আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর0%

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর লেখক:
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিষদ,ইরান।
বিভাগ: ইমাম হোসাইন (আ.)

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

লেখক: লেখকবৃন্দ
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিষদ,ইরান।
বিভাগ:

ভিজিট: 14650
ডাউনলোড: 1285

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 30 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 14650 / ডাউনলোড: 1285
সাইজ সাইজ সাইজ
আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক প্রশ্নোত্তর

লেখক:
প্রকাশক: বাংলাদেশ ইসলামী সাংস্কৃতিক পরিষদ,ইরান।
বাংলা

আশুরা ও কারবালা বিষয়ক বিভিন্ন প্রশ্ন ও উত্তর সম্বলিত এ গ্রন্থটিতে হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) এর আশুরা বিপ্লব সম্পর্কিত বিভিন্ন  প্রশ্নের উত্তর দেয়া হযেছে

ক্রন্দন সহজাত স্বাভাবিক প্রবণতা নাকি মানসিক ভারসাম্যহীনতা

প্রশ্ন 68 : ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দনে উদ্বুদ্ধকরণ কি মানুষকে সর্বক্ষণ দুঃখ -ভরাক্রান্ত থাকা ও মন :কষ্টে জীবন কাটানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে না ? এটা কি মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে একটি নেতিবাচক বিষয় নয় ? ইসলাম আমাদের ইমাম হোসেইনের জন্য ক্রন্দনে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে আমাদেরকে কি এক প্রকার মানসিক অস্বাভাবিকতার দিকে পরিচালিত করছে না ? এ ধরনের কাজ কি মানুষের উন্নয়ন ও বিকাশের পথে প্রতিবন্ধক নয় ?

উত্তর : মহানবী (সা .) ও তাঁর স্থলাভিষিক্ত ইমামদের (আ .) হাদীসসমূহে ক্রন্দনের প্রতি অনেক বেশী উৎসাহিত করা হয়েছে এবং এর জন্য অসংখ্য সওয়াব ও পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে ।539 এ বিষয়টি পর্যালোচনার পূর্বে দু টি বিষয়কে আমাদের দৃষ্টিপাত রাখতে হবে :

1 সব কান্নায় শোক ও দুঃখের প্রকাশ নয় । কান্নার অনেক প্রকার আছে । কান্নার উদ্দেশ্যওে প্রকরণ ভিক্তিতে তার সঠিকতার যাচাই করতে হবে ।

2 সব শোকের কান্নারই নেতিবাচক প্রভাব নেই ও তাকে অস্বাভাবিকতা বলে অভিহিত করা যায় না ।

আমরা এখানে প্রথমে দ্বিতীয় বিষয়টি অর্থাৎ ইমাম হোসাইনের জন্য কান্না যে বিশেষ প্রকৃতির শোকের প্রকাশক তা নিয়ে আলোচনা করব ।

ক্রন্দন করা ঐ ধরনের বিষন্নতা ও শোকগ্রস্ত হওয়া নয় যা মানসিক বিপর্যস্ততা ও অস্বাভাবিকতার জন্ম দেয় এবং মানসিক রোগ বলে গণ্য হয় । শোকগ্রস্ত ও দুঃখগ্রস্ত ও দুঃখভরাক্রান্ত হওয়ার বিভিন্ন অবস্থা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে স্পষ্ট ও অতি সূক্ষ্মভাবে শ্রেণিবিভাগ করা হয়নি । শোক -দুঃখ প্রকাশ ,শোকে মূহ্যমান হওয়া ,ক্রন্দন ও আহাজারি করা ,দুঃখে ভরাক্রান্ত হওয়া ইত্যাদি পরিভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রগুলোকে এভাবে ভাগ করা যায় :

বিলাপ করে শোক জ্ঞাপন করা : যে কোন শোকের বিষয়ের মুখোমুখি হয়ে ব্যক্তি কর্তৃক প্রকাশিত শারীরিক ,মানসিক ও আচরণগত বিশেষ এক প্রতিক্রিয়া যা বিব্রতকর ভিক্তিতে মৃদু থেকে মারাত্মক ও সংকটময় অবস্থায় পৌঁছতে পারে ।

শোকে মূহ্যমান হওয়া : অতি নিকট সম্পর্কের বা ভালবাসার পাত্র কেউ মারা গেলে তাকে হারানোর দুঃখে আবেগময় প্রকাশ এভাবে ঘটে থাকে ।

আজাদারি : চরম শোকের কোন বিষয়ে সমবেতভাবে (স্বতঃপ্রণোদিতভাবে )দুঃখ প্রকাশ করা হয় । মনোসমীক্ষণে কারো মনঃকষ্ট দূর করার জন্য কখনও কখনও যে সমবেত শোক প্রকাশের নির্দেশ দেয়া হয় তার সঙ্গে এর পার্থক্য আছে ।

মনঃকষ্ট : ব্যক্তির কাছে মূল্যবান বলে প্রতিভাত কোন বস্তু হাতছাড়া হওয়ার কারণে মনে উদ্ভূত কষ্ট ।

দুঃখ কখনও কখনও কোন ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ার হতে পারে ,তবে তা মনস্তত্ত্বের পরিভাষায় বিষন্নতার সমার্থক নয় । তবে বিষন্নতা মনঃকষ্টের একটি রূপ যা প্রাত্যাহিক জীবনের কার্যক্রমে কোন কিছুর মূল্যায়ন ,বিচার ও প্রাকৃতিক ও জৈবিক কাজের ওপর বিশেষ প্রভাব ফেলে ।

এখন দেখতে হবে ,যে কোন ধরনের শোক প্রকাশই কি নেতিবাচক ও মনস্ততত্ত্বের দৃষ্টিতে রোগ বলে গণ্য হয় ?আর ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন করার কিরূপ প্রভাব রয়েছে ?

মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে সবধরনের রোগই শোক প্রকাশই রোগ বলে গণ্য নয় । যখন শোকের মাত্রা ,তীব্রতা ও স্থায়িত্ব সীমা ছাড়িয়ে যায় বিশেষত যদি কোনরূপ তা বাহ্যিক ও উপযুক্ত কারণ ছাড়া দেখা দেয় তাহলে তা অস্বাভাবিক । যদি শোকের প্রভাব এতটা তীব্র হয় যে ,অসঙ্গত আচরণ প্রকাশ করে অথবা দীর্ঘদিন কোনরূপ পরিবর্তন ছাড়া অব্যাহত থাকে ও হ্রাস না পায় তবে তা রোগ বলে গণ্য হবে ।

অন্যভাবে বলা যায় ,কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ যদি শোকাহত ব্যক্তির মধ্যে দেখা দেয় তবে তা একটি রোগ এবং এর নিরাময়ের প্রয়োজন রয়েছে । সেগুলো হলো :

1 : শারীরিক অবনতি

2 : একাকিত্বকে বেছে নেয়া ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া

3 : নিজেকে মূল্যহীন মনে করা

4 : পাপের অনুভূতি

5 : আত্মহত্যার চেষ্টা

6 : লক্ষ্যহীনতা ও কর্ম অনীহা

7 : দীর্ঘ বিষন্নতা ও সার্বক্ষণিক মনোবেদনা

8 : আকস্মিক অস্বাভাবিকতা লক্ষণ ও আচরণ প্রকাশ

এখন দেখতে হবে ,যারা ইমাম হোসাইনের জন্য শোক প্রকাশ করে তারা এ ধরনের শারীরিক ও মানসিক লক্ষণের অধিকারী কি না ? ইমাম হোসাইনের জন্য শোক প্রকাশের সময় কোন ব্যক্তি কিরূপ অনুভূতির মুখোমুখি হয় ?বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণে সে কি স্বাভাবিকতার সীমা ছাড়িয়ে যায় ? না কি সে ইমাম হোসাইন সম্পর্কে পূর্ন জ্ঞান নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামাজিক দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য আচরণ করে ?

