নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা0%

নাহজ আল-বালাঘা লেখক:
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ: হযরত আলী (আ.)

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক: আশ-শরীফ আর-রাজী
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ:

ভিজিট: 51294
ডাউনলোড: 2392

নাহজ আল-বালাঘা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 48 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 51294 / ডাউনলোড: 2392
সাইজ সাইজ সাইজ
নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক:
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বাংলা

রাসূলের (সা.) ‘জ্ঞান নগরীর দ্বার’ আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী, দার্শনিক, সুলেখক ও বাগ্মী। আলঙ্কারিক শাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ও নৈপুন্য অসাধারণ। তিনি নবুওয়াতী জ্ঞান ভান্ডার হতে সরাসরি জ্ঞান আহরণ করেন এবং সাহাবাদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পন্ডিত ছিলেন। এতে কারো দ্বিমত নেই। আরবী কাব্যে ও সাহিত্যে তার অনন্যসাধারণ অবদান ছিল। খেলাফত পরিচালনা কালে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ (খোৎবা) দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকগণকে প্রশাসনিক বিষয়ে উপদেশ ও নির্দেশ দিয়ে পত্র লিখেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে মানুষের অনেক প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছিলেন। তার এসব বাণী কেউকেউ লিখে রেখেছিল, কেউ কেউ মনে রেখেছিল, আবার কেউ কেউ তাদের লিখিত পুস্তকে উদ্ধৃত করেছিল। মোটকথা তার অমূল্য বাণীসমূহ মানুষের কাছে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল।

আশ-শরীফ আর-রাজী আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিবের ভাষণসমূহ (খোৎবা), পত্রাবলী, নির্দেশাবলী ও উক্তিসমূহ সংগ্রহ করে “নাহজ আল-বালঘা” নামক গ্রন্থটি সঙ্কলন করেন।

খোৎবা - ১২৯

لا بِي ذَرٍ، رَحِمَهُ اللَهُ، لَمَا أُخْرِجَ إ لَى الرَّبَذَةِ

يَا أَباذَرٍّ، إِنَّكَ غَضِبْتَ لِلَّهِ، فَارْجُ مَنْ غَضِبْتَ لَهُ. إِنَّ الْقَوْمَ خافُوكَ عَلى دُنْياهُمْ، وَ خِفْتَهُمْ عَلى دِينِكَ، فاتْرُكْ فِي أَيْدِيهِمْ ما خافُوكَ عَلَيْهِ، وَاهْرُبْ مِنْهُمْ بِما خِفْتَهُمْ عَلَيْهِ، فَما أَحْوَجَهُمْ إِلى ما مَنَعْتَهُمْ، وَ مَا أَغْناكَ عَمّا مَنَعُوكَ، وَ سَتَعْلَمُ مَنِ الرَّابِحُ غَداً، وَالْأَكْثَرُ حُسَّداً، وَ لَوْ أَنَّ السَّماواتِ وَالْأَرَضِينَ كانَتا عَلى عَبْدٍ رَتْقا ثُمَّ اتَّقَى اللَّهَ لَجَعَلَ اللَّهُ لَهُ مِنْهُما مَخْرَجا. لا يُؤْنِسَنَّكَ إِلا الْحَقُّ، وَ لا يُوحِشَنَّكَ إِلا الْباطِلُ، فَلَوْ قَبِلْتَ دُنْياهُمْ لَأَحَبُّوكَ، وَ لَوْ قَرَضْتَ مِنْها لَأَمَّنُوكَ.

