ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান0%

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান লেখক:
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ: ইতিহাস

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক: শহীদ অধ্যাপক মুর্তাজা মুতাহ্হারী
: এ.কে.এম. আনোয়ারুল কবীর
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বিভাগ:

ভিজিট: 51287
ডাউনলোড: 2242

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 47 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 51287 / ডাউনলোড: 2242
সাইজ সাইজ সাইজ
ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান

লেখক:
প্রকাশক: কালচারাল কাউন্সেলরের দফতর ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান দুতাবাস -
বাংলা

চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে যখন ইসলাম আমাদের এ দেশে আসে তখন তা কিরূপ পরিবর্তন সাধন করে ? এ পরিবর্তনের ধারা কোন্ দিকে ছিল ? ইসলাম ইরান হতে কি গ্রহণ করেছে ও ইরানকে কি দিয়েছে ? ইরানে ইসলামের আগমন অনুগ্রহ ছিল নাকি বিপর্যয় ? বিশ্বের অনেক জাতিই ইসলামকে গ্রহণ করেছিল ও ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিল। তারা ইসলামের শিক্ষা প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রেখেছিল এবং তাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে‘ ইসলামী সভ্যতা’ নামে এক বৃহৎ ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতার সৃষ্টি হয়। এ সভ্যতার সৃষ্টিতে ইরানীদের অবদান কতটুকু ? এ ক্ষেত্রে ইরানীদের অবস্থান কোন্ পর্যায়ে ? তারা কি এ ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করতে সক্ষম হয়েছিল ? ইসলামের প্রতি তাদের এ অবদান ও ভূমিকার পেছনে কোন্ উদ্দীপনা কাজ করেছিল ? অত্র গ্রন্থের আলোচনাসমূহ এ প্রশ্নগুলোর সঠিক উত্তর পেতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।

অনুগ্রহ নাকি বিপর্যয়

আমাদের এ পর্যায়ের ও পরবর্তী অংশের আলোচনা ইসলাম ও ইরানের পারস্পরিক অবদান। অর্থাৎ ইসলাম ইরান ও ইরানী জাতির ওপর কি অবদান রেখেছে এবং ইরান ও ইরানী জাতি ইসলামের ক্ষেত্রে কি ভূমিকা পালন করেছে। অন্যভাবে বলা যায় ,ইসলাম ইরানকে কি দিয়েছে এবং ইসলাম ইরান হতে কিভাবে লাভবান হয়েছে।

একটি ধর্ম কোন জাতিতে কিরূপ অবদান রাখতে পারে ? অবশ্যই এ অবদান বা ভূমিকা সাময়িক ও তাৎক্ষণিক কোন বিষয় নয় ,যেমন কোন যুদ্ধে সামরিকভাবে তাদের সহযোগিতা করা অথবা দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্য দান করা বা শিল্প কারখানা স্থাপন করে সহযোগিতা করা ;বরং এ অবদান এ বিষয়সমূহ হতে অনেক মৌল এবং তা হলো তাদের চিন্তা-চেতনায় ফলপ্রসূ ও কল্যাণকর পরিবর্তন আনয়ন ,তাদের নৈতিক ও প্রশিক্ষণগত উন্নয়ন সাধন ,আবদ্ধ ও সংকীর্ণ প্রাচীন রীতির পরিবর্তন করে জীবন্ত ও গতিশীল জীবন পদ্ধতির প্রবর্তন ,নববিশ্বাস ,আদর্শ ও উন্নত চেতনার জন্মদান ,নব উদ্যোগ ও উদ্দীপনা সৃষ্টির মাধ্যমে সত্যজ্ঞান ও কল্যাণকর সৎ কর্মের প্রতি নির্দেশনা দান এবং সর্বোপরি আত্মত্যাগের অনুপ্রেরণা সৃষ্টি। যদি এমন হয় তবেই তাদের অর্থনৈতিক জীবন সমৃদ্ধ হবে ,মানব সম্পদের কার্যকর ব্যবহার সম্ভব হবে ,তাদের বিজ্ঞান ,দর্শন ,শিল্প ,স্থাপত্য ,সাহিত্যসহ জ্ঞানের সকল দিকের বিকাশ সাধিত হবে এবং এর ফলশ্রুতিতে ঐ জাতি ও সভ্যতা পূর্ণতাপ্রাপ্ত হবে।

অন্যদিকে কোন ধর্মের প্রতি এক জাতির অবদানের অর্থ হলো ঐ ধর্মের প্রচার ও প্রসার এবং তার সংস্কৃতির বিকাশ ও উন্নয়নে সে সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবে ও এজন্য আত্মনিয়োগ করবে। ঐ ধর্মের ভাষার গাঁথুনিকে মজবুত করবে ,অন্যান্য জাতিকে ঐ ধর্মের সঙ্গে পরিচিত করাবে ,নিজ জীবন ও সম্পদ দিয়ে একে রক্ষা করবে ,এর পথে জীবন উৎসর্গ করবে এবং এর সকল ক্ষেত্রে ঐকান্তিকতা ,নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগ প্রদর্শন করবে।

আমাদের এ পর্যায়ে আলোচনার প্রথমাংশ নিয়ে অর্থাৎ ইসলাম ইরানে কি অবদান রেখেছে। ইরান ও ইরানী জাতি ইসলামে কি ভূমিকা পালন করেছে আমরা তা এ গ্রন্থের তৃতীয় পর্বে আলোচনা করব।

পূর্বে আমরা যে মানদণ্ড দিয়েছি তার ভিত্তিতে দেখব ইসলাম ইরানে কোন অবদান রেখেছে কি না ? ইসলাম কি ইরানকে স্বাধীন করে এর হৃদয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার করেছে ? ইসলাম কি ইরানের ইতিহাসকে উন্নত ইতিহাসের দিকে পরিচালিত করেছে ? ইসলামের কারণেই কি ইরানের মানুষের সুপ্ত প্রতিভা ও যোগ্যতা পরিস্ফুটিত হয়েছে নাকি ইসলাম ইরানকে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশে নিয়ে গেছে ? তাদের প্রতিভার বিকাশকে স্তিমিত করে দিয়েছে ? ইরানের ইতিহাসকে কি বিপথে পরিচালিত করেছে ? ইরানের সভ্যতাকে কি নষ্ট ও ধ্বংস করেছে ? ইসলামের কারণেই কি ইরান জ্ঞান ,দর্শন ,ইরফান (আধ্যাত্মিকতা) ,শিল্প ,স্থাপত্যকলা ও নৈতিকতায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছে ও বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে নাকি ইসলাম এরূপ বিষয়ে বিভিন্ন মনীষীদের আবির্ভাবের পথকে রুদ্ধ করেছে ? যদি ইরানের ভূমিতে এরূপ মনীষীদের আবির্ভাব হয়ে থাকে এবং তা ইসলামের কারণে নয় বা ইসলাম সে পরিবেশ সৃষ্টি করে নি ;বরং ইরানীরা তাদের প্রকৃতিগত মেধা ও যোগ্যতা এবং ইসলামের প্রতি বিদ্বেষের কারণেই ইবনে সিনা ,আল বিরুনী (আবু রাইহান) ,খাজা নাসিরুদ্দীন তুসী এবং আল রাযীর মত প্রতিভার জন্ম দিতে পেরেছিল ;তাহলে এ প্রশ্নটি আসে যে ,ইসলাম ইরানের জন্য অনুগ্রহ ছিল নাকি তা বিপর্যয় ডেকে এনেছিল ?

নিঃসন্দেহে ইসলামের আবির্ভাব ও রাষ্ট্র গঠনের পর বিভিন্ন জাতি ইসলামের পতাকাতলে সমবেত হওয়ায় বিশাল মর্যাদাশীল ,বিরল ও ব্যাপক এক সভ্যতার জন্ম হয়। ঐতিহাসিক ও সমাজ বিজ্ঞানীরা যাকে ইসলামী সভ্যতা বলে অভিহিত করেছেন। এই সভ্যতায় এশিয়া ,আফ্রিকা ,এমনকি ইউরোপও অংশগ্রহণ করেছে। ইরানীরাও এ সভ্যতায় অংশগ্রহণকারী একটি জাতি এবং বিশেষজ্ঞদের মতে এ সভ্যতায় ইরানীদের অংশগ্রহণ সর্ববৃহৎ।

এর বাস্তবতা কি ? ইসলামী সভ্যতা নাম হতে যে বিষয়টি স্পষ্ট হয় প্রকৃতই কি তাই ? অর্থাৎ বাস্তবে ইসলামই কি এ সংস্কৃতি ও সভ্যতার পরিবেশ সৃষ্টিকারী ও প্রকৃত উদ্দীপক ? এ সভ্যতার প্রাণ সঞ্চারক ও পরিচালনাকারী শক্তি কি ইসলাম ? নাকি অন্য কোন কারণ ও উদ্দীপক এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে এবং প্রত্যেক জাতিই নিজস্ব উদ্দীপকের তাড়নায় এ সভ্যতায় ভূমিকা রেখেছে ? যেমন ইরানী জাতি তার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উদ্দীপনায়ই এতে অবদান রেখেছে।

এ বিষয়ে ধর্মীয় ,সামাজিক ও ঐতিহাসিক পর্যালোচনার জন্য ইসলামের আবির্ভাবের সমকালীন সময়ের ইরানের চিন্তাগত ,ধর্মীয় ,সামাজিক ,রাজনৈতিক ,পারিবারিক ও নৈতিক অবস্থার একটি পর্যালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সেই সাথে ইসলাম তার আগমনের পর এ বিষয়গুলোতে কি পরিবর্তন সাধন করেছে তা বিশ্লেষণ করলে আমরা সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারব।

সৌভাগ্যক্রমে ইসলামের ইতিহাস এবং এর আবির্ভাবের সমকালীন ইরানের ইতিহাস স্পষ্ট। তাই সহজেই আমরা প্রকৃত সত্যে পৌঁছতে পারি। বিশেষত বিগত অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়েছে। সর্বপ্রথম ইউরোপীয়রা বিষয়টি উপস্থাপন করে। পূর্বে ইরানীরা অন্যান্যের মতই এ বিষয়ে তেমন চিন্তা করত না। কিন্তু অধুনা এরূপ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা হয়ে থাকে। তবে দুঃখজনকভাবে এখনও আমাদের দেশে অন্যদের অনুসরণের নীতি অব্যাহত রয়েছে ;সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিজে গবেষণা পর্যালোচনা র ধারা এখনও চালু হয় নি। একদল লোক তোতা পাখির ন্যায় অন্যদের অনুকরণে ইরানে ইসলামের আগমনকে নিয়ামত ও অনুগ্রহ হিসেবে বর্ণনা করেন। অন্যদলও অন্যদের অনুকরণে তাদের বিপরীতে অবস্থান নেন ও বলেন ,ইসলাম ইরানের জন্য এক বিপর্যয় ছিল। বর্তমানে এমন দিন নেই যে দিন বই-পুস্তক ,পত্রিকাগুলো এ বিষয়ে কিছু লিখছে না বা রেডিও ,টিভি কিছু বলছে না। এ সবের ঊর্ধ্বে স্কুল-কলেজের বইগুলোও এ বিষয়ে বিশেষ চিন্তাধারার প্রচারের পথ হতে বিরত থাকছে না।

