ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 45728
ডাউনলোড: 1932

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 45728 / ডাউনলোড: 1932
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

চতুর্থ স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরের খুব বেশি সংখ্যক দার্শনিকের পরিচয় আমাদের জানা নেই। তবে বিভিন্ন বর্ণনা হতে যতটুকু জানা যায় ফারাবী ,আবু বাশার মাত্তা ও কারনিবের বেশ কিছু সংখ্যক ছাত্র ছিল ,কিন্তু তাঁদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। এ পর্যায়ের দার্শনিকদের মধ্যে রয়েছেন :

1. ইয়াহিয়া ইবনে আদি: তিনি একজন খ্রিষ্টান যুক্তিবিদ ও ইবনুন নাদিমের সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। ইবনুন নাদিম তাঁর কর্মতৎপরতায় আশ্চর্যান্বিত হয়েছেন। ইবনুন নাদিম ,ইবনুল কাফতী ও ইবনে আবি আছিবায়াহ্ একমত ,ইয়াহিয়া আবু নাসর ফারাবী ও আবু বাশার মাত্তার ছাত্র ছিলেন। তাঁরা সকলেই বিশেষত ইবনুল কাফতী ইয়াহিয়ার অনেক গ্রন্থের নাম উল্লেখ করেছেন যার অধিকাংশই যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কিত। অবশ্য তিনি ঐশী দর্শন নিয়েও গ্রন্থ লিখেছেন যা ফারাবীর পূর্বে সার্বিকভাবে দর্শনে বিশেষত খ্রিষ্টীয় দর্শনে লক্ষ্য করা যায় না। ইবনুন নাদিম ও তাঁর অনুসরণে ইবনুল কাফতী ও ইবনে আবি আছিবায়াহ্ বলেছেন ,ইয়াহিয়া তাঁর সমকালীন যুক্তিবিদগণের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি 363 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল 81 বছর।

2. চতুর্থ স্তরে ইয়াহিয়া ইবনে আদি ছাড়াও ইখওয়ানুস সাফা ওয়া খিলানুল ওয়াফা নামে দার্শনিকদের একটি দল ছিল। তাঁরা অপরিচিত থাকতে চাইতেন বলে এরূপ ছদ্মনাম ব্যবহার করতেন। কিন্তু তাঁরা প্রমাণ করেছেন ,তাঁরা একদিকে যেমন দার্শনিক ছিলেন তেমনি অন্যদিকে ছিলেন ধার্মিক ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তাঁরা ধর্ম ও দর্শনের ভিত্তিতে যে আদর্শে বিশ্বাস করতেন তার আদলে সমাজ সংস্কারের চিন্তায় সমিতি বা দল গঠন করেছিলেন। তাঁরা সদস্য সংগ্রহ করতেন ও এর জন্য বিশেষ নিয়ম ছিল। তাঁরা তাঁদের বিশ্বদৃষ্টি ও মতাদর্শের ওপর 52টি পুস্তিকা রচনা করেছিলেন। এক দৃষ্টিতে এটি তৎকালীন সময়ের একটি এনসাইক্লোপেডিয়া যা ইসলামী বিশ্ব ও সভ্যতার উৎকৃষ্ট নমুনা। ইখওয়ানুস সাফা তাঁদের পূর্ববর্তী দার্শনিকদের বিশেষত ফারাবীর

চিন্তাধারা দ্বারা যেমন প্রভাবিত ছিল তেমনি পরবর্তী দার্শনিকদের চিন্তাকে প্রভাবিত করতে সমর্থ হয়েছিল। এ উভয় ক্ষেত্র নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন থাকলেও তা আমাদের এ গ্রন্থের লক্ষ্য বহির্ভূত।

ইখওয়ানুস সাফার সদস্যদের নাম তাঁদের সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব আবু হাইয়ান তাওহীদী উল্লেখ করেছেন। যেমন আবু সুলাইমান মুহাম্মদ ইবনে মা শার বাস্তী ,আবুল হাসান আলী ইবনে হারুন যানজানী ,অবু আহমাদ মেহেরজানী আউফী ,যাইদ ইবনে রাফায়া প্রমুখ। আবার অনেকে অন্য কিছু সংখ্যক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছেন ,যেমন ইবনে মাসকুইয়া রাযী (মৃত্যু 421 হিজরী) ,ঈসা ইবনে যারআ (মৃত্যু 398 হিজরী ,তিনি দার্শনিক ছাড়াও অনুবাদক ছিলেন) ,প্রসিদ্ধ গণিতবিদ আবুল ওয়াফা বুযাজানী (মৃত্যু 387 হিজরী) এবং অন্যান্য। এদের অনেকেই পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর প্রথম দশকসমূহের সঙ্গে সম্পর্কিত। বিভিন্ন বর্ণনা মতে ইখওয়ানুস সাফার কর্মকাণ্ড চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে পরিচিতি লাভ করেছিল।

আবু হাইয়ান তাওহীদী 373 হিজরীতে ইখওয়ানুস সাফার বিশ্বাস ,চিন্তাধারা ,নীতি ও কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে সামসামুদ্দৌলা ইবনে আজদুদ্দৌলার মন্ত্রীর নিকট বিবরণ পেশ করেন এবং বলেন , এ বিবরণটি আমার শিক্ষক আবু সুলাইমান মানতেকী সাজেস্তানীর নিকট উপস্থাপন করলে তিনি তাঁদের সম্পর্কে নিজস্ব মত প্রকাশ করেন। এ সম্পর্কিত আবু হাইয়ানের পুস্তিকাটি চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে রচিত হয়েছিল বিধায় ইখওয়ানের ব্যক্তিত্বদের ফারাবীর ছাত্রদের সমসাময়িক হিসেবে এ স্তরের দার্শনিকদের অন্তর্ভুক্ত মনে করেছি।

ইখওয়ানুস সাফা বুদ্ধিবৃত্তি ও দর্শনের সঙ্গে দীন ও শরীয়তের সমন্বয় ঘটিয়েছিল এবং এ দু বিষয়কে একে অপরের পরিপূরক ও পূর্ণতা দানকারী হিসেবে দেখেছে । তাঁরা দর্শনে পীথাগোরাসের পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেছে ও সংখ্যাতত্ত্বের ওপর অধিকতর জোর দিয়েছে বলে মনে হয়। অন্যদিকে ইসলামী দিক দিয়ে তাঁরা শিয়া চিন্তাধারা ও বিশ্বাসের প্রতি প্রচণ্ড ঝুঁকে ছিলেন বলা যায়।

পঞ্চম স্তরের দার্শনিকগণ

1. আবু সুলাইমান মুহাম্মদ ইবনে তাহির ইবনে বাহরাম সাজেস্তানী (আবু সুলাইমান মানতেকী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি বিশিষ্ট যুক্তিবিদ ইয়াহিয়া ইবনে আদী মানতেকীর ছাত্র। ইবনুল কাফতীর তারিখুল হুকামা গ্রন্থের বর্ণনা মতে তিনি আবু বাশার মাত্তার নিকট শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। সম্ভবত তিনি শিক্ষা জীবনের শুরুতে আবু বাশার মাত্তার ছাত্র ছিলেন এবং পরে ইয়াহিয়া ইবনে আদীর নিকট পড়াশোনা করেন।

ইসলামী বিশ্বের বিশিষ্ট মনীষী ,সাহিত্যিক ও লেখক আবু হাইয়ান মূল্যবান অনেক গ্রন্থ লিখেছেন। যেমন আল মুকাবিসাত ,আল এমতা ,আল মাওয়ানিসাহ্ ,আস সিদ্দীক ওয়াস সাদাকাত। আবু হাইয়ান তাঁর এ গ্রন্থসমূহে তাঁর শিক্ষক সম্পর্কে অনেক কথা বলেছেন ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন। ইবনুন নাদিম ও ইবনে আবি আছিবায়াহ্ আবু সুলাইমানের পরিচিতি ও বিবরণ দান করলেও সংক্ষিপ্তরূপে তা উপস্থাপন করেছেন। অবশ্য ইবনুল কাফতী তাঁর সম্পর্কে অনেকটা বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

আবু সুলাইমান সম্পর্কে সবচেয়ে বিস্তারিত আলোচনাটি আমি মরহুম মুহাম্মদ কাযভীনীর বিসত মাকালেহ্ গ্রন্থের 2য় খণ্ডে (পৃ. 128-166) দেখেছি।

আবু সুলাইমানের গৃহে দার্শনিক ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের আসর বসতো। তিনি তাঁর গোত্রের নেতা বলে পরিগণিত হতেন। আবু সুলাইমানের আসরে দার্শনিক পরিবেশ বিরাজ করত। সেখানে দর্শন ও অন্যান্য জ্ঞানগত বিভিন্ন প্রশ্ন উত্থাপিত হতো। দার্শনিকগণ একে অপরের আলোচনা হতে লাভবান হতেন। আবু হাইয়ান এ ক্ষেত্রে একে অপরের হতে আলোকিত হতেন বলেছেন। আবু হাইয়ান তাঁদের আসরকে 106টি সভায় বিভক্ত করে মুকাবিসাত নামে এক গ্রন্থ রচনা করেছেন।

আবু সুলাইমানের জন্ম ও মৃত্যুর সঠিক বছর জানা যায়নি। তবে নিশ্চিত যে ,তিনি চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। মরহুম কাযভীনীর ধারণায় আবু সুলাইমান 307 হিজরীতে জন্ম ও 380 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তবে তিনি 390 হিজরী পর্যন্ত জীবিত ছিলেন বলেও ধারণা করা হয়।

আবু সুলাইমানের জ্ঞানের আসরে যাঁরা অংশগ্রহণ করতেন তাঁদের অধিকাংশই ইয়াহিয়া ইবনে আদীও আবু সুলাইমানের ছাত্র ছিলেন। যেমন আবু মুহাম্মদ উরুযী ,আবু বাকর কাউমাসী ,ঈসা ইবনে যারায়াহ্ প্রমুখ।

2. আবুল হাসান আমেরী নিশাবুরী: এই ব্যক্তি সম্পর্কে তেমন কোন তথ্য আমাদের হাতে নেই। ইবনুন নাদিম ,ইবনুল কাফতী ও ইবনে আবি আছিবায়াহ্ তাঁর নামোল্লেখ করেননি। ইয়াকুত তাঁর মুজামুল উদাবা গ্রন্থে তাঁর নাম উল্লেখ করেছেন।

সেহ্ হাকিমে মুসলমান গ্রন্থে বলা হয়েছে: আমেরীর দু টি গ্রন্থ রয়েছে ;একটি নৈতিকতা সম্পর্কিত যার নাম আস সায়াদাহ্ ওয়াল আসআদ এবং অন্যটি দর্শন সম্পর্কিত যার নাম আল আমাদ ইলাল আবাদ । তিনি ইসলামের প্রতিরক্ষায় অন্যান্য ধর্মের ওপর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব দেখিয়ে আল আলাম বি মানাকিবুল ইসলাম নামের একটি গ্রন্থ লিখেছেন। তিনি গ্রীক দর্শনের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। সাসানী রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। তিনি আবু যাইদ বালখীর ছাত্র ছিলেন।

কেউ কেউ দাবি করেছেন ,আমেরী ও ইবনে সিনার মধ্যে পত্র বিনিময় হয়েছে। কিন্তু এটি সম্ভবত ঠিক নয়। কারণ তাঁর মৃত্যুর সময় ইবনে সিনার বয়স ছিল এগার বছর। আমেরী আবু যাইদ বালখীর সরাসরি ছাত্র ছিলেন এ কথাটিও সম্ভবত সঠিক নয়। কারণ বালখী 322 হিজরীতে মারা যান এবং আমেরী 381 হিজরীতে। শিক্ষক ও ছাত্রের মৃত্যুর মধ্যকার সময়ের ব্যবধান উনষাট বছর।

3. আবুল খাইর হাসান ইবনে সাওয়ার (ইবনুল খিমার নামে প্রসিদ্ধ): তিনি একাধারে চিবিৎসক ,দার্শনিক এবং সুরিয়ানী ভাষা হতে আরবী ভাষার একজন অনুবাদক। কিন্তু দার্শনিক ও অনুবাদক অপেক্ষা তাঁর প্রসিদ্ধি চিকিৎসক হিসেবে অধিক। তিনি ইয়াহিয়া ইবনে আদীর ছাত্র এবং স্বয়ং অনেক ছাত্রকে প্রশিক্ষিত করেছেন। তিনি প্রথম জীবনে খ্রিষ্টান ছিলেন তবে শেষ জীবনে মুসলমান হয়েছিলেন বলে নামে দানেশওয়ারান গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে।

ইবনুন নাদিম তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী ছিলেন বলে উল্লেখ করেছেন। নামে দানেশওয়ারান গ্রন্থের বর্ণনানুসারে তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন ,যদিও এ গ্রন্থে তাঁর মৃত্যুর বছর উল্লিখিত হয়নি। মুহাম্মদ কাযভীনী তাঁর বিসত মাকালেহ্ গ্রন্থের সাওয়ানুল হিকমাহ্ নামক প্রবন্ধের শেষাংশে আবুল খাইরের মৃত্যু 408 হিজরীতে ঘটেছিল বলে দাবি করেছেন।308

কথিত আছে ইবনে সিনা তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তিদের নিকট হতে কিছু গ্রহণ করতেন না। তদুপরি তাঁর গ্রন্থে আবুল খাইরের নাম সম্মানের সঙ্গে উল্লেখ করে বলেছেন , আবুল খাইরকে অন্যদের সমপর্যায়ে ধরা ঠিক হবে না। আল্লাহ্ তাঁর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটান। 309

4. আবু আবদুল্লাহ্ নাতেলী: এই ব্যক্তির নিকটই ইবনে সিনা প্রথম জীবনে কিছুদিন যুক্তিবিদ্যা ও গণিতশাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। তাঁর তেমন কোন ব্যক্তিত্ব ছিল না। তাঁর প্রসিদ্ধি মূলত তাঁর ছাত্রের কারণেই।

নাতেলী একজন চিকিৎসকও ছিলেন। ইবনে আবি আছিবায়াহ্ আবুল ফারাজ ইবনুত্ তিবের জীবনী আলোচনায় নাতেলীকে তাঁর সমসাময়িক চিকিৎসকদের নামের তালিকায় এনেছেন। অনেকে ইবনে আবি আছিবায়ার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন ,আবুল ফারাজ ইবনুত্ তিব নাতেলীর ছাত্র ছিলেন। কিন্তু তা সঠিক নয়। কারণ ইবনে আবি আছিবায়াহ্ নাতেলীকে আবুল ফারাজের সমসাময়িক ব্যক্তি হিসেবে এনেছেন ,তাঁর ছাত্র হিসেবে নয়।

ষষ্ঠ স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরকে বিরল প্রতিভার দার্শনিকদের স্তর বলা যেতে পারে। অন্য কোন স্তরেই এ স্তরের ন্যায় উজ্জ্বল দার্শনিক ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় না।

1. আবু আলী আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে ইয়াকুব মাসকুইয়া (মাসকাভীয়ে) রায়ী: তিনি রেইয়ের আদি অধিবাসী। তিনি আবু রাইহান বিরুনী ,ইবনে সিনা ,আবুল খাইর ,আবু নাসর ইরাকী ও খ্রিষ্টান ব্যক্তিত্ব আবু সাহলের সঙ্গে একত্রে কিছুদিন খাওয়ারেজম শাহের দরবারে ছিলেন। তিনি 420 হিজরীতে ইসফাহানে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর জন্মের সঠিক সাল জানা যায়নি ,তবে বলা হয়েছে ,তিনি দীর্ঘ জীবন লাভ করেছেন।

আবু হাইয়ান তাওহীদীর বর্ণনা মতে ইবনে মাসকাভীয়ে কিছুদিন আবুল খাইরের ছাত্র ছিলেন। কেউ কেউ বলেছেন তিনি আবুল হাসান আমেরীর নিকটও শিক্ষা লাভ করেছেন। অবশ্য এ বর্ণনাটির সঙ্গে মু জামুল উদাবা গ্রন্থের বর্ণনার পার্থক্য রয়েছে। সেখানে আবুল হাসান আমেরীর রেই শহরে পাঁচ বছর অবস্থানকালীন সময়ে ইবনে মাসকাভী তাঁর কাছে যাননি বলা হয়েছে। সম্ভবত তাঁদের মাঝে কোন প্রতিবন্ধকতা ছিল।

ইবনে সিনার ইবনে মাসকাভীর সভায় উপস্থিত হওয়ার কাহিনীটি ইবনে মাসকাভী তাঁর নৈতিকতা বিষয়ক তাহারাতুল আরাক গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। ঘটনাটি এরূপ: একদিন ইবনে সিনা ইবনে মাসকাভীর নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর সম্মুখে একটি আখরোট ছুঁড়ে দিয়ে এর আয়তন নির্নয় করতে বলেন। ইবনে মাসকাভী তাঁকে বলেন , তোমার এই আখরোটের আয়তন জানা অপেক্ষা চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য শিক্ষার জন্য আমার শরণাপন্ন হওয়া উচিত। ইবনে সিনা তাঁর সমকালীন কোন ব্যক্তির প্রতি তেমন শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখতেন না। ইবনে মাসকাভীয়ে সম্পর্কে তিনি বলেছেন ,একটি বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করলে তিনি কোনভাবেই তা বুঝতে সক্ষম হননি।

ইবনে মাসকাভীয়ের পিতা যারথুষ্ট্র হতে মুসলমান হয়েছিলেন। কারো কারো মতে ইবনে মাসকাভীয়ে শিয়া ছিলেন। যা হোক এটি নিশ্চিত যে ,তিনি শিয়া বিশ্বাসের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহ হলো ইতিহাস বিষয়ক আল ফাউযুল আসগার এবং নৈতিকতা বিষয়ক তাহারাতুল আরাক

2. আবু রাইহান মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ বিরুনী খাওয়ারেজমী: তিনি ইলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রথম সারির একজন ব্যক্তিত্ব। কোন কোন প্রাচ্যবিদের মতে ইসলামী বিশ্বে তাঁর জুড়ি নেই। তিনি গণিতশাস্ত্র ,জ্যোতির্বিদ্যা ,ইতিহাস ,চিকিৎসাশাস্ত্র ,বিভিন্ন জাতি ও গোত্রের ধর্ম ও বিশ্বাসে বিশেষজ্ঞ ও পণ্ডিত ছিলেন। তিনি গবেষণামূলাক এমন কিছু গ্রন্থ লিখেছেন যা বিশেষজ্ঞদের আশ্চর্যান্বিত করে। যেমন তাহকীকু মিলালেল হিন্দ ,আল আসারুল বাকীয়া ,কানুনে মাসউদী ইত্যাদি।

বিরুনী 362 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন ও 442 হিজরীতে মারা যান। তিনি তাঁর মাতৃভাষা খাওয়ারেজমী ছাড়াও ফার্সী ,আরবী ,সুরিয়ানী ও গ্রীক ভাষায় পণ্ডিত ছিলেন। তিনি আরবীকে জ্ঞান সম্পর্কিত বিষয় উপস্থাপনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ভাষা মনে করতেন এবং এ ভাষার প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত ছিলেন। তিনি বলেছেন , আমাকে আরবী ভাষায় কেউ মন্দ বললেও আমি খুশী ,এমনকি কোন কোন ভাষায় আমার প্রশংসা করা অপেক্ষাও। এক ব্যক্তি ছাড়া তাঁর আর কোন শিক্ষকের পরিচয় পাওয়া যায়নি । ঐ ব্যক্তি হলেন আবু নাসর ইবনে আলী ইবনে আরাকী যিনি আবু নাসর আরাকী নামে প্রসিদ্ধ। আবু রাইহানের কোন ছাত্র ছিল কিনা তাও জানা যায়নি।

আবু রাইহান এমন ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন ও জীবনকে জ্ঞানার্জনের পথে ব্যয় করেছিলেন। তিনি প্রায় আশি বছর জীবিত ছিলেন। বছরে মাত্র দু দিন ছুটি কাটাতেন। আবু রাইহান ও ইবনে সিনা 400 হিজরীতে খাওয়ারেজমে পরস্পর সাক্ষাৎ করেন। আবু রাইহান ইবনে সিনা হতে কয়েক বছরের বড় ছিলেন। তিনি ইবনে সিনাকে দর্শন বিষয়ে আঠারটির মতো প্রশ্ন করেন। এর মধ্যে কয়েকটি অ্যারিস্টটলের মতের বিরুদ্ধে ছিল। ইবনে সিনা প্রশ্নগুলোর উত্তর দান করেন। কিন্তু তাঁদের আলোচনা তিক্ততামূলক বিতর্কে পৌঁছেছিল। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে এ প্রশ্নগুলো ইবনে সিনা খাওয়ারেজম হতে চলে যাওয়ার পর বিরুনী তাঁর নিকট প্রেরণ করেন। আবু রাইহান তাঁর আল আসারুল বাকীয়া গ্রন্থে ইবনে সিনার প্রতি উপস্থাপিত প্রশ্নসমূহ জ্ঞানী যুবক শিরোনামের আলোচনায় এনেছেন।

আবু রাইহান ইসলামের মৌলনীতির প্রতি একান্ত অনুরাগী ও বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাঁর লেখায় একজন প্রকৃত ঈমানদারের ন্যায় পবিত্র ইসলামের কথা উল্লেখ করেছেন এবং প্রসঙ্গক্রমে প্রায়ই কোরআনের আয়াত এনেছেন। তিনি শুয়ূবী আন্দোলনের প্রতি চরম বিদ্বেষ পোষণ করতেন এবং তাঁর বিভিন্ন লেখায় এ আন্দোলনের প্রতি ঘৃণার প্রকাশ ঘটিয়েছেন। আবু রাইহান যথাসম্ভব শিয়া ছিলেন।

3. আবু আলী হুসাইন ইবনে আবদুল্লাহ্ ইবনে সিনা: তিনি একজন কিংবদন্তী ও বিরল ব্যক্তিত্ব। তাঁকে চিনতে এক জীবন সময় এবং কয়েক খণ্ড গ্রন্থের প্রয়োজন হবে। তিনি 35 বছর বয়সে গোরগানে আসার সময় পর্যন্ত নিজ জীবন ইতিহাস এক ছাত্রের অনুরোধে বর্ণনা করেছেন। তাঁর স্বনামধন্য ছাত্র আবু উবাইদ জাওযাজানী ঐ ছাত্রের লিখিত বিবরণকে পূর্ণ করে ইবনে সিনার পূর্ণ জীবনেতিহাস লিখেছেন। এ ইতিহাস হতে মোটামুটিভবে ইবনে সিনার শিক্ষা ,রাজনীতি ও সার্বিক জীবন সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাঁর জীবন ঘটনাবহুল ও অশান্তিপূর্ণ ছিল এবং তিনি নাতিদীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন। অবশ্য নাতিদীর্ঘ অশান্তিপূর্ণ ও ঘটনাবহুল এ জীবনে তিনি যে পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করেছিলেন ও যত অধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন তা সত্যিই আশ্চর্যজনক।

আশ্চর্যের বিষয় হলো ইবনে আবি অছিবায়াহ্ ও ইবনুল কাফতী উভয়েই ইবনে সিনার উপরোক্ত জীবনেতিহাস কোন পার্থক্য ছাড়াই হুবহু বর্ণনা করলেও তাঁর মৃত্যুর সময় নিয়ে মতপার্থক্য করেছেন। ইবনে আবি আছিবায়াহ্ তাঁর মৃত্যু 54 বছর বয়সে হয়েছিল বলেছেন ,কিন্তু ইবনুল কাফতী 58 বছর বলে উল্লেখ করেছেন। নামে দানেশওয়ারান গ্রন্থে বিভিন্ন পারিপার্শ্বিক বর্ণনার ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যু 63 বছর বয়সে হয়েছিল বলে উল্লিখিত হয়েছে।

উল্লেখ্য ,ইবনে সিনার ব্যক্তিত্ব তাঁর পূর্বের সকল ইসলামী ব্যক্তিত্বের শ্রেষ্ঠত্বকে ছাপিয়ে গিয়েছিল। পরবর্তীতে চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনে তাঁর গ্রন্থগুলোই আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়।

ইবনে সিনার পূর্বে বাগদাদ চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনের কেন্দ্র ছিল। কিন্তু ইবনে সিনা বাগদাদে যাননি। তাঁর পিতা ছিলেন বালখের অধিবাসী এবং মাতা বুখারার। তাঁর জীবনের প্রথমার্ধ এ অঞ্চলেই কেটেছে। বিশেষ কারণে তিনি খোরাসান ও গোর্গানে আসেন ও বিভিন্ন শহরে স্বল্প সময় কাটান। অতঃপর ইসফাহানে আসেন ও হামেদানে গিয়ে বসতি স্থাপন করেন। জ্ঞানান্বেষণকারীদের মধ্যে তাঁর সুনাম ছড়িয়ে পড়ে। সকল দিক হতে তাঁরা তাঁর নিকট আসা শুরু করেন। তিনি অনেক ছাত্রকে প্রশিক্ষিত করেন। ইবনে সিনার ব্যক্তিত্ব ও পরবর্তীতে তাঁর গ্রন্থসমূহের প্রসিদ্ধি ইরানেই ঘটে ও তাঁর গ্রন্থকে কেন্দ্র করে এখানেই গবেষণাকর্ম শুরু হয়। ফলে চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনের কেন্দ্র বাগদাদ হতে ইরানে স্থানান্তরিত হয়।

4. আবুল ফারাজ ইবনুত তাইয়্যেব: তিনি ইরাকী। সম্ভবত বাগদাদের অধিবাসী। তিনি চিকিৎসক ও দার্শনিক ছিলেন। তবে চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধি অধিক। ইবনে সিনা তাঁর সমসাময়িক হিসেবে চিকিৎসাশাস্ত্রে তাঁর প্রশংসা করেছেন ,তবে দর্শনে তাঁকে তেমন কিছু মনে করতেন না। অবশ্য ইবনে সিনা দর্শনের ক্ষেত্রে তাঁর সময়ের কাউকেই গুরুত্ব দিতেন না। সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের পরিসমাপ্তিতে উল্লিখিত হয়েছে ,ইবনে সিনা আবুল ফারাজের দর্শনগ্রন্থ সম্পর্কে বলেছেন ,তাঁর রচিত গ্রন্থসমূহ বিক্রেতাদের উচিত তাঁকে ফিরিয়ে দেয়া ও তাঁর নিকট আরো অর্থ চাওয়া। একই গ্রন্থে আরো বলা হয়েছে ,যখন ইবনে সিনা ও আবু রাইহান বিরুনীর মধ্যে বিতর্ক চরম পর্যায়ে পৌঁছে তখন বিরুনী ইবনে সিনার প্রতি একটি কড়া পত্র প্রেরণ করেন। এ খবর আবুল ফারাজের নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন ,যদি কেউ অন্যদের প্রতি কঠোর আচরণ করে তার প্রতিও সেরূপ আচরণ হয়ে থাকে।

ইবনুল কাফতী ইবনে সিনার বক্তব্যের উল্লেখের পর আবুল ফারাজ সম্পর্কে বলেন , যে কোন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিই বলবেন আবুল ফারাজ পুরাতন জ্ঞানসমূহকে প্রকাশিত ও পুনর্জীবিত করেছিলেন।

আবুল ফারাজ খ্রিষ্টান ছিলেন। তিনি আবুল খাইরের ছাত্র ছিলেন এবং বেশ কিছু ছাত্র তাঁর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। ইবনুল কাফতী বলেছেন ,তিনি 420 হিজরীর পরও জীবিত ছিলেন। কথিত আছে তিনি 435 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

5. আবুল ফারাজ ইবনে হিন্দু: তিনি চিকিৎসাশাস্ত্র ও দর্শনে আবুল খাইরের ছাত্র এবং তাঁর শ্রেষ্ঠ ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন। তিনি সাহিত্যিক ,কবি ও বক্তা ছিলেন।

6. আবু আলী হাসান ইবনে হাসান (অথবা হুসাইন) ইবনুল হাইসাম বাসরী: তিনি একাধারে দার্শনিক ,চিকিৎসক ,পদার্থবিদ ও গণিতজ্ঞ ছিলেন। তিনি পদার্থবিদ্যা ও গণিতশাস্ত্রে বিশ্ববিখ্যাত ছিলেন। গণিতশাস্ত্রের উন্নয়নে তাঁর অবদান সর্বজনবিদিত। তিনি 354 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন ও 430 হিজরীতে মারা যান। সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে ,নীল নদীতে পানি হ্রাস পেলে তিনি এ থেকে মুক্তির পরিকল্পনা নকশা তৈরি করে কায়রোর শাসনকর্তার নিকট নিয়ে যান। শাসক হাকিম বিল্লাহ্ তা গ্রহণ তো করেননি ;বরং তাঁর ওপর রাগান্বিত হন। তিনি কায়রো হতে পালিয়ে দামেস্কে চলে আসেন। বলা হয়ে থাকে যে ,তিনি অত্যন্ত ধার্মিক ও ধর্মীয় বিধিবিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। মৃত্যুর সময় তাঁর বিশেষ অবস্থার বিষয়টিও উপরোক্ত গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে। কথিত আছে ,তিনি জীবনের একটি অংশ মরক্কোয় কাটিয়েছেন। সাইয়্যেদ হাসান তাকী যাদেহ্ তাঁর তারিখে উলুম দার ইসলাম গ্রন্থে বলেছেন , তাঁর অনেক রচনা ছিল। তাঁর রচনার সংখ্যা এত অধিক যে ,মনে হয় সমগ্র জীবন এ কর্মেই রত ছিলেন। সার্টনের বর্ণনা মতে ইবনুল হাইসাম পদার্থবিদ্যায় মুসলমানদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ ছিলেন এবং পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব। এ শাস্ত্রে তাঁর রচিত গ্রন্থ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে বিজ্ঞানের উন্নয়নে ব্যাপক প্রভাব রেখেছিল। বিশিষ্ট দার্শনিক রজার বেকন এবং বিশিষ্ট পদার্থ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী কেপলার তাঁর গ্রন্থ হতে লাভবান হয়েছেন বলে উল্লেখ করেছেন... ইবুনল হাইসাম আলোকরশ্মি ও এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিধি নিয়ে উচ্চমানের গবেষণা চালিয়েছিলেন। সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি অন্ধকার ঘরে আলোকরশ্মির ওপর বিভিন্ন পরীক্ষা চালান... তিনি দ্বিঘাত সমীকরণ উদ্ভাবন করেন এবং পৃথিবীর চারিদিকে বায়ুমণ্ডলের আয়তন নির্ণয়ের চেষ্টা চালান।

তাঁর সমসাময়িক প্রথম সারির গণিতজ্ঞদের মধ্যে রয়েছেন- আবুল ওয়াফা বুজাযানী নিশাবুরী ,আবদুর রহমান সুফী রাযী ,আবু সাহল কুহেস্তানী তাবারেস্তানী প্রমুখ।

