ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 68842
ডাউনলোড: 2865

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 68842 / ডাউনলোড: 2865
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

মিল্লাত’ ( জাতি) শব্দের অর্থ

মিল্লাত (ملّة ) একটি আরবী শব্দ যার অর্থ পথ ও পদ্ধতি। পবিত্র কোরআনেও শব্দটি এ অর্থে এসেছে।4 এ শব্দটি কোরআনের 15টি আয়াতে 15 বার এসেছে। কিন্তু পবিত্র কোরআনে শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে বর্তমানে ফার্সী পরিভাষায় তা ভিন্ন অর্থে প্রচলিত হয়েছে।

কোরআনের পরিভাষায় মিল্লাত অর্থ ঐশী বার্তাবাহক নবীদের পক্ষ হতে যে পথ মানুষের জন্য উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন বলা হয়েছে:ملّة أبيكم إبراهيم তোমাদের পিতা ইবরাহীমের পথ 5 অথবাملّة إبراهيم حنيفا ইবরাহীমের পথ যা সত্য ও বিশুদ্ধ6

রাগিব ইসফাহানী তাঁর মুফরাদাতুল কোরআন গ্রন্থে বলেছেন , মিল্লাত ও ইসলাম একই মূল হতে এসেছে যার অর্থ লিখিয়ে দেয়া । যেমন বলা হয়েছে:فليملل وليّه بالعدل তখন তার অভিভাবক ন্যায়সঙ্গতভাবে তা লিখিয়ে দেবেন। 7 তিনি বলেছেন ,আল্লাহর পথকে মিল্লাত বলা হয়েছে এ জন্য যে ,এ পথ আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশিত হয়েছে।

সুতরাং কোরআনের দৃষ্টিতে সামগ্রিকভাবে যে চিন্তা ,জ্ঞান ও জীবন পদ্ধতি অনুসারে মানুষকে চলতে হবে তাকেই মিল্লাত বলা হয়। সুতরাং মিল্লাত দীন সমার্থক ,তবে পার্থক্য এটুকু ,একই বস্তুকে এক দৃষ্টিতে মিল্লাত এবং অন্য দৃষ্টিতে দীন বলে অভিহিত করা হয়। এ দৃষ্টিতে মিল্লাত বলা হয় যে ,তা আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর নবীর প্রতি নির্দেশিত হয়েছে-যা মানুষের নিকট তিনি পৌঁছে দেবেন এবং তার ওপর ভিত্তি করেই নেতৃত্ব দান করবেন।

ধর্মীয় পরিভাষাবিদরা বলেন দীন মিল্লাত শব্দের মধ্যে একটি পার্থক্য হলো দীন শব্দটিকে আল্লাহর সঙ্গে যেমন সংযুক্ত করা যায় ,উদাহরণস্বরূপ বলা যায়دين الله আল্লাহর দীন তেমনি দীনের অনুসারীদের নামের সঙ্গেও সংযুক্ত করা যায় ,যেমনدين زيد أو دين عمرو যায়েদ বা আমরের দীন। কিন্তু মিল্লাত শব্দটি আল্লাহ্ বা অনুসারীদের নামের সঙ্গে সংযুক্ত করা যায় না। তাই আল্লাহর মিল্লাত বা যায়েদের মিল্লাত বলা ভুল হবে ;বরং মিল্লাত শব্দটি কেবল আল্লাহর পক্ষ হতে তাঁর পথে নেতৃত্ব দানের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির নামের সঙ্গেই সংযুক্ত হয় ,যেমন বলা হয়েছে মিল্লাতে ইবরাহীম বা মিল্লাতে মুহাম্মদ (সা.)। যেন মিল্লাত শব্দের সঙ্গে নেতৃত্ব শব্দটিও জড়িয়ে রয়েছে।

এ দৃষ্টিকোণ হতে মিল্লাত শব্দটিকেمكتب (মাকতাব) বা মতবাদের নিকটবর্তী বলা যায়। কেননা সাধারণত মতবাদ কোন প্রবক্তা বা নেতার নামের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে থাকে। যদি মিল্লাত শব্দের সঙ্গে মাকতাব শব্দের নির্দেশিত হওয়ার সাদৃশ্যের বিষয়টি লক্ষ্য রাখি তাহলে বিষয়টি আমাদের জন্য অধিকতর স্পষ্ট হবে।

