ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 45954
ডাউনলোড: 1963

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 45954 / ডাউনলোড: 1963
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

মিল্লাত’ ( জাতি) শব্দের অর্থ

মিল্লাত (ملّة ) একটি আরবী শব্দ যার অর্থ পথ ও পদ্ধতি। পবিত্র কোরআনেও শব্দটি এ অর্থে এসেছে।4 এ শব্দটি কোরআনের 15টি আয়াতে 15 বার এসেছে। কিন্তু পবিত্র কোরআনে শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বর্তমানে ফার্সী পরিভাষায় তা ভিন্ন অর্থে প্রচলিত হয়েছে।

কোরআনের পরিভাষায় মিল্লাত অর্থ ঐশী বার্তাবাহক নবীদের পক্ষ হতে যে পথ মানুষের জন্য উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:ملّة أبيكم إبراهيم তোমাদের পিতা ইবরাহীমের পথ 5 অথবাملّة إبراهيم حنيفا ইবরাহীমের পথ যা সত্য ও বিশুদ্ধ6

রাগিব ইসফাহানী তাঁর মুফরাদাতুল কোরআন গ্রন্থে বলেছেন , মিল্লাত ও ইসলাম একই মূল হতে এসেছে যার অর্থ লিখিয়ে দেয়া । যেমন বলা হয়েছে:فليملل وليّه بالعدل তখন তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখিয়ে দেবেন। 7 তিনি বলেছেন ,আল্লাহর পথকে মিল্লাত বলা হয়েছে এ জন্য যে ,এ পথ আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশিত হয়েছে।

সুতরাং কোরআনের দৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে যে চিন্তা ,জ্ঞান ও জীবন পদ্ধতি অনুসারে মানুষকে চলতে হবে তাকেই মিল্লাত বলা হয়। সুতরাং মিল্লাত দীন সমার্থক ,তবে পার্থক্য এটুকু ,একই বস্তুকে এক দৃষ্টিতে মিল্লাত এবং অন্য দৃষ্টিতে দীন বলে অভিহিত করা হয়। এ দৃষ্টিতে মিল্লাত বলা হয় যে ,তা আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর নবীর প্রতি নির্দেশিত হয়েছে-যা মানুষের নিকট তিনি পৌঁছে দেবেন এবং তার ওপর ভিত্তি করেই নেতৃত্ব দান করবেন।

ধর্মীয় পরিভাষাবিদরা বলেন দীন মিল্লাত শব্দের মধ্যে একটি পার্থক্য হলো দীন শব্দটিকে আল্লাহর সঙ্গে যেমন সংযুক্ত করা যায় ,উদাহরণস্বরূপ বলা যায়دين الله আল্লাহর দীন তেমনি দীনের অনুসারীদের নামের সঙ্গেও সংযুক্ত করা যায় ,যেমনدين زيد أو دين عمرو যায়েদ বা আমরের দীন। কিন্তু মিল্লাত শব্দটি আল্লাহ্ বা অনুসারীদের নামের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায় না। তাই আল্লাহর মিল্লাত বা যায়েদের মিল্লাত বলা ভুল হবে ;বরং মিল্লাত শব্দটি কেবল আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর পথে নেতৃত্ব দানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামের সঙ্গেই সংযুক্ত হয় ,যেমন বলা হয়েছে মিল্লাতে ইবরাহীম বা মিল্লাতে মুহাম্মদ (সা.)। যেন মিল্লাত শব্দের সঙ্গে নেতৃত্ব শব্দটিও জড়িয়ে রয়েছে।

এ দৃষ্টিকোণ হতে মিল্লাত শব্দটিকেمكتب (মাকতাব) বা মতবাদের নিকটবর্তী বলা যায়। কেননা সাধারণত মতবাদ কোন প্রবক্তা বা নেতার নামের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে থাকে। যদি মিল্লাত শব্দের সঙ্গে মাকতাব শব্দের নির্দেশিত হওয়ার সাদৃশ্যের বিষয়টি লক্ষ্য রাখি তাহলে বিষয়টি আমাদের জন্য অধিকতর স্পষ্ট হবে।

বর্তমানে ফার্সী পরিভাষায় মিল্লাত

বর্তমানে ফার্সী পরিভাষায় মিল্লাত শব্দটি তার মূল অর্থ হতে ভিন্ন অর্থে প্রচলিত হয়েছে। বর্তমানে মিল্লাত শব্দটি একটি একক সমাজের প্রতি আরোপিত হয় যা অভিন্ন ইতিহাস ,আইন ,রাষ্ট্রব্যবস্থা ,মূল্যবোধ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার ধারক। আমরা এখন জার্মান ,বৃটেন বা ফ্রান্সের সকল অধিবাসীকে জার্মানী ,ব্রিটিশ বা ফরাসী জাতি না বলে তাদের দু ভাগে ভাগ করি। একদিকে শাসক অন্য দিকে সাধারণ নাগরিক। আমরা শাসকবর্গকে সরকার এবং সাধারণ নাগরিকদের মিল্লাত বা জাতি হিসেবে অভিহিত করি। এ ফার্সী পরিভাষাটি একটি নতুন ও উদ্ভাবিত পরিভাষা এবং প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভুল পরিভাষা। কারণ শত বা সহস্র বছর পূর্বে শব্দটি ফার্সী ভাষায় এরূপ ভুল অর্থে ব্যবহৃত হতো না। আমার মনে হয় ইরানের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনের পরবর্তীতে শব্দটির এ অর্থে ব্যবহার শুরু হয়। সম্ভবত এ ভুলের সৃষ্টি এভাবে হয়েছে ,শব্দটি অন্য শব্দের সঙ্গে সংযুক্ত হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং পরে সংযুক্ত শব্দটি বাদ পড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইবরাইীমের পথের (মিল্লাতের) অনুসারী ,ঈসার পথের অনুসারী ,মুহাম্মদ (সা.)-এর পথের অনুসারী ইত্যাদি। পরে অনুসারী শব্দটি বাদ পড়ে যায় এবং বলা শুরু হয় ইবরাহীমের মিল্লাত ,ঈসার মিল্লাত ,মুহাম্মদের মিল্লাত ইত্যাদি। আরো পরে মিল্লাত শব্দটি বিভিন্ন জাতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নতুন পরিভাষায় পরিণত হয় ,যেমন মিল্লাতে ইরান ,মিল্লাতে তুর্ক ,মিল্লাতে আরব ,মিল্লাতে ইংরেজ ইত্যাদি।

