আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর0%

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর লেখক:
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিষদ,ইরান।
বিভাগ: ইমাম হোসাইন (আ.)

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

লেখক: লেখকবৃন্দ
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিষদ,ইরান।
বিভাগ:

ভিজিট: 14645
ডাউনলোড: 1285

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 30 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 14645 / ডাউনলোড: 1285
সাইজ সাইজ সাইজ
আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

লেখক:
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিষদ,ইরান।
বাংলা

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর সম্বলিত এ গ্রন্থটিতে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এর আশুরা বিপ্লব সম্পর্কিত বিভিন্ন  প্রশ্নের উত্তর দেয়া হযেছে

শোকানুষ্ঠান পালনের সওয়াব

45 নং প্রশ্ন : রেওয়ায়াতে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য শোক পালনের পুরস্কার হিসেবে অসংখ্য ও সীমাহীন সওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে ;এ ধরনের রেওয়ায়াত কতটুকু গ্রহণযোগ্য ?

উত্তর : শহীদদের নেতা আবু আবদিল্লাহ হোসাইন (আ.)-এর জন্য শোকানুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম এবং এর জন্য অসংখ্য পুণ্য ও পুরস্কার রয়েছে । এ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য গ্রন্থে ,যেমন উসূলে কাফী গ্রন্থে অসংখ্য রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে ,এর মধ্যে অনেক সহীহ হাদীসও রয়েছে ।

এ বিষয়ে কয়েকটি মৌলিক বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে :

1. এ ধরনের রেওয়ায়াতগুলোর কিছু সঠিক এবং কিছু মিথ্যা ও বানানো ।

2. যে সকল রেওয়ায়াতে বিশেষ আমলের বিশেষ ফলাফলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এই রেওয়ায়াতগুলোর অর্থ এই নয় যে ,শুধু ঐ বিশেষ আমলের ফলে ঐ বিশেষ ফলাফল অর্জিত হবে ;বরং এর অর্থ হলো ঐ আমল নির্দিষ্ট ফল লাভের আংশিক বা সহায়ক কারণ । কোন কিছু বাস্তব রূপ লাভের জন্য সার্বিক কার্যকরী কারণসমূহ বিদ্যমান থাকা এবং এর প্রতিবন্ধক সকল বাধা দূরীভূত হওয়া অপরিহার্য । এ দুই বিষয় (নিয়ামকসমূহের উপস্থিতি ও প্রতিবন্ধকের অনুপস্থিতি) এক সঙ্গে থাকলেই কেবল তা পরিপূর্ণ কারণ বলে বিবেচিত হবে । এ ধরনের পরিপূর্ণ কারণ উপস্থিত থাকলে তার কাঙ্ক্ষিত ফল অপরিহার্য । কখনই এর ব্যতিক্রম হওয়া সম্ভব নয় । অথচ আংশিক বা সহায়ক কারণ কোন কিছু ঘটার একটি শর্ত মাত্র । যদি এ বিষয়টি বাস্তবায়নে কোন বাধা না থাকে তাহলে এই ঘটনাটি ঘটবে ,কিন্তু যদি বাধা থাকে তাহলে এর বাস্তবায়ন ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে । বস্তুজগতে ও প্রকৃতিতে কার্য-কারণের এ নিয়ম প্রচলিত রয়েছে । যদি বলা হয়-আগুন কাঠ পোড়ানোর কার্যের কারণ ,তবে তা এর আংশিক বা সহায়ক কারণ অর্থাৎ আগুন থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য শর্ত ,যেমন অক্সিজেনের অভাব ও অন্যান্য বাধা (যেমন : ভিজা কাঠ) দূর না হলে কাঠ পোড়ানোর ঘটনাটি ঘটবে না ।

এ কারণে যদি কেউ ভিজা কাঠ আগুনে নিক্ষেপ করে এবং কয়েক মিনিট পরেও কাঠে আগুন না জ্বলে তাহলে আমরা যেন কার্য-কারণতন্ত্রের

প্রতি সন্দেহ পোষণ না করি ;বরং আমাদের অনুসন্ধান করা উচিত ,কেন আগুন জ্বলেনি ? এ বিষয়টির অর্থাৎ কাঠে আগুন না জ্বলার অন্য কোন শর্ত রয়েছে কি ? অথবা এর পেছনে অন্য কোন বাধা রয়েছে কি ? তখন দেখতে পাব যে ,ঘটনাটি ঘটার জন্য অন্যান্য শর্ত রয়েছে ,যেমন : অক্সিজেনের উপস্থিতি ,অন্যান্য বাধা ,যেমন : কাঠ ভিজা না থাকা ,কাঠের দাহ্যতা ,কাঠে আগুন জ্বলার জন্য প্রয়োজনীয় তাপমাত্রার উপস্থিতি থাকা । যদি সম্ভাব্য সকল বাধা দূর করা হয় অর্থাৎ পরিপূর্ণ কারণ উপস্থিত থাকে তাহলে নিশ্চিতভাবে কাঠ পুড়বে । এর বিপরীত হওয়ার অর্থ হলো এ বিষয়টির মিথ্যা প্রতিপন্ন হওয়া অর্থাৎ (সকল কারণ উপস্থিত ও উপযুক্ত পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও আগুন না জ্বললে তখনই কেবল বলা যাবে) আগুন কাঠ (কার্যের) পোড়ার কারণ নয় । এ ধরনের শর্তের প্রভাব পরিপূর্ণ কারণের অংশ হিসেবে এবং অন্যান্য শর্তের সাথে কাজ করে ।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে ঐ শর্তগুলো কী কী ? কোন কিছুর উৎপত্তির জন্য তারা স্বতন্ত্রভাবে কী পরিমাণ ভূমিকা রাখে ? এ ধরনের কার্য ও শর্তগুলোর প্রভাব সবক্ষেত্রে কি এক রকম ? এটা সম্ভব কি যে ,এই কার্যের কারণ এক ক্ষেত্রে মূল ভূমিকা পালন করবে ,কিন্তু অন্য ক্ষেত্রে ভিন্ন কোন ভূমিকা পালন করবে ? সব কারণের কার্য সাধনের পদ্ধতি কী রকম ? অন্য কোন উপাদান এতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করে ,নাকি কারণ সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে ? এ রকম অনেক প্রশ্ন রয়েছে ;মানবজাতির বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তার গভীরতা এখনও এ পর্যায়ে পৌঁছেনি যে ,এ বিষয়গুলোর যথার্থ উত্তর দিতে সক্ষম । নবীদের দায়িত্ব হলো মানবজাতিকে এ ধরনের উপাদানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যা শুধু বুদ্ধিবৃত্তি বা পর্যবেক্ষণ ও অভিজ্ঞতা দ্বারা অর্জন করা সম্ভব নয় ।

দর্শন ও ধর্মগ্রন্থের নির্ভরযোগ্য বক্তব্যের গভীর অনুসন্ধান করে যা পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা সম্ভব তা হলো কার্যকারণতন্ত্র কেবল বস্তুগত কার্যকারণ দিয়ে গঠিত হয় না ;বরং বস্তুজগতের কারণ অবস্তু ও অধ্যাত্ম জগতের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত ।

3. ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শোক পালন ও ক্রন্দনের জন্য গুণগত এবং সংখ্যাগত দিক থেকে যে পুরস্কারের কথা ব্যাপকভাবে বর্ণিত হয়েছে সেক্ষেত্রে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। কারণ ,তিনি আত্মত্যাগ ,বীরত্ব ,আল্লাহর ওপর নির্ভরতার এত বড় নমুনা দেখিয়েছেন যে ,যা অবিস্মরণীয় ও বিরল ;তিনি তাঁর সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করেছেন। (তিনি এ আয়াতের প্রকৃত দৃষ্টান্ত : নিশ্চয় আমার নামায ,আমার ইবাদত ,আমার জীবন ,আমার মৃত্যু সেই আল্লাহর জন্য যিনি জগৎসমূহের প্রতিপালক।373 ) তিনি তাঁর নির্ধারিত পরিণতির (শাহাদাতের) প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন374 ;তিনি আত্মসম্মানবোধ ,আল্লাহর আনুগত্য ,ইসলামের প্রতিরক্ষায় মহাত্যাগ ,নিষ্ঠা ,সাহসিকতা ও ধৈর্যের প্রতীক। তিনি আল্লাহর ওপর পূর্ণ বিশ্বাস নিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্ত ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন ;এসকল কর্মের বিনিময়ে তিনি এ পুরস্কারের যোগ্য। নিচের ঘটনাটির প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য করলে এটি পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হবে।

আল্লামা বাহরুল উলূম নিয়মিত সামেররাতে ইমাম হাসান আসকারী ও ইমাম হাদী (আ.)-এর মাযারে যিয়ারত করতে যেতেন । কোন একদিন যিয়ারতের জন্য যাওয়ার সময় পথিমধ্যে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করার কারণে গুনাহ মাফ হওয়ার ফজিলত সম্পর্কে চিন্তা করছিলেন । একজন আরব অশ্বারোহী তাঁর সামনে এসে সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন : হে রাসূল (সা.)-এর বংশধর (সাইয়্যেদ)! আপনাকে বেশ চিন্তিত বলে মনে হচ্ছে । যদি কোন জ্ঞানগত বিষয়ে প্রশ্ন থাকে তাহলে আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারেন ;হয়তো আমি আপনাকে সাহায্য করতে পারব । বাহরুল উলূম বললেন : এ চিন্তায় মগ্ন ছিলাম যে ,কীভাবে আল্লাহ তা আলা শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর যিয়ারতকারী ও তাঁর ক্রন্দনকারীদের জন্য এত বেশি পরিমাণ পুরস্কার ঘোষণা করেছেন ? উদাহরণস্বরূপ ,কোন যিয়ারতকারী যিয়ারতের উদ্দেশ্যে যখন পা বাড়ায় তখন তার প্রত্যেক পদক্ষেপের জন্য একটি ফরজ হজ ও একটি উমরা হজের সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হয় । এক ফোঁটা অশ্রুর বিনিময়ে সমস্ত সগীরা ও কবীরা গুনাহ ক্ষমা করে দেওয়া হয় ।

ঐ অশ্বারোহী বললেন : আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছু নেই । আপনাকে একটি উদাহরণ দিচ্ছি যাতে বিষয়টি আপনার নিকট সুস্পষ্ট হয় । কোন একজন বাদশা শিকার করার স্থানে তাঁর সঙ্গী-সাথিদের থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছিলেন । অবশেষে সঙ্গীদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে জনহীন এক মরুভূমিতে উপনীত হলেন । দীর্ঘক্ষণ চলতে চলতে প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে পড়লেন । কিন্তু ফিরে আসার পথ পেলেন না । এদিকে চরম ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় তাঁর প্রাণ ওষ্ঠাগত । নিজের জীবনের ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়লেন । অবশেষে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে রইলেন । যখন জ্ঞান ফিরল নিজেকে একটি তাঁবুতে দেখতে পেলেন । সেখানে একজন বৃদ্ধাকে তাঁর সন্তানের সাথে দেখলেন । তাঁদের একটি ছাগল ছিল যার দুধ দিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করত ;এছাড়া তাঁদের আর কিছু ছিল না । বৃদ্ধা ছাগলটিকে জবাই করে খাবার তৈরি করে বাদশার সামনে রাখলেন । বৃদ্ধা বাদশাকে চিনতেন না ,শুধু মেহমানের সম্মানের জন্য তিনি এ কাজ করেছিলেন । বাদশা সেখানে রাত্রি যাপন করলেন এবং পরের দিন বৃদ্ধার সন্তানের সাহায্যে প্রাসাদে ফিরে আসলেন । প্রাসাদের লোকদের কাছে গত রাতের ঘটনা বর্ণনা করে বললেন : শিকার করতে গিয়ে সঙ্গীদের থেকে দূরে চলে গিয়েছিলাম ,আবহাওয়াও প্রচণ্ড গরম ছিল । ফলে প্রচণ্ড ক্ষুধা-তৃষ্ণায় অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম । জ্ঞান ফেরার পর নিজেকে এক বৃদ্ধার তাঁবুতে দেখলাম । সে আমাকে চিনত না । কিন্তু তাদের একমাত্র মূলধন-যা দিয়ে তারা জীবিকা নির্বাহ করত-ছাগলটি আমার জন্য জবাই করল এবং খাদ্য তৈরি করল । এই ভালোবাসা ও সম্মানের বিনিময়ে আমার তাদেরকে কী উপহার দেওয়া উচিত ? কিভাবে আমি তাদের প্রতিদান দেব ? একজন মন্ত্রী বললেন : তাদেরকে একশ ছাগল দান করুন । আরেকজন বললেন : একশ ছাগল ও একশ স্বর্ণমুদ্রা দান করুন । অন্য একজন বললেন : অমুক ভূমিটি তাদেরকে দান করুন । বাদশা এ সকল সমাধান শুনে বললেন : যা কিছুই দিই না কেন ,তার বিনিময় বলে গণ্য হবে না । যদি রাজত্ব ,রাজমুকুট এবং রাজসিংহাসনের সবকিছু দান করি তাহলেই হয়তো সমপরিমাণ দান করলাম । কেননা ,তাদের যা কিছু ছিল সবই আমাকে দিয়েছে ও আমার প্রাণ রক্ষা করেছে ;আমারও উচিত আমার সবই তাদেরকে দেওয়া ।

শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.) তাঁর ধন-সম্পদ ,সন্তান-সন্ততি ,ভাই-বোন ,মাথা ও শরীর যা কিছু ছিল সবকিছুই আল্লাহর রাস্তায় দান করেছেন । এখন আল্লাহ যদি তাঁদেরকে এত বেশি পুরস্কার দান করেন

তাহলে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছুই নেই । এ কথা শেষ হওয়া মাত্র বাহরুল উলূমের সামনে থেকে লোকটি উধাও হয়ে গেলেন ।375

আশুরার যিয়ারতের গুরুত্ব

46 নং প্রশ্ন : আশুরার যিয়ারতের গুরুত্ব এবং এর শিক্ষণীয় বিষয় কী ?

উত্তর : শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর যিয়ারতের376 জন্য অনেক রেওয়ায়াত বর্ণিত হয়েছে । বিশেষ করে প্রসিদ্ধ আশুরার যিয়ারতের ক্ষেত্রে ইমাম জাফর সাদিক (আ.) এবং ইমাম বাকির (আ.)-এর নিকট থেকে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে । ইমাম বাকির (আ.) তাঁর একজন সাহাবী আলকামা ইবনে মুহাম্মাদ হাদরীকে এ যিয়ারতটি শিক্ষা দিয়েছেন । যেহেতু এ যিয়ারতটি ইসলামের প্রকৃত ধারার চিন্তার প্রকাশক ,সত্য নীতি-আদর্শের ধারক এবং দিকনির্দেশক সেহেতু এতে আশ্চর্য রকমের শিক্ষণীয় দিক রয়েছে । যেহেতু যিয়ারত বিষয়বস্তু এবং দিকনির্দেশনার দৃষ্টিতে বিশেষভাবে ক্রিয়াশীল ও প্রভাবসম্পন্ন সেহেতু ইমামগণ তাঁদের সাহাবীদের যিয়ারত পড়ার ধরন শিক্ষা দিয়েছেন এবং এই গঠনমূলক কাজে বিশেষ দিকনির্দেশনা ও গুরুত্ব দান করেছেন ।

যে সকল যিয়ারতনামা পবিত্র ইমামদের নিকট থেকে আমাদের নিকট পৌঁছেছে সেগুলোতে উচ্চতর শিক্ষা রয়েছে ,যেমন : যিয়ারতে জামেয়ে কাবীরা ,যিয়ারতে আশুরা ,যিয়ারতে আলে-ইয়াসিন ,যিয়ারতে নাহিয়ে

মুকাদ্দাসাহ । যিয়ারতে আশুরা ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত । ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে প্রকৃত ধারার ইসলামী চিন্তা ,মৌলিক বিশ্বাস ও নীতি-আদর্শের প্রকাশে গঠনমূলক প্রভাবের কারণে এ যিয়ারতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে । ইসলাম থেকে বিচ্যুত বনি উমাইয়ার পথের সাথে প্রকৃত ইসলামের পার্থক্যের রেখা এ যিয়ারতে টেনে দেওয়া হয়েছে । এ যিয়ারত থেকে অর্জিত বিশেষ কিছু ফলাফল ও শিক্ষার বিষয় নিম্নে বর্ণনা করা হলো :

1. পবিত্র আহলে বাইতের পরিবারের সাথে আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি ও তাঁদের সাথে ভালোবাসার সম্পর্ক বৃদ্ধি করা : তাঁদের প্রতি ভালোবাসার কারণে যিয়ারতকারীরা তাঁদেরকে নিজেদের আদর্শ রূপে গ্রহণ করে ও তাদের চিন্তা ,দর্শন ও কর্ম-পদ্ধতির ক্ষেত্রে তাঁদের মতো হওয়ার চেষ্টা করে । যেভাবে যিয়ারতে আমরা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি যে ,আমাদের জীবন ও মৃত্যু যেন তাঁদের জীবন-মৃত্যুর মতো হয় ।

اللهم اجعل محیای محیا محمد و آل محمد و مماتی محمد و آل محمد

হে আল্লাহ! আমার জীবনকে মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের জীবনের অনুরূপ কর এবং আমার মৃত্যুকে মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের মৃত্যুর মতো কর (তাঁদের ন্যায় মৃত্যু দান কর) ।

আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি এই ভালোবাসা আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা থেকে উৎসারিত ;তাঁদের ঐশী রঙে রঙিন হওয়া এবং ¯ষ্টার সাথে সম্পর্কিত হওয়া থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য । এ কারণে তাঁদের যিয়ারত পছন্দনীয় ও কাঙ্ক্ষিত এবং নৈকট্য অর্জনের উৎস ।377 এ কারণে যিয়ারতের একাংশে আমরা পড়ি :

اللهم انی اتقرب الیک بالموالاة لنبیک وال نبیک

হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার নবী ও তাঁর পরিবারের বন্ধুত্বের উসিলায় আপনার নৈকট্য কামনা করছি ।

2. যিয়ারতকারীদের অন্যায়-অত্যাচারের প্রতিবাদের মানসিকতা সৃষ্টি: এ যিয়ারতে আহলে বাইতের প্রতি যুলুমকারীদের প্রতি অভিশাপ ,লানত দেওয়ার পুনরাবৃত্তির ফলে যিয়ারতকারীদের অন্যায়ের প্রতিবাদী হওয়ার মানসিকতা সৃষ্টি হয় । সত্যের অনুসারী ও আহলে বাইতের বন্ধুদের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ধর্মীয় ভিত্তিকে শক্তিশালী করে । ঈমান (আল্লাহর রাস্তায়) ভালোবাসা ও ঘৃণা ছাড়া অন্য কিছু কি ?

