ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 47497
ডাউনলোড: 2048

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 47497 / ডাউনলোড: 2048
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

ইরানীদের ইসলাম গ্রহণ

আমাদের এতক্ষণের আলোচনা হতে কোন বিষয় জাতীয় বা বিজাতীয় হওয়ার মানদণ্ড কি তা স্পষ্ট হলো । আমরা আরো জানলাম রংহীন ,সর্বজনীন ,মানবিক হওয়া এবং বিজাতীয় বা বিশেষ জাতির অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার শর্তটি ইসলামের মধ্যে পূর্ণরূপে রয়েছে।

ইসলামের মানদণ্ড যে সার্বিক ,সর্বজনীন ও মানবিক ,বর্ণ ও জাতিগত নয় তাও স্পষ্ট হলো। ইসলাম কখনই কোন বিশেষ জাতি ,গোত্র ও বর্ণের মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ করেনি ;বরং এরূপ সংকীর্ণ গোঁড়ামিপূর্ণ চিন্তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে।

এখন আমরা দেখব ইসলাম দ্বিতীয় শর্তটি পূরণ করে কি না ? অর্থাৎ ইরান জাতীয়ভাবে ইসলামকে গ্রহণ করেছে কি না ? অন্য ভাবে বললে ইসলাম তার বিষয়বস্তুর উচ্চমান ,মানবিকতা ও বিশ্বজনীনতার কারণে ইরানীদের নিকট গৃহীত হয়েছে ,নাকি এ জাতির অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার ফলে তা মেনে নিতে হয়েছে- যেমনটি অনেকে মনে করেন। অবশ্য আমাদের এ কথার উদ্দেশ্য এটি নয় যে ,আমরা বলতে চাই সকল জাতিরই ইসলাম গ্রহণের পেছনে একমাত্র কারণ এর শিক্ষার সর্বজনীনতা ও সাম্যের ধারণা ;বরং অন্যান্য জাতিসমূহের ইসলাম গ্রহণের পেছনে চিন্তা ও বিশ্বাসগত কারণও যেমন ছিল তেমনি রাজনৈতিক ,সামাজিক ও আচরণগত কারণও ছিল। ইসলামী শিক্ষা একদিকে যেমন বুদ্ধিবৃত্তিক ,অন্যদিকে তেমনি প্রকৃতিগত ও সহজাত। ইসলামের বিশেষ এক আকর্ষণ ক্ষমতা রয়েছে যে কারণে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীকে নিজ প্রভাবে টেনেছে। সর্বজনীনতা এর বিভিন্ন দিকগুলোর একটি যা তাকে এ আকর্ষণ ক্ষমতা দিয়েছে । আমরা এখানে আপাতত অন্যান্য দিকগুলো নিয়ে আলোচনা করব না। জাতীয়তার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কারণে শুধু এ একটি দিক নিয়েই এখানে আলোচনা রাখব।

প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী হলো ইরানীরা তাদের পূর্ববর্তী ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে। শতাব্দী কাল হতে লক্ষ কোটি ইরানী এ দীনের অনুসারী হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছে এবং এ দীনের ওপর জীবন পরিচালনার পর এর সাক্ষ্যের ওপর মৃত্যুবরণ করেছে।

ইসলামী বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে সম্ভবত সৌদি আরব ব্যতীত অন্য কোন দেশের মুসলিম জনসংখ্যার শতকরা হার ইরান হতে অধিক নেই ,এমনকি যে মিশর নিজেকে ইসলামের কেন্দ্র বলে দাবি করে সেখানেও শতকরা হারে ইরান অপেক্ষা মুসলমান অধিক নয়। তদুপরি উত্তম হলো এ ইরানীদের ইসলাম গ্রহণের বিষয়টি বাধ্যবাধকতার কারণে নাকি আন্তরিকতার কারণে ঘটেছে তা পর্যালোচনা করা।

সৌভাগ্যবশত সাম্রাজ্যবাদীদের অপতৎপরতা সত্ত্বেও ইরান ও ইসলামের ইতিহাস স্পষ্ট। এ বিষয়ে আমরা পাঠকদের সত্যের নিকটবর্তী করার উদ্দেশ্যে ইরানের ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলাব ও এ দেশে ইসলামের প্রবেশের সময় হতে বিষয়টি নিয়ে পর্যালোচনা করব।

ইরানীদের ইসলাম গ্রহণের সূচনা

ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী মহানবী (সা.) তাঁর হিজরতের কয়েক বছর পর হতে বিভিন্ন দেশের শাসকদের উদ্দেশ্যে পত্র প্রেরণ শুরু করেন এবং তাতে নিজ নবুওয়াতের ঘোষণা ও ইসলামের দাওয়াত লিখে পাঠান। তন্মধ্যে ইরান সম্রাট খসরু পারভেজের উদ্দেশে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে পাঠান এবং আমরা অবহিত ,একমাত্র তিনিই রাসূলুল্লাহর পত্রটির প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে তা ছিঁড়ে ফেলেন। এটি তৎকালীন পারস্য রাজসভায় অনাচার ও বিশৃঙ্খলার একটি প্রমাণ। অন্য কোন সম্রাট ও শাসক এরূপ কাজ করেননি ;বরং তাঁদের অনেকেই সম্মানের সঙ্গে পত্রের জবাব দান করেন এবং উপঢৌকনও প্রেরণ করেন।

খসরু তার অনুগত ইয়েমেনের প্রাদেশিক শাসনকর্তাকে নির্দেশ দেন নবুওয়াতের দাবিকারী এ ব্যক্তি যে তার নামের পূর্বে নিজ নাম লেখার দুঃসাহস দেখিয়েছে দ্রুততর সময়ে যেন তার নিকট হাজির করা হয়। কিন্তুيريدون ليطفؤوا نور الله بأفواههم و الله متمّ نوره যদিও তারা চায় ফুৎকার দিয়ে আল্লাহর নূরকে নির্বাপিত করতে ,তদুপরি আল্লাহ্ তাঁর নূরকে পূর্ণ করবেন । তাই খসরুর প্রতিনিধিরা মদীনায় না পৌঁছতেই খসরু তার পুত্রের হাতে নিহত হন এবং রাসূল (সা.) তার প্রতিনিধিদের সম্রাট নিহত হওয়ার খবর দিলে তাঁরা প্রথমে বিশ্বাস করেননি। কিন্তু তাঁরা ইয়েমেনে ফিরে এসে জানতে পারেন রাসূল সত্যই বলেছেন। ইয়েমেনের শাসনকর্তাসহ অনেকেই এ ঘটনায় ইসলাম গ্রহণ করেন। ইয়েমেনের অধিবাসী অনেক ইরানীও এ সময় ইসলাম গ্রহণ করে। ইতিহাস গ্রন্থসমূহ হতে জানা যায় ,সে সময় ইয়েমেনের শাসনভার শত ভাগ ইরানীদের হাতে ছিল এবং প্রচুর ইরানী সেখানে বসবাস করত।

মহানবীর জীবদ্দশায় ইসলাম প্রচারের প্রভাবে বাহরাইনের অধিবাসী মাজুসী ও অ-মাজুসী ইরানীদের অনেকেও ইসলাম গ্রহণ করেছিল ,এমনকি বাহরাইনের ইরানী শাসনকর্তাও ইসলাম গ্রহণ করে। মোট কথা ইয়েমেন ও বাহরাইনের অধিবাসী ইরানীরাই প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী ইরানী।

অবশ্য প্রথম যে ইরানী ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করেন সম্ভবত তিনি হলেন সালমান ফারসী। এই স্বনামধন্য সাহাবীর মর্যাদা এতটা উচ্চে উঠেছিল যে ,রাসূল (সা.) বলেন ,سلمان منّا أهل البيت সালমান আমার আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। সালমান শুধু শিয়াদের মধ্যে নন ,এমনকি সুন্নীদের নিকটও প্রথম সারির সাহাবীদের অন্তর্ভুক্ত। যাঁরা মদীনায় যিয়ারতে গিয়েছেন তাঁরা লক্ষ্য করেছেন মসজিদে নববীর দেয়াল ঘিরে বিশিষ্ট সাহাবী ও মাজহাবের ইমামদের নাম লিপিবদ্ধ রয়েছে। সেখানে বিশিষ্ট সাহাবীদের নামের মধ্যে সালমান ফারসীর নামও রয়েছে।

মহানবীর জীবদ্দশায় যে স্বল্প সংখ্যক ইরানী ইসলাম গ্রহণ করে এটি অন্য ইরানীদের জন্য সত্যকে জানার যথেষ্ট সুযোগ এনে দেয় ।

স্বাভাবিকভাবেই এ বিষয়টি ইরানীদের ইসলাম পরিচিতির পরিবেশ সৃষ্টি করে ও ইরানে ইসলামের বাণী পৌঁছায়। বিশেষত ইরানের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় পরিবেশ তখন এমন অবস্থায় ছিল ,সাধারণ মানুষ নতুন বাণী শোনার জন্য তৃষ্ণার্ত এবং প্রকৃতপক্ষে মুক্তির প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছিল। তাই এরূপ নতুন কোন বাণী মানুষের মাঝে বিদ্যুতের ন্যায় ছড়িয়ে পড়ত এবং প্রকৃতভাবেই তারা প্রশ্ন করত এ নতুন ধর্মের ভিত্তি কি ? এর মূল ও শাখাসমূহ-ই বা কি ?

এ পরিস্থিতিতে হযরত আবু বকর ও উমরের খেলাফত শুরু হয়। হযরত আবু বকরের খেলাফতের শেষ দিকে এবং হযরত উমরের খেলাফতকালে মুসলমান ও ইরানীদের মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধে সমগ্র ইরানী ভূখণ্ড মুসলমানদের পদানত হয়। এ ভূখণ্ডের লক্ষ লক্ষ ইরানী মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।

আমরা এখানে ইসলামের সেবায় ইরানীদের অবদানের বিষয়ে আজিজুল্লাহ্ আওরাদী (ইরানের ওপর ইসলামের সামরিক বিজয়ের পূর্ববর্তী সময়ের ওপর ভিত্তি করে রচিত) ইসলামে ইরানীদের অবদান কখন হতে শুরু হয়েছে শিরোনামে যে প্রবন্ধ লিখেছেন তা হুবহু তুলে ধরছি:

ইসলামে ইরানীদের অবদান কখন হতে শুরু হয়েছে ? পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রতি ইরানীদের আগ্রহ ইসলামের আবির্ভাবের সময় হতেই শুরু হয়। মুসলিম যোদ্ধাদের মাধ্যমে ইসলামের পবিত্র শরীয়ত ইরানে আসার পূর্বেই ইয়েমেন অধিবাসী ইরানীদের অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করেছিল এবং সাগ্রহে কোরআনের বিধি পালন শুরু করেছিল ,এমনকি তারা চরম উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামী শরীয়তের প্রচার ও প্রসারে লিপ্ত এবং ইসলামের পথে নবী (সা.)-এর বিরোধীদের সঙ্গে সংগ্রামেও ব্যাপৃত হয়েছিল।

ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ইরানীদের অবদানের বিষয়ে ব্যাপক গবেষণার সুযোগ রয়েছে এবং ইসলামী জ্ঞানে পণ্ডিত ও বিশেষজ্ঞরা এ সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে নিজেদের পাণ্ডিত্য অনুযায়ী গবেষণাকর্মও চালাতে পারেন। পূর্ব ও পশ্চিমে ইসলামের বিজয় ইতিহাসের পেছনে ইরানের একদল আত্মত্যাগী মুজাহিদের ভূমিকা অনস্বীকার্য যাঁরা একনিষ্ঠভাবে ইসলামের পথে আত্মোৎসর্গ করে ইসলামের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশক্তির মোকাবিলা ও দমন করেছেন।