যদি তার আচরণ পরিপূর্ণ জ্ঞানসহ ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে স্বীকৃতি কাঠামোর মধ্যে -কোনরূপ বিশেষ ছাঁচে হতে হবে এমন গোঁড়ামি ছাড়া -হয় তবে তা সঠিক । ইমাম হোসাইনের জন্য শোক প্রকাশ কখনই প্রাণহীন ও আচারসর্বস্ব প্রতীকি বিষয় নয় ;বরং তা ইমাম হোসাইনের আন্দেলন ও শাহাদাতের মহান লক্ষ্যের ওপর নিবেদিত থাকার নিদর্শন । তাই তার জন্য রচিত শোকগাথা ও কবিতাগুলোর মধ্যে সত্য আদর্শকে এমনভাবে তুলে ধরা হয় যে ,তা তাঁর আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবনকে সেভাবে পরিচালিত করার অনুপ্রেরণা সৃষ্টি করে । যে কোন অন্যায় ও অনাচার প্রতিরোধ ,ধর্মীয় মহান মূল্যবোধের জাগরণ ও ন্যায়কে প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া এবং অসম্মান ও অপমানজনক জীবনকে প্রত্যাখানের আদর্শে উজ্জীবিত করে ।

তাই তার জন্য শোকপ্রকাশ ও ক্রন্দন অস্বাভাবিক কোন আচরণ নয় ;বরং তা আত্বিক বিকাশ ,মানসিক সুস্থতা এবং সামাজিক ও ধর্মীয় স্বীকৃতি প্রথার অনুকূল । এ শোক প্রকাশ ইমাম হোসাইনের মহান আত্মার সাথে একাত্মতার প্রকাশক যা ব্যক্তিকে পূর্ণতা দান করে ।

বাস্তবে প্রকৃত বিষয় হলো যদি কোন ,মুসলমান ইমাম হোসাইনের মহান আত্মত্যাগের প্রতি কোনরূপ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া না দেখায় ও ক্রন্দনের মাধ্যমে তাঁর সমবেদনা প্রকাশ না করে তবে সে ধর্মীয় দৃষ্টিতে রোগাক্রান্ত । এমনকি মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও যদি কেউ এধরনের কোন ঘটনা শ্রবণে নিষ্ক্রিয় থাকে তাহলে সে অসুস্থ বলে গণ্য হবে । যদি কেউ তার কোন একান্ত নিকটাত্মীয়ের মৃত্যুতে শুধু তাৎক্ষণিক নয় ,এমনকি দীর্ঘ সময়েও শোক প্রকাশ না করে বা জোর করে শোককে চেপে রাখে তবে তা নেতিবাচক প্রভাব অবশ্যই তার মনে পড়বে এবং তা রোগে পর্যবসিত হবে । যেমনভাবে পূর্বোল্লিখিত আটটি বৈশিষ্ট্য কোন শোকাক্রান্ত লোকের মধ্যে থাকলে তা রোগ বলে গণ্য তেমনি শোককে জোর করে চেপে রাখা এবং শোক প্রকাশে দেরী করাও এক প্রকার রোগ ।

তবে একথার অর্থ এই নয় যে ,যদি কেউ ইমাম হোসাইনের শোকানুষ্ঠানে ক্রন্দন না করে তবে সে অসুস্থ । কারণ ,এটা এজন্য হতে পারে যে ইমাম হোসাইনের প্রতি ভালোবাসা নেই এবং তাঁর সাথে আদৌ একাত্মতার অনুভূতি তার মধ্যে নেই । সে নিজেকে তার থেকে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন মনে করে । যতক্ষন কোন ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি কারো ভালোবাসা না জন্মাবে ততক্ষণ সে তাকে হারানোর বেদনায় কাঁদবে না । যদি কেউ ইমাম হোসাইনের শাহাদাতের ঘটনার মর্মান্তিকতাকে অনুভব নাও করে ,তাঁর বরকতময় অস্তিত্বের অনুপস্থিতি মানবজাতির জন্য কতটা ক্ষতিকর তা নাও বোঝে ,তাহলেও অন্তত তা শোনার পর তার কোন পরিচিত প্রতিবেশীর মৃত্যুর শোকের পরিমানে হলেও শোকাহত হওয়া উচিত । নতুবা অবশ্যই সে অসুস্থ । কোন মুসলমান যদি এপরিমান ভালোবাসাও ইমাম হোসাইনের প্রতি না রেখে তবে তার উচিত স্বীয় ইমামের বিষয়টিকে যাচাই করে দেখা । কেননা ,তার ধর্ম ধর্মীয় আদর্শ পুরুষদের প্রতি এতুটুকু ভালোবাসাও নেই যে ,তাঁদের ওপর আপতিত এত বড় বিপদ ও মুসিবত তাকে নাড়া দেবে ।

এধরনের লোকেরা মহানবী (সা .)-এর প্রতি কোনরূপ ভলোবাসাই রাখে না । এসম্পর্কে ইমাম সাদিক (আ .)বলেছেন : আমাদের অনুসারীরা আমাদের প্রকৃতিতে সৃষ্ট হয়েছে ,তাদের অন্তর আমাদের বেলায়াতের আলোয় আলোকিত ,আমাদের ইমামতে তারা সুন্তষ্ট । আর আমরাও আমাদের বন্ধুত্ব ও অনুসরণের কারণে তাদের প্রতি সুন্তষ্ট । আমাদের কষ্ট তাদেরকে কষ্ট দেয় এবং আমাদের বিপদ -মুসিবতে তারা ক্রন্দন করে ,আমাদের বেদনায় তারা বেদনাগ্রস্থ হয় আর আমাদের আনন্দে তারা আনন্দিত হয় । আমরাও তাদের অবস্থা সম্পর্কে অবহিত ও সকল অবস্থায় তাদের সাথে আছি । তাদের কষ্ট ও চিন্তা আমাদের চিন্তাগ্রস্থ ও কষ্টে ফেলে । তারা কখনই আমাদের থেকে পৃথক হয় না এবং আমরাও তাদের থেকে কখনও পৃথক হই না ।540

সুতরাং ইমাম হোসাইনের জন্য শোক প্রকাশ ও ক্রন্দন অসুস্থতা ও মানসিক রোগের লক্ষণ নয় ;বরং তা মানসিক সুস্থতা ও ধার্মিকতার প্রমাণ । এ ধরণের শোক প্রকাশ ও ক্রন্দন মানুষের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে ,তা তার কন্য উপশম বলে গণ্য ।

ক্রন্দন শোকাক্রান্ত ব্যক্তির মনের ওপর চাপ হ্রাস করে । যদি সে চাপ ক্রন্দনের মাধ্যমে প্রকাশিত না হয় তবে তা শারীরিক বিভিন্ন সমস্যার সৃষ্টি করে । অনেক বিশেষজ্ঞের মতে ,অশ্রু বিসর্জনের মাধ্যমে ক্ষতিকর অনেক উপাদান দেহ থেকে বের হয়ে যায় ।

কারবালার ঘটনা আমাদের দৃষ্টিতে নিছক মনস্তত্ত্বিক ব্যাখ্যা দিয়ে মানুষের কাছে তার যৌক্তিকতাকে আমরা প্রমাণ করতে চাচ্ছি । কারণ ,এমন অলৌকিক ঘটনাকে শুধু মানবিক জ্ঞানের ভিক্তিতে বিশ্লেষণ করা কখনই ঠিক নয় । তাই আমাদের উদ্দেশ্যও এটা নয় । বরং আমরা প্রমাণ করতে চেয়েছি যে ,মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিতেও এধরনের ঘটনার জন্য ক্রন্দন করা সঠিক এবং অনেক নেতিবাচক প্রভাব এর মাধ্যমে দূর করা যায় ।

ইমাম হোসাইনের ন্যায় আদর্শ ব্যক্তির ওপর আপতিত কঠিন কষ্ট ও মুসিবতে ক্রন্দন করার পেছনে যে ধর্মীয় ও মনস্তাত্ত্বিক জ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা রয়েছে তার কিছু দিক নিম্নে উল্লেখ করছি :

1 .যখন মানবতা ন্যায়ের মহাশিক্ষক মহানবী (সা .)-এর দৌহিত্র ইমাম হোসাইন এবং তার আহলে বাইতের ওপর আপতিত মুসিবতের বিবরণ শুনে ক্রন্দন করা হবে তখন তার মাধ্যমে এ মনঃকষ্টের জন্য সান্তনা পাবে ও তার প্রশমন ঘটবে । সেসাথে তাদের প্রিয় ব্যক্তির সুন্দর ও উত্তম বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং যে মহান উদ্দেশ্যের জন্য তিনি আত্মত্যাগ করেছেন সেগুলোর স্মরণ তাদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে ।

অবশ্য ধর্মীয় দৃষ্টিতে কারবালার ঘটনার স্মরণ শুধু একারণে নয় ;বরং এটা প্রতি মুহূর্তে মহানবীর রেসালাতের মিশনকে । অব্যাহত রাখা ,সত্যদ্বীনের প্রচার এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইমাম হোসাইনের আদর্শ ও সংস্কৃতিকে জাগ্রত রাখার প্রানসঞ্চারক উপাদান । এ শোকপালন আত্মপ্রশান্তি ও সান্তনার উর্ধ্বে ইমাম হোসাইনের শিক্ষালয়ে ধর্মরক্ষা ও পালনে আত্মত্যাগ ,স্বাধীনতা ,মনুষ্যত্ব ও পৌরুষের শিক্ষা লাভের উদ্দেশ্যে সম্পাদিত হয় । তাই এটা একই সঙ্গে ধর্মীয় জ্ঞান ও শিক্ষার উন্নয়ন এবং ঐশী সহজাত প্রকৃতি ও আবেগ -অনুভূতির জাগরন -একদিকে অনুধাবন অন্যদিকে উদ্দীপনা ।