বর্তমানে ফার্সী পরিভাষায় মিল্লাত

বর্তমানে ফার্সী পরিভাষায় মিল্লাত শব্দটি তার মূল অর্থ হতে ভিন্ন অর্থে প্রচলিত হয়েছে। বর্তমানে মিল্লাত শব্দটি একটি একক সমাজের প্রতি আরোপিত হয় যা অভিন্ন ইতিহাস ,আইন ,রাষ্ট্রব্যবস্থা ,মূল্যবোধ ও আশা-আকাঙ্ক্ষার ধারক। আমরা এখন জার্মান ,বৃটেন বা ফ্রান্সের সকল অধিবাসীকে জার্মানী ,ব্রিটিশ বা ফরাসী জাতি না বলে তাদের দু ভাগে ভাগ করি। একদিকে শাসক অন্য দিকে সাধারণ নাগরিক। আমরা শাসকবর্গকে সরকার এবং সাধারণ নাগরিকদের মিল্লাত বা জাতি হিসেবে অভিহিত করি। এ ফার্সী পরিভাষাটি একটি নতুন ও উদ্ভাবিত পরিভাষা এবং প্রকৃতপক্ষে এটি একটি ভুল পরিভাষা। কারণ শত বা সহস্র বছর পূর্বে শব্দটি ফার্সী ভাষায় এরূপ ভুল অর্থে ব্যবহৃত হতো না। আমার মনে হয় ইরানের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনের পরবর্তীতে শব্দটির এ অর্থে ব্যবহার শুরু হয়। সম্ভবত এ ভুলের সৃষ্টি এভাবে হয়েছে ,শব্দটি অন্য শব্দের সঙ্গে সংযুক্ত হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং পরে সংযুক্ত শব্দটি বাদ পড়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় ইবরাইীমের পথের (মিল্লাতের) অনুসারী ,ঈসার পথের অনুসারী ,মুহাম্মদ (সা.)-এর পথের অনুসারী ইত্যাদি। পরে অনুসারী শব্দটি বাদ পড়ে যায় এবং বলা শুরু হয় ইবরাহীমের মিল্লাত ,ঈসার মিল্লাত ,মুহাম্মদের মিল্লাত ইত্যাদি। আরো পরে মিল্লাত শব্দটি বিভিন্ন জাতির সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে নতুন পরিভাষায় পরিণত হয় ,যেমন মিল্লাতে ইরান ,মিল্লাতে তুর্ক ,মিল্লাতে আরব ,মিল্লাতে ইংরেজ ইত্যাদি।

আরবরা জাতি অর্থে ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করে থাকে। তারা কাওম (قوم ) বা শাআব (شعب ) জাতি বুঝানোর জন্য ব্যবহার করে। যেমন বলেالشّعب العربي বাالشّعب الإيراني বাالشّعب المصري ইত্যাদি।

আমরা আমাদের এ আলোচনায় মিল্লাত মিল্লিয়াত জাতি ও জাতীয়তা অর্থেই ব্যবহার করছি প্রচলিত ফার্সী পরিভাষা হিসেবে ,তা সঠিক অর্থে ব্যবহৃত হচ্ছে কি হচ্ছে না তার পর্যালোচনায় না গিয়েই।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ হতে জাতীয়তা

এখন আমরা পারিভাষিক আলোচনার পর্ব শেষ করে সামাজিক আলোচনায় প্রবেশ করছি। সমাজের সবচেয়ে ক্ষুদ্র একক হলো পরিবার। স্বামী-স্ত্রী ,সন্তান-সন্ততি ,কখনও কখনও সন্তানদের স্বামী ,স্ত্রী ও সন্তানদেরসহ যে যৌথ জীবন গড়ে ওঠে তাকে পারিবারিক জীবন বলা হয়। পারিবারিক জীবনের ঐতিহ্য অত্যন্ত পুরাতন। যখন হতে মানুষ সৃষ্ট হয়েছে তখন হতেই পারিবারিক জীবন চলে এসেছে। অনেকের ধারণা ,মানুষের পূর্বপুরুষ অন্য কোন প্রাণী ছিল। বলা হয়ে থাকে সে পর্যায়েও মোটামুটিভাবে পারিবারিক জীবন ছিল।