هل الایمان الا الحب والبغض

প্রকৃত ঈমানদার অন্যায়-অবিচারের বিপরীতে নিরপেক্ষতা অবলম্বন করে না ,সত্যের পক্ষ অবলম্বন করে ও এর সঙ্গী হয় ।

یا ابا عبدالله انی سلم لمن سالمکم و حرب لمن حاربکم

হে আবা-আবদিল্লাহ! যে আপনার সাথে সন্ধি করে আমিও তার সাথে সন্ধি করি এবং যে আপনার সাথে যুদ্ধ করে আমিও তার সাথে যুদ্ধ করি ।

3. বিচ্যুত পথ থেকে দূরে থাকা : এ যিয়ারতে অন্যায়-অত্যাচারের উৎসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে :

فلعن الله امة اسست اساس الظلم و لعن الله امة دفعتکم عن مقامکم و ازالتکم عن مراتبکم التی رتبکم الله فیها

আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক উম্মতের ঐ সকল ব্যক্তির ওপর যারা যুলুম ও অত্যাচারের ভিত্তি স্থাপন করেছে ও আপনাদেরকে আল্লাহর দেওয়া পদ থেকে অপসারণ করেছে এবং আপনাদের মর্যাদাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে ।

আশুরায় যে অন্যায়-অবিচার সংঘটিত হয়েছে ,ইতিহাসের গভীরে এর উৎস রয়েছে । ইমাম হোসাইন (আ.)-এর প্রতি যুলুম ,সার্বিক অন্যায়-অবিচারের জগতের বলয়ের একটি বলয় মাত্র যা খিলাফতের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুতির মাধ্যমে শুরু হয়েছিল ।

4. শিক্ষা গ্রহণ , হেদায়াতের আদর্শকে আদর্শ হিসেবে নির্ধারণ : যিয়ারতে বর্ণিত হয়েছে :

فاسئل الله الذی اکرمنی بمعرفتکم و معرفة اولیائکم ورزقنی البرائة من اعدائکم، ان یجعلنی معکم فی الدنیا و الآخرة و ان یثبت لی عندکم قدم صدق فی الدنیا و الآخرة

(হে নবীর আহলে বাইত!) আমি আল্লাহর কাছে কামনা করছি-যিনি আপনাদের ও আপনাদের বন্ধুদের সাথে পরিচিত করিয়ে আমাকে সম্মানিত করেছেন এবং আপনাদের শত্রুদের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করার তাওফীক দান করেছেন-দুনিয়াতে ও আখেরাতে আপনাদের সাথে থাকার সৌভাগ্য দান করুন । আর তিনি যেন দুনিয়াতে ও আখেরাতে আপনাদের পথে (সকল ক্ষেত্রে) আমার পদক্ষেপকে দৃঢ় রাখুন । 378

যিয়ারতকারী সত্যের জ্ঞান অর্জন ও অন্যায়কারীদের পরিচিতি লাভ করার পর তাদের কাছে থেকে দূরে সরে আসে । দৃঢ়তার সাথে পবিত্র আহলে বাইতের মতাদর্শে প্রতিষ্ঠিত থাকার এবং তাঁদের নির্দেশ অনুসারে আমল করার শপথ নেয় এবং এর মাধ্যমে নিজেকে দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যের পথে পরিচালিত করে । হেদায়াতের আদর্শকে অর্থাৎ যাঁরা আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত হয়েছেন তাঁদেরকে নিজের জীবনের আদর্শরূপে নির্ধারণ করে ও তাঁদের সাথে একই পথে পা বাড়াতে চায় ।

5. আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ ও শাহাদাত বরণ করার মনোবল বৃদ্ধির সংস্কৃতির প্রসার ।

6. পবিত্র আহলে বাইতের মতাদর্শ ,পথ এবং উদ্দেশ্য উজ্জীবিতকরণ ।

47 নং প্রশ্ন : কেন ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শত্রুদের প্রতি লানত ও অভিশাপ দেন ? এ কাজটি এক ধরনের বর্বর আচরণ ও নেতিবাচক ধারণা করা নয় কি ? এটি এ ধরনের নেতিবাচক অনুভূতি যা সভ্য সমাজের মানুষের প্রবণতার সাথে মিলে না । এখন আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করি যেখানে সকল মানুষের সাথে হাসিমুখে আচরণ করা উচিত । এখন জীবনের আনন্দ ও সন্ধির কথা বলা উচিত । লানত ,অভিশাপ ,সম্পর্ক ছিন্ন করা ,কারো কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা এক ধরনের সহিংসতা ;এ সংস্কৃতি এক হাজার ও চারশ বছর পূর্বের এক সংস্কৃতি । যে যুগে ইমাম হোসাইন (আ.)-কে শহীদ করা হয়েছে সে সময়ের প্রচলিত রীতি বর্তমান সময়ে প্রযোজ্য নয় । কারণ ,আজকের সভ্য সমাজ ,এমনকি সাধারণ জনগণও এ ধরনের আচরণকে অপছন্দ করে । কেন আপনারা এরূপ নেতিবাচক মতে বিশ্বাসী ?!

উত্তর : মানুষের প্রকৃতি একদিকে যেমন কেবল জ্ঞান ও পরিচিতি অর্জনের বৈশিষ্ট্য নিয়ে সৃষ্টি হয় নি ;তেমনি শুধু ইতিবাচক আবেগ-অনুভূতি নিয়েও সৃষ্টি হয় নি । মানুষ এমন এক সৃষ্টি যার ইতিবাচক অনুভূতি যেমন রয়েছে তেমনি নেতিবাচক অনুভূতিও রয়েছে । যেভাবে তার মধ্যে আনন্দ ও উৎফুল্লতা রয়েছে তেমনি দুঃখ ও বেদনাও উপস্থিত । আল্লাহ আমাদেরকে এ রকম দু টি বিপরীত অনুভূতির সমন্বয়ে সৃষ্টি করেছেন ।

কোন মানুষই দুঃখ ও আনন্দ ছাড়া জীবন-যাপন করতে পারে না । আল্লাহ তা আলা আমাদেরকে হাসি ও কান্না এ দুই বৈশিষ্ট্য দিয়েই সৃষ্টি করেছেন । কিন্তু হাসি এবং কান্না তার স্ব-স্থানে হওয়া উচিত । আল্লাহ প্রদত্ত এ বিশেষ ক্ষমতার ব্যবহার তার যথাস্থানে হওয়াই বাঞ্ছনীয় ।

আল্লাহ তা আলার মানুষকে ক্রন্দন করার ক্ষমতা দেওয়ার কারণ হলো তার উচিত উপযুক্ত ক্ষেত্রে ক্রন্দন করা । তবে ঐ ক্ষেত্রটিকে আমাদেরকে খুঁজে বের করতে হবে । তা না হলে ক্রন্দন করার ক্ষমতা আমাদের মধ্যে লোপ পাবে । এখন প্রশ্ন হলো আল্লাহ তা আলা কেন আমাদের মধ্যে এ অনুভূতিকে সৃষ্টি করেছেন যার কারণে দুঃখণ্ডমর্মপীড়ার সৃষ্টি হলে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে ?

এটি সুস্পষ্ট যে ,মানুষের জীবনে ক্রন্দনের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে । আল্লাহর জন্য ক্রন্দন করা-তা শাস্তির ভয়ে হোক অথবা আল্লাহর সাক্ষাতের আগ্রহে হোক ,তা মানুষের পরিপূর্ণতায় পৌঁছার ক্ষেত্রে বিশেষ

ভূমিকা পালন করে । তাই যখন মানুষের মন বিগলিত হয় তখন সে ক্রন্দন করে । মানুষ যাকে পছন্দ করে ও ভালোবাসে তাদের মুসিবত ও দুঃখণ্ডকষ্টে সমব্যথী হয় । এ বিষয়টি হচ্ছে মানুষের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য যে ,যার জন্য তার মনে দয়া থাকে তার দুঃখে সে ক্রন্দন করে ।

আল্লাহ তা আলা আমাদের মধ্যে ভালোবাসা সৃষ্টি করেছেন । এর ফলে যারা আমাদের উপকার ও কল্যাণ করেছে (অথবা যাঁদের পূর্ণতা রয়েছে) তাদের প্রতি আমরা আমাদের ভালোবাসা প্রকাশ করি । অন্যের প্রতি আমাদের এ ভালোবাসা হতে পারে বস্তুগত অথবা বুদ্ধিবৃত্তিক অথবা আবেগ-অনুভূতির পূর্ণতার কারণে ।

মানুষ যখনই কোন পূর্ণতা বা এর অধিকারী কাউকে খুঁজে পায় তখনই তার প্রতি তার ভালোবাসার সৃষ্টি হয় । এছাড়াও মানুষের ভালোবাসার বিপরীতে ঘৃণা ও শত্রুতারও অস্তিত্ব রয়েছে । যেমনিভাবে মানুষের প্রকৃতি হলো ,যদি কেউ তার উপকার করে তাহলে তার প্রতি ভালোবাসার সৃষ্টি হয় ,ঠিক তেমনিভাবে কেউ তার ক্ষতি করলে সে তার শত্রু হয়ে যায় ।

তবে মুমিন বান্দার নিকট দুনিয়া বা বস্তুগত ক্ষতির কোন গুরুত্ব নেই । কারণ ,প্রকৃতপক্ষে তার নিকট দুনিয়ারই কোন মূল্য নেই । কিন্তু যে তার ধর্মের শত্রু এবং তার নিকট থেকে তার চিরকালীন সৌভাগ্য অর্থাৎ পরকালকে ছিনিয়ে নিতে চায় ,সে শত্রুকে কখনই উপেক্ষা করা যায় না । কোরআন এরূপ এক শত্রুর বর্ণনা দিয়ে বলেছে :

) إِنَّ الشَّيْطَانَ لَكُمْ عَدُوٌّ فَاتَّخِذُوهُ عَدُوًّا(

নিশ্চয়ই শয়তান তোমাদের শত্রু ,অতএব ,তোমরা তাকে শত্রু হিসেবে গণ্য কর । 379

যদি আল্লাহর বন্ধুর সাথে বন্ধুত্ব করা উচিত হয় তাহলে আল্লাহর শত্রুদের সাথে শত্রুতাও করা উচিত । এই বিষয়টি মানুষের ফিতরাতের অংশ ও মানবীয় পূর্ণতা ও সৌভাগ্যের কারণ । যদি আল্লাহর শত্রুর সাথে শত্রুতা করা না হয় তাহলে ক্রমে ক্রমে তাদের সাথে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হবে । এক সাথে বসবাস করার ফলে তাদের আচরণ তার নিকট গ্রহণযোগ্য মনে হবে এবং তাদের চিন্তা-বিশ্বাস দ্বারা সে প্রভাবিত হবে এবং সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে ঐ ব্যক্তি আরেকটা শয়তানে রূপান্তরিত হবে ।

অন্য ভাষায় ,শত্রুর প্রতি ঘৃণা ও তার সাথে শত্রুতা তার ক্ষতি থেকে রক্ষাকবচ ও তার ষড়যন্ত্র ও প্রতারণার বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থাস্বরূপ । মানুষের শরীরের যেভাবে উপকারী উপাদানকে আকর্ষণ করার ক্ষমতা রয়েছে তেমনিভাবে তার প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও বিকর্ষণ করার ক্ষমতাও রয়েছে যা তাকে ক্ষতিকর উপাদান ও রোগ-জীবাণু থেকে রক্ষা করে । এ প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা রোগ-জীবাণুর সাথে যুদ্ধ করে এদেরকে ধ্বংস করে ;রক্তের শ্বেত কণিকার কাজ এরকমই । যদি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে যায় ,তাহলে জীবাণুগুলো ক্রমে ক্রমে শক্তিশালী হয়ে শরীরকে অসুস্থ করে ফেলবে ,এমনকি এর ফলে সে মৃত্যুর সম্মুখীন হতে পারে ।

যদি মনে করি ,শরীরে জীবাণু প্রবেশে কোন সমস্যা নেই ,তাই জীবাণুকে আমরা স্বাগত জানাই এবং বলি , তোমরা আমাদের অতিথি ,তোমাদের সম্মান করা আমাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য । এ অবস্থায় কি শরীর ঠিক থাকবে ? নাকি অবশ্যই জীবাণুকে ধ্বংস করা উচিত । এটি হচ্ছে আল্লাহর কাজের পদ্ধতি । এটি আল্লাহর কর্মের ক্ষেত্রে প্রজ্ঞার সাথে সম্পর্কিত । তিনি প্রত্যেক জীবিত বস্তুকে দুই ধরনের ব্যবস্থা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন । একটি আকর্ষণ ও গ্রহণ ,অপরটি বিকর্ষণ ও বর্জন । যেভাবে প্রত্যেক জীবন্ত সত্তার বৃদ্ধি ও পরিপূর্ণতার জন্য আবশ্যক উপাদানের প্রয়োজন রয়েছে ,তেমনি এর দেহ থেকে ক্ষতিকর বিষাক্ত উপাদান নিষ্কাষণ ও বর্জনেরও প্রয়োজন রয়েছে । যদি মানুষ বিষাক্ত উপাদানকে বর্জন না করে তাহলে তার জীবন অব্যাহত থাকবে না ।

জীবিত যে কোন বস্তুর প্রতিরক্ষামূলক ক্ষমতা রয়েছে । এ ক্ষমতা পশু ও মানুষের মধ্যে একই ভূমিকা পালন করে । মানুষের দেহের মতো তার আত্মাতেও এ ধরনের ক্ষমতা রয়েছে । যারা আমাদের জন্য উপকারী তাদেরকে ভালোবাসা ও তাদের সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করার জন্য এক ধরনের আত্মিক আকর্ষণ করার ক্ষমতা থাকা অত্যাবশ্যক যাতে তাদের নিকটবর্তী হয়ে তাদের নিকট থেকে জ্ঞান ,পূর্ণতা ,আদব-কায়দা ও নৈতিক গুণাবলি অর্জন করতে পারি ।

কেন মানুষ তার পছন্দের মানুষকে ভালোবাসে ? কারণ ,যখন তাদের নিকটবর্তী হয় তখন তাদের থেকে উপকৃত হয় । যেহেতু যাঁরা সৎ ও মহান তাঁরা মানবিক পূর্ণতার উৎস এবং সমাজের নৈতিক উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন সেহেতু তাঁদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করা উচিত । এর বিপরীতে বাস্তবে যারা সমাজ ধ্বংসের কারণ ,তাদের সাথে শত্রুতা করা উচিত ।

) قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَحْدَه(

তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার অনুসারীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে । যখন তারা তাদের জাতিকে বলেছিল : তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের ইবাদত কর তাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই । আমরা তোমাদেরকে মানি না । তোমাদের সাথে আমাদের চিরকালের জন্য শত্রুতা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি হয়েছে ;যতক্ষণ পর্যন্ত না তোমরা এক আল্লাহর ওপর ঈমান আন ।380

কোরআন বর্ণনা করেছে : তোমরা ইবরাহীম ও তার সাহাবীদেরকে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ কর । আমরা জানি যে ,ইসলামী সংস্কৃতিতে ইবরাহীম (আ.)-এর অবস্থান অনেক ঊর্ধ্বে । রাসূল (সা.)ও বলেছেন যে ,তিনি ইবরাহীম (আ.)-এর পথের অনুসারী । ইসলাম এমন একটি নাম যা হযরত ইবরাহীম (আ.) এ ধর্মের জন্য মনোনীত করেছেন ।

هو سماکم المسلمین من قبل

তিনি পূর্বে তোমাদেরকে মুসলিম নামকরণ করেছেন ।

আল্লাহ তা আলা ইবরাহীম (আ.)-কে আদর্শ হিসেবে অনুসরণ করতে আদেশ দিয়েছেন । ইবরাহীম (আ.)-এর ভূমিকা কী ছিল ?