আমাদের ইচ্ছা সকল প্রকার গোঁড়ামি ও পক্ষপাতিত্বের ঊর্ধ্বে উঠে এ বিষয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা রাখব। আমাদের বিশ্বাস এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে একদল ইউরোপীয় গবেষক এবং কিছু সংখ্যক ইরানী বিশেষজ্ঞও এ বিষয়ে গবেষণা চালিয়েছেন। আমরা আমাদের আলোচনায় প্রায়শই তাঁদের উদ্ধৃতি ব্যবহার করব।

বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মত

এ বিষয়ে বিভিন্ন মত হতে উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি এখানে আমরা উল্লেখ করছি।

ড. মুঈন তাঁর মাযদা ইয়াসনা ওয়া আদাবে পার্সী 39 গ্রন্থে জনাব তাকী যাদের অতীত ইরানের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিবর্তন সম্পর্কিত বক্তব্য হতে উদ্ধৃতি দিয়েছেন ,

ইসলাম... এক নতুন ধর্ম এবং এক সুশৃঙ্খল ও আকর্ষণীয় বিধান ও ন্যায়ের ভিত্তিসহ আগমন করেছিল ,ইরানে ইসলামের প্রসার নব প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছিল এবং শক্তিশালী ঈমানের ভিত্তি দান করেছিল। যে দু টি ইতিবাচক প্রভাব এর আগমনের মাধ্যমে এ ভূখণ্ডে ঘটেছিল তার প্রথমটি হলো ইসলাম সমৃদ্ধ ও ব্যাপক এক ভাষা আরবীকে সঙ্গে করে এনেছিল... এ ভাষা ইরানে এসে আকর্ষণীয় ,মনোমুগ্ধকর ও নমনীয় আর্য ভাষার সঙ্গে ধীরে ধীরে মিশ্রিত হতে থাকে ও ইরানী ঐতিহ্যে মিশে যায় এবং একে পূর্ণতা দান করে। চতুর্থ ,পঞ্চম ও ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীর কয়েকজন প্রসিদ্ধ বক্তা ও ভাষাবিদের বদৌলতে নব অলংকারপ্রাপ্ত আকর্ষণীয় ও প্রাঞ্জল এক নতুন ভাষার সৃষ্টি হয়েছিল যা সকল ধরনের বিষয়বস্তুকে ব্যাখ্যার যোগ্যতা লাভ করেছিল। এরূপ প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন সা দী ,হাফিয ,নাসির খসরু এবং তাঁদের মত উজ্জ্বল কিছু প্রতিভা।... দ্বিতীয় বিষয়টি হলো (ইসলামের সঙ্গে) জ্ঞান ও সভ্যতায় সমৃদ্ধ এক নতুন ধারার আগমন ঘটে যা গ্রীক ,সুরিয়ানী ,হিন্দী (সংস্কৃত) ও অন্যান্য ভাষার গ্রন্থসমূহ আরবীতে অনুবাদের মাধ্যমে (দ্বিতীয় শতাব্দীর মাঝামাঝি হতে তৃতীয় শতাব্দীর শেষ সময় পর্যন্ত) শুরু হয় এবং ইসলামী খেলাফতশাসিত অংশে বিশেষত ইসলামী প্রাচ্যে ইরানীদের ও আরবী ভাষাজ্ঞানসম্পন্নদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে।

...গ্রীক শিল্প-সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের অবারিত সমুদ্রের খুব কম অংশই যা দ্বিতীয় শতাব্দী পর্যন্ত অননূদিত ছিল এর অধিকাংশই মুসলমানগণ অনুবাদ করেছিল... গ্রীক জ্ঞান ,বিজ্ঞান ও দর্শনের আরবী অনুবাদ এত অধিক পরিমাণে ইসলামী বিশ্বে বিশেষত ইরানে প্রচলন লাভ করে যে ,ইবনে সিনা ,ফারাবী ,আলবিরুনী ,মুহাম্মদ ইবনে যাকারিয়া রাযীদের মত প্রসিদ্ধ ব্যক্তিবর্গের আবির্ভাব ঘটে যাঁরা দশ হাজারের অধিক পুস্তক রচনা করেন যার নিরানব্বই ভাগ আরবী ভাষায় রচিত হয়। দ্বিতীয় হতে সপ্তম হিজরী শতাব্দী পর্যন্ত ইসলামী সভ্যতা গ্রীক ও রোম সভ্যতার পর সবচেয়ে বড় সভ্যতা হিসেবে আবির্ভূত হয় ...।

তাকী যাদেহ্ তাঁর এ বক্তব্যে শুধু এতটুকু বলেছেন ,ইসলাম ইরানে নব প্রাণের সঞ্চার করেছিল ,কিন্তু ইসলাম ইরান হতে কি নিয়েছে বা ইরানকে কি দিয়েছে যার ফলে ইরান নতুন প্রাণ লাভ করেছিল তা আলোচনা করেন নি। আমরা এ গ্রন্থে এ বিষয়টি ইনশাআল্লাহ্ স্পষ্ট করার চেষ্টা করব। তাকীযাদেহ্ এ বিষয়টি ইঙ্গিত করেছেন , ইসলাম সুশৃঙ্খল এক বিধান ও ন্যায়ের ভিত্তি নিয়ে এসেছিল । কিন্তু এ বিষয়টি ইসলামের অসংখ্য অবদানের একটি মাত্র। তিনি তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন ,ইসলামই সা দী ,হাফিয ও নাসির খসরুদের সাহিত্যপ্রতিভা বিকাশের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল এবং চিকিৎসা ,দর্শন ও অংকশাস্ত্রে ইবনে সিনা ,রাযী ,ফারাবী ও বিরুনীদের সুপ্ত প্রতিভা পরিস্ফুটনের সুযোগ করে দিয়েছিল।

জয়নুল আবেদীন রাহনামা তরজমা ওয়া তাফসীরে কোরআন গ্রন্থের ভূমিকায় (75 পৃষ্ঠায়) বলেছেন , আরব ভূমিতে ইসলামের আগমন মানব ইতিহাসের বৃহৎ বৈপ্লবিক ঘটনাসমূহের একটি... সপ্তম খ্রিষ্টীয় শতাব্দীর প্রারম্ভে এ বিপ্লব শুরু হয় এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সমগ্র আরব ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তা পার্শ্ববর্তী দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সভ্যতার ধারক দেশগুলোর মানুষ ও সমাজের মাঝে যে গভীর ও বিস্ময়কর পরিবর্তন আনে তা তাদের অন্তঃসারশূন্য ও অর্থহীন জীবন সম্পৃক্ততা হতে মুক্তি দেয় এবং স্থায়ী ও দৃঢ়তর এক নব সম্পৃক্ততা তাদের হৃদয়ে ও চিন্তায় সৃষ্টি করে যা মানবতার নব জীবনের ইতিহাসে এক আশ্চর্যজনক রহস্য। এই বিপ্লব নব সভ্যতার জন্মদানের মাধ্যমে তৃণলতা ও পানিশূন্য মৃত আরব মরুভূমির কিছু অপরিচিত ও শব্দহীন মরুচারীর মধ্য হতে শুধু সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্রের সহস্র ব্যক্তির সরব পদচারণার সৃষ্টিই করে নি ;বরং তাদের জন্য এক নব দর্শন নিয়ে এসেছিল।

যদিও এ সভ্যতার কিছু মূল পার্শ্ববর্তী রোম ও পারস্য এ দু বৃহৎ সভ্যতার পানিতে পুষ্ট হয়েছিল তদুপরি তাদের জন্যও এটি নব অভিজ্ঞতা হিসেবে পরিগণিত ছিল। তাকওয়া ও ন্যায়ের ভিত্তিতে যে ঐশী ও দার্শনিক শিক্ষা এ সভ্যতা দান করেছিল তা চিন্তাশীল ,অনুসন্ধানী ও তৃষ্ণার্ত হৃদয়ে শীতল ও সুপেয় পানি ঢেলে দিয়েছিল ,তাদের অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার করেছিল। এ চিন্তা প্রসারের মাধ্যমে ইসলামী সভ্যতা এ দু বৃহৎ সাম্রাজ্যের নির্যাতিত সাধারণ মানুষ যাদের জন্য স্রষ্টার ভিন্ন সকল পথ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছিল তাদের শুধু আশ্বাসই দেয়নি যে ,নাঙ্গাপদরা আবৃতপদদের ওপর বা অস্ত্রধারীদের ওপর অস্ত্রহীনরা বিজয়ী হবে ;বরং সেই সাথে সুবিচার ও ন্যায়পরায়ণতার ওপর প্রতিষ্ঠিত এক চিন্তা-যা জালেমদের ওপর মজলুমদের চিরস্থায়ী বিজয়ের বার্তা বহন করে এনেছিল। এই চিন্তা ও অনুভূতি এই রাষ্ট্রগুলোর সাধারণ মানুষের মাঝে এতটা তীব্র হয়ে ওঠে যে ,তারা তাদের শাসকবর্গকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে ইসলামের ধ্বজাধারীর পাশে দাঁড়িয়ে সমস্বরে ফরিয়াদ জানাতে লাগল। সে সময় হতে চৌদ্দশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এ চিন্তার নৈতিক প্রভাব এ ধর্মে বিশ্বাসী জাতিসমূহের মধ্যে পূর্বের মতই বিদ্যমান রয়েছে ,অথচ আরব বিজেতাদের বিজয়ের কোন ক্ষুদ্র চিহ্নও এ জাতিগুলোর মধ্যে এখন অবশিষ্ট নেই।

(বিশিষ্ট চিন্তাবিদ) রাহনামার মতে ইসলাম অর্থহীন বিষয়াবলীর সম্পৃক্ততা হতে জীবনকে মুক্ত করে দৃঢ় অর্থপূর্ণ জীবন সম্পৃক্ততার সৃষ্টি করে এবং নব চিন্তা ও দর্শন উপস্থাপন করে। তাই ইসলামের বিজয় কোন জাতির ওপর নব চিন্তা ও বিশ্বাসের বিজয় ,অন্যায় ও অবিচারের ওপর ন্যায় আকাঙ্ক্ষা ও সত্যপরায়ণতার বিজয়। ইসলামের বিজয়ের পশ্চাতে মূলত আরবরা নয় ;বরং বিজিত অঞ্চলের বঞ্চিত-নির্যাতিত ,সত্য ও ন্যায়ের জন্য তৃষ্ণার্ত সাধারণ মানুষের জাগরণ মূল ভূমিকা পালন করেছিল। তারা এক ঐশী চিন্তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে অত্যাচারী শাসকবর্গের বিরুদ্ধে সার্বিক বিদ্রোহ করেছিল।