সপ্তম স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরের দার্শনিকগণ দু ভাগে বিভক্ত। প্রথম দল ইবনে সিনার ছাত্র এবং দ্বিতীয় দল তাঁর ছাত্র নন। প্রথম দলের ব্যক্তিরা হলেন :

1. আবু আবদুল্লাহ্ ফাকীহ্ মাসুমী: ইবনে সিনা তাঁর সম্পর্কে বলেছেন , সে আমার কাছে প্লেটোর নিকট অ্যারিস্টটলের ন্যায়। ইশক নামক পুস্তিকাটি ইবনে সিনা তাঁর অনুরোধে ও তাঁর নামে লিখেন। তিনিই ইবনে সিনা ও আবু রাইহানের মধ্যে পত্র বিনিময়ের মাধ্যম ছিলেন। আবু রাইহান ইবনে সিনার প্রতি কঠোর সমালোচনামূলক পত্র লিখলে ইবনে সিনা নিজে এর জবাব দিতে রাজী হননি। ফাকীহ্ মাসুমী আবু রাইহানকে পত্র লিখে বলেন , যদি আপনি প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি ভিন্ন অন্য কারো জন্য ঐ ভাষাসমূহ ব্যবহার করতেন তাহলে জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তির কাজ হতো। বায়হাকীর মতে ফাকীহ্ বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্তু সত্তার সংখ্যা নির্ণয় ও শ্রেণীবিন্যাস (উৎপত্তির ভিত্তিতে) করে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। কিন্তু গ্রন্থটি আমাদের হাতে পৌঁছার পূর্বেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর সঠিক বছর জানা যায়নি। তবে 450 হিজরীর দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়।310

2. আবুল হাসান বাহমানইয়ার ইবনে মারযবান আজারবাইজানী: তিনি প্রথম জীবনে মাজুসী ছিলেন ,পরে মুসলমান হন। তিনি ইবনে সিনার সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছাত্র। তাঁর প্রসিদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ ইবনে সিনাকে অধিক প্রশ্ন করা। তাঁর প্রশ্নের উত্তরের যে জবাব ইবনে সিনা দিয়েছেন তা হতে তাঁর মুবাহেসাত গ্রন্থ সংকলিত হয়েছে। বাহমানইয়ারের প্রসিদ্ধির অন্যতম কারণ তাঁর রচিত গ্রন্থ আত তাহছীল । বিভিন্ন দর্শন গ্রন্থে এর নাম বারবার এসেছে। সাদরুল মুতাআল্লেহীন (মোল্লা সাদরা) তাঁর আসফার গ্রন্থের কয়েক স্থানে আত তাহছীল গ্রন্থ হতে এবং দু টি স্থানে বাহমানইয়ারের অপর গ্রন্থ আল বাহজাত ওয়াস সাআদাত হতে উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সম্প্রতি আত তাহছীল গ্রন্থটি ইলাহিয়াত মহাবিদ্যালয়ের প্রকাশনালয় হতে আমার (মুতাহ্হারী) সংস্করণ ও সংযোজনসহ প্রকাশিত হয়েছে। বাহমানইয়ার 458 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. আবু উবাইদ আবদুল ওয়াহেদ জাওযাজানী: তিনি বিশ বা পঁচিশ বছর ইবনে সিনার ছাত্র ছিলেন। তিনিও ইবনে সিনার জীবনী গ্রন্থ সংকলন ও পূর্ণ করেন।

ইবনে সিনা তাঁর বক্তব্য ও লেখনী সংরক্ষণে তেমন প্রয়াসী ছিলেন না। কখনও প্রয়োজন পড়লে ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কোন পুস্তক লিখে কোন ছাত্রের হাতে দিতেন এর কোন অনুলিপি নিজের কাছে না রেখেই। সম্ভবত ইবনে সিনার কিছু সংখ্যক গ্রন্থ আবু উবাইদের কারণেই বর্তমানেও বিদ্যমান রয়েছে। ইবনে সিনার গণিতশাস্ত্র সংক্রান্ত গ্রন্থ নাজাত দানেশনামে আলাঈ তিনি সম্পূর্ণ করেন। এর বেশি কিছু তাঁর সম্পর্কে জানা যায়নি।

4. আবু মনসুর হুসাইন ইবনে তাহির ইবনে যিলেহ্ ইসফাহানী: সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের বর্ণনানুসারে তিনি ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থটি সংক্ষিপ্তাকারে সংকলন করেন ও তাঁর হাই ইবনে ইয়াকযানের প্রতি লিখিত পুস্তিকাটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেন। তিনি সংগীতশাস্ত্রের ওপর একটি গ্রন্থও লিখেছেন। তিনি সংগীতকলায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনি তাঁর শিক্ষক ইবনে সিনার 22 বছর পর 450 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ইবনে যিলেহ্ও বাহমানইয়ারের ন্যায় ইবনে সিনার নিকট বিভিন্ন প্রশ্ন করে উত্তর জেনে তা সংকলন করেছেন। কথিত আছে মুবাহেসাত গ্রন্থটিতে বাহমানইয়ারের প্রশ্নাবলী ছাড়াও ইবনে যিলেহ্ ও অন্যান্যদের প্রশ্নোত্তরও সংকলিত হয়েছিল। উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও ইবনে সিনার অন্যান্য ছাত্র ছিলেন যাঁদের নামোল্লেখ হতে আমরা বিরত থাকছি।

এই স্তরে যাঁরা ইবনে সিনার ছাত্র ছিলেন না তাঁর হলেন :

1. আলী ইবনে রিদওয়ান মিসরী: তিনি দার্শনিক ও চিকিৎসক ছিলেন। তিনি ঐ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত যাঁরা যাকারিয়া রাযীর মতকে খণ্ডন করে নিজস্ব মত প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন ,কিন্তু তাঁর চেহারা ছিল কদাকার। নামে দানেশওয়ারান গ্রন্থের মতে তিনি তাওরাত ,ইঞ্জিল ও দার্শনিক তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করে সর্বশেষ নবী (সা.)-এর নবুওয়াতকে প্রমাণ করে গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি 453 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শিক্ষক ও ছাত্রদের সম্পর্কে কিছু জানা যায়নি।

2. আবুল হাসান মুখতার ইবনে হাসান ইবনে আবদান ইবনে সাদান ইবনে বাতলান বাগদাদী: তিনি একজন খ্রিষ্টান ও ইবনে বাতলান নামে প্রসিদ্ধ। তিনি পূর্বোল্লিখিত খ্রিষ্টান দার্শনিক আবুল ফারাজ ইবনুত্ তাইয়্যেবের ছাত্র। তিনিও তাঁর শিক্ষকের ন্যায় একাধারে চিকিৎসক ও দার্শনিক ছিলেন ,তবে চিকিৎসক হিসেবে তাঁর প্রসিদ্ধি অধিক। আলী ইবনে রিদওয়ানের সঙ্গে তাঁর শত্রুতা ছিল ও তাঁকে জ্বিনদের কুমীর বলে তিরস্কার করতেন। একবার মিশরে গিয়ে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অসন্তুষ্ট হয়ে তিনি এরূপ মন্তব্য করেছিলেন। তিনি হালাব ও কনস্টানটিনোপোলেও গিয়েছেন। তিনি চিরকুমার ছিলেন এবং 444 হিজরীতে মারা যান।

3. আবুল হাসান আম্বারী: তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা নেই। সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের উপসংহার হতে এতটুকু জানা যায় যে ,তিনি দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ ছিলেন। তবে গণিতজ্ঞ হিসেবে অধিকতর প্রসিদ্ধ। গণিতজ্ঞ উমর খৈয়াম তাঁর নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

অষ্টম স্তরের দার্শনিকগণ

এই স্তরের দার্শনিকগণ হয় ইবনে সিনার ছাত্রদের ছাত্র নতুবা তাঁদের সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। তাঁরা হলেন :

1. আবুল আব্বাস ফাযল ইবনে মুহাম্মদ লুকারী মারভী: তিনি ছিলেন একাধারে দার্শনিক ও সাহিত্যিক। তাঁকে সাধারণত সাহিত্যিক আবুল আব্বাস লুকারী বলে অভিহিত করা হয়। তিনি বাহমানইয়ারের ছাত্র। তাঁর রচিত প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো বায়ানুল হাক্ব বি জিমানিস সিদ্ক যা এখন পর্যন্ত বিদ্যমান থাকলেও মুদ্রিত হয়নি। তবে তাঁর এ গ্রন্থটি পরবর্তীকালের দার্শনিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। মোল্লা সাদরার আসফার গ্রন্থে ইলাহিয়াত অধ্যায়ে তাঁর নামোল্লিখিত হয়েছে। তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি ও ছাত্র প্রশিক্ষণে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। বায়হাকী তাঁর সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের উপসংহারে বলেছেন , লুকারীর মাধ্যমে দর্শন খোরাসানে প্রচারিত হয়।

মাহমুদ মুহাম্মদ খাদিরী (আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক) বাগদাদে অনুষ্ঠিত ইবনে সিনার সহস্র বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে পঠিত প্রবন্ধে311 উল্লেখ করেন , আবুল আব্বাস দীর্ঘজীবন লাভ করেছিলেন ,তবে তাঁর মৃত্যুর সঠিক সাল আমার জানা নেই। আমার ধারণা তিনি পঞ্চম হিজরী শতাব্দীর শেষাংশে মৃত্যুবরণ করেন।

আবদুর রহমান বাদাভী তাঁর তালিকাতে ইবনে সিনা গ্রন্থের 8 পৃষ্ঠায় বুরুক লেমেন হতে বর্ণনা করেছেন ,লুকারী ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর প্রথমদিকে 517 হিজরীতে মারা যান। তবে তিনি বারক লেমেনের সূত্রটি কি সে সম্পর্কে অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।

2. আবুল হাসান সাঈদ ইবনে হাব্বাতুল্লাহ্ ইবনে হুসাইন: ইবনে আবি আছিবায়াহ্ বলেছেন , তিনি চিকিৎসক হিসেবে শ্রেষ্ঠ হলেও দার্শনিক হিসেবে শ্রেষ্ঠতর ছিলেন। তিনি আবদান কাতিব এবং আবুল ফাযল কাতিফাতের ছাত্র ছিলেন। তাঁরা উভয়েই আবুল ফারাজ ইবনুত তাইয়্যেবের ছাত্র ছিলেন। তিনি ইহুদী ও খ্রিষ্টান ছাত্র গ্রহণ করতেন না। আল মুতাবার গ্রন্থের লেখক আবুল বারাকাত বাগদাদী প্রথম জীবনে ইহুদী ছিলেন। তিনি আবুল হাসানের গৃহের পেছনে বসে চতুরতার সাথে তাঁর পাঠ দান শুনতেন। এভাবে এক বছর চলার পর আবুল হাসান এরূপ ছাত্রের উপস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন ও তাঁর প্রতি করুণা প্রদর্শন করে পাঠে অংশগ্রহণের অনুমতি দেন।

ইবনে আবি আছিবায়াহ্ বলেছেন ,আবুল বারাকাত আবুল হাসান রচিত আত তালখিসুন নিযামী গ্রন্থটি তাঁর নিকটই শিক্ষা লাভ করেন।

এ গ্রন্থটি দর্শনের না চিকিৎসাশাস্ত্রের ওপর লিখিত তা আমার জানা নেই। সাঈদ ইবনে হাব্বাতুল্লাহ্ 495 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. হুজ্জাতুল হাক্ব আবুল ফাত্হ উমর ইবনে ইবরাহীম খাইয়ামী নিশাবুরী (খাইয়াম বা ওমর খৈয়াম নামে প্রসিদ্ধ): তিনি দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ ছিলেন। সম্ভবত কবিও ছিলেন। দুঃখজনকভাবে খাইয়াম দর্শন বা গণিতের কারণে প্রসিদ্ধি লাভ না করে কবিতার কারণে প্রসিদ্ধি পেয়েছেন ,অথচ তিনি বিশেষভাবে গণিতশাস্ত্রে স্মরণীয় অবদান রেখেছেন। খাইয়ামের নামে প্রচলিত কবিতাসমূহের অধিকাংশই তাঁর এমন এক চেহারা ফুটিয়ে তুলেছে যেন তিনি একজন সন্দেহবাদী ,দায়িত্বহীন ও নৈরাশ্যবাদী ব্যক্তি ছিলেন যা তাঁর প্রকৃত চরিত্রের সঙ্গে সংগতিশীল নয়। ফিজ্জেরাল্ড নামের যে ইংরেজ কবি তাঁর চতুর্পদী (রুবাঈ) কবিতাসমূহকে-তাকী যাদের বর্ণনানুযায়ী কোথাও কোথাও বিকৃত ও পরিবর্তন করে-(উচ্চমানের সাহিত্যরূপ দিয়ে ইংরেজিতে) অনুবাদ করেছেন তিনিই তাঁর এ মিথ্যা প্রসিদ্ধির কারণ হয়েছেন বলে মনে করা হয়। খাইয়াম প্রণীত দর্শন সম্পর্কিত কিছু পুস্তিকা এখনও বিদ্যমান রয়েছে যা তাঁর চিন্তার প্রকৃতিকে স্পষ্ট করে। ফার্স প্রদেশের বিচারক আবু নাসর মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহীম নাসভীর প্রতি প্রেরিত তাঁর উত্তর পত্রটির নাম কৌন ওয়া তাকলীফ । খাইয়াম এ পত্রে আবু নাসর কর্তৃক সৃষ্টি ,সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও ইবাদাতের দর্শন সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আবু নাসর খাইয়ামের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করেছেন যাতে তাঁকে জীবনসঞ্চারী বারির অধিকারী মেঘপুঞ্জের সঙ্গে তুলনা করেছেন এবং তাঁর উপরিউক্ত গ্রন্থের উত্তরসমূহকে অকাট্য বলেছেন।

খাইয়াম তাঁর এ পত্রে তাঁর শিক্ষক অথবা শিক্ষকের শিক্ষক ইবনে সিনার নির্দেশিত কাঠামোর ভিত্তিতে প্রশ্নগুলোর উত্তর দিয়েছেন। যদি কোন ব্যক্তি ইবনে সিনার প্রদত্ত এ সম্পর্কিত কাঠামোর রূপ সম্পর্কে অবহিত থাকেন তাহলে বুঝতে পারবেন খাইয়াম এ বিষয়ে কতটা যথার্থ চিন্তা করতেন। উক্ত পত্রে খাইয়াম ইবনে সিনাকে নিজ শিক্ষক হিসেবে উল্লেখ করে একজন দৃঢ়চেতা দার্শনিকের ন্যায় বিশ্বজগতে বৈপরীত্যের উপস্থিতি ও মন্দের অস্তিত্ব সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর প্রদান করেছেন। তিনি বলেন , আমি ও আমার শিক্ষক ইবনে সিনা এ বিষয়গুলোতে পর্যাপ্ত গবেষণা করে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি এবং সন্তুষ্ট হয়েছি। হয়তো কেউ তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে আমাদের দুর্বলতা মনে করতে পারে ,কিন্তু আমাদের মতে এ উত্তর সন্তোষজনক।

এ পত্রটি তাঁর আরো কিছু পত্রের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নে ছাপা হয়েছে। পূর্বে মিশরেও জামেউল বাদায়ী নামে এটি প্রকাশিত হয়েছিল। সোভিয়েত প্রকাশক দাবি করেছেন ,মিশরীয় প্রকাশক বিশ্বজগতে বৈপরীত্যের উপস্থিতি সম্পর্কিত পত্রটি কৌন ওয়া তাকলীফ নামক পত্র হতে স্বতন্ত্র পত্র বলে মনে করেছেন যা সঠিক নয় ;বরং ঐ পত্র এ পত্রটিরই অংশ।

ঘটনাক্রমে এ পত্রে যে সকল বিষয়ে খাইয়াম দৃঢ় সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাঁর নামে প্রচলিত কবিতায় সে সব বিষয়েই দ্বিধা প্রকাশিত হয়েছে। এ কারণেই কোন কোন ইউরোপীয় ও ইরানী গবেষক এ কবিতাগুলো খাইয়ামের নয় বলেছেন। কেউ কেউ ঐতিহাসিক দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে বিশ্বাস করেন খাইয়াম নামের দু ব্যক্তি ছিলেন। একজন কবি এবং অপরজন গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক। আবার কেউ মনে করেন একজনের নাম ছিল আলী খাইয়াম এবং তিনি ছিলেন কবি। অপরজনের নাম ছিল ওমর খাইয়ামী এবং তিনি দার্শনিক ও গণিতজ্ঞ ছিলেন।

কেউ কেউ বলেছেন ,খাইয়ামীর আরবী উচ্চারণ খাইয়াম এ কথাটি ঠিক নয়। কারণ স্বয়ং খাইয়াম তাঁর অস্তিত্ব সম্পর্কিত পুস্তিকায় আরবীতে তাঁর নাম আবুল ফাত্হ ওমর ইবরাহীম আল খাইয়ামী লিখেছেন।

তবে এটুকু নিশ্চিত যে ,তিনিও তাঁর মতো অনেক মনীষীর ন্যায় পূর্ণ ঈমান ও বিশ্বাস সত্ত্বেও বকধার্মিক ও বাহ্যিকভাবে ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার কারণে অসুবিধায় পড়েছিলেন। তাঁর সকল গ্রন্থই তাঁর প্রকৃত ধর্মপরায়ণতার স্বাক্ষর বহন করে ,এমনকি বিতর্কিত বলে কথিত নওরুয নামে গ্রন্থটিও।

বায়হাকী বলেছেন ,

তিনি ইবনে সিনার উত্তরসূরি ছিলেন বলা যায় যদিও তাঁর চরিত্রে কিছুটা সংকীর্ণতা এবং প্রশিক্ষণ ও লিখনে কৃপণতা লক্ষণীয়... এক দিন তিনি আবদুর রাজ্জাক ইবনুল ফাকীর পরামর্শদাতা শিহাবুল ইসলামের নিকট আগমন করলে বিশিষ্ট কারী আবুল হুসাইন গাজ্জালী কোরআনের কোন একটি আয়াতের বিষয়ে ক্বারীদের মধ্যে পঠন পদ্ধতির পার্থক্যের আলোচনা তুললেন। শিহাবুল ইসলাম বললেন: যখন জ্ঞানী ব্যক্তি আমাদের সামনে উপস্থিত তখন আমরা নিশ্চুপ থাকছি।... খাইয়াম পঠন পদ্ধতির পার্থক্যের বিভিন্ন রূপ ও সেগুলোর প্রতিটির পেছনে যুক্তি উপস্থাপন করে সকলকে তাক লাগিয়ে দিলেন । ইমাম আবুল ফাখর এতে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বললেন: আল্লাহ্ আলেমদের মধ্যে আপনার মতো ব্যক্তির সংখ্যা বৃদ্ধি করুন।

খাইয়ামের জন্মের তারিখ জানা যায়নি। তবে তাঁর মৃত্যুর সাল 517 অথবা 526 হিজরী বলা হয়ে থাকে। তিনি দীর্ঘ নব্বই বছর জীবিত ছিলেন বলা হয়। তদুপরি ইবনে সিনার নিকট তাঁর সরাসরি শিক্ষা লাভ করার বিষয়টি যথসম্ভব সঠিক নয়। তিনি ইবনে সিনাকে নিজ শিক্ষক হিসেবে স্বীয় গ্রন্থে যে সম্বোধন করেছেন তা এজন্য যে ,ইবনে সিনার গ্রন্থ ও চিন্তার পাঠশালায় শিক্ষাগ্রহণ করেছেন কিংবা সম্ভবত তিনি ইবনে সিনার ছাত্রের ছাত্র ছিলেন।

4. আবু হামিদ মুহাম্মদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আহমদ গাজ্জালী তুসী: অবশ্য তাঁকে পারিভাষিক অর্থে দার্শনিক বলাটা সঠিক হবে না। কারণ তিনি নিজেকে দার্শনিক মনে করেননি ;বরং দর্শনের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছিলেন ;বিশেষত ইবনে সিনার বিরুদ্ধে। তিনি কোন শিক্ষকের নিকট দর্শন পড়েননি। তিন বছর নিজে বিভিন্ন দর্শনের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেছেন। অতঃপর দর্শনের বিরুদ্ধে মাকাসিদুল ফালাসাফা এবং তোহফাতুল ফালাসাফা নামের দু টি গ্রন্থ রচনা করেছেন যা সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী গ্রন্থ।

ইসলামী বিশ্বে দর্শনের বিরোধী অনেকেই ছিলেন ,তবে তাঁদের কেউই গাজ্জালীর ন্যায় ক্ষুরধার ছিলেন না। যদি গাজ্জালীর নিকটবর্তী সময়ে সোহরাওয়ার্দী ও খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর মতো দার্শনিকের আবির্ভাব না ঘটত তাহলে গাজ্জালী দর্শনের মূলোৎপাটন করতেন। গাজ্জালীর দর্শনবিরোধী তৎপরতা সত্ত্বেও যেহেতু তাঁর বিভিন্ন মত দর্শনের বিবর্তনে কিছুটা হলেও ভূমিকা রেখেছিল সেহেতু তাঁকে আমরা দার্শনিকদের তালিকায় এনেছি। তিনি 450 হিজরীতে জন্ম ও 505 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। গাজ্জালীর প্রসিদ্ধতম গ্রন্থ হলো এহইয়ায়ে উলুমুদ্দীন । মুসলমানদের মধ্যে খুব কম গ্রন্থই এ গ্রন্থের ন্যায় প্রচারিত হয়েছে ও প্রভাব ফেলতে পেরেছে।

নবম স্তরের দার্শনিকগণ

1. শারাফুদ্দীন মুহাম্মদ ইলাকী: তিনি আবুল আব্বাস লুকারী ও ওমর খাইয়ামের ছাত্র। তিনি একাধারে দার্শনিক ও চিকিৎসক ছিলেন। কথিত আছে তিনি 536 হিজরীতে কাতওয়ানের যুদ্ধে নিহত হন। কেউ কেউ তাঁকে বাহমানইয়ারের ছাত্র বলেছেন। কিন্তু উভয়ের মৃত্যুর বছরের তুলনা করলে এ বক্তব্যের অসারতা প্রমাণিত হয়। ইলাকী আল বাসায়িরুন নাসিরিয়া গ্রন্থের লেখক কাজী যাইনুদ্দীন উমর ইবনে সাহলান সাভেজীর শিক্ষক।

2. আবুল বারাকাত হাব্বাতুল্লাহ্ ইবনে ইয়ালী মিলকায়ী বাগদাদী: তিনি ইহুদী ছিলেন ও পরবর্তীতে মুসলমান হন। তাঁর ইসলাম গ্রহণের কারণ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আমরা পূর্বে সাঈদ ইবনে হাব্বাতুল্লাহর নিকট তাঁর শিক্ষা লাভের বিবরণ দিয়েছি। দর্শনে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি হলো আল মুতাবার যা মোল্লা সাদরার মতো দার্শনিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। আবু বারাকাত দর্শনের বিভিন্ন বিষয়ে স্বতন্ত্র মত পোষণ করতেন। তিনি ইবনে সিনার বিরোধী ছিলেন। তাঁর শিক্ষকদের ক্রমধারা ফারাবী পর্যন্ত পৌঁছায়। কারণ তাঁর শিক্ষক ছিলেন সাঈদ ইবনে হাব্বাতুল্লাহ্ যিনি আবু ফাজল কাতিফাত ও আবদান কাতিবের ছাত্র। আবুল ফারাজ আবুল খাইর হাসান ইবনে আওয়ারের ছাত্র যিনি ইয়াহিয়া ইবনে আদী মানতেকীর শিষ্য এবং ইয়াহিয়া মানতেকী আবু নাসর ফারাবীর ছাত্র। কথিত আছে দার্শনিক ওমর খাইয়ামকে বলা হয়েছিল , আবুল বারাকাত বাগদাদী ইবনে সিনার মতকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন , সে ইবনে সিনার কথাই বুঝতে পারেনি তাই কিভাবে তা প্রত্যাখ্যান করবে। 312

তিনি আরবী অভিধান রচয়িতা ইবনুল ফাজলান ও ইবনুদ দাহান ,বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী মাহযাবউদ্দীন ও মুসলমানদের হাতে আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার ধ্বংসের গুজব রটনাকারী আবদুল লতিফ বাগদাদীর পিতার শিক্ষক ছিলেন। শেষ জীবনে তিনি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ও এই ছাত্রদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয় লিখতেন।313

3. মুহাম্মদ ইবনে আবি তাহের তাবাসী মুরুজী: তিনি লুকারীর ছাত্র ছিলেন। তাঁর পিতা মারভের প্রাদেশিক শাসনকর্তা এবং মাতা খাওয়ারেজমের অধিবাসী ছিলেন। তিনি 539 হিজরীতে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে সারাখসে মৃত্যুবরণ করেন।314

4. আফজাল উদ্দীন গিলানী উমর ইবনে গিলান: তিনিও লুকারীর ছাত্র। তাঁর সম্পর্কে পূর্ণ ইতিহাস জানা যায়নি। তিনি সাদরুদ্দীন সারাখসীর শিক্ষক ছিলেন। মুহাম্মদ খাদিরীর বর্ণনামতে ইমাম ফাখরে রাযী তাঁর আল মুহাসসেল গ্রন্থে তাঁর নাম স্মরণ করে তাঁর ওপর রহমতের দোয়া করেছেন। কথিত আছে তাঁর চিন্তা ইবনে সিনার চিন্তার বিরোধী ছিল। তিনি বিশ্বজগতের সৃষ্ট হওয়ার বিষয়ে একটি পুস্তিকা লিখেছেন। তিনি মারভের সেনাদলে 523 হিজরী পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন।

5. আবু বাকর মুহাম্মদ ইবনে ইয়াহিয়া ইবনুস সায়েগ আন্দালুসী: তিনি ইবনে বাজা নামে প্রসিদ্ধ এবং দর্শনের প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অন্যতম। তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত নাফস নামক পুস্তিকাটি সম্প্রতি315 পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর মুহাম্মদ সাফির হাসান মাসুমী সংকলন করে প্রকাশ করেছে। আবু বাকর 533 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি স্পেনের স্বনামধন্য মুসলিম দার্শনিক ইবনে রুশদের শিক্ষক ছিলেন।

6. আবুল হাকাম মাগরেবী আন্দালুসী: তিনি একাধারে দার্শনিক ,কবি ও চিকিৎসক ছিলেন। অবশ্য কবি বৈশিষ্ট্যের প্রভাব তাঁর মধ্যে অধিকতর লক্ষণীয়। তাঁর লেখায় দৃঢ়তার অভাব ছিল ,অধিকাংশ ক্ষেত্রে কৌতুক ও উপহাসের প্রবণতা লক্ষণীয়। তিনি বাহেলী আরব ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন আন্দালুসে (স্পেনে) থাকার পর প্রাচ্যে আসেন এবং মিশর ও সিরিয়ায় বসবাস শুরু করেন। তিনি 549 হিজরীতে মারা যান। তিনি শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীর শিক্ষকের শিক্ষক ইবনুস সালার শিক্ষক ছিলেন।

দশম স্তরের দার্শনিকগণ

1. সাদরুদ্দীন আবু আলী মুহাম্মদ ইবনে আলী ইবনুল হারেসান আল সারাখসী: তিনি আফজালউদ্দীন গিলানীর ছাত্র এবং ফরিদউদ্দীন দামাদের শিক্ষক। তাঁর সম্পর্কে সঠিকভাবে তেমন কোন তথ্য জানা যায়নি।

তিনি খাজা নাসিরউদ্দীন তুসীর শিক্ষকের শিক্ষক হিসেবে প্রসিদ্ধ। সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের উপসংহারে তাঁর সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে। মাহমুদ মুহাম্মদ খাদিরী খারিদাতুল কাছর গ্রন্থের লেখক হতে বর্ণনা করেছেন ,তিনি দর্শন ,ঘনজ্যামিতি ও হিসাববিজ্ঞানের ওপর বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি কিছুদিন বাগদাদে ছিলেন ও আবু মনসুর জাওয়ালিকীর (মৃত্যু 539 হিজরী) সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অতঃপর সারাখসে ফিরে আসেন। তিনি 545 হিজরীতে সম্ভবত যুবক বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

2. আবু বাকর মুহাম্মদ ইবনে আবদুল মালেক ইবনে তোফাইল আন্দালুসী: তিনি স্পেনের প্রসিদ্ধ মুসলিম দার্শনিক। সম্ভবত তিনি ইবনুস সায়েগের ছাত্র ছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধি মূলত হাই ইবনে ইয়াকজান গ্রন্থের মাধ্যমে যা ইবনে সিনার হাই ইবনে ইয়াকজানের প্রতি লিখিত পত্রের ব্যাখ্যা ও পূর্ণতাদানকারী পুস্তিকা। এই গ্রন্থটি ইরানে বদিউজ্জামান ফুরুজান কর্তৃক অনূদিত ও মুদ্রিত হয়েছে। আবু বাকর দীর্ঘ জীবন লাভ করেছিলেন ও 581 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. কাজী আবুল ওয়ালিদ মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে রুশদ আন্দালুসী: তিনি একাধারে দার্শনিক ,চিকিৎসক ও ফিকাহ্শাস্ত্রবিদ ছিলেন। এর প্রতিটি বিভাগেই তাঁর অনেকগুলো গ্রন্থ রয়েছে। দর্শনে তাঁর অ্যারিস্টটলের মা বাদাত তাবিয়িয়াত গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থটি প্রসিদ্ধ। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি হলো বিদায়াতুল মুজতাহিদ । তাঁর রচনা সমগ্র বোম্বাই হতে প্রকাশিত হয়েছে। ইউরোপীয়গণ দর্শনশাস্ত্রে ইবনে রুশদকে ইবনে সিনার সমকক্ষ মনে করেন। কিন্তু ইসলামী দর্শনে তাঁর মতের কোন মূল্যই নেই।

ইবনে রুশদের অন্যতম প্রসিদ্ধ গ্রন্থ তোহাফাতুল তোহাফাহ্ যা তিনি গাজ্জালীর তোহাফাতুল ফালাসাফা গ্রন্থের জাবাবে লিখেছেন। ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলের প্রতি অত্যন্ত অন্ধ ছিলেন। ইবনে সিনার সঙ্গে তাঁর পার্থক্য এই যে ,ইবনে সিনা অ্যারিস্টটলের প্রতি অন্ধ ছিলেন না ;বরং অনেক ক্ষেত্রেই নিজস্ব মতকে তাঁর ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছেন। সাইয়্যেদ জামালউদ্দীন আসাদাবাদীর (আফগানী) সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব (পরস্পর বিভিন্ন বিষয়ে বিতর্কে লিপ্ত হয়েছিলেন) ফরাসী দার্শনিক আর্নেস্ট রেনান ইবনে রুশদ সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণা করেছেন। ইবনে রুশদ 595 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