আরবরা জাতি অর্থে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে থাকে। তারা কাওম (قوم ) বা শাআব (شعب ) জাতি বুঝানোর জন্য ব্যবহার করে। যেমন বলেالشّعب العربي বাالشّعب الإيراني বাالشّعب المصري ইত্যাদি।

আমরা আমাদের এ আলোচনায় মিল্লাত মিল্লিয়াত জাতি ও জাতীয়তা অর্থেই ব্যবহার করছি প্রচলিত ফার্সী পরিভাষা হিসেবে ,তা সঠিক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে কি হচ্ছে না তার পর্যালোচনায় না গিয়েই।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ হতে জাতীয়তা

এখন আমরা পারিভাষিক আলোচনার পর্ব শেষ করে সামাজিক আলোচনায় প্রবেশ করছি। সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্র একক হলো পরিবার। স্বামী-স্ত্রী ,সন্তান-সন্ততি ,কখনও কখনও সন্তানদের স্বামী ,স্ত্রী ও সন্তানদেরসহ যে যৌথ জীবন গড়ে ওঠে তাকে পারিবারিক জীবন বলা হয়। পারিবারিক জীবনের ঐতিহ্য অত্যন্ত পুরাতন। যখন হতে মানুষ সৃষ্ট হয়েছে তখন হতেই পারিবারিক জীবন চলে এসেছে। অনেকের ধারণা ,মানুষের পূর্বপুরুষ অন্য কোন প্রাণী ছিল। বলা হয়ে থাকে সে পর্যায়েও মোটামুটিভাবে পারিবারিক জীবন ছিল।

পরিবার হতে বৃহত্তর সমাজিক একক হলো গোত্র বা বংশ। গোত্রীয় জীবন হলো যে সকল পরিবারের পিতৃপুরুষ এক ব্যক্তি। গোত্রীয় জীবন ক্ষুদ্র পারিবারিক জীবনের পূর্ণাঙ্গতর রূপ।

বলা হয়ে থাকে মানবের পারিবারিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পদ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে সামষ্টিক মালিকানা ছিল ,পরবর্তীতে তা ব্যক্তি মালিকানায় পর্যবসিত হয়।

গোত্র অপেক্ষা বৃহত্তর যে সামাজিক একক পূর্ণতররূপে আবির্ভূত হয় এবং এক জনসমষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করে-যাদের ওপর একই আইন ও একক সরকারের নেতৃত্ব কার্যকর তাকে ফার্সী ভাষাভাষীরা মিল্লাত বা জাতি বলে থাকে। একটি জাতি একটি মূল ,রক্ত ,বংশ ও গোত্র হতে যেমন উৎপত্তি লাভ করতে পারে তেমনি এরূপ ঐক্য নাও থাকতে পারে এবং এমনও হতে পারে যে ,তাদের মাঝে ঐতিহ্যগতভাবে গোত্রীয় জীবনই হয়তো ছিল না বা থাকলেও সীমিত পর্যায়ে কোন গোষ্ঠীতেই ছিল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূলনীতি 8 নামক গ্রন্থের 1ম খণ্ডের 327 পৃষ্ঠায় এসেছে :

বিংশ শতাব্দীতে জাতি জনতা র মধ্যে যে পার্থক্য করা হয় তাতে বোঝা যায় অধিকংশ ক্ষেত্রে সামাজিক কোন দলকে বুঝাতে জনতা বলা হয়ে থাকে ;কিন্তু জাতি বলতে কোন ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রে বসবাসরত জনসমষ্টি যারা একই রাজনৈতিক ও আইনগত বিধানের আওতায় রয়েছে তাদের বুঝায়। একই ভূখণ্ডে অবস্থানের কারণ বিভিন্ন হতে পারে। ঐতিহাসিক ,ভাষাগত ,ধর্মীয় ,অর্থনৈতিক ,সামাজিক মূল্যবোধ বা সামষ্টিক জীবনের অভিন্ন লক্ষ্যের কারণে এটি হতে পারে। জনতা শব্দটি সাধারণত সমাজবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয় এবং জাতি শব্দটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয়ে ব্যবহৃত হয়। তবে এ শব্দটি মার্কসবাদে এবং উদারনীতিবাদে9 ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তাই এ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বক্তা ও লেখক কোন্ মতাদর্শে বিশ্বাসী তা লক্ষ্য রাখতে হবে।

বর্তমান পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির অস্তিত্ব রয়েছে। যে বিষয়টি তাদের এক জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করেছে তা হলো সামষ্টিক জীবন এবং অভিন্ন আইন ও সরকার। যেহেতু একক সরকার তাদের ওপর শাসন ক্ষমতার অধিকারী সেহেতু এর ওপর ভিত্তি করেই তারা এক জাতি ;এক রক্ত ,বর্ণ ও ভাষার কারণে নয়। এ সকল জাতির অনেকেরই দীর্ঘ ঐতিহাসিক কোন নজীরও নেই ;বরং সামাজিক কোন ঘটনা প্রবাহের ফলে সৃষ্ট হয়েছে ,যেমন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্রই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানী খেলাফতের পতনের কারণে সৃষ্ট হয়েছে।

বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই যারা এক রক্ত ও বর্ণ হতে সৃষ্ট এবং অন্য জাতি হতে স্বতন্ত্র। উদাহরণস্বরূপ আমরা ইরানীরা দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী এবং শাসন ব্যবস্থা ও আইনের দৃষ্টিতে আমাদের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে ,কিন্তু নৃতাত্ত্বিকভাবে কি আমরা প্রতিবেশী জাতিসমূহ হতে স্বতন্ত্র ? আমরা আর্য বংশোদ্ভূত এবং আরবরা সেমিটিক বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে এখনও কি পৃথক যখন শত সহস্র মিশ্রণের ফলে ঐ নৃতাত্ত্বিক ভিত্তির কোন প্রভাবই এখন অবশিষ্ট নেই ?