2 ইমাম হোসাইনের জন্য শোক পালনের সংস্কৃতি দুই উৎস থেকে উৎপত্তি ও রূপ লাভ করেছে :ধর্মীয় নিয়মনীতি ও প্রথা এবং প্রত্যেক জাতির নিজস্ব আচার -অনুষ্ঠান । সুতরাং এ বিষয়টি যেমনি ঐশী তেমনি শরীয়তের অনুমোদিত গণ্ডিতে প্রত্যেক জাতি ও গোষ্ঠীর স্থানীয় রীতি ও প্রথার ওপর নির্ভরশীল । তাই ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে শোক প্রকাশের স্থানীয় রীতি -প্রথা অন্যতম স্বীকৃত মাধ্যম -যা ব্যক্তির মনের কষ্ট দূর করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে ।

আহলে বাইতের ইমামগণ শোকগাথা পাঠ ও শোকপালনের যে পদ্ধতি শিক্ষা দিয়েছেন তা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতি । এ পদ্ধতি সবধরনের লক্ষ্যহীন কর্ম ও বাড়াবাড়িমূলক আচরণ থেকে মুক্ত হিসেবে ইমাম হোসাইনের শোকে হৃদয়কে নাড়া দেয়ার মাধ্যমে প্রশান্তি অর্জনের সর্বোত্তম পন্থা । যে হৃদয় ইমাম হোসেইনের ভালোবাসায় সিক্ত এবং আহলে বাইতের সাথে এই বন্ধনে আবদ্ধ তা তাঁদের কষ্ট ও মুসিবাতে ক্রন্দন করে স্বস্তি ও প্রশান্তি পায় । কিন্তু যে হৃদয়ে মহানবীর আহলে বাইতের প্রতি ভালোবাসা নেই এবং তাঁদের বেদনায় বেদনাদগ্ধ হয় না সে এরূপ প্রশান্তির অর্থ বোঝে না । তার কাছে এ ধরনের শোক প্রকাশ অর্থহীন কর্ম বলে প্রতীয়মান হয় । কেননা ,সন্তানহারা মায়ের আর্তনাদ ও আহাজারির সাথে অপরিচিত ব্যক্তির কাছে এরূপ মায়ের বাঁধনহারা ক্রন্দন পাগলের বিলাপ ছাড়া কিছুই নয় ।

3 কোন ব্যক্তি যে কোন মুসিবতের কারনেই মনোবেদনায় থাকুক না কেন যখন ইমাম হোসাইনের শোকানুষ্ঠানে প্রবেশ করে তখন শোকাবহ পরিবেশ তার মনে প্রশান্তি এনে দেয় । এমন ব্যক্তি কোন আনন্দের অনুষ্ঠানে স্বস্তি বোধ করে না । কারণ ,ঐ পরিবেশ তার মনের সাথে খাপ খায় না ;বরং তার দুঃখক্লিষ্ট মন তার মতোই পরিবেশ চায় যাতে নিজের শোককে প্রকাশ করতে পারে ।

4 যার মন শহীদদের নেতার শাহাদাত আহলে বাইতের নিপীড়িত হওয়ার কষ্ট ও বন্দিত্বের মুসিবতের স্মরণে মূহ্যমান হয়েছে অথবা তার মনে কান্নার ভাব এসেছে সে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে । অবশ্য যদি কারো মন ইমাম হোসাইনের প্রতি ভালোবাসাশূন্য হয় ,তবে এরূপ অসুস্থ ব্যক্তির ক্ষেত্রে আরোগ্য লাভের জন্য অন্য কোন উপায় খুঁজতে হবে ।

সুতরাং ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন করা রোগ তো নয়ই ;বরং তাঁর শোকে শোকাহত না হওয়াই অসুস্থত্র লক্ষণ । তাঁর কষ্টের সমব্যথী ব্যক্তি তাঁর স্মরণে অনুষ্ঠিত সমাবেশে অংশগ্রহন ও ক্রন্দনের মাধ্যমেই প্রশান্তি পায় । ইমাম হোসাইনের জন্য ক্রন্দন করা দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ অর্জন ছাড়াও তাঁর আন্দোলনের মহান লক্ষ্যকে বাস্তবায়ন ,ইসলামের পথে শাহাদাত ও আত্মত্যাগের আদর্শকে নিজেদের মধ্যে জাগ্রত রাখা এবং সত্যের প্রতিষ্ঠায় সাহসী ভূমিকা পালনের অনুপ্রেরণা দেয় ।

5 সামষ্টিকভাবে শোক পালনের অন্যতম সুফল হলো শোকাহত ব্যক্তির মানসিক চাপ দ্রুত পশমিত হয় । যেহেতু এরকম অনুষ্ঠানে সকলের মধ্যে একই অনুভূতি সৃষ্টি হয়ে সবার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে । তাছাড়া এতে পারস্পারিক মত বিনিময় এবং এক অপরের সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয় । ফলে কষ্ট সহ্য করা সহজ হয়ে যায় । উত্তম আচরণ ও বিষয়ের অন্যের অনুসরণ ,পারস্পারিক মেলামেশার মাধ্যমে শিক্ষা লাভ ,অন্য মানুষের প্রতি ভালোবাসা ও সহানুভূতি জাগা ও মন হালকা হওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলোও এ থেকে অর্জিত হয় । মানসিক চাপ কমাতে এগুলোর ভূমিকা অনস্বীকার্য ।

ইমাম হোসেইনের স্মরণে আয়োজিত শোকানুষ্ঠানে তাঁর শোকে শোকাহত ব্যক্তিদের সামষ্টিক অংশগ্রহনের ফলে উপরিউক্ত সকল কল্যাণ হস্তগত হয় । মুমিন ব্যীক্তরা ইমাম হোসাইনের প্রতি এভাবে তাদের ভালোবাসা ব্যক্ত করার মাধ্যমে মানসিক প্রশান্তি অর্জন করে ।

প্রশ্ন 69 :ইসলামে দুঃখ ও আনন্দের স্থান কোথায় ?

উত্তর : ইসলাম হাসি -আনন্দ এবং দঃখ -শোকের কোনটিকেই সত্তাগতভাবে মূল্যবান বা মূল্যহীন অথবা পছন্দনীয় বা অপছন্দনীয় গণ্য করে নি । তাই এই দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্যের কোনটিই অপরটির ওপর শেষ্ঠত্ব বা প্রাধান্য রাখে না । কোন কারণ ছাড়াই ক্রন্দন বা আনন্দ করা একটি ভালো কাজ ,এমন কথা ইসলাম বলে না । তবে আনন্দ বা হাসির কারণ ও উদ্দেশ্যের ভিক্তিতে তা ভালো বা মন্দ হতে পারে । হাসি -কান্না মানুষের আত্মিক অবস্থা ও বৈশিষ্ট্যের প্রকাশক । এ দু টি কাজ সামাজিক সম্পর্ক ও আল্লাহর দাসত্বের পথে নেতিবাচক প্রভাব না ফেললে তা সমর্থনযোগ্য ও কাঙ্কিত কর্ম ।

যদি ক্রন্দন মানুষের মনে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে ,তা সঠিক লক্ষ্যে পৌঁছার ক্ষেত্রে এবং আল্লাহর দাসত্ব ও মানবসেবার পথে প্রতিবন্ধক হয় তবে তা নিন্দনীয় । তেমনি হাসি ও আনন্দ যদি ধর্মীয় ও মানবিয় দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে তা সমালোচিত । হাসি ও ক্রন্দন এই দুই সহজাত অনুভূতির উৎস ও ফলাফলের ওপর এদের মূল্য নির্ধারিত হয় ।

হাদীসে অজ্ঞতাপ্রসূত ও অর্থহীন হাসিকে নিন্দা এবং জ্ঞানপ্রসূত ও অর্থপূর্ন হাসিকে মূল্যায়ন ও প্রসংসা করা হয়েছে । ইমাম হাসান আসকারী ( আ .) বলেছেন : অর্থহীন হাসি অজ্ঞতার পরিচায়ক । 541 ইমাম কাযিম ( আ .) বলেছেন : যে ব্যক্তি কোন কারণ ছাড়া অযথা হাসে আল্লাহ্ তাকে ঘৃনা করেন । 542

সুতরাং সকল হাসিই মন্দ ও নিন্দিত নয় । তেমনি সকল কান্না ও দুঃখও অপছন্দনীয় নয় । যেমন আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনইসলামে অত্যন্ত মূল্যবান গণ্য হয়েছে । ইমাম বাকির ( আ .) বলেছেন : মহান আল্লাহর কাছে রাতের অন্ধকারে তাঁর ভয়ে নিষ্ঠার সাথে এক ফোঁটা অশ্রু বিসর্জন ও ক্রন্দনের চেয়ে প্রিয় কিছু নেই । 543

হযরত আলী ( আ .) বলেছেন : আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন আল্লঅহর রহমত বর্ষনের চাবিসরূপ । অন্যত্র তিনি এ ধরনের কান্নাকে অন্তরের আলো ও গুনাহ থেকে ফিরে আসা ও দূরে থাকার নিয়ামক বলেছেন ।544