4. মাজদুদ্দীন জিলী: এ ব্যক্তি সম্পর্কে আমার তেমন কিছু জানা নেই। শুধু এতটুকু অবহিত হয়েছি যে ,তিনি মারাগে নামক স্থানে পাঠ দান করতেন ও ইমাম ফাখরে রাযী তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।316 শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দীও তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রথমদিকে মারাগেতে তাঁর ছাত্র ছিলেন।317 সম্ভবত তিনি কালামশাস্ত্র ,দর্শন ,ফিকাহ্ ও উসূলশাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। ইয়াকুত তাঁর মুজামুল উদাবা গ্রন্থে সোহরাওয়ার্দীর জীবনী আলোচনায় তাঁকে ফকীহ্ ,কালামশাস্ত্রবিদ ও উসূলবিদ বলে উল্লেখ করেছেন।318

5. কাজী যাইনুদ্দীন উমর ইবনে সাহলান সাভেজী: তিনি ইবনে সাহলান নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ইরানের সাভেতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি নিশাবুরে জীবনযাপন করতেন । গ্রন্থ নকলের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতেন। সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের বর্ণনামতে তিনি দর্শন ও শরীয়তকে (ফিকাহ্শাস্ত্র) এক গ্রন্থে সমন্বিত করেছিলেন। পূর্বোল্লিখিত ব্যক্তিত্ব শারাফুদ্দীন ইলাকী তাঁর শিক্ষক ছিলেন। কথিত আছে যে ,তিনি ইবনে সিনার রিসালাতুত তায়ের গ্রন্থটি ফার্সীতে অনুবাদ ও ব্যাখ্যা দান করেন। তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো আল বাসাইরুন নাসিরিয়া যা মিশর হতে প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থটির যুক্তিবিদ্যা অংশটি যুক্তিবিদ্যার সর্বোত্তম গ্রন্থসমূহের একটি। সাওয়ানুল হিকমাহ্ গ্রন্থের পরিবর্ধনে বর্ণিত হয়েছে ,তাঁর উপরোক্ত গ্রন্থটি ব্যতীত অন্য সকল গ্রন্থ দুর্ঘটনায় ভস্মিভূত হয়েছিল। ইবনে সাহলান দর্শনের জীবন্ত ব্যক্তিত্বদের একজন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক তারিখ ও বর্ষ আমার জানা নেই ।

6. আবুল ফুতুহ নাজমুদ্দীন আহমাদ ইবনে মুহাম্মদ আস সারী: তিনি ইবনুস সালাহ্ নামে প্রসিদ্ধ। কেউ কেউ তাঁকে ইরানের হামেদানের অধিবাসী ,আবার কেউ ইরাকের ইউফ্রেটিস (ফোরাত) নদীর তীরবর্তী সামিসাতের অধিবাসী বলেছেন। তিনি সেখান হতে বাগদাদে যান ও আবুল হাকাম মাগরেবীর নিকট পড়াশোনা করেন। তিনি 548 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন (স্বীয় শিক্ষকের মৃত্যুর এক বছর পূর্বে)। তাঁর জন্মবছর আমার জানা নেই। তাঁকে নবম স্তরের দার্শনিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তাঁর শিক্ষক আবুল হাকাম মাগরেবী নিজের ওপর ইবনুস সালার শ্রেষ্ঠত্ব স্বীকার করেছেন। উল্লিখিত হয়েছে যে ,তিনি ইবনে সিনার শাফা ও ইবনে মাসকাভীর আল ফাওযুল আসগার গ্রন্থ দু টির ব্যাখ্যা লিখেছেন।

7. মুহাম্মদ ইবনে আবদুস সালাম আনসারী মারদিনী: তিনি তাঁর সময়ের শ্রেষ্ঠ দার্শনিক হিসেবে পরিগণিত ছিলেন। তাঁর জন্ম ফিলিস্তিনের বায়তুল মুকাদ্দাসের (কুদসের) নিকটবর্তী স্থানে। তাঁর পিতামাতা সেখানেই বাস করতেন। সম্ভবত তাঁর পূর্বপুরুষ মদীনার আনসার ছিলেন। তাঁর দর্শনের শিক্ষক ছিলেন ইবনুস সালাহ্। তিনি ইবনে সিনার প্রসিদ্ধ কাসীদা কাসীদায়ে আইনিয়া ব্যাখ্যা করেছেন। ইবনুল কাফতীর বর্ণনামতে শাহাবুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী কিছুদিন তার নিকট দর্শন শিক্ষা করেছিলেন। মারদিনী অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ ব্যক্তি ছিলেন। তিনি 594 হিজরীতে 82 বছর বয়সে প্রশান্ত মন নিয়ে স্রষ্টার নিকট প্রত্যাবর্তন করেন।

একাদশ স্তরের দার্শনিকগণ

1. ফাখরুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আমর ইবনুল হুসাইন আর রাযী (ফাখরে রাযী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি একাধারে ফকীহ ,কালামশাস্ত্রবিদ ,দার্শনিক ,মুফাসসির ,বক্তা এবং চিকিৎসক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী ছিলেন। বিভিন্ন জ্ঞানের গভীরতায় তাঁর জুড়ি মেলা ভার। যদিও তিনি দর্শনে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন ও এ সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থ রচনা করেছেন তদুপরি তাঁর চিন্তাধারা কালামশাস্ত্রীয় ,দার্শনিক নয় ;বরং তিনি দর্শনের ওপর ক্ষুরধার আক্রমণ করেছেন ও দর্শনের বিভিন্ন সন্দেহাতীত বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করেছেন। তাঁর বিন্যাস ,বাচনভঙ্গী ও উপস্থাপন ক্ষমতা অত্যন্ত সুন্দর ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সাদরে মুতাআল্লেহীন এ ক্ষেত্রে তাঁর নিকট থেকে অনেক কিছু নিয়েছেন। তাঁর প্রসিদ্ধ দর্শন গ্রন্থ আল মাবাহিসুল মাশরেকীয়া । তাঁর পরিচিতি সবচেয়ে বেশি মাফাতিহুল গাইব নামের তাফসীর গ্রন্থের মাধ্যমে যা কোরআনের তাফসীর গ্রন্থসমূহের মধ্যে একটি বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। দর্শনে তাঁর একমাত্র শিক্ষক ছিলেন মাজদুদ্দীন জিলী (জাইলী)। সম্ভবত এ শাস্ত্রে তাঁর পাণ্ডিত্য অধিক পঠন ও অধ্যয়নের মাধ্যমে। তবে তাঁর কিছু সংখ্যক প্রসিদ্ধ ছাত্র ছিল ,যেমন শামসুদ্দীন খসরুশাহী ,কুতুবুদ্দীন মিশরী ,যাইনুদ্দীন কাশী ,শামসুদ্দীন খুয়ী এবং শাহাবউদ্দীন নিশাবুরী। ফখরুদ্দীন রাযী 534 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং 606 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. শেখ শাহাবুদ্দীন ইয়াহিয়া ইবনে হাবাশ ইবনে মিরাক সোহরাওয়ার্দী যানজানী: তিনি শেখ ইশরাক নামে প্রসিদ্ধ। তিনি নিঃসন্দেহে তাঁর সময়ের বিরলতম প্রতিভা। তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধিবৃত্তি ,ক্ষুরধার মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি ছিল। দর্শনের ইশরাকী ধারার (প্লেটোনিক ধারার ইসলামীরূপ) চিন্তা তাঁর পূর্বের ফারাবী ও ইবনে সিনার মধ্যে বিদ্যমান থাকলেও যে ব্যক্তি এ ধারার দর্শনের প্রবক্তা হিসেবে আবির্ভূত হন ও মাশশায়ী বা অ্যারিস্টটলীয় ধারার ইসলামীরূপ হতে সম্পূর্ণ পৃথক ধারা হিসেবে এর জন্ম দেন তিনি হলেন সোহরাওয়ার্দী। কেউ কেউ এ দু য়ের পার্থক্য অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর চিন্তাধারার পার্থক্য মনে করলেও বস্তুত অ্যারিস্টটলীয় ধারার ইসলামীরূপ (মাশশায়ী) হতে ইশরাকী ধারার পার্থক্যে অনেক স্বাতন্ত্র্য রয়েছে যা সোহরাওয়ার্দীর নিজস্ব উদ্ভাবন ও সৃষ্টি। তিনি মাজদুদ্দীন জাইলীর নিকট মারাগেতে ,জহিরুদ্দীন ক্বারীর নিকট ইসফাহানে ও ফাখরুদ্দীন মারদিনীর নিকট ইরাকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন। তিনি কিছুদিন মারদিনীর একান্ত সান্নিধ্যে ছিলেন। মারদিনী তাঁর সম্পর্কে বলেছেন , বুদ্ধির তীক্ষ্ণতা ,মনোযোগ ও একাগ্রতার ক্ষেত্রে তাঁর মতো কাউকে দেখিনি। আমি তাঁর জীবনের ব্যাপারে আশংকা করছি। 319 বলা হয়ে থাকে ,তিনি ইবনে সাহলানের আল বাসাইরুন নাসিরিয়াহ গ্রন্থটি জহিরউদ্দীন ক্বারীর নিকট পড়েছেন।

সোহরাওয়ার্দী অন্যান্য জ্ঞানের সঙ্গে ফিকাহ্শাস্ত্রেও পণ্ডিত ছিলেন । তিনি সিরিয়া ও হালাব গিয়েছিলেন ও হালাবের হালাভীয়া মাদ্রাসার শিক্ষক শেখ ইফতিখারউদ্দীনের নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র পড়েন। তিনি এ শাস্ত্রে তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সক্ষম হন ও শিক্ষকের বিশেষ দৃষ্টি ও নৈকট্য লাভ করেন। তাঁর প্রশংসা ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বিষয়টি সালাহউদ্দীন আইউবীর পুত্রের (আল মুলকুয যাহিরের) নজরে পড়ে। তিনি বিভিন্ন কালামশাস্ত্রবিদ ও ফকীহ্দের ডেকে তাঁর সঙ্গে বিতর্ক সভার প্রচলন করেন। তাঁর উপস্থিতিতে এ সকল সভায় সোহরাওয়ার্দী নির্ভীকতার সাথে সকলকে পরাস্ত করেন। এ বিষয়টি তাঁদের বিদ্বেষের কারণ হয় ও তাঁরা সালাউদ্দীন আইউবীর কান ভারী করে তাঁকে হত্যায় প্ররোচিত করেন। ফলে তিনি তাঁর পুত্রকে নির্দেশ দেন এ মহান আলেমকে হত্যা করার জন্য। ফলে তিনি বাধ্য হয়ে তাঁকে হত্যা করেন। তিনি মাত্র 36 বছর বয়সে 586 হিজরীতে অথবা 38 বছর বয়সে 587 হিজরীতে নিহত হন।

কথিত আছে ফখরুদ্দীন রাযী তাঁর সহপাঠী ছিলেন। সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর তাঁর রচিত তালভীহাত গ্রন্থটি ফখরুদ্দীন রাযীকে দেয়া হলে তিনি তা চুম্বন করে নিজ সহপাঠীর কথা স্মরণ করে ক্রন্দন করেছিলেন।

সোহরাওয়ার্দী বিভিন্ন কালামশাস্ত্রবিদ ও ফকীহ্দের সঙ্গে বিতর্কে শুধু বেপরোয়াই ছিলেন না ;বরং আক্রমণাত্মক বিতর্কে জড়াতেন। সম্ভবত বয়সের অপরিপক্বতার কারণে এতটা বেপরোয়া ছিলেন যে ,দর্শনের এমন অনেক তত্ত্ব যা সর্বসম্মুখে উপস্থাপন করা অনুচিত-যেরূপ ইবনে সিনা তাঁর ইশারাত গ্রন্থের পবিশেষে বলেছেন-তিনি তা প্রকাশ্যে করতেন। তাঁর শিক্ষক মারদিনী পূর্বেই তাঁর বিষয়ে আশংকা করেছিলেন। তাই যখন তাঁর নিহত হওয়ার সংবাদ তাঁর নিকট পৌঁছে তখন তিনি বলেন , আমি যা আশংকা করেছিলাম তাই ঘটেছে। সোহরাওয়ার্দীর ব্যাপারে অনেকে তাই বলেন ,তাঁর জ্ঞান তাঁর বুদ্ধিবৃত্তির ওপর প্রাধান্য লাভের ফলেই এমনটি হয়েছে।

3. আফজালউদ্দীন মারকী কাশানী: তিনি বাবা আফজাল নামে প্রসিদ্ধ। তিনি যদিও একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব তদুপরি তাঁর সঠিক জীবনেতিহাস জানা যায়নি। তিনি আরবী ও ফার্সী ভাষায় প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন যার তালিকা সম্প্রতি মুজতাবা মিনুয়ী ও ডক্টর ইয়াহিয়া মাহদাভী কর্তৃক প্রকাশিত হয়েছে। ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশন হতে এনসাইক্লোপেডিয়া অব পারসিয়ান -এর ফার্সী অনুবাদে উল্লিখিত হয়েছে , আফজালউদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন কাশানী একজন ইরানী আরেফ ও কবি। এক বর্ণনামতে তিনি 582 অথবা 592 হিজরীতে কাশানের মারকে গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং 654 অথবা 664 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।... তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর ঘনিষ্ঠ ছিলেন। দেহখোদা ফার্সী অভিধান এবং গাজ্জালী নামেহ গ্রন্থে তাঁর মৃত্যু 707 হিজরী বলা হয়েছে। কেউ কেউ তাঁর মৃত্যু 666 অথবা 667 বলেছেন।

দাওয়াতুত তাকরীব গ্রন্থে মাহমুদ খাদিরীর লেখা আফজালউদ্দীন আর কাশানী ফিলসুফুন মাগমুরুন নামক প্রবন্ধে মুখতাছার ফি যিকরিল হোকামাউল ইউনানী ওয়াল মুসলিমীন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর মৃত্যু 610 হিজরী বলা হয়েছে।

ফালাসাফায়ে ইরানী গ্রন্থে মাহমুদ খাদিরীর প্রবন্ধ ও সাঈদ নাফিসীর ভূমিকা হতে খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর শারহে ইশারাত গ্রন্থের কিয়াস অধ্যায়ে আলোচনায় উল্লিখিত প্রমাণ উপস্থাপন করে বলা হয়েছে আফজালউদ্দীনের মৃত্যু 667 হিজরীর অনেক পূর্বে হয়েছিল। কারণ শারহে ইশারাত গ্রন্থটি খাজা নাসিরুদ্দীন 624-644 হিজরীর মাঝামাঝি সময়ে লিখেছেন এবং তাতে আফজালউদ্দীনের নাম উল্লেখ করে রহমত উল্লাহ্ লিখেছেন যা হতে বোঝা যায় ইতোপূর্বেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন। খাজা নাসিরুদ্দীন বাবা আফজালের প্রশংসায় নিম্নোক্ত চতুষ্পদী কবিতাটি রচনা করেন :

যদি আসমানের স্রষ্টা অনুমতি দেন বলার ,

কে সর্বোত্তম জ্ঞানী ও জ্ঞানের ভাণ্ডার।

সকল ফেরেশতা তাসবীহ না করে বলবেন ,

তিনি হলেন আফজাল ,আফজাল।

সারগুজাশত ওয়া আকায়েদে ফালসাফীয়ে খাজা নাসিরুদ্দীন তুসী গ্রন্থে স্বয়ং খাজা নাসিরুদ্দীন তুসী হতে বর্ণিত হয়েছে , আমার পিতা আমাকে বিভিন্ন জ্ঞানান্বেষণে এবং বিভিন্ন মাযহাব ও মতের কথা শ্রবণে উদ্বুদ্ধ করতেন। আমার পিতার সঙ্গে আফজালউদ্দীন কাশানী (রহ.)-এর ছাত্র কামালউদ্দীন মুহাম্মদের পরিচিতি ও বন্ধুত্ব ছিল। তিনি আফজালউদ্দীনের নিকট গণিত ও অন্যান্য শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেছিলেন। আমার পিতা আমাকে তাঁর নিকট গণিতশাস্ত্র শিক্ষার জন্য সমর্পণ করেন।

উপরিউক্ত বক্তব্য হতে বুঝা যায় খাজা নাসিরুদ্দীন আফজালউদ্দীনের ছাত্রের ছাত্র ছিলেন। তাই তিনি খাজা নাসিরুদ্দীনের নিকটতম ব্যক্তি হওয়ার বিষয়টি সঠিক নয় ;বরং সঠিক হলো বাবা আফজালের মৃত্যু 606 বা 610 হিজরীতে ঘটেছিল।

দ্বাদশ স্তরের দার্শনিকগণ

1. ফরিদউদ্দীন দামাদ নিশাবুরী: তাঁর জীবনেতিহাস ,সঠিকভাবে জানা নেই। এতটুকু জানা যায় ,তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর শিক্ষক ছিলেন ও তুসী ইবনে সিনার ইশারাত গ্রন্থটি তাঁর নিকট পড়েছেন।320 ফরিদউদ্দীন সাদরুদ্দীন সারাখসীর ছাত্র ছিলেন। খাজা নাসিরুদ্দীনের শিক্ষকের ধারাবাহিকতা তাঁর মাধ্যমে ইবনে সিনা পর্যন্ত পৌঁছায়। কারণ খাজা তুসী ফরিদউদ্দীন দমাদের ছাত্র। তিনি সাদরুদ্দীন সারাখসীর ছাত্র ,তিনি আফজালউদ্দীন গিলানীর ছাত্র। তিনি আবুল আব্বাস লুকারীর ছাত্র ,তিনি বাহমানইয়রের ছাত্র এবং বাহমাইয়র ইবনে সিনার ছাত্র। তাঁর মৃত্যুর বছর আমাদের জানা নেই।

2. শামসুদ্দীন আবদুল হামিদ ইবনে ঈসা খসরুশাহী (শামসুদ্দীন খসরুশাহী নামে প্রসিদ্ধ): ইবনে আবি আছিবায়াহ্ তাঁকে আলেমদের ইমাম , দার্শনিকদের নেতা , মানুষের আদর্শ এবং ইসলামের সম্মান বলে উল্লেখ করেছেন।321 তিনি ফখরুদ্দীন রাযীর বিশিষ্ট ছাত্র। তিনি দর্শন ,চিকিৎসা ও ফিকাহ্শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থটির সংক্ষিপ্ত রূপ দিয়েছেন। দর্শনে তাঁর প্রসিদ্ধি কিছু প্রশ্নের উত্তরের মাধ্যমে যা তাঁর ছাত্র খাজা নাসিরুদ্দীন তাঁকে করেছিলেন ও দর্শন গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছিলেন।

3. কুতুবুদ্দীন ইবরাহীম ইবনে আলী ইবনে মুহাম্মদ সালামী: তিনি কুতুবুদ্দীন মিশরী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি ফখরুদ্দীন রাযীর ছাত্র ছিলেন। ইবনে আবি আছিবায়াহর মতে তিনি মরক্কোর অধিবাসী ,কিন্তু মিশরে বসবাস করতেন। তিনি সেখান হতে ইরানে চলে আসেন ও ফখরুদ্দীন রাযীর নিকট শিক্ষাগ্রহণ শুরু করেন। তিনি দর্শনে ফখরুদ্দীন রাযীকে দর্শনের ক্ষেত্রে ইবনে সিনার ওপর প্রাধান্য দিতেন এবং খ্রিষ্টান চিকিৎসক আবু সাহলকেও চিকিৎসাশাস্ত্রে ইবনে সিনার ওপর মনে করতেন। তিনি নিশাবুরে মোগলদের হামলার সময় নিহত হন। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসী ও ফখরুদ্দীন রাযীর ছাত্রের ছাত্র ছিলেন ।

4. কামালুদ্দীন ইউনুস মৌসেলী অথবা কামাল উদ্দীন ইবনে ইউনুস (ইবনে মানআ নামে প্রসিদ্ধ): ইবনে আবি আছিবায়াহ্ তাঁর সমকালীন ছিলেন ও তাঁকে প্রজ্ঞাবানদের নেতা আলেমদের ইমাম নামে অভিহিত করেছেন। তিনি মৌসেলের শিক্ষাকেন্দ্রে দর্শন পাঠ দান করতেন ও বেশ কিছু ছাত্রকে শিক্ষা দান করেছেন। রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থের বর্ণনামতে নাসিরুদ্দীন তুসী এ ব্যক্তির নিকটও কিছু পড়াশোনা করেছেন। উক্ত গ্রন্থের 5ম খণ্ডের 9 পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে ,তিনি আহলে সুন্নাতের প্রথম সারির আলেম ও দার্শনিকের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। তিনি আরবী ব্যাকরণশাস্ত্র ,ফিকাহ্ ,হাদীস ,তাফসীর ,চিকিৎসাবিদ্যা ,ইতিহাস ,সংগীত ,জ্যামিতি ,দর্শন ও জ্যোতির্বিদ্যায় সমকালীন মনীষীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। স্বল্প সময়ে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছিলেন ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অনেকেই তাঁর নিকট শিক্ষাগ্রহণের জন্য আসতেন ,এমনকি দূরবর্তী স্থান হতেও তাঁর নিকট ছাত্র ও মনীষীরা সমবেত হতেন।... তিনি 639 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

ত্রয়োদশ স্তরের দার্শনিকগণ

1. খাজা নাসিরুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনুল হোসাইন আত তুসী: তাঁকে মানবের শিক্ষক উপাধি দেয়া হয়েছে। আলাদাভাবে তাঁর পরিচয় দেয়ার তেমন প্রয়োজন নেই। দর্শনে তাঁর অবদান ও এ শাস্ত্রের বিবর্তনে তাঁর ভূমিকা তুলে ধরার জন্য স্বতন্ত্র গ্রন্থের প্রয়োজন। তিনি গণিতশাস্ত্রে বিশ্বের সীমিত সংখ্যক বিশেষ ব্যক্তিত্বের একজন। তিনি টলেমীর জ্যোতির্বিদ্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন মতের যুক্তিপূর্ণ সমালোচনার মাধ্যমে জ্যোতির্বিদ্যায় নতুন পথ উন্মোচন করেছিলেন। তাকী যাদের মতে নাসিরুদ্দীন তুসী তাঁর তাযকিরাহ্ গ্রন্থে টলেমীর যে সকল মতের ওপর সমালোচনা করেছেন তা কোপার্নিকাসের ওপর প্রভাব ফেলেছিল ও তিনি সে অনুযায়ী জ্যোতির্বিদ্যায় নতুন তত্ত্ব দিয়েছিলেন।

খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীরও ইবনে সিনার ন্যায় ঘটনাবহুল জীবন ছিল। তিনি তাঁর শারহে ইশারাত গ্রন্থে এ সকল দুঃখজনক ঘটনার কিছু মর্মবেদনা তুলে ধরেছেন। এতদসত্ত্বেও তিনি অনেক ছাত্রকে প্রশিক্ষিত ও অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি 597 হিজরীতে জন্ম ও 672 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2 আসিরুদ্দীন মুফাজ্জাল ইবনে উমর আবহারী : তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থের নাম হিদায়াহ্ যা প্রকৃতি ও স্রষ্টা বিষয়ের আলোচনায় বিশেষ স্থান লাভ করেছিল। এ গ্রন্থটি কাজী হুসাইন মাইবাদী ও সদরুল মুতায়াল্লেহীন ( মোল্লা সাদরা ) ব্যাখ্যা করেছেন। বিশে ষত মোল্লা সাদরার ব্যাখ্যাগ্রন্থটি তাঁকে ও গ্রন্থটির বিশেষ পরিচিতি দান করেছে। আল্লামা হিল্লীর জাওহারুন নাদিদ গ্রন্থের 78 পৃষ্ঠায় বিপরীত ঋণাত্মক আংশিক উক্তির ( Opposite Negative Particular Proposition )আলোচনায় ঋণাত্মক আংশিক উক্তির বিপরীত উক্তি নেই বলে উল্লেখ করে বলা হয়েছে , এর ব্যতিক্রম শুধু বিশেষ শর্তাধীন ও সাধারণ উক্তির ক্ষেত্রে দেখা যায়। বলা হয় যুক্তিবিদ্যার এ নীতিটি আসিরুদ্দীন মুফাজ্জাল ইবনে উমর আবহারী উদ্ঘাটন করেন। আসিরুদ্দীন ইমাম ফাখরুদ্দীন রাযীর ছাত্র ছিলেন।

3. নাজমুদ্দীন আলী ইবনে উমর কাতেবী কাযভীনী: তিনি দাবিরান নামে প্রসিদ্ধ এবং প্রথম সারির দার্শনিক ,যুক্তিবিদ ও গণিতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত। দর্শনে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি হলো হিকমাতুল আইন যার অসংখ্য ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচিত হয়েছে। যুক্তিবিদ্যায় তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ শামসীয়াহ্ যা খাজা শামসুদ্দীন সাহেব দিওয়ান জুয়াইনীর নামে উৎসর্গ করে লিখিত এবং গ্রন্থটি কুতুবুদ্দীন রাযী ব্যাখ্যা করেছেন। মূল গ্রন্থ ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ দু টিই যুক্তিবিদ্যার ছাত্রদের পাঠ্য। কাতেবী আল্লামা হিল্লী ও কুতুবুদ্দীন শিরাজীর শিক্ষক ছিলেন। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর সহায়তায় মারাগেতে একটি মানমন্দির তৈরি করেন। তিনি 675 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

চতুর্দশ স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরের দার্শনিকগণ সকলেই নাসিরুদ্দীন তুসীর ছাত্র ছিলেন। তাঁরা হলেন :

1. হাসান ইবনে ইউসুফ ইবনে মুতাহ্হার হিল্লী (আল্লামা হিল্লী নামে প্রসিদ্ধ): যদিও আল্লামা হিল্লী ফিকাহ্শাস্ত্রে সর্বাধিক পরিচিত তদুপরি তিনি যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে পূর্ণ অভিজ্ঞ ছিলেন এবং এ দু শাস্ত্রে গ্রন্থ রচনা করেছেন। আমরা ফকীহ্দের আলোচনায় ইসলামী ইতিহাসের অন্যতম বিরল এই ব্যক্তিত্বের বিষয়ে উল্লেখ করেছি। আল্লামা হিল্লী আরব ছিলেন এবং কাতেবী ও খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর ছাত্র ছিলেন। তিনি 648 হিজরীতে জন্মগ্রহণ এবং 711 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. কামালউদ্দীন মাইসাম ইবনে মাইসাম বাহরানী: তিনি ইবনে মাইসাম বাহরানী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি একাধারে ফকীহ্ ,সাহিত্যিক ও দার্শনিক ছিলেন। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর নিকট দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা করেন। কারো কারো মতে নাসিরুদ্দীন তুসীও এর বিপরীতে তাঁর নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষা করেন।322 ইবনে মাইসাম হযরত আলীর বাণী নাহজুল বালাগা র ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর এ ব্যাখ্যাগ্রন্থটি নাহজুল বালাগার শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত। সম্প্রতি পাঁচ খণ্ডে এটি প্রকাশিত হয়েছে। তিনি 678 অথবা 679 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। আজ্জররিয়া গ্রন্থের লেখকের মতে তিনি 699 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন।323

3. কুতুবুদ্দীন মাহমুদ ইবনে মাসউদ ইবনে মুছলেহ শিরাজী (কুতুবুদ্দীন শিরাজী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি কাতেবী কাযভীনির নিকট যুক্তিবিদ্যা এবং খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর নিকট দর্শন ও চিকিৎসাবিদ্যা পড়াশোনা করেন। তিনি ইবনে সিনার চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কিত গ্রন্থ কানুন এবং সোহরাওয়ার্দীর দর্শন গ্রন্থ হিকমাতুল ইশরাক ব্যাখ্যা করেন। তিনি দর্শনের প্রকারভেদ নিয়ে ফার্সীতে দুররাতুত তাজ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর এ তিনটি গ্রন্থই বেশ মূল্যবান। তাঁর প্রসিদ্ধি মূলত দর্শনের হিকমাতুল ইশরাক গ্রন্থের ব্যাখ্যাকারক হিসেবে। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীকে মারাগেতে মানমন্দির তৈরিতে সহযাগিতা করেছিলেন। তিনি 710 অথবা 716 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন ।

4. হাসান ইবনে মুহাম্মদ ইবনে শারাফ শাহ আলাভী হুসাইনী আসতারাবাদী: তিনি ইবনে শারাফ শাহ নামে পরিচিত। তিনি মারাগেতে খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর নিকট পড়াশোনা করেন ও তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ছিলেন। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর মৃত্যুর পর মৌসেলে যান এবং সেখানকার নুরীয়া মাদ্রাসায় দর্শন শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি নাসিরুদ্দীন তুসীর তাজরীদ গ্রন্থে টীকা সংযোজন করেন ও কাওয়ায়েদুল আকায়েদ গ্রন্থের ব্যাখ্যা করেন। তিনি 717 অথবা 718 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

পঞ্চদশ স্তরের দার্শনিকগণ

1. কুতুবুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আবি জাফর রাযী: তিনি কুতুবুদ্দীন রাযী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি একজন যুক্তিবিদ ,দার্শনিক ,ফকীহ্ এবং ইসলামের অন্যতম প্রসিদ্ধ মনীষী। তিনি আল্লামা হিল্লীর নিকট পড়াশোনা করেছেন এবং তিনি তাঁকে (কুতুবুদ্দীন) তাঁর নিকট হতে হাদীস বর্ণনার অনুমতি দিয়েছিলেন। শহীদে আউয়াল (মুহাম্মদ ইবনে মাক্কী) তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর (রাযী) নিকট থেকে হাদীস বর্ণনার অনুমতি নিয়েছিলেন। শহীদে আউয়াল তাঁর অসাধারণ জ্ঞানের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি ,কুতুবুদ্দীন রাযী কাতেবী কাযভীনীর শামসীয়াহ্ গ্রন্থটি ব্যাখ্যা করেছেন যা যুক্তিবিদ্যার ছাত্রদের পাঠ্য। তিনি দর্শনে মুহাকিমাত নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন যাতে দর্শনের দু দিকপাল ও ইবনে সিনার আল ইশারাত গ্রন্থের দু ব্যাখ্যাকারের (ফখরুদ্দীন রাযী ও নাসিরুদ্দীন তুসীর) মতামতের পর্যালোচনা ও বিচার করেছেন। তিনি যুক্তিবিদ্যায় কাজী সিরাজউদ্দীন আরমাভীর মাতালিউল আনওয়ার রচিত গ্রন্থটি ব্যাখ্যা করেছেন যা শারহে মাতালী নামে প্রসিদ্ধ। বর্তমানে এ গ্রন্থটি ধর্মীয় শিক্ষাঙ্গনগুলোতে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে প্রচলিত। যদিও কুতুবুদ্দীন রাযী তাঁর উপরোক্ত তিন গ্রন্থের জন্য প্রসিদ্ধ তদুপরি তার অন্যান্য গ্রন্থও রয়েছে। তিনি 766 অথবা 776 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. শামসুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে মুবারাক শাহ মারভী (মিরাক বুখারায়ী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি কাতেবী কাযভীনীর হিকমাতুল আইন গ্রন্থটি ব্যাখ্যা করেছেন। এ কারণে দর্শন গ্রন্থসমূহের অনেক স্থানেই তাঁকে হিকামাতুল আইন ব্যাখ্যাকারী নামে উল্লেখ করা হয়। তাঁর রচিত ব্যাখ্যাগ্রন্থের সঙ্গে মীর সাইয়্যেদ শারিফ জুরজানী টীকা সংযোজন করেছেন। মিরাক বুখারায়ীর মৃত্যু সম্পর্কে জানা যায়নি।