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার23 বিভিন্ন দেশ যেমন ভারত উপমহাদেশ ,পাকিস্তান ,চীন ,মালয়েশিয়া ,ইন্দোনেশিয়া ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জসমূহের মুসলমানরা ইরানী মুসলমানদের নিকট ঋণী এ জন্য যে ,তারা সমুদ্র বাণিজ্যের সাথে সাথে এ অঞ্চলের মানুষদেরকে পবিত্র ইসলামের সঙ্গে পরিচিত করান।

ইরানীরা উত্তর আফ্রিকা ,ইউরোপ মহাদেশ ,এশিয়া মাইনর এবং পশ্চিমের দেশগুলোতেও ইসলামের প্রচারে বিশেষ অবদান রেখেছে। বিশেষত খোরাসানসহ পূর্ব ইরানের বাসিন্দারা উমাইয়্যা খেলাফতের বিরুদ্ধে যে বিদ্রোহ করে তাতে মুসলমানদের ওপর ইসলামের নামে শোষণকারী উমাইয়্যা শাসকদের পতন ঘটে এবং আব্বাসীয়রা খেলাফত লাভ করে। তখন ইসলামী রাষ্ট্রের সামরিক ও অন্যান্য সকল কর্ম ইরানীদের হাতে ন্যস্ত হয় । বিশেষত খোরাসানীরা পূর্ব ও পশ্চিমের দেশসমূহে আব্বাসীয়দের পক্ষ হতে সকল রাজনৈতিক পদ লাভ করে। খলীফা মামুনের সময় তিনি যখন ইরাকে (বাগদাদে) যান তখন খোরাসানের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়ে সেখানে অবস্থান নেন। মামুন তাঁর নিজ বংশের অনেক ব্যক্তির ষড়যন্ত্রে অতিষ্ঠ হয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদ ইরানীদের হাতে সোপর্দের সিদ্ধান্ত নেন। এ পদক্ষেপের অংশ হিসেবে তিনি কিছু বিশিষ্ট ইরানী ব্যক্তিকে মিশর ও উত্তর আফ্রিকায় প্রাদেশিক শাসনকর্তা নিয়োগ করেন যাতে করে তাঁর বিরোধীদের আক্রমণ হতে রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে পারেন। বিশেষত আন্দালুসে (স্পেন) তখনও উমাইয়্যা শাসন বলবৎ ছিল ও তাদের আক্রমণের সম্ভাবনা ছিল বিধায় মামুন এই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেন।

ইরানী মুহাজিরগণ যাদের অধিকাংশই নিশাবুর ,হেরাত ,বালখ ,বুখারা ও ফারগানার অধিবাসী ছিল তাদের অবদান ও ভূমিকা নিয়ে কয়েক খণ্ডের আলাদা বই রচনা সম্ভব। উত্তর আফ্রিকায় বসবাসকারী ইরানীদের অবদান ইতিহাস ,সাহিত্য ও হাদীস গবেষণার গ্রন্থসমূহে

বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে।

আমরা ইরানীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে দু টি পর্যায়ে সংক্ষিপ্ত তালিকা আকারে পেশ করছি। প্রথম পর্যায়ে ইরানে ইসলামের প্রবেশের পূর্ব ইতিহাস নিয়ে এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণের পর ইরানীদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা রাখব।

ইয়েমেনের ইরানীরা

রাসূল (সা.)-এর জন্মের সময় ইয়েমেন ,এডেন ,হাজরা মাউত এবং লোহিত সাগরের তীরবর্তী অঞ্চলে বেশ কিছু ইরানীর বসবাস ছিল এবং ইয়েমেনের শাসনভারও ইরানীদের হাতে ছিল। এ বিষয়টি পর্যালোচনার পূর্বে ইরানীদের ইয়েমেনে হিজরতের কারণের ওপর আলোকপাত করা প্রয়োজন মনে করছি যাতে বিষয়টি অধিকতর স্পষ্ট হয়।

অনুশীরওয়ানের রাজত্বকালে ইথিওপিয়ার (হাবশা) রাজা সমুদ্র পথে ইয়েমেনে আক্রমণ করে এলাকাটি দখল করেন। ইয়েমেনের রাজা সাইফ ইবনে ফি ইয়াযান অনুশীরওয়ানের কাছে হাবাশীদের কবল থেকে ইয়েমেন উদ্ধারের জন্য সাহায্যে চান। ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন সাইফ সাত বছর তিসফুনে (মাদায়েন) অপেক্ষার পর অনুশীরওয়ান তাঁকে দরবারে সাক্ষাতের জন্য অনুমতি দেন । সাইফ অনুশীরওয়ান-এর নিকট হাবাশীদের হাত হতে রাজ্য উদ্ধারের লক্ষ্যে সাহায্য চান ।

অনুশীরওয়ান বলেন , আমার ধর্মে নিজ সেনাদলকে প্রতারণা এবং ভিন্ন ধর্মীদের সাহয্যের অনুমতি নেই। অতঃপর তিনি রাজকীয় পরামর্শদাতাদের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেন তাঁর জেলখানার মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কয়েদীদের সাইফের সঙ্গে প্রেরণ করবেন যাতে তিনি রাজ্য উদ্ধার করতে পারেন।

সাইফের সঙ্গে প্রেরিত যোদ্ধারা সংখ্যায় ছিল এক হাজারের মত। এই স্বল্প সংখ্যক যোদ্ধা ত্রিশ হাজার সোনদলের হাবাশী বাহিনীকে পরাস্ত ও তাদের সকলকে হত্যা করতে সক্ষম হয়। ইরানীদের এ সেনাদলের প্রধানের ডাক নাম ছিল ওয়াহরায। হাবাশীদের পতন ও সাইফ ইবনে ইয়াযানের মৃত্যুর পর ওয়াহরায যাঁর ভাল নাম ছিল খারযাদ তিনি ইয়েমেনের শাসনকর্তা হন ও ইরানী সম্রাটের আনুগত্য ঘোষণা করেন।

ইয়েমেনের ইরানী শাসক বজান ও তাঁর অনুগত ইরানীদের ইসলাম গ্রহণ

যখন মহানবী (সা.) ইসলাম ধর্মের দাওয়াত শুরু করেন তখন ইয়েমেনে ইরানী শাসক হিসেবে বজান ইবনে সাসান রাজত্ব করছিলেন। তাঁর সময়েই কুরাইশ ও অন্যান্য আরব মুশরিকদের সঙ্গে রাসূলের যুদ্ধ শুরু হয়। বজান খসরু পারভেজের পক্ষ হতে ইয়েমেনের শাসক ছিলেন এবং তাঁর দায়িত্ব ছিল হিজায ও তাহামার ওপর নজর রাখা। তাই তিনি রাসূলের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে খসরুকে নিয়মিত সংবাদ প্রেরণ করতেন।

হযরত মুহাম্মদ (সা.) ষষ্ঠ হিজরীতে খসরু পারভেজকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তিনি এ আহ্বানে অসন্তুষ্ট হয়ে নবীর পত্রটি ছিঁড়ে ফেলেন ও বজানকে নির্দেশ দেন রাসূলকে বন্দী করে তাঁর নিকট উপস্থিত করার। বজান ববাভেই ও খসরু নামের দু ব্যক্তিকে রাসূলের নিকট এ নির্দেশপত্রসহ প্রেরণ করেন। এটিই ছিল ইরানীদের সঙ্গে রাসূলের প্রথম আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ।

ইরানী দূতের এরূপ নির্দেশ সম্বলিত পত্রসহ আগমনের সংবাদে মক্কার কুরাইশরা অত্যন্ত খুশী হয় ও বলতে থাকে ,এবার মুহাম্মদের আর রক্ষা নেই। কারণ পারস্য সম্রাট খসরু তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়েছেন ও তাকে বন্দী করার নির্দেশ দিয়েছেন। বজানের প্রেরিত দূতরা নবীর নিকট উপস্থিত হলে তিনি বললেন , আগামীকাল আমি জবাব দেব। পরবর্তী দিন তাঁরা নবীর নিকট জবাবের জন্য আসলে তিনি বললেন , খসরুর পুত্র শিরাভেই গতরাতে পিতাকে পেট ফেঁড়ে হত্যা করেছে। আল্লাহ্ আমাকে জানিয়েছেন তোমাদের সম্রাট নিহত হয়েছেন এবং শীঘ্রই তোমাদের রাজ্য মুসলমানদের হাতে বিজিত হবে। তোমরা ইয়েমেনে ফিরে গিয়ে বজানকে বল ইসলাম গ্রহণ করতে। যদি সে মুসলমান হয় তাহলে ইয়েমেন পূর্বের মতই তার শাসনাধীন থাকবে। মহানবী (সা.) এ দু ব্যক্তির হাতে কিছু উপঢৌকনও প্রেরণ করলেন। তাঁরা ইয়েমেনে ফিরে গিয়ে সমগ্র ঘটনা খুলে বললেন। বজান বললেন , আমরা কয়েক দিন অপেক্ষা করব। যদি তাঁর কথা সত্য প্রমাণিত হয় তবে তিনি সত্যই আল্লাহর নবী ও তাঁর পক্ষ হতেই কথা বলেন। তখন আমি সিদ্ধান্ত নেব। কয়েকদিন পর তিসফুন হতে বার্তাবাহক শিরাভেইয়ের পত্র নিয়ে বজানের নিকট উপস্থিত হলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হলেন। সেখানে শিরাভেই তাঁর পিতার হত্যার কারণ ব্যাখ্যা করে নির্দেশ দিয়েছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসীদের তাঁর নেতৃত্বের দিকে আহ্বান করার ও হেজাযে নবুওয়াতের দাবিদার ব্যক্তিকে স্বাধীনভাবে ছেড়ে দেয়ার। সেই সাথে তাঁর অসন্তুষ্টি ঘটতে পারে এমন কাজ হতে বিরত থাকারও তিনি নির্দেশ দেন। এর পরপরই বজান ইসলাম গ্রহণ করেন এবং আবনা আহরার নামক ইরানীদের দু টি গোষ্ঠীও তাঁর সঙ্গে ঈমান আনে। এরাই পবিত্র ইসলামী শরীয়ত গ্রহণকারী প্রথম ইরানী মুসলমান।

রাসূল বজানকে পূর্বের ন্যায় ইয়েমেনের শাসক হিসেবে বহাল রাখেন এবং এ দিন হতে তাঁর পক্ষ হতে ইয়েমেনের শাসনকার্য পরিচালনা ও জনসাধারণকে ইসলামের দিকে আহ্বানের দায়িত্ব পালন করা শুরু করেন। তিনি বিরোধীদের দমন ও ইসলামের প্রচারকার্য চালাতে থাকেন। তাঁর মৃত্যুর পর রাসূল তাঁরই পুত্র শাহর ইবনে বজানকে শাসক নিয়োগ করলে তিনিও পিতার ন্যায় ইসলামের প্রচার ও শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন।

আসওয়াদ উনসীর মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হওয়া ও তার রিরুদ্ধে ইরানীদের অভিযান

মহানবী (সা.) বিদায় হজ্ব হতে ফিরে আসার কয়েক দিন পরই অত্যধিক ক্লান্তির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েন। আসওয়াদ উনসী নবীর অসুস্থতা সম্পর্কে অবহিত হয়ে ভাবল নবী আর আরোগ্য লাভ করবেন না। তাই সে নবুওয়াতের দাবি করে কিছু লোককে নিজের চারপাশে সমবেত করল। ইয়েমেনী আরবদের এক বড় অংশ তার অনুসারীতে পরিণত হলো।