বাস্তব হলো রক্ত ও বর্ণ পৃথক হওয়ার দাবিটি একটি অলীক দাবি। নৃতাত্ত্বিকভাবে কেউ আর্য সেমিটিক বা অন্য কিছু হওয়ার বিষয়টি পূর্বে ছিল ,কিন্তু পরবর্তীতে এত বেশি মিশ্রণ ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ,ঐ সকল বর্ণের স্বাধীন কোন অস্তিত্ব এখন আর নেই।

বর্তমান সময়ে ইরানী ও ফার্সী ভাষী অনেক ব্যক্তিই যাঁরা ইরানী জাতীয়তাবাদের কথা বলেন হয়তো তুর্কী ,মোগল বা আরব বংশোদ্ভূত তেমনি আরবদের মধ্যেও আরব জাতীয়তাবাদের পক্ষাবলম্বনকারী অনেক ব্যক্তি হয়তো ইরানী ,তুর্কী বা মোগল বংশোদ্ভূত। আপনি যদি এখন মক্কা ও মদীনায় ভ্রমণ করেন তাহলে লক্ষ্য করবেন সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী হয় ভারতীয় ,ইরানী ,বালখী ,বুখারী বা অন্য কোন অঞ্চলের আদি অধিবাসী। হয়তো কুরুশ বা দারভীশ বংশের (ইরানের দুই প্রসিদ্ধ বংশ) কোন ব্যক্তি আরব ভাষার কোন দেশে বাস করে এবং আরব জাতীয়তার প্রতি গোঁড়ামি পোষণ করে। বিপরীত দিকে হয়তো আবু সুফিয়ানের অনেক বংশধর বর্তমানে ইরানী জাতীয়তাবাদের গোঁড়ামি পোষণ করে। কয়েক বছর পূর্বে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন যে ,ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া একজন ইরানী বংশোদ্ভূত। যদি তা-ই হয় তবে তার বংশধররা তো এখানে থাকতেই পারে।

সুতরাং বর্তমানে জাতি বলতে যা বুঝায় তাতে আমরা এমন এক জনসমষ্টি যারা এক ভূখণ্ডে ,এক পতাকার নীচে ,অভিন্ন সংবিধান ও সরকারের অধীনে বসবাস করছি। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষ ইরানী ,গ্রীক ,আরব না মোগল ছিল তা আমরা জানি না।

যদি আমরা ইরানীরা জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে কাউকে আর্য কিনা বিচার করতে যাই তবে এ জাতির অধিকাংশ লোককে অ-ইরানী বলতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের আর গর্ব থাকবে না অর্থাৎ এ কর্মের মাধ্যমে আমরা ইরানী জাতীয়তাবাদের ওপর সর্বোচ্চ আঘাতটি হানব। বর্তমানে ইরানে অনেক গোত্র ও সম্প্রদায় রয়েছে যাদের ভাষা ফার্সী নয় এবং তারা আর্য বংশোদ্ভূতও নয়। তাই বর্তমান সময়ে জাতি ,রক্ত ও বর্ণের স্বাতন্ত্র্যের দাবি নিছক বুলি ছাড়া কিছুই নয়।

জাতীয়তার গোঁড়ামি

সমাজের যে কোন একক তা পরিবার ,গোত্র ,সম্প্রদায় বা জাতি যা-ই হোক না কেন ,তার সঙ্গে এক প্রকার আবেগ ও গোঁড়ামি জড়িয়ে রয়েছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে নিজ পরিবার ,গোত্র ও জাতির প্রতি এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। পক্ষপাতিত্বের এ অনুভূতি কখনও কখনও কোন বৃহত্তর এককেও (বৃহত্তর অঞ্চল নিয়েও) দেখা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ এশিয়ানদের মোকাবিলায় ইউরোপীয়রা এক ধরনের পক্ষপাতিত্বমূলক আবেগ প্রদর্শন করতে পারে যেমনিভাবে পারে এশিয়ানরাও। একই বর্ণের ও জাতির মানুষরাও পরস্পরের প্রতি এরূপ পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারে।

জাতীয়তার বিষয়টিও স্বার্থপরতা ও পক্ষপাতিত্বের অন্তর্ভুক্ত তবে তা ব্যক্তি ও গোত্রের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় গণ্ডিতে প্রবেশ করেছে।

জাতীয়তার মধ্যে স্বার্থপরতার সাথে স্বাভাবিকভাবেই পক্ষপাতিত্ব ,গোঁড়ামি ,জাতীয় মানদণ্ডে স্বজাতির ত্রুটির প্রতি নির্লিপ্ততা ,স্বজাতির ভাল দিকগুলোকে বড় করে দেখা ,অহংকার ও গর্বের মত বিষয়গুলো চলে আসে।

জাতীয়তাবাদ

স্বজাতির প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাকে ইংরেজি ভাষায় ন্যাশনালিজম বলে অভিহিত করা হয় যা ফার্সী ভাষার পণ্ডিতরা মিল্লাত পারাস্তি অনুবাদ করেছেন।