ড. আবদুল হুসাইন যেররিন কুব তাঁর কর-নমেয়ে ইসলাম গ্রন্থের 13 পৃষ্ঠায় ইসলামের আড়ম্বরপূর্ণ ও মর্যাদাবান সভ্যতার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বলেছেন , যে বিষয়টি মুসলমানদের জ্ঞানগত ও বৈষয়িক উন্নয়নকে সম্ভব করে তুলেছিল তা হলো ইসলামের বাস্তবতা। ইসলাম জ্ঞানের প্রসারের লক্ষ্যে মুসলমানদের মধ্যে জীবনসঞ্চারী উদ্দীপনা ও উৎসাহ সৃষ্টি করে। প্রাচীন পৃথিবীর গোঁড়ামি ও কুসংস্কারকে জ্ঞানের দ্বারা প্রতিস্থাপিত করে এর প্রসারে পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতার জন্ম দেয় ও এর পথকে সুগম করে। যখন খ্রিষ্টধর্ম ও তাদের যাজকগণ মানুষকে জ্ঞান বর্জন করে উপাসনালয়ে নিজেদের সীমিত করার উপদেশ দিচ্ছিল তখন ইসলাম জ্ঞান ও শিল্পের পূর্ণতা ও উন্নয়নের পথকে সহজীকরণের মধ্যপন্থা অবলম্বন করেছিল।

ইসলাম যখন জ্ঞানের প্রসারের এই ময়দানে প্রবেশ করে তখন ভারসাম্য ও সহনশীলতার পথ অস্তগামী ছিল। সে সময়ের দুই পরাশক্তির (বাইজান্টাইন ও ইরান) একটি বাইজান্টাইনীরা খ্রিষ্টধর্মের গোড়ামিতে আড়ষ্ট হয়ে পড়েছিল এবং প্রতিদিনই তারা জ্ঞান ও দর্শনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে চলেছিল। জাস্টিনিয়ান দর্শনের চর্চাকে নিষিদ্ধ করে রোমীয়দের সঙ্গে সভ্যতা ও জ্ঞানের সম্পর্কের আশু বিচ্ছেদের ঘোষণা দেন। তৎকালীন ইরানেও অপসৃয়মান সাসানী শাসক খসরু অনুশিরওয়ানদের জ্ঞান ও চিন্তার প্রতি যে অনীহা ছিল তা এ ভূখণ্ডে সকল প্রকার চিন্তা ও জ্ঞানের পুনরুজ্জীবনের পথকে অসম্ভব করে তুলেছিল।

বারজুইয়া তাবিব তাঁর কালিলা ও দিমনা গ্রন্থের ভূমিকায় তৎকালীন শাসকদের চিন্তাগত গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার প্রতি ইশারা করেছেন। এরূপ জাতিগত গোঁড়ামি ও ধর্মান্ধতার সমাজে ইসলাম নতুন জীবন ফুঁকে দিয়েছিল। ইসলাম এক ইসলামী রাষ্ট্র (দারুল ইসলাম) গঠনের মাধ্যমে-যার প্রাণকেন্দ্র ইরাক বা সিরিয়া নয় ,ছিল কোরআন-বর্ণ ও জাতিগত গোঁড়ামিকে বিশ্ব মাতৃভূমির ধারণার মধ্যে নিশ্চি হ্ন করে এর সমাধান দেয়। খ্রিষ্টান ও মাজুসীদের ধর্মীয় গোঁড়ামির বিপরীতে ইসলাম জ্ঞান ও জীবনের প্রতি ভালবাসা ও আগ্রহ এবং আহলে কিতাবদের সঙ্গে সহনশীলতা ও সম্মানজনক সহাবস্থানের নীতি গ্রহণ করে। ইসলামের বিজয়ের ফলশ্রুতিতে এ বিস্ময়কর বৃক্ষের-যা না পূর্বের না পশ্চিমের কারণে-সৃষ্টি হয়েছিল।

ড. যেররিন কুবের দৃষ্টিতে ইসলাম এমন এক পৃথিবীতে পা রেখেছিল যা স্থবির ও জরাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। সে পরিস্থিতিতে ইসলাম জ্ঞানার্জন ,ধর্মীয় ও জাতিগত গোঁড়ামি পরিত্যাগ ,আহলে কিতাবগণের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান প্রভৃতি নৈতিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কোরআনের ভাষায় যে শৃঙ্খল তৎকালীন বিশ্ববাসীদের হাত ,পা ও চোখ বেঁধে রেখেছিল তা ছিন্ন করেছিল এবং এক নতুন ও ব্যাপক সভ্যতার জন্ম ও উত্তরণের পথকে সুগম করেছিল।

জার্মান অধ্যাপক আর্নেস্ট কুনেল যিনি বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামী শিল্পকলা অনুষদে 1935-1964 সাল পর্যন্ত অধ্যাপনা করেছেন তাঁর ইসলামী শিল্পকলা গ্রন্থের ভূমিকায় বলেছেন , অভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রভাব ইসলামী বিশ্বের অন্তর্ভুক্ত জাতিসমূহের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসমূহে খ্রিষ্টীয় বিশ্বে তাদের (খ্রিষ্টধর্মের) অভিন্ন বিশ্বাসের প্রভাব হতে অধিক। অভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণেই অতীতে ভিন্ন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অধিকারী জাতিসমূহকে এক সূত্রে গেঁথে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করা সম্ভব হয়েছিল। শুধু নৈতিকতার ক্ষেত্রে নয় ,এমনকি বিভিন্ন রাষ্ট্র ও জাতির সামাজিক রীতি-নীতি ও আচার-অনুষ্ঠানকেও আশ্চর্যজনকভাবে এ লক্ষ্যের দিকে পরিচালনা করা সম্ভব হয়েছিল। এই ঐক্য সৃষ্টির পশ্চাতে যার ভূমিকা সর্বাধিক ছিল তা হলো কোরআন-যা তাদের জীবনের সার্বিক বিষয়ে দিক-নির্দেশনা দিয়েছে। কোরআন তার অবতীর্ণ হবার ভাষায় প্রচারিত হওয়ায় আরবী লিখন পদ্ধতি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে সমগ্র ইসলামী বিশ্বকে সম্পর্কিত করে এবং সকল শিল্পের সৃষ্টিতে মুখ্য ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাশ্চাত্যে ধর্মীয় ও ধর্মবহির্ভূত শিল্পকলার মধ্যে যে পার্থক্য করা হয় তা এ ক্ষেত্রে বিলীন হয়ে গিয়েছিল। অবশ্য ধর্মীয় উপাসনালয়সমূহ সৃজনশীলতার প্রয়োজনে বিশেষ স্থাপত্য গঠনে তৈরি হলেও বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য অন্যান্য স্থাপত্য নিদর্শনে ব্যবহৃত নকশাই গৃহীত হতো।40

তিনি আরো বলেছেন , গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি এখানে উল্লেখ্য তা হলো মধ্যযুগের কঠোর রাজনৈতিক বিধি-নিষেধ সত্ত্বেও ইসলামী বিশ্বের দেশসমূহের মধ্যে এমন এক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল যা তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক লেনদেনই শুধু নয় ,সে সাথে সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ও বিনিময় প্রক্রিয়াকেও সহজ ও ত্বরান্বিত করেছিল। আরব ভূগোলবিদ ও পর্যটকদের ভ্রমণকাহিনী হতে বোঝা যায় ,এক অঞ্চল ও রাষ্ট্রের মানুষ অপর অঞ্চল ও রাষ্ট্রের মানুষের অবস্থা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে অবহিত ছিল। তাই নতুন উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও শিল্পের দ্রুত স্থানান্তরের বিষয়ে আশ্চর্যের কিছু ছিল না। পাশ্চাত্য বিশ্বদৃষ্টির শিক্ষার্থীদের জানতে হবে ইসলামী বিশ্বে বিশেষ এক পরিবেশ ক্রিয়াশীল ছিল যা যে কোন সৃজনশীল সৃষ্টিতে প্রভাবকের ভূমিকা পালন করত। 41

এই গবেষক যা বলেছেন তা শুধু ইরানেই নয় ;বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বে এরূপ ছিল এবং ইরান এর চেয়ে ব্যতিক্রম ছিল না। এই বিশেষজ্ঞের বক্তব্যের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়টি হলো তিনি বলেছেন ,মুসলমান জাতি-বর্ণের স্বাতন্ত্র্য সত্ত্বেও পরস্পর সম্পর্কিত ছিল। অর্থাৎ ইসলামই প্রথমবারের মত ধর্মীয় বিশ্বাস ও বিধি-বিধানের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক ঐক্য সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছিল। এ কারণেই এরূপ ব্যাপক ও আড়ম্বরপূর্ণ সভ্যতা সৃষ্টি করতে পেরেছিল। এরূপ ইতিবাচক মতসমূহ যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান রয়েছে।

এ ধরনের ইতিবাচক মতামতের বিপরীতে নেতিবাচক কিছু মতও বিদ্যমান রয়েছে যা পর্যালোচনার দাবি রাখে। এ ধরনের মতানুযায়ী আরবদের ইরান আক্রমণ ও বিজয় ইরানীদের জন্য বিপর্যয় ছিল। এ বিপর্যয় মোগল বা আলেকজান্ডারের আক্রমণের ন্যায় মারাত্মক ছিল। বিশেষত মোগলদের আক্রমণ যেমন করে এক প্রতিষ্ঠিত ও বিন্যাসিত সভ্যতাকে ধ্বংস করেছিল ,আরবদের আক্রমণও তেমনি প্রাচীন এক সভ্যতাকে চুরমার করে দিয়েছিল। ইসলামের আবির্ভাবের পর তৃতীয় ,চতুর্থ ,পঞ্চম ও ষষ্ঠ হিজরী শতাব্দীতে ইরানীরা জ্ঞান ও সংস্কৃতির সেবায় যে আত্মনিয়োগ করেন তা তাদের প্রাচীন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কারণেই ;এটি প্রকৃতপক্ষে তাদের ইসলাম-পূর্ব অবস্থায় ফিরে যাওয়ারই দৃষ্টান্ত। ইসলাম এ ক্ষেত্রে যা করেছে তা হলো দু শতাব্দী জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে রেখেছে। দু শতাব্দী পর যখন ইরান আরবদের প্রভাবমুক্ত হয়ে রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করে তখন তারা পূর্ব বৈশিষ্ট্য ফিরে পায় এবং ঐতিহ্যবাহী সে পথে নতুনভাবে যাত্রা শুরু করে। এভাবেই ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য অব্যাহত থাকে।