আসওয়াদ উনসী ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুরতাদ।24 উনসী তার অনুসারী আরব গোত্রদের নিয়ে সানআয় আক্রমণ করে। সানআয় তখন শাহর ইবনে বজান রাসূলের পক্ষ হতে শাসনকার্য পরিচালনা করছিলেন। তিনি ইসলামের শত্রু ও মিথ্যা দাবিদার আসওয়াদের বিরুদ্ধে রণপ্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। তাঁর ও আসওয়াদ কায্যাবের সাতশ সৈন্যের বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে শাহর ইবনে বজান নিহত হন। তিনি ইসলামের পথে নিহত প্রথম ইরানী শহীদ। আসওয়াদ উনসী শাহর ইবনে বজানকে হত্যার পর তাঁর স্ত্রীকে বিবাহ করে। সে এহসা ,বাহরাইন ,নাজদ ও তায়েফের মধ্যবর্তী অঞ্চলসহ ইয়েমেন হতে হাজরা মাউত পর্যন্ত অঞ্চল দখল করে ও সকল ইয়েমেনী গোত্রকে তার আনুগত্য পালনে বাধ্য করে। শুধু কয়েকজন আরব তার নিকট হতে পালিয়ে মদীনায় আশ্রয় নেয়।

শাহর ইবনে বজানের মৃত্যুর পর ফিরুজ ও দদাভেই ইরানীদের নেতৃত্ব দান শুরু করে। তাঁরা বজান ও শাহর ইবনে বজানের ন্যায় ইসলামের পথে নিজেদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখেন। ইতিমধ্যে রাসূল ও মদীনার মুসলমানগণ জানতে পারেন ইরানীরা ও কিছু আরব ব্যতীত ইয়েমেনের সকল লোক ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে আসওয়াদ কায্যাবের অনুসারী হয়েছে।

ইয়েমেনের ইরানীদের উদ্দেশে রাসূলের পত্র

জাশীশ দাইলামী ছিলেন ইয়েমেনের অধিবাসী এক ইরানী মুসলমান। তিনি বলেন , নবী (সা.) আমাদের আসওয়াদ কায্যাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। এ পত্র দদাভেই ,ফিরুয ও জাশীশের নামে প্রেরিত হয়। সেখানে রাসূল তাঁদের গোপনে ও প্রকাশ্যে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের নির্দেশ দেন ও সকল মুসলমানের নিকট এ বার্তা পৌঁছাতে বলেন। ফিরুয ,দদাভেই ও জাশীশ দাইলামী এ বার্তা সকল ইরানীর নিকট পৌঁছান।

দাইলামী বলেন , আমরা জনসাধারণকে আসওয়াদ উনসীর বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করার উদ্দেশ্যে পত্র ও বার্তা প্রেরণ শুরু করি। এ সময় আসওয়াদ এ তৎপরতা সম্পর্কে জানতে পারে ও ইরানীদের উদ্দেশ্যে সতর্ক বার্তা প্রেরণ করে বলে ,যদি তার সঙ্গে ইরানীরা যুদ্ধে লিপ্ত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। আমরা তার উত্তরে বলি: আমরা তোমার সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাই না। তদুপরি সে আমাদের কথা বিশ্বাস করেনি এবং সর্বক্ষণ আমাদের আক্রমণের আশংকায় থাকত।

এমতাবস্থায় আমের ইবনে শাহর ,যিজুদ এবং অন্যান্যদের কাছ থেকে আমাদের নিকট পত্র পৌঁছল। এতে আসওয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে আমাদের সহযোগিতা দানের আশ্বাস দিয়ে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। পরে আমরা জানতে পারি রাসূল (সা.) বিভিন্ন গোত্রের উদ্দেশে পত্র প্রেরণ করে দদাভেই ,ফিরুয ও দাইলামীকে আসওয়াদের বিরুদ্ধে সহযোগিতা দানের নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে আমরা জনসাধারণের মধ্যে সমর্থন লাভ করি।

আসওয়াদ উনসীকে হত্যার জন্য ইরানীদের পরিকল্পনা

আসওয়াদ উনসী ইরানীদের ষড়যন্ত্রের ভয় করছিল ও এ ষড়যন্ত্রের পরিণাম অত্যন্ত উত্তেজনাকর অবস্থায় পৌঁছতে পারে তা বুঝতে পারছিল। এ সম্পর্কে দাইলামী বলেন , শাহর ইবনে বজানের স্ত্রী অযাদ আসওয়াদের অধীনে থেকে আমাদের ভালভাবেই সহযোগিতা করে আসছিলেন এবং তাঁর সাহায্যেই আমরা জয় লাভ করি ও আমাদের লক্ষ্যে পৌঁছাই। আমরা অযাদকে বলি: আসওয়াদ তোমার স্বামীসহ অন্যান্য সকল আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করেছে ,তাদের কেউই তার তরবারী হতে রক্ষা পায়নি । সে তাদের নারীদেরও দাসীতে পরিণত করেছে। অযাদ আত্মসম্মানবোধসম্পন্না সাহসী নারী ছিলেন। তিনি বললেন: আল্লাহর শপথ ,আসওয়াদের মত অন্য কোন শত্রু আমার নেই। সে আল্লাহর কোন অধিকারই রক্ষা করে না।

অযাদ বলেন: তোমরা তোমাদের লক্ষ্য ও সিদ্ধান্তসমূহ আমাকে জানাও। আমিও

গৃহাভ্যন্তরের তথ্য তোমাদের জানাব। দাইলামী বর্ণনা করেছেন , অযাদের নিকট থেকে বিদায় নিয়ে বাইরে এসে আমাদের মধ্যকার সংলাপের বিষয়বস্তু ফিরুয ও দদাভেইকে জানালাম। সে মুহূর্তে এক ব্যক্তি গৃহাভ্যন্তর হতে আমাদের অন্যতম সহযোগী কাইস ইবনে আবদে ইয়াগুছকে আসওয়াদের কক্ষে আহ্বান করল। কাইস কয়েক ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে গৃহে প্রবেশ করলেও আসওয়াদের কোন ক্ষতি করতে পারেনি।

তবে কাইস ও আসওয়াদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় এবং কাইস সেখান হতে ফিরে ফিরুয ,দদাভেই ও দাইলামীর নিকট এসে বলে , এখন আসওয়াদ কায্যাব এখানে আসবে ,তোমরা যা ইচ্ছা করতে পার। কাইস গৃহ হতে বেরিয়ে যাবার পরপরই আসওয়াদ তার সঙ্গীঁসাথীদের নিয়ে আমাদের নিকট আসল। গৃহের নিকট দু উট ও গরু ছিল। আসওয়াদ সবগুলোকে হত্যা করার নির্দেশ দিল। অতঃপর চীৎকার করে বলল , হে ফিরুয! এ কথা কি সত্য ,তুমি আমার সঙ্গে যুদ্ধ ও আমাকে হত্যার পরিকল্পনা করছ ? এ কথা বলেই আসওয়াদ তার হাতের অস্ত্র ফিরুযের প্রতি ছুঁড়ে মেরে বলল , তোমাকে এই পশুদের মত হত্যা করব। ফিরুয বললেন , আপনি যা চিন্তা করেছেন তেমনটি নয়। আপনার সঙ্গে আমাদের কোন সংঘর্ষ নেই ,তাই আপনাকে হত্যার কোন পরিকল্পনাও নেই। কারণ আপনি ইরানীদের জামাতা। আপনার স্ত্রী অযদের সম্মানে আমরা আপনার কোন ক্ষতি করব না। তা ছাড়া আপনি নবী হিসেবে দুনিয়া ও আখেরাতের দায়িত্বশীল।

আসওয়াদ বলল , তোমাকে কসম করে বলতে হবে আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না ও আমার প্রতি প্রতিশ্রুতি পরায়ণ থাকবে। ফিরুয তার সঙ্গে কথা বলতে বলতে গৃহের বাইরে আসল। আসওয়াদ কিছু দূরে অগ্রসর হতেই এক ব্যক্তিকে তার সম্পর্কে মন্দ বলতে শুনল। সে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল , আগামীকাল ফিরুয ও তার বন্ধুদের হত্যা করব। আসওয়াদ পাশ্চাতে তাকিয়ে দেখল ফিরুযও এ কথা শুনে ফেলেছেন।

দাইলামী বলেন , ফিরুয আসওয়াদের নিকট হতে ফিরে এসে তার ষড়যন্ত্র সম্পর্কে আমাদের বলল। আমরা কাইসকে এ আলোচনায় অংশ গ্রহণের জন্য ডেকে পাঠালাম। অতঃপর আমরা পরামর্শের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলাম আসওয়াদের স্ত্রী অযাদের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করে আমাদের সিদ্ধান্ত তাঁকে জানিয়ে তাঁর নিকট হতে তথ্য সংগ্রহ করা হবে। দাইলামী বলেন , আমি অযাদের নিকট গমন করি এবং তাঁকে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবহিত করি।

অযাদ বলেন: আসওয়াদ নিজের বিষয়ে অত্যন্ত ভীত ও নিজ জীবনের ব্যাপারে কোন আস্থা রাখে না। যখন গৃহে প্রবেশ করে সমগ্র প্রাসাদ ও পার্শ্ববর্তী স্থানগুলোতে পর্যবেক্ষকদের নিয়োগ করে যাতে যে কোন ব্যক্তির চলাচলের ওপর নজর রাখতে পারে। তাই সাধারণ কোন লোকের পক্ষে এ প্রাসাদে প্রবেশ অসম্ভব। একমাত্র আসওয়াদের শয়ন কক্ষে কোন প্রহরী নেই। সুতরাং তার শয়নকক্ষেই তোমরা তাকে হত্যা করতে পার। এ কক্ষে একটি তরবারী ও লণ্ঠন ব্যতীত কিছু নেই।

দাইলামী বলেন , আমি প্রাসাদ হতে বেরিয়ে আসার উদ্দেশ্যে অযাদের নিকট থেকে বিদায় গ্রহণ করলাম। এমন সময় আসওয়াদ নিজ কক্ষ হতে বের হয়ে আমাকে দেখে অত্যন্ত রাগান্বিত হয়। রাগে তার চক্ষু রক্তিম হয়ে গিয়েছিল। সে রাগতস্বরে বলল: কোথা হতে এসেছ ,কে তোমাকে এখানে প্রবেশের অধিকার দিল। অতঃপর সে আমার মাথা এমনভাবে চেপে ধরল যে ,আমার প্রাণ বেরিয়ে আসছিল। এ অবস্থা দেখে অযাদ চীৎকার করে বলল: আসওয়াদ ওকে ছেড়ে দাও। যদি অযাদের চীৎকার তার কানে না পৌঁছত তবে সে আমাকে হত্যাই করে ফেলত।

অযাদ আসওয়াদকে বললেন: সে আমার চাচাত ভাই ,আমাকে দেখতে এসেছে। তাকে ছেড়ে দাও। আসওয়াদ এ কথা শুনে আমাকে ছেড়ে দিল। আমি প্রাসাদ হতে বেরিয়ে এলাম ও বন্ধুদের নিকট ঘটনা খুলে বললাম। যখন আমরা এ বিষয়ে আলোচনায় রত ছিলাম ঠিক তখনই অযদের পক্ষ হতে এক বার্তাবাহক এসে বলল: তোমাদের লক্ষ্যে পৌঁছার সুবর্ণ সুযোগ এখনই ,যে পরিকল্পনা নিয়েছ তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নাও।