যেহেতু এ ধরনের ক্রন্দন জ্ঞান থেকে উদ্ভুত ও মানবীয় সহজাত প্রকৃতির সাথে সঙ্গতিশীল তাই তা মূল্যবান । এ কান্না আত্মগঠন , আত্মসংশোধন ও আত্মিক উন্নতির সহায়কই শুধু নয় ; বরং এজন্য অপরিহার্য । আল্লাহর বান্দাদের বিশেষত তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিপদে ও কষ্টে সহানুভূতি ও একাত্মতা প্রকাশে ক্রন্দনও এরূপ কান্নার অন্তর্ভূক্ত ।

হাসি ও আনন্দও কখনই মন্দ ও অসুন্দর নয় । মহানবী ( সা .)- এর জীবনীতে এসেছে , তিনি তার কোন সাহাবাকে বিষন্ন দেখলে তাকে আনন্দ দানের মাধ্যমে খুশি করতে চেষ্টা করতেন ।545 তাই শরীয়তের সীমায় কৌতুক ও আনন্দ করা অপছন্দনীয় তো নয়ই , কখনও কখনও কাঙ্খিত ।

এমনকি বিশেষ অবস্থা ছাড়া সাধারণভাবে মানুষের হৃদয় সবসময় প্রফুল্ল থাকা বানঞ্ছনীয় । তাই মনকে প্রফুল্ল রাখার জন্য শরীয়ত সমর্থিত প্রচলিত সকল পন্থা অবলম্বনে কোন সমস্যা নেই । যেমন খেলাধুলা , ব্যায়াম , ভ্রমণ , সুগন্ধি ও আতর ব্যবহার , আনন্দদায়ক পোশাক পরিধান , সর্বক্ষণ ভালো ও ফলদায়ক ও উপকারী কাজে ব্যস্ত থাকা ইত্যাদি । এগুলো মানুষের মনকে সতেজ ও প্রফুল্ল রাখে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে । ইসলামে মুমিনদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে সবসময় মুখে মৃদু হাসি , হাসিমুখে সকলকে অভ্যর্থনা জানানো , অন্যের সঙ্গে সহজেই মেশা ও আচরণে তাদের আকৃষ্ট করা ইত্যাদি উল্লেখিত হয়েছে । আর এর বিপরীতে ভ্রুকুঞ্চিত মুখ , কর্কশ ও কঠোর আচরণকে মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে ।546

মানবজাতির মহাআদর্শ মহানবী ( সা .) বলেছেন : আমিও মানুষ হিসেবে তোমাদের সাথে হাসি - ঠাট্টা করি , কিন্তু কখনও আমার কথা ও আচরণ সত্যকে অতিক্রম করে না ( অর্থাৎ সত্যের মানদণ্ডকে বজায় রেখেই আমি তা করি )।547

রাসূল ( সা .) একবার কৌতুক করে বলেন : কেবল সুন্দর যুবকরাই বেহেশতে প্রবেশ করবে । উপস্থিত বৃদ্ধরা এতে উদ্বিগ্ন হয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন : তোমরা প্রথমে যুবক হবে , তারপর বেহেশতে প্রবেশ করবে ।

অতএব , ইসলামের দৃষ্টিতে কাঙ্খিত আনন্দ হলো সেটাই যা অন্য মুমিনকে সন্তুষ্ট করা , সামাজিক বন্ধন দৃঢ় করা , আচরণের মাধ্যমে ইসলামের রূপকে সুন্দররূপে উপস্থান করার লক্ষ্যে সম্পাদিত হয় । তাই এই হাসি ও আনন্দের পেছনে ধর্মীয় বিশ্বাস , ইসলামের বিধান , নৈতিক ও সামাজিক কল্যান নিহিত রয়েছে । সঠিক চিন্তা ও শিক্ষার প্রসার তার অন্যতম লক্ষ্য ।

কাউকে অপমান , সমালোচনা ও তিরস্কার , ঠাট্টা ও বিদ্রুপ , গীবত ও অপবাদ আরোপের উদ্দেশ্যে যদি হাসা হয় ও আনন্দ করা হয় তবে তা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত হবে এবং তা অবৈধ । তেমনি বিভিন্ন হাদীসে অট্টহাসি ও আনন্দের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘন ও মিথ্যা বলে মানুষকে হাসানো নিন্দিত হবে ।

রাসূল ( সা .) বলেছেন : অধিক হাসি ঈমানকে বিলীন করে । 548

তিনি আরো বলেছেন : অট্টহাসি শয়তানের থেকে । 549

সুতরাং কেউ আনন্দের বিষয়টি সম্পূর্নভাবে জীবন থেকে বাদ দিতে চায় তা ঠিক নয় । কেননা , সব ক্ষেত্রেই হাসি ও আনন্দ গুনাহ নয় ।

আর ক্রন্দনের ক্ষেত্রেও কেবল সেই ক্রন্দনই মূল্যবান যা আল্লাহর ভয় ও ভালোবাসা এবং তার পছন্দনীয় বান্দাদের ওপর আপতিত মুসিবতে হয় । কারণ , এ কান্না জ্ঞান , নৈতিকতা ও আল্লঅহর পরিচয় ও ভীতি থেকে উৎসারিত । আর যে ক্রন্দন অযৌক্তিক ও পার্থিব কোন কারণে হবে তা নিন্দনীয় । তাই এ ধরনের কোন কারনে চিৎকার করে কান্না , মাথা ওবুক চাপড়ানো নিন্দনীয় কর্ম ।

মোটকথা মুসলমানদের সামাজিক ও ব্যক্তিগত জীবনে প্রফুল্ল , সজীব ও সতেজ থাকা বাঞ্ছনীয় এবং এটা সামাজিক দায়িত্ব পালন ও ব্যক্তি উন্নয়নের অপরিহার্য । এভাবেই তারা তাদের প্রতিভা ও যোগ্যতার বিকাশ ঘটাতে পারবে ।

স্বাভাবিকভাবে তার জীবনে এ অংশটা প্রাধান্য পাবে । এ কারনেই ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য হাস্যমুখ ও প্রফুল্ল স্বভাবের বলা হয়েছে । হাদীসে এসেছে : মুমিনের মুখ হাস্যোজ্জল এবং তার কষ্ট তার অন্তরে । 550

অন্যদিকে ইসলামে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করার প্রতি তাগিত দেয়া হয়েছে , কিন্তু তা একাকিত্বে ও গোপনে করতে বলা হয়েছে । প্রকাশ্যে মানুষের উপস্থিতিতে করতে নিষেধ করা হয়েছে । হাদীসে বলঅ হয়েছে : সিজদার সময় ক্রন্দন করা হলো আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সবচেয়ে নিকটবর্তী অবস্থা । 551 তেমনি বর্ণিত হয়েছে : রাতের অন্ধকারে আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দনে ঝরা একফোঁটা অশ্রু আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় । 552

তবে মনে রাখতে হবে ,ইসলাম ব্যক্তি ও সমাজের মানুষের মন প্রফুল্ল ও সতেজ থাকাকে আবশ্যক মনে করে ,কিন্তু এর অর্থ এটা নয় যে ,ইসলাম মানুষকে হাসানোর জন্য কোন অনুষ্ঠানের আয়োজন করাকে জায়েজ সনে করে ;বরং এসব হাসি ঠাট্টার অনুষ্ঠানকে বাতিলপন্থীদের কাজ বলে মনে করে ও এধরণের ব্যক্তিদের ক্ষতি গ্রস্থ বলে গণ্য করে ।553 অন্যদিকে ইসলাম মুমিনকে প্রফুল্ল থাকতে বলেছে ,ঠিকই কিন্তু তাকে সব সময় আল্লাহর স্মরণে রাখতে ,তার ভয়ে ক্রন্দন করতে এবং তার নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দাদের শোকে শোকাহত ও তাদের বেদনায় ক্রন্দন করতেও বলেছে ।

মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে আনন্দ

আনন্দের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে যে ,কোন জয় ও কাঙ্ক্ষিত বস্তু পাওয়ার ফলে অর্জিত মানসিক শান্তির অনুভূতি । কষ্টহীন সুখকেও আনন্দ বলে অভিহিত কার হয়েছে । অ্যারিষ্টটলের দৃষ্টিতে সবার আনন্দের অনুভূতি হলো শারীরিক আনন্দ লাভ ;মধ্যম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের সুখ হলো ভালো কাজ করার ফলে আনন্দ পাওয়া এবং সর্বোচ্চ পর্যায়ের সুখ ও আনন্দ হলো জ্ঞান লাভ ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন । সক্রেটিস এজন্যই বলেছেন : আমি দুঃখিত মানুষ হওয়াকে আন্দিত শুকর হওয়ার ওপর প্রাধান্য দেই । কেননা ,সে যদিও দৈহিকভাবে সর্ব্বোচ্চ সুখ ভোগ করে ,কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তার চেষ্টাগত অবস্থানকে নির্ণয়ে সক্ষম নয় । তাই নিজের সন্তুষ্টিকে ব্যক্ত করতে পারে না ।

এ দৃষ্টিতে আনন্দ হলো সন্তুষ্টি ও সুখের পর্যায়ের (প্রকারের ) সমষ্টি । তাই মানুষ জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন যাপনের আনন্দ লাভে সক্ষম না হলেও যেন সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করে ।