মদিনা হতে আবু যরের বহিষ্কারের সময় প্রদত্ত ভাষণ

হে আবু যর ! তুমি আল্লাহর নামে ক্রোধ দেখিয়েছিলে। সুতরাং যার ওপরে রাগান্বিত হয়েছিলে তার বিষয়ে আল্লাহতে আশা রেখো। মানুষ তাদের জাগতিক বিষয়ের জন্য তোমাকে ভয় করতো ,আর তুমি তোমার ইমানের জন্য তাদেরকে ভয় করতে। কাজেই তারা যে জন্য তোমাকে ভয় করে তা তাদের কাছে রেখে দাও এবং তুমি যে জন্য তাদেরকে ভয় কর তা নিয়ে বেরিয়ে পড়। যে বিষয় থেকে তুমি তাদেরকে বিরত করতে চেয়েছিলে তাতে তারা কতই না আসক্ত এবং যে বিষয়ে তারা তোমাকে অস্বীকার করেছে। তার প্রতি তুমি কতই না নির্লিপ্ত। অল্পকাল পরেই তুমি জানতে পারবে। আগামীকাল (পরকালে) কে বেশি লাভবান এবং কে বেশি ঈর্ষনীয়। এমনকি সমস্ত আকাশ ও পৃথিবী যদি কারো জন্য রুদ্ধ হয়ে যায় এবং সে যদি আল্লাহকে ভয় করে ,তবে আল্লাহ তার জন্য তা খুলে দিতে পারেন। শুধু ন্যায়পরায়ণতা তোমাকে আকর্ষণ করে এবং অন্যায় তোমাকে বিকর্ষণ করে। যদি তুমি তাদের জাগতিক বিষয়ের প্রীতি গ্রহণ করতে তাহলে তারা তোমাকে ভালোবাসতো এবং যদি তুমি তাদের সাথে এর অংশ গ্রহণ করতে তবে তারা তোমাকে আশ্রয় দিত।

____________________

১। আবু যর আল - গিফারীর নাম ছিল জুনদাব ইবনে জুনাদাহ। তিনি মদিনার পূর্বপ্রান্তে অবস্থিত রাবাযাহ্ নামক একটা ছোট গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। রাসূলের (সা.) ইসলাম প্রচারের কথা শুনামাত্রই তিনি মক্কা এসেছিলেন এবং রাসূলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। এতে কাফের কুরাইশগণ তাকে নানাভাবে অত্যাচার - উৎপীড়ন করেছিল। কিন্তু তার দৃঢ় সংকল্প থেকে তাকে টলাতে পারেনি। ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে তিনি চতুর্থ অথবা পঞ্চম ছিলেন। ইসলামে অগ্রণী হবার সাথে তার আত্মত্যাগ ও তাকওয়া এত উচুস্তরের ছিল যে ,রাসূল (সা.) বলেছেনঃ

আমার লোকদের মধ্যে আবু যরের আত্মত্যাগ ও তাকওয়া মরিয়াম তনয় ঈসার মত |

খলিফা উমরের রাজত্বকালে আবু যর সিরিয়া চলে গিয়েছিলেন এবং উসমানের সময়েও সেখানে ছিলেন। তিনি উপদেশ প্রদান ,ধর্ম প্রচার ,সৎপথ প্রদর্শন ও আহলে বাইতের মহত্ত্ব সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করে দিন অতিবাহিত করেছিলেন। বর্তমানে সিরিয়া ও জাবাল আমিলে (উত্তর লেবানন) শিয়া সম্প্রদায়ের যে চিহ্ন পাওয়া যায় তা তার প্রচার ও কার্যক্রমের ফল। সিরিয়ার শাসনকর্তা মুয়াবিয়া তাকে ভালো চোখে দেখতো না। উসমানের অন্যায় কর্মকাণ্ড ও তহবিল তসরুফের প্রকাশ্য সমালোচনা করতেন বলে মুয়াবিয়া তার উপর খুব বিরক্ত ছিল। কিন্তু সে তাকে কিছু করতে না পেরে উসমানের কাছে পত্র লেখল যে ,আবু যর যদি আরো কিছু দিন এখানে থাকে। তবে সে জনগণকে খলিফার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলবে। প্রত্যুত্তরে উসমান লেখালো যে ,আবু যারকে যেন জিনবীহীন উটের পিঠে চড়িয়ে মদিনায় প্রেরণ করা হয়। উসমানের আদেশ পালিত হয়েছিলো। মদিনায় পৌঁছেই তিনি ন্যায় ও সত্যের প্রচার শুরু করলেন। তিনি মানুষকে রাসূলের (সা.) সময়ের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে লাগলেন এবং রাজকীয় আড়ম্বর প্রদর্শনের বিষয়ে সতর্ক করতে লাগলেন। এতে উসমান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে তার কথা বলা বন্ধ করতে চেষ্টা করলেন। একদিন উসমান তাকে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন , আমি জানতে পেরেছি। তুমি নাকি প্রচার করে বেড়াচ্ছে যে ,রাসূল (সা.) বলেছেনঃ