অগ্নি উপাসকরা যখন ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর সাহাবীদের সাথে শত্রুতা করা শুরু করল এবং তাঁদেরকে তাঁদের অঞ্চল থেকে বের করে দিল তখন তিনি তাদের উদ্দেশে বললেন : তোমাদের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই । আমরা তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট । এভাবে তাদের সাথে সম্পর্কোচ্ছেদ করলেন । এটা করেও তিনি ক্ষান্ত হন নি ;বরং তাদেরকে বলেছেন : কিয়ামত পর্যন্ত আমাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা বজায় থাকবে যদি না তোমরা অবিশ্বাস ত্যাগ কর ।

শুধু আল্লাহর বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্ব করাই যথেষ্ট নয় । যদি আল্লাহর শত্রুদের সাথে শত্রুতা না থাকে তাহলে আল্লাহর সাথেও বন্ধুত্ব থাকবে না । যদি শরীরের রোগ প্রতিরোধের ব্যবস্থা না থাকে তাহলে খাদ্য ও শক্তি গ্রহণ করার ক্ষমতাও ধ্বংস হয়ে যাবে । আমাদের আকর্ষণ-বিকর্ষণের ক্ষেত্র সম্পর্কে সঠিকভাবে জানা অপরিহার্য । দুঃখের সাথে বলতে হয় কিছু ক্ষেত্রে এ বিষয়টি নিয়ে ভুলের সৃষ্টি হয় । যা কিছুকে আকর্ষণ ও গ্রহণ করা উচিত বাস্তবে তা বিকর্ষণ ও বর্জন করি । যেমন অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে যদি কেউ ভুল বলে ও বোঝে ,এর ফলে সঠিক পথ থেকে তার বিচ্যুতি ঘটে ;কিন্তু পরে এ কারণে সে অনুতপ্ত হয় কিংবা যদি কারো নিকট সত্যকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করার পর সে তার ভুল স্বীকার করে তাহলে এ দুই ধরনের ব্যক্তির সাথে শত্রুতা করা উচিত নয় । শুধু গুনাহ করার কারণে কোন ব্যক্তিকে সমাজ থেকে বিতাড়িত করা উচিত নয় ;বরং তাকে সংশোধন করা উচিত । এ ধরনের ব্যক্তিরা হচ্ছে অসুস্থ ;তাদের সেবা দেওয়া উচিত । এটি শত্রুতা প্রকাশ করার ক্ষেত্র ও স্থান নয় । কিন্তু যদি কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশ্যে গুনাহ করে সমাজে তার প্রচলন ঘটাতে চায় সেক্ষেত্রে এ ধরনের কাজকে বিশ্বাসঘাতকতা বলা যায় এবং তার সাথে শত্রুতা করা উচিত ।

আমরা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর সাথে সম্পর্কিত বরকত (শিক্ষা ও আদর্শ) থেকে উপকৃত হতে পারব না যতক্ষণ না ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শত্রুর প্রতি লানত করব ,এরপর ইমাম হোসাইনের উদ্দেশে সালাম পাঠাব । এ কারণেই কোরআনে রাসূল (সা.)-এর প্রকৃত সাহাবাদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনায় প্র ম অংশে বলা হয়েছে :( أ َشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّار ) কাফিরদের বিরুদ্ধে কঠোর । 381 এরপর বলা হয়েছে :( رُحَمَاءُ بَيْنَهُم ) তাদের নিজেদের (মুমিন) মধ্যে সহৃদয় । 382

অতএব ,সালামের সাথে অভিসম্পাত ও লানত অবশ্যই থাকতে হবে ।383 আল্লাহর মনোনীত ব্যক্তিদের অভিভাবকত্ব ও কর্তৃত্বকে মেনে নেওয়ার সাথে ইসলামের শত্রুদের প্রতি ঘৃণা ও বিকর্ষণ থাকতে হবে ।

ক্রন্দন ও শোক প্রকাশ

48 নং প্রশ্ন : হোসাইনী সংস্কৃতিতে ক্রন্দন করার মর্যাদা কী পরিমাণ যে ,এর ওপর এত বেশি গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে ?

উত্তর : প্রথমে এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করতে হবে যে ,এ অস্তিত্বজগতে অনেক রহস্য রয়েছে এবং মানুষ এ সম্পর্কে জানে না । কিছুসংখ্যক ব্যক্তি তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতার কারণে এ জগতের বাহ্যিক দিকের প্রতিই শুধু লক্ষ্য করে এবং কখনই চিন্তা করে না যে ,এর বাহ্যিক দিকের বাইরেও গভীর গুরুত্বপূর্ণ ও মর্যাদাবান বিষয় লুকিয়ে রয়েছে । ক্রন্দন এরকমই একটি বিষয় ।

অনেকে মনে করে যে ,ক্রন্দন এমন একটি বিষয় যা শুধু মানুষের দুঃখণ্ডকষ্ট ও অনুভূতির সাথে সম্পৃক্ত । অনেকে ক্রন্দনকে উপহাস করে ও একে মানুষের প্রতিক্রিয়াশীলতার চিহ্ন হিসেবে মনে করে । আরেক শ্রেণি সমালোচনার সাথে বলে : ক্রন্দন প্রাণহীনতা ও নিষ্ক্রিয়তা ছাড়া অন্য কিছু নিয়ে আসে না । অথচ আজকের পৃথিবী প্রাণচাঞ্চল্য ,উৎসাহ-উদ্দীপনা ও খুশির পৃথিবী । বর্তমান মানুষ আনন্দ চায় ,চোখের পানি চায় না ।

আশা করি ,এ বিষয় সম্পর্কে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংক্ষেপে আলোচনার মাধ্যমে ক্রন্দনের বাস্তবতা ও মর্যাদা সম্পর্কে শিয়াদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিষ্কার হবে ।

ক. ক্রন্দনের শ্রেণি

ক্রন্দনের বিভিন্ন শ্রেণি ও ধরন রয়েছে ;এর মধ্য হতে গুরুত্বপূর্ণ ধরনগুলো নিম্নে সংক্ষেপে বর্ণিত হলো :

1. ভয়ের ক্রন্দন : এ ধরনের ক্রন্দন সাধারণত শিশুরা করে থাকে । প্রকৃতপক্ষে শিশুরা এর মাধ্যমে তাদের ভয়ের প্রকাশ ঘটায় ।

2. সহানুভূতি পাওয়ার ক্রন্দন : এ ধরনের ক্রন্দন দুই শ্রেণির : প্রথমত ,প্রকৃতিগত যা অত্যন্ত প্রভাবসম্পন্ন ও উদ্দীপক ,যেমন শিশু ও বাচ্চাদের পিতা-মাতা হারানোর ক্রন্দন । দ্বিতীয়ত ,কৃত্রিম অর্থাৎ বাহ্যিক কান্নার মাধ্যমে অন্যকে বিশ্বাস করাতে চায় যে ,তার মনে দুঃখ ও কষ্ট রয়েছে ।

3. দুঃখ ও শোকের ক্রন্দন : এই ক্রন্দন তার অন্তর জগতের শোকের ছায়ার প্রতিফলনস্বরূপ । এ ধরনের ক্রন্দনের ভালো দিক হচ্ছে তার অন্তর ভারাক্রান্ত Í অবস্থা থেকে মুক্তি পায় । এ কারণেই এর পরে মানুষ প্রশান্তি অনুভব করে ।

4. আনন্দের ক্রন্দন : এ ধরনের ক্রন্দন নরম মন থেকে উৎপত্তি ঘটে যা কোন বিষয়ে দীর্ঘ সময়ের নিরাশা ও হতাশার পর প্রকাশ পায় ।

5. তাকওয়া ও আত্মিক উন্নয়নের ক্রন্দন : এ ধরনের ক্রন্দন বিশেষ করে ঈমানদার নারী-পুরুষদের আল্লাহর নিকট নিজের অক্ষমতা প্রকাশ ,তওবা ও অনুশোচনা ,ভারাক্রান্ত অবস্থা ও প্রেমের প্রকাশ । এ ধরনের ক্রন্দন অন্তরের পরিচ্ছন্নতা ও আল্লাহর নৈকট্যের পরিবেশ সৃষ্টি করে ।

তাকওয়া ও আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনের অশ্রু যদি অন্তরের অন্তস্থল থেকে হয় ও তা মানুষের গাল বেয়ে গড়িয়ে পরে তাহলে সে আল্লাহর নেক দৃষ্টি আকৃষ্ট করতে পেরেছে এবং তার মধ্যে তাঁর রহমত লাভের মর্যাদাকর ক্ষেত্র সৃষ্টি হয়েছে ।

যদি মেঘ ক্রন্দন না করে তবে ঘাস কখন হাসে

যদি বাচ্চা ক্রন্দন না করে তবে মায়ের দুধ কখন আসে

এক দিনের বাচ্চাও জানে এ পদ্ধতি

ক্রন্দন করবে যেন এসে পৌঁছায় ধাত্রী বন্ধু

তুমি জান না যে ,ধাত্রীদের ধাত্রী (আল্লাহ)

কম সময়ই ক্রন্দন ব্যতীত তার দুধ বিনামূল্যে দান করে

বললেন : সুতরাং তারা যেন অধিক ক্রন্দন করে বাক্যটি মনোযোগ দিয়ে শোন

(যদি অধিক ক্রন্দন কর) ফলে সৃষ্টিকর্তা দয়ার দুধ দেবেন ঢেলে । 384

এই ক্রন্দনের জন্য বিভিন্ন কারণ বর্ণনা করা হয়েছে :

5-1. গুনাহ থেকে অনুশোচনা : কিছু ক্ষেত্রে মুমিনদের ক্রন্দন যে সকল গুনাহ করেছে সেগুলো থেকে অনুশোচনার কারণে হয়ে থাকে । এ ধরনের অশ্রুপাতের ফলে মানুষ তার মন্দ কাজে অনুশোচিত হয় ,এ কাজ থেকে বিরত থাকার জন্য দৃঢ় সংকল্প করে । যেভাবে ইমাম আলী (আ.) বলেন : সৌভাগ্যবান ঐ ব্যক্তি যে প্রভুর আনুগত্যের দিকে প্রত্যাবর্তন করল ও তার গুনাহসমূহের কারণে ক্রন্দন করল । 385

যদি দয়ার কাবার নিকট ঝাঁপিয়ে পড়তে না পার

দুদর্শা থেকে রক্ষাকারীর (আল্লাহর) নিকট দুর্দশা বর্ণনা কর ।

শক্তিশালী ক্রন্দন ও বিলাপ হচ্ছে মূলধন

ধাত্রীমাতার (আল্লাহর) সর্বজনীন রহমত অধিকতর শক্তিশালী

ধাত্রীমাতা ও মাতা অজুহাত খুঁজতে থাকে

কখন তাদের শিশু ক্রন্দন করবে ।

সে-ই তোমাদের চাহিদার শিশুকে সৃষ্টি করেছে

যাতে ঐ শিশু ক্রন্দন করলে তাঁর (করুণার) দুধের হয় সৃষ্টি ।

বলল : আল্লাহকে ডাক ,বিলাপহীন হয়ো না

যাতে তার (আল্লাহর) দয়ার দুধ উথলে ওঠে ।386

5-2. আল্লাহর দিকে চূড়ান্ত প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে অস্পষ্টতার অনুভূতি : আল্লাহর বুদ্ধিমান প্রেমিকরা সবসময় নিজেকে বিপদের মধ্যে দেখতে পায় ও চিন্তায় থাকে ভবিষ্যতে কী হবে ? কীভাবে তারা তাদের উদ্দেশ্যে পৌঁছবে ? কী অবস্থায় প্রভুর সামনে হাজির হবে ? চিরন্তন উপাস্যের কাছে পৌঁছানোর জন্য নাফ্স ও শয়তানের প্রতারণা থেকে মুক্ত রয়েছে কি ? আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের ক্ষেত্রে এ ধরনের অস্পষ্ট অনুভূতির ফলে তারা ক্রন্দন করে ? ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এ কারণে মুনাজাতের অংশবিশেষে এ বিষয়টি বর্ণনা করেন :

و ما لی لا ابکی و لا ادری إلی ما یکونو مصری و أری نفسی تخادعنی و ایامی تخاتلنی، و قد خفقت عند رأسی اجنحه الموت ، فمالی لا أبکی، أبکی لخروج نفسی، أبکی لظلمه قبری ابکی لضیق لحدی...

আমার কী হয়েছে যে ,আমি ক্রন্দন করছি না ,যখন আমি জানি না আমার চলার পথ কোন্ দিকে ;আমি দেখছি কুপ্রবৃত্তি আমাকে ধোঁকা দেয় এবং আমার (জীবনের) দিনগুলো আমার সাথে প্রতারণা করে এমন অবস্থায় যখন মাথার ওপর মৃত্যুর ডানা আমাকে দিশাহারা করে দিয়েছে । আমার কী হয়েছে যে ,তারপরও আমি ক্রন্দন করছি না ,আমি ক্রন্দন করি আমার দেহ থেকে আত্মা আলাদা হওয়ার জন্য ,ক্রন্দন করি কবরের অন্ধকারাচ্ছন্ন অবস্থার জন্য ,আমি ক্রন্দন করি আমার কবরের সংকীর্ণতার জন্য... 387

5-3. উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভালোবাসার ক্রন্দন : প্রভুর প্রকৃত প্রেমিকরা কেবল তাঁকেই তাদের প্রেমিক মনে করে । কিছু ক্ষেত্রে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার উৎসাহে ক্রন্দন করে ,যখন কেউ বন্ধু ও প্রেমাস্পদের নিকট থেকে দূরে থাকা ও বিরহের কারণে উদ্বেলিত থাকে । এ ধরনের ক্রন্দন বন্ধু ও কাঙ্ক্ষিত পবিত্র সত্তা থেকে দূরে থাকা ও তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ঘটে থাকে ।

বিচ্ছেদের দুঃখে আমার দু চোখ বেয়ে রক্ত অশ্রু ঝরিয়েছি

কী করব ,এগুলো (আল্লাহর সাথে) পরিচিতির কল্যাণের ফুল ।388

5-4. আল্লাহর মর্যাদার ভয়ে ক্রন্দন : এ ভীতি মানুষের জ্ঞান থেকে উৎসারিত ও মহান আল্লাহর পরিচিতি ও মর্যাদাকে অনুধাবনের কারণে তাদের মনে এরূপ ভয়ের সৃষ্টি হয় । এ ভীতির পর্যায় মহান আল্লাহর মর্যাদাকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে খোদাকাঙ্ক্ষী নর-নারীদের অবস্থার ওপর নির্ভর করে ;যে আল্লাহর মর্যাদাকে যতটা চেনে তার মধ্যে তাঁর ভয়ে ক্রন্দন তত তীব্র হয় ।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন : কিয়ামতের দিনে প্রত্যেক চোখ ক্রন্দনরত অবস্থায় থাকবে কেবল ঐ চোখ ছাড়া যে চোখ আল্লাহর নিষিদ্ধ কর্ম থেকে নিজেকে দূরে রাখে ,যে চোখ আল্লাহর আনুগত্যের কারণে রাত্রি জাগরণ করে এবং যে চোখ গভীর রাতে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করে । 389

5-5. প্রকৃত বন্ধুদেরকে হারানোর কারণে ক্রন্দন : যেহেতু কোরআন ও রেওয়ায়াতের দৃষ্টিতে আল্লাহর প্রিয় বন্ধুরাই হচ্ছে প্রকৃত বন্ধু ,তাই তাদের প্রতি ভালোবাসার অর্থ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ।390 পৃথিবী থেকে এ ধরনের বন্ধুদের বিদায়ের কারণে ঐশী মানবরা ক্রন্দন করে থাকেন । তাঁদের এ ক্রন্দন প্রকৃতপক্ষে চিরন্তন প্রেমিক আল্লাহ ও তাঁর পরের পর্যায়ে পরিপূর্ণ মানবদের থেকে দূরে থাকার কারণে ঘটে থাকে ।

এ মুহব্বত ও ভালোবাসা অন্যান্য মুহব্বত ও ভালোবাসা থেকে ভিন্ন ;

আল্লাহর প্রেমিকদের প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা অভিন্ন ।