অবশ্য কোন ইরানী বা অ-ইরানী গবেষকদের এরূপ মন্তব্য করতে দেখা যায় না। শুধু যে সকল ব্যক্তির কথায় বিশেষ এক ধরনের প্রচারণার রং ও গন্ধ রয়েছে তাদেরই এরূপ বলতে শোনা যায়। সম্প্রতি এরূপ মন্তব্য উস্কানিমূলক সাহিত্যিক রং দিয়ে অধিক হারে প্রচার করা হচ্ছে।

ফারিদুন অদামিয়ত তাঁর আমির কবির ও ইরান শীর্ষক গ্রন্থে বলেছেন , ইসলাম ধর্মের উৎপত্তির কেন্দ্র হিসেবে আরব ভূখণ্ডের মত একটি প্রাথমিক সমাজ অপরিহার্য ছিল এবং এ কারণেই ইসলাম সেখানে আবির্ভূত হয়। এ ধর্ম আরব উপদ্বীপের পূর্ববর্তী ধর্ম ও বিধানের মিশ্রণ হিসেবে দ্বিমুখী ও স্থিতিস্থাপক শিক্ষা সম্বলিত ছিল। তাই যখন এ ধর্ম ইরানে প্রবেশ করে তখন এ দেশের সামাজিক গতিকে আকস্মিক বিচ্যুতির পথে পরিচালিত করে। এটি আরব ভূখণ্ডের মত প্রাথমিক সমাজে যতটা কল্যাণ বয়ে এনেছিল ইরানের জন্য ঠিক ততটা অকল্যাণ ও ধ্বংস ডেকে এনেছিল। ইরানীরা তাদের সুযোগের অপেক্ষায় বসেছিল । তাই তাদের আতঙ্ক ও বিস্ময়ের সময় দীর্ঘায়িত হয় নি। তারা সকল দিক হতে বিরোধিতার ঐকতান বাজাতে শুরু করল। সাধারণত কোরআনের নাসখ (রহিতকারী) ও মানসুখ (রহিত) আয়াতের সাহায্য নিয়ে তারা প্রমাণ উপস্থাপন করতে লাগল।

...একদিকে ইসলামের কিছু নেতিবাচক শিক্ষা ,যেমন দুনিয়াকে ধ্বংসশীল ,মৃত ও মুমিনদের জন্য বন্দীশালা হিসেবে দেখা ,অন্যদিকে হিন্দু দর্শনের স্রষ্টার মধ্যে বিলুপ্তির ধারণাসমূহ প্রচারের ফলে ইরানের মানুষ দুনিয়ার জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তারা এ হতে মুক্তির পথ খুঁজছিল। কিন্তু আমরা দেখতে পেলাম ইসলামের বিভিন্ন শিক্ষা ,যেমন সম্পদ পুঞ্জীভূত করা গুনাহ্ ,কারুকার্যময় শিল্পকে নিষিদ্ধ ,মানুষের রিযিক নির্ধারিত ,তার ভাগ্য অবধারিত ও নির্দিষ্ট ,তাকদীরে বিশ্বাস প্রভৃতি ধারণা এ সমাজে ধীরে ধীরে অনুপ্রবেশ করে। ইসলামের বিরোধীরা প্রথম দিকে নেতিবাচকভাবে ইশরাকী (দর্শনের একটি শাখা) ও তাসাউফের (সুফী) দর্শন দ্বারা একে মোকাবিলা করতে গিয়ে তার সঙ্গে মিশ্রিত হয়ে যায়। ভাগ্যে বিশ্বাস ইরানে ব্যাপক প্রচলন লাভ করার ফলশ্রুতিতে ইরানের বস্তুগত জীবন ধ্বংসের মুখোমুখি হলো। দুনিয়া বিমুখতা ,অলসতা ,ধ্বংসকামিতা ,ভিক্ষা প্রবণতা ,দরবেশী জীবন এ সবই ইরানীরা ইসলাম হতে লাভ করেছে। এ সব শিক্ষা ইরানে প্রসার লাভের মাধ্যমে সামাজিক পতনের সূচনা ও ভিত্তি রচিত হয়েছিল।

এ লেখক একদিকে বলেছেন ইসলামের আবির্ভাবের কেন্দ্র হিসেবে আরব ভূখণ্ডের মত প্রাথমিক একটি সমাজ অপরিহার্য ও উপযোগী ছিল। আবার অন্যদিকে বলছেন অলসতা ,ধ্বংসকামিতা ,ভিক্ষা প্রবৃত্তি ও দরবেশী জীবন ইসলামী শিক্ষার ফসল। তবে কিরূপে এ ধর্ম তার শিক্ষার মাধ্যমে আরব ভূখণ্ডের মত প্রাথমিক সমাজকে ক্ষমতা ,ঐক্য ও সভ্যতার কেন্দ্রে পরিণত করতে সক্ষম হলো ? দ্বিতীয়ত যদি এমনটিই হতো তাহলে ইসলামী জাতিসমূহ ইসলামের আগমণের শুরুতেই পতনের মুখোমুখি হতো। যেহেতু দুনিয়া মৃতদেহ তাই নিজেকে দায়িত্বহীন মনে করে তাকদীরের ওপর ভরসা করে হাত পা গুটিয়ে বসে থাকত ও নিজেকেও ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিত ,কিন্তু এর বিপরীতে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ইসলামের আবির্ভাবের ফলে উত্তর আফ্রিকা হতে পূর্ব এশিয়ার মানুষের মধ্যে ব্যাপক ও আড়ম্বরপূর্ণ গতিশীলতার সৃষ্টি হয়েছিল এবং এক নজীরবিহীন সভ্যতার জন্মদান করেছিল। এ অবস্থা ছয় শতাব্দী অব্যাহত থাকে এবং তার পরবর্তী সময়ে এতদঞ্চলের মানুষের মধ্যে স্থবিরতা ও পতনের মানসিকতার সৃষ্টি হয়। এই লেখক জ্ঞাত অথবা অজ্ঞাতসারে অর্থলিপ্সার বিরুদ্ধে ইসলামের নৈতিক যুদ্ধকে (যা জীবনের লক্ষ্য হিসেবে সম্পদ পুঞ্জীভূতকরণ ও আত্মীকরণকে অনাকাক্সিক্ষত বলে ঘোষণা করে) কর্মবিমুখতা ও উৎপাদনহীনতা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেছেন ,অথচ ইসলাম সেবা ও জীবনের উন্নয়নের লক্ষ্যে পণ্য উৎপাদন ,শিল্পকর্মে আত্মনিয়োগের ওপর গুরুত্ব আরোপ ও একে উৎসাহিত করেছে । তিনি বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টধর্মের তাকওয়া ও যুহদের ধারণা-যা ইবাদত ও কর্মকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখে-তার সঙ্গে ইসলামের তাকওয়া ও যুহদের পার্থক্য করেননি বা করতে চাননি ,অথচ ইসলামের যুহদ অর্থ দুনিয়া বিমুখতা নয় যেমনি এর তাকওয়ার অর্থও ভিন্ন-যা উন্নত চিন্তাশক্তি ও হৃদয়ের পবিত্রতায় বিশ্বাসী।

এ সবের চেয়েও আশ্চর্যজনক হলো ইউরোপীয়দের অনুকরণে তাকদীরের প্রতি বিশ্বাসকে মুসলমানদের পতনের কারণ হিসেবে দেখান। তার জন্য উত্তম ছিল এ বিষয়টি বিশেষজ্ঞদের হাতে অর্পণ করা। আমরা মানুষ ও তার গন্তব্য 42 (ফার্সী ভাষায় লিখিত) নামক গ্রন্থে ইসলামী পরিভাষায় ভাগ্যের (ক্বাযা ও ক্বাদর) অর্থ এবং মুসলমানদের পতনের পেছনে এর আদৌ কোন প্রভাব ছিল কিনা সে বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা করেছি।

স্কুল-কলেজের বইগুলোতেও এ চিন্তার প্রচার কম-বেশি লক্ষণীয়।43 পাঠ্যপুস্তকসমূহের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা এলেই এ চিন্তার প্রচারণা চালানো হয়েছে। আমরা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের একটি পুস্তক হতে এখানে কিছু উদ্ধৃত করছি। ইরানের মানবিক ভূগোল নামক পুস্তকে বলা হয়েছে :

সামানী আমলে খুজিস্তানের জানদীশাপুরে যে চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয় তা ইরানীদের জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহের প্রমাণ। অকাট্য সত্য ,তৎকালীন সময়ে ইরানীরা অনেক গ্রন্থ ও পুস্তিকা রচনা করেছিল। দুঃখজনকভাবে সেগুলো ভিনদেশী শত্রুদের আক্রমণে নিশ্চি হ্ন হয়েছে। এখন শুধু তৎকালীন গ্রন্থগুলোর কিছু নাম আমাদের নিকট অবশিষ্ট আছে। ইরানের ওপর আরবদের প্রভুত্ব আমাদের জ্ঞান ও সাহিত্যের ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। কারণ তারা জ্ঞান ,সাহিত্য ও শিল্পকর্মের বিরাট অংশ ধ্বংস করে এবং তাদের ভাষা ও লিখনরীতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়। ফলে ইবনে মুকাফ্ফা ,মুহাম্মদ যাকারিয়া রাযী ,আবু আলী সিনা ,আবু রাইহান বিরুনী ,আবু নাসর ফারাবীর মত বড় বড় ইরানী মনীষিগণ বাধ্য হয়ে আরবী ভাষায় গ্রন্থ রচনা করেন। তৃতীয় হিজরী শতাব্দীর পর ইরানীদের সাহসিকতাপূর্ণ সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে যখন ইরান স্বাধীনতা লাভ করল তখন আধুনিক ফার্সী ভাষা সর্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করল। ফলে লেখক ,বক্তা ,কবি ,সাহিত্যিকগণ ,যেমন রুদাকী ,ফেরদৌসী ,ওমর খাইয়াম ,মাসউদ সাদ সালমান ,মৌলাভী (জালাল উদ্দীন রুমী) ,সা দী ,হাফিযসহ এ দেশের শত শত প্রতিভা তাঁদের চমৎকার লেখনীর মাধ্যমে বিশ্ব-সাহিত্যে অবদান রেখেছেন।