যখন বনি উমাইয়া ত্রিশজন সংখ্যায় হবে তখন তারা আল্লাহর নগরীসমূহকে তাদের নিজের সম্পদ মনে করবে ,তাঁর বান্দাগণকে তাদের গোলাম মনে করবে এবং তাঁর দ্বীনকে তাদের প্রতারণার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করবে ।

আবু যর বললেন তিনি রাসূলকে (সা.) এরূপ বলতে শুনেছেন। উসমান বললেন যে ,আবু যর মিথ্যা কথা বলেছে এবং তিনি তার পার্শ্বে উপবিষ্ট সকলকে জিজ্ঞেস করলেন যে ,তারা এমন কথা শুনেছে কিনা। উপস্থিত সকলেই না বোধক উত্তর দিয়েছিল। আবু যর তখন বললেন যে ,এ বিষয়ে আলী ইবনে আবি তালিবকে জিজ্ঞেস করা হোক। তখন আলীকে ডেকে পাঠানো হলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি আবু যরের বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করেন। তখন উসমান আলীর কাছে জানতে চাইলেন কিসের ভিত্তিতে তিনি এ হাদিসের সত্যতা সম্পর্কে সাক্ষ্য দিয়েছেন। আমিরুল মোমেনিন বললেন তিনি রাসূলকে বলতে শুনেছেনঃ

আকাশের নিচে ও মাটির ওপরে আবু যর অপেক্ষা অধিক সত্য বক্তা আর কেউ নেই ।

এতে উসমান আর কথা না বাড়িয়ে চুপ করে রইলেন। কারণ আবু যরকে এরপরও মিথ্যাবাদী বলা মানে রাসূলের (সা.) ওপর মিথ্যারোপ করা। কিন্তু ভেতরে ভেতরে উসমান আবু যরের ওপর ভীষণ রাগান্বিত হয়ে রইলেন। কারণ তিনি তাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারেন নি। অপরদিকে মুসলিমদের সম্পদ অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করার জন্য আবু যর প্রকাশ্যভাবে উসমানের সমালোচনা অব্যাহত রাখলেন। যেখানেই তিনি উসমানকে দেখতেন সেখানে নিম্নের আয়াত আবৃত্তি করতেনঃ

আর যারা স্বর্ণ ও রৌপ্য পুঞ্জীভূত করে এবং তা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না তাদেরকে মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দাও। সে দিন জাহান্নামের অগ্নিতে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তা দিয়ে তাদের ললাট ,পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশে দাগ দেয়া হবে । সেদিন বলা হবে ,এটাই তা যা তোমরা নিজেদের জন্য পুঞ্জীভূত করতে (কুরআন - ৯ : ৩৪ - ৩৫) ।