3. কাজী এ দ্দুদ্দীন আবদুর রহমান আইজী শিরাজী: তিনি একাধারে দার্শনিক ,কালামশাস্ত্রবিদ ও উসূলী324 ছিলেন। উসূলশাস্ত্র ,দর্শন ও কালামশাস্ত্রে তাঁর কোন কোন মত উপস্থাপিত হয়ে থাকে। তাঁর মুয়াফিক নামের প্রসিদ্ধ গ্রন্থটি কালামশাস্ত্রের নামে প্রসিদ্ধ হলেও তা দর্শন নির্ভর। আমরা জানি খাজা নাসিরুদ্দীনের পরবর্তী সময় হতে বিশেষত খাজার তাজরীদ গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে কালামশাস্ত্র দর্শনের অনেক নিকটে চলে আসে অর্থাৎ কালামশাস্ত্রের লক্ষ্য কালামশাস্ত্রের নীতিতে প্রমাণিত ও বাস্তবায়িত না হয়ে দর্শনের নীতিতে প্রমাণিত ও ব্যাখ্যাত হতে শুরু করে এবং স্রষ্টাতত্ত্বের দর্শনের সার্বিক ও আংশিক বিষয়সমূহ কালামশাস্ত্রের গ্রন্থসমূহে আলোচিত হতে থাকে। এ দৃষ্টিতে মুয়াফিক গ্রন্থটি বেশ উপযুক্ত। মীর সাইয়্যেদ শারিফ জুরজানী এ গ্রন্থটিরও ব্যাখ্যা করেছেন যা মূল অংশসহ পুনঃপুন মুদ্রিত হয়েছে। কাজী এ দ্দুদ্দীন বেশ কিছু ছাত্রকে প্রশিক্ষণ দান করেছেন। যেমন সাদুদ্দীন তাফতাযানী ,শামসুদ্দীন কেরমানী ,সাইফুদ্দী আবহারী প্রমুখ। তিনি 700 অথবা 701 হিজরীতে জন্ম এবং 756 অথবা 760 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

ষোড়শ স্তরের দার্শনিকগণ

1. সা দুদ্দীন মাসউদ ইবনে উমর ইবনে আবদুল্লাহ্ তাফতাযানী: তিনি মোল্লা সা দ তাফতাযানী নামে প্রসিদ্ধ। তাঁর পরিচিতি মূলত কালামশাস্ত্র ও ভাষার অলংকারশাস্ত্রে। তিনি সার্বিকভাবে বিভিন্ন জ্ঞান সম্পর্কে জানতেন এবং দর্শন সম্পর্কেও তাঁর মোটামুটি জ্ঞান ছিল। তিনি সংক্ষিপ্ত ও অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় যুক্তিবিদ্যা সম্পর্কিত একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন যার নাম তাহযীবুল মানতেক । এ গ্রন্থটি তৎকালীন সময় হতে এখন পর্যন্ত দীনী শিক্ষাঙ্গনসমূহের পাঠ্য পুস্তক হিসেবে প্রচলিত। তাফতাযানী অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন যে ,মোগলদের আক্রমণের পর তিনি ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারের অনেক জ্ঞান নিজ স্মরণ শক্তির সাহায্যে নতুন করে সুন্দর ভাষায় লিখেন। আমরা বিভিন্ন স্তরের দার্শনিকদের নিয়ে যে আলোচনা করছি তা শুধু দর্শনে নিজস্ব মতের অধিকারী ব্যক্তিদের নিয়ে নয় ;বরং যে সকল ব্যক্তি দর্শন সম্পর্কে অবহিত ছিলেন ও এ শাস্ত্রকে পরবর্তী স্তরে পৌঁছে দিতে ভূমিকা রেখেছেন আমরা তাঁদেরকেও এ দলে অন্তর্ভুক্ত করেছি। তাফতাযানী যুক্তিবিদ্যায় এমনই একজন ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি 712 অথবা 722 হিজরীতে নাসা শহরের নিকটবর্তী এক গ্রামে জন্মগ্রহণ এবং 792 অথবা 793 হিজরীতে সারাখসে মৃত্যুবরণ করেন। কারো কারো মতে তিনি সামারকান্দে মারা যান ;অতঃপর তাঁর মরদেহ সারাখসে স্থানান্তরিত করা হয়।

2. সাইয়্যেদ আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আলী জুরজানী: তিনি মীর সাইয়্যেদ শারিফ জুরজানী নামে প্রসিদ্ধ। তাঁকে গবেষক বা মুহাক্কেক শারিফ নামে অভিহিত করা যথার্থ হয়েছে। তিনি গবেষণায় সূক্ষ্মদর্শী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দর্শন শিক্ষা দিতেন এবং এ শাস্ত্রে অনেক ছাত্রকে শিক্ষাদান করেছেন। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। মুহাক্কেক শারিফের বিপুল সংখ্যক মূল্যবান রচনা রয়েছে। কাজী নুরুল্লাহর মতে মুহাক্কেক শারিফের পরবর্তী প্রজন্মের সকল মুসলিম আলেম ও মনীষী তাঁর পরিবারের সদস্য ও মেহমান। তিনি প্রচুর টীকা ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন। যেমন দর্শনে শারহে হিকমাতুল আইন গ্রন্থের টীকা সংযোজিত গ্রন্থ ;যুক্তিবিদ্যায় শারহে মাতালিই শামসিয়াহ্ গ্রন্থদ্বয়ে টীকা সংযোজন ;বাগ্মিতা ও অলংকারশাস্ত্রে তাফতাযানীর মুতাওয়াল গ্রন্থের এবং সাক্কাকীর মিফতাহুল ইলম গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ ,যামাখশারীর অলংকারশাস্ত্রভিত্তিক তাফসীর গ্রন্থ কাশশাফ -এর টীকাগ্রন্থ ;কালামশাস্ত্রে এ দ্দুদ্দীনের মুয়াফিক গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রভৃতি। মীরের শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো তারিফাত যা তারিফাতে জুরজানী নামে পরিচিত। যুক্তিবিদ্যায় তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো কুবরা যা ফার্সীতে লিখিত। আরবী ব্যাকরণের সারফ বা শব্দগঠনের ওপর তাঁর রচিত সারফে মীর গ্রন্থটি এ শাস্ত্রের প্রাথমিক ছাত্রদের জন্য অত্যন্ত উপযোগী যা ফার্সী ভাষায় লিখিত ও তাঁর সময় থেকেই ছাত্রদের পাঠ্যগ্রন্থ।

মীর সাইয়্যেদ শারিফ কুতুবুদ্দীন রাযীর ছাত্র। যদিও তিনি জুরজানের অধিবাসী ছিলেন ,কিন্তু শিরাজে বসবাস করতেন। রওযাত গ্রন্থে মাজালিসুল মুমিনীন গ্রন্থসূত্রে বর্ণিত হয়েছে তখন বাদশাহ সুজা ইবনে মুজাফফার গোরগানে সাইয়্যেদ শারিফের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁকে নিজের সঙ্গে শিরাজে নিয়ে যান এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুশ শিফা মাদ্রাসার দায়িত্ব তাঁর হাতে অর্পণ করেন। আমীর তৈমুর লং শিরাজ অধিকার করলে মীরকে সামারকান্দে নিয়ে যান। তিনি সেখানে সাদুদ্দীন তাফতাযানীর সঙ্গে বিতর্ক করেন। তৈমুর লংয়ের মৃত্যুর পর তিনি পুনরায় শিরাজে ফিরে আসেন এবং আমরণ সেখানে ছিলেন। মীর সাইয়্যেদ শারিফ বিশ বছর বয়স হতেই শিক্ষা দান ও গবেষণার কাজে ব্রত হন। তিনি দর্শনশাস্ত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তাঁর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত ক্লাসসমূহে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জ্ঞানী ব্যক্তির সমাবেশ ঘটত।

কথিত আছে যে ,তাঁর ক্লাসে অংশগ্রহণকারী ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন খাজা লিসানুল গাইব হাফেয শিরাজী। যদি কেউ তাঁর ক্লাসে কবিতা পাঠ করত তাহলে তিনি বলতেন , অনর্থক এ বিষয়গুলো বাদ দিয়ে দর্শন চর্চা কর। কিন্তু যদি শামসুদ্দীন মুহাম্মদ হাফেয শিরাজী কবিতা পাঠ করতেন তাহলে তিনি বলতেন , তোমার ওপর কি ইলহাম হয়েছে আমাকে শোনাও। একটি গজল আবৃতি কর। এতে অন্য ছাত্ররা প্রতিবাদ করে বলত , আমাদেরকে আপনি কবিতা পাঠ করতে নিষেধ করেন ,অথচ হাফিযের কবিতা শোনার আগ্রহ কেন ব্যক্ত করেন ? তিনি জবাবে বলতেন , হাফিযের সকল কবিতাই হাদীসে কুদসী ,ইলহাম ,কোরআনের সুন্দর ও লক্ষণীয় বিষয়সমৃদ্ধ যা সূক্ষ্ম প্রজ্ঞা সমন্বিত। 325

মীর সাইয়্যেদ শারিফ 740 হিজরীতে গোরগানে (জুরজান) জন্মগ্রহণ এবং 816 হিজরীতে শিরাজে মৃত্যুবরণ করেন।326

সপ্তদশ স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরের অধিকাংশ ব্যক্তিত্বই মুহাক্কেক শারিফের ছাত্র ও তাঁর চিন্তাধারার প্রচারক। যেমন :

1. মুহিউদ্দীন গুশকিনারী: তিনি মীর সাইয়্যেদ শারিফ জুরজানীর ছাত্র ও মুহাক্কেক দাওয়ানীর শিক্ষক। তাঁর জন্ম ও মৃত্যু সাল সম্পর্কে আমার জানা নেই।

2. খাজা হাসান শাহ বাক্কাল: তিনি ও মুহাক্কেক শারিফের ছাত্র এবং মুহাক্কেক দাওয়ানীর শিক্ষক। সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব আলী দাওয়ানী তাঁর শারহে যিন্দেগানীয়ে জালালুদ্দীন দাওয়ানী গ্রন্থে হাবিবুস সাইর হতে বর্ণনা করেছেন ,মুহিউদ্দীন গুশকিনারী ও খাজা হাসান শাহ বাক্কাল মির্জা মুহাম্মদ বাইসানকারের আমলে শিরাজে শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহের দাবি তুলেছিলেন।

3. সাদুদ্দীন আসআদ দাওয়ানী: তিনি জালালউদ্দীন দাওয়ানীর পিতা। তিনিও শারিফ জুরজানীর ছাত্র ছিলেন।

4. কাওয়ামুদ্দীন কারবালী: তিনি সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন দাশতকী ও জালালউদ্দীন দাওয়ানীর শিক্ষক ছিলেন। তিনিও শারিফ জুরজানীর ছাত্র।

আমরা এ স্তরের অন্য কোন দার্শনিকের সম্পর্কে জানি না। এ সময়ে ইসলামী বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মোগলদের ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা পরিলক্ষিত হচ্ছিল। আমীর তৈমুর লং-এর আক্রমণ এর ভয়াবহতাকে আরো প্রকট করে তুলেছিল। আমাদের জানা নেই ,এ সময় শিরাজের বাইরে অন্য কোন স্থানে তখন শিক্ষাঙ্গন চালু ছিল কি না ?

অষ্টাদশ স্তরের দার্শনিকগণ

1. সাইয়্যেদুল হুকামা মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম হুসাইনী দাশতকী শিরাজী: তিনি সাইয়্যেদ সিন্দ এবং সাদরুদ্দীন দাশতকী নামে সুপরিচিত। তিনি ইসলামী জগতের প্রথম সারির দার্শনিকদের অন্যতম। মীর দামাদের সময় পর্যন্ত তাঁর ও তাঁর সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব জালালুদ্দীন দাওয়ানীর দার্শনিক মত ও গ্রন্থসমূহ এ শাস্ত্রের পণ্ডিতদের নিকট সমাদৃত হতো। তার কোন কোন মত এখনও মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে প্রচলিত এবং কোন কোনটি সকলের নিকট গৃহীত। তিনি 828 হিজরীতে জন্মগ্রহণ ও 903 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি সাইয়্যেদ শারিফের ছাত্র কাওয়ামুদ্দীন কারবালী ও সাইয়্যেদ ফাজেল ফার্সীর নিকট দর্শন শিক্ষা করেন।

2. আল্লামা জালালুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে আসয়াদুদ্দীন দাওয়ানী সিদ্দিকী: তিনি আল্লামা ও মুহাক্কেক দাওয়ানী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি দর্শন ,যুক্তিবিদ্যা ও অংকশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তাঁর অনেক মতই বর্তমানের দর্শন গ্রন্থসমূহেও রয়েছে। তিনি কাওয়ামুদ্দীন কারবালী ,মুহিউদ্দীন গুশকিনারী ,হাসান শাহ বাক্কাল ও স্বীয় পিতা আসয়াদুদ্দীন দাওয়ানীর নিকট দর্শন শিক্ষা করেছিলেন।

রাওজাত রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থদ্বয়ের লেখকগণ মনে করেছেন মুহাক্কেক দাওয়ানী মীর সাইয়্যেদ শারিফের প্রত্যক্ষ ছাত্র। কিন্তু সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব আলী দাওয়ানী তাঁর শারহে যিন্দেগানীয়ে জালালুদ্দীন দাওয়ানী নামক মূল্যবান গ্রন্থে এটি ভুল বলে প্রমাণ করেছেন। তিনি বলেছেন ,আল্লামা দাওয়ানী মীর সাইয়্যেদ শারিফকে শিক্ষক হিসেবে পান নি ;বরং তাঁর ছাত্রদের নিকট পড়াশোনা করেছেন।

আল্লামা দাওয়ানীর অনেক দার্শনিক মত তাঁর জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর শোরগোলের সৃষ্টি করেছিল। জীবিত থাকাকালে তিনি সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন দাশতকীর সঙ্গে মৌখিক ও লিখিতভাবে কয়েকবার বিতর্ক করেছেন। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর গ্রন্থসমূহ দার্শনিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাঁর বিভিন্ন মত আলোচিত ও পর্যালোচিত হতে থাকে। মোল্লা সাদরা তাঁর আসফার গ্রন্থের তৃতীয় খণ্ডে তিন পৃষ্ঠা আল্লামা দাওয়ানীর মত পর্যালোচনা ও প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন , তাঁর মতের পর্যালোচনাটি দীর্ঘ করার কারণ হলো অনেকে ধারণা করেন আল্লামার মতটি একত্ববাদের আলোচনার ক্ষেত্রে শেষ কথা। তাই আমরা তাঁর মতের বিভিন্ন ত্রুটিসমূহ উল্লেখ করে তা পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছি।

মোল্লা সাদরার উপরোক্ত কথা থেকে বোঝা যায় আল্লামা দাওয়ানীর মতামত পরবর্তী দার্শনিকদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।

আল্লামা দাওয়ানীর প্রসিদ্ধির চূড়ান্ত সময়ে শিরাজ নগরী দর্শনের কেন্দ্র ছিল। তখন খোরাসান ,আজারবাইজান ,কেরমান হতে ,এমনকি রোম ,তুরস্ক ও বাগদাদ হতেও শিক্ষার্থীরা তাঁর নিকট শিরাজে আসতেন।327 আল্লামা দাওয়ানী 830 হিজরীতে জন্ম ও 903 অথবা 908 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. আলী ইবনে মুহাম্মদ সামারকান্দী কুশজী (মোল্লা আলী কুশজী নামে পরিচিত): তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর তাজরীদ গ্রন্থের ব্যাখ্যাতা হিসেবে প্রসিদ্ধ। কুশজী একাধারে গণিতশাস্ত্রবিদ ও কালামশাস্ত্রের পণ্ডিত ছিলেন। তিনি গিয়াসউদ্দীন জামশিদ ও আলগবিকের (রোমীয় কাজী বা বিচারক) নিকট জ্যোতির্বিদ্যা ও গণিতশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তাঁর শিক্ষক আলগবিক ইবনে শাহরুখ ইবনে আমীর তাইমুরের (বিশিষ্ট গণিতজ্ঞ) নির্দেশে তাঁর জ্যোতিষ্ক চার্ট টি তৈরি করেন। তিনি তাবরীজ ও উসমানীতে সফর করেছেন এবং শেষ জীবন পর্যন্ত উসমানীতে কাটান। তাঁর রচিত খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর তাজরীদ গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থটি সকল দার্শনিকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং তাতে অনেক মনীষীই টীকা সংযোজন করেছেন। তাঁর এ গ্রন্থটি ঐশী দর্শনের ইতিহাসে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। তিনি 879 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

ঊনবিংশ স্তরের দার্শনিকগণ

এই স্তরের দার্শনিকগণ সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন দাশতকী ও আল্লামা দাওয়ানীর ছাত্র। তাঁরা হলেন :

1. গিয়াসউদ্দীন মানসুর দাশতকী: তিনি সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন দাশতকীর পুত্র এবং বিশিষ্ট দার্শনিকদের অন্যতম। কথিত আছে যে ,তিনি বিশ বছর বয়সে তৎকালীন সময়ের প্রচলিত সকল জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি শাহ তাহমাসবের শাসনামলে উচ্চপদ লাভ করেছিলেন। পরবর্তীতে পদত্যাগ করে শিরাজে ফিরে আসেন। শিরাজের প্রসিদ্ধ মানসুরীয়া মাদ্রাসাটি তাঁর প্রতিষ্ঠিত। তিনি পিতার অনুসরণে আল্লামা দাওয়ানীর মত খণ্ডনে প্রবৃত্ত হন। তিনি কখনও কখনও তাঁদের উভয়ের বিতর্কে অংশ গ্রহণ করতেন। তিনি দর্শনের ওপর কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন ইসবাতুল ওয়াজিব ,শারহে হায়াকিলুন্ নূর (সোহরাওয়ার্দীর গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ) ,খাজা নাসিরুদ্দীনের শারহে ইশারাত গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ ,ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ প্রভৃতি।

মোল্লা সাদরা তাঁর আসফার গ্রন্থের ইলাহীয়াত অধ্যায়ে তাঁকে পবিত্র ,সমর্থিত ও সাহায্যপ্রাপ্ত পিতার রহস্য ,আলেম ও নেতাদের সাহায্যকারী এবং ঐশী জগতের অধিপতির অনুগ্রহপ্রাপ্ত বলে উল্লেখ করেছেন। গিয়াসউদ্দীন দাশতকী 940 অথবা 948 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মাহমুদ নাইরিযী: তিনি সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন দাশতকীর অন্যতম ছাত্র। তিনি জালালুদ্দীন দাওয়ানীর কয়েকটি গ্রন্থ ব্যাখ্যা করেছেন। সেগুলোতে তাঁর বিভিন্ন মতের সমালোচনা ও স্বীয় শিক্ষক দাশতকীর পক্ষাবলম্বন করেছেন।

3. কাজী কামালুদ্দীন মাইবাদী ইয়াযদী: তাঁর প্রসিদ্ধি দু টি গ্রন্থের মাধ্যমে। একটি হলো আসিরুদ্দীন আবহারীর হেদায়া গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ যা শারহে হেদায়ায়ে মাইবাদী নামে প্রসিদ্ধ এবং অপরটি হলো হযরত আলীর কবিতা সমগ্রের ব্যাখ্যাগ্রন্থ। তিনি দর্শনশাস্ত্রে জামে গীতি নামা শীর্ষক ফার্সীতে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন।

4. জামালউদ্দীন মাহমুদ শিরাজী: তিনি জালালুদ্দীনের মৃত্যুর পর শিক্ষকতার ক্ষেত্রে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। বিভিন্ন অঞ্চল হতে তাঁর নিকট ছাত্ররা শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে আসতেন। মুকাদ্দাস আরদেবিলী নামে প্রসিদ্ধ মোল্লা আহমাদ আরদেবিলী ,মোল্লা আবদুল্লাহ্ শুশতারী , তাহজীবুল মানতেক গ্রন্থের টীকা সংযোজক মোল্লা মির্জা জান শিরাজী প্রমুখ তাঁর ছাত্র ছিলেন।

5. মোল্লা হুসাইন ইলাহী আরদেবিলী: তিনি খাজা শারাফুদ্দীন আবদুল হক আরদেবিলীর পুত্র। তিনি আল্লামা দাওয়ানী ও আমীর গিয়াসুদ্দীনের ছাত্র। তিনি শিয়া ছিলেন। তিনি প্রথম সাফাভী শাসক শাহ ইসমাঈল সাফাভীর সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। এ কারণে তাঁর অনেক লেখা তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করে লিখেছেন ও তাঁকে উপহার দিয়েছেন। তিনি ইরানের আরদেবিলের অধিবাসী হলেও ইরানের অন্যান্য শহরেও জ্ঞানান্বষণে সফর করেছেন ,যেমন শিরাজ ও হেরাত (যা বর্তমানে আফগানিস্তানের অংশ)। তিনি যুক্তিবিদ্যা ,দর্শন ,কালামশাস্ত্র ,জ্যোতির্বিদ্যা ও জ্যামিতির ওপর অনেক গ্রন্থ রচনা করেছেন। তৎকালীন সময়ের প্রচলিত ধারা অনুযায়ী তিনি পুরাতন গ্রন্থগুলোতে টীকা সংযোজন করেছেন ও সেগুলোর ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। যেমন শারহে মুয়াফিক ,শারহে মুতালেই ,শারহে শামসিয়াহ্ ,শারহে হেদায়ায়ে মাইবাদী ,শারহে তাজরীদ ,শারহে চাগমিনী প্রভৃতি যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ এবং খাজা নাসিরুদ্দীনের জ্যোতির্বিদ্যা বিষয়ক গ্রন্থ শারহে তাযকিরাহ্ ,জ্যামিতিতে এক্লিডসের রচিত গ্রন্থ ,গ্রহ নক্ষত্রের উচ্চতা ও গতিবিধি (অ্যাস্ট্রোলেব) সম্পর্কিত বিভিন্ন গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেছেন। তাঁর মৃত্যুর সঠিক সময় আমাদের জানা নেই।

বিংশ স্তরের দার্শনিকগণ

1. মোল্লা আবদুল্লাহ্ ইয়াযদী: তিনি তাহজীবুল মানতেক গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ হাশিয়েয়ে মোল্লা আবদুল্লাহ্ র জন্য সুপরিচিত যা দীনী ছাত্রদের যুক্তিবিদ্যার পাঠ্যপুস্তক। কেউ কেউ মনে করেন তিনি শরীয়ত সম্পর্কিত জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন না ,কিন্তু এটি সঠিক নয়। কারণ তিনি ফিকাহ্ ও যুক্তিবিদ্যা (মানতেক) উভয় শাস্ত্রেই পণ্ডিত ছিলেন। তিনি শিরাজে জামালুদ্দীন মাহমুদ ও গিয়াসউদ্দীন দাশতকীর নিকট পড়াশোনা করেন। শেষ জীবনে ইরাকে চলে যান ও 981 হিজরীতে সেখানে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মোল্লা হাবিবুল্লাহ্ বাগনাভী শিরাজী: তিনি মোল্লা মির্জা জান ও ফাজেল বাগনাভী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি জামালুদ্দীন মাহমুদের ছাত্র ছিলেন ও আল্লামা দাওয়ানীর কয়েকটি গ্রন্থের ব্যাখ্যা লিখেছেন। আল্লামা সাবযেওয়ারী তাঁর শারহে মানযুমা গ্রন্থের প্রকৃতিতত্ত্ব অধ্যায়ে ফাজেল বাগনাভী র নাম উল্লেখ করেছেন। তিনি 994 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. শামসুদ্দীন মুহাম্মদ খাফারী শিরাজী: তিনি আমীর গিয়াসউদ্দীন মনসুরের ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত তিনি আল্লামা দাওয়ানী ও সাইয়্যেদ সাদরুদ্দীন দাশতকীরও ছাত্র ছিলেন। তিনি শারহে তাজরীদ শারহে হিকমাতুল ওয়াজিব নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। মোল্লা সাদরা তাঁর আসফার গ্রন্থের প্রথম খণ্ডে তাঁর মতের উল্লেখ করে আলোচনা করেছেন। খাফারীকে ঊনবিংশ

স্তরের দার্শনিকও বলা যেতে পারে। কারণ এ স্তরে তিনি যুবক ছিলেন এবং বিংশ

স্তরে বৃদ্ধাবস্থায় পৌঁছেছিলেন। তিনি 957 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। কারো কারো মতে তিনি 935 হিজরীতে মারা যান।

4. খাজা আফজালুদ্দীন তারাকাহ্: তিনি জামালুদ্দীন মাহমুদের ছাত্র।328 রাওজাত গ্রন্থের লেখক বলেছেন , বিশিষ্ট দার্শনিক খাজা আফজালুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে হাবিবুল্লাহ্ তারাকাহ্ নাসরুল বায়ান নামে প্রসিদ্ধ শেখ আবুল কাসেম কাযরুনীর শিক্ষক ছিলেন। নাসরুল বায়ান তাঁর সিলমুস সামাওয়াত গ্রন্থের দার্শনিকদের ইতিহাস অংশে তাঁর শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে তাঁর প্রসিদ্ধির সময়কাল 970-990 হিজরী বলেছেন। তারাকাহ্ ইরাক ও খোরাসানে জীবন কাটান।

5. হাকিম দাউদ ইবনে উমর এনতাকী মিসরী: তাঁর নাম আমি শুধু নামে দানেশওয়ারান গ্রন্থে দেখেছি। তিনি দশম হিজরী শতাব্দীর শেষাংশ ও একাদশ হিজরী শতাব্দীর প্রথমাংশের একজন প্রথম সারির দার্শনিক ও চিকিৎসক। তিনি স্বয়ং নিজ জীবনী সম্পর্কে বলেছেন ,তিনি জন্মান্ধ ছিলেন ও সাত বছর পর্যন্ত পক্ষাঘাতগ্রস্ত জীবন কাঠিয়েছেন। এ অবস্থায়ই প্রাথমিক পড়াশোনা ও কোরআন মুখস্থ করেন। সব সময় নিজ আরোগ্যের জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করতেন। এ সময় মুহাম্মদ শরীফ নামের এক ইরানী তাঁর এলাকায় আসেন ও চিকিৎসার মাধ্যমে তাঁকে আরোগ্য দান করেন। মুহাম্মদ শরীফ নামের এই ব্যক্তি তাঁর মধ্যে তীক্ষ্ণ মেধা লক্ষ্য করে তাঁকে নিজ ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেন ও তাঁকে দর্শন ,যুক্তিবিদ্যা ও গণিতশাস্ত্র শিক্ষা দান শুরু করেন। দাউদ ফার্সী ভাষার প্রতি অনুরক্ত হয়ে শিক্ষকের নিকট তা শেখার আগ্রহ ব্যক্ত করেন। কিন্তু মুহাম্মদ শরীফ তাঁকে গ্রীক ভাষা শেখা উত্তম বলে তা শেখান। তখন ঐ অঞ্চলে কেউ গ্রীক ভাষা জানত না।

অতঃপর দাউদ কায়রোতে যান। কিন্তু মিশরের অধিবাসীদেরকে দর্শনের প্রতি অনাগ্রহী লক্ষ্য করে সেখান হতে ফিরে আসেন। তিনি শেষ জীবন মক্কায় কাটান ও সেখানেই 1008 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

তিনি দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রের বিভিন্ন গ্রন্থ ,যেমন ইবনে সিনার কানুন ,শাফা ও ইশারাত ,ইখওয়ানুস সাফাদের পুস্তিকাদি ,হিকমাতুল মাশরিকিয়া ,তালিকাত ,মুহাকিমাত ,মুতারিহাত প্রভৃতিতে পণ্ডিত ছিলেন।

দাউদ বেশ কিছু সংখ্যক গ্রন্থ লিখেছেন। তন্মধ্যে এশ্ক গ্রন্থটি সম্পর্কে নামে দানেশওয়ারান গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা এসেছে।329

একুশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মীর মুহাম্মদ বাকের দামাদ: তিনি এতটা প্রসিদ্ধ যে তাঁর পরিচয় দেয়ার আর প্রয়োজন নেই।330 দার্শনিক হিসেবে তাঁকে যদিও প্রথম সারির বলা যায় না ,তবে তিনি দ্বিতীয় সারির দার্শনিকদের অন্তর্ভুক্ত। তিনি একাধারে দার্শনিক ,ফকীহ্ ,সাহিত্যিক ,হাদীসশাস্ত্রবিদ ও গণিতজ্ঞ ছিলেন। বলা যায় ,বহু বিষয়ে পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন। নিজেকে দর্শনের তৃতীয় শিক্ষক বলে দাবি করতেন।331

তাঁর জাঁকজমকপূর্ণ ক্লাস অনুষ্ঠিত হতো। দ্বাবিংশ স্তরে তাঁর কিছু ছাত্রের নাম আমরা উল্লেখ করব। মীর দামাদ কার নিকট দর্শন শিক্ষা করেছেন সে বিষয়ে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে অনেকে তাঁর শিক্ষকের তালিকায় নিম্নোক্ত ব্যক্তিদের নাম এসেছেন। যেমন শেখ আবদুল আলী কোর্কী ,সাইয়্যেদ নুরুদ্দীন আমেলী ,তাজউদ্দীন হুসাইন সায়েদ তুসী ,ফাখরুদ্দীন আসতারাবাদী সামাকী প্রমুখ। তন্মধ্যে প্রথমোক্ত তিন ব্যক্তি ফিকাহ্ ও হাদীসশাস্ত্রে তাঁর শিক্ষক ছিলেন ;দর্শনে নয়। একমাত্র শেষোক্ত ব্যক্তি দর্শনের শিক্ষক ছিলেন।

সাইয়্যেদ আলী বেহবাহানী মীর দামাদের জীবনী ও দর্শনের পর্যালোচনা নামক প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন , ফাখরুদ্দীন মুহাম্মদ হুসাইনী আসতারাবাদী সম্রাট তাহমাসবের (918-984 হিজরী) সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। ইসকান্দারবিকের বর্ণনা মতে ,তিনি আসতারাবাদের সামাকের বিশিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন ও মীর দামাদ তাঁর ছাত্র ছিলেন। মুহাক্কেক খাফারীর অনুকরণে ফাখরুদ্দীনকে মুহাক্কেক ফাখারী বলা হতো। কিন্তু সম্ভবত মীর দামাদ তাঁর সমসাময়িক ছিলেন না ও তাঁর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেননি।