আমরা ফিরুযকে বললাম: তুমি দ্রুত অযাদের নিকট যাও। ফিরুয অযাদের নিকট গেলে অযাদ পূর্ণ পরিকল্পনা ফিরুযের নিকট বর্ণনা করেন। ফিরুয বর্ণনা করেছেন , আমরা প্রাসাদের বাহির হতে আসওয়াদের শয়নকক্ষ পর্যন্ত মাটি খুঁড়ে একটা পথ তৈরি করি ও গর্তের মুখে কয়েক জনকে মোতায়েন করি যাতে তারা প্রয়োজনে এ পথে প্রবেশ করে আসওয়াদকে হত্যায় সহযোগিতা করতে পারে। অতঃপর ফিরুয ঐ কক্ষে অযদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছে এমন ভঙ্গীতে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। ফিরুয ও অযাদের সংলাপের মাঝেই আসওয়াদ কক্ষে প্রবেশ করল। ফিরুযকে দেখা মাত্রই সে প্রচণ্ডভাবে রেগে গেল। অযাদ আসওয়াদকে রাগান্বিত হতে দেখে বলল , সে আমার নিকটাত্মীয় ,আমাকে দেখতে এসেছে। আসওয়াদ ক্ষুব্ধভাবে ফিরুযকে কক্ষ হতে বের করে প্রাসাদের বাইরে টেনে নিয়ে গেল।

রাত্রিতে ফিরুয ,দদাভেই ও দাইলামী ভূগর্ভস্থ পথে আসওয়াদের শয়ন কক্ষে প্রবেশ করে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নিল। আসওয়াদকে হত্যার প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্নের পর তাঁরা বন্ধু ও সমচিন্তার ব্যক্তিদের নিকট তা প্রকাশ করেন। দু টি আরব গোত্র হুমাইর ও হামাদানীদের ঘটনাটি জানানো হলো।

দাইলামী বলেন , আমরা রাত্রিতে কাজ শুরু করলাম। আসওয়াদের পাশের কক্ষে ভূগর্ভস্থ গোপন পথে পৌঁছলাম । কক্ষটিতে একটি প্রদীপ জ্বলছিল। তার মৃদু আলোতে কক্ষটি আলোকিত হচ্ছিল। ফিরুযের ওপর আমাদের আস্থা ছিল। কারণ তিনি ছিলেন শক্তিশালী ও সাহসী এক পুরুষ। আমরা ফিরুযকে কক্ষের বাইরে লক্ষ্য করতে বললাম। সে সন্তর্পণে আসওয়াদের কক্ষে প্রবেশ করতেই তার নাক ডাকার শব্দ শুনতে পেলাম। তিনি নিশ্চিত হলেন ,আসওয়াদ গভীর ঘুমে রয়েছে। তার স্ত্রী অযাদ কক্ষের এক কোণে বসেছিলেন। ফিরুয আসওয়াদের নিকটবর্তী হতেই সে ঘুম হতে হতচকিয়ে উঠল ও ফিরুযের উদ্দেশ্যে বলল: এখানে কি করতে এসেছ ? আমার সঙ্গে তোমার কি প্রয়োজন ?

ফিরুয বুঝতে পারল তখন ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করলে নির্ঘাত প্রহরীদের হাতে নিহত হবে এবং অযদও প্রাণ হারাবে। তাই অকস্মাৎ আসওয়াদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার গলা চেপে ধরলেন। ক্ষিপ্ত পুরুষ উটের ন্যায় হামলা চালিয়ে তাকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করলেন। যখন তিনি কক্ষ হতে বেরিয়ে আসবেন তখন অযাদ তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন: তুমি কি নিশ্চিত যে ,সে মারা গেছে ? ফিরুয বললেন: হ্যাঁ। সে মারা গেছে ,তুমিও তার হাত হতে মুক্তি পেলে। এ বলে তিনি ঐ কক্ষ হতে বেরিয়ে আমাদের নিকট এসে সব ঘটনা খুলে বললেন। আমরা তার সঙ্গে আসওয়াদের কক্ষে প্রবেশ করলাম। সে তখনও গরুর মত গোঁ গোঁ করছিল। আমরা বড় একটি ছুরি দিয়ে তার মস্তক বিচ্ছিন্ন করে তার অপবিত্র উপস্থিতি হতে ইয়েমেনকে রক্ষা করলাম।

এ মুহূর্তে আসওয়াদের কক্ষের বাইরে অস্থিরতা ও শোরগোলের সৃষ্টি হলো। প্রহরীরা চারদিক হতে তার কক্ষের বাইরে ভীড় জমালো ও চীৎকার করে কি হয়েছে জানতে চাইলো। অযাদ বললেন , নতুন কোন বিষয় নয়। নবীর ওপর এখন ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। ওহীর কারণে এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তখন প্রহরীরা কক্ষের নিকট হতে চলে গেল এবং আমরাও বিপদ হতে রক্ষা পেলাম।

প্রহরীরা চলে গেলে কক্ষে আবার নীরবতা নেমে এল। আমরা চারজন (ফিরুয ,দদাভেই ,জশীশ দাইলামী ও কাইস) এ ঘটনা কিভাবে সকলকে জানান যায় সে চিন্তায় মশগুল হলাম। সিদ্ধান্ত হলো বেরিয়ে গিয়ে চীৎকার করে সকলকে জানাব ,আমরা আসওয়াদকে হত্যা করেছি। ফজরের সময় চীৎকার করে আমরা বিষয়টি ঘোষণা করলাম। সকল কাফের ও মুসলমান এ বড় ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারল। দাইলামী বলেন , অতঃপর আযান দেয়া শুরু করলাম। উচ্চৈঃস্বরে বলতে লাগলাম: আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্। বললাম: আইয়াহ্লাহ্ অর্থাৎ আসওয়াদ কায্যাব মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করত। এ কথা বলে আমরা তার মাথা সবার সামনে ছুঁড়ে ফেললাম। যখন তার প্রাসাদের প্রহরীরা তার নিহত হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পারল তখন তারা প্রাসাদ লুণ্ঠনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক মুহূর্তে প্রাসাদের সব কিছু লুটপাট হয়ে গেল। এভাবেই অসংখ্য মানুষের হত্যাকারী এক মিথ্যুকের পতন ও ধ্বংস হলো।

অতঃপর সানআবাসীদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা করলাম ,আসওয়াদ উনসীর কোন অনুসারীকে পেলে যেন বন্দী করে। এর ফলে আসওয়াদের বেশ কিছু সঙ্গী-সাথী বন্দী হলো। আসওয়াদের অনুসারীরা যখন দেখল তাদের সত্তর জন নিখোঁজ হয়েছে তারা আমাদের নিকট পত্র পাঠাল । আমরাও তার জবাব জানিয়ে দিলাম: তোমরা আমাদের যা কিছু হস্তগত করেছ তা ফেরত দিলে আমরাও তাদের ছেড়ে দেব।

এ প্রস্তাব কার্যকর হলেও আসওয়াদের অনুসারীরা পরস্পরের সাথে সাক্ষাৎ করতে পারল না এবং নতুন কোন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি। আমরাও সম্পূর্ণরূপে তাদের অকল্যাণ হতে মুক্তি পেলাম। আসওয়াদের নিহত হওয়ার ঘটনা মদীনাতেও দ্রুত পৌঁছল। আবদুল্লাহ্ ইবনে উমর বর্ণনা করেছেন , যে রাত্রে আসওয়াদ কায্যাব নিহত হয় রাসূল (সা.) ওহীর মাধ্যমে তা জানতে পারেন এবং বলেন: উনসী একটি বরকতময় পরিবারের হাতে নিহত হয়েছে। সকলে জানতে চাইল: সে কে ? নবী বললেন: ফিরুয।

ইয়েমেন ও পাশ্ববর্তী এলাকায় আসওয়াদের শাসনকাল তিন মাস স্থায়ী হয়েছিল। ফিরুয বর্ণনা করেছেন , আসওয়াদকে হত্যার কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং তার উত্থানের পূর্বে ইয়েমেনে যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছিল তা ফিরে আসে। মাআয ইবনে জাবাল ইতোপূর্বে রাসূলের পক্ষ হতে ইয়েমেনে জামায়াতের নামাজের ইমাম ছিলেন এবং উনসীর শাসনামলে গৃহবন্দী ছিলেন। তাঁকে ইমামতির জন্য নতুন করে আহ্বান করা হলো । শুধু আসওয়াদের কিছু অনুচর যারা ইয়েমেনের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল তাদের আক্রমণের ক্ষীণ আশংকা ছাড়া অন্য কোন ভয় আমাদের ছিল না। কিন্তু এরূপ শান্তিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে রাসূলের মৃত্যু সংবাদ ইয়েমেনে এসে পৌঁছলে পুনরায় বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়।

ইয়েমেনী আরব মুরতাদদের বিরুদ্ধে ইরানীদের সংগ্রাম

কাইস ইবনে আবদ ইয়াগুস ফিরুয ও অন্যান্য ইরানীদের সঙ্গে আসওয়াদের বিরুদ্ধে কাজ করলেও রাসূলুল্লাহ্ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুরতাদ হয়ে যায় ও ফিরুযের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। সে প্রথমত ফিরুযকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় এ কারণে যে ,আসওয়াদকে হত্যার কারণে ইয়েমেনের মানুষের নিকট ফিরুয জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন ও তারা তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব দিত।

কাইস তার শয়তানী চক্রান্তের মাধ্যমে ফিরুযকে অসহায় ও দিশেহারা করে ফেলে। ইয়েমেনের অবস্থা পুনরায় অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে বিশেষত ইরানী মুসলমানদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ে। তারা ইয়েমেনের মুসলমানদের প্রকৃত নেতা ,সংরক্ষক ও কেন্দ্র হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। কাইস তিন ব্যক্তির (যাদের তিনজনই ইরানী) ব্যাপারে ভীত ছিল। তাঁরা হলেন ফিরুয ,দদাভেই ও জাশীশ দাইলামী। যখন কাইস ইবনে আবদ ইয়াগুসের ধর্মত্যাগের কথা মদীনায় পৌঁছল তখন নতুন খেলাফতে অধিষ্ঠিত খলীফা আবু বকর কয়েক ব্যক্তির নামে পত্র লিখে ফিরুয ও ইরানী মুসলমানগণ যাঁরা আসওয়াদ কায্যাবকে হত্যা করেছেন তাদেরকে কাইসের বিরুদ্ধে সহযোগিতা করার নির্দেশ দেন।

কাইস এ কথা শোনার পর যুল কালাকে পত্র লিখে যেন সে তার সঙ্গীদের নিয়ে ইরানীদের সঙ্গে যুদ্ধ করে ইয়েমেন হতে বিতাড়িত করে। কিন্তু যুলকালা তার নির্দেশের প্রতি কোন ভ্রূক্ষেপ করেন নি। কাইস যখন দেখল কেউ তাকে সহযোগিতা করছে না তখন সিদ্ধান্ত নিল প্রতারণা ,ষড়যন্ত্র যে কোন ভাবেই হোক না কেন ফিরুয ,দদাভেই ও দাইলামীকে হত্যা করে ইরানীদের পরাস্ত করার। কাইস ফিরুয ও ইরানীদের কঠিন শত্রু আসওয়াদ কায্যাবের যে সকল সঙ্গী পাহাড় ও মরুভূমিতে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের আহ্বান জানাল এবং ফিরুয ও ইরানী মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য তাদের সাহায্য চাইল। এ আহ্বানের পর আসওয়াদ উনসীর সহযোগীরা সানআয় সমবেত হয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে লাগল। সানআর অধিবাসীরা কাইস ইবনে আবদে ইয়াগুসের পৃষ্ঠপোষকতা ও গোপন তৎপরতায় এ ঘটনা ঘটেছে জানতে পারল। কিন্তু কাইস ফিরুয ও দদাভেইয়ের নিকট বিপরীত চিত্র তুলে ধরে প্রতারণা ও ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিল ও পরদিন তাঁদের নিজগৃহে আহারের আমন্ত্রণ জানাল। তাঁরাও কাইসের কথায় বিশ্বাস করে তার আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন।

পরদিন প্রথমে দদাভেই কাইসের গৃহে প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে ওঁত পেতে থাকা ব্যক্তিদের হাতে নিহত হলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরুয গৃহদ্বারে পৌঁছামাত্র গৃহের ছাদে দু মহিলাকে বলতে শুনলো: এই লোকটিও এখন নিহত হবে যেমনভাবে দদাভেই নিহত হয়েছে।

