেখক তাঁর কিছু সঙ্গীকে নিয়ে আবুল হাযিলের সঙ্গে একত্ববাদ ও দ্বিত্ববাদ নিয়ে বিতর্ক করতে আসেন। আবুল হাযিল তাদের পরাস্ত করলে মিলাস মুসলমান হন। শিবলী নোমানী তাঁর তারিখে ইলমে কালাম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ,কয়েক হাজার ইরানী মাজুসী আবুল হাযিলের মাধ্যমে মুসলমান হয়। বিধর্মীরা তাঁর সঙ্গে বিতর্কে ভীত থাকত। কারণ তিনি বিতর্কে অত্যন্ত শক্তিশালী ছিলেন। সন্দেহবাদী বুদ্ধিজীবী সালেহ ইবনে আবদুল কুদ্দুসের সঙ্গে তাঁর বিতর্কের প্রসিদ্ধ কাহিনীটি ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরেস্ত গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। আবুল হাযিল একমাত্র যে ব্যক্তির সঙ্গে বিতর্কে ভয় পেতেন তিনি হলেন হিশাম ইবনে হাকাম যিনি ইমাম সাদিকের শিষ্য ও প্রসিদ্ধ শিয়া কালামশাস্ত্রবিদ ছিলেন।290

4. ইবরাহীম ইবনে সাইয়ার (নিযাম নামে প্রসিদ্ধ): ইবনে খাল্লেকান তাঁর গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে মুহাম্মদ ইবনে আবদুল করিম শাহরেস্তানীর জীবনী আলোচনায় এ ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে তাঁকে বালখের অধিবাসী বলেছেন । কালামশাস্ত্র ও দর্শনে তাঁর মত প্রসিদ্ধ। নিযাম হিশাম ইবনে হাকামের ছাত্র ছিলেন।

5. আমর ইবনে উবাইদ ইবনে বাব: তাঁর পিতা বসরার নিরাপত্তা রক্ষীবাহিনীতে কাজ করতেন। আমর ইবনে উবাইদ 80 হিজরীতে জন্মগ্রহণ ও 150 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

আমর ইবনে উবাইদ খারেজী291 চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত এবং উন্নত চিন্তার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি আব্বাসীয় খলীফা মনসুরের পূর্ব পরিচিত বন্ধু ছিলেন। মনসুর তাঁর খেলাফতের সময় একদিন তাঁকে ডেকে পাঠান। তিনি মনসুরের নিকট এলে মনসুর তাঁকে উপদেশ ও নসিহত করতে বলেন। তিনি মনসুরকে যে উপদেশ দেন তাতে বলেন , যে রাজত্ব তোমার হস্তগত হয়েছে তা যদি কারো জন্য স্থায়ী হতো তবে কখনই তা তোমার হাতে এসে পৌঁছত না। ঐ রাত্রিকে স্মরণ কর যার পর আর কোন রাত নেই। আমর এ কথা বলে চলে যেতে উদ্যত হলে মনসুর তাঁকে দশ হাজার দিরহাম দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ করেননি। মনসুর তাঁকে কসম দিয়ে তা গ্রহণের কথা বলেন। আমরও কসম করে তা গ্রহণ না করার কথা বলেন। সে মুহূর্তে মনসুরের পুত্র ও ঘোষিত উত্তরাধিকারী মাহ্দী অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বলেন , এর অর্থ কি ? আপনি খলীফার বিপরীতে কসম করছেন ? আমর মনসুরকে প্রশ্ন করেন , এই যুবক কে ? মনসুর বলেন , আমার পুত্র ও উত্তরাধিকারী। আমর তাঁকে বলেন , তাকে সৎ কর্মশীলদের মতো পোশাক পরিয়েছ ও উত্তম নাম (মাহ্দী) রেখেছ ,অথচ সে এ দু টির কোনটিরই উপযুক্ত নয়। তার জন্য এমন এক পদ নির্ধারণ করেছ যা তাকে দান করা অসচেতনতা ছাড়া কিছু নয়। অতঃপর আমর মাহ্দীর দিকে তাকিয়ে বলেন , হে ভ্রাতুষ্পুত্র! এতে কোন অসুবিধা নেই যে ,তোমার পিতা কোন বিষয়ে কসম করবে এবং তোমার চাচা তা ভঙ্গের জন্য কসম করবে। যদি আমি ও তোমার পিতার মধ্যে যে কোন একজন কসম ভঙ্গ করি তবে তার কাফ্ফারা দানের ক্ষমতা তোমার পিতার রয়েছে ;আমার নেই। মনসুর তাঁকে বলেন , কোন কিছু চাওয়ার থাকলে আমাকে বল। আমর বলেন , আমার একটিই চাওয়া। আর তা হলো আমাকে আর কখনও ডেকে পাঠিয়ো না। মনসুর বলেন , এর ফলে তুমি মৃত্যু পর্যন্ত আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। আমর বলেন , আমিও তাই চাই। এ কথা বলে তিনি দৃঢ় পদক্ষেপে দরবার হতে বেড়িয়ে গেলেন। মনসুর তাঁর যাওয়ার পথের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে স্বীয় পরাজয়ের গ্লানি নিয়ে ভাবতে লাগলেন। তিনি আপন মনে নিম্নোক্ত কবিতা পড়তে লাগলেন :