পরিবার হতে বৃহত্তর সমাজিক একক হলো গোত্র বা বংশ। গোত্রীয় জীবন হলো যে সকল পরিবারের পিতৃপুরুষ এক ব্যক্তি। গোত্রীয় জীবন ক্ষুদ্র পারিবারিক জীবনের পূর্ণাঙ্গতর রূপ।

বলা হয়ে থাকে মানবের পারিবারিক জীবনের প্রাথমিক পর্যায়ে সম্পদ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে সামষ্টিক মালিকানা ছিল ,পরবর্তীতে তা ব্যক্তি মালিকানায় পর্যবসিত হয়।

গোত্র অপেক্ষা বৃহত্তর যে সামাজিক একক পূর্ণতররূপে আবির্ভূত হয় এবং এক জনসমষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করে-যাদের ওপর একই আইন ও একক সরকারের নেতৃত্ব কার্যকর তাকে ফার্সী ভাষাভাষীরা মিল্লাত বা জাতি বলে থাকে। একটি জাতি একটি মূল ,রক্ত ,বংশ ও গোত্র হতে যেমন উৎপত্তি লাভ করতে পারে তেমনি এরূপ ঐক্য নাও থাকতে পারে এবং এমনও হতে পারে যে ,তাদের মাঝে ঐতিহ্যগতভাবে গোত্রীয় জীবনই হয়তো ছিল না বা থাকলেও সীমিত পর্যায়ে কোন গোষ্ঠীতেই ছিল।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূলনীতি 8 নামক গ্রন্থের 1ম খণ্ডের 327 পৃষ্ঠায় এসেছে :

বিংশ শতাব্দীতে জাতি জনতা র মধ্যে যে পার্থক্য করা হয় তাতে বোঝা যায় অধিকংশ ক্ষেত্রে সামাজিক কোন দলকে বুঝাতে জনতা বলা হয়ে থাকে ;কিন্তু জাতি বলতে কোন ভূখণ্ড বা রাষ্ট্রে বসবাসরত জনসমষ্টি যারা একই রাজনৈতিক ও আইনগত বিধানের আওতায় রয়েছে তাদের বুঝায়। একই ভূখণ্ডে অবস্থানের কারণ বিভিন্ন হতে পারে। ঐতিহাসিক ,ভাষাগত ,ধর্মীয় ,অর্থনৈতিক ,সামাজিক মূল্যবোধ বা সামষ্টিক জীবনের অভিন্ন লক্ষ্যের কারণে এটি হতে পারে। জনতা শব্দটি সাধারণত সমাজবিজ্ঞানে ব্যবহৃত হয় এবং জাতি শব্দটি আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও আইনগত বিষয়ে ব্যবহৃত হয়। তবে এ শব্দটি মার্কসবাদে এবং উদারনীতিবাদে9 ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়। তাই এ শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বক্তা ও লেখক কোন্ মতাদর্শে বিশ্বাসী তা লক্ষ্য রাখতে হবে।

বর্তমান পৃথিবীতে বিভিন্ন জাতির অস্তিত্ব রয়েছে। যে বিষয়টি তাদের এক জাতি হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করেছে তা হলো সামষ্টিক জীবন এবং অভিন্ন আইন ও সরকার। যেহেতু একক সরকার তাদের ওপর শাসন ক্ষমতার অধিকারী সেহেতু এর ওপর ভিত্তি করেই তারা এক জাতি ;এক রক্ত ,বর্ণ ও ভাষার কারণে নয়। এ সকল জাতির অনেকেরই দীর্ঘ ঐতিহাসিক কোন নজীরও নেই ;বরং সামাজিক কোন ঘটনা প্রবাহের ফলে সৃষ্ট হয়েছে ,যেমন মধ্যপ্রাচ্যের অনেক রাষ্ট্রই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ওসমানী খেলাফতের পতনের কারণে সৃষ্ট হয়েছে।