ফিরুয এ কথা শোনামাত্রই বিপরীত দিকে ফিরে দৌড় দিলেন। কাইসের সঙ্গীরা তাঁকে দেখে ধওয়া করল ,কিন্তু ধরতে সক্ষম হলো না।

ফিরুয ঐ এলাকা হতে দ্রুত বেরিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে জাশীশ দাইলামীকে কাইসের গৃহের দিকে রওয়ানা হতে দেখে তাঁকে এ সম্পর্কে জানাল। পরে তাঁরা দু জন খাউলান পর্বতের দিকে যাত্রা করে ফিরুযের আত্মীয়-স্বজনের নিকট পৌঁছলেন। ফিরুয সানআ হতে চলে যাওয়ার পর আসওয়াদ উনসীর অনুসারীরা তাদের কর্মতৎপরতা বাড়িয়ে দিল। ফিরুয খাউলান পর্বতে আশ্রয় নেয়ার পর কিছু সংখ্যক আরব ও ইরানী তাঁর চারপাশে ভীড় জমাল। ফিরুয ইয়েমেনের অবস্থা জানিয়ে মদীনায় খবর পাঠালেন।

অধিকাংশ আরব গোত্রপ্রধান ফিরুযের প্রতি সহযোগিতা থেকে হাত গুটিয়ে নিল। কাইস সকল ইরানীকে যত দ্রুত সম্ভব ইয়েমেন হতে ইরানে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দিল। ফিরুয ও দদাভেইয়ের পরিবারবর্গকেও ইয়েমেন ত্যাগ করতে বাধ্য করল।

ফিরুয এ ঘটনা শোনার পর কাইস ইবনে আবদে ইয়াগুসের সঙ্গে যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি কয়েকজন আরব গোত্রপতির নিকট মুরতাদদের বিরুদ্ধে সাহায্য চেয়ে পত্র লিখলেন। তখন আকিল গোত্রের লোকেরা ফিরুয ও ইরানীদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসল। তারা কাইসের অশ্ববাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে একদল ইরানীকে তাদের হাত হতে মুক্ত করে।

আক গোত্রের লোকেরাও ফিরুযের সাহায্যে এগিয়ে এসে আরব মুরতাদদের হাত হতে অপর এক দল বন্দী ইরানীকে মুক্ত করে। আকিল ও আক গোত্রের লোকরা সম্মিলিতভাবে কাইসের নেতৃত্বাধীন ধর্মত্যাগীদের ওপর হামলা শুরু করল। ফলে কাইস ইবনে ইয়াগুস পরাজিত হয়ে পলায়ন করল। সে সাথে আসওয়াদ উনসীর অনুচররাও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়ল।

অবশেষে মুহাজির ইবনে আবি উমাইয়্যার হাতে সে বন্দী হয়। অতঃপর বন্দী অবস্থায় তাকে মদীনায় প্রেরণ করা হয়। খলীফা আবু বকর তাকে দদাভেইকে হত্যার কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলে , আমি তাকে হত্যা করিনি। তাকে গোপনে হত্যা করা হয়েছে। তার হত্যাকারী কে তা অস্পষ্ট। খলীফা আবু বকর তার কথাকে মেনে নিয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন। সম্ভবত ইসলামী আইনের এটি সর্বপ্রথম লঙ্ঘন ও পদদলন যেখানে জাতিগত গোঁড়ামি ও অন্ধত্বের ভিত্তিতে অনারবদের ওপর আরবদের প্রাধান্য দেয়া হয়েছিল ,যদিও সকলেই জানত কাইস মুরতাদ হয়ে গিয়েছিল ও ইসলামের শত্রুদের সহযোগিতা করত এবং বিপরীত দিকে দদাভেই একজন ইরানী মুসলমান হিসেবে ইসলামের পথে নিহত হয়েছিলেন।

মুসলমানদের হাতে ইরানীদের পতন

ইরানের শাসন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মুসলমানদের সংঘর্ষ ও মুসলমানদের হাতে সাসানী সাম্রাজ্যের পতন ইরানীদের চোখে ইসলামের মহত্ত্ব ও বিরাটত্বের প্রকৃত রূপ প্রস্ফুটিত করে তোলে।

সাসানী শাসকবাহিনীর সঙ্গে মুসলমানদের যুদ্ধের সময় ইরানের অভ্যন্তরে বিশৃঙ্খলা ও চরম গোলযোগ সত্ত্বেও সামরিক দিক হতে ইরান খুবই শক্তিশালী ছিল। সামরিক দিক দিয়ে সে সময় মুসলমানরা ইরানের প্রতিপক্ষ বলেই ধর্তব্য ছিল না। তখন দু পরাশক্তি পৃথিবীতে রাজত্ব করত: পারস্য ও রোম। অন্যান্য রাষ্ট্রগুলো তাদের অধীন অথবা করদরাষ্ট্র বলে পরিগণিত হতো। সে সময়কার ইরান সৈন্য ,যুদ্ধাস্ত্র ,জনসংখ্যা ,খাদ্য সম্পদ ,সাজ-সরঞ্জাম ও বৈষয়িক সকল দিক হতেই মুসলমানদের থেকে অনেক উন্নত অবস্থানে ছিল। এমনকি মুসলমানরা ইরান ও রোমীয়দের উন্নত যুদ্ধ কৌশলের সঙ্গে পরিচিত ছিল না। আরবরা গোত্রযুদ্ধ হতে ব্যাপকতর ,সর্বব্যাপী যুদ্ধে পারদর্শী ছিল না। এ কারণেই তখন কেউই আরব মুসলমানদের হাতে ইরানের পরাজয়ের চিন্তাও করেনি।

এখানে হয়তো কেউ বলতে পারেন মুসলমানদের জয়ের পিছনে তাদের ঈমানী চেতনা ,রিসালতের প্রতি বিশ্বাস ,উজ্জ্বল লক্ষ্যমাত্রা ,জয়ের প্রতি অবিচল আস্থা ,সর্বোপরি আল্লাহ্ ও কিয়ামতের প্রতি দৃঢ় ঈমানই মূল ছিল।

অবশ্যই এ বিষয়গুলো মুসলমানদের জয়ের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল সন্দেহ নেই। তাদের আত্মত্যাগ ,আত্মবিসর্জনের যে সকল নমুনা ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে তা তাদের জিহাদকালীন বক্তব্যসমূহে ফুটে উঠেছে। এগুলো তাদের আল্লাহ্ ও কিয়ামতের প্রতি দৃঢ ঈমান ,রাসূল (সা.)-এর রেসালতের প্রতি তাদের আস্থা ,সে সাথে নিজ ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতার স্বাক্ষর বহন করে। আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো উপাসনা করা যাবে না- এ বিশ্বাস তাদের অন্য জাতিসমূহকে সব ধরনের খোদা ভিন্ন অন্য সত্তার উপাসনা হতে মুক্তি দিতে অনুপ্রাণিত করত। তারা একত্ববাদ ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাকে নিজ দায়িত্ব মনে করত। তারা চাইত অসহায় ও নির্যাতিতকে অত্যাচারীদের হাত হতে মুক্তি দিতে।

বিভিন্ন বক্তব্যে যখন নিজ লক্ষ্য সম্পর্কে তারা বলত তাতে এটি স্পষ্ট হতো যে ,পূর্ণ সচেতনতা সহকারেই তারা নির্দিষ্ট লক্ষ্যের উদ্দেশ্যে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রকৃতই একটি আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার দায়িত্ব পালন করেছে। স্বয়ং হযরত আলী (আ.) তাদের এভাবে বর্ণনা করেছেন ,و حملوا بصائرهم على أسيافهم এবং তারা তাদের তরবারীগুলোতে তাদের অন্তর্দৃষ্টিসমূহকে বহন করত। 25 কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের বেতনভোগীরা কাপুরুষোচিতভাবে ইসলামী আন্দোলনগুলোকে আলেকজান্ডার ও মোগলদের আক্রমণের সঙ্গে তুলনা করে থাকে।

মুসলমানদের ঈমানী চেতনা ও আত্মিক শক্তির বিষয়ে কথাগুলো পুরোপুরি ঠিক ,কিন্তু এরূপ মহাবিজয় হস্তগত করার জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। কারণ স্বল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে সাসানী শাসকবর্গের এক বৃহৎ প্রতিষ্ঠিত রাজত্বকে সম্পূর্ণরূপে নিশ্চি হ্ন করা (বিশেষত যে অবস্থার কথা আমরা উল্লেখ করেছি) এতদসত্ত্বেও অসম্ভব বলে পরিগণিত।26

তৎকালীন ইরানের লোক সংখ্য চৌদ্দ কোটি ছিল বলে উল্লিখিত হয়েছে27 এবং তাদের একটি বড় অংশ সৈনিক ছিল। আপরদিকে ইরান ও রোমের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী মুসলিম সৈন্যসংখ্যা ষাট হাজারের অধিক ছিল না। যদি ইরানীরা পশ্চাদাপসরণ না করত তবে এ সংখ্যা ইরানের মানুষের মাঝে হারিয়ে যেত ,অথচ এ অল্প সংখ্যক সৈনিকের হাতেই সাসানী রাজত্ব সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। তাই ইরানীদের পরাজয়ের পেছনে অন্য কারণও খুঁজতে হবে।

গণ অসন্তোষ

প্রকৃতপক্ষে ইরানে সাসানী শাসকদের পরাজয়ের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ ছিল শাসন কর্তৃপক্ষের অনৈতিক পথ ও জোর-জবরদস্তিমূলক আচরণের প্রতি জনসাধারণের অসন্তোষ। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সকল ঐতিহাসিক এটি স্বীকার করেছেন ,তৎকালীন সামাজিক ,রাজনৈতিক ও ধর্মীয় অবস্থা এতটা অধঃপতিত ছিল যে ,প্রায় সকলেই শাসকবর্গের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল। এই অসন্তোষ খসরু পারভেজের পরবর্তী কয়েক বছরের ফলশ্রুতি নয় । কারণ জনগণ যদি কোন শাসন পদ্ধতি ও ধর্মের অনুগত ও আশান্বিত থাকে তাহলে একজন শাসকের প্রতি সাময়িক অসন্তুষ্টির কারণে তারা সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ হতে বিরত থাকতে পারে না। এর বিপরীতে যদি জাতীয় চেতনা জাগ্রত থাকে তবে বাহ্যিক পরিস্থিতি মন্দ ও প্রতিকূল হলেও জনসাধারণ অভ্যন্তরীণ বিভেদ ভুলে নিজেদের সমন্বিত করে সাধারণ শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এর উদাহরণ ইতিহাসে প্রচুর রয়েছে।

সাধারণত বহিঃশত্রুর আক্রমণের কারণে অভ্যন্তরীণ বিভেদ দূরীভূত হয়ে অধিকতর ঐক্য স্থাপিত হয়। তবে এ শর্তে ,ঐ জনগণের মধ্যে সে দেশের সরকার ও ধর্মের অভ্যন্তর হতে উৎসারিত এক জীবন্ত মানসিকতা থাকতে হবে।

বর্তমান সময়েও লক্ষ্য করলে দেখি আরবদের মাঝে যথেষ্ট অনৈক্য ও বিভেদ থাকা সত্ত্বেও (তদুপরি রয়েছে সাম্রাজ্যবাদীদের তৎপরতা) সাধারণ শত্রু ইসরাইলের উপস্থিতির কারণে তারা তাদের শক্তিকে সমন্বিত করে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। এটি তাদের মধ্যে এক জীবন্ত চেতনার উপস্থিতির প্রমাণ।