আনন্দিত থাকার পন্থা সম্পর্কে নিম্নোক্ত কাজগুলোকে উল্লেখ করা হয়ে থাকে : 1 .উদ্বিগ্নতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ;2 .প্রতিকূলতা মোকাবিলা ও সহ্য করার ক্ষমতা বৃদ্ধি ;3 .ভ্রমণ .4 .খেলাধুলা ;5 .সাজা ওসুন্দর পোশাক পরা ;6 .আনন্দ অনুষ্ঠানে যোগদান ;7 .কামনা -বাসনাকে সীমিত করা ;8 .মৃদু হাসি ও কৌতুক করা ।

সুতরাং আনন্দ লাভের অন্যতম পথ হলো মৃদুহাসি ,কিন্তু মনে রাখতে হবে ইসলামী জীবনে যে বিষয়টি কাঙ্খিত তা হলো সবসময় আনন্দে থাকা ,সবসময় হাসা নয় । এ দুয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে । এ আনন্দ ধর্মীয় ও নৈতিক জীবনের ছায়ায় অর্জিত হয় ।

যদি হাসির মাধ্যমে রোগ ও অসুস্থতার চিকিৎসা করা যায় তবে কেবল তা দৈহিক ও পার্থিব কষ্টের জন্য নিরাময়ের ভূমিকা পালন করে । কিন্তু মানব সমাজের সদস্য হিসেবে প্রত্যেক মানুষ সকল মানুষের কষ্টের সমব্যথী । তাই সে শুধু নিজের কষ্ট থেকে মুক্তি পেলেই আনন্দ অনুভব করে না ;বরং তার মনুষ্যত্বের দাবি হলো তার আনন্দ হবে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বিবেকপ্রসূত এবং জ্ঞান ,ন্যায় ,সত্য ও ভালোবাসার ভিক্তিতে আনন্দকে সার্বজনীনভাবে ছড়িয়ে দেয়ার লক্ষ্যে । এ আনন্দের অধিকারীরা নিজেকে বঞ্চিত রেখেও অন্যদের আনন্দিত করতে চায় । তারা ততক্ষণ আনন্দের স্বাদ পায় না যতক্ষণ না সকলকে আনন্দিত দেখে ।

ধর্মীয় দৃষ্টিতে শোকের অনুষ্ঠান পালনের লক্ষ্যে ।

মূলত তিনটি উদ্দেশ্যে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করা হয় :

1 .মহান আল্লাহর ইবাদত ও সন্তুষ্টি অর্জন ।

2 .ধর্মীয় জ্ঞান ,বিধিবিধান ,সামাজিক ও ব্যক্তিগত আচার -আচরণ এবং জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় সার্বিক বিষয় শিক্ষাদান করা ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য ;

3 .মানুষের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সৃষ্টি এবং মুমিনদের মধ্যে ভাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ়করণ ;

4 .মহান আল্লঅহর পথে তাঁর যে সকল মহান বান্দা আত্মোৎসর্গ করেছেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন এবং তাদের প্রদর্শিত পথে জীবন অতিবাহিত করার জন্য প্রতিশ্রুতবদ্ধ হওয়া ।

বিশেষ শোকের দিনগুলোতে কালো পোশাক পরিধান

প্রশ্ন 70 : কালো পোশাক পরিধান কি মনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না ?তবে কেন শোকের দিনগুলোতে কালো পোশাক পরা হয় ?

এ ধরনের চিন্তা মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে মানুষের মনের ওপর বিভিন্ন রংয়ের প্রভাবের যুক্তিনির্ভর । মনে রাখা আবশ্যক ,যদি কেউ জীবনের প্রতি নিরাশ হয়ে একে নিরর্থক ভেবে সবসময় কালো পোশাক পড়ে (অন্য রংয়ের পোশাককে চিরতরে বর্জন করে ) তবে হয়তো এমন চিন্তার ফলে কারো মনের ওপর ঐ রংয়ের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে ,কিন্তু যদি কেউ এমন চিন্তার বশবর্তী না হয়ে শুধুই শোকের আবহ সৃষ্টির জন্য ও অন্যদেরকে শোকের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত করার জন্য তা পরে ,মনস্তাত্ত্বিকভাবে এমন ব্যক্তির ওপর ঐরূপ প্রভাব কখকই পড়তে পারে না । কেননা ,রংয়ের প্রভাব মানুষের মনের ওপর এতটা তীব্র নয় যে ,কেউ সীমিত দিন ও সময়ের জন্য কালো পোশাক পড়লে তার চিন্তা -চেতনা ও আচরণে অস্বাভাবিক প্রভাব ফেলবে । এরূপ ক্ষেত্রে কালো পোশাক পরার অর্থ জীবনের প্রতি নিরাশ হওয়া নয় ;কারো ওপর প্রিয় ও নিকট কাউকে হারানোর মতো বিপদ ও দুঃখ আপতিত হলে এরূপ পোশাক তার মনে দুঃখের অনুভূতি সৃষ্টি করে ও তাকে এ শোকের কথা স্মরণ করিয়ে দেয় ও নীরবতা পালনে উদ্বদ্ধ করে । এভাবে তার মনের সাথে তা বহ্যিক ভূষণের সমরূপতা দেখা দেয় যা তার মনের সান্তনার কারণ হয় । তাকে আনন্দময় পরিবেশ থেকে দূরে রাখে । তাই সাময়িক সময়ের জন্য এমন রংয়ের পোশাক পরা ক্ষতিকর নয় ।

কিন্তু ইসলামে সকল সময় এ রংয়ের পোশাক পরতে নিষেধ করা হয়েছে । যেমন হাদীসে এসেছে : কালো পোশাক পরিধান করো না ,কেননা ,তা ফিরআউনের পোশাক ।554 এর বিপরীতে ইসলামের সবচেয়ে পছন্দীয় রং হলো সাদা । হাদীসে বর্ণিত হয়েছে : সর্বোত্তম পোশাক হলো সাদা । 555 ইসলামের দৃষ্টিতে সাদা হলো দিনের প্রতীক -যা প্রশান্তি ,সজীবতা ,কর্মচঞ্চলতা ও চেষ্টা প্রচেষ্টার চিহ্ণবাহী । সাদার পর ইসলামের পছন্দের রং হলুদ ও সবুজ । কালো হলো ক্লান্তি ও অবসানের প্রতীক ।

তাই কালো পোশাক পরার অনুমতি সাময়িকভাবে শোকের দিনের জন্য দেয়া হয়েছে । ইবনে আকিল হাদীদ বর্ণনা করেছেন : ইমাম হাসান (আ .)-এর মৃত্যুর পর কালো পোশাক পরে জনতার সামনে উপস্থিত হন । এভাবেই তাদের সামনে বক্তব্য রাখেন ।556 কিন্তু সাধারণভাবে এ রংয়ের পোশাক পরা অপছন্দনীয় এবং কালো পোশাক পরে নামায পড়া মাকরুহ ।

প্রশ্ন 71 : কিভাবে ইমাম হোসাইনের স্মরণে আমরা ক্রন্দনের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করব ?

এ প্রশ্নের উত্তর দানের জন্য প্রথমে মনের কষ্ট ও বেদনাকে প্রকাশের একটি মধ্যম ও আচরণগত অবস্থা হিসাবে কান্নাকে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন । এতে এধরণের অনুভূতি প্রকাশে যে সকল প্রভাব উপাদান ও কারণ হয়েছে তাকে কার্যকর করার পদ্ধতি বর্ণনা করে ।

কান্না অনেক প্রকার ;কান্নার ধরণ আনন্দের কান্না থেকে শোকের কান্না পর্যন্ত বিস্তৃত । যেহেতু ইমাম হোসেইনের জন্য কান্না শোকের কান্না ,তাই আমাদের আলোচনা এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখব ।

শোকের কান্না দুঃখের অনুভূতির প্রতিক্রিয়ায় দুঃখভরাক্রান্ত ব্যক্তি থেকে প্রকাশিত হয় । এটি শোক ও মনঃকষ্টের একটি আচরণগত ও সামাজিকভাবে প্রকাশিত রূপ । সুতরাং আজাদারিতে ক্রন্দন করতে হলে এর উদ্দীপক ও নিয়ামকগুলোকে অর্জন করতে হবে । কোন শোকাবহ ঘটনা ,যেমন প্রিয় কোন বস্তু বা মানুষকে হারানোর প্রতিক্রিয়ায় দুঃখের অনুভূতি সৃষ্টি হয়ে থাকে । কারো কাছে যদি ইমাম হোসাইন অত্যন্ত প্রিয় বলে গণ্য হন তবেই কেউ তার বিচ্ছেদে ক্রন্দন করবে । যদি কারো অন্য কিছুর প্রতি বেশী ভালোবাসা থাকে তবে তার হৃদয় ইমাম হোসাইনের জন্য আলোড়িত হবে না ।