মুহাদ্দিস কুমীও তাঁর আল কুনী ওয়াল আলকাব গ্রন্থে তাঁকে মীর দামাদের শিক্ষক বলেছেন। রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থেও তা-ই বলা হয়েছে। কিন্তু ঘটনাক্রমে এ সকল গ্রন্থে বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের বিষয়ে ফাখরুদ্দীন আসতারাবাদী হুসাইনী নামে অপর এক ব্যক্তির নাম উল্লিখিত হয়েছে যিনি আল্লামা কুশচীর শারহে তাজরীদ গ্রন্থের ইলাহিয়াত ,জাওয়াহির ও আওয়ারিজ অধ্যায়ের টীকা লিখেছেন। জনাব আলী দাওয়ানীর বর্ণনানুসারে তিনি দাওয়ানীর তাহসীবুল মানতেক গ্রন্থেরও টীকা লিখেছেন। যদিও সাধারণভাবে মনে হয় তাঁরা দু ব্যক্তি নন ;বরং একজন ,কিন্তু যুররিয়া গ্রন্থের লেখকের মতে তাঁরা দু ব্যক্তি। একজন হলেন মুহাম্মদ ইবনুল হাসান ফাখরুদ্দীন সামাকী এবং অপরজন হলেন ফাখরুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনুল হুসাইন সামাকী।

আমরা মীর দামাদের দর্শনের শিক্ষকদের সম্পর্কে এর অধিক কিছু জানি না। ফাখরুদ্দীন সামাকীর ছাত্র কারা ছিলেন বা তিনি কার নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেছেন তাও আমাদের জানা নেই । তিনি কবে মৃত্যুবরণ করেছেন তাও অজ্ঞাত। কথিত আছে তিনি (ফাখরুদ্দীন) গিয়াসুদ্দীন মনসুর দাশতকীর ছাত্র ছিলেন।

2. শেখ বাহাউদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে হুসাইন ইবনে আবদুস সামাদ আমেলী: তিনি জাবালুল আমেলের অধিবাসী ও ইরানে হিজরত করেছিলেন। তিনি বিভিন্ন জ্ঞান ও শিল্পে পণ্ডিত ছিলেন। যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে মোল্লা আবদুল্লাহ্ ইয়াযদী ব্যতীত অন্য কারো সম্পর্কে আমরা জানি না। বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানে (যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনে) তাঁর শিক্ষকের ক্রমধারা (ওপর দিকে) মোল্লা আবদুল্লাহ্ ইয়াযদীর মাধ্যমে খাজা নাসিরুদ্দীন তুসী ও ইবনে সিনা পর্যন্ত পৌঁছেছে। এটি নিশ্চিত যে ,শেখ বাহাউদ্দীন সাহিত্যিক ,ফকীহ্ ,মুফাসসির ,গণিতজ্ঞ ,স্থপতি এবং কবি ছাড়া দার্শনিকও ছিলেন। তবে তাঁর দর্শনের ছাত্রদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় নি। প্রসিদ্ধি আছে যে ,মোল্লা সাদরা (সাদরুল মুতাআল্লেহীন) তাঁর নিকট দর্শন পড়েছেন এবং তিনি তাঁর (সাদরার) মধ্যে বিশেষ প্রতিভা লক্ষ্য করে মীর দামাদের নিকট প্রেরণ করেন। শেখ বাহাউদ্দীনের দর্শন বিষয়ক কোন লেখা আমাদের হাতে নেই তবে সম্প্রতি মিশর হতে ওয়াহ্দাতে উজুদ সম্পর্কিত তাঁর একটি পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছে। শেখ বাহাউদ্দীন 1030 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. মীর আবুল কাসেম ফানদারাসকী: তিনি ইরানের আসতারাবাদের ফানদারাসকে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি একাধারে গণিতজ্ঞ ,দার্শনিক ও আরেফ ছিলেন। যদিও তাঁর প্রতিষ্ঠিত বড় শিক্ষাঙ্গন ও অসংখ্য ছাত্র ছিল তদুপরি তাঁর জীবনী সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না । তিনি শেখ বাহায়ী ও মীর দামাদের সমকালীন ব্যক্তিত্ব। তিনি ভারতবর্ষেও সফর করেছেন ও ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে অবহিত হয়েছেন। তিনি যুক্তিবিদ্যার আনায়াত বা পঞ্চশাস্ত্র (বিতর্ক ,কবিতা ,বক্তব্য ,ভ্রান্তযুক্তি ও যুক্তি) নিয়ে পুস্তিকা রচনা করেছেন। তিনি মাশশায়ী ধারায় (অ্যারিস্টটলীয় দর্শনের ইসলামীরূপ) গতি সম্পর্কে একটি পুস্তক রচনা করেছেন। তিনি 1050 হিজরীতে 80 বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

বাইশতম স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরের দার্শনিকগণ হলেন শেখ বাহাউদ্দীন ,মীর দামাদ ও মীর ফানদারাসকীর ছাত্র।

1. রাফিউদ্দীন মুহাম্মদ ইবনে হায়দার হুসাইনী তাবাতাবায়ী নাইনী (মির্জা রাফিয়া নামে প্রসিদ্ধ): তিনি শেখ বাহায়ী ও মীর ফানদারাসকীর ছাত্র ছিলেন। তিনি নাইন ,যাওয়ারাহ ও আরদেস্তানের সাইয়্যেদদের বংশধর। কাজার শাসকদের সমকালীন বিশিষ্ট দার্শনিক মির্জায়ী জেলভে (মৃত্যু 1314 হিজরী) তাঁরই উত্তরপুরুষ। তিনি (রাফিউদ্দীন) অস্তিত্বের পর্যায় বিষয়ে যে পুস্তিকা লিখেছিলেন তা পরবর্তী দার্শনিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর শারহে ইশারাত ও শারিফ জানজানীর হিকমাতুল আইন গ্রন্থের টীকা লিখেছেন। তিনি দর্শনের ইসতিলজাম বিষয়েও পুস্তিকা রচনা করেছেন। মৌল আকীদা বিষয়ক তাঁর সামারেয়ে সাজারায়ে ইলাহীয়া নামক পুস্তিকাটি দার্শনিক ভূমিকাসহ সম্প্রতি বিশিষ্ট আলেম আবদুল্লাহ্ নুরানী প্রকাশ করেছেন। মির্জা রাফিয়া 999 হিজরীতে জন্ম ও 1083 হিজরীতে 85 বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহীম কাওয়ামী শিরাজী (মোল্লা সাদরা ও সাদরুল মুতাআল্লেহীন নামে প্রসিদ্ধ): তিনি বিশিষ্ট দার্শনিক ও ঐশীপ্রজ্ঞাসম্পন্ন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি ঐশী দর্শনকে নতুন দিক-নির্দেশনার মাধ্যমে নব পর্যায়ে উত্তরণ ঘটান। সাদরা সর্বোচ্চ দর্শন বা ঐশী প্রজ্ঞাকে-যাকে প্রকৃত দর্শন নামে অভিহিত করা হয় (পূর্বে প্রকৃতিবিজ্ঞান ,গণিত ও অন্যান্য বিষয়কে দর্শনের অন্তর্ভুক্ত করা হতো)-স্থায়ী ও দৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেন ও পূর্বের অনেক মৌল নীতির মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটান। তিনি তাঁর পূর্ববর্তী সকল দার্শনিক মতকে ছাপিয়ে নিজ মতকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।

মোল্লা সাদরার দর্শন চারটি নদীর মিলনস্থলের ন্যায় চারটি মতকে সমন্বিত করেছে অর্থাৎ তিনি অ্যারিস্টটল ও ইবনে সিনার মাশশায়ী দর্শন ,সোহরাওয়ার্দীর ইশরাকী দর্শন ,মুহিউদ্দীন আরাবীর এরফানী দর্শন ও কালামশাস্ত্রীয় চিন্তাসমূহের মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়েছেন। অন্যভাবে বলা যায় যে ,তিনি চারটি মৌলের মধ্যে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ঘটিয়ে নতুন মৌলের সৃষ্টি করেছেন যা পূর্ববর্তী উপাদান হতে স্বতন্ত্র।

মূলত মোল্লা সাদরার দর্শন ইসলামী জ্ঞানের জগতে এক অবিরত পর্যায়ক্রমিক বিবর্তনের ফল। মোল্লা সাদরার দর্শন বাহ্যিকভাবে সহজ মনে হলেও অত্যন্ত কঠিন ও সহজবোধ্য নয়। তাঁর বিবরণ ও লেখার ধারা সাহিত্যিক ও দক্ষতাসম্পন্ন। তাই ক্ষুরধার ও তীক্ষ্ণ মেধার ব্যক্তিত্বকেও দীর্ঘদিন তাঁর গ্রন্থের ওপর কাজ করতে হয়। প্রথম পর্যায়ে তা অধ্যয়ন করে বুঝেছি মনে করলেও দ্বিতীয় পর্যায়ের অধ্যয়নে তিনি যে সঠিক বুঝেননি তা বুঝতে পারবেন। এ কারণেই এমন অনেক ব্যক্তিত্ব দীর্ঘদিন মোল্লা সাদরার দর্শন গ্রন্থ পড়িয়েও তার গভীরে প্রবেশে সক্ষম হননি। তাই সাদরার দর্শন বোঝা যে কোন দর্শন পড়া ব্যক্তির জন্যই সম্ভব নয়। মোল্লা সাদরা শেখ বাহায়ী ও মীর দামাদের ছাত্র ছিলেন। তিনি উসূলে কাফী র ব্যাখ্যাগ্রন্থে শেখ বাহায়ীকে তাঁর উলুমে নাকলীর (কোরআন ও হাদীস) এবং মীর দামাদকে উলুমে আকলী র (যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের) শিক্ষক বলে উল্লেখ করেছেন। মোল্লা সাদরার গ্রন্থসমূহ এতটা প্রসিদ্ধ যে ,তার পরিচয় দানের প্রয়োজন নেই। তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো আসফার যা দর্শনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের গ্রন্থ বলে বিবেচিত। তিনি ইরান হতে সাত বার পায়ে হেঁটে হজ্ব করেছেন। সপ্তমবার 1050 হিজরীতে হজ্ব হতে প্রত্যাবর্তনের পথে বসরায় মৃত্যুবরণ করেন।

3. শামসুদ্দীন গিলানী (মোল্লা শামসা নামে পরিচিত): তিনি মীর দামাদের অন্যতম ছাত্র। তাঁর ও মোল্লা সাদরার মধ্যে অনেক পত্র বিনিময় হয়েছে। মোল্লা শামসা দর্শনের পরিমাণগত গতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক অন্যান্য বিষয়ে (যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক অস্তিত্ব) মোল্লা সাদরাকে প্রশ্ন করেছেন ও মোল্লা সাদরা পত্রের মাধ্যমে জবাব দিয়েছেন। তাঁর প্রদত্ত উত্তরগুলো তাঁরই মাবদা ওয়া মায়াদ নামের গ্রন্থে টীকা আকারে সংযোজন করে পুস্তিকাকারে মুদ্রিত হয়েছে।

4. সুলতানুল উলামা আমুলী মাজেনদারানী (খলীফাতুস সুলতান নামে প্রসিদ্ধ): তিনিও শেখ বাহায়ী ও মীর দামাদের ছাত্র ছিলেন। সাফাভী শাসক শাহ আব্বাস স্বীয় কন্যাকে তাঁর সঙ্গে বিবাহ দেন। তিনি কিছুদিন শাসক শাহ সাফী ও দ্বিতীয় শাহ আব্বাসের মন্ত্রী ছিলেন। তিনি ভাল গবেষক ছিলেন। মায়ালিম শারহে লোমআ গ্রন্থে তাঁর টীকা সংযোজিত অংশটি তাঁর গভীর জ্ঞানের স্বাক্ষর। তিনি এতে বাহুল্য ও অনাবশ্যক কথা পরিহার করেছেন। তিনি আল্লামা কুশচীর শারহে তাজরীদ গ্রন্থেরও টীকা লিখেছেন। তিনি 1063 হিজরীতে 64 বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন।

5. সাইয়্যেদ আহমাদ আমেলী: তিনি মীর দামাদের খালাতো ভাই ও ছাত্র। তিনি ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থে ইলাহিয়াত অধ্যায়ের টীকা লিখেছেন। তাঁর টীকা সংযোজিত গ্রন্থটি তেহরান হতে প্রকাশিত হয়েছে। ঐ টীকাগ্রন্থের কিছু অংশ মীর দামাদের উদ্ধৃতি যার কোন কোনটি তিনি সংশোধন করেছেন ও নিজে মত দিয়েছেন। মীর দামাদ ও সাইয়্যেদ আহমাদ উভয়েই মুহাক্কেক কুরকীর দৌহিত্র।

6. কুতুবুদ্দীন আশকুরী: তিনি মাহবুবুল কুলুব নামের প্রসিদ্ধ গ্রন্থের লেখক। তিনি দর্শনের ইতিহাস বিষয়ে মীর দামাদের নিকট পড়াশোনা করেন।

7. সাইয়্যেদ আমীর ফাজলুল্লাহ্ আসতারাবাদী: এ ব্যক্তিও মীর দামাদের ছাত্র। তাঁর স ¤পর্কে সঠিক কোন তথ্য আমাদের জানা নেই। রওজাত গ্রন্থে মুকাদ্দাস আরদেবিলীর জীবনী আলোচনায় রিয়াজুল উলামা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে ,আমীর ফাজলুল্লাহ্ মুকাদ্দাস আরদেবিলীর স্বনামধন্য ছাত্রদের একজন। মুকাদ্দাস আরদেবিলীর অন্তিম মুহূর্তে (মৃত্যুর পূর্বে) তাঁর পর দীনী বিষয়ে কার নিকট জনগণ প্রশ্ন করবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন , শরীয়তের বিষয়ে আমীর আলামের নিকট এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানে আমীর ফাজলুল্লাহর নিকট। 332

তেইশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মোল্লা মুহসেন ফায়েয কাশানী: তিনি একজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস ,দার্শনিক ও আরেফ। তিনি মোল্লা সাদরার ছাত্র ও জামাতা ছিলেন। তিনি তাঁর নিকট দর্শন পড়েছেন । দর্শন সংক্রান্ত তাঁর একটি পুস্তিকা এখনও বিদ্যমান। উসূলুল মাআরিফ নামের তাঁর একটি গ্রন্থ সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

দর্শনে ফায়েয হতে যে সকল বিবরণ আমাদের নিকট রয়েছে তা হুবহু মোল্লা সাদরার বক্তব্যের সারাংশ। আমরা ইতোপূর্বে মুফাসসির ও মুহাদ্দিসদের আলোচনায় ফায়েয কাশানীর নাম উল্লেখ করেছি। তিনি 1091 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মোল্লা আবদুর রাজ্জাক লাহিজী: তিনি শাওয়ারিকুল ইলহাম গাওহার মুরাদ গ্রন্থের লেখক। তিনি মোল্লা সাদরার ছাত্র ও জামাতা। তিনি মোল্লা মুহসেন ফায়েযের তুলনায় অনেক কম তাঁর শিক্ষকের চিন্তাদর্শন দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। তাই তাঁর লেখায় মোল্লা সাদরা অপেক্ষা পূর্ববর্তী দার্শনিকগণ ,যেমন মুহাক্কেক দাওয়ানী ও গিয়াসউদ্দীন দশতাকীর প্রভাব অধিকতর লক্ষণীয়। তিনি 1071 অথবা 1072 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. মোল্লা রজব আলী তাবরীজী ইসফাহানী: রওজাত গ্রন্থের লেখক রিয়াজুল উলামা গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে ,তিনি দ্বিতীয় শাহ আব্বাস (সাফাভী শাসক) ও সভাসদদের নিকট বিশেষ সম্মানিত ছিলেন ও তাঁরা সাক্ষাতের জন্য তাঁর নিকট আসতেন। মোল্লা রজব আলীর ছাত্রদের মধ্যে মাওলা মুহাম্মদ তানকাবানী ,হাকিম মুহাম্মদ হুসাইন কুমী ও কাজী সাঈদ কুমী উল্লেখযোগ্য। তিনি মীর ফানদারাসকীর ছাত্র ছিলেন এবং 1080 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

4. মোল্লা মুহাম্মদ বাকের: তিনি মুহাক্কেক সাবযেওয়ারী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি প্রথম সারির একজন দার্শনিক ও ফকীহ্ ছিলেন। তিনি শেখ বাহায়ী ও মীর ফানদারাসকীর ছাত্র ছিলেন। তিনি ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থের ইলাহিয়াত অধ্যায়ের সুন্দর টীকা লিখেছেন। রওজাত গ্রন্থের লেখক বলেছেন , মুহাক্কেক খুনসারী ও সারাব বা মরীচিকা নামে প্রসিদ্ধ মোল্লা মুহাম্মদ তানকাবানী তাঁর ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত মুহাক্কেক খুনসারী ফিকাহ্ ও হাদীসশাস্ত্রে তাঁর ছাত্র ছিলেন ;দর্শনশাস্ত্রে নয়। তিনি 1090 হিজরীতে মারা যান।

5. অগা হুসাইন খুনসারী (মুহাক্কেক খুনসারী নামে প্রসিদ্ধ): তিনি মরহুম সাবযেওয়ারীর ছাত্র (হাদীস ও ফেকাহ্শাস্ত্রে) ও বোন জামাতা। তিনি দর্শন ও যুক্তিবিদ্যায় মীর ফানদারাসকীর ছাত্র ছিলেন। তিনিও শাফা গ্রন্থের ইলাহিয়াত অধ্যায়ের ওপর প্রসিদ্ধ একটি টীকাগ্রন্থ লিখেছেন। তিনি খাজা নাসিরুদ্দীন তুসীর শারহে ইশারাত ,আল্লামা কুশচীর শারহে তাজরীদ মুহাকিমাত গ্রন্থের টীকা লিখেছেন। তিনি 1098 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

রওজাত গ্রন্থের লেখক মোল্লা যামান ইবনে মোল্লা কালাব আলী তাবরীজীর জীবনীতে লিখেছেন , ফারায়িদুল ফাওয়ায়িদ ফি আহওয়ালিল মাদারিস ওয়াল মাসাজিদ নামে তাঁর একটি গ্রন্থ রয়েছে যা তিনি ইসফাহানের লুতফুল্লাহ্ মাদ্রাসায় থাকাকালীন লিখেছিলেন। এ মাদ্রাসায় যে সকল বিশিষ্ট ব্যক্তি পড়াশোনা করেছেন তিনি তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন অগা হুসাইন খুনসারী ,মোল্লা শামসাই গিলানী ,মোল্লা হাসান লানবানী গিলানী (তিনি একজন দার্শনিক ও আরেফ ছিলেন এবং মাওলানা রুমীর মসনভী গ্রন্থটি ব্যাখ্যা করেছেন)। তন্মধ্যে মোল্লা হাসান লানবানী তাকওয়া পরহেজগারীর ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ ছিলেন।... ঐ মাদ্রাসার ছাত্রদের মধ্যে আরেফগণের আদর্শ ও গবেষকদের পুরোধা মোল্লা রজব আলী তাবরীজী ও তাঁর ছাত্র মীর কাওয়ামুদ্দীন রাযী তেহরানীও ( আইনাল হিকমা গ্রন্থ রচয়িতা) ছিলেন। 333 তিনি আরো উল্লেখ করেছেন , এ মাদ্রাসায় বিশিষ্ট দার্শনিক ও গবেষক মোল্লা আবুল কাসেম ইবনে মুহাম্মদ রাবী গুলপায়গানীও পড়াশোনা করেছেনথ- যিনি আকলী ও নাকলী বিভিন্ন গ্রন্থের ব্যাখ্যায় সূক্ষ্ম টীকা লেখায় পারদর্শী ছিলেন... সম্ভবত তিনি প্রথম মাজলিসীর ছাত্র ছিলেন। 334

উপরোল্লিখিত মোল্লা হাসান লানবানী আল্লামা মাজলিসীর অন্যতম ছাত্র মোল্লা হুসাইন লানবানীর পিতা। লানবানী ও গুলপায়গানী উভয়েই এ স্তরের ব্যক্তিত্ব।

এ স্তরের আরো কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছেন যাঁরা তেমন প্রসিদ্ধ নন। যেমন মোল্লা সাদরার ছাত্র আলী রেজা অগাজানী ও শেখ হুসাইন তানকাবানী। আনন্দের বিষয় ,সম্প্রতি মাশহাদের ইলাহিয়াত ওয়া মায়ারেফে ইসলামী মহাবিদ্যালয়ের সম্মানিত শিক্ষক সাইয়্যেদ জালালুদ্দীন অশতিয়ানী মীর দামাদ ও মীর ফানদারাসকীর সময় হতে বর্তমান সময়ের ইরানের নির্বাচিত দার্শনিকদের বিবরণ শিরোনামের গ্রন্থে উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গের বর্ণনাও দিয়েছেন।

চব্বিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মুহাম্মদ সাঈদ ইবনে মুহাম্মদ মুফিদ কুমী: তিনি কাজী সাঈদ নামে পরিচিত এবং তাঁর উপাধি হলো হাকিমে কুচাক অর্থাৎ ক্ষুদ্র দার্শনিক। তিনি মোল্লা মুহসেন ফায়েয ,মোল্লা আবদুর রাজ্জাক লাহিজী ও মোল্লা রজব আলী তাবরীজীর ছাত্র। তিনি ইসফাহানে মোল্লা রজব আলীর নিকট পড়াশোনা করেন ও রওজাত গ্রন্থের লেখকের বর্ণনানুসারে তিনিও তাঁর শিক্ষক রজব আলীর ন্যায় সাফাভী শাসক শাহ আব্বাসের নিকট সম্মানিত ছিলেন। তিনি মোল্লা আবদুর রাজ্জাকের নিকট কোমে এবং সম্ভবত কোমেই ফায়েয কাশানীর নিকট শিক্ষা গ্রহণ করেন। রওজাত এবং রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থের লেখকদ্বয় তাঁর মৃত্যুর সঠিক বছর সম্পর্কে অবগত নন ,তবে রওজাত গ্রন্থের পাদটীকায় আয যুররিয়া গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিয়ে তাঁর জন্ম 1049 হিজরী ও মৃত্যু 1103 হিজরী বলেছেন।

2. মোল্লা মুহাম্মদ তানকাবী সারাব: তিনি মোল্লা রজব আলী তাবরীজী এবং মুহাক্কেক সাবযেওয়ারীর ছাত্র ছিলেন।

3. জামালুদ্দীন খুনসারী (আগা জামাল খুনসারী নামে পরিচিত): তিনি অগা হুসাইন খুনসারীর (পূর্বোল্লিখিত) পুত্র ও ছাত্র। তিনি সাবযেওয়ারীর নিকটও পড়াশোনা করেছেন। তিনি ইবনে সিনার শাফা গ্রন্থের তাবিয়িয়াত বা প্রকৃতি বিষয়ক অধ্যায়ের টীকা লিখেছেন। তিনি নাসিরুদ্দীন তুসীর শারহে ইশারাত গ্রন্থেরও টীকা লিখেছেন। তিনি বর্ণনামূলক (ফিকাহ্ ও হাদীস) এবং বুদ্ধিবৃত্তিক (যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন) উভয় জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। তিনি 1121 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

4. কাওয়ামুদ্দীন মুহাম্মদ রাযী: তিনি কাওয়ামুদ্দীন হাকিম নামে পরিচিত। জনাব হুমায়ী তাঁর শারহে মাশায়িরে মোল্লা জাফর লানগরুদী গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন ,তিনি মোল্লা রজব আলী তাবরীজীর ছাত্র এবং শেখ এনায়েতুল্লাহ্ গিলানীর শিক্ষক ছিলেন। জনাব সাইয়্যেদ জালালুদ্দীন অশতিয়ানী মীর দামাদ ও মীর ফানদারাসকীর সময় হতে বর্তমান সময়ের নির্বাচিত ইরানী দার্শনিকদের বিবরণ শীর্ষক গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

5. মুহাম্মদ রাফী পীরযাদেহ্: তিনিও মোল্লা রজব আলী তাবরীজীর ছাত্র ও পরোক্ষভাবে মীর ফানদারাসকীরও ছাত্র। জনাব জালালুদ্দীনের পূর্বোল্লিখিত গ্রন্থে তাঁর সম্পর্কেও আলোচনা করা হয়েছে।

6. আলী কুলী খান: তিনি কারচেকায়ী খান খিলজী কুমীর পুত্র। অগা হুসাইন খুনসারী ,মোল্লা শামসায়ী গিলানী ও মোল্লা রজব আলী তাবরীজী তাঁর শিক্ষক ছিলেন। জনাব মুর্দারেসী তাবাতাবায়ীর তুরবাত নামক গ্রন্থের 235-240 পৃষ্ঠায় তাঁর রচিত অনেকগুলো পুস্তিকার উল্লেখ করা হয়েছে। আলী কুলী খান 1020 হিজরীতে জন্মগ্রহণ ও 1097 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। বর্তমানে কোমের খান মাদ্রাসাটি তাঁর স্বনামধন্য পুত্র মাহ্দী কুলী খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত।

পঁচিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মোল্লা মুহাম্মদ সাদিক আরদিসতানী: তাঁর সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায়নি। তবে এটুকু জানা যায় যে ,তিনি দার্শনিক ছাড়াও একজন সাধক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। ফলে অন্যদের তিরস্কার ,লাঞ্ছনা ও অপমানের শিকার হয়েছেন। তাঁকে কাফের প্রতিপন্ন করা হয়েছে ও তিনি দেশ ত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি 1134 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। হুমায়ী ও অশতিয়ানীর বর্ণনামতে মোল্লা মুহাম্মদ সাদিক মানবসত্তা ও প্রবৃত্তির বস্তুগত ও আত্মিক শক্তির বিষয়ে হিকমতে সাদিকিয়া নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন যা এখনও বিদ্যমান।

2. শেখ এনায়েতুল্লাহ্ গিলানী: তিনি মাশ্শায়ী ধারার একজন শিক্ষক ও মীর কাওয়াম হাকিমের ছাত্র।

3. মীর সাইয়্যেদ হাসান তালেকানী: তিনি মুহিউদ্দীন আরাবীর শারহে ফুসুস এবং সোহরাওয়ার্দীর ইশরাকী দর্শনের গ্রন্থসমূহ পড়াতেন ।

ছাব্বিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মোল্লা ইসমাঈল খাওয়াজুয়ী: মোল্লা ইসমাঈল বিগত কয়েক হিজরী শতাব্দীর অন্যতম প্রসিদ্ধ দার্শনিক। তিনি ইরানের উত্তরাঞ্চলের মাজেনদারানের অধিবাসী। রওজাত গ্রন্থের লেখক তাঁর বেশ প্রশংসা করেছেন ;তাঁর জ্ঞান (বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক) ,প্রজ্ঞা ,তাকওয়া ,উন্নত নৈতিক চরিত্র ও মর্যাদার বিষয়ে উক্ত গ্রন্থে লিখেছেন। বলা হয়েছে ,সম্রাট নাদির শাহ কারো প্রতি সম্মানের দৃষ্টিতে না দেখলেও এ মনীষীকে বিশেষ মর্যাদা দিতেন। এ সময়েই আফগানরা ইরানে আক্রমণ করে ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ইসমাঈল খাওয়াজুয়ী তাঁর কোন কোন লেখায় এ ধ্বংসযজ্ঞের নিন্দা করেছেন। রওজাত গ্রন্থের লেখক তাঁর শিক্ষকদের সম্পর্কে জানা যায়নি বলে প্রকাশ করেছেন। আফগানদের ধ্বংসযজ্ঞের পর ইরানে দর্শন চর্চা এ ব্যক্তির মাধ্যমে অব্যাহত থাকে। তিনি বেশ কিছু সংখ্যক প্রসিদ্ধ ছাত্রকে শিক্ষাদান করেন। যেমন অগা মুহাম্মদ বাইদাবাদী ,মোল্লা মাহ্দী নারাকী ,মির্জা আবুল কাসেম ইসফাহানী ও মোল্লা মেহরাব গিলানী। ইসমাঈল খাওয়াজুয়ী 1173 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মির্জা মুহাম্মদ তাকী আলমাসী: রওজাত গ্রন্থে তাঁকে আল্লামা মাজলিসীর বংশধর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর পিতা প্রথম মাজলিসীর পৌত্র ছিলেন। তিনি অগা মুহাম্মদ বাইদাবাদীর শিক্ষক ছিলেন বলা হয়েছে।

3. মোল্লা হামযা গিলানী: তিনি মোল্লা মুহাম্মদ সাদিক আরদিসতানীর ছাত্র ও 1134 হিজরীতে মারা যান।

4. মোল্লা আবদুল্লাহ্ হাকিম: তিনিও ইসমাঈল খাওয়াজুয়ী ও আলমাসীর ন্যায় অগা মুহাম্মদ বাইদাবাদীর শিক্ষক ছিলেন।

সাতাশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. অগা মুহাম্মদ বাইদাবাদী গিলানী ইসফাহানী: তিনি বিগত নিকটবর্তী শতাব্দীসমূহের অন্যতম প্রসিদ্ধ দার্শনিক। তিনি মোল্লা সাদরার দর্শনের পুনর্জীবন দানকারী। মোল্লা সাদরার দর্শন তাঁর ছাত্রদের মাধ্যমে প্রচলিত থাকলেও তা পূর্ববর্তী দার্শনিক ,যেমন ইবনে সিনা ও শেখ সোহরাওয়ার্দীর দর্শনের ব্যাপক পরিচিতি ও প্রসারের কারণে তেমন পরিচিতি লাভ করেনি। বিশেষত পূর্ববর্তী ধারার দর্শনের কারণে প্রাচীন ধারার মীর ফানদারাসকী ও তাঁর ছাত্র মোল্লা রজব আলী তাবরীজী শিক্ষক হিসেবে অত্যন্ত প্রসিদ্ধ ছিলেন।

স্বয়ং মোল্লা সাদরা বলেছেন ,তিনি তাঁর সমসাময়িকদের মধ্যে সম্মানের পাত্র ছিলেন না ;বরং একজন সাধারণ ছাত্রের ন্যায় জীবনযাপন করতেন ,অথচ তাঁর প্রায় সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব মোল্লা রজব আলী তাবরীজী এতটা প্রসিদ্ধ ছিলেন যে ,রাজকীয় ব্যক্তিবর্গ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য আসতেন। মোল্লা সাদরার দর্শন ধীর গতিতে পরিচিতি লাভ করে। সম্ভবত মাটির গভীরে সুপ্ত এ প্রস্রবণের উন্মুক্ত পথটি সর্বপ্রথম অগা মুহাম্মদ বাইদাবাদীর মাধ্যমে উদ্ঘাটিত হয়। রওজাত গ্রন্থ অনুসারে বাইদাবাদী একজন পরহেজগার ,দুনিয়াবিমুখ ,আত্মত্যাগী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি সাধারণ জীবনযাপন করতেন। শেখ আগা বুযুর্গ তেহরানী তাঁর গ্রন্থসমূহে তাঁকে একজন মহান আরেফ ও সাধক বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি প্রকৃতই একজন উন্নত নৈতিক চরিত্রের অধিকারী সাধক ছিলেন। এরফানশাস্ত্রে তাঁর রচিত দু টি গ্রন্থ কোমের বিশিষ্ট আলেম মুদাররেসী তাবাতাবায়ী কর্তৃক অনূদিত হয়েছে যা 1352 হিজরীতে প্রকাশিত ওয়াহিদ নামক পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছে। তাঁর উন্নত নৈতিক বৈশিষ্ট্য ও ঐশী প্রবণতা শাসকগোষ্ঠী হতে তাঁকে দূরে রাখত ,যদিও তাঁরা তাঁর নিকট আসতেন ,তবে তিনি তাঁদের উপেক্ষা করতেন।