ইমামদের একে অপরের জন্য ক্রন্দন ,স্বীয় চাচা হামযা ও স্ত্রী খাদিজা (আ.).এর মৃত্যুতে রাসূল (সা.)-এর ক্রন্দন এ ধরনেরই ছিল ।

5-6. সত্যপন্থীদের বৈশিষ্ট্য ও পূর্ণতার গুণাবলি নিজের মধ্যে না থাকার কারণে ক্রন্দন : যখন খোদাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিরা একজন পরিপূর্ণ মানুষের পূর্ণতা ও গুণাবলি নিয়ে চিন্তা করে এবং নিজের মধ্যে এর অভাব লক্ষ্য করে তখন তারা ক্রন্দন করে । এর ফলে তারা ঐ পূর্ণতা ও বৈশিষ্ট্যগুলো অর্জনের জন্য চেষ্টা করে ।

পানশালার কোনায় ক্রন্দন করলাম ও লজ্জিত হলাম

আমার নিজের অর্জনের (ভুল ও অন্যায়ের) কারণে লজ্জিত হলাম ।

ইমাম সাজ্জাদ (আ.)-এর দোয়ার অংশ এ ধরনের ক্রন্দনের কারণ নির্দেশ করে :

واعنی بالبکاء الی نفسی فقد افنیت با التسویف و الآمال عمری

(হে আল্লাহ) আমাকে আমার নিজের জন্য ক্রন্দনে সাহায্য কর ,যখন তওবাকে পিছিয়ে দিয়ে (গুনাহ করে পরে তাওবা করব এ ভেবে) ও (দুনিয়াকে পাওয়ার) দীর্ঘ আশা করে আমার জীবনকে ধ্বংস করেছি । 391

খ. মূল্যবোধের ক্রন্দন : যদিও অন্য ধরনের ক্রন্দনের ক্ষেত্রে কোন নিষেধ নেই ,কিন্তু কোরআন ও রেওয়ায়াতের শিক্ষায় যে ক্রন্দনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তা হচ্ছে আল্লাহর ভয়ে ও আত্মার উৎকর্ষ সাধনের জন্য ক্রন্দন । এ ক্রন্দনের দু টি দিক রয়েছে । যার এক দিকে অন্তর্জ্বালা অপর দিকে শান্তি ,আনন্দ ,খুশি ও সম্মান392 এবং এক দিকে দুঃখবোধ ,অন্তরের অস্থিরতা ,অন্যদিকে খুশি ,পবিত্র অনুভূতি ও প্রত্যক্ষ দর্শনের আনন্দ ।393

দুঃখে খুশি হও ;কেননা ,দুঃখ (প্রেমিকের সাথে) সাক্ষাতের ফাঁদ ।

এ পথেই ঘটে নিম্ন থেকে উচ্চে আরোহন ।

কারো দুঃখ হচ্ছে রত্ন এবং তোমার দুঃখ হচ্ছে খনির মতো ।

কিন্তু কে যে এই খনিতে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে ।394

আত্মিক ক্রন্দনের এক দিকে ক্রন্দন হলেও এর অপর দিক হলো উপাস্যের নিকটবর্তী হওয়া ।395

হে হাফিজ! যদি তাঁর সাথে সাক্ষাতের রত্ন পেতে চাও

তবে চোখের সাগরকে পানি দিয়ে ভরে তাতে ডুব দাও ।

কোরআন ও রেওয়ায়াতের দৃষ্টিতে এ ধরনের ক্রন্দন নিম্নলিখিত বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন :

প্রথমত ,এ ক্রন্দনের উৎস হলো বোধশক্তি ও অনুধাবন ক্ষমতা অর্থাৎ আত্মিক বিকাশের ক্রন্দনের উৎপত্তি ঘটে অনুধাবন ক্ষমতা থেকে । এটা অনুকরণ ও ধারণা থেকে সৃষ্টি হয় না ।

মুমিনের ক্রন্দন অত্যধিক মূর্খ ,অন্ধ অনুকরণকারী ও সন্দেহপরায়ণ ব্যক্তির ক্রন্দনের মতো নয় ।

তুমি এ (মুমিনের) ক্রন্দনের সাথে ঐ (মূর্খের) ক্রন্দনের তুলনা কর না ।

এ ক্রন্দনের থেকে ঐ ক্রন্দনের পথের দূরত্ব অনেক ।396

কোরআনে বর্ণিত হয়েছে : বল : তোমরা কোরআনে বিশ্বাস কর বা বিশ্বাস না কর ,যাদেরকে এর পূর্বে জ্ঞান দেওয়া হয়েছে যখন তাদের নিকট কোরআন পাঠ করা হয় তাখন তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে । তারা বলে : আমাদের প্রতিপালক পবিত্র ,মহান । আমাদের প্রতিপালকের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হবেই 397

এ আয়াতগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে ,যদি কোন ব্যক্তি উচ্চতর জ্ঞান ও অনুধাবনক্ষমতার অধিকারী হয় তাহলে কোরআনের আয়াত শ্রবণ করে এর প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে । এমতাবস্থায় প্রভুর সামনে উপস্থিত হয়ে স্বীয় মস্তককে মাটিতে অবনত করে এবং অন্তর্জ ¡ালা সহকারে ক্রন্দন করে এ আশাতে যে ,তার এ অশ্রু আল্লাহর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে ও আল্লাহর রহমত লাভ করবে । সুতরাং যাদের অন্তর্জ্বালা ও চোখের অশ্রু নেই তারা এর অর্থ অনুধাবন করে না ।

পানি বায়ুমণ্ডলে স্থির থাকে না

কারণ ,ঐ বায়ুম-ল তৃষ্ণার্ত ও পানি শোষণকারী না । 398

উদাহরণস্বরূপ ,যে ব্যক্তি গুনাহের প্রকৃত রূপ ও অবস্থা সম্পর্কে জানে না তার অন্তরে তা কী ধরনের বিরূপ প্রভাব ফেলে যে ,সে ব্যক্তি সহজেই গুনাহ করে । এই গোনাহের ফলে তার হৃদয় কঠোর হয়ে যায় এবং এরূপ কঠোর হৃদয় কখনই ¯ষ্টার থেকে দূরে থাকার ও গোনাহের অনুশোচনার অন্তর্জ্বালা ও কষ্ট অনুভব করে না । ফলে এ ব্যক্তি কোন দিন ক্রন্দনও করে না । এ কারণে রেওয়ায়াতে এসেছে যে ,অশ্রুশূন্য চোখ নির্দয় ও নিষ্ঠুর হৃদয়ের প্রমাণ বহন করে ।399

দুঃখজনক হলেও সত্য যে ,এ ধরনের পরিণতির মূলে রয়েছে অজ্ঞতা ও মূর্খতা ।

যতক্ষণ পর্যন্ত অবাধ্য গুনাহগার নিজের সম্পর্কে জানে না

কিভাবে জানবে তার চোখের পানি কোথায় বর্ষিত হতে হবে ? 400

দ্বিতীয়ত ,ক্রন্দন নাফ্সের বিরুদ্ধে জিহাদের মূলধন । মানুষের অভ্যন্তরীণ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অস্ত্র অনুশোচনা ও ক্রন্দন । যেমনভাবে হযরত আলী (আ.) দোয়ায়ে কুমাইল-এ বলেছেন :

و سلاحه البکاء তার অস্ত্র হলো ক্রন্দন ।

আল্লাহ তা আলা এই কার্যকরী অস্ত্র সবাইকে দান করেছেন । কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো এর প্রকৃত মর্যাদা সম্পর্কে আমরা জানি না ।

তৃতীয়ত ,ঐশী নেয়ামত ও অনুগ্রহের ক্রন্দন । আল্লাহ তা আলা কোরআনে বলেছেন : এরা তারাই ,নবীদের মধ্যে যাদেরকে আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন ,আদমের বংশ হতে ও যাদেরকে আমরা নূহের সাথে (নৌকায়) আরোহণ করিয়েছিলাম এবং ইবরাহীম ও ইসমাঈলের বংশধর ও যাদের আমরা পথপ্রদর্শন ও মনোনীত করেছিলাম ;যখন তাদের নিকট দয়াময় আল্লাহর কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করা হয় তারা ক্রন্দনরত অবস্থায় সিজদায় লুটিয়ে পড়ে । 401

আল্লাহ তা আলা এ আয়াতে অন্তর্জ্বালা ও ক্রন্দনকে রাসূলদের লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্যের মধ্যে গণ্য করেছেন যাঁরা সত্যিকারের খোদাপ্রেমিকদের শিক্ষা দানকারী ।

অন্তর্জ্বালা ,প্রবহমান অশ্রু ,শেষ রাতের আহ ও আফসোস ।

এগুলো সবই তোমার দয়া ও অনুগ্রহেই হয়েছে ।402

চতুর্থত :ক্রন্দন ,বান্দার ঐশী হওয়ার চিহ্ন

আল্লাহ তা আলা বলেন : এবং যখন তারা এই রাসূলের প্রতি অবতীর্ণ বাণী শ্রবণ করে তখন যতটুকু সত্য উপলব্ধি করেছে তার কারণে তাদের চোখ থেকে অশ্রু ঝরতে থাকে । 403

পঞ্চমত : ক্রন্দনকারীর অন্তর আনন্দিত ও খুশি

মূল্যবোধের ক্রন্দন আল্লাহর গোপন রহস্যের অন্তর্ভুক্ত যার একদিকে রয়েছে পোড়ানো ও আগুন ,কিন্তু অপর দিকে রয়েছে আনন্দ ,খুশি ,উপভোগ ও আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ ।404

(দগ্ধ হৃদয়) আগুনকে পানির রূপ দান করেছে

আগুনের মধ্যে থেকে ঝরনা প্রবাহিত করেছে ।405

এক পাশে দুঃখ ,মানসিক অস্থিরতা ও অশ্রুর বর্ষণ এবং অপর পাশে অন্তরের খুশি ।

দুঃখের ধুলা মুছে যাবে ,তোমার অবস্থার উন্নতি হবে হাফিজ

এ পথে অশ্রু ঝরাতে কার্পণ্য কর না ।

গ. রেওয়ায়াতে মূল্যবেধের ক্রন্দন : মূল্যবোধের ক্রন্দন যা আত্মিক উৎকর্ষ ,তাকওয়া ও মানবিক উন্নতির ক্রন্দন নামে অভিহিত তার মূল্য বিভিন্ন রেওয়ায়াত ,বিশেষ করে নিম্নলিখিত হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট হয় :

1. ইমাম সাদিক (আ.) বলেন : বান্দার জন্য তার প্রভূর সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থা হলো ক্রন্দনের সাথে সিজদারত অবস্থা । 406

2. ইমাম বাকির (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন : আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় অশ্রুর ফোঁটা হলো যা আল্লাহর ভয়ে রাতের অন্ধকারে ঝরে এবং তাঁকে ছাড়া অন্য কিছু চায় না । 407

3. মাফাতিহুল জিনান -এ বিশ্বাসীদের নেতা আলী (আ.)-এর যিয়ারতের শেষে আমরা এ দোয়াটি পড়ি :

وأعوذ بک من قلب لا یخشع و من عین لا تدمع

হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন এক অন্তর থেকে যা কখনই ভয় করে না এবং এমন চোখ থেকে যা কখনই ক্রন্দন করে না । 408

4. রোযার মাসের দোয়াতে যেভাবে রয়েছে :

واعنی بالبکاء علی نفسی

আমাকে আমার জন্য ক্রন্দনে সাহায্য করুন । 409

5. ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন : ক্রন্দন করার জন্য যদি তোমাদের চোখে পানি না আসে তাহলে তুমি মনে কান্নার ভাব (দুঃখপীড়িত অবস্থায় থাকার অনুভূতি) সৃষ্টি কর । 410

49 নং প্রশ্ন : ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করার নির্দেশবাহী কিছু রেওয়ায়াত বর্ণনা করে ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দনের দর্শন সম্পর্কে বলুন ?

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করার বিশেষভাবে বর্ণিত কিছু রেওয়ায়াত হলো :

1. মাসুম ইমাম (আ.) বলেছেন : সকল চোখ কিয়ামতের দিন কঠিন অবস্থার কারণে ক্রন্দনরত অবস্থায় থাকবে শুধু ঐ চোখ ব্যতীত যে চোখ ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করেছিল ;ঐ চোখ (ঐ দিন) হাস্যোজ্জ্বল ও উৎফুল্ল থাকবে । 411

2. ইমাম রেযা (আ.) বলেন : ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন কবীরা গুনাহকে মুছে দেয় । 412

3. ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন : যদি ইমাম হোসাইনের স্মরণে মাছির ডানা পরিমাণ পানি কোন ব্যক্তির চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে ,এর পুরস্কার দেওয়ার দায়িত্ব আল্লাহর এবং আল্লাহ তার জন্য পুরস্কার হিসেবে বেহেশ্ত ছাড়া অন্য কিছুতে সন্তুষ্ট হবেন না । 413

4. মাসুম ইমাম (আ.) বলেছেন : যদি কোন ব্যক্তি ইমাম হোসাইন (আ.)-এর মুসিবতে নিজে কাঁদে এবং অন্যকে কাঁদায় অথবা দুঃখিত ও মর্মাহত অবস্থায় থাকে তাহলে বেহেশ্ত তার জন্য ফরজ হয়ে যাবে ।

5. ইমাম রেযা (আ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : হে শাবিবের সন্তান! কোন কিছুর জন্য যদি কাঁদতে চাও তাহলে হোসাইন ইবনে আলীর জন্য কাঁদ ;কারণ ,যেভাবে ভেড়া জবাই করা হয় সেভাবে তাঁকে জবাই করা হয়েছে । হে শাবিবের সন্তান! ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য যদি এমনভাবে কাঁদ যাতে তোমার গাল বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে-তা অল্প বা বেশি-আল্লাহ তোমার সকল সগীরা ও কবীরা গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন । 314

ইমাম হোসাইন (আ.)-এর হৃদয়বিদারক ঘটনার স্মরণে ক্রন্দনের আরো কিছু দর্শন বর্ণিত হয়েছে যেগুলো এর প্রকৃত দর্শন নয় । এদের মধ্যে নিম্নে কিছু নমুনা তুলে ধরা হলো :

ক. ক্রন্দন মৌলিক দৃষ্টিতে ভালো এবং মানুষের অন্তরকে পরিশোধিত করে (যদি তা আল্লাহকে পাওয়ার আশা ,গুনাহর অনুশোচনা অথবা আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও ওলিদের বিচ্ছেদ ও বিরহে ঘটে) ;তবে ইমাম হোসাইনের শোকানুষ্ঠানে অন্তরের পরিশোধন অধিক পরিলক্ষিত হয় ।

খ. ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন হলো (ইসলামের রক্ষায় তাঁর অবদানের প্রতিদানস্বরূপ) তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ;তবে একমাত্র ক্রন্দনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা সব ক্ষেত্রে সঠিক নয় । কেননা ,ইমাম হোসাইনের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য যদি ক্রন্দন ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকত ,তবে তা করা সঠিক হতো । কিন্তু তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের অন্য পথও তো রয়েছে । তাছাড়া এ ধরনের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতি ইমাম হোসাইনের কোন প্রয়োজন আছে কি ?

গ. ইমাম হোসাইন (আ.) আমাদের ক্রন্দন ও শোক প্রকাশ থেকে উপকৃত হন ;ক্রন্দন ও শোক প্রকাশের মাধ্যমে যেভাবে আত্মিকভাবে উৎকর্ষ অর্জন করতে পারি তেমনিভাবে ইমামের স্মরণের ফলে তাঁর মর্যাদাও বৃদ্ধি পায় ।

ঘ. সওয়াব ও শাফায়াত লাভ করা ।

উল্লিখিত দর্শনগুলো যদিও রেওয়ায়াত ও বিশেষ বিশ্লেষণ অনুযায়ী একটা পর্যায় পর্যন্ত সঠিক ,কিন্তু ক্রন্দনের ক্ষেত্রে এর চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ দর্শন চিন্তা করা সম্ভব নয় কি ? যদি তা সম্ভব হয় তাহলে কেন ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দনের দর্শনকে শাফায়াত ,সওয়াব ,কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ করব ?