জাতীয়তবাদ জাতীয় আবেগ ও অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ;কোন যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে নয় যা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। জাতীয়তাবাদকে সম্পূর্ণরূপে নিন্দা করা যায় না যদি তার মধ্যে শুধু ইতিবাচক দিকগুলোই থাকে। যেমন পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা ,স্বজাতির লোকদের অধিকতর কল্যাণ সাধন প্রভৃতি দিকগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক এবং যুক্তিহীন নয় এবং ইসলামের দৃষ্টিতেও নিন্দনীয় নয় ;বরং ইসলাম প্রতিবেশী ,আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের প্রতি অধিকতর অধিকার ও দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

জাতীয়তাবাদ তখনই নিন্দনীয় যখন তা নেতিবাচকতা লাভ করে অর্থাৎ যখন বিভিন্ন জাতির ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে পরস্পরকে পরস্পরের প্রতি শত্রু করে তোলে এবং অন্যের ন্যায্য অধিকারের প্রতি ভ্রূকুটি প্রদর্শন করে।

জাতীয়তাবাদের বিপরীত হলো আন্তর্জাতিকতাবাদ যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে জাতীয়তাবাদকে সমালোচনা করে। ইসলাম জাতীয়তাবাদী অনুভূতির সকল দিককেই নিন্দা করে না ;বরং শুধু নেতিবাচক দিকগুলোকে নিন্দা করে ,ইতিবাচক দিকগুলোকে নয়।

জাতীয়তার মানদণ্ড

বাহ্যিকভাবে মনে হয় জাতীয়তাবাদী চেতনা হলো একটি ভূখণ্ডের মানুষের সৃষ্টি ও চিন্তার ফল যা ঐ ভূখণ্ডের সম্পদ এবং যা কিছু জনসাধারণের দৃষ্টিতে জাতীয় বলে পরিগণিত তা গ্রহণ ,সে সাথে ঐ ভূখণ্ডের বাহির্ভূত সকল কিছুই বিদেশী ও বিজাতীয় বলে পরিত্যাগ। এ মানদণ্ডই জাতীয়তা যাচাইয়ের ভিত্তি বলে অনেকে মনে করেন।

কিন্তু এ মানদণ্ড সঠিক নয়। কারণ অসংখ্য লোক নিয়ে জাতি গঠিত হয়। তন্মধ্যে কোন ব্যক্তি সৃজনশীল কিছু করলেই অন্যরা তা গ্রহণ করবে তা সম্ভব নয় ;বরং সাধারণের পছন্দ ভিন্ন কিছু হতে পারে। তাই এমন বিষয় জাতীয় বলে পরিগণিত হতে পারে না।

উদাহরণস্বরূপ কোন জাতি হয়তো কোন বিশেষ সামাজিক ব্যবস্থাকে নিজেদের জন্য মনোনীত করেছে ,কিন্তু ঐ জাতিরই কোন ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গ নতুন কোন ব্যবস্থার প্রস্তাব করতে পারে যা তারা প্রত্যাখ্যানও করতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রত্যাখ্যাত এ ব্যবস্থাকে ঐ জাতির এক ব্যক্তির উদ্ভাবিত চিন্তার ও সৃজনশীলতার প্রমাণ হওয়ায় তাকে জাতীয় বলে অভিহিত করা যায় না ,অথচ ঐ রাষ্ট্রের বহির্সীমার কোন ব্যক্তি কোন সামাজিক ব্যবস্থা উদ্ভাবন করার পর যদি ঐ জাতি তা সন্তুষ্ট চিত্তে গ্রহণ করে তবে এ ব্যবস্থাকে অন্য দেশ হতে এসেছে এ অজুহাতে বিজাতীয় বলে অভিহিত করা যায় না কিংবা যে ব্যক্তি এ ব্যবস্থার অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছে তাকেও জাতীয় মৌলনীতি পরিপন্থী কাজ করেছে বলে অভিযুক্ত করা যায় না। এ কর্মের ফলে ঐ জাতি অন্য জাতির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায় না বা তারা তাদের পথ ও জাতিসত্তাকে পরিবর্তন করেছে বলা যায় না।

অবশ্য কখনও কখনও এমন কিছু বিষয় রয়েছে যা বাইরে থেকে এলে সেটি বিজাতীয় এবং জাতীয় নীতির পরিপন্থী বলে পরিগণিত হবে। এরূপ বিষয়ের গ্রহণও তাই জাতিসত্তা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা বলে ধরা হবে । যেমন এমন কোন বিষয় যা এক জাতির বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও রং ধারণ করেছে এবং তাদের জাতীয় প্রতীক ও স্লোগান বলে গণ্য হয় ,যদি অন্য কোন জাতি সে রং ও স্লোগান ধারণ করে তবে জাতিসত্তার নীতি বহির্ভূত কাজ হবে। তাই জার্মানীর নাজী বা যায়নবাদী ইহুদীদের যে বিশেষ প্রতীক ও রং রয়েছে তা যদি অন্য কোন জাতি গ্রহণ করে তবে তারা স্বজাতির বিরুদ্ধে জাতীয়তা বিরোধী কাজ করেছে বলে গণ্য হবে। কিন্তু যদি ঐ রংয়ের কোন বিশেষত্ব না থাকে ও কোন বিশেষ জাতির প্রতীক না হয় ;বরং সকল জাতির জন্য সাধারণ হয়ে থাকে অর্থাৎ এর স্লোগানগুলো যদি সর্বজনীন ও মানবিক হয় তবে যে কেউ তা গ্রহণ করুক না কেন তা বিজাতীয় ও জাতিসত্তা পরিপন্থী বলে বিবেচিত হবে না। ধর্মীয় ছাত্রদের ভাষায়