কিরূপ দেখলে তার ধীর গতির প্রস্থান

যে চায় সে-ই হয় শিকার

আমর ইবনে উবাইদ ছাড়া সে অন্য কেউ নয়। 29 2

আমর ইবনে উবাইদ হলেন সেই ব্যক্তি যাঁর পাঠ দানের সময় হিশাম ইবনে হাকাম একজন অপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে সেখানে প্রবেশ করেন এবং তাঁকে ইমামত সম্পর্কে প্রশ্ন করে পরাস্ত করেন। আমর ইবনে উবাইদ এ প্রশ্নকারীর প্রশ্ন করার দক্ষতায় বুঝতে পারেন তিনি হিশাম ইবনে হাকাম। ফলে তাঁর প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শন করেন (যদিও তিনি তাঁর চেয়ে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন)।293

উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ আহলে সুন্নাতের প্রথম ও দ্বিতীয় সারির প্রসিদ্ধ ইরানী কালামশাস্ত্রবিদ। পরবর্তী শতাব্দীসমূহে অসংখ্য ইরানী সুন্নী কালামশাস্ত্রবিদের উদ্ভব ঘটেছিল। আমরা এখানে শতাব্দীর পর্যায়ক্রমে তাঁদের উল্লেখযোগ্য কয়েক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করছি।

আবুল হুসাইন আহমাদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনে ইসহাক রাভান্দী কাশানী ,ইবনুল মুনজেম নাদিমুল মুয়াফ্ফাক ,সাসানী শাসক ইয়ায্দ গারদের বংশধারার আল মুকতাফি বিল্লাহ্ ,আবুল কাসেম কা বী বালখী ,আবু আলী জাবায়ী খুজিস্তানী ,তাঁর পুত্র আবু হাশেম জাবায়ী প্রমুখ তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর ,আবু মনসুর মাতুরিদী সামারকান্দী ,ইবনে ফুরাক ইসফাহানী নিশাবুরী ,আবু ইসহাক ইসফারাইনী প্রমুখ চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর ,আবু ইসহাক সিরাজী ,ইমামুল হারামাইন জুয়াইনী ,ইমাম মুহাম্মদ গাজ্জালী পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর এবং ফাখরুদ্দীন রাযী ,আবুল ফাযল ইবনুল আরাকী ও শাহরেস্তানী ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর সুন্নী ইরানী কালামশাস্ত্রবিদ।

দর্শন ও প্রজ্ঞা

প্রচলিত অর্থে দর্শন চর্চা মুসলিম বিশ্বে দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীতে মূলত গ্রীক বিভিন্ন গ্রন্থ (কোন কোন ক্ষেত্রে ভারতীয়) আরবীতে অনূদিত হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। অবশ্য দর্শন ,গণিতবিদ্যা ,চিকিৎসাশাস্ত্র ও অন্যান্য জ্ঞানের গ্রন্থসমূহের অনুবাদ কখন হতে শুরু হয় সে সম্পর্কে অনেক কথা রয়েছে। কারো কারো দাবি হলো ,এ কাজ সর্বপ্রথম প্রথম হিজরী শতাব্দীতে খালিদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়ার সময় শুরু হয়।

কথিত আছে খালিদ প্রথম ব্যক্তি যিনি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রীক ভাষায় পণ্ডিত কতিপয় ব্যক্তিকে এ কর্মে নিয়োগ করেন। তাঁরা রসায়নশাস্ত্র বিষয়ক কিছু গ্রীক ও মিশরীয় (কিবতী) গ্রন্থ আরবীতে অনুবাদ করেন।294