ইমাম হোসাইনের শাহাদাত ও তাঁকে হারানোর বেদনা যদি মনে প্রচন্ড প্রভাব ফেলে তবেই কারো কান্না পাবে । আর এ ধরনের অনুভূতি সৃষ্টির জন্য এ মহান ব্যক্তিকে আমাদের চিনতে হবে । যখন কেউ তার জীবনে কোন ব্যক্তি বা বস্তুর ভূমিকা ও প্রভাব সম্পর্কে জানবে কিংবা তার কাছে মহামূল্যবান বলে গণ্য কোন কিছুর প্রতিরক্ষায় কারো আত্মত্যাগী অবদানের কথা শুনবে তাঁর প্রতি ব্যক্তির মনে ভালোবাসার বন্ধন সৃষ্টি হবে ।

তাই ইমাম হোসাইনের জন্য কান্নার জন্য প্রথমে তাঁর সঠিক পরিচিতি অর্জন করতে হবে । ইমাম হোসাইনের ব্যক্তিত্ব ,তাঁর আদর্শ ও অনুসৃত পন্থা ,তাঁর জীবনের লক্ষ্য ,তাঁর বিশ্বাস ,ব্যক্তি ,সমাজ ও ইসলামের জন্য তাঁর আত্মত্যাগী ভূমিকা ,আমাদের জীবনে তাঁর চরিত্র ও কর্মের প্রভাব -এগুলোর সবই তাঁর সাথে আমাদের ভালোবাসার সম্পর্ক সৃষ্টি করে । অবশ্য এ পরিচিতি শুধু চিন্তাজগতে থাকা যথেষ্ট নয় ;বরং আমাদের জীবনে এ ভালোবাসার সরব ও লক্ষ্যনীয় উপস্থিতি থাকতে হবে ,তবেই তাঁর অনুপস্থিতি আমাদের জন্য বেদনাদায়ক ও অসহনীয় হবে । এমনভাবে আমাদের জীবনে তাঁর উপস্থিতি থাকতে হবে যেন আমরা অনন্তকাল ধরে এ মহান পুরুষের সান্নিধ্যে কাটিয়েছি এবং তার সুন্দর ও প্রেমপূর্ণ ছোঁয়া আমাদের প্রতি মুহূর্তে স্পর্শ করেছে । আমরা যেন তাকে হারিয়ে তাঁর দয়া ও অনুগ্রহের সংস্পর্শ থেকে বঞ্চিত হয়েছি ।

যে ব্যক্তি তার মধ্যে ইমাম হোসাইনের উষ্ণ উপস্থিতি ও ভালোবাসাকে যত বেশী অনুভব করবে তাঁর বিচ্ছেদ তাকে তত বেশী মর্মাহত করবে । যে অনুভব করবে ইমাম হোসাইনের সাথে সে অনন্তকাল জীবন কাটিয়েছে ও তার স্নেহ ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছে সে তাঁর সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাবে ;তাঁর কষ্ট ,দুঃখ ও বেদনাকে নিজের দুঃখ কষ্ট ও বেদনার চেয়ে অসহনীয় মনে করবে । (আর এ অবস্থাটি কেবল তাদের মনেই সৃষ্টি হয় যারা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে তাদের পিতামাতা ,সন্তান ,স্ত্রী ,গোত্র ,জাতি ,ব্যবসা -বানিজ্য ,বাসস্থান ও গৃহ ,এমনকি নিজেদের প্রান থেকেও ভালোবাসে যেরূপ ভালোবাসার নির্দেশ আল্লাহ সূরা তাওবার 24 নং আয়াতে দিয়েছেন এবং তা না থাকাকে অবাধ্যতা বলে গণ্য করেছেন ।)

প্রশ্ন 72 : মানুষের কর্ম ও আচার -আচরণ অবশ্যই তার বুদ্ধিবৃত্তি ও চিন্তা এবং জ্ঞান -পরিচিতির ভিক্তিতে হওয়া উচিৎ :তাহলে কেন আশুরার শোকানুষ্ঠান আবেগ -অনুভূতি ও উদ্দীপনার ভিক্তিতে করা হয় ? তদুপরি আবেগ -অনুভূতির মধ্য হতে কেন শুধু নেতিবাচক অনুভূতি ,যেমন ক্রন্দন ও বিলাপকে বেছে নেয়া হয় ? আশুরার অনুষ্ঠান কেন হাসি -আনন্দ ,নিরবতা পালন এবং সভা -অধিবেশনের মাধ্যমে পালিত হয় না ?

উত্তর : এ প্রশ্নের জবাবে প্রথমে ভূমিকা হিসিবে দু টি প্রশ্ন উপস্থাপন করব । এরপর এদু টি প্রশ্নের শেষে মূল প্রশ্নের উত্তরে যাব । প্রথমত ,কোন উপাদানগুলেঅ মানুষের আচার -আচরণের প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তার করে ?দ্বিতীয়ত ,মুসলমানরা কোন উদ্দেশ্যে ইমাম হোসাইন (আ .)-এর জন্য শোকানুষ্ঠান পালন করে ?

প্রথমত ,আচার আচরণ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারকারী উপাদাসমূহ

মানুষ থেকে যে অসংখ্য আচরণ এবং কর্ম প্রকাশিত হয়ে থাকে তার মধ্য হতে একটি হলো আশুরার ঘটনার স্মরণ ও শোকপালন । সুতরাং মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে মানুষের আচার -আচরণের ওপর কার্যকর সুফল মূলনীতি ও নিয়ম থেকে এটা ব্যতিক্রম নয় । তাই যে সকল মূলনীতি ,নিয়ম ও ক্ষেত্র কোন আচরণের পেছনে বিদ্যমান ইমাম হোসাইনের শোক পালনের আচরণের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য ।

মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে কমপক্ষে দু টি মৌলিক উপাদান মানুষের কর্ম ও আচার -আচরণের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে । একটি পরিচিত এবং অপরটি উৎসাহ -উদ্দীপনা ।

মানুষের আচরণের একটি কার্যকারী উপাদান হলো পরিচিতি ও জ্ঞান । যার মাধ্যমে মানুষ কোন বিষয়কে অনুধাবন করে ,একে গ্রহন করে এবং এর ওপর ভিক্তি করে কাজ করে থাকে । মানুষ যতক্ষণ পর্যন্ত কোন বিশেষ বিষয় সম্পর্কে না জানে ও তার সাথে পরিচিত না হয় ততক্ষণ ঐ বিষয়ে কর্মে প্রবৃত্ত হয় না । তবে কোন বিষয়ে বিশেষ আলোচনার ক্ষেত্রে পরিচিতিমূলক উপাদান জরুরি ,কিন্তু তা যথেষ্ট নয় । কোন কাজের জন্য পরিচিতি ছাড়াও অন্যান্য উপাদান থাকতে হবে যা ঐ আচরণের প্রকাশের জন্য আমাদেরকে উৎসাহ যোগাবে । ঐ বিষয়ের প্রতি উৎসাহ -উদ্দীপনা সৃষ্টি হতে হবে ,ফলে কাজটি বাস্তব রূপ লাভ করবে । কোন আচরণের ক্ষেত্রে আবশ্যকভাবে এর প্রতি আকর্ষন ও উৎসাহ -উদ্দীপনা সৃষ্টি হতে হবে তা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহন করতে পারে ।

একটি সাধারণ উদাহরনের মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা সম্ভব । কোন পথ অতিক্রম করার জন্য পথের নকশা এবং তা পাড়ি দেয়ার জন্য বাহন ও মাধ্যম প্রয়োজন । পরিচিতিমূলক উপাদান পথের নকশার মতো কাজ করে ,কিন্তু মানুষের আচরণের যন্ত্র চালু হওয়ার জন্য নকশা ছাড়াও আরো শক্তিশালী কোন উৎপাদন দরকার যা দিয়ে সে নির্দিষ্ট পথে যাত্রা শুরু করতে পারে । অর্থাৎ উৎসাহ -উদ্দীপনা মানুষের আচরণের জন্য ইঞ্জিনসরূপ এবং পরিচিতিমূলক জ্ঞান হলেঅ নকশা । সুতরাং স্পষ্ট যে ,কোন বিষয় সম্পর্কে পরিচিতি ও জ্ঞান -যা নকশার ভূমিকা পালন করে ,তা কোন বিশেষ কাজ ও আচরণকে বাস্তব রূপ দানের জন্য যথেষ্ট নয় এবং তা আমাদের মধ্যে গন্তব্যস্থলের দিকে যাত্রার জন্য গতির সৃষ্টি করে না ।

যদিও শোক প্রকাশের জন্য কারবালার ঘটনা এবং ইমাম হোসাইন (আ .)-এর ব্যক্তিত্ব এবং তাঁর আন্দোলনের উদ্দেশ্যে সম্পর্কে পরিচিত থাকা অত্যন্ত জরুরী ,কিন্তু তা যথেষ্ট নয় ;পরিচিতি ছাড়াও উৎসাহ -উদ্দীপনার প্রয়োজন রয়েছে ।

অনেক মানুষ আছে যারা ইমাম হোসাইন (আ .) সম্পর্কে জানে ,কিন্তু তাদের শোক প্রকাশের জন্য কোন উৎসাহ নেই । এ কারণেই বছরের পর বছরমুসলমান হিসেবে জীবনযাপন করলেও এবং তারা তৃতীয় ইমাম হিসেবে ইমাম হোসাইনের সাথে অপরিচিত না হলেও তাদের অন্তরে শোক পালনের বিন্দুমাত্র উৎসাহ খুঁজে পাওয়া যায় না । এমনকি তাদের কেউ কেউ ইমাম হোসাইন (আ .)-এর প্রতি শোক পালনকারীদের ঠাট্টা -বিদ্রুপ করে থাকে । তাদের এ শোক পালনকে মূর্খতা ও অর্থহীন কর্ম এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বলে মনে করে । এ শ্রেণির দৃষ্টিতে ইমাম হোসাইন (আ .) একটি আন্দোলন করেছেন ,ভালো -মন্দ যাই হোক না কেন ,তা গত ও নিঃশেষ হয়ে গেছে ? কেন আমরা এত বছর এবং শতাব্দী পরও শোক পালন করব ,এ ঘটনাকে পুনরুজ্জীবিত করব ? এ কাজের প্রয়োজনীয়তা আছে কি ?এতে ইমাম হোসাইন (আ .) বা আমাদের কোন লাভ আছে কি ?