উসমান অর্থ দিয়ে আবু যরের মুখ বন্ধ করতে চাইলেন। কিন্তু এ স্বাধীনচেতা লোকটিকে তার সোনার ফাঁদে আটকাতে পারেন নি। এ লোকটি কোন কিছুতেই ভীত অথবা প্রলুব্ধও হলেন না ,আবার তার মুখও বন্ধ হলো না ;অবশেষে মদিনা ত্যাগ করে রাবাযাহ চলে যাবার জন্য উসমান তাকে নির্দেশ দিলেন এবং মারওয়ান ইবনে হাকামকে (এই হাকামকে তার কুকর্মের জন্য রাসূল মদিনা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন ;সে তার পুত্রসহ নির্বাসনে ছিল এবং উসমান তাদেরকে ফেরত এনেছিল) নিয়োগ করেছিল আবু যরকে বের করে দেয়ার জন্য। একই সাথে উসমান একটা অমানবিক আদেশ জারি করেছিলেন যে ,আবু যরকে কেউ যেন বিদায় সম্বর্ধনা না জানায়। কিন্তু ইবনে ইয়াসির খলিফার অমানবিক আদেশ অমান্য করে আবু যরকে বিদায় সম্বর্ধনা দিয়েছিলেন। সেই বিদায় সম্বর্ধনায় আমিরুল মোমেনিন এ খোৎবা প্রদান করেন।

রাবাযাহতে যাবার পর থেকে আবু যর অতি দুঃখ - কষ্টে দিন কাটাচ্ছিলেন। এ স্থানে তার পুত্র যার ও তার স্ত্রী মারা গিয়েছিলো এবং তার জীবিকা নির্বাহের জন্য যে ভেড়া ও ছাগল পালন করতেন সেগুলোও মরে গিয়েছিল। তার সন্তানদের মধ্যে একটা কন্যা জীবিত ছিল ,যে পিতার দুঃখ - কষ্ট ও উপোসের অংশীদার ছিল। যখন তাদের জীবিকার সকল পথ বন্ধ হয়ে গেল তখন দিনের পর দিন উপোস করে সে পিতাকে বললো , বাবা ,আর তো ক্ষুধার জ্বালা সইতে পারি না। আর কতদিন এভাবে কাটাবো। জীবিকার সন্ধানে চল অন্য কোথাও যাই। ” আবু যর কন্যাকে সাথে নিয়ে এক নির্জন স্থানের মধ্য দিয়ে যাত্রা করলেন। কোথাও বৃক্ষপত্র পর্যন্ত তাঁর চোখে পড়লো না। অবশেষে এক স্থানে তিনি ক্লান্ত হয়ে বসে পড়লেন। তিনি কিছু বালি একত্রিত করে তার ওপর মাথা রেখে শুয়ে পড়লেন। অল্পক্ষণের মধ্যেই তার চোখে - মুখে মৃত্যুর লক্ষণ দেখা দিল।

পিতার এ অবস্থা দেখে কন্যা বিচলিত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো এবং বললো , পিতা ,এ নির্জন স্থানে তোমার মৃত্যু হলে আমি - কিভাবে তোমার দাফন - কাফনের ব্যবস্থা করবো। ” প্রত্যুত্তরে পিতা বললেন , বিচলিত হয়ো না। রাসূল (সা.) আমাকে বলেছেন অসহায় অবস্থায় আমার মৃত্যু হবে এবং কয়েকজন ইরাকি আমার দাফন - কাফন করবে। আমার মৃত্যুর পর আমাকে চাদরে ঢেকে রাস্তার পাশে বসে থেকো এবং কোন যাত্রিদল যেতে থাকলে তাদরকে বলে রাসূলের প্রিয় সাহাবা আবু যর মারা গেছে। ” ফলে তার মৃত্যুর পর তার কন্যা রাস্তার পাশে বসেছিল। কিছুক্ষণ পরে একটা যাত্রিদল সে পথ দিয়ে যাচ্ছিলো। এ যাত্রিদলে ছিল মালিক ইবনে হারিছ ইবনে ইয়াজিদসহ মোট চৌদ্দজন। আবু যরের এহেন অসহায় মৃত্যুর কথা শুনে তারা অত্যন্ত শোক বিহ্বল হলো। তারা তাদের যাত্রা স্থগিত করে আবু যরের দাফনের ব্যবস্থা করলেন। মালিক আশতার কাফনের জন্য একটা চাদর দিলেন। এ কাপড়টির দাম ছিল চার হাজার দিরহাম। তার জানাজার পর তাকে দাফন করে তারা প্রস্থান করলো। ৩২ হিজরি সনের জিলহজ্জ মাসে এ ঘটনা ঘটেছিল।