বাইদাবাদী অনেক স্বনামখ্যাত ছাত্রকে শিক্ষাদান করেছেন যাঁদের সম্পর্কে আমরা কিছু পরেই আলোচনা করব। তিনি 1197 হিজরীতে মারা যান।

2. মোল্লা মাহ্দী নারাকী: তিনি বিশিষ্ট ফকীহ্ ও দার্শনিক। তিনি ও তাঁর পুত্র মোল্লা মাহমুদ নারাকী উভয়েই ইসলামী বিশ্বের প্রসিদ্ধ আলেম এবং বিবরণমূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সকল জ্ঞানে সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি মোল্লা ইসমাঈল খাওয়াজুয়ীর ছাত্র। সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকের শিফতী ইসফাহানী ও মুহাম্মদ ইবরাহীম কালবাসী তাঁর বিশিষ্ট ছাত্রদের অন্যতম।

3. মির্জা আবুল কাসেম হুসাইনী খাতুনাবাদী: তিনি মুদাররিস নামে প্রসিদ্ধ ও আল্লামা মাজলিসীর বংশধর। তিনিও মোল্লা ইসমাঈল খাওয়াজুয়ীর ছাত্র। 1203 হিজরীতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

4. মোল্লা মেহরাব গিলানী: তিনি একজন প্রসিদ্ধ দার্শনিক ও আরেফ। রাইহানাতুল আদাব গ্রন্থে তাঁকে খাওয়াজুয়ী ও বাইদাবাদীর ছাত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু রওজাত গ্রন্থে তাঁকে শুধু খাওয়াজুয়ীর ছাত্র বলা হয়েছে।

অগা বুযুর্গ তেহরানী তাঁর নুকাবাউল বাশার গ্রন্থের 1114 পৃষ্ঠায় মারেফাতুল কিবলা গ্রন্থের লেখক মির্জা আবদুর রাজ্জাক খান বাগায়েরীকে মোল্লা মেহরাবের দৌহিত্র বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি 1197 হিজরীতে মারা যান।

আটাশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মোল্লা আলী নূরী মাজেনদারানী ইসফাহানী: তিনি ইসলামী দর্শনের প্রসিদ্ধ পণ্ডিত। গত চার শতাব্দীতে যে সকল ব্যক্তিত্ব মোল্লা সাদরার দর্শনের গভীরে প্রবেশ করতে পেরেছেন তিনি তাঁদের অন্যতম। তিনি প্রথম জীবনে মাজেনদারান ও কাযভীনে পড়াশোনা করেন ও পরবর্তীতে ইসফাহানে আসেন। সেখানে তিনি অগা মুহাম্মদ বাইদাবাদী ও সাইয়্যেদ আবুল কাসেম মুদাররিস ইসফাহানীর নিকট পড়াশোনা করেন। তিনি পরবর্তী সময়ে ইসফাহানে দর্শনের সর্ববৃহৎ শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করেন।

মোল্লা আলী নূরী শিক্ষাদান ও ছাত্র প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দীর্ঘ সত্তর বছর সাধনা করেছেন। বুদ্ধিবৃত্তির প্রসারে তিনি বিরল ভূমিকা রেখেছেন।

মুহাম্মদ হুসাইন খান মারভী তেহরানের মারভী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার প্রাক্কালে সম্রাট ফাত্হ আলী শাহকে অনুরোধ করেন এ মাদ্রাসায় শিক্ষাদানের লক্ষ্যে মোল্লা আলী নূরীকে ইসফাহান হতে তেহরানে দাওয়াত করার। সম্রাট তাঁকে আমন্ত্রণ জানালে তিনি উত্তর দেন ইসফাহানে তাঁর নিকট দু হাজার শিক্ষার্থী শিক্ষারত রয়েছে যাঁদের মধ্যে চার শতাধিক যোগ্য ছাত্র রয়েছে। তাঁদের ত্যাগ করে তেহরান আসলে ইসফাহানের মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যাবে। সম্রাট পুনরায় পত্র লিখে তাঁর একজন উৎকৃষ্ট ছাত্রকে তেহরানে শিক্ষক হিসেবে প্রেরণের আহ্বান জানালে তিনি মোল্লা আবদুল্লাহ্ জানুজীকে প্রেরণ করেন। মোল্লা আলী নূরীর সকল ছাত্রই ইসফাহানের ছিলেন না। তাঁর ছাত্রদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন স্থান হতে তাঁর নিকট শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে আসতেন। সত্তর বছরব্যাপী বিভিন্ন ছাত্র তাঁর নিকট হতে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার মশাল নিয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিলেন।

রওজাত গ্রন্থের লেখক বলেছেন , আমি শৈশবে তাঁকে দেখেছি। তখন তিনি শুভ্র চুলের বৃদ্ধ ছিলেন। সাইয়্যেদ মসজিদে তিনি সাইয়্যেদ বাকের হুজ্জাতুল ইসলামের সঙ্গে নামাজের উদ্দেশ্যে আসতেন। সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকের হুজ্জাতুল ইসলাম তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁরা নামাজের পর আলোচনার জন্য বসতেন। তিনি ও ইসফাহানের শিয়াদের প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব ও নেতা হাজ কালবাসী অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। হাজ কালবাসী বিভিন্ন সভায় মোল্লা আলী নূরীকে নিজের ওপর প্রাধান্য দিতেন।

এ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কর্মপ্রচেষ্টাতেই জ্ঞান ও প্রজ্ঞা পরবর্তীতে অব্যাহত থাকে। তিনি মোল্লা সাদরার আসফার গ্রন্থের কিছু সংক্ষিপ্ত টীকা লিখেছেন। তিনি সূরা ইখলাসের একটি দীর্ঘ তাফসীরও লিখেছেন। তিনি 1246 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. হাজী মোল্লা আহমাদ নারাকী: তিনি মোল্লা মাহ্দী নারাকীর পুত্র। তিনি একজন ফকীহ্ ,মুজতাহিদ ও মুফতী ছিলেন। তিনি জ্ঞান ও প্রজ্ঞার পণ্ডিত ছিলেন যা স্বীয় পিতার নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তিনি 1244 অথবা 1245 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। আল্লামা তেহরানী তাঁর আলকিরামুল বারারাহ্ নুকাবাউল বাশার গ্রন্থে মোল্লা হাবিবুল্লাহ্ কাশানীর লুবাবুল আলকাব গ্রন্থসূত্রে উল্লেখ করেছেন ,কিছুদিন পূর্ব পর্যন্ত কাশান বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের অন্যতম কেন্দ্র ছিল। তিনি ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ হিজরী শতাব্দীর বেশ কিছু সংখ্যক দার্শনিকের নাম এ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যাঁরা কাশানে শিক্ষা লাভ করেছেন। সম্ভবত নারাকের আলেমদের মাধ্যমে সেখানে দর্শন প্রসার লাভ করেছিল।

3. মির্জা মাহ্দী ইবনে মির্জা হেদায়েতুল্লাহ্ শাহীদ মাশহাদী: তিনি তাঁর সময়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ ফকীহ্ ও আলেম ছিলেন। তিনি উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্রে ওয়াহিদ বেহবাহানীর ছাত্র ছিলেন। তিনি সাইয়্যেদ মাহ্দী বাহরুল উলুম ও শেখ জাফর কাশেফুল গেতার সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। সম্ভবত তিনি ইসফাহানের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ইসফাহানে আগা মুহাম্মদ বাইদাবাদীর নিকট দর্শন শিক্ষা করেন। পরবর্তীতে মাশহাদে যান এবং সেখানে দর্শন ,উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি গণিতশাস্ত্রেও পণ্ডিত ছিলেন যা স্বীয় শ্বশুর শেখ হুসাইন আমেলীর নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁর পুত্রত্রয় মির্জা হেদায়েতুল্লাহ্ ,মির্জা আবদুল জাওয়াদ ও মির্জা দাউদ দর্শনে গভীর বুৎপত্তি অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। শেষোক্ত দু পুত্র খোরাসানের প্রথম সারির দু গণিতজ্ঞ হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তাঁর বংশধারায় প্রসিদ্ধ ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছিল। যেমন বিশিষ্ট দার্শনিক ,আরেফ ও মুজতাহিদ মির্জা হাবিব রাজাভী ,চতুর্দশ হিজরী শতাব্দীর বিশিষ্ট দার্শনিক আগা বুযুর্গ হাকিম শাহিদী মাশহাদী প্রমুখ।

মির্জা মাহ্দী ইবনে সিনার ইশারাত ও কিছু সংখ্যক গণিত বিষয়ক গ্রন্থও পাঠদান করতেন। তিনি সম্রাট নাদির শাহের পৌত্র নাদির মির্জা কর্তৃক শহীদ হন। তাঁর জন্ম 1152 হিজরীতে । তাঁকে 1218 হিজরীতে শহীদ করা হয়।

উনত্রিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মির্জা হাসান নূরী: তিনি মোল্লা আলী নূরীর পুত্র। তিনি পিতার উত্তরাধিকারী হিসেবে আকর্ষণীয় পাঠচক্রের আয়োজনে সক্ষম হন। বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব আগা আলী মুদাররেস জানুযী তেহরানী তাঁর ক্লাসে অংশগ্রহণ করতেন। অধ্যাপক জালালুদ্দীন হুমায়ী তাঁর নির্বাচিত কবিতা সংকলন গ্রন্থে ইসফাহানের তিন শ্রেষ্ঠ কবির আলোচনায় তাঁকে তাঁর পিতার ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন। তাঁর কোন রচনা বর্তমানে বিদ্যমান না থাকলেও তাঁর ছাত্রদের নিকট হতে তাঁর মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। যা হোক তিনি পরবর্তী প্রজন্মের জন্য দর্শনশাস্ত্রে ভূমিকা রেখেছেন।

2. মোল্লা ইসমাঈল ইবনে মোল্লা মুহাম্মদ সামিই দারবেকুশাকী ইসফাহানী: তিনি ওয়াহিদুল আইন বা এক চক্ষুধারী নামে প্রসিদ্ধ। তিনি মোল্লা আলী নূরীর বিশিষ্ট ছাত্রদের

অন্তর্ভুক্ত এবং হাজী মোল্লা হাদী সাবযেওয়ারীর শিক্ষক। তাঁর দর্শনের ক্লাসসমূহ আকর্ষণীয় ছিল। তিনি মোল্লা সাদরার আরশিয়া গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ এবং মাশায়ি র ও আসফার গ্রন্থের টীকা লিখেছেন। এ ছাড়া তিনি লাহিজীব সাওয়ারিক গ্রন্থের টীকাও লিখেছেন। তিনি 1277 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. মোল্লা আবদুল্লাহ্ জানুযী: তিনি ঐ ব্যক্তি যাঁকে মুহাম্মদ হুসাইন খান মারভীর অনুরোধে হাকিম নূরী ইসফাহান হতে তেহরানে পাঠদানের জন্য প্রেরণ করেছিলেন। ইসফাহানের জ্ঞানকেন্দ্রের ঔজ্জ্বল্য ক্রমাগ্রত হ্রাসের পর জ্ঞানকেন্দ্র হিসেবে তেহরানের আবির্ভাব এ সময়েই ঘটে। মোল্লা আবদুল্লাহ্ সম্পর্কে তাঁর স্বনামধন্য পুত্র আগা আলী মুদাররেস যে বিবরণ দিয়েছেন তা হতে জানা যায় ,তিনি তাঁর জীবনের প্রাথমিক পড়াশোনা আজারবাইজানে সম্পন্ন করেন। অতঃপর কারবালায় যান। তিনি সেখানে সাহেবে রিয়াজের নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি কোমে বিশিষ্ট মুজতাহিদ মির্জায়ে কুমীর নিকট পড়াশোনা করেন। পরে তিনি কোম হতে ইসফাহানে যান ও হাকিম নূরীর নিকট দর্শন শিক্ষা লাভ করেন। তিনি 1237 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

4. মোল্লা মুহাম্মদ জাফর লাঙ্গরুদী লাহিজী: তিনি মোল্লা আবদুল্লাহ্ জানুজীর সমসাময়িক। তিনি সাইয়্যেদ আবুল কাসেম মুদাররেস ইসফাহানী ,মোল্লা মেহরাব গিলানী এবং বিশেষত মোল্লা আলী নূরীর ছাত্র ছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো মোল্লা সাদরার মাশায়ের গ্রন্থের ব্যাখ্যা। এ গ্রন্থটি সম্প্রতি মোল্লা সাদরার চারশ তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে যথাক্রমে ডক্টর সাইয়্যেদ হুসাইন নাসর ,অধ্যাপক জালালউদ্দীন হুমায়ী ও অধ্যাপক সাইয়্যেদ জালালউদ্দীন অশতিয়ানীর লিখিত ইংরেজি ও ফার্সী ভূমিকাসহ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি মাশায়ের গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ ছাড়াও কুশচীর শারহে তাজরীদ ও এ গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ হাশিয়ায়ে খাফারী র টীকাগ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর শারহে তাজরীদ গ্রন্থের টীকাগ্রন্থটি সুলতান মুহাম্মদ শাহের রাজত্বকালে 1255 হিজরীতে রচিত হয়।

তাঁর মৃত্যুর সঠিক সময় সম্পর্কে আমার জানা নেই। তবে জনাব হুমায়ী বলেছেন ,তাঁর মৃত্যু 1294 হিজরীর পূর্বেই ঘটেছিল।

আশ্চর্যের বিষয় হলো ,বিশিষ্ট আলেম শেখ আগা বুযুর্গ তেহরানী তাঁর আল কিরামুল বারারাহ্ ফিল কারনিস সালিছ বা দাল আশারা গ্রন্থের 239 এবং 257 পৃষ্ঠায় একই নামের সমসাময়িক ও গিলানের অধিবাসী হিসেবে তিনজন দার্শনিকের নাম যথাক্রমে শেখ জাফর লাহিজী ,শেখ মুহাম্মদ জাফর লাঙ্গরুদী (যিনি মোল্লা সাদরার আরশিয়ে গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন) ও শেখ মুহাম্মদ জাফর লাহিজী (যিনি মাশায়ির ও শারহে তাজরিদ গ্রন্থের টীকা লিখেছেন) উল্লেখ করেছেন। কিন্তু একই নামের ও একই এলাকার সমসাময়িক তিনজন দার্শেিকর অস্তিত্বের বিষয়টি সাধারণ দৃষ্টিতে অসম্ভব বলে মনে হয়। তাই বিষয়টি গবেষণার দাবি রাখে।

5. মোল্লা আগায়ে কাযভীনী: তিনিও মোল্লা আলী নূরীর বিশিষ্ট ছাত্রদের একজন। তিনি ইসফাহান হতে কাযভীনে ফিরে আসার পর বড় একটি দীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এখানে জ্ঞান অর্জনের জন্য সমবেত হন। আলী মুদাররেস জানুজী তাঁর নিজ জীবনীতে লিখেছেন ,এই বিশিষ্ট আলেমের নিকট জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি কিছুদিন কাযভীনে অবস্থান করেছিলেন। মোল্লা আগায়ে কাযভীনী মোল্লা আলী নূরীর অন্যতম ছাত্র মোল্লা ইসমাঈল ইসফাহানীর নিকটও পড়াশোনা করেন। এ কারণে তাঁকে হাজী সাবযেওয়ারীর সমসাময়িক হিসেবে ত্রিশতম স্তরের দার্শনিকদেরও অন্তর্ভুক্ত করা যায়। তিনি 1282 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

ত্রিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. হাজী মোল্লা হাদী সাবযেওয়ারী: তিনি শেষ চার শতাব্দীর দার্শনিকদের মধ্যে মোল্লা সাদরার পর সর্বাধিক প্রসিদ্ধ। তিনি 1212 হিজরীতে সাবযেওয়ারে জন্মগ্রহণ করেন। সাত বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান। দশ বছর বয়সে তিনি পবিত্র মাশহাদ শহরে যান। তিনি সেখানে দশ বছর অবস্থান করেন। ইসফাহানের দার্শনিকদের সুনামে মুগ্ধ হয়ে তিনি ইসফাহান গমন করেন। তিনি ইসফাহানের দার্বে কুশাকীতে মোল্লা ইসমাঈলের নিকট সাত বছর পড়াশোনা করেন । তিনি হাকিম নূরীর জীবনের শেষ দু তিন বছর তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। অতঃপর তিনি মাশহাদ প্রত্যাবর্তন করেন এবং সেখানে কয়েক বছর অধ্যাপনা করেন। সেখান হতে তিনি মক্কায় যান। তিনি মক্কা হতে ফেরার পথে দু তিন বছর কেরমান শহরে বসবাস করতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি আত্মশুদ্ধির লক্ষ্যে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকেন। অতঃপর সাবযেওয়ার ফিরে আসেন। সে সময় হতে চল্লিশ বছর পর্যন্ত তিনি এ শহর হতে বের হননি। এ শহরেই তিনি অধ্যয়ন ,অধ্যাপনা ,গবেষণা ,রচনা ,সংকলন ,ইবাদাত ,আত্মশুদ্ধি ও ছাত্র প্রশিক্ষণে নিয়োজিত থাকেন এবং শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা ,বিভিন্ন অঞ্চল হতে ছাত্র সংগ্রহ ও তাঁদের প্রশিক্ষণের পর বিভিন্ন শহরে প্রেরণের ক্ষেত্রে তিনি হাকিম নূরীর পরেই স্থান লাভ করেছিলেন। তাঁর প্রসিদ্ধি ইরান এবং ইরানের বাইরে ছড়িয়ে পড়েছিল। দর্শন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্থান হতে তাঁর নিকট আসতেন। এ বিশিষ্ট দার্শনিকের কারণেই পরিত্যক্ত সাবযেওয়ার শহরটি ইসলামী দর্শন শিক্ষার্থীদের সমবেত হওয়ার স্থান ও দীনী কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল।

বিশিষ্ট ফরাসী দার্শনিক কান্ট গোবিনু যিনি ইতিহাসের দর্শনের ক্ষেত্রে প্রসিদ্ধ ,ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত হিসেবে তাঁর তিন বছর ইরানে অবস্থানের সময় একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেন। তাতে তিনি লিখেন , তাঁর (হাজী সাবযেওয়ারী) প্রসিদ্ধি এতটা ছড়িয়ে পড়েছিল যে ,বিভিন্ন দেশ ,যেমন ভারত ,তুরস্ক ,হেজায হতে তাঁর নিকট শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ছাত্ররা আসতেন এবং তাঁরা তাঁর প্রতিষ্ঠিত সাবযেওয়ারের দীনী মাদ্রাসায় পড়াশোনা করতেন।

দার্শনিক সাবযেওয়ারী বাগ্মিতা ও লেখনী শক্তিতে ছিলেন বিরল। আকর্ষণীয়ভাবে শিক্ষা দান করতেন। তিনি দর্শন ও প্রজ্ঞার জ্ঞান ছাড়াও এরফানী জ্ঞানে পূর্ণ ছিলেন। তদুপরি তিনি ছিলেন একজন সুশৃঙ্খল ,আত্মপরিশুদ্ধ ,আরাধক ,শরীয়তের অনুগত। অর্থাৎ সর্বোপরি তিনি ছিলেন আল্লাহর পথের পথিক। এ সকল বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাঁর ছাত্ররা তাঁকে আন্তরিকভাবে ভালবাসতেন। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন বিরল। তাঁর অন্যতম ছাত্র তাঁর মৃত্যুর চল্লিশ বছর পরও তাঁর নাম শ্রবণে অশ্রু বিসর্জন করতেন।

দার্শনিক সাবযেওয়ারী ফার্সী ও আরবী ভাষায় অনেক কবিতা রচনা করেছেন । তিনি তাঁর কবিতায় অনেক ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন। কিন্তু কোন কোন কবিতা অদ্ভুত সুন্দর ,উচ্চ মানের ও উত্তেজনাপূর্ণ।

হাজী সাবযেওয়ারী 1289 হিজরীতে এক আবেগময় পরিবেশের সৃষ্টি করে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে তাঁর এক ছাত্র নিম্নোক্ত কবিতা রচনা করেছিলেন :

এক রহস্য পৃথিবী হতে নিল বিদায়

যাঁর আহ্বান পৌঁছেছিল ভূমি হতে আরশে খোদায়

যদি তাঁর মৃত্যু তারিখ সম্পর্কে প্রশ্ন কর

বলব আমি মরেননি তিনি ,লাভ করেছেন জীবন আরো উচ্চতর।

হাজী সাবযেওয়ারীর যে সকল ছাত্র সম্পর্কে আমার নিকট তথ্য রয়েছে তাঁরা হলেন :

1. মোল্লা আবদুল করিম খাবুশানী (কুচানী) যিনি মানজুমে মানতেক গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ রচনা করেছেন।

2.মির্জা হুসাইন সাবযেওয়ারী যিনি মোল্লা মুহাম্মদ হাইদাযী ও মির্জা আলী আকবর ইয়াযদীর শিক্ষক ছিলেন।

3. মির্জা হুসাইন আলাভী সাবযেওয়ারী যিনি জ্ঞানের সব শাখায় তাঁর সময়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ।

4. ফার্স প্রদেশের বিশিষ্ট দার্শনিক হাকিম আব্বাস দারাবী।

5.শাইখুর রাইস কাযারের শিক্ষক শেখ ইবরাহীম সাবযেওয়ারী।

6. শেখ মুহাম্মদ ইবরাহীম তেহরানী।

7. সাইয়্যেদ আবুল কাসেম মুসুভী জানজানী।

8. সাইয়্যেদ আবদুর রহিম সাবযেওয়ারী।

9. মোল্লা মুহাম্মদ সাব্বাগ।

10. শেখ হাদী বীরজান্দীর শিক্ষক শেখ মুহাম্মদ রেজা বরুগানী।

11. মির্জা আবদুল গফুর দারাবী।

12.হাজ ফাজেল খোরাসানী ও আগা বুযুর্গে শাহেদী মাশহাদীর শিক্ষক মোল্লা গোলাম হুসাইন মাশহাদী।

13. হাজী ফাজেল খোরাসানী ও আগা বোজুর্গ শাহিদী মাশহাদীর শিক্ষক মির্জা মুহাম্মদ সারুকাদী।

14. শেখ আলী ফাজেল তাব্বাতী

15.মির্জা অগা হাকিম দারাবী

16.মির্জা মুহাম্মাদ ইয়াযদী

17.মির্জা আবু তালেব জানজানী

18.মোল্লা ইসমাঈল আরেফ বেজনূরদী

19.শেখ আবদুল হুসাইন শাইখুল ইরাকাইন এবং

20.মির্জা মুহাম্মদ হাকিম এলাহী

হাকিম সাবযেওয়ারীর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ ছাত্র ছিলেন বিশিষ্ট আরেফ ,দার্শনিক ও প্রসিদ্ধ ফকীহ্ মোল্লা হুসাইন কুলি হামেদানী। এই মহান ব্যক্তি এক পবিত্র চরিত্রের মেষ পালকের সন্তান ছিলেন। তিনি শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে হামেদান হতে তেহরানে আসেন। হাকিম সাবযেওয়ারীর প্রসিদ্ধ আধ্যাত্মিক আকর্ষণে তিনি সাবযেওয়ারে আসেন এবং সেখানে পড়াশোনা শুরু করেন। অতঃপর ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষা লাভের জন্য আতাবাতে আসেন ও শেখ মুর্তাজা আনসারীর ছাত্র হন। এ সময়েই তিনি আগা সাইয়্যেদ ইলী শুসতারীর ছাত্র হন ও তাঁর নিকট আধ্যাত্মিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি আধ্যাত্মিক জ্ঞানের প্রবাদ পুরুষে পরিণত হন।

যদি হাকিম সাবযেওয়ারীর মাদ্রাসার ছাত্ররা এ মাদ্রাসায় পড়ার কারণে গৌরব লাভ করে থাকেন তবে বলা যায় ,এ ব্যক্তির উপস্থিতির কারণে মাদ্রাসা গৌরবান্বিত হয়েছিল।

আখুন্দ মোল্লা হুসাইন কুলি যে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তা ছাত্রদের শিক্ষাদান হতে তাদের প্রশিক্ষণ ও মানব গঠনে অধিকতর গুরুত্ব দিত। এ মাদ্রাসায় অনেক প্রসিদ্ধ ব্যক্তি শিক্ষা লাভ করেছেন।

বিভিন্ন সূত্র হতে যতটুকু জানা যায় সাইয়্যেদ জামালউদ্দীন আফগানী তাঁর নাজাফে অবস্থানকালে দু ব্যক্তি হতে শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁদের একজন হলেন শেখ মুর্তাজা আনসারী এবং অপরজন মোল্লা হুসাইন কুলি হামেদানী। সম্ভবত সাইয়্যেদ জামালউদ্দীন মোল্লা হুসাইন কুলির নিকট বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান অর্থাৎ যুক্তিবিদ্যা ও দর্শন শিক্ষা লাভ করেছিলেন। কোন সূত্র অনুযায়ী সাইয়্যেদ জামাল মোল্লা হুসাইন কুলির ছাত্র সাইয়্যেদ আহমদ কারবালায়ী ও সাইয়্যেদ সাঈদ হুবুবী যাঁরা তাঁর নিকট এরফানশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করতেন তাঁদের সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক রাখতেন। এ দিকটি এই অসাধারণ ব্যক্তিত্বের (সাইয়্যেদ জামাল) এক আশ্চর্যজনক ও অনুদ্ঘাটিত দিক যা খুব কম ঐতিহাসিকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

2. আগা আলী যানুযী: তিনি আগা আলী হাকিম ও আগা আলী মুদাররেস নামে পরিচিত। তিনি পূর্বোল্লিখিত মোল্লা আবদুল্লাহ্ যানুযীর পুত্র। তিনি সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোর বিরল শিক্ষকদের একজন। আগা আলী যানুযী 1234 হিজরীতে ইসফাহানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় পিতা হতে ফিকাহ্শাস্ত্র ও দর্শনের জ্ঞান লাভ করেছিলেন। তিনি দর্শন শিক্ষা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে আতাবাতে যান। সেখান থেকে ইসফাহানে ফিরে আসেন ও মির্জা হাসান নূরীর ছাত্র হন। অতঃপর কাযভীনে যান ও মোল্লা আগায়ে কাযভীনীর নিকট শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে ইসফাহানে ফিরে এসে হাসান নূরীর নিকট তাঁর শিক্ষা সমাপ্ত করেন। শিক্ষা সমাপনের পর তেহরানের সেপাহ্সালার মাদ্রাসায় শিক্ষাদান কাজে নিয়োজিত হন। তিনি 1307 হিজরীতে তেহরানে মৃত্যুবরণ করেন।

3. আগা মুহাম্মদ রেযা হাকিম কামশেহী: তিনিও বিগত শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও আরেফ। তিনি ইসফাহানের কামশেহ শহরের অধিবাসী। তরুণ বয়সে তিনি শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে ইসফাহানে আসেন। তিনি মির্জা হাসান নূরী এবং মোল্লা মুহাম্মদ জাফর লাঙ্গরুদীর নিকট পড়াশোনা করেন। তিনি দীর্ঘদিন ইসফাহানের দীনি শিক্ষাকেন্দ্রে দর্শন শিক্ষাদান করেন। জীবনের শেষ দশ বছর তিনি তেহরানের সাদর মাদ্রাসায় অবস্থান করেন। সেখানে শিক্ষার্থীরা তাঁর নিকট থেকে লাভবান হতেন। এটি তাঁর জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সময় ছিল।

তিনি একজন পূর্ণ আরেফ ছিলেন। তিনি একাকিত্বকে পছন্দ করতেন ও সমাজ হতে কিছুটা বিচ্ছিন্ন থাকতেন। যুবক বয়সে তিনি একজন ধনী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি তাঁর সকল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি 1288 হিজরীর দুর্ভিক্ষের সময় সাধারণ দরিদ্র ব্যক্তিদের মধ্যে বিলিয়ে দেন। পরবর্তীতে তিনি একজন দরবেশের ন্যায় জীবনযাপন করেন। যখন আগা আলী হাকিম মুদাররেস যানুযী ও মির্জা আবুল হাসান যেলভে দর্শনশাস্ত্রের শিখরে অবস্থান করছিলেন তখনই হাকিম কামশেহী তেহরানে আসেন। তিনি মোল্লা সাদরার দর্শনের অনুসারী হলেও ইবনে সিনার দর্শন গ্রন্থসমূহ পড়াতেন। তিনি ইবনে সিনার দর্শনে পণ্ডিত হিসেবে মির্জা আবুল হাসান যেলভের অবস্থানকে টলিয়ে দেন।

হাকিম কামশেহী কখনই তাঁর গ্রামীণ পোশাক পরিত্যাগ করে আলেমদের পোশাক পরিধান করেননি। তাঁর বিশিষ্ট ছাত্র জাহাঙ্গীর খান কাশকায়ী বর্ণনা করেছেন , হাকিম কামশেহীর প্রসিদ্ধির কথা শুনে তাঁর নিকট হতে শিক্ষা লাভের পরম আগ্রহ নিয়ে তেহরান গিয়েছিলাম। তেহরান পৌঁছে প্রথম রাতেই তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। তাঁর পোশাক আলেমদের মত ছিল না । তাঁর পোশাক ছিল তাঁবু ও ক্যানভাসের কাপড় বিক্রেতাদের মতো। আমি তাঁকে আমার ইচ্ছার কথা জানালাম। তিনি তেহরানে বাইরের একটি কফির দোকানে (যেখানে দরবেশদের আড্ডা ছিল) আমাকে পরদিন আসতে বললেন। আমি মোল্লা সাদরার আসফার গ্রন্থটি সঙ্গে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়ে লক্ষ্য করলাম তিনি এক কোণায় একটি চাটাইয়ের ওপর বসে রয়েছেন। আমি তাঁর নিকট গিয়ে আসফার গ্রন্থটি খুলে বসলাম। তিনি তা হতে পড়ে আমাকে বুঝাতে লাগলেন। তাঁর পাঠ দানের প্রক্রিয়ায় মুগ্ধ হয়ে আমি আত্মহারা হলাম। তিনি আমার অবস্থা লক্ষ্য করে বললেন: হ্যাঁ ,এ শক্তিই পাত্রটিকে ভেঙ্গেছে।