নিঃসন্দেহে আব্বাসীয় বংশের শাসনকালে দর্শনশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহ অনুবাদ শুরু হয়। এ সময়ে নৈতিকতা এবং সামাজিক রীতিসম্বলিত গ্রন্থসমূহ ছাড়াও বিভিন্ন জ্ঞান ও শিল্পের গ্রন্থসমূহ অনূদিত হয়।

ফার্সী ভাষা হতে দর্শনশাস্ত্রের কোন গ্রন্থ আরবীতে অনূদিত হয়নি। যে সকল ইরানী গ্রন্থ অনূদিত হয়েছে তন্মধ্যে সাহিত্য ,ইতিহাস ,জ্যোতির্বিদ্যা ও প্রকৃতিবিজ্ঞান উল্লেখযোগ্য। ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরস্ত গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে ফার্সী ভাষার যে সব গ্রন্থ আরবীতে অনূদিত হয়েছে সেগুলোর নাম উল্লেখ করেছেন। সেগুলোর কোনটিই দর্শন সম্পর্কিত ছিল না। দর্শন সম্পর্কিত একমাত্র যে গ্রন্থটি আরবীতে অনূদিত হয়েছিল তা ছিল গ্রীক দার্শনিক অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা যা পাহলভী ভাষায় পূর্বে অনূদিত হয়েছিল। গ্রন্থটি ইসলামী শাসনামলে আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফ্ফা অথবা তাঁর পুত্র মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফ্ফার মাধ্যমে পাহলভী ভাষা হতে আরবীতে অনূদিত হয়েছিল।

ইবনুন নাদিম তাঁর আল ফেহেরেস্ত গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ের সপ্তম প্রবন্ধে (দর্শন সম্পর্কিত প্রবন্ধে) বলেছেন ,

পূর্বে গ্রীস ও রোমে দর্শন চর্চার প্রচলন ছিল। রোম খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলে দর্শন চর্চা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ফলে কোন কোন দর্শন গ্রন্থ পুড়িয়ে দেয়া হয়। আবার কোনটি শিক্ষিত ব্যক্তিরা লুকিয়ে ফেলেন। এ সময় সর্বসাধারণের জন্য দর্শন চর্চাকে নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ তারা দর্শনকে খ্রিষ্টধর্মের (বিধানের) পরিপন্থী মনে করত। অতঃপর রোম সময়ের পরিক্রমায় খ্রিষ্টধর্মের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে দর্শনের দিকে পুনঃপ্রত্যাবর্তন করে। এটি ঘটে যখন আলেকজান্দ্রিয়ার বিশিষ্ট দার্শনিক ও অ্যারিস্টটলের গ্রন্থসমূহের ব্যাখ্যাকার ব্যক্তিত্ব সামিসথিউস রোমের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন।

ইবনুন নদিম অতঃপর ইরান সম্রাট শাপুর যুল আকতাফের সঙ্গে রোম সম্রাটের যুদ্ধের বিবরণ দিয়েছেন। এ যুদ্ধে শাপুর বন্দী হন। কিন্তু জেলখানা হতে পালিয়ে আসেন। পরবর্তীতে তিনি রোমীয়দের ইরান হতে বহিষ্কার করেন এবং তাঁর সমর্থনেই কনস্টান্টিনোপল রোমের সম্রাট হন। এ সময়েই রোম দ্বিতীয় বারের মতো খ্রিষ্টধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ে ও দর্শনের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। ইবনুন নাদিম আরো উল্লেখ করেছেন ,

ইরানীরা গ্রীক হতে যুক্তিবিদ্যা ও চিকিৎসাশাস্ত্র সম্পর্কিত কিছু সংখ্যক গ্রন্থ পূর্বেই পাহলভী ভাষায় অনুবাদ করেছিল যা আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফ্ফা ও অন্যরা আরবীতে অনুবাদ করেন।295