খোৎবা - ১৩০

أَيَّتُهَا النُّفُوسُ الْمُخْتَلِفَةُ، وَالْقُلُوبُ الْمُتَشَتِّتَةُ، الشَّاهِدَةُ أَبْدانُهُمْ، وَالْغَائِبَةُ عَنْهُمْ عُقُولُهُمْ، أَظْأَرُكُمْ عَلَى الْحَقِّ وَ أَنْتُمْ تَنْفِرُونَ عَنْهُ نُفُورَ الْمِعْزَى مِنْ وَعْوَعَةِ الْأَسَد! هَيْهاتَ أَنْ أَطْلَعَ بِكُمْ سَرارَ الْعَدْلِ، أَوْ أُقِيمَ اعْوِجاجَ الْحَقِّ.

اللَّهُمَّ إِنَّكَ تَعْلَمُ أَنَّهُ لَمْ يَكُنِ الَّذِي كانَ مِنّا مُنافَسَةً فِي سُلْطانٍ، وَ لا الْتِماسَ شَيْءٍ مِنْ فُضُولِ الْحُطامِ، وَ لكِنْ لِنَرُدَّ الْمَعالِمَ مِنْ دِينِكَ، وَ نُظْهِرَ الْإِصْلاحَ فِي بِلادِكَ، فَيَأْمَنَ الْمَظْلُومُونَ مِنْ عِبادِكَ، وَ تُقامَ الْمُعَطَّلَةُ مِنْ حُدُودِكَ.

أَللَّهُمَّ إِنِّي أَوَّلُ مَنْ أَنابَ، وَ سَمِعَ وَ أَجابَ، لَمْ يَسْبِقْنِي إِلاّ رَسُولُ اللَّهِ،صلى‌الله‌عليه‌وآله‌وسلم ، بِالصَّلاَةِ. وَ قَدْ عَلِمْتُمْ أَنَّهُ لايَنْبَغِي أَنْ يَكُونَ الْوالِىَ عَلَى الْفُرُوجِ وَالدِّمأِ وَالْمَغانِمِ وَالْأَحْكامِ وَ إِمامَةِ الْمُسْلِمِينَ الْبَخِيلُ، فَتَكُونَ فِي أَمْوالِهِمْ نَهْمَتُهُ. وَ لا الْجاهِلُ فَيُضِلَّهُمْ بِجَهْلِهِ، وَ لاَ الْجافِي فَيَقْطَعَهُمْ بِجَفائِهِ، وَ لا الْخائِفُ لِلدُّوَلِ فَيَتَّخِذَ قَوْماً دُونَ قَوْمٍ، وَ لا الْمُرْتَشِي فِي الْحُكْمِ فَيَذْهَبَ بِالْحُقُوقِ، وَ يَقِفَ بِها دُونَ الْمَقَاطِعِ وَ لاَالْمُعَطِّلُ لِلسُّنَّةِ فَيُهْلِكَ الْأُمَّةَ.

খেলাফত গ্রহণের কারণ ও শাসকের গুণাবলী

হে জনমণ্ডলী! তোমাদের হৃদয় ও মন দ্বিধা বিভক্ত। তোমাদের দেহ এখানে কিন্তু তোমাদের বোধশক্তি এখানে অনুপস্থিত। আমি তোমাদের সত্যের পথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। আর তোমরা তা থেকে এমনভাবে দৌড়ে পালিয়ে যাচ্ছে যেন ভেড়া - ছাগলের পাল সিংহের গর্জনে দৌড়ে পালায়। ন্যায়ের গুপ্তভেদ তোমাদের কাছে উন্মোচন করা কতই না শক্ত। সত্যের বক্রতাকে সোজা করতে আমার কতই না কষ্ট হচ্ছে।