لا بشرط يجتمع مع ألف شرط শর্তহীন বিষয় সহস্র শর্তের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে অর্থাৎ রংহীন প্রকৃতির বস্তু যে কোন রংই গ্রহণে সক্ষম। কিন্তু রঙ্গীন বস্তু অন্য কোন রূপের সঙ্গে মিলে না।

এ কারণেই জ্ঞানগত বিষয়সমূহ সমগ্র বিশ্বের সম্পদ বলে পরিগণিত। পীথাগোরাসের চার্ট বা আইনস্টাইনের সূত্র কোন জাতির সম্পদ নয় এবং কোন জাতিসত্তার সঙ্গেই এর বৈপরীত্য নেই। কারণ এটি একটি রংহীন বাস্তবতা যা বিশেষ কোন জাতি বা সম্প্রদায়ের নিজস্ব নয়। এজন্যই নবী ,দার্শনিক ও বিজ্ঞানীরাও সকল জাতির সম্পদ এবং তাঁদের চিন্তা ও বিশ্বাস কোন বিশেষ জাতির জন্য নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ নয়।

সূর্য বিশেষ কোন জাতির জন্য নয় বলে কোন জাতিই সূর্যকে বিজাতীয় ভাবে না। সূর্য সমগ্র বিশ্বের জন্য ,কোন বিশেষ ভূমির জন্য নির্দিষ্ট নয়। যদি কোন স্থান সূর্যতাপ স্বল্প পরিমাণে পেয়ে থাকে তবে সেটি তার অবস্থানের কারণে ,সূর্যের কারণে নয়। সূর্য নিজেকে কোন বিশেষ ভূমিতে সীমাবদ্ধ রাখেনি।

সুতরাং আমাদের নিকট পরিষ্কার হলো যে ,কোন বিষয় এক জাতি হতে উদ্ভূত হলেই তা তাদের নিজস্ব হয়ে যায় না যেমনি তার সীমাবহির্ভূত অঞ্চল হতে কিছু প্রবেশ করলেই বিজাতীয় বলা যায় না। অর্থাৎ জাতীয় ও বিজাতীয় হওয়ার মানদণ্ড এটি নয়। অভিন্ন দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী হওয়াও জাতীয়তার মানদণ্ড নয়। যেমন আমাদের ইরানে অন্যান্য অনেক দেশের মতই আড়াই হাজার বছর ধরে স্বৈরতান্ত্রিক সরকার কার্যকর ছিল যা অর্ধ শতাব্দী কালের কিছু বেশি সময় হলো সাংবিধানিক সরকারে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এ সাংবিধানিক বা শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা আমরা নিজেরা উদ্ভাবন করি নি ;বরং অন্যরা তা উদ্ভাবন করেছে ও আমরা তা গ্রহণ করেছি ও এটি অর্জনের জন্য অনেক আত্মবিসর্জনও দিয়েছি। অবশ্য এ জাতিরই অনেক ব্যক্তি স্বৈরতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য আশ্চর্যজনক প্রতিরোধ করেছে ,অস্ত্রধারণ করেছে ,নিজের রক্ত ঝরিয়েছে যদিও তারা ছিল সংখ্যালঘু। অপরদিকে ইরান জাতির অধিকাংশ মানুষ শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে মেনে নিয়ে তা প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করেছে। অবশেষে সংখ্যালঘু বিরোধীরা সংখ্যাগুরুর নিকট আত্মসমর্পণ করেছে। এখন কি আমরা শাসনন্ত্রিক ব্যবস্থাকে জাতীয় সরকার বলে মেনে নেব না ? নাকি ঐতিহাসিকভাবে আমাদের জাতীয় ও সামাজিক নেতৃত্ব স্বৈরতান্ত্রিক ছিল বিধায় এবং শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থার উদ্ভাবক যেহেতু আমরা নই ;বরং অন্য জাতির নিকট হতে গ্রহণ করেছি এ অজুহাতে দাবি তুলব আমাদের জাতীয় সরকার হলো স্বৈরতান্ত্রিক (তাই উচিত হলো একে গ্রহণ করা) এবং শাসনতান্ত্রিক সরকার বিজাতীয় সরকার (তাই উচিত তা বর্জন করা)।

বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণাপত্র আমরা প্রস্তুত করিনি বা এটি প্রস্তুতেও আমরা ভূমিকা রাখিনি এবং এই ঘোষণাপত্রে যা এসেছে আমাদের জাতীয় ইতিহাসে তা উল্লিখিত হয় নি ,কিন্তু অন্যান্য জাতির মতই আমরা এ ঘোষণাপত্রকে মোটামুটিভাবে গ্রহণ করেছি। এখন ইরানী জাতীয়তার ধারণায় এ ঘোষণাপত্রকে কি বলে উল্লেখ করব ? যে সকল রাষ্ট্র এ ঘোষণাপত্র প্রস্তুতে অংশ নেয় নি ,যেহেতু ঘোষণাপত্রটি তাদের রাষ্ট্রসীমার বহির্ভূত সে ক্ষেত্রে এ বিষয়ে তাদের বক্তব্যই বা কি হবে ? তাদের জাতীয় চেতনা কি এ ঘোষণাপত্র তাদের দীর্ঘ ইতিহাসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ও তাদের ভূখণ্ডের বাইরে থেকে আগমনের অজুহাতে এর বিরুদ্ধে সংগ্রামে লিপ্ত হতে বলে ? তারা কি একে বিজাতীয় মনে করে ? নাকি যেহেতু এ ঘোষণাপত্র কোন বিশেষ জাতির বৈশিষ্ট্য নেয় নি এবং জাতি একে গ্রহণ করেছে এ দু যুক্তিতে আমরাও একে জাতীয় ও নিজস্ব বলে মনে করব ?