বাহ্যত ইরানে কোন দর্শন গ্রন্থই অনূদিত হয়নি। গ্রীক ও সুরিয়ানী ভাষার দর্শন গ্রন্থসমূহের কোন অনুবাদকও ইরানী ছিলেন না। কিন্তু ইসলামী সভ্যতায় ইরানীদের অবদানের একটি অংশ হিসেবে অনুবাদশাস্ত্রে তাঁদের ভূমিকা এখানে তুলে ধরছি। আমরা ইবনুন নাদিমের আল ফেহেরেস্ত অবলম্বনে ফার্সী হতে আরবীতে অনুবাদকারী ইরানী ব্যক্তিবর্গের নাম এখানে উল্লেখ করছি। (অবশ্য ফার্সী হতে আরবীতে অনুবাদক সকলেই ইরানী ছিলেন না)।

আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফ্ফা অ্যারিস্টটলের গ্রীক যুক্তিবিদ্যা ,ফার্সী গ্রন্থ খোদায়ীনামে যা ফেরদৌসীর শাহনামা গ্রন্থের মূল উৎস এবং সম্রাট আনুশিরওয়ানের সময় ফার্সীতে অনূদিত ভারতীয় গ্রন্থ কালিলা ওয়া দিমনা উচ্চমানের আরবীতে অনুবাদ করেন। অন্যতম বিশিষ্ট অনুবাদক হলেন খলীফা হারুনুর রশিদ ও মামুনের দরবারের পণ্ডিত ব্যক্তি বাইতুল হিকমা র প্রধান আবু সাহল ফাযল ইবনে নওবাখত। এ ছাড়া হাসান ইবনে মূসা নওবাখতী ,প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক ফুতুহুল বুলদান গ্রন্থের লেখক আহমাদ ইবনে ইয়াহিয়া বালাজুরী ,মূসা ইবনে খালিদ ,ইউসুফ ইবনে খালিদ ,আলী ইবনে যিয়াদ তামিমী ,হাসান ইবনে সাহল ,আহমাদ ইবনে ইয়াহিয়া জাবের ,হিশাম ইবনে আবদুল মালেকের দলিল লেখক জাবাল্লাহ্ ইবনে সালেম ,ইসহাক ইবনে ইয়াযীদ ,মুহাম্মদ ইবনে জাহাম বারমাকী ,হিশাম ইবনুল কাসেম ,মূসা ইবনে ঈসা আল কুর্দী ,যদাভী ইবনে শাহভীয়ে ইসফাহানী ,মুহাম্মদ ইবনে বাহরাম ইবনে মিতইয়ার ইসফাহানী ,বাহরাম ইবনে মারদানশাহ্ ,আমর ইবনুল ফারখান , বায়তুল হিকমা র দায়িত্বশীল সালেম ,হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের রাজকীয় দলিল লেখক সালেহ ইবনে আবদুর রহমান এবং আবদুল্লাহ্ ইবনে আলীর নাম উল্লেখযোগ্য।

এখন আমরা মুসলিম দার্শনিকদের পর্যায়ক্রমিক (শুরু হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত) বিবরণ প্রদান করব। পূর্বে ফিকাহ্শাস্ত্র ও অন্যান্য বিষয়ে এরূপ বিন্যাসের কাজ সম্পন্ন হলেও এ শাস্ত্রে তা হয়নি বিধায় এ পর্বটির মধ্যে নতুনত্ব রয়েছে ।

যদিও এ কাজ সহজ নয় ,কিন্তু যেহেতু ইসলামী সভ্যতায় দর্শনের ইতিহাস নিয়ে আমি পূর্বে কাজ করেছি সেহেতু এ বিষয়ের প্রতি আমার বিশেষ আগ্রহ রয়েছে। ইসলামী দর্শনের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করতে হলে অবশ্যই বিভিন্ন যুগের দার্শনিকদের পরিচিতি জানা প্রয়োজন। আমরা এখানে শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্কের ভিত্তিতে দার্শনিকদের পর্যায়ক্রমে উল্লেখ করব।

ইসলামী দর্শনের ইতিহাসে দার্শনিকদের পর্যায়ক্রমিক এ বিন্যাসে আমরা সে সব দার্শনিকের নামই উল্লেখ করব যাঁরা ইসলামী পরিবেশে কার্যক্রম চালিয়েছেন। এদের অনেকেই হয়তো মুসলমান নন ;বরং ইহুদী বা খ্রিষ্টান কিংবা মুসলমান হলেও তাঁদের ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বা কারো কারো মতে তাঁরা নাস্তিক ছিলেন। আমরা এদের নাম উল্লেখের পর (প্রথম যুগ হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত) সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা করব।