বর্তমান পৃথিবীতে এমন কোন জাতি নেই যারা এক রক্ত ও বর্ণ হতে সৃষ্ট এবং অন্য জাতি হতে স্বতন্ত্র। উদাহরণস্বরূপ আমরা ইরানীরা দীর্ঘ ইতিহাসের অধিকারী এবং শাসন ব্যবস্থা ও আইনের দৃষ্টিতে আমাদের স্বাতন্ত্র্য রয়েছে ,কিন্তু নৃতাত্ত্বিকভাবে কি আমরা প্রতিবেশী জাতিসমূহ হতে স্বতন্ত্র ? আমরা আর্য বংশোদ্ভূত এবং আরবরা সেমিটিক বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে এখনও কি পৃথক যখন শত সহস্র মিশ্রণের ফলে ঐ নৃতাত্ত্বিক ভিত্তির কোন প্রভাবই এখন অবশিষ্ট নেই ?

বাস্তব হলো রক্ত ও বর্ণ পৃথক হওয়ার দাবিটি একটি অলীক দাবি। নৃতাত্ত্বিকভাবে কেউ আর্য সেমিটিক বা অন্য কিছু হওয়ার বিষয়টি পূর্বে ছিল ,কিন্তু পরবর্তীতে এত বেশি মিশ্রণ ও পরিবর্তন সাধিত হয়েছে ,ঐ সকল বর্ণের স্বাধীন কোন অস্তিত্ব এখন আর নেই।

বর্তমান সময়ে ইরানী ও ফার্সী ভাষী অনেক ব্যক্তিই যাঁরা ইরানী জাতীয়তাবাদের কথা বলেন হয়তো তুর্কী ,মোগল বা আরব বংশোদ্ভূত তেমনি আরবদের মধ্যেও আরব জাতীয়তাবাদের পক্ষাবলম্বনকারী অনেক ব্যক্তি হয়তো ইরানী ,তুর্কী বা মোগল বংশোদ্ভূত। আপনি যদি এখন মক্কা ও মদীনায় ভ্রমণ করেন তাহলে লক্ষ্য করবেন সেখানকার অধিকাংশ অধিবাসী হয় ভারতীয় ,ইরানী ,বালখী ,বুখারী বা অন্য কোন অঞ্চলের আদি অধিবাসী। হয়তো কুরুশ বা দারভীশ বংশের (ইরানের দুই প্রসিদ্ধ বংশ) কোন ব্যক্তি আরব ভাষার কোন দেশে বাস করে এবং আরব জাতীয়তার প্রতি গোঁড়ামি পোষণ করে। বিপরীত দিকে হয়তো আবু সুফিয়ানের অনেক বংশধর বর্তমানে ইরানী জাতীয়তাবাদের গোঁড়ামি পোষণ করে। কয়েক বছর পূর্বে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন যে ,ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া একজন ইরানী বংশোদ্ভূত। যদি তা-ই হয় তবে তার বংশধররা তো এখানে থাকতেই পারে।

সুতরাং বর্তমানে জাতি বলতে যা বুঝায় তাতে আমরা এমন এক জনসমষ্টি যারা এক ভূখণ্ডে ,এক পতাকার নীচে ,অভিন্ন সংবিধান ও সরকারের অধীনে বসবাস করছি। কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষ ইরানী ,গ্রীক ,আরব না মোগল ছিল তা আমরা জানি না।

যদি আমরা ইরানীরা জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে কাউকে আর্য কিনা বিচার করতে যাই তবে এ জাতির অধিকাংশ লোককে অ-ইরানী বলতে হবে। সে ক্ষেত্রে আমাদের আর গর্ব থাকবে না অর্থাৎ এ কর্মের মাধ্যমে আমরা ইরানী জাতীয়তাবাদের ওপর সর্বোচ্চ আঘাতটি হানব। বর্তমানে ইরানে অনেক গোত্র ও সম্প্রদায় রয়েছে যাদের ভাষা ফার্সী নয় এবং তারা আর্য বংশোদ্ভূতও নয়। তাই বর্তমান সময়ে জাতি ,রক্ত ও বর্ণের স্বাতন্ত্র্যের দাবি নিছক বুলি ছাড়া কিছুই নয়।