কিন্তু শোকানুষ্ঠান কিভাবে উৎসাহ -উদ্দীপনা বৃদ্ধি করা যায় -এটি অন্যত্র আলোচনার বিষয় এবং উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তরের সাথেও সম্পর্কিত নয় । বর্তমানে আমাদের মূল আলোচনার বিষয় হলেঅ কোন উৎসাহ -উদ্দীপনার কারণে ইমাম হোসাইন (আ .)-এর জন্য শোক প্রকাশকারীরা আযাদারি ও শোক পালন করে থাকে । মূলত আমরা জানতে চাই ,কোন ধরনের আচরণ থেকে শোকপালনের দু টি মৌলিক উপাদান (পরিচিতি এবং উৎসাহ -উদ্দীপনা ) প্রতিফলিত হয় ।

দ্বিতীয়ত ,মুসলমানরা কোন উদ্দেশ্যে ইমাম হোসাইন (আ .)-এর জন্য শোকানুষ্ঠান পালন করে

উৎসাহ -উদ্দীপনা কোন আচরণের কারনকে ব্যাখ্যা করে । অর্থাৎ যখন কোন কাজের পেছনে বিদ্যমান উৎসাহ -উদ্দীপনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে তখন এর উদ্দেশ্যে হলেঅ কোন কারণে এ ধরনের আচরণ করা হয়েছে এবং কোন বিষয়গুলো একাজের অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে তা জানতে চাওয়া । আমাদের খুব ভালোভাবে জানা রাখা দরকার কেন মুসলমানরা শোকপালনের সংস্কৃতি এবং ইমাম হোসাইন (আ .) ও তাঁর অন্দোলনের প্রতি অনুরাগ দেখায় ।

প্রত্যেক ব্যক্তি তার পরিচিত এবং উৎসাহ উদ্দীপনার পর্যায় অনুযায়ী শোক পালন করে থাকে । অর্থাৎ শোক পালনের ক্ষেত্রেমুসলমানদের উৎসাহ -উদ্দীপনা প্রকাশের অনেক ধরণ থাকতে পারে । কিন্তু মুসলমানদের অন্তরে যে সকল উদ্দীপনােএ বিষয়টির পেছনে কাজ করে সেগুলোকে তালিখা আকারে প্রকাশ করা এখানে উদ্দেশ্যে নয় ;বরং এ বিষয়টি বিশ্লেষনের উদ্দেশ্য হলো ঐ সকল উদ্দীপনার বিষয় বর্ণনা করা যেগুলো গ্রহনযোগ্য ধর্মীয় শিক্ষা এবং এর প্রসারে কাজে লাগে অথবা ঐ সকল সার্বিক বিষয় বর্ণনা যেগুলেঅ মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের ক্ষেত্রে বর্ণনা করা হয়ে থাকে ।

ইসলামী চিন্তার গভীরে এবং মানুষের স্মৃতিতে স্থায়িত্ব লাভের দৃষ্টিতে কোন ইতিহাসে সৃষ্টিকারী ঘটনা নিম্নলিখিত তিনটি উদ্দেশ্যে পালিত হয়ে থাকে :

1 .স্মৃতিতে ঐ ঘটনাকে পুনরুজ্জীবিত এবং পুনঃনির্মাণ করা ।

2 গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মর্যাদা রক্ষা এবং এর রচয়িতাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞপন ।

3 বর্তমান ও ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য শিক্ষাগ্রহন এবং আদর্শ বিনির্মাণ ।

যেহেতু আশুরার ঘটনাটি নবুয়াতের মিশন557 ও ইসলামের অব্যাহততার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং সকল যুগের মানুষের দ্বীনি উদ্দেশ্যকে (নৈতিক বিকাশ এবং সমাজের হেদায়েত )অর্জনের লক্ষ্যে সম্পাদিত হয়েছে ,সে কারনে আমরা শোকানুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে ঐ ঘটনাটিকে স্মৃতিতে জাগরুক এবং ধর্মীয় ও সামাজিক পরিবেশে একে পুনঃনির্মাণ করে থাকি যাতে তা সকল সময়ের জন্য মানবজীবনের আদর্শ হিসেবে থাকে ।

অন্যদিক থেকে মুসলমানদের স্মৃতিতে ইমাম হোসাইন (আ .) সম্পর্কে একটি বিশেষ ধর্মীয় অনুভূতি এবং তাঁর প্রতি ঋণী থাকার অনুভূতি রয়েছে । যদি কেউ নিজেকে ইমাম হোসাইন (আ .)-এর কাছে ঋণী এবং তাঁর প্রতি দায়িত্ব পালন করার উদ্দেশ্যে শোকানুষ্ঠানে অংশগ্রহন করে ;যেন নিজের বিবেককে সন্তুষ্ট করতে পারে । অবশ্য হয়তো এ শোকপালন তাৎক্ষনিকভাবে তার জন্য হেদায়েত ও পথনির্দেশনার উপকরণ নাও হতে পারে ;কিন্তু ঐতিহাসিক এ ঘটনার রচয়িতা ইমাম হোসাইন (আ .) ঐ সময়ে তাঁর মহান ভূমিকার কারণে মুসলমানদের ওপর এ অধিকার রাখেন যে ,শোকের মাধ্যমে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে এবং নিজের ঋণ পরিশোধ করবে ।

স্বাধীনতাকামীদের নেতা ইমাম হোসাইনের জন্য শোকানুষ্ঠান পালন এবং আশুরার বার্তাকে পুনরুজ্জীবিত করার মাধ্যমে তাঁর আন্দোলন থেকে মডেল তৈরী সম্ভব যেন হক ও বাতিলের দ্বন্দ্বে ইমাম হোসাইনের মতো সত্যের পক্ষে বিপ্লবী কাজ করা সম্ভব হয় ।

এ বিষয়টি স্পষ্ট যে ,কোন কর্মের পেছনে বিদ্যমান কারণ ও উদ্দেশ্যই তার ধরণ ,গুণগত মান এবং পরিমাপকে নির্ধারিত করে । মানুষের বসবাসের জন্য নির্মান করা ভবনের কাঠামোর সাথে বানিজ্যিক উদ্দেশ্যে নির্মিত ভবনের পার্থক্য রয়েছে ।

ইমাম হোসাইন (আ .)-এর আন্দোলনের শোক এমনভাবে পালন করতে হবে যেন এর উদ্দে্শ্য ও লক্ষ্যে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের সহযোগী হয় । কিভাবে আমরা ইমাম হোসাইনের শোকানুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি ? হোসাইন ইবনে আলী (আ .)-এর শাহাদতকে এমনভাবে পালন করা উচিত যেন তা মানবজীবন গঠনের শিক্ষা দেয় এবং মুসলমানদেরকে রিসালাতের মিশন বাস্তবায়নের পথে পরিচালিত করে ।

কখনই কয়েকটি প্রবন্ধ পাঠ ,সেমিনার ও সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে ইমাম হোসাইনের উদ্দেশ্যকে বাস্তবায়ন ও আল্লাহর রাসূলের মিশনের পথকে অব্যাহত রাখা সম্ভব নয় ।

যেমনভাবে পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে ,কোন কাজের ধরণ ও গুণগত মান এমনভাবে হতে হবে যেন মানুষের মধ্যে সঠিক উৎসাহ -উদ্দীপনা সৃষ্টিতে সাহায্য করে ,এ কারণে কিছু কিছু অনুষ্ঠান উৎসাহ -উদ্দীপনা সৃষ্টিতে সাহায্য তো করেই না ;বরং তাকে নষ্ট করে । তাই আনন্দ অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে আদালত ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার হোসাইনী আন্দোলনকে উপযুক্ত মর্যাদা দান এবং এর আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয় ।