তিনি উচ্চ পর্যায়ের কবি ছিলেন। নিজ কবিতাসমূহকে লাল মদ ছদ্ম নামে প্রকাশ করতেন। তিনি 1306 হিজরীতে তাঁরই মাদ্রাসার স্বীয় কক্ষের এক কোণে একজন নীরব সূফীর ন্যায় নশ্বর পৃথিবী হতে বিদায় নেন। একই দিনে তেহরান শহরের সবচেয়ে বড় মুফতি মোল্লা আলী কুনীও মৃত্যুবরণ করেন। সে দিন এ শহরে শোকের ছায়া নেমেছিল। যদিও তাঁর মৃত্যুর অনেক পরে তাঁর বন্ধু মহল ও ছাত্ররা তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে অবহিত হয়েছিলেন। তিনি যে এমন মৃত্যুই চেয়েছিলেন তা তাঁর একটি কবিতা হতে বোঝা যায় :

জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদ তো বাদশাদের জন্য ,আমার জন্য নয়

আমি পাগলের জন্য একটি কোণাই যথেষ্ট ,পৃথিবীতে তা কম নয়।

হাকিম কামশেহী অনেক ছাত্রকে শিক্ষাদান করেছেন। আগা মির্জা হাশেম এশকাওয়ারী ,আগা মির্জা হাসান কেরমানশাহী ,আগা মির্জা শিহাব নাইরিযী ,জাহাঙ্গীর খান কাশকায়ী ,আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাশী ইসফাহানী ,মির্জা আলী আকবর ইয়াযদী ,শেখ আলী নূরী মুদাররেস ,মির্জা মুহাম্মদ বাকের হাকিম ,শহীদ মুজতাহিদ ইস্তিহবানাতী ,বিশিষ্ট কবি হাকিম সাফায়ী ইসফাহানী ,শেখ আবদুল্লাহ্ রাশতী রিয়াযী ,শেখ হাইদার খান নাহাভান্দী কাযার ,মির্জা আবুল ফযল কালানতার তেহরানী ,মির্জা সাইয়্যেদ হুসাইন রাজাভী কুমী ,শেখ মাহমুদ বুরুজারদী ,মির্জা মাহমুদ কুমী প্রমুখ তাঁর ছাত্র ছিলেন।

4. মির্জা আবুল হাসান যেলভে: তিনি এই স্তরের অন্যতম দর্শনের প্রসিদ্ধ শিক্ষক। তিনি দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন। অনেক ছাত্র তাঁর দ্বারা শিক্ষাপ্রাপ্ত হয়েছে। তিনি 1238 হিজরীতে জন্মগ্রহণ ও 1314 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ইবনে সিনার দর্শনের সমর্থক ছিলেন। তাই মোল্লা সাদরার দর্শনকে তেমন গুরুত্ব দিতেন না। তিনি ইসফাহানের অধিবাসী ছিলেন তবে তেহরানে হিজরত করেন। তিনি মির্জা হাসান নূরী ও মির্জা হাসান চিনির ছাত্র ছিলেন। কথিত আছে যে ,তিনি ইসফাহান হতে সাবযেওয়ারে যাওয়ার উদ্দেশ্যে তেহরানে আসেন। পরে সাবযেওয়ারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তেহরানেই থেকে যান। আবুল হাসান যেলভে ত্রয়োদশ হিজরী শতাব্দীর শেষাংশ ও চতুর্দশ শতাব্দীর প্রথমাংশের শ্রেষ্ঠ তিন দার্শনিকের একজন। অবশ্য অপর দু জন তাঁর চেয়ে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। হাকিম কামশেহীর ছাত্ররা তাঁরও ছাত্র ছিলেন।

একত্রিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. মির্জা হাশেম এশকাওয়ারী রাশতী: তিনি দর্শন ও এরফানের ক্ষেত্রে তাঁর সময়ের অন্যতম প্রসিদ্ধ শিক্ষক। তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা হতে অনেক ছাত্র শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি তাঁর স্তর হতে পরবর্তী স্তরে দর্শন ও এরফানশাস্ত্র স্থানান্তরের মাধ্যম হয়েছিলেন। তাঁর সমকালীন ব্যক্তিদের থেকে এরফানশাস্ত্রের তত্ত্ব জ্ঞানে তিনি অগ্রগামী ছিলেন। তিনি ফান্নারী রচিত মিসবাহুল ইনস গ্রন্থটির (যা কৌনাভী রচিত মিফতাহুল গাইব গ্রন্থের ব্যাখ্যাগ্রন্থ) টীকাগ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি একাধারে কামশেহী ,আগা আলী মুদাররেস ও মির্জা যেলভের ছাত্র ছিলেন। তিনি 1332 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মির্জা হাসান কেরমানশাহী: তিনি হাশেম এশকাওয়ারীর সমসাময়িক ব্যক্তিত্ব। পূর্বোক্ত তিন শিক্ষক তাঁরও শিক্ষক ছিলেন। কেরমানশাহীর নিকট অসংখ্য ছাত্র শিক্ষা লাভ করেছেন। তিনি দর্শনশাস্ত্রকে তাঁর পরবর্তী স্তরে স্থানান্তরে বিশেষ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি 1336 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

3. মির্জা শিহাবউদ্দীন নাইরিযী শিরাজী: তিনি হাকিম কামশেহী ও মির্জা যেলভের ছাত্র ছিলেন। তিনি ফিকাহ্ ও উসূলশাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। এরফানশাস্ত্রের মুহিউদ্দীনী ধারার ওপরও তাঁর দক্ষতা ছিল। হাকিম নাইরিযী তেহরানের সাদর মাদ্রাসায় তাঁর শিক্ষক হাকিম কামশেহীর স্থলাভিষিক্ত হন। সেখানে তিনি পাঠ দান ,গবেষণা ও ছাত্র প্রশিক্ষণের কাজে ব্রত হন। তিনি

অস্তিত্বের বাস্তবতা সম্পর্কিত একটি পুস্তিকা রচনা করেন। শেখ আগা বুযুর্গ তেহরানী তাঁর জীবনী বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন ,উপরোক্ত পুস্তিকটি তাঁর নিকট রয়েছে।

4. মির্জা আব্বাস শিরাজী দারাবী: তিনি হাকীম আব্বাস নামে পরিচিত ও ফার্স প্রদেশের দর্শনের প্রসিদ্ধ শিক্ষকদের একজন। তিনি হাকিম সাবযেওয়ারীর ছাত্র ছিলেন যা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। শেখ আগা বুযুর্গ তেহরানী বলেছেন ,তিনি একাধারে দর্শন ও ফিকাহ্শাস্ত্রে পণ্ডিত ছিলেন। তিনি মোল্লা সাদরার আসফার গ্রন্থটি স্বহস্তে কপি করে তাতে টীকা সংযোজন করেছেন। তিনি দোয়া-ই কুমাইল ও মীর ফানদারাসতীর কাসিদার ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছেন। তিনি চিরুনী নির্মাতা নামে প্রসিদ্ধ শেখ আহমাদ শিরাজী ও মির্জা ইবরাহীম নাইরিযীর শিক্ষক ছিলেন। ফুরআত উদ্দৌলা শিরাজী তাঁর আসারুল আযাম গ্রন্থে তাঁর মৃত্যু 1300 হিজরীতে হয়েছিল বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর কবর শিরাজের হাফিযিয়ায় বিদ্যমান রয়েছে।

5. জাহাঙ্গীর খান কাশকায়ী: প্রায় মধ্যবয়সে তাঁর মধ্যে জ্ঞানের নেশা উজ্জীবিত হয় ও তিনি জ্ঞান অন্বেষণে ব্রতী হন। পরবর্তীতে ইসফাহানের প্রতিষ্ঠিত দর্শন শিক্ষকদের অন্যতম ছিলেন। জাহাঙ্গীর খান জ্ঞান ও দর্শনে উচ্চ মর্যাদা লাভ করা ছাড়াও ধৈর্য ,স্থিরতা ,নৈতিক শৃঙ্খলা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে আদর্শ ছিলেন। তিনি শেষ জীবন পর্যন্ত তাঁর পূর্বের সাধারণ পোশাক পরিধান করতেন। তিনি তাঁর ছাত্র ও পরিচিতদের শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন। জাহাঙ্গীর খান আগা মুহাম্মদ রেযা কামশেহীর ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত তিনি প্রথম দিকে মির্জা আবদুল জাওয়াদ খোরাসানী ও মোল্লা ইসমাঈল ইসফাহানী দারবে কুশাকীরও ছাত্র ছিলেন। জাহাঙ্গীর খান 1243 হিজরীতে ইসফাহানের দেহাকানে জন্মগ্রহণ এবং 1328 হিজরীতে ইসফাহানে মৃত্যুবরণ করেন।

6. আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাশী: তিনি জাহাঙ্গীর খানের সমসাময়িক ও আগা মুহাম্মদ রেযা কামশেহীর ছাত্র ছিলেন। তিনি ইসফাহানের সাদর মাদ্রাসায় শিক্ষাদান করতেন। জাহাঙ্গীর খানের ন্যায় তিনিও শেষ জীবন পর্যন্ত কুমার ছিলেন। তিনি সুফী ছিলেন। তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন আশ্চর্য ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। অনেক বড় বড় আলেম ,যেমন প্রসিদ্ধ মারজা হাজী আগা হুসাইন বুরুজারদী ,হাজী আগা রহীম আরবাব ও অন্যান্য অনেকেই তাঁর ছাত্র ছিলেন। তিনি 1332 হিজরীতে ইসফাহানে মৃত্যুবরণ করেন। ইসফাহানের তাখতে ফোলাদে জাহাঙ্গীর খানের সমাধির নিকট তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়।

7. মির্জা মুহাম্মদ বাকের এসতেহবানাতী: তিনিও আগা আলী হাকিম কামশেহী ও মির্জা যেলভের ছাত্র ছিলেন। তিনি ফিকাহ্ ও হাদীসশাস্ত্র অধ্যয়নের জন্য আতাবাতে যান। সেখানে অনেক বড় বড় আলেম ,যেমন তাঁর সমসাময়িক প্রসিদ্ধ গবেষক শেখ মুহাম্মদ হুসাইন ইসফাহানী দারভী ও শেখ গোলাম রেযা ইয়াযদী তাঁর নিকট দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ইরানের শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনে (1326 হিজরী) এসতেহবানাতে শহীদ হন।

8. মির্জা আলী আকবর হুকমী ইয়াযদী কুমী: তিনি পূর্বোল্লিখিত তিনি শিক্ষক ছাড়াও মির্জা হুসাইন সাবযেওয়ারীর ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত শেষোক্ত ব্যক্তির নিকট তিনি এরফান ও যোগ সাধনা শিক্ষা লাভ করেছিলেন। শেষ জীবনে তিনি কোমে বসবাস শুরু করেন। যখন বিশিষ্ট মুজতাহিদ শেখ আবদুল করিম হায়েরী কোমে দীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তখন অনেক বড় বড় আলেম ,যেমন বিশিষ্ট মারজা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ তাকী খুনসারী ,সমসাময়িক মারজা সাইয়্যেদ আহমদ খুনসারী এবং আমার শিক্ষক আয়াতুল্লাহ্ খোমেনী তাঁর নিকট শিক্ষা লাভ শুরু করেন। মির্জা আলী আকবর 1345 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

9. শেখ আবদুন নবী নূরী: তিনি দর্শন ও ফিকাহ্ উভয় শাস্ত্রেই পণ্ডিত ছিলেন। তিনি ফিকাহ্ ও হাদীসশাস্ত্রে বড় মির্জা শিরাজীর ছাত্র এবং দর্শনশাস্ত্রে আগা আলী মুদাররেসের ছাত্র ছিলেন। সম্ভবত তিনি কামশেহী ও মির্জা যেলভেরও ছাত্র ছিলেন। তিনি 1344 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন । তাঁর কবর রেই শহরের শাহ আবদুল আযীমের মাযারের নিকট। শেখ আবদুন নবী বিভিন্ন জ্ঞানে পারদর্শী ছিলেন। তাকওয়া ও পরহেযগারীতেও তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। বিশিষ্ট ফকীহ্ ও দার্শনিক শেখ মুহাম্মদ তাকী আমুলী (মৃত্যু 1391 হিজরী) 14 বছর তাঁর ছাত্র ছিলেন।

10. মির্জা হুসাইন আলাভী সাবযেওয়ারী: তিনি হাজী সাবযেওয়ারীর নিকট দর্শনশাস্ত্র এবং মির্জা শিরাজীর নিকট উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তীক্ষ্ণ মেধা ও মুখস্থ করার ক্ষমতার জন্য প্রসিদ্ধ ছিলেন। তাঁর ইজতিহাদ করার ক্ষমতার বিষয়ে মির্জা শিরাজী এতটা প্রশংসা করেছেন যে ,অন্য কারো বিষয়ে তা শোনা যায়নি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তিনি সারাজীবন সাবযেওয়ারে অবস্থানের কারণে তাঁর নিকট হতে দীনী ছাত্ররা তেমন লাভবান হতে পারেনি। আলাভী সাবযেওয়ারী 1268 হিজরীতে জন্মগ্রহণ এবং 1352 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

11. শেখ গোলাম হুসাইন শাইখুল ইসলাম খোরাসানী: তিনিও হাজী সাবযেওয়ারীর ছাত্র। তিনি ছয় বছর তাঁর ছাত্র ছিলেন এবং দীর্ঘদিন পবিত্র মাশহাদ শহরে দর্শনশাস্ত্রের আলো বিতরণ করেছিলেন। শেখ গোলাম হুসাইনের বিশিষ্ট ছাত্রদের মধ্যে শেখ আব্বাস আলী খোরাসানীর নাম উল্লেখযোগ্য যিনি হাজ ফাজেল নামে প্রসিদ্ধ। তিনি 1246 হিজরীতে জন্ম এবং 1319 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

12. মির্জা মুহাম্মদ সুরুকাদী মাশহাদী: তিনি হাজী সাবযেওয়ারীর অন্যতম ছাত্র। তিনি মাশহাদের দর্শনশাস্ত্রের প্রসিদ্ধ শিক্ষকদের একজন। হাজী ফাজেল খোরাসানীও তাঁর ছাত্র ছিলেন।

13. মোল্লা মুহাম্মদ হায়দাজী জানজানী: তিনি জানজান ও কাযভীনে প্রাথমিক পড়াশোনার পর তেহরানে আসেন। তিনি সেখানে আগা মির্জা হুসাইন সাবযেওয়ারীর নিকট এরফান এবং মির্জা যেলভের নিকট দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর অধ্যয়ন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে আতাবাতে যান। সেখানেও ফিকাহ্ ও দর্শনশাস্ত্র অধ্যয়নে রত হন। পুনরায় তেহরানে ফিরে এসে অধ্যাপনায় রত হন। তিনি হাকিম সাবযাওয়ারীর শারহে মানজুমা গ্রন্থের টীকাগ্রন্থ লিখেন যা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হতে পুনঃপুন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি তাঁর পূর্বসূরিদের অনেকের মতই আত্মপরিশুদ্ধির পথে যথেষ্ট অগ্রসর ছিলেন এবং তাঁদের অনেকের অনুকরণে শেষ জীবন পর্যন্ত অবিবাহিত ছিলেন। তিনি 1339 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ফার্সী ও তুর্কী ভাষায় বেশ কিছু সুন্দর কবিতা রচনা করেছেন। তাঁর একটি আকর্ষণীয় ও উপদেশমূলক ওসিয়তনামা রয়েছে যা তাঁর কবিতাগ্রন্থের শেষে সংযোজিত করে মুদ্রিত হয়েছে।

বত্রিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

1. শেখ আব্বাস আলী ফাজেল খোরাসানী: তিনি মধ্যবর্তী একজন শিক্ষকের সূত্রে দর্শনশাস্ত্রে হাজী সাবযেওয়ারীর ছাত্র। ফিকাহ্শাস্ত্রে তিনি মির্জা শিরাজীর ছাত্র। তিনি গত শতাব্দীর বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারীদের অন্যতম নমুনা। তিন ব্যক্তি গত শতাব্দীর বহু বিষয়ক পণ্ডিতদের মধ্যে প্রবাদপুরুষ ছিলেন। তাঁরা হলেন মাশহাদের হাজী ফাজেল খোরাসানী ,তেহরানের হাজী শেখ আবদুন নবী নূরী এবং সাবযেওয়ারের হাজী মির্জা হুসাইন আলাভী। হাজী মির্জা হুসাইন তাঁদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন। হাজী ফাজেল তাঁর সময়ে মাশহাদে দর্শনের স্বীকৃত গ্রন্থসমূহের শিক্ষক হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। তিনি 1344 হিজরীতে মাশহাদে মৃত্যুবরণ করেন।

2. মির্জা আসকারী শাহিদী মাশহাদী: তিনি আগা বুযুর্গ হাকিম নামে প্রসিদ্ধ। তিনি মির্জা মাহ্দী শাহিদের বংশধর এবং মোল্লা আলী নূরীর সমপর্যায়ের। মির্জা মাহ্দী শাহিদীর মাশহাদের বাসস্থানটি দীর্ঘ দেড়শ বছর জ্ঞান ,প্রজ্ঞা ও ছাত্র প্রশিক্ষণের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। আগা বুযুর্গে হাকিম মির্জা জাবিহুল্লাহর পুত্র ছিলেন। মির্জা জাবিহুল্লাহ্ মির্জা হেদায়েতউল্লাহর সন্তান এবং তিনি মির্জা মাহ্দী শাহিদের পুত্র ও ছাত্র ছিলেন। মির্জা মাহ্দী শাহিদ আগা মুহাম্মদ বাইদাবাদী এবং শেখ হুসাইন আমেলীর ছাত্র ছিলেন।

আগা বুযুর্গ হাকিমের শিক্ষাজীবন সম্পর্কে আমার তেমন জানা নেই। সম্ভবত তিনি মাশহাদে স্বীয় পিতা ,মোল্লা সুরুকাদী এবং গোলাম হুসাইন শাইখুল ইসলামের নিকট প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরবর্তীতে মাশহাদ হতে তেহরানে আসেন। তিনি মির্জা যেলভের নিকট কিছুদিন দর্শনশাস্ত্র চর্চা করেন। তিনি হাকিম এশকাওয়ারী এবং হাকিম কেরমান শাহীর নিকটও শিক্ষা লাভ করেন।

আমি যখন আরবী ভাষার প্রাথমিক পড়াশোনার জন্য 1352 হতে 1354 হিজরী পর্যন্ত মাশহাদে অবস্থান করছিলাম তখন তাঁকে একজন সাধারণ ও অতিশয় বৃদ্ধরূপে দেখেছি। তাঁর পুত্র মির্জা মাহ্দী সে সময় মাশহাদের জমজমাট দীনী মাদ্রাসায় উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে প্রজ্বলিত ছিলেন। তিনি শারহে মানজুমা , আসফার এবং কেফায়া পড়াতেন। তাঁর বয়স তখন ত্রিশের অধিক ছিল। এ বয়সেই তিনি 1354 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুতে মাশহাদে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। পরবর্তী বছরই তাঁর পিতা আগা বুযুর্গ হাকিম মৃত্যুবরণ করেন। এ দু ব্যক্তির মৃত্যুর মাধ্যমে এ বংশের আলেম ধারার পরিসমাপ্তি ঘটে।

আগা বুযুর্গ হাকিম স্পষ্টভাষী ,স্বাধীনচেতা ও মুক্ত মনের অধিকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। যদিও তিনি খুবই দরিদ্র অবস্থায় জীবনযাপন করতেন তথাপি কারো নিকট হতে কিছু গ্রহণ করতেন না। একবার তাঁর এক আলেম বন্ধু তাঁর দারিদ্র্যের অবস্থার কথা জানতে পেরে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে মোটা অংকের অনুদান সংগ্রহ করেন এবং তা পত্রসহ তাঁর নিকট প্রেরণ করেন। তিনি পত্র পাঠে বিষয়টি অবহিত হয়ে খামের বিপরীত দিকে লিখেন , আমি দরিদ্র অবস্থায়ও সন্তুষ্ট থাকার সম্মানকে হারাতে চাই না। অতঃপর প্রেরিত অর্থসহ খামটি ফেরত পাঠান।

3. আগা সাইয়্যেদ হুসাইন বাদকুবেয়ী: আগা বাদকুবেয়ী 1293 হিজরীতে বাদকুবেয়ীর একটি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করার পর তেহরানে আসেন। এখানে তিনি মির্জা যেলভের নিকট এরফান এবং হাকিম এশকাওয়ারী ও হাকিম কেরমান শাহীর নিকট দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর তিনি নাজাফে যান এবং আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাযেম খোরাসানী ও শেখ হাসান মামাকানীর নিকট উসূলে ফিকাহ্শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। আল্লামা তেহরানী তাঁর নুকবাউল বাশার গ্রন্থে বলেছেন ,আগা বাদকুবেয়ী নাজাফে দর্শন ও ফিকাহ্ উভয় শাস্ত্রে প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক বিভিন্ন শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। অনেক বড় বড় আলেম তাঁর নিকট শিক্ষা লাভ করেছেন। আমাদের শিক্ষক আল্লামা সাইয়্যেদ মুহাম্মদ হুসাইন তাবাতাবায়ী ইবনে সিনার শিফা গ্রন্থের তাবইয়াত ও ইলাহিয়াত অধ্যায় পুরোটাই তাঁর নিকট পড়েছিলেন। আল্লামা তেহরানীর বর্ণনামতে আগা বাদকুবেই এবং শেখ মুহাম্মদ হুসাইন গারভী সে সময় নাজাফে দর্শনশাস্ত্রের দু দিকপাল ছিলেন। এ মহান আলেম 1358 হিজরীতে নাজাফে মৃত্যুবরণ করেন।

4. অগা মির্জা মুহাম্মদ আলী শাহ আবাদী তেহরানী: তিনি প্রকৃতপক্ষে ইসফাহানের অধিবাসী ছিলেন। তিনি বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক উভয় শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন। তিনি মির্জা যেলভে এবং মির্জা এশকাওয়ারীর নিকট দর্শন ও এরফানশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। তিনি তেহরানে মির্জা হাসান আশতিয়ানীর নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে নাজাফ ও সামেরায় আখুন্দ খোরাসানী ও মির্জা মুহাম্মদ তাকী শিরাজীর নিকট উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্রের উচ্চতর পড়াশোনা করেন। তিনি তেহরানে মারজা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলেন। শেখ আবদুল করিম হায়েরীর কোমে অবস্থানকালে তিনি কোমে চলে আসেন এবং শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি এরফানশাস্ত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আয়াতুল্লাহ্ খোমেনী এই মহান ব্যক্তির নিকট পড়াশোনা করেছেন এবং এরফানশাস্ত্রে তাঁর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। তিনি 1369 হিজরীতে তেহরানে মৃত্যুবরণ করেন।

5. আগা সাইয়্যেদ আলী মুজতাহিদ কাজেরুনী শিরাজী: তিনি সাইয়্যেদ আব্বাস মুজতাহিদ কাজেরুনীর পুত্র। তিনি 1278 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। 1291 হিজরীতে তিনি কাজেরুন হতে শিরাজে আসেন। 1304 হিজরী পর্যন্ত শিরাজে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক জ্ঞান অধ্যয়নে রত থাকেন। তিনি হাকিম আব্বাস দারাবীর ছাত্র শেখ আহমাদ শিরাজী নাজাফী এবং শেখ মুহাম্মদ হুসাইন শানেসাযের নিকট যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। সম্ভবত তিনি হাকিম আব্বাস দারাবীর (মৃত্যু 1300 হিজরী) নিকটও কিছুদিন পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি 1304 হতে 1315 হিজরী পর্যন্ত নাজাফে অবস্থান করেন এবং আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাযেম খোরাসানীর নিকট ফিকাহ্শাস্ত্র পড়াশোনা করেন। তিনি 1319 হিজরী হতে শেষ জীবন পর্যন্ত (1343 হিজরী) শিরাজে দর্শন ও এরফানশাস্ত্র শিক্ষাদানে রত থাকেন। শিরাজে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক শাস্ত্রের ছাত্রদের অধিকাংশই তাঁর ছাত্র। অগা সাইয়্যেদ আলী মুজতাহিদ পূর্ববর্তী সৎকর্মশীল আলেমদের মধ্যকার একজন আদর্শ ব্যক্তিত্ব। তাঁর ছাত্র ও শিরাজের সাধারণ মানুষদের নিকট থেকে তাঁর পবিত্র আত্মার পরিচয় বহনকারী অনেক ঘটনা শোনা যায়।

6. আগা শেখ মুহাম্মদ খোরাসানী গুণাবাদী ইসফাহানী: তিনি আগা শেখ মুহাম্মদ হাকিম আগা শেখ মুহাম্মদ খোরাসানী এ উভয় নামেই প্রসিদ্ধ। তিনি আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাশী ও জাহাঙ্গীর খান কাশকায়ীর ছাত্র ছিলেন। তাঁদের দু জনের মৃত্যুর পর তিনি ইসফাহানে দর্শনশাস্ত্রের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক হন। তিনি ইসফাহানের সাদর মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। হাজী মির্জা আলী আগা শিরাজী এবং তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জালালউদ্দীন হুমায়ী তাঁর ছাত্র ছিলেন। হাকিম খোরাসানী আত্মিক পরিশুদ্ধতার ক্ষেত্রে বিরল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি তাঁর শিক্ষক জাহাঙ্গীর খান ও আখুন্দ কাশীর ন্যায় শেষ জীবন পর্যন্ত অবিবাহিত ছিলেন। তিনি 1355 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুর পর হাজী আগা সাদর কুপায়ী এবং শেখ মাহমুদ মুফিদ ইসফাহানের এ জ্ঞানকেন্দ্রের আলোকে প্রজ্বলিত রেখেছিলেন। এ দু ব্যক্তির মৃত্যুর পর ইসফাহানের জ্ঞান কেন্দ্রটি চারশ বছর আলো বিতরণের পর প্রায় নিভে গিয়েছিল।

7. হাজী শেখ মুহাম্মদ হুসাইন গারভী ইসফাহানী: তিনি জ্ঞান (বুদ্ধিবৃত্তিক ও বর্ণনামূলক) ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। তিনি 1296 হিজরীতে নাজাফে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা কাযেমাইনের একজন ধার্মিক ব্যবসায়ী ছিলেন।

মুহাম্মদ হুসাইন গারভী বিশ বছর বয়স পর্যন্ত কাযেমাইনে ছিলেন এবং সেখানে প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্ন করেন। অতঃপর তিনি নাজাফে চলে আসেন। সেখানে তিনি আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাযেম খোরাসানীর শেষ জীবন পর্যন্ত (1329 হিজরী) তাঁর ছাত্র হিসেবে পড়াশোনা করেন। তিনি দর্শনশাস্ত্রে মির্জা মুহাম্মদ বাকের হাকিম এসতেহবানাতীর ছাত্র ছিলেন। উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্রে মুহাম্মদ হুসাইন গারভী ইসফাহানীর রচিত অনেক গ্রন্থ রয়েছে যেগুলো ফিকাহ্ ও উসূলশাস্ত্রের ছাত্রদের জন্য আজও চিন্তার খোরাক যুগিয়ে আসছে ও জীবন্ত রয়েছে। তিনি তোহফাতুল হাকিম নামে দর্শনের একটি আকর্ষণীয় গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি পরকাল সম্পর্কিত একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক আল্লামা মুহাম্মদ হুসাইন তাবাতাবায়ী দীর্ঘ দশ বছর (1344-1354 হিজরী) এ মহান ব্যক্তির নিকট শিক্ষা লাভ করেছেন এবং এ নিয়ে গর্ববোধ করতেন। তিনি 1361 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন।

8. আগা শেখ মুহাম্মদ তাকী আমোলী: তিনি 1304 হিজরীতে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় পিতা বিশিষ্ট দার্শনিক আগা শেখ মুহাম্মদ আমোলীর (1263-1336 হিজরী) নিকট দর্শন ও ফিকাহ্শাস্ত্রের প্রাথমিক পড়াশোনা করেন। অতঃপর মির্জা কেরমান শাহীর মৃত্যুর পর তিনি শেখ আবদুন নবী মুজতাহিদ নূরীর নিকট প্রায় চৌদ্দ বছর পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে নাজাফে হিজরত করেন। সেখানে হাজী মির্জা হুসাইন নায়িনী ,সাইয়্যেদ আবুল হাসান ইসফাহানী এবং অগা জিয়াউদ্দীন ইরাকীর নিকট উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষা লাভ করেন। তিনি মহান আরেফ হাজী মির্জা আলী আগা কাজী ফায়েযের নিকট আখলাক বিষয়ে পড়াশোনা করেন। তিনি তেহরানে অবস্থানকালে ফিকাহ্ ও দর্শন উভয় শাস্ত্রই শিক্ষাদান করতেন। তাঁর সবচেয়ে প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো হাকিম সাবযেওয়ারীর শারহে মানজুমা গ্রন্থের টীকা গ্রন্থ। ফিকাহ্শাস্ত্রে তাঁর প্রসিদ্ধ গ্রন্থ হলো শারহে উরওয়াতুল উসকা যেটি একটি দলিলভিত্তিক বই। তিনি 1391 হিজরীতে তেহরানে মৃত্যুবরণ করেন।

9. আগা মির্জা মাহ্দী আশতিয়ানী: তিনি বর্তমান শতাব্দীর (চতুর্দশ হিজরী শতাব্দী) শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের অন্যতম। তাঁর পিতা মির্জা জাফর যিনি মির্জা কুচাক নামে প্রসিদ্ধ আগা মুহাম্মদ রেজা হাকিম কামশেয়ীর ছাত্র ছিলেন। তাঁর মাতা তেহরানের প্রসিদ্ধ মুজতাহিদ মির্জা হাসান অশতিয়ানীর কন্যা।

মির্জা মাহ্দী মির্জা হাসান কেরমান শাহী এবং মির্জা হাশেম এশকাওয়ারীর ছাত্র। তিনি দীর্ঘদিন তেহরানে দর্শন ও এরফানশাস্ত্রের শিক্ষক ছিলেন। তিনি 1365-1366 হিজরীর দিকে কোমের ছাত্র ও শিক্ষকদের আহ্বানে কোমে আসেন এবং সেখানে শিক্ষকতায় রত হন। আমি সে সময় কিছুদিন তাঁর ছাত্র ছিলাম।

তিনি বেশ কিছু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। তিনি যুক্তিবিদ্যা ও দর্শনের টীকাগ্রন্থ লিখেছেন যা শারহে মানজুমা গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে রচিত। তিনি কায়েদাতুল ওয়াহেদ (একত্বের নিয়ম) এবং ওয়াহ্দাতে উজুদ (অস্তিত্বের একতা) সম্পর্কিত আসাসুত তাওহীদ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন। তাঁর রচিত অন্যান্য গ্রন্থ সম্পর্কে আমার তেমন ধারণা নেই। তিনি 1372 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