এর বিপরীতে সম্ভাবনা রয়েছে এমন কিছু প্রচলিত মত ও পথ থাকতে পারে যা কোন জাতি হতে উদ্ভূত ,কিন্তু ঐ জাতির জাতীয় বিষয় বলে পরিগণিত হয় না। যেহেতু বিষয়টিতে অন্য জাতির রং রয়েছে অথবা নিজ ভূখণ্ড হতে উৎসারিত হওয়া সত্ত্বেও জাতি তা গ্রহণ করে নি সেহেতু তা জাতীয় বলে গৃহীত হয় নি। উদাহরণস্বরূপ মনী ও মাজদাকী ধর্ম বিশ্বাস ইরানী জাতির মধ্যে আবির্ভূত হলেও জাতির পক্ষ হতে পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে নি। তাই এ দু ধর্মমতের কোনটিকেই ইরানের জাতীয় বিষয় বলা যায় না।

যদি এরূপ উদ্ভাবক ও তাদের গুটি কয়েক অনুসারীদের কর্মকে জাতীয় বলে অভিহিত করি তবে অধিকাংশ মানুষের অনুভূতি ও আবেগকে উপেক্ষা করা হবে।

উপরোক্ত আলোচনা থেকে বোঝা গেল জাতীয় অনুভূতি ও আবেগের চেতনার দৃষ্টিতে যা কিছুই ঐ দেশে উদ্ভাবিত হয় তা-ই জাতীয় হতে পারে না। আবার যা কিছুই দেশের সীমার বাইরে থেকে আসে বিজাতীয় বলে পরিগণিত হয় না ;বরং মানদণ্ড হলো প্রথমে জানতে হবে ঐ বিষয়টি কোন জাতির বিশেষ রং ধারণ করেছে কি ? নাকি তা রংহীন সর্বব্যাপী ও বিশ্বজনীন ? দ্বিতীয়ত ঐ জাতি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে তা গ্রহণ করেছে নাকি চাপে বাধ্য হয়ে ?

যদি দু টি শর্তই পূরণ হয় তবে ঐ বিষয়টি নিজস্ব ও জাতীয় বলে গণ্য হবে আর যদি এ দু শর্ত সমন্বিত না হয় অর্থাৎ যে কোন একটি উপস্থিত থাকে অথবা কোনটিই উপস্থিত না থাকে তবে তা বিজাতীয় বলে গণ্য হবে। যা হোক কোন বিষয় কোন জাতির মধ্যে উদ্ভাবিত হলেই তা যেমন স্বীয় সম্পদ হতে পারে না। আবার একই কারণে তা বিজাতীয়ও হতে পারে না।

এখন আমরা এ আলোচনায় প্রবেশ করব ,ইসলাম কি ইরানে এ দু শর্ত পূরণ করেছে ? অর্থাৎ প্রথমত ইসলাম কি বিশেষ জাতির রং (বৈশিষ্ট্য) ধারণ করেছে যেমন আরব জাতীয়তার রং নাকি এমন এক দীন যা সাধারণ ও বিশ্বজনীন হওয়ার কারণে রংহীন ? দ্বিতীয়ত ইরান জাতি কি স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে নাকি বাধ্য হয়ে ?

জাতি জাতীয়তা নিয়ে যে আলোচনা রেখেছি তা ধর্মীয় ছাত্রদের ভাষায় আলোচনার বৃহত্তর প্রতিজ্ঞা এবং বর্তমান বিষয়টি আলোচনার ক্ষুদ্রতর প্রতিজ্ঞা।

ইসলামী আন্তর্জাতিকতাবাদ

এ বিষয় সুনিশ্চিত ,ইসলাম ধর্মে বর্তমানে প্রচলিত জাতীয়তার কোন মূল্য নেই ;বরং ইসলাম সকল জাতি ,গোত্র ও বর্ণকে সমদৃষ্টিতে দেখে। আবির্ভাবের প্রথমেও এ ধর্মের দাওয়াত বিশেষ জাতির প্রতি ছিল না। তাই প্রথম থেকেই এ ধর্ম প্রচেষ্টা চালিয়েছে বিভিন্ন উপায়ে গোত্রীয় ও জাতীয় গর্ব ও অহংকারের ভিত্তিকে উপড়ে ফেলার।

এখানে দু টি অংশে আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। প্রথমাংশে ইসলামের ঊষালগ্ন হতেই যে ইসলাম বিশ্বজনীন দাওয়াত পেশ করেছে সে বিষয়ে আলোচনা করা হবে এবং দ্বিতীয়াংশে ইসলামের মানদণ্ড যে জাতি ,গোত্র বা বর্ণভিত্তিক নয় ,বরং বিশ্বজনীন সেটি প্রমাণ করা হবে।

ইসলামের বিশ্বজনীন আহ্বান

কোন কোন ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞের দাবি ইসলামের নবী (সা.) প্রথম দিকে চেয়েছিলেন শুধু কুরাইশদের হেদায়েত করতে ,কিন্তু পরবর্তীতে ইসলামের প্রসারের গতি লক্ষ্য করে আরব ও অনারব সকলের নিকট এ ধর্মের দাওয়াত উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন।

এ মন্তব্য কাপুরুষতামূলক অপবাদ ছাড়া কিছুই নয়। আর এ কথার কোন ঐতিহাসিক ভিত্তিও নেই এবং কোরআনের প্রথম দিকের আয়াত যা নবীর ওপর অবতীর্ণ হয় তাও এ কথাকে অসত্য প্রমাণ করে। কোরআন মজীদে এমন অনেক আয়াত রয়েছে যা রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতের প্রথম দিকে মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে ,অথচ সর্বব্যাপী ও বিশ্বজনীন। তন্মধ্যে কোরআনের ক্ষুদ্র সূরাগুলোর অন্যতম সূরা আত-তাকভীরের কথা উল্লেখ করতে পারি। এ সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ ও নবুওয়াতের প্রারম্ভিক একটি সূরা-যার একটি আয়াতে বলা হয়েছে

) إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ(

এটি বিশ্ববাসীদের জন্য উপদেশ বৈ কিছু নয়। 10

সূরা সাবার 28 নং আয়াতে বলা হয়েছে:

) وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا كَافَّةً لِّلنَّاسِ بَشِيرًا وَنَذِيرًا وَلَـٰكِنَّ أَكْثَرَ النَّاسِ لَا يَعْلَمُونَ(

আমি আপনাকে সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি ;কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না।

সূরা আম্বিয়ার 105 নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেছেন ,

) و لقد كتبنا في الزّبور من بعد الذّكر أنّ الأرض يرثها عبادي الصالحون(

আমরা উপদেশের পর যাবুরে লিখে দিয়েছি ,আমার সৎকর্মশীল বান্দাগণ অবশেষে পৃথিবীর অধিকারী হবে।

সূরা আ রাফের 158 নং আয়াতে বলা হয়েছে :

) يا أيّها النّاس إنّي رسول الله إليكم جميعا(

হে মানবমণ্ডলী! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহ্ প্রেরিত রাসূল।

কোরাআনের কোন স্থানেইيا أيّها العرب হে আরব জাতি বাيا أيّها القريشيّون হে কুরাইশ সম্প্রদায় বলে উল্লিখিত হয়নি। কোরআনে কখনও কখনওيا أيّها الذين آمنوا এসেছে সে সকল মুমিনের প্রতি লক্ষ্য করে যাঁরা নবীর সঙ্গে মিলিত হয়েছেন বা হবেন। এ ক্ষেত্রেও মুমিন ব্যক্তি যে কোন জাতি ,গোত্র বা বর্ণের হতে পারেন ,বিশেষ কোন জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এ ক্ষেত্র ব্যতীত অন্যান্য স্থানগুলোতে সাধারণভাবেيا أيّها النّاس হে মানবমণ্ডলী বলা হয়েছে।

ইসলামী শিক্ষার সর্বজনীনতা এবং এ দীনের দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা আরেক ভাবেও প্রমাণ করা যায়। তা হলো কোরআনে এমন কিছু আয়াত রয়েছে যাতে ইসলাম গ্রহণের বিষয়ে আরবদের এক প্রকার তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করা হয়েছে এবং তাদের অমনোযোগের দৃষ্টিতে দেখা হয়েছে। ঐ আয়াতগুলোর ভাবার্থ এরূপ যে ,ইসলামের তোমাদের প্রতি কোন প্রয়োজন নেই ,তাই যদি তোমরা ইসলাম গ্রহণ না কর তবে পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি রয়েছে যারা মন হতে ইসলামকে গ্রহণ করবে ,এমনকি এরূপ আয়াতসমূহ হতে এও বোঝা যায় ,কোরআন ঐ জাতিসমূহের হৃদয়কে ইসলামের জন্য অধিকতর উপযোগী ও প্রস্তুত বলে মনে করে। এ আয়াতগুলো যাথার্থভাবে ইসলামের বিশ্বজনীনতাকে তুলে ধরে। যেমন সূরা আনআমের 89 নং আয়াতে বলা হয়েছে :

) فإن يكفربِها هؤلاء فقد وكّلنا بِها قوماً ليسوا بِها بكافرين(

যদি তারা (আরবরা) কোরআনকে অস্বীকার করে তবে অবশ্যই আমরা অন্য জাতিকে তাদের স্থালাভিষিক্ত করব যারা একে অস্বীকার করবে না অর্থাৎ এর প্রতি ঈমান আনবে ও এর মর্যাদা রক্ষা করবে।

সূরা নিসায় বলা হয়েছে :

) إن يشأ يذهِبكم أيّها النّاس و يأت بآخرين و كان الله على ذلك قديرا(

হে মানবকুল! মহান আল্লাহ্ চাইলে তোমাদের সরিয়ে অন্য কাউকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন। বস্তুত আল্লাহর সে ক্ষমতা রয়েছে। 11

আবার সূরা মুহাম্মদে এসেছে :

) و إن تتولّوا يستبدل قوما غيركم ثُمّ لا يكونوا أمثالكم(

যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও (কোরআন হতে) তবে তিনি তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে প্রতিষ্ঠিত করবেন। এরপর তারা তোমাদের মত হবে না। 12

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম বাকির (আ.) বলেন , অন্য জাতি বলতে মাওয়ালীদের (ইরানীদের) কথা বলা হয়েছে।

অনুরূপ ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন ,কোরআন থেকে আরবদের মুখ ফিরিয়ে নেয়ার মাধ্যমে এ আয়াত সত্য প্রমাণিত হয়েছে এবং আল্লাহ্ তদস্থলে মাওয়ালী অর্থাৎ ইরানীদের প্রতিস্থাপিত করেছেন যারা মন-প্রাণ দিয়ে ইসলামকে গ্রহণ করেছে।13

অবশ্য এখানে আমাদের লক্ষ্য এটি নয় যে ,প্রমাণ করব অন্য জতিটি ইরানীই ছিল বা অন্য কেউ ;বরং এখানে আমরা যেটি বলতে চাই তা হলো ইসলাম গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে আরব-অনারব ইসলামের দৃষ্টিতে সমান। এ জন্যই আরবরা ইসলামের প্রতি অমনোযোগিতার কারণে পুনঃপুন তিরস্কৃত হয়েছে। ইসলাম আরবদের বুঝাতে চায় তারা ঈমান আনুক বা না আনুক এ দীন অগ্রগতি লাভ করবেই। কারণ ইসলাম এমন দীন নয় যা বিশেষ কোন জাতির জন্য আবির্ভূত হয়েছে।