হয়তো এমন অনেক অনুষ্ঠান রয়েছে যা মানুষের কাজের উদ্দেশ্যের সাথে সাংঘর্ষিক নয় ,কিন্তু তার উদ্দেশ্যের একাংশকেই কেবল পূর্ণ করে অথবা উদ্দেশ্যের সাথে এর কোন সম্পর্কই নেই । উদাহরণসরূপ ,কিছু সময়ে নীরবতা পালনের মাধ্যমে কিভাবে ইমাম হোসাইন (আ .)-এর পথকে অব্যাহত রাখা সম্ভব এবং কিভাবে তাঁর আদর্শের বাস্তবায়নে তা ভূমিকা রাখবে ?যদিও ইমাম হোসাইনের মতাদর্শের পরিচিতি এবং উদ্দেশ্যের প্রচারের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন অথবা একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ উপস্থাপন কিছুটা ভূমিকা পালন করে ,কিন্তু কেবল একাজগুলো ইমামের আদর্শ অনুসারে কর্ম সম্পাদন এবং তাঁর শিক্ষাকে পুনরুজ্জীবিত করার জন্য যথেষ্ট নয় ।

আমরা অনেকে ক্ষমার মতো ভালো গুণ সম্পর্কে জানি ,কিন্তু বাস্তব জীবনে অন্যদের ক্ষমা করার ইচ্ছা পোষণ করি না এবং উৎসাহ খুঁজে পাই না । মহান হোসাইনী আন্দোলনের গুরুত্বের জ্ঞান এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সৌভাগ্যর ক্ষেত্রে এর বিশাল প্রভাবের কথা জানার পরও আমরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে এ পথের ওপর আমল করার জন্য উদ্দীপনা পাই না । কেবল তখনই শহীদদের নেতা সম্পর্কে জ্ঞান এবং তার স্মৃতির স্মরণ আমাদেরকে তাঁর পথ অনুসরণ করার জন্য অগ্রসর করে যখন আমরা উদ্দীপ্ত হই এবং আমাদের মধ্যে উৎসাহের সৃষ্টি হয় । এ উদ্দীপনার ওপর ভিক্তি করেই আমরা এ কাজগুলো করতে পছন্দ করি এবং তাঁর উদ্দেশ্যে এবং অন্দোলেনের পথে পা বাড়াই । অবশ্যই আমাদের আবেগ -অনুভূতিকে এ ধরনের কাজ ও আচরণের প্রতি অনুপ্রাণিত হতে হবে ;তাহলেই আমরা ইমাম হোসাইনের অনুরূপ কাজ করতে পারব এবং এর মাধ্যমে আমাদের ঋণ আদায় এবং তাঁর স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারব ।

এ কারণে এ অনুষ্ঠানগুলোতে যখন দু টি মৌলিক উপাদানের উপস্থিতি থাকবে তখনই তাঁর ঋণ আদায় এবং তাঁর প্রতি কুতজ্ঞতা প্রকাশ করা হবে । এ দু টি মৌলিক উপাদানের একটি ইমাম হোসাইন (আ .)ও তাঁর আন্দোলন এবং উদ্দেশ্যে সম্পর্কে সার্বিক পরিচিতি ;অপরটি হলো পরিচিতির পর আবেগ -অনুভূতিকে তাঁর পথে শক্তিশালী করা এবং মানুষকে ইমামের উদ্দেশ্য ও মতাদর্শ অনুযায়ী চলার জন্য অনু্প্রাণিত করা । অর্থাৎ অন্তরসমূহে হোসাইনী আদর্শের জ্ঞান বৃদ্ধি করা ও উদ্দীপনার সঞ্চার ঘটানো যার ফলাফল দাঁড়াবে ,সে হোসাইন (আ .)-এর মতো কাজ করবে ।

কেউ কেউ মনে করতে পারে ,এইধরণের অনুষ্ঠানগুলোতে আবেগ -অনুভূতির মিশ্রণ থাকার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য ;কিন্তু প্রশ্ন হলো আবেগ -অনুভূতি প্রকাশের বিভিন্ন পদ্ধতি থাকা সত্ত্বেও কেন আমাদেরকে শুধু নেতিবাচক অনুভূতি ,যেমন -ক্রন্দন ,আহাযারি ,শোকগাথার মাধ্যমে তা প্রকাশ করতে হবে ।

ক্রন্দন -হাসি ,আনন্দ -দুঃখ অনুভূতি প্রকাশের দু টি বিপরীতমূখী দিক ;এ দুটিই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটায় । কিন্তু এদর বাস্তব প্রভাব ভিন্ন । এ কারণে এমন আবেগ ও অনুভূতিকে নির্বাচন করতে হবে যেখানে পরিচিতির পাশাপাশি এর উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রও প্রস্তুত করে এবং প্রয়োজনীয় উদ্দীপনা জোগায় । যদি ইমাম হোসাইন (আ .)-এর শোক হাসির অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পালন করা হয় তাহলে তা কখনই হোসাইনী আন্দোলনকে পনুরুজ্জীবিত করার কারণ হবে না । হাসি -তামাশা ও আনন্দ -উল্লাস মানুষকে কখনই শাহাদাত ও ত্যাগের পথে আহবান করতে পারে না ,মানুষের মধ্যে প্রতিরোধ এবং সত্যানুসন্ধানের প্রবণতাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে না ।

আরেক দিক থেকে মানুষের মধ্যে আবে -অনুভূতির সম্পর্কের গভীরতম পর্যায়টি কেবল ক্রন্দন এবং শোকপালনের মাধ্যমে অর্জিত হয় । একসঙ্গে হাসি -আনন্দ করা সবসময় তাদের মধ্যে সত্যিকার অর্থে আত্মিক সম্পর্কের লক্ষণ নয় । কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় আপনার কেউ আনন্দ উল্লাসের অংশীদার ও সাথি হয়েছে ,কিন্তু প্রকৃত অর্থে অন্তরের গভীরে সন্তুষ্ট নাও থাকতে পার । কিন্তু মানুষের অন্তরের গভীর থেকে .উত্থিত .দুঃখ -বেদনা ও ক্রন্দনে বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার মধ্যে তেমন কোন পার্থক্য থাকে না । এ কারণে বলঅ হয় -কারো সুখের সময়ের সঙ্গী হওয়া প্রকৃত বন্ধুর ও প্রেমিকের পরিচয় বহন করে না ,কিন্তু প্রকৃত বন্ধু ও প্রেমিক হলো সে যে আপনার দুঃখ ও অভাবের সময়ে সঙ্গী হয় । এ ছাড়াও দুঃখ -বেদনার কোন সুনির্দিষ্ট ঘটনা থেকে যে গভীর প্রভাবের সৃষ্টি হয় ,আনন্দের ঘটনা থেকে তা হয় না ।

এ দু টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ওপর ভিক্তি করে বলা যায় ইমাম হোসাইন (আ .)-এর সাথে সহযোগীতা করা ক্রন্দনের মাধ্যমে দৃশ্যমান ও স্পষ্ট হয় । কোন মুসিবত ও দুঃখ -ভরাক্রান্ত ব্যক্তির জন্য ক্রন্দন এবং শোকপালন করা অধিকতর নির্ভেজালভাবে তার সাথে একাত্ম বিষয়টিকে চিত্রায়িত করে । যদি নিজের পক্ষ থেকে কোন ব্যক্তির প্রতি নিষ্ঠার সাথে সহমর্মিতার বিষয়টি ব্যক্তি ও তাঁর প্রতি ভালোবাসাকে প্রমাণ করতে চাই তাহলে তার দুঃখের অংশীদার হতে হবে -আনন্দের নয় । এ বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে বলা সম্ভব ,ইমাম হোসাইন (আ .)-এর স্মরণ যদি শোকানুষ্ঠান পালনের মাধ্যমে করা হয় তাহলেই তাঁর সাথে প্রকৃত সহমর্মিতা প্রকাশ করা হয় এবং উত্তমরূপে তাঁর কৃতজ্ঞতা আদায় করা হয় ।

তথ্যসূত্র

1 .আনগীযেস ও হায়াজন ,এডওয়ার্ড জী .মুরী ,অনুবাদক মুহাম্মদ তাকীবারাহিনী ,শেরকাতে সাহমীয়ে চেহর ,ফারসি সাল 1363 ,পৃ .32 ।

2 .যামিনেয়ে রাওয়ান -সেনোসীয়ে ইজতেমায়ী ,আলী আকবার মেহের অরো ,মেহেরদদ্ ,প্রকাশনী ,ফারসি সাল1373 ,পৃ .184 ।

3 .অযারাখসে দিগার আয অসেমনে কাবালা ,মুহাম্মদ তাকী মেসবাহ ইয়াযদী ,মুয়াসসেসে অমুযেস ও পাযুহেসে ইমাম খোমেইনী প্রকাশনী ,ফারসি সাল 1379 ,পৃ .11 -20 ।

4 খুলাসেয়ে তরিখে ইসলাম ,সাইয়্যেদ হাশেম রাসূলী মাহাল্লাতী ,দাফতারে নাশর ওয়া ফারহাঙ্গে ইসলামী প্রকাশনী ,ফারসি সাল 1372 ,3য় খণ্ড ,পৃ .19 ।