এ গ্রন্থের বর্ণনানুসারে ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে ইরান জ্ঞান ,শিল্প ও সাহিত্যে চরম উৎকর্ষ লাভ করেছিল এবং আরব মুসলমানদের বিজয় ইরানীদের মানসিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল। আরবগণ তাদের ভাষা ও লিপি ইরানীদের ওপর এমনভাবে চাপিয়ে দেয় যে ,আরবদের আক্রমণের চারশ বছর পরের ইবনে সিনা ও গাজ্জালীরা আরবী ভাষায় গ্রন্থ রচনায় বাধ্য হয় অর্থাৎ ইরানীরা স্বাধীনতা লাভের দু বা তিনশ বছর পরও আরবদের ভয়ে আরবীতে গ্রন্থ রচনা করত। এ পুস্তকের বর্ণনানুসারে সাহিত্যিক ও কবিগণ তখনই সাহিত্য ও কবিতা রচনায় আত্মনিয়োগ করেছেন যখন আরবদের হতে মুক্তি লাভ করেছেন এবং তাঁদের এ ফার্সী-সাহিত্য চর্চা ইসলাম ও আরবদের আক্রমণের প্রতিক্রিয়া হিসেবে ঘটেছিল। আমরা পূর্বে ইরানীদের ওপর আরবী ভাষা চাপিয়ে দেয়ার কল্পকাহিনী এবং ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে ফার্সী ভাষার পুনরুজ্জীবনের মিথ্যা প্রচারণার জবাব দিয়েছি। আমরা পরবর্তীতে তাদের আরেকটি মিথ্যা দাবি-আরবদের হাতে ইরানের জ্ঞানকেন্দ্রগুলোর ধ্বংস সাধন বিশেষত জানদীশাপুর মহাবিদ্যালয়ের স্বরূপ ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করব।

কেউ কেউ এ থেকেও এক ধাপ এগিয়ে ইরানে ইসলামের আগমনকে দুর্ভাগ্য ও দুর্দশা হিসেবে দেখিয়েছেন। তাঁরা ইরানীদের সকল মন্দ চরিত্র আরবদের ইরান আক্রমণ ও ইসলামের অনুপ্রবেশের ফসল বলে মনে করেন। উদাহরণস্বরূপ ফার্সী 1345 সালের (খ্রিষ্ট 1967) 3 আবানে প্রকাশিত ফেরদৌসী প্রত্রিকার একটি প্রবন্ধ হতে উদ্ধৃতি দিচ্ছি। এ প্রবন্ধের লেখক তাঁর এ প্রবন্ধে জালাল আলে আহমাদের পাশ্চাত্য প্রবণতা গ্রন্থের উত্তর দিয়েছেন। আলে আহমাদ দাবি করেছেন ,বর্তমান প্রজন্মের অবক্ষয়ের মূল কারণ যান্ত্রিকতা ও পাশ্চাত্যপ্রবণতা। তিনি পাশ্চাত্যঘেষা র সংজ্ঞায় বলেন ,

পাশ্চাত্যঘেষা (পাশ্চাত্যসেবী) ব্যক্তি অধার্মিক। কোন কিছুতেই তার বিশ্বাস নেই। আবার কোন কিছুতে অবিশ্বাসীও নয়। সে এক পরিত্যক্ত মানুষ। সে স্রোতের অনুকূলে চলে। সব কিছুই তার নিকট সমান। সে তার ও তার গাধার চিন্তা করে। তার গাধা পুল পেরিয়ে গেলে পুলের আর কোন প্রয়োজন মনে করে না। তার না ঈমান আছে ,না নীতি। না আল্লাহ্য় বিশ্বাস করে ,না মানবতায়। না সে সামাজিক পরিবর্তনের নীতিতে বিশ্বাসী ,না ধর্মহীনদের দলে রয়েছে। কখনও কখনও সে মসজিদে যায় যেমনটি সিনেমায় বা কোন দলের সভায়ও তাকে দেখা যায়। কিন্তু সকল স্থানে সে শুধুই দর্শক ,ফুটবলের দর্শকের ন্যায়। সব সময় তাকে গর্তের কিনারায় দেখা যায় ,কোন সময়েই গর্তের মাঝে পাওয়া যায় না। কখনই সে পুঁজি বিনিয়োগ করে না ,হোক সে পুঁজি বন্ধুর মৃত্যুতে এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন বা যিয়ারতগাহের প্রতি দৃষ্টি দান বা কিছুক্ষণ একাকী চিন্তা করা। সে একাকিত্বকে ভয় পায়-এতে অভ্যস্ত নয় ,তাই এ থেকে দূরে থাকে। যদিও সে সকল স্থানে বর্তমান ,কিন্তু কখনই তাকে কোন বিষয়ে ফরিয়াদ জানাতে ও প্রতিবাদ করতে দেখা যায় না। তাকে কোন বিষয়ের কারণ জানার জন্য প্রশ্ন উত্থাপন করতেও দেখা যায় না। পাশ্চাত্যঘেষা ব্যক্তি স্বার্থপর ও সুযোগসন্ধানী। তাই প্রতিটি শ্বাসকে সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে নেয় (অবশ্য দার্শনিক অর্থে নয়)। পাশ্চাত্যসেবী দের কোন ব্যক্তিত্ব নেই ,এরা মূলহীন...।

ফেরদৌসী পত্রিকা আলে আহমাদকে উত্তর দিয়েছেন এভাবে :

তুমি যেরূপ ব্যক্তির বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছ তা কি শুধুই বিগত দু বছরে এসেছে ?... না ;বরং তোমার বর্ণিত এরূপ অধার্মিক ,চাটুকার ,মিথ্যাবাদী ,ভূমিহীন ,নিঃস্ব ও চিন্তা-বিশ্বাসহীন গত তেরশ বছর হলো ইরানে সৃষ্টি হয়েছে। ঐ অলুক্ষণে ও কালো দিবস যে দিন মাদায়েনের প্রাসাদের প্রহরীরা আরবদের স্বাগত জানিয়ে প্রাসাদের দ্বারে দাঁড়িয়ে মহাসম্মানিত বিচারক এসেছেন বলে চিৎকার করেছিল সে দিন এ অবৈধ সন্তানের বীজ রোপিত হয়। যে দিন নাহাভান্দের যুদ্ধে দুর্ভাগা ইরানী সেনাপতি ফিরুযন কাপুরুষ আরবদের দ্বারা প্রতারিত হয়ে পরাজিত হয় সে দিন এই অশুভ সত্তার জন্ম হয়। এখন তেরশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও এরূপ ব্যক্তিদের দেখি যারা তাকিয়া (সত্যকে প্রকাশ হতে বিরত) করে ,অন্যদের ওপর বিশ্বাস করে না ,যেহেতু সন্দেহ প্রবণ ও মন্দ ধারণা পোষণকারী সেহেতু মন খুলে কথা বলে না ,তাদের কোন প্রতিবাদ ,যাচাই-বাছাই ও যুক্তির ময়দানে দেখা যায় না।

একই পত্রিকার পরবর্তী সংখ্যায় লেখা হয়েছে :

এক হাজার বছরের কিছু অধিক সময় পর আরবদের ইরান আক্রমণের ফল এ জাতির মধ্যে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ভূখণ্ডের নৈতিক ,আত্মিক ও জাতিগত সকল মানদণ্ড পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আমাদের যুদ্ধংদেহী ,আক্রমণাত্মক ও প্রতিদ্বন্দ্বী অনুসন্ধানের দৃঢ় মানসিকতা ভীরুতা ,কাপুরুষতা ও সিদ্ধান্তহীনতায় পরিণত হয়েছে। কত জীবাণু আমাদের প্রাণের ওপর এখন হামলা চালাচ্ছে!

ঐ পত্রিকারই 1347 ফার্সী সালের (1369 খ্রিষ্টাব্দ) উরদিবেহেশতে প্রকাশিত 23 নং সংখ্যায় কবিতায় রূপকের ব্যবহার শীর্ষক আলোচনায় বলা হয়েছে , আমরা জানি ইরানে আরবদের হামলায় আমাদের মাতৃভূমির অধিবাসীদের চরম খেসারত দিতে হয়েছিল। আরব ও পারস্য সভ্যতার দ্বন্দ্বে ইরানীদের রাজনৈতিক পরাজয় পারস্য সভ্যতার নৈতিক পরাজয়ে পর্যবসিত হয়। আরবগণ ইরানী সভ্যতাকে তিরস্কার করত ও ইরানীদের মাওয়ালী অর্থাৎ দাস বলে সম্বোধন করত... ইরানীদের আনন্দ উৎসবসমূহ বন্ধ হয়ে গেল। ইরানীরা মধ্যাহ্ন ও নৈশ ভোজের পর যে মদ পান করত তা শয়তানের কাজ বলে নিষিদ্ধ করা হলো। আমাদের অগ্নিমন্দিরসমূহের সকল অগ্নি নিভিয়ে ফেলা হলো। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের জনগণ তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তুলল। ইরান জাতি ছাইভস্মের মধ্য হতে অগ্নিপক্ষির ন্যায় জেগে উঠল এবং অগ্নিশিখার ন্যায় উজ্জ্বল ইরানী প্রতিভাগণ ,যেমন আবু রাইহান বিরুনী ,ফেরদৌসী ,খাইয়াম ,আবদুল্লাহ্ ইবনে মুকাফ্ফা ,রুদাকী ,দাকীকী ,যাকারিয়া রাযী ,বাইহাকীরা জাগ্রত হলেন ও দুঃস্বপ্নের অবসান ঘটালেন।

ইংরেজ স্যার জন ম্যালকম তাঁর তারিখে ইরান (ইরানের ইতিহাস) গ্রন্থে বলেছেন , রাজ্য ও ধর্ম রক্ষার জন্য ইরানীদের অবিচলতা ও একগুঁয়েমী তৎপরতায় আরবীয় নবীর অনুসারিগণ এতটা ক্ষিপ্ত হলো যে ,ইরানী জাতীয়তাবাদকে শক্তিশালী করে এমন সকল চিহ্ন তারা ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিল। শহরগুলোকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হলো ,অগ্নিমন্দিরগুলো ভস্মীভূত করা হলো ,উপাসনালয়সমূহের রক্ষণাবেক্ষণকারী ও সেবকদের হত্যা করা হলো ,জ্ঞান ,বিজ্ঞান ,ইতিহাস ,ধর্ম সম্পর্কিত সকল গ্রন্থ ধ্বংস করা হল। তৎকালীন গোঁড়া আরবগণ কোরআন ভিন্ন অন্য কোন গ্রন্থ সম্পর্কে জানত না এবং জানার চেষ্টাও করত না। পুরোহিতদের মাজুস (অগ্নি উপাসক) ও জাদুকর এবং তাঁদের পবিত্র গ্রন্থকে জাদুর গ্রন্থ নামকরণ করা হলো । গ্রীস ও রোম সভ্যতার উদাহরণ হতে বোঝা যায় সে পারস্যের ন্যায় সভ্যতার কি পরিমাণ গ্রন্থ ছিল যা এ আক্রমণে ধ্বংস হয়েছে।