তৎকালীন ইরানী সমাজে আশ্চর্যজনক শ্রেণীবিভক্তি ছিল। বিভিন্ন শ্রেণীর অস্তিত্বের ফলে শ্রেণীবিভক্ত সমাজের সকল মন্দ প্রভাব সেখানে বিদ্যমান ছিল। বিভিন্ন শ্রেণীর যারথুষ্ট্রিয়ানদের জন্য স্বতন্ত্র অগ্নিমন্দির ছিল। এখন চিন্তা করুন যদি মুসলমানদের ধনী ও দরিদ্রদের জন্য স্বতন্ত্র মসজিদ হতো তাহলে মানুষের মধ্যে কিরূপ ধারণার জন্ম নিত। তৎকালীন শ্রেণীবিভক্তির বাড়াবাড়ি এতটা বেশি ছিল যে ,এক শ্রেণী অপর শ্রেণীতে প্রবেশের অধিকার রাখত না। ধর্মীয় আইন শ্রমিক ও জুতা মেরামতকারীর (মুচি) সন্তানকে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার দিত না। একমাত্র ধর্মীয় গুরু ও রাজসভার সদস্যদের পুত্ররাই শিক্ষাগ্রহণ করতে পারত।

যারথুষ্ট্র ধর্ম বাস্তবে যা-ই হয়ে থাক সেসময়ে ধর্মীয় গুরুদের হাতে এতটা বিচ্যুত ও নষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে ,বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন ইরানী জাতি অন্তর থেকে এ বিশ্বাসকে গ্রহণ করতে পারে নি। তাই বিশেষজ্ঞদের ধারণা যদি ইসলাম এ সময় ইরানে না আসত খ্রিষ্টধর্ম ইরানকে দখল করে ফেলত ও যারথুষ্ট্র ধর্ম নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত। ইরানের সকল চিন্তাশীল ও জ্ঞানী ব্যক্তি তখন খ্রিষ্টধর্মাবলম্বী ছিলেন। তাঁরা যারথুষ্ট্র ছিলেন না এবং ইরানের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সকল কেন্দ্রও তখন খ্রিষ্টানদের হাতে ছিল। যারথুষ্ট্রগণ ভ্রান্তি ও কুসংস্কারপূর্ণ রীতি বিশ্বাস এবং নিরস ধর্মীয় গোঁড়ামির অহংকারে এতটা নিমজ্জিত ছিল যে ,ন্যায়পরায়ণতা ও স্বাধীন চিন্তায় অক্ষম হয়ে পড়েছিল। বাস্তবে ইরানে ইসলামের প্রবেশের ফলে যারথুষ্ট্র মতবাদ নয় ;বরং খ্রিষ্টধর্ম সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ সবচেয়ে উপযোগী ভূমিটি তাদের হাতছাড়া হয়েছিল। ইরানের জনসাধারণ ক্ষমতাশীল শাসকবর্গ ,ধর্মীয় কর্তৃপক্ষ ও পুরোহিতদের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। যে কারণে সাধারণ সৈনিকরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে কোন উৎসাহবোধ করত না ;বরং কখনও কখনও তারা মুসলমানদের সহযোগিতাও করেছে।28

এডওয়ার্ড ব্রাউন তাঁর তারিখে আদাবিয়াতে ইরান গ্রন্থের 299 পৃষ্ঠায় বলেছেন ,

ইসলাম ইরানীদের ওপর আরোপিত হয়েছে , নাকি তারা স্বেচ্ছায় তা গ্রহণ করেছে এ সম্পর্কে আলীগড় প্রকৌশল ইসলামী প্রশিক্ষণ বিষয়ক ইনস্টিটিউটের প্রফেসর আর্নল্ড তাঁর মূল্যবান গ্রন্থে উত্তমরূপে আলোচনা করেছেন। আর্নল্ড যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের অসহনশীলতার উল্লেখ করে বলেছেন: পুরোহিতগণ অন্যান্য ধর্মের পণ্ডিতদের প্রতিই শুধু নয় ; বরং তাঁদের মতাদর্শের বিরোধী আর্য , মনু , মাযদাকী , খ্রিষ্টীয় আধ্যাত্মিক পণ্ডিত ( Gnostic)সকলের প্রতিই সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। এ কারণে তাঁরা অনেকেরই অসন্তোষের কারণ হয়েছিলেন। অন্যান্য ধর্মের অনুসারীদের প্রতি যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের অত্যাচারী আচরণের কারণে ইরানী জনসাধারণের অনেকের অন্তরেই যারথুষ্ট্র ধর্ম ও এর পুরোহিতদের পৃষ্ঠপোষক সম্রাটদের প্রতি বিতৃষ্ণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছিল এবং আরবদের বিজয় অত্যাচার ও নিপীড়ন হতে ইরানীদের মুক্তির সন্ধিক্ষণ বলে পরিগণিত হয়েছিল।

এডওয়ার্ড ব্রাউন আরও বলেছেন ,

সুনিশ্চিত বলা যায় অধিকাংশ মানুষ যারা ধর্ম পরিবর্তন করেছিল স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে

সন্তুষ্ট চিত্তেই তা করেছিল। উদাহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় ,কাদেসীয়ায় ইরানীদের পরাজয়ের পর কাস্পিয়ান সাগরের নিকটবর্তী স্থানের দাইলামী বংশের চার হাজার সৈন্য পরস্পর আলোচনার মাধ্যমে সর্বসম্মতভাবে ইসলাম গ্রহণ করে আরবদের সঙ্গে মিলিত হয়। তারা জালুলা দখলে আরব মুসলমানদের সাহায্য করে এবং তাদের সঙ্গে বসবাসের লক্ষ্যে কুফায় হিজরত করে। অন্যান্য ইরানীও দলে দলে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়েই ইসলামে প্রবেশ করে।

ইসলামের আবির্ভাবের সমকালীন ইরানী শাসক ,আইন ও ধর্মীয় পরিবেশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল সমগ্র ইরানী জাতিকে নতুন এক শাসন ব্যবস্থা ও ধর্ম গ্রহণের উপযোগী করে তুলেছিল। এ কারণেই মুসলমানদের হাতে ইরান বিজিত হওয়ার পর ইরানী জনসাধারণ কোন বিপরীত প্রতিক্রিয়া তো প্রদর্শন করেইনি ;বরং স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে ইসলামের অগ্রগতির লক্ষ্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় রত হয়েছিল।

ডক্টর সাহেবুয যামানী তাঁর দীবাচেই বার রাহবারী গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন ,

ইরানের সাধারণ মানুষ ইসলামের আকর্ষণীয় শ্রেণীবিদ্বেষহীন বিশ্বদৃষ্টি ও মতাদর্শের প্রতি বিপরীত কোন প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করেনি এ জন্য যে ,এ মতাদর্শে তাদের শতাব্দী কালের আকাক্সিক্ষত বস্তুর সন্ধান পেয়েছিল যা পাওয়ার জন্য তারা রক্ত ,অশ্রু ,জীবন সব কিছুই বিনিময়ে প্রস্তুত ছিল এবং দীর্ঘকাল তার জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল...।

ইসলামের আবির্ভাবের পর প্রথম ইরানী প্রজন্ম নতুন এ ধর্মের মধ্যে অন্তঃসারশূন্য বাহ্যিক চাকচিক্যময় স্লোগানের আবর্তে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করার কোন নমুনা তো দেখেইনি ;বরং এর বাণীসমূহের প্রতিফলন তারা প্রতি মুহূর্তেই প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিল। ইসলামের নবী (সা.) বিভিন্ন সময় যেমন স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন , আমি তোমাদের মতই মানুষ ,কালো হাবাশী দাস এবং সম্ভ্রান্ত কুরাইশের মধ্যে খোদাভীতির মানদণ্ড বহির্ভূত কোন পার্থক্য নেই - তেমনি বাস্তবেও তার নমুনা তিনি দেখিয়েছেন। ইরানীরা স্বপ্নে ও কল্পকাহিনীতেও যা ভাবেনি ও অন্তরে যার আকাঙ্ক্ষাই শুধু করেছিল বাস্তবে খোলাফায়ে রাশেদীনের মধ্যে বিশেষত আলী (আ.)-এর মধ্যে তা হতেও আশ্চর্যজনক কিছু লক্ষ্য করেছিল।... বিলুপ্ত সাসানী ও নবীন ইসলামী সভ্যতার বিশ্বদৃষ্টিগত পার্থক্যের এক সংবেদনশীল চিত্র আমরা লক্ষ্য করি আমিরুল মুমিনীন আলীর সিরিয়া অভিযানের সময় যখন তিনি ফোরাত উপকূলের আনবার শহরের মুক্তিপ্রাপ্ত কৃষকদের উদ্দেশ বক্তব্য রাখেন। হযরত আলীর অলংকারপূর্ণ ও উদ্দীপনাময় বক্তব্যসমূহের অন্যতম এটি। সেখানে তিনি পারস্পরিক আচরণের (বিশেষত সাধারণ মানুষের সঙ্গে শাসকের আচরণের) যে নমুনা পেশ করেন ,তাতে এ ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিশ্বের ভবিষ্যৎ নেতাদের জন্য এক আদর্শ রেখে যান...। ইরাকী সেনাদল সিরিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করেছিল। ফোরাত উপকূলের সুন্দর এ শহরের কৃষকরা আমীরুল মুমিনীনের শুভাগমনকে স্বাগত জানানোর উদ্দেশ্যে তাদের প্রাচীন রীতি (সাসানী আমলের) অনুযায়ী সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেনাদল আনবারে পৌঁছলে তারা হর্ষধ্বনি দিয়ে আনন্দ প্রকাশ শুরু করল। (তারা সেনাদলের প্রতি উল্লাস ধ্বনি দিয়ে এগিয়ে আসল ,কিন্তু হযরত আলীকে অন্যদের হতে পার্থক্য করে চিনতে পারল না।) হযরত আলী শাসকদের প্রতি অভিনন্দন জ্ঞাপনের এ রীতিকে বিনয়ের সঙ্গে সমালোচনা করে বললেন ,... মহান আল্লাহ্ এরূপ আচরণে সন্তুষ্ট নন। মুমিনদের নেতা হিসেবেও এটি আমার নিকট অপছন্দনীয়। স্বাধীনচেতা মানুষরা কখনও নিজেদের এরূপ ছোট ও অপমানিত করে না... চিন্তা করে দেখ বুদ্ধিমানরা নিজেদের কষ্টের বিনিময়ে কখনও কি আল্লাহর অসন্তুষ্টি লাভ করতে চায় ? 29

ডক্টর সাহেবুয যামানী আরো বলেছেন ,

ইসলাম নেতৃত্বের দর্শনের মধ্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক নতুন বিষয় সংযুক্ত করেছিল। ইসলাম রাখালকে মেষপালের সংরক্ষণকারী বলে মনে করে। নেকড়ে রূপ রাখালের রক্ত পিপাসা মিটানোর জন্য মেষপাল নয়। তাই ইসলাম বঞ্চিত ও নিপীড়িত সাধারণ মানুষের মধ্যে মুক্তির উদ্দীপনা দিয়েছিল।

নেতার জন্য মানুষ ,নাকি মানুষের জন্য নেতা ? প্রাচীন বিশ্ব ও সাসানী আমলের প্রচলিত রাজনীতির বিপক্ষে ইসলাম এ নতুন প্রশ্ন উত্থাপন করেছিল। ইরান (পারস্য) ও রোম সাম্র্যজ্যের মধ্যে সাতশ বছরে সংঘটিত যুদ্ধগুলোতে সাধারণ মানুষের নিকট এ প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। কারণ স্বেচ্ছাচারী এ দু সাম্রাজ্যের রাজনীতি ছিল অভিন্ন। জনসাধারণ নেতার জন্য এবং সাধারণ শ্রেণী অভিজাতের জন্য-এই ছিল নীতি...। (এর বিপরীতে) কুফায় আলী (আ.)-এর সাধারণ গৃহের সভাকক্ষে মুক্তিপ্রাপ্ত দাস ও ইরানীদের সার্বক্ষণিক যাতায়াত ছিল। তারা শুধু শুনে নয় ,নিকট হতে আলীর সাদাসিধে জীবনকে প্রত্যক্ষ করার সুযোগ পেয়েছিল। তাই ইরানের নির্যাতিত-বঞ্চিত মানুষের এরূপ আহ্বানে সাড়া দেয়া আশ্চর্যের কোন বিষয় নয়।