হে আমার আল্লাহ! তুমি তো জান যে ,আমরা যা করেছি তা ক্ষমতার লোভে বা এ অসার দুনিয়া থেকে কোন কিছু অর্জন করার জন্য করিনি। বরং আমরা চেয়েছিলাম তোমার দ্বীনের চিহ্ন টিকিয়ে রাখতে ,তোমার নগরীসমূহকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে ,যাতে তোমার বান্দাদের মধ্যে যারা অত্যাচারিত তারা নিরাপদে থাকতে পারে এবং তোমার পরিত্যাক্ত আদেশাবলী প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।

হে আমার আল্লাহ! আমিই প্রথম যে তোমার কাছে আত্মোৎসর্গ করেছে এবং তোমার ইসলামের কথা শুনা মাত্রই সাড়া দিয়েছে। রাসূল (সা.) ব্যতীত আর কেউ সালাতে আমার অগ্রণী নয়। হে আল্লাহ ,তুমি নিশ্চয়ই জান ,যে ব্যক্তি মুসলিমগণের মান - ইজ্জত ,জীবন ,বায়তুল মাল ,আইন প্রয়োগ ইত্যাদি দায়িত্বে ও নেতৃত্বে থাকবে সে কৃপণ হতে পারবে না ,যাতে জনগণের সম্পদের প্রতি তার লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ;সে অজ্ঞ হতে পারবে না ,যাতে তার অজ্ঞতা জনগণকে বিপথগামী করে ফেলে ;সে রূঢ় আচরণের হতে পারবে না ,যাতে তার রূঢ়তা জনগণের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে ;সে ন্যায়ের পরিপন্থী কিছু করতে পারবে না ,যাতে একদল অন্যদলের ওপর প্রাধান্য পায় ;সে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুবাদে উৎকোচ গ্রহণ করতে পারবে না ,যাতে অন্যের অধিকার খর্ব হয় এবং চূড়ান্ত না করে (কোন বিষয়) লুকিয়ে রাখতে ও রাসূলের সুন্নাহর প্রতি কোনরূপ উপেক্ষা প্রদর্শন করতে পারবে না যাতে জনগণ ধ্বংস হয়ে যায় ।

খোৎবা - ১৩১

نَحْمَدُهُ عَلَى ما أَخَذَ وَ أَعْطَى، وَ عَلَى ما أَبْلَى وَ ابْتَلَى. الْباطِنُ لِكُلِّ خَفِيَّةٍ، وَ الْحاضِرُ لِكُلِّ سَرِيرَةٍ، الْعالِمُ بِما تُكِنُّ الصُّدُورُ، وَ ما تَخُونُ الْعُيُونُ. وَ نَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ غَيْرُهُ، وَ أَنَّ مُحَمَّدا ص، نَجِيبُهُ وَ بَعِيثُهُ، شَهادَةً يُوافِقُ فِيهَا السِّرُّ الْإِعْلانَ، وَ الْقَلْبُ اللِّسانَ.

فَإِنَّهُ وَاللَّهِ الْجِدُّ لا اللَّعِبُ، وَ الْحَقُّ لا الْكَذِبُ، وَ ما هُوَ إِلا الْمَوْتُ، أَسْمَعَ دَاعِيهِ، وَ أَعْجَلَ حادِيهِ، فَلا يَغُرَّنَّكَ سَوادُ النّاسِ مِنْ نَفْسِكَ، وَ قَدْ رَأَيْتَ مَنْ كانَ قَبْلَكَ مِمَّنْ جَمَعَ الْمالَ وَ حَذِرَ الْإِقْلالَ، وَ أَمِنَ الْعَواقِبَ طُولَ أَمَلٍ وَ اسْتِبْعادَ أَجَلٍ، كَيْفَ نَزَلَ بِهِ الْمَوْتُ، فَأَزْعَجَهُ عَنْ وَطَنِهِ، وَ أَخَذَهُ مِنْ مَأْمَنِهِ، مَحْمُولاً عَلَى أَعْوَادِ الْمَنايا، يَتَعاطى بِهِ الرِّجالُ الرِّجالَ حَمْلاً عَلَى الْمَناكِبِ وَ إِمْساكا بِالْأَنامِلِ. أَما رَأَيْتُمُ الَّذِينَ يَأْمُلُونَ بَعِيداً، وَ يَبْنُونَ مَشِيداً، وَ يَجْمَعُونَ كَثِيراً! كَيْفَ أَصْبَحَتْ بُيُوتُهُمْ قُبُوراً، وَ ما جَمَعُوا بُوراً؛ وَ صارَتْ أَمْوالُهُمْ لِلْوارِثِينَ، وَ أَزْواجُهُمْ لِقَوْمٍ آخَرِينَ؛ لا فِي حَسَنَةٍ يَزِيدُونَ، وَ لا مِنْ سَيِّئَةٍ يَسْتَعْتِبُونَ!