এ সকল তথাকথিত ঐতিহাসিকের কথায় নতুনত্বের গন্ধ পাওয়া যায় যা কোন ঐতিহাসিক দলিল ও পাণ্ডুলিপিতে খুঁজে পাওয়া যায় না। সুতরাং আমাদের ধরে নিতে হবে এ সব ইতিহাস বৈধভাবে জন্ম লাভকারী মনুষ্যরূপ কোন প্রাণীর চোখে পড়ে নি ও তাদের হাতে পৌঁছে নি। তাই তার গ্রন্থসূত্রের নামও প্রকাশিত হয় নি। বাধ্য হয়ে এমন ভাবাই স্বাভাবিক। কারণ তা না ভাবলে এই মহান লেখকদের চরম ও পরম সত্যবাদিতার পেছনে সৎ মনোভাব ছিল মনে হতে পারে এবং তাঁরা ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে এরূপ গ্রন্থ রচনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন নি বলে সন্দেহে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এ সকল লেখকের বর্ণনা ইংল্যান্ডের পররাষ্ট্র দপ্তরের দলিলপত্রের মধ্যে ছাড়া অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না। কারণ প্রথমত সকল ঐতিহাসিকের সাক্ষ্যের বিপরীতে এই ব্যক্তিবর্গের মতে ইরানীরা তাদের সাম্রাজ্য ও ধর্ম রক্ষার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছে। অর্থাৎ আনুমানিক চৌদ্দ কোটি ইরানীর তৎকালীন সমাজ চার লক্ষ সৈনিক বিপুল সামরিক সাজ-সরঞ্জাম ও সর্বোন্নত যুদ্ধ কৌশল নিয়ে মরণপণ সংগ্রাম করেও পঁয়তাল্লিশ হাজার নাঙ্গা পায়ের আরব মুসলমানের হাতে পরাস্ত হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে নবীন ধর্ম ইসলামের আদর্শের আকর্ষণ এবং অন্যদিকে প্রাচীন ধর্ম ,পুরোহিতগণ ও শাসন কর্তৃপক্ষের প্রতি ইরানীদের অসন্তোষের কারণে এ পরাজয় ঘটে নি ;বরং এ ব্যক্তিদের মতে যেহেতু ইরানীরা অক্ষম এক জাতি সেহেতু মরণপণ সংগ্রামের পরও তারা ক্ষুদ্র এক দলের নিকট পরাস্ত হয়েছিল।

দ্বিতীয়ত এদের মতে ইরানের শহরগুলো আরবদের আক্রমণে ধূলিসাৎ হয়েছিল। প্রশ্ন হলো শহরগুলো কোথায় অবস্থিত ছিল ? সেগুলোর নাম কি ? ইতিহাসে আদৌ ধ্বংসপ্রাপ্ত এরূপ কোন শহরের নাম উল্লিখিত হয়েছে কি ? হয়ে থাকলে কেন তিনি সেই ইতিহাস গ্রন্থসমূহের নাম উল্লেখ করেন নি ? সার্জন ম্যালকমের নিকট এটিই প্রশ্ন।

তৃতীয়ত এই ব্রিটিশ লেখকের মতে উপাসনালয়সমূহের পুরোহিত ও রক্ষণাবেক্ষণকারীদের হত্যা করা হয় এবং অগ্নিমন্দিরসমূহ ভস্মীভূত করা হয়। তাহলে মাসউদী ,মুকাদ্দাসীসহ অন্যান্য ঐতিহাসিকরা চতুর্থ হিজরী শতাব্দীতেও ইরানে অগ্নিমন্দিরসমূহ ছিল বলে যে উল্লেখ করেছেন ও পুরোহিতদের নিকট প্রাচীন গ্রন্থ দেখেছেন বলে জানিয়েছেন সে সম্পর্কে তিনি কেন আলোচনা করেন নি ? আরব শাসকরা আহলে কিতাব হিসেবে মাজুসদের উপাসনালয় সংরক্ষণের জন্য ইসলামী বিধান মতে চুক্তিবদ্ধ হতেন ও তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতেন বলে যে ঐতিহাসিকরা উল্লেখ করেছেন কেন তিনি তা উপেক্ষা করেছেন ?

চতুর্থত ইরানীদের নিকট বর্তমান ধর্ম ,বিজ্ঞান ও ইতিহাস গ্রন্থসমূহ ধ্বংস করা হয় বলে তিনি যে উল্লেখ করেছেন তা আমরা গ্রন্থ ভস্মীভূতকরণ শিরোনামে পরে আলোচনা করব।

পঞ্চমত আরবগণ পুরোহিতদের জাদুকর ও তাদের পবিত্র গ্রন্থকে যাদুর গ্রন্থ বলে অভিহিত করত বলে যে এই লেখক উল্লেখ করেছেন তা প্রথমবারের মত এমন ব্যক্তিদের নিকট হতেই শোনা যায় যাদের এরূপ কথার পেছনে কোন উদ্দেশ্য রয়েছে।

এখানে ইসলাম ও ইরান সম্পর্কে উত্থাপিত বিপরীতমুখী দু টি দৃষ্টিভঙ্গিই আমরা উল্লেখ করেছি। এখন আমরা কোন্ মতটিকে গ্রহণ করব ? আমরা কি এ মতকে গ্রহণ করব ,যে দাবি করেছে ইসলামের আবির্ভাবের যুগে ইরানসহ অন্যান্য অঞ্চল অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল ,মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস অবক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল ,শাসকবর্গ দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল ,সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও অনাচার বেড়ে গিয়েছিল ,সাধারণ মানুষ অসন্তুষ্ট ও অতিষ্ঠ হয়ে গিয়েছিল এবং বিশ্ব এক পরিবর্তন ও বিনির্মাণের প্রয়োজন অনুভব করছিল। এমন মুহূর্তেই ইসলামের আগমন ঘটে এবং এই মহান কর্ম সম্পাদন করে। ইসলাম পুরাতন জরাজীর্ণ মানদণ্ডকে পরিবর্তন করে ও সকল শৃঙ্খলকে ছিন্ন করে সকলকে নিদ্রা হতে জাগ্রত করে অর্ধমৃত জাতিসমূহের দেহে নতুন প্রাণের সঞ্চার করে। ইরানী জাতিও তাদেরই অন্যতম যারা নতুন জীবনপ্রাপ্ত হয়েছিল।

নাকি আমরা এর বিপরীত অবস্থান নিয়ে বলব যে ,আমাদের সব কিছু ছিল ,ইসলাম এসে আমাদের নিঃস্ব করে ফেলে। পূর্বেও আমরা বলেছি সৌভাগ্যবশত ইসলামের আবির্ভাবের সমকালের ইরানের ইতিহাস স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে। তাই এ বিষয়ে মোটামুটি অধ্যয়নেই তা আমাদের নিকট পরিষ্কার হবে। ইসলামপূর্ব ইরানের চিন্তা ও বিশ্বাসগত অবস্থা ,সমাজে ঐ সকল বিশ্বাসের প্রভাব ,তৎকালীন ইরানের সামাজিক ,ধর্মীয় ,পারিবারিক ,রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থার প্রতি দৃষ্টি দান করাই এখানে আমাদের জন্য যথেষ্ট হবে। অতঃপর ইতিহাস হতে ইসলামের চিন্তা-বিশ্বাস ,সামাজিক ,রাজনৈতিক ,পারিবারিক ও নৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে এর তুলনা করে আমরা সিদ্ধান্ত নেব। প্রথমে তৎকালীন ইরানী সমাজের চিন্তা ও বিশ্বাসগত অবস্থার আলোচনা করব।

চিন্তা ও বিশ্বাসগত অবস্থা

এ পর্যায়ে আমদের আলোচনার বিষয়বস্তু ইসলামের আবির্ভাবের সমসাময়িক ইরানের সাধারণ মানুষের ধর্মীয় চিন্তা ও বিশ্বাস। আমরা আপাতত তৎকালীন সময়ের দার্শনিক

চিন্তা-বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করছি না। তাই সামানী আমলে ধর্মীয় চিন্তা ও বিশ্বাসের বাইরে স্বতন্ত্র কোন দার্শনিক চিন্তা-বিশ্বাসের অস্তিত্ব ছিল কি না ,থাকলে কিরূপ মতের তা আমাদের আলোচনা বহির্ভূত বিষয়। কারণ যদি তেমন কোন মতবাদ থেকেও থাকে সেরূপ দার্শনিক মত বাস্তবে সাধারণ মানুষের মানসিকতায় কোন প্রভাব রাখত না। যেহেতু আমরা সাধারণ মানুষের চিন্তা-বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করব সেহেতু অবশ্যই তৎকালীন প্রচলিত ধর্ম নিয়ে আমাদের আলোচনা করতে হবে।

নিঃসন্দেহে ইসলাম ইরানকে এক নতুন ধর্মীয় চিন্তা ও বিশ্বাস দান করেছিল। আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি ইরানের মানুষ নজীরবিহীনভাবে ইসলামের চিন্তা ও বিশ্বাসকে গ্রহণ করেছিল এবং তাদের পূর্ব পুরুষের চিন্তা-বিশ্বাসকে দূরে নিক্ষেপ করেছিল। তবে এ গ্রহণ আকস্মিক বা তাৎক্ষণিক ছিল না ;বরং মন্থর গতিতে পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন হয়েছিল এবং বিশেষত ইরানীদের স্বাধীন ক্ষমতা লাভের পরবর্তী সময়ে এটি ঘটেছিল।

এ আলোচনাটি এ দৃষ্টিতে আকর্ষণীয় যে ,ইসলাম বিশেষ এক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। আর তা হলো ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্মই বিজিত জাতির আত্মাকে জয় করে তাদের আত্মিক জীবনকে প্রভাবিত করতে সক্ষম হয়নি।

গুসতাভ লুবুন তাঁর ইসলাম ও আরব সভ্যতার ইতিহাস গ্রন্থে বলেছেন , যে সকল জাতি ইসলামী শরীয়ত ও এর বিধানকে গ্রহণ করেছিল ,এ শরীয়ত তাদের জীবনে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। পৃথিবীতে খুব কম ধর্মই পাওয়া যায় যা তার অনুসারীদের হৃদয়ে ইসলামের ন্যায় গভীরভাবে প্রবেশের ক্ষমতা ও প্রভাব রাখতে পেরেছে ;বরং হয়তো ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন ধর্ম পাওয়া যাবে না যা এতটা প্রভাবশীল হতে পেরেছিল। অর্থাৎ যেমনভাবে কোরআন মূলকেন্দ্র হিসেবে সার্বিক ও নির্দিষ্ট (সাধারণ ও বিশেষ) সকল বিধানসহ মুসলমানদের সকল কর্মকাণ্ড ও আচরণে প্রকাশিত হয়েছে ,অন্য কোন ধর্মগ্রন্থ তা পারেনি। 44