ইমামের জন্য ক্রন্দনের দর্শন হিসেবে আত্মিক উৎকর্ষ ও তাকওয়া বৃদ্ধির যে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়েছে তা ছাড়াও এর আরো দু টি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক দর্শন রয়েছে । এ দু টি মৌলিক দর্শন তার স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রভাব রাখে ।

নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে : প্রথমত এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ,শিয়া সংস্কৃতিতে মূল্যবোধের ক্রন্দন প্রথমত এমন এক ক্রন্দন যার ফলে অন্তরের

উৎকর্ষ সাধিত হয় । দ্বিতীয়ত ,এ ক্রন্দনের উৎস হলো জ্ঞান । ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দনকারী ব্যক্তি আল্লাহ তা আলার সত্যিকারের প্রেমিককে-যিনি আল্লাহর সিফাতের (সকল পূর্ণতার গুণের বহিঃপ্রকাশ ছিলেন)-হারানোর (ও তাঁর কল্যাণকর প্রভাব থেকে বঞ্চিত হওয়ার) শোকে কাঁদে । মুমিনদের মাঝে তাঁর উপস্থিতি ঐশী সুবাস ছড়াতো ,তাঁর দর্শন ও সান্নিধ্য আল্লাহর কথা স্মরণ করিয়ে দিত । এক্ষেত্রে মুমিনরা ঐশী (গোলাপের) সুগন্ধ তাঁর (গোলাপ জলস্বরূপ) ওলি থেকে পেত ।

যেহেতু ফুলের মৌসুম চলে গেছে এবং ফুলের বাগান নষ্ট হয়েছে

সেহেতু গোলাপের ঘ্রাণ গোলাপজল থেকে নিই ।

মহান ইমাম (আ.) ও তাঁর সঙ্গী-সাথিদের মর্যাদা এবং নিজের অপূর্ণতার কথা চিন্তা করে এ আত্মিক উৎকর্ষ থেকে বঞ্চিত থাকা ও পিছিয়ে পড়ার কারণে ক্রন্দন করে । ক্রন্দন এজন্য যে ,হাবিব ইব্নে মাজাহের কী ছিলেন এবং আমি কে ? আমার কী মর্যাদা রয়েছে ? আলী আকবর (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করা হচেছ নিজের জন্য ক্রন্দন করা অর্থাৎ ঐ সাহসী ও নৈতিক গুণসম্পন্ন যুবকের কী পরিমাণ পূর্ণতা ছিল এবং আমার কী পরিমাণ অপূর্ণতা রয়েছে ,তা ভেবে দেখা । এ দুয়ের ব্যবধানের স্মরণ করে ক্রন্দন করা (কারণ ,এ ব্যবধানই আমাদেরকে তাঁদের থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে) ।415

যদিও আমাদের ক্রন্দন এ ধরনের উৎসমূল থেকে অনেক দূরে ,কিন্তু আমাদের অবশ্যই চেষ্টা করা উচিত মনের আকুতি ও আফসোসকে এ দিকে পরিচালিত করা । এর ফলে আমাদের ওপর আল্লাহর রহমত বর্ষিত হবে । বাস্তবে এ ক্রন্দন দুঃখণ্ডকষ্ট প্রকাশের জন্য-যা মানুষকে সামনে এগিয়ে যেতে বাধ্য করে যার ফলে সে ঐ মাত্রার পূর্ণতায় পৌঁছায় । এ ধরনের ক্রন্দন মানুষের পূর্ণতাদানকারী ক্রন্দন ।

সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে : যদি আবু আবদিল্লাহ (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন অন্তর্দৃষ্টি ,জ্ঞান এবং নৈতিক কারণে হয় তাহলে নিশ্চিতভাবে এ মর্মপীড়া মানুষের মনে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সামাজিক পরিবর্তনের

পরিবেশ সৃষ্টি করবে । ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন যখন অন্তরের উৎকর্ষ সাধনের জন্য হয় তখন মানুষ তার ব্যক্তিগত ও নৈতিক অবস্থা নিয়ে চিন্তা ও পর্যালোচনা করে । অন্তর জগতে এ ধরনের পরিবর্তন পরিণতিতে ইসলামের মহান উদ্দেশ্যের পথে কাঙ্ক্ষিত সমাজ গঠনের ক্ষেত্র সৃষ্টি করবে ।

যখন মানবজাতি অনুধাবন করবে যে ,হযরত আবু আবদিল্লাহ কেন এবং কিভাবে আন্দোলন শুরু করেছিলেন এবং কিভাবে রক্তের কালি দিয়ে ইতিহাসের পাতায় চিরন্তন বাণী অঙ্কিত করেছেন তখন এরূপ জ্ঞান-উৎসারিত ক্রন্দন মানুষের অন্তরে এমন পরিবর্তন আনে যা ব্যক্তির গণ্ডি পেরিয়ে সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে এবং সমাজকে প্রভাবিত করে । তখন সে চেষ্টা করে সমাজ থেকে ফ্যাসাদ ও পথভ্রষ্টতা দূর করতে ,দ্বীনের মধ্যে বিকৃতি রোধ করতে এবং স্বাধীনতা ,পৌরুষ ,ধার্মিকতাকে শুধু ব্যক্তি জীবনে নয় ,সামাজিক জীবনেও প্রতিষ্ঠিত করতে ।

অন্য ভাষায় ,ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন পরোক্ষভাবে তাঁর আদর্শ রক্ষা ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে । এ কারণে বলা যায় ,ইমামের জন্য ক্রন্দনের অন্যতম দর্শন হলো তাঁর প্রতিষ্ঠিত আদর্শের ভিত্তিতে সমাজ গঠন করা । ইমাম হোসাইন সম্পর্কে প্রচলিত ও প্রসিদ্ধ এ বাক্য- ইসলামের শুরু মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে এবং এর স্থায়িত্ব হোসাইন (আ.)-এর মাধ্যমে -এর অর্থ এ রকমই ।

ইসলাম ,বিশেষ করে শিয়া আদর্শ ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দনের মাধ্যমে টিকে আছে ।

50 নং প্রশ্ন : ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য শোক পালন এবং মর্সিয়া পাঠের সময় কী করলে আমাদের অন্তর বিগলিত হবে ও আমরা ক্রন্দন করব ?

উত্তর : প্রথমত ,মর্সিয়া পাঠের সময় দুঃখিত ও মর্মাহত হওয়ার অনুভূতি সৃষ্টি হওয়া মূল্যবান একটি বিষয় । বিভিন্ন রেওয়ায়াতে যেভাবে বর্ণিত হয়েছে তা থেকে এ বিষয়টি সুস্পষ্ট হয় ।416

দ্বিতীয়ত ,মূল্যবোধের ক্রন্দনের উৎপত্তিস্থল হলো জ্ঞান । এ কারণে যদি অনুভব করি যে ,মর্সিয়া পাঠ করার সময় ক্রন্দন আসে নি বা চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ে নি ,এমনকি অন্তরও প্রভাবিত হয় নি ও দুঃখবোধ জাগ্রত হয় নি ,তাহলে নিজের মধ্যে আহলে বাইত (আ.) সম্পর্কে জানার ক্ষেত্র সৃষ্টি ও তাঁদের পরিচয়ের জ্ঞানকে বৃদ্ধি ও শক্তিশালী করার জন্য প্রচেষ্টা নিতে হবে এবং এ পথে অন্তরায়গুলো দূর করতে হবে । আরো নিশ্চিত হতে হবে যে ,না কাঁদার পেছনে কোন শারীরিক কারণ আছে কিনা ।

আহলে বাইত সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র সৃষ্টি ও তাঁদের পরিচয়ের জ্ঞানকে বৃদ্ধির জন্য নিম্নলিখিত কাজগুলো করতে হবে :

1. তাঁদের জীবন ইতিহাস পড়া ।

2. তাঁদের বক্তব্য সম্পর্কে জানা ও তা নিয়ে চিন্তা করা ।

3. আল্লাহ-পরিচিতি অর্জন করা। কারণ ,তাঁরা হলেন আল্লাহর গুণাবলির বহিঃপ্রকাশ । আল্লাহ ও তাঁর গুণাবলির পরিচিতি লাভের মাধ্যমে তাঁদের মর্যাদা সম্পর্কে জানা সম্ভব ।417

আমাদের মন্দকর্ম জ্ঞান অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করে । অসৎ ও মন্দকর্ম এবং পুণ্যের প্রতি অনীহা আমাদের অন্তরকে কঠোর ও নির্দয় করে ফেলে ।418 নির্দয় অন্তর আবেগ-অনুভূতিকে অকার্যকর ও আমাদেরকে বুদ্ধিবৃত্তির নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায় । নিম্নে ক্রন্দনের অন্তরায়ের কিছু কারণ তুলে ধরা হলো :

1. অধিক কথা বলা (যিকর ও আল্লাহর স্মরণে মশগুল থাকা ছাড়া) ।419

2. অতিরিক্ত গুনাহ ।420

3. অতিরিক্ত (বস্তুবাদী) আশা-আকাঙ্ক্ষা ।421

4. আমোদ-প্রমোদে ব্যস্ত থাকা ।422

5. ধন-সম্পদ পুঞ্জিভূত করা ।423

6. আল্লাহর ইবাদত ত্যাগ ।424

7. পথভ্রষ্ট ও অত্যাচারী ব্যক্তির সাথে চলাফেরা ও ওঠা-বসা করা ।425

8. হীন ও নীচু শ্রেণির মানুষের সাথে ওঠা-বসা করা ।426

9. অতিরিক্ত হাসি ।427

অন্তরের নির্দয়তা ও হৃদয়ের কঠোরতা দূর করার জন্য রেওয়ায়াতে অনেক বিষয় বর্ণিত হয়েছে । এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি হলো :

1. বেশি বেশি মৃত্যুর কথা স্মরণ ।428

2. উপদেশ শ্রবণ ।429

3. আল্লাহর নিদর্শন ,কিয়ামত ,নিজ অবস্থা সম্পর্কে চিন্তা করা ।430

4. জ্ঞানী ও চিন্তাশীলদের সাথে ওঠা-বসা করা ।431

5. নৈতিক গুণাবলিসম্পন্ন ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের সাথে ওঠা-বসা করা ।432

6. জ্ঞানের বিষয় আলোচনা ও পর্যালোচনা করা ।433

7. দরিদ্র ও অভাবীদের খাওয়ানো ।434

8. ইয়াতিমদের প্রতি ভালোবাসা ।435

9. আল্লাহর স্মরণ ।436

10. আহলে বাইতের ফযিলত ও মুসিবত বর্ণনা ।437

11. কোরআন তেলাওয়াত করা ।438

12. গোনাহের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা (অধিক আসতাগ্ফিরুল্লাহ পড়া) ।439

এ বিষয়গুলোর মধ্য হতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আল্লাহ তা আলার নিকট থেকে অক্ষমের মতো কামনা করব যেন আমাদের চোখে অশ্রু দান করেন । এ জন্য আহলে বাইতকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নির্ধারণ এবং তাঁদের নিকট থেকে সাহায্য কামনা করব ।440

যেহেতু তোমার একাকিত্বের কারণে নিরাশ হয়ে

ছায়ার নিচে সূর্যের সাহায্য কামনা করেছ ।

যাও দ্রুত আল্লাহর সাহায্য কামনা কর ।

যেহেতু এ রকম করেছ আল্লাহ তোমার সাহায্যকারী হবেন । 441

51 নং প্রশ্ন : গুনাহগার ও পাপী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কেবল ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য অশ্রুপাত এবং শোকানুষ্ঠান পালন কোন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে কি ?

শাফায়াত সম্পর্কে প্রকৃত ধারণা এ প্রশ্নের উত্তরকে সুস্পষ্ট করবে । কিছু রেওয়ায়াতে এমন কিছু বিষয় ও কর্মের উল্লেখ আছে যা মানুষকে গুনাহ ,আত্মিক অপবিত্রতা ,দুনিয়ার প্রতি মোহ ও বস্তুনির্ভরতা থেকে মুক্তি দান করে । শাফায়াতের একটি প্রকার হলো আহলে বাইত (আ.) ,বিশেষ করে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করা । রেওয়ায়াত অনুসারে শাফায়াতের গোপন রহস্য হলো সকল মানুষকে-গুনাহগার হোক বা না হোক-রাসূল (সা.) ও পবিত্র ইমামদের সাথে সম্পৃক্তকরণ । এর অর্থ হলো দুনিয়াতে যখন একজনের সাথে কারো আত্মিক সম্পর্ক থাকে ,তাদের দু জনের চিন্তা ,বিশ্বাস ও পথ একই হয় ;জীবনপদ্ধতি একই হয় ;তারা দু জন একে অপরকে চেনে-জানে ও ভালোবাসে তখন তাদের দু জনের মধ্যে অস্তিত্বগতভাবে বাস্তব সম্পর্ক সৃষ্টি হয় ও তাদের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন এক বন্ধনের রূপ নেয় ।

এ কারণে যারা মহানবী (সা.) ও পবিত্র ইমামদের নেতৃত্ব ও বেলায়াতে বিশ্বাস করে ,তাদের অনুসরণ করে ,যথাসম্ভব তাদের উপদেশ অনুসারে আমল করে ,তার চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাস তাঁদের চিন্তা-চেতনা ও বিশ্বাসের নিকটবর্তী (কখনও কখনও সমরূপ ও একীভূত হয়) । এর ওপর ভিত্তি করে তাঁদের প্রতি ভালোবাসা ও জ্ঞান রাখে । এ বিষয়গুলো প্রমাণ করে ঐ ব্যক্তির সাথে মহানবী (সা.) ও পবিত্র ইমামদের আত্মিক সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে । অর্থাৎ তার ও তাঁদের মধ্যে বাতেনী ও রূহের জগতে সম্পর্ক বিদ্যমান এবং অভ্যন্তরীণ ও আধ্যাত্মিকভাবে তাঁরা পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত । মহানবী (সা.) ও ইমাম (আ.)-দের সাথে বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে যার যত বেশি মিল হবে এ সম্পর্কও তত বেশি শক্তিশালী হবে । এর বিপরীত বিষয়টিও সত্য অর্থাৎ যত বেশি অমিল হবে এ সম্পর্কও তত দুর্বল হবে ।

যখন অস্তিত্ব ও সত্তাগতভাবে এ সম্পর্ক সৃষ্টি হয় তখন মহানবী (সা.) ও ইমামদের সাথে তার একাত্মতার সৃষ্টি হয় । গুনাহ ,অপবিত্রতা ও দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা থাকা সত্ত্বেও যেহেতু সে বিশ্বাস ও ভালোবাসার ক্ষেত্রে তাঁদের সাথে ঐক্য স্থাপন করেছে সেহেতু এ বিষয়ে তাঁদের সাথে অস্তিত্বগত এক সম্পর্ক সৃষ্টি করেছে যা কিয়ামতের দিন শাফায়াতের রূপে প্রকাশ পাবে । এ একাত্মতাই তাকে ওপরে টেনে তোলে অর্থাৎ আল্লাহর

সাথে সাক্ষাৎ (রহমত লাভ) ও আযাব থেকে মুক্তি পাওয়ার ক্ষেত্রে সাহায্য করে ।

শাফায়াতের গোপন রহস্য অনুধাবন করলে আমরা বুঝতে পারব যে ,শাফায়াতের উপযুক্ততা লাভের জন্য মানুষের মধ্যে বিশেষ প্রস্তুতি ও আল্লাহর দিকে আকর্ষণ থাকা আবশ্যক । তবেই সে শাফায়াতের উপযুক্ত হয়ে গুনাহ ও দুনিয়ার সাথে সম্পৃক্ততা থেকে মুক্তি লাভ করতে পারে । এ ধরনের প্রস্তুতি কেবল মহানবী (সা.) ও ইমামদের রঙে রঙিন হওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব । এ শাফায়াত কেবল ঐ সকল ব্যক্তির ভাগ্যে জোটে যারা দুনিয়ার জীবনে ঈমানদার ও সৎকর্মশীল ছিল এবং তারা আল্লাহ ,রাসূল ও পবিত্র ইমামদের সত্য অনুসারী হিসেবে একটা পর্যায় পর্যন্ত তাঁর আদেশ পালনকারী এবং চরম অমান্যকারী এবং বিদ্রোহী ছিল না ;তাই আল্লাহ তাদের ব্যাপারে মোটামুটি সন্তুষ্ট ছিলেন ।442

এ কারণে এ ধরনের শাফায়াত সবার ভাগ্যেই জুটবে না । কোন ব্যক্তি যা ইচ্ছা তাই করে অর্থাৎ সব ধরনের অন্যায় করে কেবল আবু আবদিল্লাহ (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন করে বেহেশতে যেতে পারবে না ;তার গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে না । শুধু তাঁর প্রতি লোক-দেখানো ভালোবাসা দেখিয়ে ও ক্রন্দন করে আযাব ,মনের ভয় ,কবরের কঠিন অবস্থা ও মানসিক অশান্তি থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয় । যদিও প্রকৃত ভালোবাসা মানুষকে গুনাহ ও আল্লাহ ছাড়া অন্যের প্রতি ভালোবাসা থেকে অনেক পরিমাণে দূরে রাখে । কিন্তু এ শাফায়াত পাওয়ার জন্য আল্লাহর (ন্যূনতম) সন্তুষ্টি অর্জন ,ঈমান ও সৎকর্মের প্রয়োজন রয়েছে ।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) তাঁর অনুসারীদের চিঠির মাধ্যমে এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন : জেনে রাখ যে ,আল্লাহর কোন সৃষ্টি ,তাঁর নিকটবর্তী কোন ফেরেশতা ,তাঁর কোন প্রেরিত পুরুষ অথবা অন্য কেউ মানুষকে আল্লাহর প্রতি মুখাপেক্ষিতা থেকে মুক্তি দিতে পারে না । সুতরাং যে ব্যক্তি এ ভেবে আনন্দিত যে ,শাফায়াতকারীদের শাফায়াত তার উপকারে আসবে তার উচিত ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর নিকট কামনা করা যেন তিনি তার ওপর সন্তুষ্ট হন । 443