জাতীয়তার গোঁড়ামি

সমাজের যে কোন একক তা পরিবার ,গোত্র ,সম্প্রদায় বা জাতি যা-ই হোক না কেন ,তার সঙ্গে এক প্রকার আবেগ ও গোঁড়ামি জড়িয়ে রয়েছে। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে নিজ পরিবার ,গোত্র ও জাতির প্রতি এক ধরনের পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। পক্ষপাতিত্বের এ অনুভূতি কখনও কখনও কোন বৃহত্তর এককেও (বৃহত্তর অঞ্চল নিয়েও) দেখা দিতে পারে। উদাহরণস্বরূপ এশিয়ানদের মোকাবিলায় ইউরোপীয়রা এক ধরনের পক্ষপাতিত্বমূলক আবেগ প্রদর্শন করতে পারে যেমনিভাবে পারে এশিয়ানরাও। একই বর্ণের ও জাতির মানুষরাও পরস্পরের প্রতি এরূপ পক্ষপাতিত্ব দেখাতে পারে।

জাতীয়তার বিষয়টিও স্বার্থপরতা ও পক্ষপাতিত্বের অন্তর্ভুক্ত তবে তা ব্যক্তি ও গোত্রের গণ্ডি পেরিয়ে জাতীয় গণ্ডিতে প্রবেশ করেছে।

জাতীয়তার মধ্যে স্বার্থপরতার সাথে স্বাভাবিকভাবেই পক্ষপাতিত্ব ,গোঁড়ামি ,জাতীয় মানদণ্ডে স্বজাতির ত্রুটির প্রতি নির্লিপ্ততা ,স্বজাতির ভাল দিকগুলোকে বড় করে দেখা ,অহংকার ও গর্বের মত বিষয়গুলো চলে আসে।

জাতীয়তাবাদ

স্বজাতির প্রতি বিশেষভাবে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতাকে ইংরেজি ভাষায় ন্যাশনালিজম বলে অভিহিত করা হয় যা ফার্সী ভাষার পণ্ডিতরা মিল্লাত পারাস্তি অনুবাদ করেছেন।

জাতীয়তবাদ জাতীয় আবেগ ও অনুভূতির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত ;কোন যুক্তি ও বুদ্ধিবৃত্তির ভিত্তিতে নয় যা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। জাতীয়তাবাদকে সম্পূর্ণরূপে নিন্দা করা যায় না যদি তার মধ্যে শুধু ইতিবাচক দিকগুলোই থাকে। যেমন পারস্পরিক সুসম্পর্ক ও সহযোগিতা ,স্বজাতির লোকদের অধিকতর কল্যাণ সাধন প্রভৃতি দিকগুলো বুদ্ধিবৃত্তিক এবং যুক্তিহীন নয় এবং ইসলামের দৃষ্টিতেও নিন্দনীয় নয় ;বরং ইসলাম প্রতিবেশী ,আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের প্রতি অধিকতর অধিকার ও দায়িত্ব অর্পণ করেছে।

জাতীয়তাবাদ তখনই নিন্দনীয় যখন তা নেতিবাচকতা লাভ করে অর্থাৎ যখন বিভিন্ন জাতির ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য সৃষ্টি করে পরস্পরকে পরস্পরের প্রতি শত্রু করে তোলে এবং অন্যের ন্যায্য অধিকারের প্রতি ভ্রূকুটি প্রদর্শন করে।

জাতীয়তাবাদের বিপরীত হলো আন্তর্জাতিকতাবাদ যা বৈশ্বিক মানদণ্ডে জাতীয়তাবাদকে সমালোচনা করে। ইসলাম জাতীয়তাবাদী অনুভূতির সকল দিককেই নিন্দা করে না ;বরং শুধু নেতিবাচক দিকগুলোকে নিন্দা করে ,ইতিবাচক দিকগুলোকে নয়।

জাতীয়তার মানদণ্ড

বাহ্যিকভাবে মনে হয় জাতীয়তাবাদী চেতনা হলো একটি ভূখণ্ডের মানুষের সৃষ্টি ও চিন্তার ফল যা ঐ ভূখণ্ডের সম্পদ এবং যা কিছু জনসাধারণের দৃষ্টিতে জাতীয় বলে পরিগণিত তা গ্রহণ ,সে সাথে ঐ ভূখণ্ডের বাহির্ভূত সকল কিছুই বিদেশী ও ব