মন্থর ও পর্যায়ক্রমিক অনুপ্রবেশ

যতই দিন অতিবাহিত হচ্ছিল ইরানীদের ইসলামের প্রতি আগ্রহ ও ভালবাসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল ,সে সাথে পুরাতন ধর্মের রীতি ও আচার-প্রথা বিলীন হচ্ছিল। এর সর্বোত্তম উদাহরণ হলো ফার্সী সাহিত্য। সময়ের পরিক্রমায় ফার্সী সাহিত্যে ইসলাম ,কোরআন ও হাদীসের প্রভাব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। তাই তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর সাহিত্যিক ,কবি ও লেখকদের অপেক্ষা ষষ্ঠ ও সপ্তম হিজরী শতাব্দীর ইরানী লেখক-কবিদের লেখায় ইসলামের প্রভাব অধিকতর লক্ষণীয়। ফেরদৌসী ও রুদাকীর লেখার সঙ্গে মৌলাভী (জালালুদ্দীন রুমী) ,সা দী ,নেযামী ,হাফিয ও জামীর লেখা তুলনা করলে এটি স্পষ্ট হয়।

মরহুম বদিউজ্জামান ফুরুযন ফার তাঁর আহাদীসে মাসনাভী গ্রন্থে ফার্সী কবিতায় হাদীসসমূহের ভাবার্থের অনুপ্রবেশ ও প্রভাব সম্পর্কে আলোচনা করতে গিয়ে রুদাকীর কবিতার উল্লেখ করে বলেন ,

চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে যখন ইসলামী সংস্কৃতি সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল এবং বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হলো তখন ইসলাম ধর্ম ইরানের অন্য সকল ধর্মের ওপর পূর্ণ প্রতিষ্ঠা লাভ করল। যারথুষ্ট্র ধর্ম ইরানের সকল শহরেই প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে অবধারিত পরাজয় বরণ করল। ইরানী সংস্কৃতি ইসলামের রঙে দীপ্তিমান হলো। শিক্ষাব্যবস্থা আরবী ভাষা ও ইসলাম ধর্মের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হলো। ফলশ্রুতিতে লেখক ও কবিদের লেখায় আরবী শব্দ ও ভাবার্থের প্রচলন বৃদ্ধি পেল। ইসলাম-পূর্ব যুগে গল্প ও কবিতায় এরূপ শব্দ ও প্রবাদের প্রচলন খুবই কম ছিল । এমনকি সাসানী ও গজনভী শাসনামলের প্রথমে দাকীকী ,ফেরদৌসী ও অন্যান্য কবিদের লেখায়ও যারথুষ্ট্র ,আভেস্তা ,বুজার জামহার ও তাঁর প্রজ্ঞার কথা উল্লিখিত হয়েছে যা চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথম ভাগের উনসুরী ,ফারখী ,মনুচেহরী প্রভৃতি কবির লেখায় আসেনি।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইরানীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্র্য যত বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে ইসলামী নৈতিকতা ,আধ্যাত্মিকতা ও বাস্তবতার গ্রহণযোগ্যতা ইরানীদের মাঝে তত প্রসার লাভ করেছে।

তাহেরীয়ান ,আলেবুইয়া এবং অন্যান্যরা তুলনামূলকভাবে অধিকতর রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করা সত্ত্বেও কখনও চিন্তা করেননি আভেস্তা 30 কে নতুনভাবে ইরানে জীবিত করবেন এবং তাকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবেন ;বরং তাঁরা এর বিপরীতে ইসলামের সত্যকে প্রচারের কাজে মনোনিবেশ করেছেন।

মুসলমানদের হাতে ইরান বিজিত হওয়ার একশ বছর পর ইরানীরা একটি সুসংগঠিত সেনাবাহিনী তৈরিতে সক্ষম হয়। শক্তির অপপ্রয়োগ এবং ইসলামের শিক্ষা হতে বিচ্যুত হওয়ার কারণে উমাইয়্যা শাসকবর্গের প্রতি সাধারণ মুসলমানদের অসন্তোষ তীব্র হয়ে উঠেছিল। তাই কিছু গোঁড়া আরব ব্যতীত তাদেরকে কেউই পছন্দ করত না। ইরানীরা তাদের সেনা সাহায্য ও নেতৃত্বে উমাইয়্যাদের নিকট থেকে ক্ষমতা আব্বাসীয়দের হাতে অর্পণে সক্ষম হয়। সে সময় ইরানীরা চাইলে অবশ্যই এক স্বতন্ত্র শাসন প্রতিষ্ঠা এবং তাদের পুরাতন ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারত। কারণ পরিবেশ সম্পূর্ণরূপে তাদের অনুকূলে ছিল। কিন্তু সে সময় তারা খেলাফতের বাইরে স্বাধীন শাসন কর্তৃপক্ষের যেমন চিন্তা করত না তেমনি নতুন ধর্ম প্রত্যাখ্যান করে পুরাতন ধর্মে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছাও কখনও পোষণ করত না। কারণ তখনও তারা চিন্তা করত শাসন ক্ষমতা এক পরিবার হতে অপর এক অভিজাত পরিবারে31 স্থানান্তরের মাধ্যমে কোরআন ও ইসলামী শাসন ব্যবস্থার অধীনে জীবন যাপনের তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ হবে।

কিন্তু বনি আব্বাসের শাসনামলেও আব্বাসীয়দের ভূমিকায় তারা সন্তুষ্ট হতে পারেনি। আব্বাসীয় খলীফা হারুনের মৃত্যুর পর হারুনের দু পুত্র মামুন ও আমিনের মধ্যে বিভেদ দেখা দিলে পারস্য সেনাদল তাহের ইবনে হুসাইনের নেতৃত্বে মামুনের পক্ষে আলী ইবনে ঈসার নেতৃত্বের আরব সেনাদলের (আমিনের পক্ষের) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। তাহের ইবনে হুসাইনের জয় প্রমাণ করে ইরানীদের সামরিক শক্তি কতটা দৃঢ় ছিল! তদুপরি ইরানীরা সে সময় রাজনৈতিক স্বাধীনতা বা ইসলামকে প্রত্যাখ্যানের কোন চিন্তা করেনি। ইরানীরা তখনই স্বাধীন ও স্বতন্ত্র শাসন ক্ষমতার চিন্তা করেছে যখন তারা শত ভাগ ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠায় আরবদের ব্যর্থতা লক্ষ্য করেছে।

তাই এমনকি যখন পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করেছে তখনও ইসলাম ধর্মের প্রতি পূর্ণ নিবেদিত ভূমিকা রেখেছে। অধিকাংশ ইরানী পূর্ণ স্বাধীনতা প্রাপ্তির পরই ইসলাম গ্রহণ করেছে। ইরানীরা তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর প্রথম দিক হতে স্বতন্ত্র শাসন ক্ষমতা লাভ করতে শুরু করে। এ সময় পর্যন্ত বেশির ভাগ ইরানী তাদের পূর্ববর্তী ধর্ম যথা যারথুষ্ট্র ,খ্রিষ্টধর্ম ,সাবেয়ী বা বৌদ্ধ ধর্মের ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। তৃতীয় ও চতুর্থ হিজরী শতাব্দীতে যে সকল পর্যটক ইরান সফর করেছেন তাঁদের সফর নামায় উল্লিখিত হয়েছে সে সময় প্রচুর পরিমাণ অগ্নিমন্দির ও গীর্জা দৃষ্টিগোচর হতো। পরবর্তীতে এগুলোর সংখ্যা কমে যায় এবং মসজিদ স্থাপিত হয়।

মুসলিম ঐতিহাসিকদের অনেকেই বেশ কিছু ইরানী পরিবারের নাম উল্লেখ করেছেন যাদের কেউ কেউ চতুর্থ হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত যারথুষ্ট্র ধর্মাবলম্বী হিসেবেই ছিল এবং মুসলিম সমাজে সম্মানের সঙ্গে বাস করত। পরবর্তীতে তারা যারথুষ্ট্র ধর্ম পরিত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করে। বলা হয়ে থাকে ,সাসানী বংশধারার সামান (বালখের সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিত্ব) যিনি সামানী শাসকবর্গের পূর্বপুরুষ তিনি দ্বিতীয় হিজরী শতাব্দীতে ,কাবুস শাসকবর্গের পূর্বপুরুষ তৃতীয় হিজরী শতাব্দীতে এবং প্রসিদ্ধ ও দক্ষ কবি মেহইয়র দাইলামী চতুর্থ হিজরী শতাব্দীতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইরানের উত্তরাংশ ও তাবারিস্তানের অধিবাসীরা তৃতীয় হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামের সঙ্গে পরিচিত ছিল না ও মুসলিম খলীফাদের বিরোধিতা করত। ইরানের কেরমানের অধিবাসীরা উমাইয়্যা শাসনের শেষ সময় পর্যন্ত যারথুষ্ট্র ধর্মাবলম্বী ছিল।

আল মাসালিক ওয়াল মামালিক গ্রন্থের লেখক বলেছেন ,ইসতাখরীর যুগে ইরানের অধিকাংশ মানুষ যারথুষ্ট্র ধর্মাবলম্বী ছিল। বিশিষ্ট মুসলিম ভূগোলবিদ ও আহসানু তাকাসীম গ্রন্থের লেখক মাকদেসী তাঁর গ্রন্থের 39 ,420 ও 429 পৃষ্ঠায় ইরান ভ্রমণের বর্ণনায় তৎকালীন সময়ের ইরানী যারথুষ্ট্রদের অবস্থা সম্পর্কে বলেছেন ,যারথুষ্ট্রগণ যথেষ্ট প্রভাবশালী ছিল ও মুসলমানদের নিকট অন্যান্য ধর্মাবলম্বী হতে অধিকতর সম্মানিত ছিল। তাঁর বর্ণনা মতে তৎকালীন সময়ে যারথুষ্ট্রদের উৎসবগুলোতে বাজারসমূহ বিভিন্ন রঙে সজ্জিত করা হতো ,নববর্ষ ও শরৎকালীন ফসলী উৎসবে শহরের লোকজন আনন্দ উৎসবে মেতে উঠত।

মাকদেসী তাঁর আহসানুত তাকাসীম -এর 323 পৃষ্ঠায় ইরানের খোরাসানীদের ধর্ম সম্পর্কে বলেছেন ,খোরাসানে প্রচুর ইহুদী ছিল ,কিছু সংখ্যক খ্রিষ্টান ও মাজুসীও বসবাস করত। মুসলিম ঐতিহাসিক মাসউদী (মৃত্যু চতুর্থ হিজরী শতাব্দীর প্রথমার্ধে) যদিও তিনি ইরানী ছিলেন না ,কিন্তু ইরানী ইতিহাস ও ঐতিহ্যের বিষয়ে বেশ আগ্রহী ছিলেন। তিনি তাঁর ইরান সফরের ঘটনা আত তানবীহ ওয়াল আশরাফ গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। এ গ্রন্থের 91 ও 92 পৃষ্ঠায় তিনি ইসতাখরের কিছু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির নিকট সাসানী আমলের ইতিহাস সমগ্র দেখেছেন বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি ঐ গ্রন্থ হতে কিছু উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সেখানকার কিছু যারথুষ্ট্র পুরোহিতের নামও তিনি উল্লেখ করেছেন। তাতে বোঝা যায় তৎকালীন সময়ে বিশিষ্ট যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের বিশেষ অবস্থান ছিল। মাসউদী তাঁর মুরুজুয যাহাব গ্রন্থের 382 পৃষ্ঠায় ফি যিকরিল আখবার আজ বুয়ুতিন নিরান ওয়া গাইরাহা শিরোনামের আলোচনায় যারথুষ্ট্রদের অগ্নিমন্দিরের উল্লেখ করেছেন। তিনি দরাব জারদের অগ্নিমন্দিরের বিষয়ে বলেছেন ,332 হিজরীতেও এ অগ্নিমন্দিরে মাজুসিগণ উপাসনার জন্য দলে দলে আসত। অন্য কোন অগ্নিমন্দিরের অগ্নির এত সম্মান ছিল না।