অতএব ,দুনিয়ার প্রতি ভালোবাসা ততটুকুই থাকা বাঞ্ছনীয় যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ না হয় । কারণ ,কারো প্রতি আল্লাহ অসন্তুষ্ট হলে এ ধরনের শাফায়াত অর্জন সম্ভব নয় । যদি কোন ব্যক্তি নিশ্চিন্তে গুনাহ করে ,কিন্তু তার গুনাহের জন্য অনুশোচনা ও বিলাপ করে না ,এমনকি কীভাবে তার গুনাহ থেকে মুক্তি পাবে সে সম্পর্কেও চিন্তা করে না ,শুধু ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শোকানুষ্ঠানে ক্রন্দন করে তাহলে আল্লাহ এ কারণে সন্তুষ্ট হবেন না ;ইমাম (আ.)-এর শাফায়াতও অর্জিত হবে না ।

কিন্তু যদি কেউ তার আত্মিক অপবিত্রতা ও গুনাহের কারণে অনুশোচনা ,অনুতাপ ও বিলাপ করে এবং কীভাবে গুনাহ থেকে মুক্ত হয়ে চিন্তা ,বিশ্বাস ও কর্মের ক্ষেত্রে রাসূল ও ইমামদের সাথে একাত্ম হওয়া যায় তার পথ খোঁজে ও এজন্য চেষ্টাও করে ,যেহেতু তার অন্তরের গভীরে গুনাহ ও অপবিত্রতার প্রতি ঘৃণা রয়েছে এবং ইমামের সাথে বিশ্বাস ,চিন্তা ও আমলের ক্ষেত্রে তার একাত্মতা রয়েছে সেহেতু এ একাত্মতার অনুভূতি তার মনে এক ধরনের আনন্দের সৃষ্টি করবে আর এ বৈশিষ্ট্যই তাকে শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও তাতে অশ্রুবিসর্জনের কল্যাণ থেকে উপকৃত করবে এবং এটিই তার গুনাহের ক্ষমার কারণ হবে ।

যদি আমাদের ইমাম হোসাইনের শাফায়াতের আকাঙ্ক্ষা থাকে তাহলে অবশ্যই তাঁকে ভালোবাসতে হবে ;তাঁর বিশ্বাস ,চিন্তা-চেতনা ,ভালো গুণ ,কর্ম ,আচরণ ও আকঙ্ক্ষার সাথে ঐক্য থাকতে হবে এবং আমরা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করব না । এর থেকে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো আল্লাহ ,যিনি প্রকৃত শাফায়াতকারী ,তাঁর নিকট থেকে কামনা করব যেন তিনি আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট থাকেন এবং তাঁর সন্তুষ্টির ছায়াতলে ইমামের শাফায়াত থেকে উপকৃত হব ।

হে আল্লাহ! তা-ই কর যা তোমাকে মানায়

সব গর্ত থেকে সাপ আমাকে দংশন করছে ।

যদি আমার প্রাণ কঠিন ও হৃদয় লোহার মতো শক্ত না হতো

দুঃখের বিলাপে চোখ দিয়ে রক্ত ঝরত ।

আমার সময় সংকীর্ণ ও আমার নিঃশ্বাস বন্ধের উপক্রম হয়েছে

হে আর্তনাদের সাড়াদানকারী! তোমার ক্ষমতা দিয়ে আমাকে সাহায্য কর ।

যদি এ বারের মতো সাহায্য কর

যা করা উচিত ছিল না তা থেকে তাওবা করছি ।

শেষবারের মতো আমার তাওবা কবুল কর

যাতে চিরদিনের জন্য দৃঢ়তার সাথে তাওবা না করার পথ বন্ধ করতে পারি ।

যদি আরেকবার ইচ্ছাকৃত ভুল করি

তাহলে আমার আহ্বান ও দোয়াকে গ্রহণ কর না । 444

52 নং প্রশ্ন : শিয়া সংস্কৃতি কেন শুধু দুঃখণ্ডমর্মপীড়া ও শোকের সংস্কৃতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ?

উত্তর : প্রথমত ,শিয়া সংস্কৃতিতে অনেকগুলো বড় ঈদ ও আনন্দের অনুষ্ঠান রয়েছে ,যেমন : ঈদুল ফিত্র ও ঈদুল আযহা ,আল্লাহর রাসূল (সা.) ,হযরত ফাতিমা (আ.) ও বার ইমাম (আ.)-এর জন্মদিন ,গাদীরে খুমের ঈদ ,রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াতে (আনুষ্ঠানিক) অভিষেকের ঈদ... । এসব দিনে আনন্দ ও খুশি রয়েছে ।

দ্বিতীয়ত ,যদি শিয়া সংস্কৃতির ধারক ও বাহকরা শোকানুষ্ঠানের মতো করে আনন্দ অনুষ্ঠান পালন না করে তাহলে এ সমস্যা ধারক ও বাহকদের ,শিয়া সংস্কৃতির নয় । এর ধারক ও বাহকরা তাদের দায়িত্ব পালন করেনি ।

তৃতীয়ত ,ইসলামী সংস্কৃতিতে যেভাবে আহলে বাইতের জন্য শোকানুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে তেমনিভাবে আনন্দ অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে । এমনকি রেওয়ায়াতসমূহে বিভিন্ন শব্দ ও বাক্যে অন্যদের খুশি করতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে । আল্লাহর রাসূল (সা.) সকল শিশু ,এতিম ও মুমিনদের খুশি করার আদেশ দিয়েছেন । তিনি সুন্দর একটি হাদীসে বলেছেন : যে ব্যক্তি কোন মুমিনকে খুশি করল সে আমাকে খুশি করল ;যে আমাকে খুশি করল সে আল্লাহকে খুশি করল । 445

চতুর্থত ,শিয়া সংস্কৃতিতে শোকানুষ্ঠান আনন্দ অনুষ্ঠানের চেয়ে বেশি প্রচলিত । এর কারণ হলো আহলে বাইতের ওপর বনি উমাইয়া ও বনি আব্বাসের শাসকগোষ্ঠীর যুলুম-অত্যাচার । এ যুলুমের মাত্রা এত বেশি পরিমাণে ছিল যে ,ইতিহাসে তার নমুনা খুঁজে পাওয়া যাবে না । এ কারণে স্বাভাবিক যে ,ইমামদের ওপর অত্যাচারের ঘটনাসমূহ ও তাঁদের মযলুম (জুলুমের শিকার হওয়া) অবস্থা শোকানুষ্ঠান ,মর্সিয়া ও শোকগাথার মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত ও বর্ণিত হয়েছে । এর বিপরীতে আনন্দ অনুষ্ঠানের সংখ্যা অপেক্ষাকৃত অনেক কম । যেহেতু শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর ওপর যে যুলুম করা হয়েছে তা আন্যান্য ইমামের ওপর আপতিত মুসিবত ও যুলুমের তুলনায় অনেক বেশি ও যুগ যুগ ধরে মানুষের মনে গভীর রেখাপাত করেছে সেহেতু তাঁর শোকের স্মরণ অধিক ও ব্যাপকতর ।

53 নং প্রশ্ন : আনন্দ-খুশি ও উৎফুল্লতার সাথে ধর্মের কোন সম্পর্ক রয়েছে কি ? ধর্ম কি একে শক্তিশালী করে নাকি একে নিরুৎসাহিত ও স্তব্ধ করে ?

উত্তর : ধর্মীয় সূত্র অর্থাৎ কোরআন ,রাসূল (সা.) ও পবিত্র ইমামদের সুন্নাত ও জীবনী থেকে প্রমাণিত হয় যে ,ইসলাম ধর্ম আনন্দ ও খুশির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ । এছাড়াও এ ধর্ম অলসতা থেকে দূরে এবং সজীবতা ও কর্মচাঞ্চল্যের পক্ষে । তবে এ আনন্দ কোন বাড়াবাড়ি পর্যায়ে নয় ;বরং নির্দিষ্ট গণ্ডিতে ভারসাম্যপূর্ণরূপে বিদ্যমান ।

1. ইসলাম ও মানুষের মৌলিক চাহিদাসমূহ : সর্বোত্তম ধর্ম মানব-প্রকৃতি ও এর কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তার ফিতরাতগত চাহিদা পূরণ করে ;তা না হলে এ ধর্ম অনুসারে আমল করা সম্ভব নয় এবং মানুষকে সৌভাগ্যবান করা সম্ভব নয় । ইসলামী শিক্ষা এ প্রকৃতিগত চাহিদার দিকে বিশেষ লক্ষ্য রাখা ও মানুষের ফিতরাতের446 সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার কারণে আরব উপদ্বীপের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রসার লাভ করেছে । আল্লামা তাবাতাবাঈর কথা অনুযায়ী : ইসলাম ,না মানুষের জৈবিক বৈশিষ্ট্যকে অগ্রাহ্য করে এর চাহিদা পূরণ থেকে মানুষকে নিবৃত্ত করে ,না তার সম্পূর্ণ মনোযোগ ও দৃষ্টি বস্তুগত ও জৈবিক চাহিদাপূরণ ও এ দিকটিকে শক্তিশালী করার ওপর নিবদ্ধ করে । না তাকে যে (বস্তু) জগতে সে বসবাস করে তা থেকে আলাদা করে ,না তাকে দ্বীন ও শরিয়তের প্রতি অমুখাপেক্ষী জ্ঞান করে । মানুষ ,দ্বীন ও দুনিয়া-এই ত্রিভুজের তিন কোণকে অঙ্কিত করে ;মানুষ ত্রিভুজের এ সীমানার মধ্যে কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতা অর্জন করে এবং চিরস্থায়ী সৌভাগ্যে পৌঁছায় । যদি ত্রিভুজের তিন কোণের কোন একটি না থাকে ও গুরুত্ব কমে যায় তাহলে মানুষ পতনের সম্মুখীন হয় এবং মনুষ্যত্বের সর্বোচ্চ সীমা থেকে ধ্বংসের গহ্বরে পৌঁছে যায় । 447

2. আনন্দ ও খুশির প্রয়োজনীয়তা : খুশি ও আনন্দকে বিভিন্ন সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে । যেমন :

ক. ইতিবাচক অনুভূতি-যা বিজয়ের সন্তুষ্টির অনুভূতি থেকে অর্জিত হয় ।448

খ. দুঃখ ও বেদনা ছাড়া সার্বিক আনন্দ উপভোগকে খুশি বলা হয় ।449

গ. আনন্দ ও খুশি আত্মিক অবস্থাকে বলা হয় যা মানুষের চাওয়া পূরণের মাধ্যমে অর্জিত হয় ।450

এ বিষয়গুলো যদিও বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত ও ব্যাখ্যা করা হয়েছে ,কিন্তু সকল জ্ঞানী ও পণ্ডিত একমত যে ,আনন্দ ও খুশি মানুষের মৌলিক চাহিদার অন্তর্ভুক্ত । এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া যাবে না ,যে দাবি করে তার আনন্দের কোন প্রয়োজন নেই । প্রকৃতপক্ষে বিশ্বজগতের ভিত্তি ও এর দৃশ্যমান বস্তু ও বিষয়সমূহ এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছে যেন মানুষের মধ্যে আনন্দের অনুভূতি সৃষ্টি করবে । বসন্তকালকে সতেজতা সহকারে ,সকালকে কমনীয়তা সহকারে ,প্রকৃতিকে সুন্দর ঝরনা সহকারে ,ফুলকে বিভিন্ন রঙে ;বন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ ,বৈবাহিক সম্পর্ক ,মানুষ... এ সবই আনন্দ বয়ে নিয়ে আসে । যেহেতু আনন্দ ও খুশি মানুষকে পরাজয় ,নিরাশা ,ভয় ও চিন্তা থেকে দূরে রাখে ,এ কারণে মনোবিজ্ঞানীরা মানুষের মধ্যে আনন্দ ও খুশির সৃষ্টির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন । এ আলোচিত বিষয় আনন্দ ও খুশির প্রয়োজনীয়তার বিষয় নির্দেশ করে ।451

এটাই উত্তম যে সবসময় খুশি থাকব

সকল ব্যথা-বেদনা ও দুঃখমুক্ত থাকব ।

দিনগুলো অতিবাহিত হবে হাস্যোজ্জ্বল মুখ ও ভালো ব্যবহারে

ফলে কাজে-কর্মে সুন্দর হৃদয়ের অধিকারী হবে ।

যদি খুশি ও আনন্দে সুন্দর হৃদয়ের অধিকারী হও

তোমার খুশি বিরাজমান থাকবে সবসময় । 452

3. আনন্দ ও খুশির কারণসমূহ : গবেষকদের মতামত এবং নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে মানুষের আনন্দ ও খুশির কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় :

1. ঈমান ,2. সন্তুষ্টি ও ধৈর্য ,3. গুনাহ থেকে মুক্ত থাকা ,4. দুশ্চিন্তার সাথে সংগ্রাম করা ,5. মৃদু হাসি ,6. গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে হাসি-কৌতুক করা ,7. সুগন্ধি ব্যবহার ,8. সাজগোজ করা ,9. উজ্জ্বল পোশাক পরিধান করা ,10. আনন্দ উৎসবে যোগদান করা ,11. ব্যায়াম করা ,12. জীবনের প্রতি আশাবাদী থাকা ,13. উন্নতির চেষ্টা করা ,14. ভ্রমণ করা ,15. পরিমাণমত বিনোদন করা ,16. কোরআন তেলাওয়াত করা ,17. আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে গভীর চিন্তা করা ,18. দান-খয়রাত করা ,19. সবুজ প্রকৃতি অবলোকন করা এবং ।453

চারটি গুণ রয়েছে যা স্বাধীনচেতা মানুষের দুঃখ করে মোচন

সুস্থ দেহ ,উত্তম চরিত্র ,সুন্দর নাম ও বুদ্ধিবৃত্তিই সেই ধন ।

আল্লাহ যাকে দেন এ চারটি গুণ উপহার

সবসময় থাকে খুশিতে ,থাকে না কোন দুঃখ তার । 454

4. ইসলাম ও আনন্দ : ইসলাম মানুষের মৌলিক চাহিদা অনুসারে আনন্দ ও খুশিকে অভিনন্দন জানায় এবং একে অনুমোদন দেয় ও সহায়তা করে । কোরআন সর্বোত্তম ও নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ হিসেবে আনন্দ ও খুশির জীবনকে আল্লাহর নেয়ামত ও রহমত এবং ক্রন্দন ,চিৎকার ও আহাজারির জীবনকে নেয়ামত ও রহমতবিহীন মনে করেছে । এ বিষয়টি কোরআনের এ আয়াত সাক্ষ্য দেয় :فَلْيَضْحَكُوا قَلِيلًا وَلْيَبْكُوا كَثِيرًا তাদের উচিত কম হাসা ও অধিক কাঁদা । 455

এ আয়াতের শানে নুযুল হলো ,আল্লাহর রাসূল (সা.) যুদ্ধ করতে সক্ষম ব্যক্তিদের ইসলামী ভূখণ্ডে হামলাকারী কাফির ও মুশরিকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হওয়ার আদেশ দিয়েছিলেন । কিন্তু এক শ্রেণির লোকেরা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে আল্লাহর রাসূলের আদেশ অমান্য করে ঐ সৈন্যদলে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত ছিল । কোরআন এ আয়াতে এ শ্রেণির লোকদের আযাবের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছে যে ,এ হুকুম অমান্যকারী গোষ্ঠী এখন থেকে কম কাঁদবে ও বেশি হাসবে ।

এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ,মন্দকর্মের প্রতিফল ও শাস্তিস্বরূপ যে অভিশাপ দেওয়া হয় যা অভিশপ্ত ব্যক্তিকে সবসময় আযাব ও কষ্টের মধ্যে ফেলে তা মানুষের সহজাত প্রকৃতি ও ফিত্রাতের বিপরীত আচরণের ফল । আল্লাহ তা আলা তাঁর হুকুম অমান্যকারীদের শাস্তিস্বরূপ কম হাসা ও বেশি কাঁদার কথা বলেছেন ;এবং তা তাদের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য অর্থাৎ আনন্দ-হাসি ও উৎসাহ-উদ্দীপনা থেকে বঞ্চিত করে ।456

কোরআনের অন্য আয়াতে যা কিছু আনন্দ ও খুশির কারণ হিসেবে বর্ণিত হয়েছে তা বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য :

) قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ(

বল : আল্লাহ নিজ বান্দাদের জন্য যে সকল শোভনীয় ও পবিত্র জীবিকা সৃষ্টি করেছেন ,কে সেগুলোকে হারাম করেছে ? বল : এ সমস্ত নেয়ামত পার্থিব জীবনেও তাদের জন্য যারা ঈমান এনেছে আর কিয়ামতের দিনে বিশেষ করে তাদের জন্য নির্দিষ্ট হবে ।457

হে রাসূল! (যারা আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে নিষিদ্ধ করে তাদেরকে) বল : আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে সকল সৌন্দর্যময় ও সুসজ্জিত বস্তু প্রকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন কে সেগুলোকে হারাম করেছে ?