অপর যে দিক হতে এ আলোচনাটি আকর্ষণীয় তা হলো ইসলাম গ্রহণকারী জাতিসমূহের মধ্যে ইরানীরা বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। সেটি হলো ইরানীদের ন্যায় অন্য কোন জাতি এত সহজে তার পূর্ববর্তী ধর্ম ত্যাগ করে নি এবং তাদের ন্যায় এত আন্তরিকভাবে ,ভালবেসে ও একাগ্রতার সাথে নতুন ধর্মের চিন্তা ও বিশ্বাসকে গ্রহণ করে নি। প্রসিদ্ধ প্রাচ্যবিদ দুজী বলেছেন , সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জাতিটি ধর্ম পরিবর্তন করে সেটি হলো ইরানী জাতি। কারণ আরবরা নয় ,ইরানীরাই ইসলাম ধর্মকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর স্থাপন করে। 45

তাই বাধ্য হয়ে তৎকালীন ইরানী সমাজে প্রতিষ্ঠিত চিন্তাধারার একটি পর্যালোচনা আমরা করব এবং ইসলামী বিশ্বাস ও চিন্তাধারার সঙ্গে তার একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানার চেষ্টা করব ইসলাম চিন্তাগতভাবে ইরানকে কি দিয়েছে এবং ইরান হতে ইসলাম কি চিন্তাসমূহ গ্রহণ করেছে। তৎকালীন ইরানের বিশ্বাস ও চিন্তাধারা সম্পর্কে জানার জন্য প্রথমেই দেখব সে সময় ইরানে কি কি ধর্ম বিশ্বাস প্রচলিত ছিল।

ধর্ম ও সম্প্রদায়

সামানী শাসনামলে বাহ্যিকভাবে একমাত্র যারথুষ্ট্র ধর্মের শাসন ছিল বলে মনে হলেও এমনটি নয়। যদিও যারথুষ্ট্র ধর্ম এ দেশের রাষ্ট্রীয় ধর্ম ছিল কিন্তু অন্যান্য ধর্মসমূহেরও সংখ্যালঘু হিসেবে পর্যাপ্ত অনুসারী ছিল। এদের কেউ কেউ যারথুষ্ট্রকে নবী জানা সত্ত্বেও ভিন্ন ধর্মাবলম্বী বলে পরিচিত ছিল ,আবার অনেকের যারথুষ্ট্রদের সঙ্গে কোন সম্পর্কই ছিল না এবং যারথুষ্ট্রকে নবী হিসেবেও মানত না।

সাঈদ নাফিসী তাঁর তারিখে এজতেমায়ীয়ে ইরান (ইরানের সামাজিক ইতিহাস) গ্রন্থের 2য় খণ্ডে সামানী শাসনামলের সামাজিক বিশৃঙ্খলার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে ধর্মীয় বিভেদকে দেখিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন ,যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণের জোর-জবরদস্তি ও অনাচারের কারণেই বিভিন্ন দল ও মতের সৃষ্টি হয়েছিল এবং সামাজিক অসন্তোষ বেড়ে গিয়েছিল । তিনি বলেন , তৎকালীন সময়ের সামাজিক বিন্যাসের ভিত্তিতে যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণ সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। বিশেষত ধর্মযাজক ও পুরোহিতদের মধ্যে যাঁরা সামানী রাজ দরবারে উচ্চপদ দখল করেছিলেন তাঁরা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন আইন ,যেমন সম্পদের মালিকানা ,উত্তরাধিকার ,বিবাহ ইত্যাদির পরিবর্তন ,পরিবর্ধন ,রহিতকরণ ,নতুন আইন প্রবর্তন ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ দানের পূর্ণ অধিকার রাখতেন। সামানী সভ্যতার প্রভাব বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে তাঁদের ক্ষমতা ও ইখতিয়ারও বেড়ে গিয়েছিল। ইরানের সাধারণ মানুষেরাও তাদের অত্যাচার ও সীমা লঙ্ঘনে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল। তারা এ অশান্ত অবস্থা হতে বের হওয়ার চেষ্টায় রত ছিল। এ লক্ষ্যে তারা মাযদিস্তী যারথুষ্ট ধর্ম যা রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসেবে স্বীকৃত ছিল ও বেছদীন নামে পরিচিত ছিল তা হতে মুখ ফিরিয়ে যারথুষ্ট্র ধর্মের নতুন দুই শাখার সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল। তাদের একটি হলো যারওয়ানীয়ান যাদের বিশ্বাস ছিল আহুরামাযদা (সত্যের খোদা) ও আহ্রিমান (মন্দের খোদা) এ দু জনই এদের হতে উন্নত ও প্রাচীন এক খোদা যার নাম যারওয়ান আকারনু অর্থাৎ সীমাহীন সময় হতে জন্ম লাভ করেছে। অপরটি হলো কিউমারসিয়ান যাদের বিশ্বাস ছিল আহ্রিমান স্বতন্ত্র কোন সত্তা ছিল না এবং যখন আহুরমাযদা তাঁর কর্মে সন্দেহ পোষণ করেন তখন তাঁর সন্দেহ হতে আহ্রিমানের জন্ম হয়। যারওয়ানিয়ান কিউমারসিয়ান এ উভয় দলেরই মাযদাইসনা যারথুষ্ট্র ধর্মের সঙ্গে প্রচণ্ড বিরোধ ছিল এবং এ বিরোধ হতে প্রচণ্ড শত্রুতার সৃষ্টি হয়েছিল। কখনও কখনও অ-পারসিকরা এ শত্রুতাকে ব্যবহার করে লাভবান হতো। এ ছাড়াও অন্য পাঁচটি ধর্ম ইরানে প্রচলিত ছিল যাদের যারথুষ্ট্র ,কিউমারসিয়ান ও যারওয়ানীয়ানদের সঙ্গে যেমন বিরোধ ছিল তেমনি তাদের নিজেদের মধ্যে তীব্র বিরোধ পরিদৃষ্ট হতো।

এদের মধ্যে প্রধান হলো ইহুদীরা যারা হাখামানেশী আমলে কুরেশের বাবেল অভিযানের সময় মুক্তি লাভ করে। তাদের একটি অংশ ইরানে আগমন করে। তাদের অধিকাংশই ইরানের পশ্চিমাংশের খুজিস্তান ও একবাতানে বসতি স্থাপন করে। সাসানী শাসনামলে এদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় এবং তারা ইরানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ,এমনকি ইসফাহানেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ইহুদী সমবেত হয়েছিল। দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি খ্রিষ্টানদের যারা আশকান শাসনামলে খ্রিষ্টান ধর্মের আবির্ভাবের প্রাথমিক পর্যায়েই এ ধর্ম গ্রহণ করে। ইরানের পশ্চিমাঞ্চলের অধিবাসীদের একাংশ যারা ফোরাতের পূর্ব ও পশ্চিমে বাস করত তারা নাস্তুরী খ্রিষ্টবাদকে গ্রহণ করেছিল। তারা সেখানে বিশেষ গীর্জাসমূহও তৈরি করেছিল। পরবর্তীতে তারা ইরানের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে ও উত্তর পূর্ব ইরানের উজবেকিস্তান পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তাদের কেউ কেউ খ্রিষ্টবাদের এ ধারাকে চীন পর্যন্ত নিয়ে যায়।

তৃতীয় ধর্মীয় দলটি হলো মনী (মনাভী)। 228 খ্রিষ্টাব্দে এ ধর্মের উৎপত্তি ঘটে ও দ্রুত ইরানে বিস্তৃতি লাভ করে। এ ধর্ম সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর একটি ধর্ম। মনুগণ চারিত্রিক পরিশুদ্ধি ,আত্মসংশোধন ,বাহ্যিক ও আত্মিক পবিত্রতা অর্জনের চেষ্টা করতেন এবং আধ্যাত্মিকতা ও একান্তভাবে স্রষ্টার হয়ে যাওয়ার শিক্ষা দিতেন। ইরানের প্রাচীন ধর্মগুলোর মধ্যে এ ধর্মে সৌন্দর্যের আরাধনা (উপাসনা) ,বস্তুগত ও আত্মিক সুখের সন্ধান অধিকতর লক্ষণীয়। ইরানীরা দ্রুততার সাথে এ ধর্মের দিকে ঝুঁকে পড়ছিল এবং যারা এ ধর্ম গ্রহণ করত তারা গভীরভাবে একে বিশ্বাস করত। সাসানী শাসকগণ তাদের ওপর কঠোরতা আরোপ করেও এ ধর্ম হতে বিরত রাখতে পারেনি।

চতুর্থ ধর্মীয় দল হলো মাযদাকী। এ ধর্ম 497 খ্রিষ্টাব্দে ইরানে উৎপত্তি লাভ করে। তবে তাদের সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। কারণ খসরু নুশিন রাওয়ান তাদের সঙ্গে অত্যন্ত কঠোর আচরণ করেছিল। তাদের এক স্থানে বন্দী করে সকলকে হত্যা করে। তদুপরি এ ধর্ম ইরান হতে বিলুপ্ত হয় নি ও অনেকে গোপনে এ ধর্ম পালন করত... এ ধর্ম সম্পর্কে বিরোধীদের মুখ হতে যা জানা যায় তার ওপর নির্ভর করা যায় না। তাদের বর্ণনা মতে মাযদাকীরা সম্পদ ও নারীর সামষ্টিক মালিকানায় বিশ্বাস করত ,এমনকি সম্পত্তি বন্টনে সর্ব অধিকার স্বীকৃত ছিল।

পঞ্চম ধর্মটি হলো বৌদ্ধ ধর্ম। এর অনুসারীরা উত্তর-পূর্ব ইরানের জেলাগুলোতে বাস করত। একদিকে ভারতবর্ষ ও অন্যদিকে চীন ছিল তাদের প্রতিবেশী। তাদের কয়েকটি প্রধান কেন্দ্র ছিল। বিশেষত বালখ বামিয়ানে তাদের জাঁকজমকপূর্ণ মূর্তিমন্দির ছিল। বালখের নওবাহার অবস্থিত উপাসনালয়টি যাকে ইসলামী যুগে যারথুষ্ট্রদের কেন্দ্র ও অগ্নিমন্দির মনে করা হতো মূলত সেটি ঐ অঞ্চলের বৌদ্ধদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মন্দির ছিল। খলীফা হারুনুর রশীদের শাসনামলে যে বার্মাকী বংশ ইরানে উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত হয়েছিল তারা নওবাহারের মূর্তিমন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক গোষ্ঠী বার্মাক -এর পরবর্তী বংশধর ছিল...।