উপরোক্ত বিষয়গুলো প্রমাণ করে ইরানীরা পর্যায়ক্রমে ও ধীরে ধীরে ইসলাম গ্রহণ করে। বিশেষত ইরানীদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অবস্থান লাভের পরই ইসলাম যারথুষ্ট্র ধর্মের ওপর পূর্ণ বিজয় অর্জন করে। আশ্চর্যজনক যে ,ইরানের যারথুষ্ট্ররা ইরানীদের স্বাধীন ক্ষমতা লাভের সময়কাল অপেক্ষা আরব শাসনামলে অধিকতর সম্মানিত ও স্বাধীনভাবে ধর্মীয় আচার-আচরণ পালন করতে পারত। ইরানীরা যত বেশি ইসলাম গ্রহণ করেছিল যারথুষ্ট্রগণ তত সংখ্যালঘুতে পরিণত হচ্ছিল ও তাদের অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়ছিল। আরবদের অপেক্ষা ইরানী মুসলমানরা যারথুষ্ট্র মতবাদের প্রতি অধিকতর অসহিষ্ণু ছিল। ইরানী নও মুসলিমদের এই অসহিষ্ণুতার কারণেই যারথুষ্ট্রদের অনেকেই ভারতে চলে যায়। তারাই ভারতের সংখ্যালঘু পারসিক।

মিস্টার ফ্রয় তাঁর মিরাসে বসতনীয়ে ইরান 32 গ্রন্থের 396 পৃষ্ঠায় যে বর্ণনা দিয়েছেন তা এখানে উল্লেখ করা অপ্রয়োজনীয় মনে করছি না । তিনি বলেছেন ,

বিভিন্ন মুসলিম ঐতিহাসিক সূত্র হতে জানা যায় পারস্যের ইসতাখরে যারথুষ্ট্রদের সর্ববৃহৎ দু টি কেন্দ্রের একটি (অপরটি আজারবাইজানের শীজে ছিল) মুসলিম শাসনামলেও পূর্বের মত জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থায় ছিল। দিন দিন যারথুষ্ট্রদের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অগ্নিমন্দিরগুলোর জৌলুস কমতে শুরু করল। এতদসত্ত্বেও এক হাজার খ্রিষ্টাব্দ (400 হিজরী শতাব্দী) পর্যন্ত পারস্যের অধিবাসীরা যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রতি অনুগত ছিল। একাদশ খ্রিষ্ট শতকে সালজুকীদের রাজ্য বিস্তারের সময় পর্যন্ত পারস্যের বিরাট অংশ যারথুষ্ট্র ধর্মাবলম্বী ছিল।

এ শতাব্দীতে ইরানের কযেরুন শহরে মুসলমান ও যারথুষ্ট্রদের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয় । বিশিষ্ট সুফী আবু ইসাহাক ইবরাহীম ইবনে শাহরিয়ার কযেরুনীর (মৃত্যু 1034 খ্রিষ্টাব্দ) সময়কালে এ ঘটনা ঘটে। যারথুষ্ট্রদের অনেকেই এ সুফী সাধকের দিক-নির্দেশনায় ইসলাম গ্রহণ করে। কিন্তু মু জামুল বুলদান ও অন্যান্য ইতিহাস গ্রন্থ হতে জানা যায় পারস্যে তখনও যারথুষ্ট্ররা শক্তিশালী ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ছিল। আলে বুইয়াদের সময় কযেরুনের শাসক ছিলেন খুরশীদ নামক এক যারথুষ্ট্র ব্যক্তি। পারস্যের সিরাজের শাসনকর্তা বুয়াইহী সিরাজের দরবারে তাঁর বিশেষ অবস্থান ছিল। বুয়াইহী সিরাজ খুরশীদের নিকট এ মর্মে পত্র পাঠান আবু ইসহাককে যেন তাঁর নিকট প্রেরণ করা হয়। কেন সে মুসলমান করার মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে অস্থিরতা সৃষ্টি করছে তার জবাবদিহিতার জন্য তিনি এ নির্দেশ দেন। মুসলমান ও যারথুষ্ট্র উভয়েই ইরানী বংশোদ্ভূত ছিল। তাদের মধ্যে খ্রিষ্টান ও ইহুদীর সংখ্যা খুবই কম ছিল।

তিনি 399 পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ,

ইসলামী চিন্তা দিন দিন যত প্রসার লাভ করতে লাগল সুফী ও শিয়া মতাদর্শ তত দীপ্তি অর্জন করল। ফলে সংকীর্ণ ও অনুন্নত যারথুষ্ট্র চিন্তাধারা ইরানীদের মাঝ হতে হারিয়ে যেতে লাগল। ইরানের দাইলামী শাসকরা শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করলে ইরানের পশ্চিম অংশ ইরানীদের হস্তগত হয়। 334 হিজরীতে বাগদাদ ইরানীদের পদানত হয়। তখনই যারথুষ্ট্র ধর্ম বিলুপ্তির পথে পা দেয়। আলেবুইয়া রাষ্ট্রীয় নীতিতে ইসলাম ও আরবী ভাষাকে মৌলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ এ দু টি বিষয় আন্তর্জাতিকতা লাভ করেছিল এবং যারথুষ্ট্র ধর্ম নিজস্ব গণ্ডীতে সীমিত হয়ে পড়েছিল। আলেবুইয়া অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে সহনশীল অবস্থানের নীতি গ্রহণ করেন। ইতোপূর্বে সুন্নী মতাবলম্বী খলীফা বিভিন্ন প্রদেশে সুন্নী শাসকবর্গকে নিযুক্ত করেছিলেন। কিন্তু আলেবুইয়া বিশেষভাবে হযরত আলীর পরিবারের প্রতি দুর্বল ছিলেন ও এই ধারার আরবীয় সংস্কৃতির প্রচলনে বিশ্বাসী ছিলেন। অন্যতম আলেবুইয়া শাসক আজদুদ্দৌলা 344 হিজরীতে (955 খ্রিষ্টাব্দে) জামশীদের সিংহাসনে উৎকীর্ণ ফার্সী বাক্যগুলোকে আরবীতে রূপান্তরের নির্দেশ দেন।

কি কারণে আরবদের শাসনকাল শেষ হওয়ার পরও ইরানের মানুষ ইসলামের প্রতি তাদের ভালবাসা প্রদর্শন অব্যাহত রেখেছিল ? ইসলামের আকর্ষণ ও ইরানীদের মানসিকতার সঙ্গে এর সামঞ্জস্য ভিন্ন অন্য কিছু এর কারণ হতে পারে কি ?

ইরানের স্বাধীন শাসকবর্গ যাঁরা রাজনৈতিকভাবে আরবদেরকে শত্রু ও প্রতিপক্ষ মনে করতেন তাঁরা বরং ইসলামের প্রচার ,প্রসার ও দীনী আলেমদের পৃষ্ঠপোষকতায় আরবদের হতে অধিক নিবেদিত ছিলেন। ইসলামী শিক্ষার বিস্তার ও এরূপ গ্রন্থ প্রণয়নে তাঁরা আলেমদের অধিকতর সহযোগিতা করতেন।

গত চৌদ্দ শতাব্দী ধরে ইরানীরা ইসলাম ও ইসলামী জ্ঞানের বিষয়ে যে অবদান রেখেছে ইসলামের দৃষ্টিতে তা নজীর বিহীন। এমনকি ব্রিটিশ সার্জন ম্যালকম যিনি প্রথম দু শতাব্দীকে নীরব দু শতাব্দী বলেছেন তাঁর দৃষ্টিতেও অন্য কোন জাতি ইরানীদের ন্যায় এত উদ্দীপনা ও ভালবাসা নিয়ে ইসলামের অগ্রগতিতে ভূমিকা রাখেনি। ইসলামের আগমনের পূর্বেও ইরানীরা কোন সময়ে এত নিবেদিত ভূমিকা রাখেনি।

ইরানীরা রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর তাদের প্রাচীন ধর্ম ও আচার ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারত ,কিন্তু তারা তা করেনি ;বরং তা প্রত্যাখ্যান করে ইসলামের দিকে অধিকতর নিবেদিত হয়েছে। কেন ? কারণ ইসলামকে তারা তাদের চিন্তা ও প্রকৃতির চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যশীল হিসেবে পেয়েছে। তাই কখনই যে ধর্ম ও আচার তাদের দীর্ঘ দিনের আত্মিক কষ্টের কারণ ছিল তা পুনরুজ্জীবিত করার কল্পনাও করত না। চৌদ্দ শতাব্দীর ইতিহাস এর সাক্ষ্য বহন করে। এখন যদি মাঝে মাঝে কিছু হাতে গোনা আত্মপরিচয়হীন ব্যক্তি প্রাচীন আচার ও ধর্মরীতি পুনরুজ্জীবনের কথা বলে তা ইরানী জাতির কথা বলে ধরা যায় না।

পরবর্তীতে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব ,ইরানীরা বারবার প্রমাণ করেছে ইসলাম তাদের প্রকৃতির সাথে আরবদের হতে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল। এর প্রমাণ হলো গত চৌদ্দ শতাব্দীব্যাপী ইসলামের জন্য তাদের নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকা। এই অবদান গভীর ঈমান ও ইসলাম প্রসূত ছিল । মহান আল্লাহর ইচ্ছা ও সহযোগিতায় আমরা পরবর্তী আলোচনাতে ইরানীদের কিছু মূল্যবান অবদানের উল্লেখ করব। এতে প্রমাণিত হবে ইরানী মুসলমানগণ অন্তরের অন্তস্তল হতে ইসলামকে গ্রহণ করেছিল এবং এ ধর্মের বিধানকে তারা চিন্তা ও বিবেকের প্রশ্নের উত্তর হিসেবে বিশ্বাস করেছিল। এ সত্য আমাদের রাসূল (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যিনি বলেছিলেন , আল্লাহর শপথ ,আমি এমন দিন দেখতে পাচ্ছি সে দিন এই ইরানীরা ,যাদের সঙ্গে তোমরা ইসলামের জন্য যুদ্ধ করছ তারা তোমাদের মুসলমান বানানোর জন্য যুদ্ধ করবে।

ইরানে দু টি ধারার উপস্থিতির ব্যাখ্যা প্রদান করতে গিয়ে অনেকে ভুল অথবা বাড়াবড়ি করেছেন এবং এ দু ধারাকে ইসলামের বিরুদ্ধে বা অন্তত আরবদের বিরুদ্ধে ইরানীদের প্রতিক্রিয়া ও প্রতিরোধ আন্দোলন হিসেবে দেখেছে। প্রথমত ফার্সী ভাষার পুনরুজ্জীবন। দ্বিতীয়ত শিয়া মাযহাব। তাই এ দু টি বিষয় যার একটি আমাদের জাতীয় ভাষা অন্যটি রাষ্ট্রীয় মাযহাব-এ সম্পর্কে বিশেষ গবেষণামূলক আলোচনা রাখা প্রয়োজন মনে করছি।