বল : হে রাসূল! এ পবিত্র উপহার ও সৌন্দর্যের উপকরণসমূহ-যা আল্লাহ ঈমানদার ব্যক্তিদের এ দুনিয়া এবং আখেরাতের জীবনের জন্য সৃষ্টি করেছেন । এ দুই জগতের মধ্যে পার্থক্য শুধু এটা যে ,দুনিয়ার সৌন্দর্য মন্দ ও অপবিত্রতার সাথে মিশে আছে ;আনন্দ ও খুশিগুলো দুঃখ ও ব্যথার সাথে মিশে আছে । কিন্তু পরকালের সৌন্দর্যগুলো নির্ভেজালভাবে ঈমানদারদের জন্য রয়েছে । 458

এ আয়াত এ বাস্তবতাকে সুস্পষ্ট করে যে ,ইসলাম জীবনের আনন্দ এবং উৎসাহ-উদ্দীপনা দানকারী সৌন্দর্য ও ঐশী উপহারসমূহকে গুরুত্ব দান করে । একে ধার্মিক ও মুমিনদের সৌন্দর্য বর্ধনকারী হিসেবে মনে করে ।

ওহীর প্রকৃত ব্যাখাকারী পবিত্র ইমামদের থেকে বর্ণিত হয়েছে :

. হযরত রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে : মুমিন রসিক এবং প্রাণোচ্ছ্বল ও সজীবতায় পূর্ণ । 459

. হযরত আলী (আ.) বলেন : আনন্দ ও খুশি অন্তরের প্রশস্ততা আনে 460 ; আনন্দ ও খুশি হচ্ছে অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া সুফলের মতো ; যার আনন্দ ও খুশি কম হবে মৃত্যুর সময় তার সহজ ও প্রশান্তির সাথে মৃত্যু ঘটবে । 461

. ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন : এমন কোন মুমিন ব্যক্তি নেই যার প্রকৃতির মধ্যে রসিকতা নেই । 462

. ইমাম রেযা (আ.) বলেন : চেষ্টা কর যেন তোমার সময় চার ভাগে বিভক্ত হয় : 1. আল্লাহর সাথে একান্তে কথা বলা ও ইবাদাতের সময় ,2. জীবিকা অন্বেষণের সময় ,3. বিশ্বস্ত বন্ধুদের সঙ্গে কাটানোর সময়-যারা তোমার দোষত্রুটি সম্পর্কে তোমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় এবং তোমাকে আন্তরিকভাবে ভালোবাসে ,4. কিছু সময় নিজের বিনোদন ও উপভোগের জন্য নির্দিষ্ট কর এবং বিনোদনের সময়ের আনন্দ থেকে অন্য সময়ের দায়িত্ব পালন করার জন্য শক্তি সঞ্চয় কর । 463

পবিত্র ইমামদের জীবনীতে আনন্দ ও খুশির উপাদানের এত বেশি উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় যে ,তাঁরা এর অনুমোদন দেওয়া ছাড়াও এর ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেছেন ।464

কোন কোন হাদীস আনন্দ ও খুশির সার্বিক গুরুত্ব বর্ণনা ছাড়াও এজন্য নিজেকে প্রস্তুত করা ও তা বজায় রাখার পদ্ধতি বর্ণনা করেছে । এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো দৈনন্দিন হাঁটা-চলা করা ,ঘোড়ায় আরোহণ করা ,পানিতে সাঁতার কাটা ,সবুজ প্রকৃতি অবলোকন করা ,সতেজতা দানকারী খাবার খাওয়া ও পানীয় পান করা ,দাঁত মাজা ,রসিকতা ,হাসি-ঠাট্টা ও ।465

যখন আনন্দ ও খুশি কমে যায় তখন অন্তর ভেঙে যায় ,হয় অক্ষম । 466

5. আনন্দ ও খুশির সীমানা : মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্য ও জীবনের উত্তম পরিণতির চিন্তা সামনে রেখে ইসলামী দৃষ্টিতে আনন্দ ও খুশির নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে । আনন্দ ও খুশির বিষয়বস্তু ,কাঠামো ও উপাদান যেন ইসলাম ধর্মের তাওহীদ এবং মানবাত্মার সহজাত ঐশী প্রকৃতির বিপরীত ও তার সাথে সাংঘর্ষিক না হয় । কেননা ,যে কোন বিষয় যা মানুষকে তার প্রকৃত আদর্শ এবং উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয় ,ইসলামের দৃষ্টিতে তা বর্জনীয় । অতএব ,আনন্দের অনুভূতি ও প্রাণচঞ্চল থাকা ও এর প্রভাবক উপাদানগুলো একটি মৌলিক ও আবশ্যক প্রয়োজন হিসেবে বিবেচিত হলেও তার বৈধতার নির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে । আর তা হলো এ বিষয়টি ঐ পর্যায় পর্যন্ত অনুমোদনযোগ্য যতক্ষণ না মানুষের মৌলিক উদ্দেশ্য অর্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় ;বরং কাঙ্ক্ষিত হলো যেন তা এ লক্ষ্যের সহযোগী হয় । অনেক ইসলামী চিন্তাবিদ মনে করেন যে ,যেহেতু প্রত্যেক ঐচ্ছিক আচরণের পেছনে বিশেষ উদ্দীপনা ও উদ্দেশ্য কাজ করে তাই আনন্দ ও খুশি এক ধরনের আচরণ হিসেবে এ মূলনীতির ব্যতিক্রম নয় এবং কোন উদ্দেশ্য উদ্দীপনা ছাড়া এমনিই ঘটে না ।467

যদি উদ্দীপনা ও উদ্দেশ্য মানুষের জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্যের পথে পরিচালিত হয় তাহলে তা উপকারী ও কাঙ্ক্ষিত হবে ,কিন্তু যদি এর মধ্যে মিথ্যা উদ্দেশ্য লুক্কায়িত থাকে ও মানুষের জীবনের মৌলিক উদ্দেশ্যের বিপরীতে পরিচালিত হয় তাহলে তা অগ্রহণযোগ্য এবং ক্ষতিকর । এ কারণে বলা যায় ,আনন্দ ও খুশির পেছনে লুক্কায়িত উদ্দীপনা ও উদ্দেশ্য এর সীমানা নির্ধারণ করে । রসিকতা ,হাসি-ঠাট্টা আনন্দের অন্যতম প্রভাবক উপাদান । যদি এর মধ্যে নির্বুদ্ধিতা ,লজ্জাহীনতা ও ধৃষ্টতার মিশ্রণ হয় তবে তা অশ্লীল কর্ম ও ঠাট্টা-বিদ্রুপে পর্যবসিত হয় যা ইসলামে বর্জন করতে বলা হয়েছে । আর যদি কথার মধ্যে অসম্মান ,গালমন্দ ও কটুক্তির মিশ্রণ থাকে তবে তাতে কারো অপবাদ দান ও দুর্নাম করা হয় ;এ ধরনের আচরণ ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে ।468 যদি রসিকতা সীমা লঙ্ঘন করে ,অর্থহীন হয় তাহলেও ইসলামের দৃষ্টিতে অপছন্দনীয় । যেভাবে মুমিনদের নেতা হযরত আলী (আ.) বলেছেন : যে ব্যক্তি অধিক রসিকতা করে তার ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায় । 469 ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন : অতিরিক্ত রসিকতা মানুষের সম্মান নষ্ট করে । 470

মৃদু বা যে কোন হাসি যা আনন্দিত থাকার অন্যতম নিয়ামক তা মন থেকে হওয়া আবশ্যক এবং তা যাতে মানুষের ব্যক্তিত্বকে কলঙ্কিত না করে । ইসলামী দৃষ্টিতে তখনই হাসি-ঠাট্টা ও রসিকতা ইতিবাচক ও উপকারী হবে যখন কারো ব্যক্তিত্ব নষ্টের কারণ না হয় ;কাউকে অপমান ও ছোট করার উদ্দেশ্যে না হয় । ইসলামের দৃষ্টিতে মুমিন ব্যক্তির ব্যক্তিত্বে আঘাত করা নিষেধ । যখন মুমিন ব্যক্তির সম্মানকে কাবা ঘরের সম্মানের চেয়ে অধিক ধরা হয়েছে তখন বিষয়টি স্পষ্ট যে ,তার অপমান কত বেশি অনাকাঙ্ক্ষিত!471 আনন্দ ও খুশির পরিমাণ ও ধরন মানুষের মর্যাদা অনুযায়ী হওয়া উচিত । কেননা ,সুন্দর জিনিসও যদি কিছু ক্ষেত্রে সঠিক স্থানে ও উপযুক্তরূপে উপস্থাপিত না হয় তবে ইতিবাচক প্রভাব রাখার পরিবর্তে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে । এ কারণে রেওয়ায়াতে অট্টহাসিকে শয়তানের পক্ষ472 থেকে এবং মৃদুহাসিকে সর্বোত্তম হাসি গণ্য করা হয়েছে ।473 খুশির সময় ও স্থানও মানুষের ব্যক্তিত্ব অনুযায়ী হওয়া উচিত ;যদি তার ব্যক্তিত্বের সাথে সামঞ্জস্যশীল না হয় তাহলে তা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্জনীয় হবে । শোকানুষ্ঠানে এবং পবিত্র স্থানসমূহে হাসি-ঠাট্টা ও রসিকতা করা অপছন্দনীয় কাজ ।474 হাসির স্থান ,কাল ও পাত্র সংক্রান্ত বিষয়ে বিশেষভাবে হাদীস বর্ণিত হয়েছে : যদি কেউ কোন ব্যক্তির জানাযার অনুষ্ঠানে উপহাস করে হাসে ,কিয়ামতের দিন আল্লাহ তা আলা সবার সামনে তাকে অপমানিত করবেন ;তার দোয়া কবুল হবে না । যদি কেউ কারো কবরস্থানে হাসে তাহলে সে ওহুদ পাহাড়ের মতো কষ্টের বোঝা নিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নেবে ।475

এখানে যা আলোচনা করা হয়েছে তা থেকে স্পষ্ট হয় যে ,যে সকল রেওয়ায়াতে সার্বিকভাবে অথবা শর্তসাপেক্ষে আনন্দ ও আমোদ-প্রমোদকে নিষেধ করা হয়েছে সেগুলো একারণে যে ,তাতে ইসলামের সীমা লঙ্ঘিত হয়েছে এবং বাড়াবাড়ি পর্যায়ে পৌঁছেছে । ইসলাম আনন্দ ও খুশি এবং এর উপাদানকে বাস্তবে অপছন্দনীয় মনে করেনি ;বরং এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপ ও তাগিদ করেছে ।

6. বিশেষ দ্রষ্টব্য :

1. জীবন ভাঙা-গড়া ,আনন্দ-বেদনা ,খুশি-দুঃখ ,আশা-নিরাশা ও ...এর সমন্বয় ;জীবনের এ অমসৃণতা থেকে পলায়ন করা সম্ভব নয় । কবি রুদাকির ভাষায় :

আরশের অধিকারী আল্লাহ করেছেন পৃথিবীকে এমনভাবে সৃষ্টি

যেন কিছু সময় মানুষ হয় খুশি ,কিছু সময় হয় দুঃখী ।

2. বিশেষ কিছু রেওয়ায়াতে মুমিনদের সর্বদা দুঃখণ্ডভারাক্রান্ত মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে । এগুলো তার অন্তরের দুঃখ ও মর্মপীড়া-যা সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে তার জ্ঞান এবং তাদের প্রতি দায়িত্ববোধের

অনুভূতি থেকে উৎসারিত । এ দুঃখ তার মনের বিক্ষিপ্ত অবস্থা ও মানসিক অস্থিরতার নির্দেশক নয় । তাই তা আনন্দ ও প্রফুল্লতার পরিপন্থী নয় । বাস্তবে এ ধরনের দুঃখের মূলে রয়েছে মানুষের দুঃখণ্ডকষ্টের প্রতি বিশেষ মনোযোগ এবং তাদের সাথে সহানুভূতিশীলতা ।476 যেভাবে শেখ শাদী বর্ণনা করেন :

আদমসন্তানরা একই দেহের অঙ্গসমূহের মতো

একই বস্তুমূল দিয়ে সৃষ্ট হয়েছে তাদের দেহ

যদি কোনদিন শরীরের কোন অঙ্গে হয় ব্যথা অনুভূত

অন্যান্য অঙ্গগুলোও হয় পীড়িত ।

3. আনন্দ ও খুশির কিছু প্রভাবক উপাদান আত্মার ওপর প্রভাব ফেলার সাথে সাথে পরোক্ষভাবে দেহের ওপরও প্রভাব ফেলে । আবার কিছু উপাদান রয়েছে যা সরাসরি মানুষের অন্তরে প্রভাব ফেলে ।

এদের মধ্যে কোরআন তেলাওয়াত ,আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে গভীর চিন্তা করা ,ঈমান বৃদ্ধি ও একে শক্তিশালী করা ,দান করা ও গুনাহ মুক্ত থাকা অন্যতম যা সরাসরি আত্মিক আনন্দের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে এবং উপযুক্ত খাবার গ্রহণ ,ব্যায়াম ,সুগন্ধির ব্যবহার ,নিজেকে সজ্জিত ও পরিপাটি রাখা ,উজ্জ্বল পোশাক পরিধান ,হাঁটার অভ্যাস ,সবুজ প্রকৃতি অবলোকন-এ সবই শারীরিক আনন্দের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে ;অবশ্য দেহের প্রফুল্লতায় মনেও প্রফুল্লতার সৃষ্টি হয় ।

4. কিছু সংখ্যক মুসলিম অন্তর্মুখী আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ,আরেফ যাঁরা অন্তরের প্রভাবকে প্রকৃত প্রভাব মনে করেন ,তাঁরা আনন্দ ও খুশিকে মানুষের অন্তরে অনুসন্ধান করেন । তাঁরা আত্মিক প্রেমিক আল্লাহর সাথে মিলিত হওয়ার আনন্দকে শারীরিক ও বাহ্যিক আনন্দের চেয়ে উত্তম মনে করেন । আত্মিক পরিভ্রমণকারী দুঃখ ও মর্মপীড়াকে আত্মিক অভিজ্ঞতার এক বিশেষ মাত্রা ও পদমর্যাদা মনে করেন । এ কারণে কিছু কিছু ক্ষেত্রে নিজের আনন্দ ও খুশিকে এ ধরনের দুঃখ ও মর্মপীড়ার নিকট উৎসর্গ করেন এবং তাঁরা বিশ্বাস করেন যে ,দুঃখ ও মর্মপীড়ার মাধ্যমে আত্মিক আনন্দ লাভ করা সম্ভব ।

এমন কাউকে বিশ্বজগতে দেখেছ কি

যে কোন দুঃখ ও মর্মপীড়া ছাড়াই আনন্দিত ও খুশি লাভ করেছে । 477

তাঁদের বিশ্বাস অনুযায়ী দুনিয়ার আনন্দ ও খুশি স্বয়ং দুনিয়ার মতো যার রোগের কোন উপশম নেই ;এর সাথে সবসময় দুঃখের মিশ্রণ রয়েছেই ।

এ দুনিয়ার বাজারে দুঃখ ছাড়া আনন্দ নেই কোন

বিষাক্ত সাপ ছাড়া কোন রত্ন পাওয়া যায় না জেন

কণ্টকহীন ফুলের সন্ধান করা বৃথা এক চেষ্টা হায়

আনন্দের পথ ব্যথা-বেদনার মধ্যে দিয়ে করেছে অতিক্রম

যদি প্রাসাদে ও নিরাপদ স্থানে বসে কেউ আনন্দ পেতে চায়

তাহলে জেনে রাখ সে এক মূর্খ অধম । 478

যেহেতু আরেফ অর্থাৎ আধ্যাত্মিক সাধকরা আল্লাহর প্রেমের মতাদর্শের অনুসারী সে কারণে তাঁরা বিশ্বাস করেন কেবল পবিত্র প্রেম আনন্দ-খুশি ও জীবনের সৃষ্টি করে ।

মৃত্যুবরণ করেছিলাম জীবন লাভ করেছি

প্রেমের সম্পদ হাতে পেয়ে আমি স্থায়ী হয়েছি

আমি তোমার থেকে সৃষ্টি হে চন্দ্রের শহর ;

আমার মধ্যেই তোমার অস্তিত্ব খুজে পেয়েছি

তোমার হাসির প্রভাবেই হাসির বাগিচা হয়েছি । 479

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আধ্যাত্মিক সাধক আরেফরা সর্বজনীন ও পূর্ণ আনন্দের অনুসন্ধান করেন নিজের অস্তিত্বগত বিশেষ ধারণক্ষমতা অনুসারে । প্রকৃত আনন্দে পৌঁছানোর জন্য দুঃখ ও মর্মপীড়াকে স্বাগত জানান ,কিন্তু কখনই অন্যদের জন্য দুঃখণ্ডবেদনা কামনা করেন না ;তাঁরা সবসময় সতর্ক থাকেন যেন তাঁদের দুঃখের বিষয়টি কোন অবস্থাতেই অন্যরা জানতে না পারে ।480

54 নং প্রশ্ন : যদি তোমরা বিশ্বাস কর যে ,শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইন (আ.) শাহাদাতের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক জগতের সর্বোচ্চ স্থান ফানাফিল্লাহয় (আল্লাহর গুণাবলিতে বিলীন হওয়া) পৌঁছেছেন ;তাহলে তাঁর জন্য ক্রন্দনের অর্থ কী ?