এখানে অন্য আরেকটি বিষয়ের প্রতি আলোকপাত করা প্রয়োজন মনে করছি ,তা হলো: কোন ধর্মমত ,পথ ও চিন্তা-বিশ্বাস দেশ ,জাতি ও রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে যাওয়া শুধু ইসলামের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় ;বরং সকল বৃহৎ ধর্ম ও মতের ক্ষেত্রে এটি সত্য। বৃহৎ অনেক ধর্ম ও মতবাদই তার উৎসভূমিতে হয়তো অভিনন্দিত হয়নি ,কিন্তু তার উৎসস্থলের বাইরের দেশ ও জাতির নিকট গৃহীত ও অভিনন্দিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ হযরত ঈসা (আ.) ফিলিস্তিনে জন্মগ্রহণ করেছেন ,কিন্তু ফিলিস্তিনসহ প্রাচ্য হতে পাশ্চাত্যে তাঁর অনুসারীর সংখ্যা অধিক। ইউরোপ ও আমেরিকার অধিকাংশ মানুষ খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ,অথচ তারা ভূখণ্ড ও মহাদেশ হিসেবেও হযরত ঈসার জন্মভূমি হতে বিচ্ছিন্ন। এর বিপরীতে ফিলিস্তিনের অধিকাংশ অধিবাসী মুসলমান এবং ইহুদী। খ্রিষ্টানরা থাকলেও খুবই কম। প্রশ্ন হলো আমেরিকা ,ইউরোপের অধিবাসীরা কি খ্রিষ্ট ধর্মকে বিজাতীয় মনে করে ? আমি জানি না ,যে ইউরোপীয়রা অনৈক্যের স্রষ্টা তারা এই জাতীয়তাবাদের উদ্গাতা হিসেবে নিজেদের বিষয়ে কেন এরূপ চিন্তা করে না ,অথচ তাদের প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে এ মতবাদ প্রচার করে।

যদি ইসলাম ইরানীদের জন্য বিজাতীয় হয় তবে খ্রিষ্টধর্ম ইউরোপ-আমেরিকার জন্য বিজাতীয় পরিগণিত হবে না কেন ?

কারণটি পরিষ্কার। তারা জানে ও অনুভব করেছে প্রাচ্যের দেশগুলোতে শুধু ইসলাম জীবনের এক স্বাধীন দর্শনে বিশ্বাসী যা এর অনুসারীদের স্বাধীনচেতা হিসেবে গড়ে তোলে। যদি এ ইসলাম না থাকে তবে অন্য কোন কিছুই কাল ও লাল সাম্রাজ্যবাদের চিন্তাকে প্রতিরোধে সক্ষম নয়।

গৌতম বুদ্ধ ভারতে জন্মগ্রহণ করলেও ভারতের বাইরে চীনের শত কোটি লোক এ ধর্ম গ্রহণ করেছে।

যারথুষ্ট্র ধর্ম যদিও ইরানের বাইরে তেমন প্রসার লাভ করেনি ,তদুপরি এর জন্ম স্থল আজারবাইজানে বিস্তৃতি না ঘটে বালখে বিস্তার লাভ করে।

তদ্রূপ মক্কাও রাসূলুল্লাহর জন্মস্থল হওয়া সত্ত্বেও প্রথমে এর অধিবাসীরা ইসলাম গ্রহণ করে নি ;বরং শত ক্রোশ দূরের মদীনার অধিবাসীরা ইসলামকে আলিঙ্গন করেছিল। ধর্মের কথা বাদ দিলেও বিভিন্ন মতাদর্শ ও রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে পর্যালোচনা করলেও তাই দেখা যায়। বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম প্রসিদ্ধ ও শক্তিশালী মতবাদ হলো কমিউনিজম। কমিউনিজম কার মাথা হতে ,কোথায় উৎপত্তি লাভ করেছে আর কোন্ জাতি তা গ্রহণ করেছে। কার্ল মার্কস এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এ দু জার্মান বংশোদ্ভূত বর্তমান কমিউনিজমের স্রষ্টা। কার্ল মার্কস তাঁর শেষ জীবনে ইংল্যান্ডে অতিবাহিত করেন। তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী ছিল বৃটেনের অধিবাসীরা অন্যদের হতে পূর্বে কমিউনিজম গ্রহণ করবে। কিন্তু জার্মান বা ইংরেজরা তাঁর মতবাদ গ্রহণ করেনি ;বরং রাশিয়ার জনগণ তা গ্রহণ করে। কার্ল মার্কস ভাবতে পারেননি ,তাঁর মতবাদ জার্মান বা ইংরেজরা গ্রহণ করবে না ;বরং চীন ও সোভিয়েতরা গ্রহণ করবে।

এই কট্টর জাতীয়তাবাদীদের প্রশ্ন করতে চাই কেন সোভিয়েত রাশিয়া ও চীনের জনগণ দেশাত্মবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে যে কমিউনিস্ট চিন্তাধারা তাদের দেশের বাইরে থেকে এসেছে তাকে বিজাতীয় বলে প্রত্যাখ্যান করছে না ? যদি তাদের এ প্রশ্ন করেন তাহলে হেসে বলবে :

আমি মানব সন্তান ,আমায় শয়তান ভেব না

আমার জন্য কখনও তুমি লা হাওলা পড় না।

কোন কোন মতবাদ ও মতাদর্শ তার উৎপত্তি স্থলের বহির্সীমায় অধিকতর গ্রহণযোগ্যতা লাভ করার বিষয়টি নতুন নয়। ইসলাম তার আবির্ভাবের প্রথমেই এ বিষয়টিকে তার দৃষ্টিতে রেখেছিল।

আরব জাতির অনেকেই কোরআন হতে মুখ ফিরিয়ে নিলেও ইসলাম অন্যান্য জাতির মধ্যে ব্যাপক প্রসার লাভ করবে এ বিষয়টি ইসলাম পূর্বেই ভবিষ্যদ্বাণী কুরেছিল।14