فَمَنْ أَشْعَرَ التَّقْوى قَلْبَهُ بَرَّزَ مَهَلُهُ، وَ فازَ عَمَلُهُ. فاهْتَبِلُوا هَبَلَها، وَ اعْمَلُوا لِلْجَنَّةِ عَمَلَها: فَإِنَّ الدُّنْيا لَمْ تُخْلَقْ لَكُمْ دارَ مُقامٍ، بَلْ خُلِقَتْ لَكُمْ مَجازاً لِتَزَوَّدُوا مِنْهَا الْأَعْمالَ إِلَى دارِ الْقَرارِ، فَكُونُوا مِنْها عَلَى أَوْفازٍ، وَ قَرِّبُوا الظُّهُورَ لِلزِّيَالِ.

মৃত্যু সম্পর্কে সতর্কাদেশ

আমরা আল্লাহর প্রশংসা করি যা তিনি দিয়েছেন তার জন্য ,যা তিনি নিয়ে যাচ্ছেন তার জন্য ,যা তিনি আমাদের ওপর আপতিত করেন তার জন্য এবং আমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য। যা কিছু গুপ্ত তা তিনি অবহিত এবং যা কিছু দৃষ্টির আড়ালে তা তিনি দেখেন। মানুষের অন্তরে যা লুকিয়ে আছে তা তিনি জানেন এবং চোখ যা আড়াল করতে চায় তা তার অজ্ঞাত নয়। আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি। তিনি ছাড়া আর কোন মাবুদ নেই এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর মনোনীত প্রতিনিধি। আমরা এ সাক্ষ্য দিচ্ছি গোপনে ও প্রকাশ্যে - হৃদয়ে ও মুখে।

আল্লাহর কসম ,এটাই বাস্তবতা - কৌতুক নয় ;এটাই সত্য ,এতে মিথ্যার লেশ মাত্র নেই। এটা মৃত্যু ব্যতীত আর কিছু নয়। মৃত্যুর আহবান সতত উচ্চারিত হচ্ছে এবং টানা হেঁচড়াকারী (মৃত্যুদূত।) দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসছে। তোমরা আত্মপ্রবঞ্চনায় জড়িয়ে পড়ো না (অথবা অধিকাংশ লোক তোমাকে প্রবঞ্চনা করবে না) । তোমরা দেখেছো তোমাদের পূর্বে এ পৃথিবীতে বহু লোক বাস করতো। যারা সম্পদের পাহাড় গড়েছিল ,দারিদ্রকে ভয় করতো ,সম্পদের কুফল থেকে নিজেদেরকে নিরাপদ মনে করতো ,যাদের কামনা - বাসনা ছিল অসীম এবং যারা মৃত্যু থেকে দূরে সরে থাকতে চেয়েছিল। তারপর তাদের কি হয়েছিল! মৃত্যু তাদেরকে গ্রাস করেছিল ,তাদের সুরম্য ভবন হতে তাদেরকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো এবং তাদের নিরাপদ স্থান থেকে তাদেরকে সরিয়ে দেয়া হয়েছিলো। তারাও কাফনে আবৃত হয়েছিল - মানুষ তাদের সরিয়ে দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলো - তাদেরকে কফিনে করে কাধে বহন করে নিয়েছিলো।