উত্তর : এ ধরনের বক্তব্য দুই দিক থেকে সঠিক নয় । প্রথমত ,আবু আবদিল্লাহর জন্য ক্রন্দন করা কেবল তাঁর মযলুম অবস্থায় শহীদ হওয়া ও তাঁর পরিবারের বন্দিদশার জন্য নয় । দ্বিতীয়ত ,ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের পরে অন্যান্য ইমাম যাঁরা সত্যের অন্তর্নিহিত জ্ঞানের অধিবারী ছিলেন এবং যাঁদের কাছে অদৃশ্য জগৎ স্পষ্ট ছিল তাঁরা ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন করার আদেশ দেয়া ছাড়াও নিজেরা কাঁদতেন ,শোকানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন এবং অন্যদের এ কাজে উৎসাহিত করতেন । তাঁরা কি কারবালার ঘটনার রহস্য ও দর্শন সর্ম্পকে জানতেন না ? নিশ্চয়ই ইমামের জন্য ক্রন্দনের অন্য কোন দর্শন আছে যার কারণে তাঁদের অনুসারীদেরকে এভাবে শিক্ষা দিতেন ।

অন্যভাবে বলা যায় ,আশুরার বীরত্বগাথা দুই দিকসম্পন্ন একটি ঘটনা । যদি আমরা ঘটে যাওয়া ঘটনাটিকে এক দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করি তাহলে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছব যে ,ইমাম হোসাইন (আ.) ও তাঁর সন্তানরা শহীদ হয়েছেন ;তাঁর পরিবার বন্দি হয়েছে ;ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়া বিজয় লাভ করেছে । যদি ইমামের জন্য ক্রন্দন করাকে এ দৃষ্টিতে দেখা হয় তাহলে এ ক্রন্দন কেবল মানবীয় কষ্ট ও দুঃখের অনুভূতি ও আবেগের প্রকাশ-যা এক ব্যক্তির শারীরিক ও আত্মিক কষ্ট সহ্য করা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর কারণে হয়েছে ।

এ দৃষ্টিতে ক্রন্দন কেবল দুঃখী ও মযলুম ব্যক্তিদের প্রতি সহানুভূতি ও সমবেদনা প্রকাশ করা । এ ধরনের ক্রন্দনের সাথে রাসায়নিক বোমায় নিহতদের জন্য ক্রন্দনের কোন পার্থক্য নেই ;একমাত্র পার্থক্য হলো ব্যথার কাঠিন্যের পরিমাণ ও মৃত্যুবরণ করার পদ্ধতির ভিন্নতা ।

কিন্তু আশুরার ঘটনাকে অন্য দৃষ্টিতে দেখলে বুঝতে পারব যে ,এ যুদ্ধে ইমাম হোসাইন বিজয় লাভ করেছেন ;ইয়াযীদ ও তার সঙ্গীসাথিদের পরাজয় ঘটেছে । বাস্তবে এ দৃষ্টিকোণ থেকে আশুরার ঘটনায় সবচেয়ে সুন্দর গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো (হোসাইনী চরিত্র) সবচেয়ে নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্যের (ইয়াযীদী চরিত্র) ওপর বিজয় লাভ করেছে । সুতরাং এর একদিকে সুন্দর ও

অনুপমতার বৈশিষ্ট্য থাকলেও অপরদিকে নিষ্ঠুরতা ও কুৎসিত শয়তানি বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান । এ দৃষ্টিকোণ থেকে ক্রন্দন শুধু সহানুভূতি ও সমবেদনার ক্রন্দনের অন্তর্ভুক্ত নয় ;অর্থাৎ তা কেবল দুঃখী ও জুলুমের শিকার এক ব্যক্তির প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ নয় । বরং সত্যের প্রতীক ও বাহকের প্রতি একাত্মতা ঘোষণা যাঁর অবমাননার মাধ্যমে সত্যের বিজয় ঘটেছে । তাই এ কথা বলা যায় না যে ,যেহেতু ইমাম হোসাইন (আ.) ফানাফিল্লাহর মর্যাদা অর্জন করেছেন তাই তাঁর জন্য ক্রন্দন করার অর্থ কী ?

55 নং প্রশ্ন : ইমাম হোসাইন (আ.) মযলুম ছিলেন -এ বাক্যটির অর্থ কী ?

উত্তর : ন্যায় বিচারের বিপরীতে যুলুমের অর্থ হলো উপযুক্ত কোন ব্যক্তির অধিকার দান না করা । ইমাম হোসাইন (আ.) এ দৃষ্টিকোণ থেকে মযলুম যে ,তাঁর ঐশী বেলায়াত বা মুসলমানদের ওপর আল্লাহপ্রদত্ত কর্তৃত্বের অধিকার তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে । এছাড়া মুসলমানদের ওপর তাঁর সর্বজনীন যে অধিকারগুলো ছিল যার অন্যতম হলো রাসূলের উম্মতের পক্ষ থেকে তাঁর ভালোবাসা পাওয়ার অধিকার481 ,সেগুলো থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা হয়েছে । দুঃখজনকভাবে অপপ্রচারের কারণে বেহেশতের যুবকদের নেতা হিসেবে তাঁর আধ্যাত্মিক ও পার্থিব মর্যাদা তাঁকে দেওয়া হয় নি । মূর্খতা ,হিংসা ও বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকারের পর্দা দিয়ে তাঁর উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ফেরেশতার মতো চেহারাকে ঢেকে ফেলা হয়েছে এবং তাঁকে পরিপূর্ণভাবে তাঁর ঐশীরূপে প্রকাশের সুযোগ দেওয়া হয় নি ।

মুসলমানদের নেতা হিসেবে শহীদদের নেতা ইমাম হোসাইনকে স্বীকৃতি দান না করা এবং তাঁর প্রকৃত মর্যাদাকে গোপন করা-এ দু টি অপরাধের বিপরীতে তাঁর শাহাদাত সামান্য বলেই গণ্য ;যদিও তাঁকে হত্যার অপরাধ হত্যাকারীদের অনন্তকালীন শাস্তির জন্য যথেষ্ট ।482 কিন্তু মযলুম অবস্থায় তাঁকে হত্যা করার চেয়ে বড় অপরাধ হলো তাঁকে তাঁর মর্যাদা সহকারে না চেনা ,তাঁকে তাঁর অধিকার না দেওয়া এবং অন্যদের সামনে তাঁর মহান পরিচয় তুলে না ধরা ;এ দু টিই হল মানবজাতির ইতিহাসে তাঁর প্রতি সবচেয়ে বড় অপরাধ এবং এখন পর্যন্ত এ অপরাধ অব্যাহত রয়েছে । (তার বিপরীতে ইয়াযীদের মতো নরপিশাচকে মুসলমানদের প্রকৃত খলিফা বলে তার ক্ষমতাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে ।483 )

লক্ষ্য করা আবশ্যক যে ,আরবি ভাষায় মাযলুম শব্দটি মুনযালাম শব্দ থেকে ভিন্ন । মুনজালাম শব্দটির অর্থ হলো যে ব্যক্তি অন্যায়কে বরণ করে নেয় এবং কোন প্রতিবাদই করে না ;কিন্তু মাযলুম ঐ ব্যক্তিকে বলা হয় যার প্রতি অন্যায় করা হয় এবং এর বিপরীতে সে প্রতিবাদ করে ও সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রতিহত করে । ইসলামী সংস্কৃতিতে অন্যায়কে বরণ করা অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্জিত কর্ম হিসেবে ধরা হয়েছে কিন্তু অন্যায়ের প্রতিবাদ করাকে কাঙ্ক্ষিত ও পছন্দনীয় ধরা হয়েছে ।

আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত ও শোকানুষ্ঠান

56 নং প্রশ্ন : আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের কোন কোন ভাই কেন ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য শোকানুষ্ঠান ও মার্সিয়া পাঠের বিষয়টির সমালোচনা করেন ? এগুলোকে কেন অযৌক্তিক এবং সুন্নাতের পরিপন্থী মনে করেন ?

উত্তর : আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের এই ভাইদের দলিল হচ্ছে ঐ সকল রেওয়ায়াত যেখানে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন ও শোক পালনে নিষেধ করা হয়েছে । কিন্তু আহলে সুন্নাতের জ্ঞানী ও হাদীসশাস্ত্রে পণ্ডিত ব্যক্তিদের মত অনুসারে এ রেওয়ায়াতগুলো সনদ ও বিষয়বস্তুর দিক থেকে ত্রুটিমুক্ত নয় । সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাকারী মনীষী নাবাবী বলেন : উল্লিখিত রেওয়ায়াতগুলো হযরত আয়েশার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে নি । তাঁর মতে বর্ণনাকারীরা ভুলে যাওয়া এবং ভুল করার কারণে এভাবে বর্ণনা করেছেন । কেননা ,দ্বিতীয় খলিফা হযরত উমর ও তাঁর সন্তান আবদুল্লাহ এ রেওয়ায়াতগুলোকে সঠিকভাবে রাসূল (সা.) থেকে গ্রহণ করেন নি । ইবনে আব্বাস বলেন : এ রেওয়ায়াতগুলো খলিফার নিজস্ব বক্তব্য ,রাসূল (সা.)-এর হাদীস নয় । 484

অন্যদিকে ইতিহাসে আহলে সুন্নাতের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জন্য সর্বসাধারণের শোক পালনের অনেক উদাহরণ বর্ণিত হয়েছে । যেমন জুয়াইনীর (মৃত্যু 478 হিজরি) জন্য লোকেরা শোকানুষ্ঠান করেছিল । যাহাবী মুহাদ্দিস জুয়াইনীর মৃত্যু ও শোকানুষ্ঠানকে এভাবে স্মরণ করেছেন : প্রথমে তাঁকে তাঁর বাড়িতে দাফন করা হয়েছিল ;এরপর তাঁর মৃতদেহকে ইমাম হোসাইন (আ.)-এর কবরের কাছে স্থানান্তর করা হয়েছিল । শোকের কারণে তিনি যে মিম্বারে বসে বক্তব্য দিতেন তা ভেঙে ফেলা হয়েছিল ;বাজারের কেনা-বেচা বন্ধ করা হয়েছিল ;তাঁর মুসিবতে অনেক মর্সিয়া পাঠ করা হয়েছিল ;তাঁর চারশ ধর্মীয় ছাত্র তাঁদের শিক্ষকের মৃত্যুশোকে কলম ও কলমদানিগুলো ভেঙে ফেলেছিল ;তারা এক বছর তাঁর জন্য শোকানুষ্ঠান পালন করেছিল ;তাদের মাথা থেকে পাগড়ি এমনভাবে এক বছর পর্যন্ত খুলে রেখেছিল যে ,অন্য কোন ব্যক্তি তা মাথায় দেওয়ার সাহস পায় নি ;তাঁর ছাত্ররা এ সময় পর্যন্ত মর্সিয়া পাঠে রত ছিল এবং তারা চিৎকার ও ক্রন্দনের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছিল । 485

যাহাবী একইভাবে ইবনে জাওযীর (মৃত্যু 597 হিজরি) মৃত্যুর প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে লিখেছেন : তাঁর মৃত্যুর পর বাজারের কেনা-বেচা বন্ধ করা হয়েছিল ;অনেক লোক তাঁর দাফন-কাফনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিল... ;রমযান মাসের শেষ পর্যন্ত রাত থেকে সকাল পর্যন্ত লোকেরা তাঁর কবরের সামনে উপস্থিত থাকত... ;শনিবারে আমরা শোকানুষ্ঠান পালন করেছিলাম । 486

আশ্চর্যজনক হলো আহলে সুন্নাতের এ সকল ঐতিহাসিক ও আলেম তাঁদের গণ্যমান্য আলেমদের জন্য দ্বীনি ছাত্র ও সাধারণ মানুষের শোকানুষ্ঠান পালনের এ ঘটনাগুলো কোন রকম প্রতিবাদ ছাড়াই সহজভাবে গ্রহণ করেছেন এবং এগুলোর পক্ষে কোন ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেন নি ;বরং এ ঘটনাগুলোকে তাঁদের জন্য মর্যাদাকর বিষয় হিসেবে স্মরণ করেছেন ;কিন্তু আহলে বাইত ( আ .) ,বিশেষ করে ইমাম হোসাইন ( আ .)- এর জন্য করা শোকানুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এর বিপরীতে অযৌক্তিক পক্ষাবলম্বন ক রেছেন ? এরূপ দু ধরনের নীতি অবলম্বনের রহস্য কী ?!

57 নং প্রশ্ন : কেন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ভাইয়েরা যারা গাল চাপড়ায় ,কাপড় ছিন্ন করে ও জাহেলী যুগের মতো দোয়া করে তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় -এ হাদীসের অনুসরণে শোকানুষ্ঠান পালন করে না ?

উত্তর : প্রথমত ,এ হাদীসটি ঐ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যেখানে কোন ব্যক্তি তার প্রিয় মানুষের মৃত্যুতে নিজেকে প্রচণ্ডভাবে আঘাত করে ও কাপড় ছিন্ন করে ;এমনভাবে শোক করে এবং এমন ধরনের কথা বলে যা আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হয় । তার এ আচরণ থেকে প্রতিপন্ন হয় সে আল্লাহর নির্ধারিত হুকুম মৃত্যুর প্রতি অসস্তুষ্ট । কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য ক্রন্দন আল্লাহর নৈক্যট্যের উত্তম কারণ ;আল্লাহর নিদর্শনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ;ইমামদের এবং এ মতাদর্শের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকা ও তাঁদের আনুগত্যের পথে নিবেদিত থাকার ঘোষণা । এ ছাড়াও অনান্য দর্শন রয়েছে যেগুলো পূর্বের প্রশ্নের উত্তরে উত্থাপিত হয়েছে ।

দ্বিতীয়ত ,(শালীনতা বজায় রেখে) কাপড় ছিন্ন করা বিশেষ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে । পিতা-মাতা ও ভাইয়ের মৃত্যুতে কাপড় ছিন্ন করাতে কোন সমস্যা নেই । যেভাবে হযরত মূসা (আ.) তাঁর ভাই হারুন (আ.)-এর বিচ্ছেদে এবং ইমাম হাসান আসকারী (আ.) তাঁর পিতা ইমাম হাদী (আ.)-এর শাহাদাতে কাপড় ছিন্ন করেছিলেন ।487

এ কারণে ইমামদের ,বিশেষ করে ইসলামী উম্মতের আধ্যাত্মিক পিতা ইমাম হোসাইন (আ.)-এর শোকে ক্রন্দন ,মর্সিয়া পাঠ করা ,শোকানুষ্ঠান পালন এবং কাপড় ছিন্ন করায় কোন অসুবিধা নেই ;বরং তা মানুষের সৌভাগ্য লাভ এবং আল্লাহর নৈকট্যের কারণ হয়ে থাকে ।

ঐ ধরনের ক্রন্দন ও শোকগাথাকেই রেওয়ায়াতে তিরষ্কার করা হয়েছে যেগুলো আল্লাহর প্রতি অসন্তুষ্টি সহকারে ঘটে এবং যে সকল পদ্ধতি আরবের জাহেলী যুগে প্রচলিত ছিল । রাসূল (সা.) থেকে বর্ণিত রেওয়ায়াত- যারা গাল চাপড়ায় ,কাপড় ছিন্ন করে ও জাহেলী যুগের মতো দোয়া করে তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয় -এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত শোকানুষ্ঠানের প্রতিই নির্দেশ করে ।

কিন্তু ইমাম হোসাইন (আ.)-এর জন্য শোকানুষ্ঠান অন্য বিষয় । আমাদের সূত্র থেকে বর্ণিত নির্ভরযোগ্য রেওয়ায়াত এ বিষয়ের প্রতি উৎসাহিত করেছে ;কারণ ,এ শোকানুষ্ঠানের জীবন্ত স্মরণের মধ্যে ইসলামের জীবন ও ফাসিক-যালেম শাসনব্যবস্থার ধ্বংস লুক্কায়িত রয়েছে এবং এর অনেক আত্মিক ও সামাজিক সুফল রয়েছে ।