মনী ও বৌদ্ধরা শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। যারথুষ্ট্র ,ইহুদী ও খ্রিষ্টানদের ভূমিকার (তারা এরূপ কোন প্রচেষ্টা চালায় নি) বিপরীতে তারা বিশ বছরের অধিক সময় স্বভূমি রক্ষার নিমিত্তে আরবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল।

অতঃপর তিনি (সাইদ নাফিসী) উল্লেখ করেছেন ,

সাসানী আমলে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল ইরাক ও টাইগ্রীস - ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী জেলাসমূহ। এ অঞ্চল নিয়ে সব সময় সাসানী ও রোম স াম্রাজ্যের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হতো। এতদঞ্চলের অধিকাংশ মানুষ সামী (semitic)বংশোদ্ভূত ছিল। ইরানের প্রতি তারা সর্ববৃহৎ যে খেদমতটি করে তা হলো গ্রীক সভ্যতার জ্ঞানসমূহকে গ্রীক ভাষা হতে তাদের সুরিয়ানী ভাষায় অনুবাদ করার মাধ্যমে গ্রীক ভাষার চিকিৎসা বিজ্ঞান , অংকশাস্ত্র , জ্যোতির্বিদ্যা ও দর্শন সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহ সারা ইরানে ছড়িয়ে দেয়। তাদের মধ্যে অনেক বড় বড় মনীষীরও আবির্ভাব ঘটেছিল। তাদের ভাষা সাসানী রাজ দরবারেও প্রচলন লাভ করেছিল। ইতোপূর্বে হাখামানেশীদের যুগেও তাদের ভাষা ইরানের অফিস আদালতের ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে স্বতন্ত্র বিশ্বাসের কয়েকটি ধর্ম ছিল এবং অনুসারীদের স্বতন্ত্র আচার - নীতি ছিল। তন্মধ্যে ইবনে দাইসান - এর অনুসারীরা ও মারকিউন - এর অনুসারীরা প্রসিদ্ধ ছিল। ইউরোপীয়গণ এদের যথাক্রমে বরদেসান মারকিউন বলে থাকে। অন্য যে ধর্মটি তখন প্রচলিত ছিল তা হলো সাবেয়ী কোরআনে কোথাও কোথাও ইহুদী ও নাসারাদের নামের পাশে তাদের সাবেয়ীন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। 46

সাসানী শাসনামলে ইরানে প্রচলিত ধর্মসমূহ নিয়ে যাঁরাই আলোচনা করেছেন তাঁরাই উপরোক্ত ধর্মসমূহের উল্লেখ করেছেন। ডেনমার্কের প্রসিদ্ধ গবেষক ক্রিস্টেন সেন তাঁর গবেষণানির্ভর গ্রন্থ ইরান দার যামানে সাসানীয়ান -এ উল্লিখিত ধর্মসমূহের পুনঃপুন উল্লেখ করেছেন। তিনি এ গ্রন্থের ভূমিকায় ইরানের প্রচলিত ধর্মসমূহের প্রতি ইশারা করেছেন এবং এ গ্রন্থকে বিভিন্ন শিরোনামে বিন্যাস করেছেন ,যেমন যারথুষ্ট্র ধর্ম-রাষ্ট্রীয় ধর্ম , মনী ও তাঁর ধর্ম , ইরানের ঈসায়িগণ , মাযদাকী আন্দোলন প্রভৃতি এবং এ বিষয়গুলো বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। কয়েকজন মধ্যপ্রাচ্যবিদ রচিত ইরানী সভ্যতা যা ডক্টর ঈসা বাহনাম অনুবাদ করেছেন সেখানেও এ বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা রয়েছে। আগ্রহীরা এ গ্রন্থগুলো অধ্যয়ন করতে পারেন।

লক্ষণীয় বিষয় হলো সাসানী আমলে যারথুষ্ট্র ধর্ম রাষ্ট্রীয় ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও (একদিকে শাসকবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা ,অন্যদিকে যারথুষ্ট্র ধর্মীয় পুরোহিতদের শক্তিশালী ও প্রভাবশালী সংগঠনের উপস্থিতি সত্ত্বেও) তারা ইরানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে সক্ষম হয়নি।

তাই শুধু খ্রিষ্টানগণ নয় ,এমনকি ইহুদী ও বৌদ্ধগণ তাদের শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী বলে পরিগণিত হতো। বিশেষত খ্রিষ্টান ধর্ম সে সময় দ্রুত অগ্রসরমান ছিল। আর্যদের মধ্যেও ইরানের অভ্যন্তরে মনী ,মাযদাকী ও অন্যান্য ধর্ম উৎপত্তি লাভ করে এগিয়ে যাচ্ছিল। এর বিপরীতে যারথুষ্ট্রদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছিল।

ইরানের সর্বকালীন ইতিহাসে ইসলাম একমাত্র ধর্ম যা পর্যায়ক্রমে ইরানে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে এবং দু তিন শতকের মধ্যে মনী ,মাযদাকী ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করতে সক্ষম হয় ,ইরানের পূর্বাঞ্চল ও আফগানিস্তান হতে বৌদ্ধধর্মের মূলোৎপাটন করে ও যারথুষ্ট্র ,খ্রিষ্ট ও ইহুদী ধর্মকে সংখ্যালঘুর ধর্মে পরিণত করে।

সাসানী শাসকগণ ধর্মের ওপর ভিত্তি করে তাদের রাষ্ট্র পরিচালনার নীতি গ্রহণ করে। সাসানী ধারার অন্যতম শাসক আরদ্শির বাবেকান ধর্মযাজক শ্রেণী হতে ক্ষমতা লাভ করেছিলেন। একদিকে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ ও অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার বিশ্বাসগত ভিত্তি স্থাপনের প্রয়োজনে আরদ্শির যারথুষ্ট্র ধর্মের প্রচার ,পুনরুজ্জীবন ও দৃঢ়করণে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি যারথুষ্ট্র ধর্মের পবিত্র গ্রন্থ আভেস্তা র পুনর্বিন্যাস ও লিখন এবং যারথুষ্ট্র পুরোহিতদের সুসংগঠিত প্রতিষ্ঠান তৈরি করেন। ফলে যারথুষ্ট্র ধর্মযাজকগণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে ওঠেন।

ড. মুহাম্মদ মুঈন মাযদা ইয়াসনা ও আদাবে পার্সী গ্রন্থে বলেছেন ,

আশকানীদের পতনের পর আরদ্শির ববেকান (226-241 খ্রি.) সাসানী সাম্রাজ্যের অধিপতি হন। তাঁর আবির্ভাব ইরানের সাফল্য গ্রন্থের ভূমিকা রচনা করেছিল। তাঁর প্রচেষ্টায় ইরান জাতি বিশেষ দীপ্তি লাভ করে। এই সম্রাট মাযদা ইয়াসনা (যারথুষ্ট্র ধর্মের বিশেষ ফির্কা) ধর্মরীতির ওপর তাঁর সাম্রাজ্য ও তাঁর স্থলাভিষিক্তের ভিত রচনা করেন। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে ধর্মের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর পিতামহ সাসান ইসতাখারের নাহিদ (শুকতারা) মন্দিরের তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন। এ কারণেই আরদ্শির প্রাচীন ধর্মের পুনরুজ্জীবনে বিশেষ প্রচেষ্টা চালান। মুদ্রার ওপর অগ্নিমন্দিরের ছাপ জাতীয় প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হতো। তিনি শিলালিপিতে নিজেকে সেতাইয়ান্দে মাযদা ইয়াসনা অর্থাৎ মাযদার প্রশংসাকারী বলে উল্লেখ করেছেন। ঐতিহাসিকগণ সম্রাটের সঙ্গে ধর্মজাযকদের সম্পর্ক ও ধর্মপরায়ণতার বিষয়ে তাঁর বিভিন্ন বাণীর উল্লেখ করেছেন। কবি ফেরদৌসী তাঁর শাহনামা কাব্যগ্রন্থে তার পুত্র শাপুর-এর প্রতি সম্রাটের উপদেশ বাণী কবিতার আকারে এনেছেন ,

দীন ও দৌলত পরস্পর সম্পর্কিত জেনো

এক চাদরের নীচে দু সুহৃদ যেন

সিংহাসন ছাড়া হয় না বাদশাহী

দীন ছাড়া অচল শাহনশাহী।

দিনকারতের বর্ণনা মতে আরদ্শির বিশিষ্ট ধর্মযাজক তানসেরকে তাঁর দরবারে ডেকে

আভেস্তাকে পুনর্বিন্যাস করার নির্দেশ দেন।

ড. মুঈন আরো বলেছেন ,

সাসানীদের যুগে মাযদা ইয়াসনা ধর্মের জাঁকজমকপূর্ণ অবস্থান ছিল। যারথুষ্ট্র ধর্মযাজকরা এ সময় ক্ষমতার পূর্ণতায় পৌঁছেন। কখনও কখনও ধর্মযাজক ও সম্ভ্রান্তগণ সম্রাটের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতেন। ধর্মযাজকদের প্রভাব এতটা বেশি ছিল যে ,মাঝে মাঝে তাঁরা সম্রাটের ব্যক্তিগত জীবনেও হস্তক্ষেপ করতেন। এমন অবস্থা ছিল ,সব বিষয়ের মীমাংসার অধিকার এ শ্রেণীর হাতে চলে গিয়েছিল।

অতঃপর তিনি প্রসিদ্ধ ইরান বিশেষজ্ঞ ক্রিস্টেন সেন হতে বর্ণনা করেছেন ,

ধর্মযাজকদের প্রভাব সরকার নির্ধারিত ও ধর্মীয় বিষয় ,যেমন সাধারণ বিচার-আচার ,বিয়ে ,নবজাতককে পুণ্য ও বরকত দান করা ,পবিত্রকরণ ও কুরবানী বা ত্যাগ প্রভৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না ;বরং তাঁরা নির্দিষ্ট ভূমির মালিকানা ছাড়াও সদকা ,হাদীয়া ,শস্যকর ও অপরাধের জরিমানা হতে প্রচুর অর্থ পেতেন যা তাঁদের প্রভাবকে বর্ধিত করত। তদুপরি যারথুষ্ট্র পুরোহিতগণ ব্যাপক স্বাধীনতা ভোগ করতেন এবং বলতে গেলে তাঁরা সরকারের মধ্যে সরকার তৈরি করছিলেন । 47