10. আগা মির্জা আহমাদ আশতিয়ানী: তিনি হাজী মির্জা হাসান মুজতাহিদ আশতিয়ানীর কনিষ্ঠ পুত্র ছিলেন। তিনি ফিকাহ্ ,দর্শনশাস্ত্রসহ বিভিন্ন জ্ঞানে পণ্ডিত ছিলেন। তাকওয়া-পরহেজগারীর ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রবাদপুরুষ। তিনি চল্লিশ বছরের অধিক সময় ধরে তেহরানে উসূল ,ফিকাহ্ ও দর্শনশাস্ত্র শিক্ষা দান করেছেন। তিনি হাকিম কেরমান শাহী ও হাকিম এশকাওয়ারীর ছাত্র ছিলেন।

তিনি 1345 হিজরীতে ফিকাহ্শাস্ত্রের শিক্ষা পূর্ণ করার উদ্দেশ্যে নাজাফে যান। সেখানে পাঁচ বছর অবস্থান করেন। সেখানে তিনি শিক্ষকতাও করেন। অনেক স্বনামধন্য মুজতাহিদ ও শিক্ষকও তাঁর নিকট দর্শনের আসফার গ্রন্থটি পড়তেন। আমার শিক্ষক আল্লামা তাবাতাবায়ী সে সময় আসফার গ্রন্থটির কিছু অংশ তাঁর নিকট পড়েছেন। এ মহান ব্যক্তি প্রায় শত বছর বয়সে 1395 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

11. আগা মির্জা তাহের তানকাবানী: তিনিও বর্তমান শতাব্দীর দর্শনের প্রথম শ্রেণীর শিক্ষকদের একজন। দর্শনের বিভিন্ন মতের ওপর তাঁর আশ্চর্যজনক দখল ছিল। তিনি 1280 হিজরীতে মাজেনদারানের কালারদাসতে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাথমিক পড়াশোনা সম্পন্নের পর তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে তেহরানে আসেন। তিনি মির্জা যেলভে ,হাকিম কামশেয়ী এবং হাকিম মুদাররেসের নিকট শিক্ষা লাভ করেছিলেন ,তবে হাকিম কেরমান শাহী এবং হাকিম নাইরেযীর নিকট শিক্ষা লাভ করেছেন কি না তা আমার জানা নেই। পূর্বোক্ত তিন দার্শনিকের (তাঁর শিক্ষকত্রয়) পর তিনি দর্শনের ক্ষেত্রে তেহরানে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে অভিহিত হন। তিনি 1360 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

12. আগা সাইয়্যেদ আবুল হাসান রাফিয়ী কাযভীনী: তিনি বর্তমান শতাব্দীর শেষার্ধের প্রসিদ্ধ শিক্ষকদের একজন। তিনি বর্ণনামূলক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উভয় জ্ঞানেই পণ্ডিত ছিলেন। তিনি হাকিম কেরমান শাহী ও হাকিম এশকাওয়ারীর নিকট দর্শন শিক্ষা লাভ করেছিলেন। কোমের দীনী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার পর তিনি শেখ আবদুল করিম হায়েরীর আহ্বানে কোমে আসেন। কিছুদিন আয়াতুল্লাহ্ হায়েরীর নিকট শিক্ষা লাভের পর তিনি হাকিম সাবযেওয়ারীর শারহে মানজুমা ও মোল্লা সাদরার আসফার গ্রন্থ শিক্ষাদান শুরু করেন। আমার মহান শিক্ষক আয়াতুল্লাহ্ খোমেনী শারহে মানজুমা সহ আসফার গ্রন্থের কিছু অংশ তাঁর নিকট পড়েছেন এবং তাঁর পাঠ দানের পদ্ধতি ও বর্ণনার প্রশংসা করতেন। সাইয়্যেদ রাফিয়ী কাযভীনী আয়াতুল্লাহ্ হায়েরীর জীবদ্দশাতেই কাযভীনে ফিরে যান । সেখানে দর্শনের ছাত্ররা তাঁর নিকট শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে আসতেন। পরবর্তীতে তিনি মারজা হন এবং তেহরানে বসবাস শুরু করেন । তিনি 1394 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

13. আগা শেখ মুহাম্মদ হুসাইন ফাজেল তুনী: তিনি বর্তমান শতাব্দীর দর্শনের প্রসিদ্ধ শিক্ষকদের অন্যতম। দর্শনের ইলাহিয়াত অধ্যায়ের ওপর ভিত্তি করে তিনি একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন যার ভূমিকাতে নিজেকে জাহাঙ্গীর খান ও হাকিম এশকাওয়ারীর ছাত্র বলে পরিচয় দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কলেজে সাহিত্য ,দর্শন ও ফিকাহ্শাস্ত্র শিক্ষাদান শুরু করেন। তিনি কায়সারী রচিত শারহে ফুসুস গ্রন্থের ভূমিকার ওপর টীকা লিখেছেন। তিনি 1309 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

14. সাইয়্যেদ মুহাম্মদ কাযেম আসসার: তিনি বর্তমান শতাব্দীর দর্শনের শিক্ষকদের অন্যতম। তিনি 1305 হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। 18 বছর বয়সে তিনি ইসফাহানে আসেন এবং সেখানে তিন বছর জাহাঙ্গীর খান ও আখুন্দ মোল্লা মুহাম্মদ কাশীর নিকট দর্শন শিক্ষা লাভ করেন। অতঃপর ছয় বছর তেহরানে অবস্থান করেন। সেখানে তিনি হাকিম এশকাওয়ারী ,হাকিম কেরমান শাহী এবং হাকিম নাইরিযীর নিকট দর্শন শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি আতাবাতে যান। দশ বছর সেখানে তিনি বিশিষ্ট শিক্ষকদের নিকট উসূল ও ফিকাহ্শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন। 1340 হিজরীতে 35 বছর বয়সে তিনি তেহরানে ফিরে আসেন এবং উসূল ,ফিকাহ্ ও দর্শন শিক্ষাদান শুরু করেন। 1353 হিজরীতে তেহরান বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন সাহিত্য ,দর্শন ও ফিকাহ্ বিষয়ক বিভাগে শিক্ষাকতা শুরু করেন। 1365 হিজরীতে তেহরানের সেপাহ্সালার মাদ্রাসাটি দীনী বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বীকৃতি লাভ করলে তিনি সেখানে শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন এবং শেষ জীবন পর্যন্ত এখানেই এ পেশায় রত থাকেন।

সাইয়্যেদ মুহাম্মদ কাযেম আসসার একজন খোলামনের মানুষ ছিলেন। সবকিছুই তিনি হালকাভাবে গ্রহণ করতেন। তিনি ওয়াহ্দাতে উজুদ ,বাদা (ভাগ্যের পরিবর্তন) ,হাদীসশাস্ত্র এবং তাফসীর সম্পর্কিত গ্রন্থ রচনা করেছেন। তিনি 1394 হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন।

তেত্রিশতম স্তরের দার্শনিকগণ

এ স্তরের দার্শনিকগণ আমার শিক্ষক পর্যায়ের। বিশেষ কিছু কারণে এ সম্পর্কিত বর্ণনা হতে আপাতত বিরত থাকছি। সুবিধা অনুযায়ী অন্য সময় ও স্থানে ইনশাআল্লাহ্ আলোচনা করব।

দার্শনিকদের এরূপ স্তরবিন্যাস ইতোপূর্বে কেউ করেছেন বলে আমার জানা নেই। প্রথমবারের মত আমি এটি করায় স্বাভাবিকভাবেই কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে। প্রথম ত্রুটি হলো এটি সামগ্রিক হয়নি। অনেকেই হয়তো অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েছেন আবার অনেককে আমি নিজেই বাদ দিয়েছি। কারণ এ সকল স্তরের সকল দার্শনিকের নামের তালিকা ও বিবরণ দান আমাদের উদ্দেশ্য ছিল না। তা ছাড়া এ কাজটি সহজও নয়। আমরা শুধু সেই সকল দার্শনিক যাঁরা শিক্ষাদান ,ছাত্র প্রশিক্ষণ কিংবা গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে দর্শনশাস্ত্রকে পরবর্তী স্তরে উত্তরণে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন তাঁদের নিয়েই এখানে আলোচনা করেছি । কারণ তাঁরা ইসলামী সংস্কৃতি ও জ্ঞানের এ বিশেষ ধারাটির টিকিয়ে রাখা ও অগ্রযাত্রায় ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছেন। সবশেষে কয়েকটি বিষয় উল্লেখের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি :

1. এ স্তর বিন্যাসটি অন্যান্য স্তর বিন্যাসের মতই পূর্ণ ও যথার্থ নয়। যদিও এই স্তর বিন্যাসটি ছাত্র-শিক্ষকের সময়গত অবস্থান অনুযায়ী করা হয়েছে তদুপরি আমরা জানি যে সকল ছাত্র একই শিক্ষকের নিকট থেকে শিক্ষা লাভ করেন তাঁরা সকলেই এক স্তরের (সময় অনুযায়ী) নন ;বিশেষভাবে যখন ঐ শিক্ষক দীর্ঘদিন যাবত শিক্ষাদান করেন। সাধারণত তাঁর ছাত্রদের মধ্যে বয়স অনুযায়ী ও শিক্ষা লাভের সময় অনুযায়ী কেউ অগ্রগামী কেউ পশ্চাদ্গামী।

উদাহরণস্বরূপ হাজী সাবযেওয়ারীকে আমরা মির্জা যেলভে এবং হাকিম কামশেয়ীর সমস্তরে উল্লেখ করেছি। যদিও হাজী সাবযেওয়ারী তাঁদের চেয়ে বয়সে অনেক বড় ছিলেন এবং মির্জা যেলভে ছিলেন তাঁদের কনিষ্ঠ (এমনকি আমরা উল্লেখ করেছি মির্জা যেলভে হাজী সাবযেওয়ারীর নিকট শিক্ষা লাভের জন্য সাবযেওয়ার যেতে চেয়েছিলেন ,কিন্তু তেহরানেই থেকে যান)। কারণ যেমনভাবে মির্জা যেলভে ও হাকিম কামশেয়ী মোল্লা আলী নূরীর ছাত্রের ছাত্র ছিলেন ঠিক তেমনিভাবে হাজী সাবযেওয়ারী মোল্লা ইসফাহানীর ছাত্র হিসেবে জনাব নূরীর ছাত্রের ছাত্র।

2. তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধ হতে ইসলামী দর্শনের ইতিহাস শুরু হয়। তখন থেকে চতুর্থ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত অনুবাদের যুগ বলে পরিচিত। এই সময়কালের অধিকাংশ দার্শনিকই অনুবাদক ছিলেন এবং অধিকাংশ অনুবাদকও দার্শনিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। অবশ্য কোন কোন অনুবাদক যেমন দার্শনিক ছিলেন না তেমনি অনেক দার্শনিক ও অনুবাদক ছিলেন না। তবে দর্শনের সংকলন ও গবেষণার যুগ অনুবাদের যুগ হতে পৃথক নয় যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করেছেন। তাঁরা মনে করেছেন ,ইসলামী দর্শনের ইতিহাসে এক বা দু শতাব্দীতে শুধু অনুবাদ হয়েছে এবং সে সময় কোন প্রকৃত দার্শনিক ছিলেন না। পরবর্তীতে প্রকৃত অর্থে দার্শনিকের আগমন হয়। কিন্তু এটি সঠিক নয় ,বরং প্রথম যুগেই অনুবাদ শুরুর সাথে সাথে ইয়াকুব ইবনে ইসহাক কিন্দীর ন্যায় বিরল প্রতিভার দার্শনিকের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং তিনি অনেক দার্শনিক তৈরি করেছেন। আল কিন্দী হুনায়েন ইবনে ইসহাক ইবাদী এবং আবদুল মাসিহ হেমসির ন্যায় অনুবাদকদের সমসাময়িক এবং সাবেত ইবনে কোররাহ্ ও অন্যান্য দর্শন গ্রন্থ অনুবাদকদের পূর্ববর্তী সময়ের।

3. দর্শনের অনুবাদকদের অধিকাংশই ছিলেন ইহুদী ,খ্রিষ্টান ও সাবেয়ী। অনুবাদকদের মধ্যে মুসলমান খুবই কম ছিলেন। তাঁদের মধ্যে কোন যারথুষ্ট্র অনুবাদকও ছিলেন না। আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফ্ফাকে একমাত্র যারথুষ্ট্র অনুবাদক হিসেবে অনেকে বলেছেন যদিও প্রকৃতপক্ষে তিনি যারথুষ্ট্র ছিলেন না ;বরং মনুয়ী ধর্মের অনুসারী ছিলেন এবং পরবর্তীতে মুসলমান হন। কিন্তু এই পর্যায়ের দার্শনিকদের মধ্যে যাঁরা স্বতন্ত্র মতের অধিকারী ছিলেন তাঁরা সকলেই মুসলমান। এই স্তরের দার্শনিকদের মধ্যে একজন অমুসলমানকেও খুঁজে পাওয়া যায় না। এ বিষয়টি ইতিহাস ও সমাজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে গবেষণার দাবি রাখে।

4. অনুবাদের যুগের পরবর্তী যুগ অর্থাৎ অনুবাদের যুগ হতে ষষ্ঠ বা সপ্তম হিজরী পর্যন্ত অধিকাংশ দার্শনিক দর্শনের পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যার চর্চা করতেন। তাই তাঁরা একদিকে যেমন দার্শনিক ছিলেন অন্যদিকে ছিলেন চিকিৎসাবিদ। যেমন ইবনে সিনা একই সাথে দার্শনিক ও চিকিৎসাবিদ ছিলেন। এ সকল দার্শনিকদের কেউ কেউ চিকিৎসক হিসেবে অধিকতর প্রসিদ্ধ ছিলেন।

দার্শনিক-চিকিৎসাবিদদের এ যুগের দার্শনিকদের মধ্যে মুসলমান ,ইহুদী ও খ্রিষ্টান সকলেই ছিলেন। সাবেয়ীনদের মধ্যে এরূপ ব্যক্তিত্বের সন্ধান পাওয়া যায় না। এ যুগে উচ্চমানের ইহুদী ও খ্রিষ্টান বেশ কিছু চিকিৎসকের কথা আমরা জানি যাঁরা পাশাপাশি দার্শনিকও ছিলেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে কেউ উচ্চমানের দার্শনিক ছিলেন না। উদাহরণস্বরূপ আবুল ফারায ইবনুত ত্বিব ইবনে সিনার সমসাময়িক ছিলেন এবং একজন বড় চিকিৎসক হিসেবে ইবনে সিনা তাঁর প্রশংসা করেছেন ,কিন্তু তিনি দর্শনের চর্চা করলেও ইবনে সিনাসহ অন্য কেউই তাঁকে দার্শনিক বলে মনে করতেন না। তবে এ ক্ষেত্রে আবুল বারাকাত বাগদাদী এবং এমনকি আবুল খায়ের হাসান ইবনে সাওয়ারকে ব্যতিক্রম বলা যেতে পারে। কারণ আবুল বারাকাত ইহুদী হিসেবে স্বকীয় চিন্তার দার্শনিক ছিলেন। অনুরূপ খ্রিষ্টান হিসেবে আবুল খায়ের। তবে আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি এ দু ব্যক্তিই পরবর্তীতে মুসলমান হয়েছিলেন। অনুবাদের যুগে আমরা যেমন লক্ষ্য করেছিলাম কেবল মুসলমান দার্শনিকগণই স্বকীয় দর্শন চিন্তার অধিকারী ছিলেন ,তেমনি দার্শনিক-চিকিৎসকের যুগেও আমরা লক্ষ্য করি যে ,এ যুগে অমুসলমানদের মধ্যে উচ্চমানের চিকিৎসক থাকলেও তাদের মধ্যে স্বকীয় দর্শন চিন্তার তেমন কোন অস্তিত্ব ছিল না। এ বিষয়টি থেকে বুঝা যায় ,অন্যান্য ধর্ম হতে ইসলামী শিক্ষা ও ইসলামের প্রাণ দর্শন ও বুদ্ধিবৃত্তির সাথে অধিকতর সঙ্গতিশীল।

সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো ইসলামী যুগের দর্শন ও চিকিৎসাশাস্ত্রের বারোশ বছরের ইতিহাসে কোন যারথুষ্ট্র দার্শনিক ও চিকিৎসকের সন্ধান আমরা পাই না (সম্ভবত গণিতশাস্ত্রের ক্ষেত্রেও তাই)। স্বভাবতই এ যুগে যেমনিভাবে ইহুদী ও খ্রিষ্টানগণ জ্ঞান ,সংস্কৃতি ও দর্শনের আন্দোলনে মুসলমানদের পাশাপাশি যে ভূমিকা রেখেছেন যারথুষ্ট্রগণও তা রাখতে পারতেন ,কিন্তু তাঁরা এ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেননি। ইসলামপূর্ব যুগেও বিশ্ব সংস্কৃতিতে তাঁদের কোন ভূমিকা ছিল না। ইসলামপূর্ব যুগে ইরানের জ্ঞান ও সংস্কৃতির মশাল খ্রিষ্টান ,ইহুদী এবং সাবেয়ীরাই বহন করত এবং জান্দী শাপুরের বিশ্ববিদ্যালয়টি তারাই পরিচালনা করত।

ইসলামী যুগে একমাত্র বাহমানইয়ার ইবনে মার্জবান (আজারবাইজানের অধিবাসী) যারথুষ্ট্র ছিলেন যিনি পরবর্তীতে মুসলমান হন। চিকিৎসকদের মধ্যে একমাত্র আলী ইবনে আব্বাস যিনি ইবনুল মাজুসী নামে প্রসিদ্ধ তিনি যারথুষ্ট্র ছিলেন বলে মনে করা হয় । কিন্তু এডওয়ার্ড ব্রাউনসহ অনেকেই তাঁকে মুসলিম চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তদুপরি তাঁর নাম হতেও বুঝা যায় তিনি মুসলমান ছিলেন এবং হয়তো তাঁর পূর্বপুরুষগণ যারথুষ্ট্র ছিলেন।

প্রকৃত কথা হলো যারথুষ্ট্র ধর্মটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল (বা একে পৌঁছানো হয়েছিল) যে ,কখনই তা জ্ঞান ও দর্শনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না। তাই যদি কেউ তা অস্বীকার করে জ্ঞান অন্বেষনে লিপ্ত হতেন পরিশেষে দেখা যেত তিনি যারথুষ্ট্র ধর্ম ত্যাগ করেছেন।

5. মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে অধিকাংশই শিয়া ছিলেন। শিয়া সম্প্রদায় বহির্ভূত দার্শনিকদের মধ্যে একমাত্র স্পেনের দার্শনিকগণ ছাড়া (যাঁরা শিয়া পরিবেশ ও চিন্তা হতে দূরে ছিলেন) বাকিরা প্রায় সকলেই শিয়া চিন্তা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এ বিষয়টি প্রমাণ করে যে ,শিয়াদের বুদ্ধিবৃত্তি প্রথম হতেই দর্শনকেন্দ্রিক ছিল। আমরা নাহজুল বালাগা র তাৎপর্য গ্রন্থে (সেইরী দার নাহজুল বালাগাহ্) এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। এ বিষয়ে অধিক আলোচনার জন্য আরো বেশি সময় প্রয়োজন। তাই এখানে তা হতে বিরত থাকছি।

6. দর্শন ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে ইরানীদের অবদান ইসলামী সংস্কৃতিতে অ-ইরানীদের সমগ্র অবদান হতে এতটা অধিক যে ,তাতে ইরানীদের নিরঙ্কুশ প্রাধান্যই ফুটে উঠেছে ;বিশেষত দশম হিজরী শতাব্দী হতে যখন ইরানে নিরঙ্কুশ শিয়া প্রাধান্য লাভ করে তখন এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ সময় হতে মুসলিম দার্শনিকদের সকলেই ইরানী। যদিও ইরানীরা ইসলামী দর্শনের সূচনাকারী নয় এবং সর্বপ্রথম মুসলিম দার্শনিক একজন আরব ,তদুপরি দর্শনশাস্ত্রের সঙ্গে পরিচয় লাভের পর হতে ইরানীরা এর পতাকা স্বহস্তে ধারণ করে এবং অন্যান্য সকল জাতি হতে দর্শনের সঙ্গে অধিকতর স ¤পৃক্ত হয়ে পড়ে। আমার দৃষ্টিতে এর পেছনে দু টি কারণ রয়েছে। প্রথমত যারথুষ্ট্রদের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও (ইসলামপূর্ব যুগে) ইরানীদের চিন্তার প্রকৃতি ছিল দর্শনভিত্তিক। দ্বিতীয়ত ইরানে শিয়া চিন্তার প্রভাব। যদি ইরানী দার্শনিকদের মধ্য হতে আরব ,তুর্কী বা অন্য কোন বংশোদ্ভূতদের পৃথক না করি (যেমন ফখরুদ্দীন রাযী ,জালালউদ্দীন দাওয়ানী ,সাদরুদ্দীন দাশতাকী ,গিয়াসউদ্দীন দাশতাকী প্রমুখদের বাদ না দিই) তবে বলা যায় অ-ইরানী দার্শনিকদের সংখ্যা নগণ্য।

অ-ইরানী দার্শনিকদের মধ্যে একদল হলেন অমুসলমান। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মিশর ,সিরিয়া ,স্পেন প্রভৃতি স্থানের চিকিৎসক-দার্শনিকগণ। অপর দল হলেন অ-ইরানী মুসলমান ,যেমন ইবনে হাইসাম বাসরী মিশরী ,আবুল বারাকাত বাগদাদী ,আলী ইবনে রেজওয়ান মিশরী আল কিন্দী ,ইবনে রুশদ ,ইবনে তোফাইল ,ইবনুস সায়িতা ,কুতুবউদ্দীন মিশরী ,কামালউদ্দীন ইউনুস মৌসেলী এবং কারো কারো মতে ফারাবীও এদের অন্তর্ভুক্ত।

7. ইবনে সিনার পূর্বে দর্শন শিক্ষার কেন্দ্র ছিল বাগদাদ। ইবনে সিনা এ কেন্দ্রকে ইরানে স্থানান্তর করেন। ইবনে সিনা কোন সময়েই বাগদাদে যাননি ,এমনকি তাঁর দর্শনের কোন শিক্ষকও ছিল না ,যদিও একজন শিক্ষকের নিকট কিছুদিন যুক্তিবিদ্যা পড়েছিলেন। ইবনে সিনার বিরল প্রতিভা ও প্রসিদ্ধি জ্ঞান অন্বেষণকারীদের বিভিন্ন স্থান হতে তাঁর নিকট আসতে ও তাঁর গ্রন্থসমূহ অধ্যয়নে উদ্বুদ্ধ করত। তাঁর গ্রন্থসমূহ ছিল পূর্ববর্তী সকল গ্রন্থের যুক্তি খণ্ডনকারী ও সমালোচক। যদিও প্রথমদিকে তাঁর গ্রন্থসমূহের পাঠদানকারী শিক্ষকরা শুধুই ইরানী ছিলেন তবে পরবর্তীতে তা ইরানের বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ইবনে সিনার চিন্তার প্রভাব ,তাঁর লিখিত অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রন্থসমূহ এবং এ গ্রন্থসমূহের পাঠদানকারী তাঁর সকল ছাত্রই ইরানী হওয়ায় বাগদাদ হতে দর্শনের কেন্দ্র ইরানে স্থানান্তরিত হয়। যদিও এ সময় বাগদাদে ইবনে সিনার গ্রন্থসমূহ পাঠদান শুরু হয় তবে বাগদাদের পূর্বের সেই জৌলুস ছিল না।

পরবর্তীতে ইবনে সিনার ছাত্রের ছাত্র আবুল আব্বাস লুকারী ইরানে দর্শন শিক্ষাকেন্দ্রটি যা ইরানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল- তার বিস্তৃতি ঘটিয়ে খোরাসান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করেন।

8. পরবর্তীতে একদিকে মোগলদের আক্রমণ ও অপরদিকে গাজ্জালীর মতো ব্যক্তিদের হামলায় ইরানের বাইরে দর্শনের শিকড় উৎপাটিত হয়। তবে ইরানে দর্শনের প্রদীপ তখনও টিম টিম করে জ্বলছিল। অতঃপর ধীরে ধীরে এ দুর্বল প্রদীপটি শক্তি সঞ্চয় করে আলো দিতে শুরু করে। এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল ফার্স প্রদেশ। আরো পরে সাফাভীরা ক্ষমতায় আসলে ইসফাহানে জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আন্দোলন নতুনভাবে শুরু হয় এবং মীর দামাদ ও মোল্লা সাদরার মাধ্যমে দর্শন পূর্ণ দীপ্তি নিয়ে উদ্ভাসিত হয়।

9. সাফাভীদের সময়কাল হতে ইসলামী দর্শন ইরানী শিয়াদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। তবে ইরানের সব অঞ্চল সমানভাবে ইসলামী দর্শনে ভূমিকা রাখেনি। কোন কোন অঞ্চল বর্ণনামূলক জ্ঞানের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় ভূমিকা রাখলেও বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই রাখেনি বা রাখলেও তা নগণ্য। খুজিস্তান আরবী ব্যাকরণ ,হাদীস এবং ফিকাহ্শাস্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও দর্শন ও প্রজ্ঞার ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই রাখেনি। সিস্তান-বেলুচিস্তানের ব্যাপারটিও অনুরূপ। এ অঞ্চলের একমাত্র ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব হলেন আবু সোলায়মান মানতেকী সাজেস্তানী। কোন কোন প্রদেশ স্বল্প ভূমিকা রেখেছে। যেমন আজারবাইজান। আজারবাইজানের বিশিষ্ট দার্শনিকদের মধ্যে বাহমানইয়ার ,শামসউদ্দীন খসরুশাহী ,মোল্লা রজব আলী ,মোল্লা হুসাইন আরদেবিলী ,আলী হাকিম যানুযী এবং বর্তমান সময়ের আল্লামা তাবাতাবায়ীর নাম উল্লেখযোগ্য। আবার কোন কোন প্রদেশ দর্শনের ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। যেমন খোরাসান ,ইসফাহান এবং ফার্স।

যে বিষয়টি অনেকের নিকটই আশ্চর্যজনক মনে হতে পারে তা হলো বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞানের ক্ষেত্রে মীর দামাদের সময় হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত ইরানের উত্তরাঞ্চলের তিনটি প্রদেশ সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। এ তিনটি প্রদেশ হলো গীলান ,মাজেনদারান এবং গোরগান। দর্শনের প্রসিদ্ধ ত্রিশজন শিক্ষক এ অঞ্চলের। যেমন মীর দামাদ ,মোল্লা ইসমাঈল খাওয়াজুয়ী ,মুহাম্মদ বাইদাবাদী ,মোল্লা আলী নূরী ,মীর ফানদারাসকী ,আবদুর রাজ্জাক লাহিযী ,মোল্লা মুহাম্মদ জাফর লাঙ্গরুদী প্রমুখ । যদিও এ ব্যক্তিবর্গের শিক্ষাগ্রহণ ও শিক্ষাদানের বলয় ছিল ইসফাহান ,কিন্তু তাঁরা প্রকৃতপক্ষে উত্তর ইরানের অধিবাসী।

10. এখানে আমরা পর্যায়ক্রমে যে ,দার্শনিকদের নামসমূহ এনেছি তা ধারাবাহিক ,অবিচ্ছিন্ন ও পরস্পর সম্পর্কিত হিসেবে একটি অবিচ্ছিন্ন সংস্কৃতির নমুনা। ফিকাহ্ ,হাদীসশাস্ত্র ,এরফান ,সাহিত্য ,ব্যাকরণ ,এমনকি গণিতশাস্ত্রের ক্ষেত্রেও এরূপ নমুনা পেশ করা সম্ভব। শিক্ষক-ছাত্রের ভিত্তিতে রচিত এ তালিকায় শুধু দু স্থানে অস্পষ্টতা রয়েছে। একটি স্থান হলো ইরানে আফগানদের আক্রমণের সময় দার্শনিক মোল্লা ইসমাঈল খাওয়াজুয়ীর বিষয়। আর তা হলো তিনি স্বয়ং বা তাঁর সম্পর্কে যাঁরা বর্ণনা দিয়েছেন তাঁদের কেউই তাঁর শিক্ষকদের নাম উল্লেখ করেননি। অন্য স্থানটি হলো জনাব মীর দামাদের শিক্ষক ফাখরুদ্দীন সামাকীর শিক্ষকদের সম্পর্কে কেউ কিছু উল্লেখ করেননি।335

অবশ্য এ দু টি বিষয় ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ভিত্তিতে রচিত। এ তালিকায় কোন অস্পষ্টতা সৃষ্টি করেনি। তাই এ দু স্থানকে বাদ দিলে আমার শিক্ষকদের ধারাবাহিকতা ইবনে সিনা পর্যন্ত পৌঁছায় (অর্থাৎ তাঁদের সকলের নাম আমরা উল্লেখ করতে সক্ষম)। অন্যদিকে শেখ বাহায়ীকে যদি দার্শনিক হিসেবে ধরি তবে ঐ দু স্থানের অস্পষ্টতাও দূর হয়ে যায় এভাবে যে ,মীর দামাদকে বাদ দিয়ে যদি শেখ বাহায়ীকে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করি তবে তাঁর শিক্ষক মোল্লা আবদুল্লাহ্ ইয়াযদীর মাধ্যমে আমার শিক্ষকের ধারাবাহিকতা অবিচ্ছিন্নভাবে ইবনে সিনা পর্যন্ত পৌঁছায়। যেহেতু ইবনে সিনার দর্শনের আদৌ কোন শিক্ষক ছিল না সেহেতু ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের ভিত্তিতে রচিত এ তালিকা এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।

11. অবশ্য ইবনে সিনা ছাড়াও দু ব্যক্তি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে ,তাঁদের দর্শনের শিক্ষক ছিল না। তাঁরা দর্শনের গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে দার্শনিক হয়েছিলেন। তাঁরা হলেন আল কিন্দী ও ফারাবী। ইতিহাসে আল কিন্দীর কোন শিক্ষকের নাম উল্লিখিত হয়নি । এমনকি বাস্তবেও আল কিন্দীর অঞ্চলে কোন দার্শনিকের অস্তিত্ব ছিল না। তাই ইসলামী দর্শনের ধারা আল কিন্দী হতেই শুরু হয়েছে। ফারাবীও ইউহান্না ইবনে হাইলানের নিকট শুধু যুক্তিবিদ্যা পড়েছিলেন। তাঁরও দর্শনের কোন শিক্ষক ছিল না। অনেকে ফারাবীর শিক্ষক হিসেবে আবু বাশার মাত্তার নাম উল্লেখ করেছেন ,কিন্তু এটি যে ঠিক নয় তা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। উল্লেখ্য ,মুসলমানগণ দর্শনের গ্রন্থের ক্ষেত্রে অমুসলমানদের নিকট ঋণী হলেও দর্শনের শিক্ষকের ক্ষেত্রে কখনই তা নয়।

এখন আমরা এরফান ও তাসাউফশাস্ত্রে ইরানী মুসলমানদের অবদান নিয়ে আলোচনা করব।