তোমরা কি তাদের দেখনি যারা অসীম আকাঙ্খা করতো ,সুদৃঢ় ইমারত গড়তো ,সম্পদ স্তুপীকৃত করতো। কিন্তু তাদের প্রকৃত ঘর হয়েছিলো কবর এবং তাদের সমুদয় সঞ্চয় ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছিলো। তাদের ধন - সম্পদ পরবর্তী আপনজন ভোগ করেছিলো। তারা এখন আর কোন সৎ আমল বৃদ্ধি করতে পারছে না বা কোন মন্দ আমলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে পারছে না।

সুতরাং যে ব্যক্তি নিজের হৃদয়কে আল্লাহর ভয়ে ভীত থাকার জন্য অভ্যস্ত করে সে অগ্রণী মর্যাদা প্রাপ্ত হয় এবং তার আমল জয়যুক্ত হয়। এর জন্য নিজকে প্রস্তুত কর ,জান্নাতের জন্য সম্ভব সব কিছু কর। নিশ্চয়ই ,এ পৃথিবী তোমার চিরস্থায়ী আবাসস্থল নয়। কিন্তু এটা সৃষ্টি করা হয়েছে। যাত্রা পথের সরাইখানা হিসাবে যেন তোমরা তা থেকে সৎ আমলরূপী রসদ সংগ্রহ করে চিরন্তন আবাসস্থলে যেতে পার। এখান থেকে প্রস্থানের জন্য সদা - সর্বদা প্রস্তুত থেকো এবং যাত্রার জন্য বাহন সংগ্রহ করে রেখো।

খোৎবা - ১৩২

وَ انْقَادَتْ لَهُ الدُّنْيَا وَ الْآخِرَةُ بِأَزِمَّتِها، وَ قَذَفَتْ إِلَيْهِ السَّماواتُ وَ الْأَرَضُونَ مَقالِيدَها، وَ سَجَدَتْ لَهُ بِالْغُدُوِّ وَ الْآصالِ الْأَشْجارُ النّاضِرَةُ، وَ قَدَحَتْ لَهُ مِنْ قُضْبانِهَا النِّيرانَ الْمُضِيئَةَ، وَ آتَتْ أُكُلَها بِكَلِماتِهِ الثِّمارُ الْيانِعَةُ.

خصائص القرآن

وَ كِتابُ اللّهِ بَيْنَ أَظْهُرِكُمْ ناطِقٌ لاَ يَعْيى لِسانُهُ، وَ بَيْتٌ لا تُهْدَمُ أَرْكانُهُ، وَ عِزُّ لا تُهْزَمُ أَعْوانُهُ.

خصائص النبیصلى‌الله‌عليه‌وآله‌وسلم

أَرْسَلَهُ عَلَى حِينِ فَتْرَةٍ مِنَ الرُّسُلِ، وَ تَنازُعٍ مِنَ الْأَلْسُنِ، فَقَفّى بِهِ الرُّسُلَ، وَ خَتَمَ بِهِ الْوَحْىَ،

فَجاهَدَ فِي اللَّهِ الْمُدْبِرِينَ عَنْهُ، وَ الْعادِلِينَ بِهِ.

کیفیة التعامل مع الدنیا

وَ إِنَّمَا الدُّنْيا مُنْتَهَى بَصَرِ الْأَعْمَى، لا يُبْصِرُ مِمَّا وَرَأَها شَيْئاً، وَ الْبَصِيرُ يَنْفُذُها بَصَرُهُ، وَ يَعْلَمُ أَنَّ الدَّارَ وَرأَها فَالْبَصِيرُ مِنْها شاخِصٌ، وَ الْأَعْمَى إِلَيْها شاخِصٌ، وَ الْبَصِيرُ مِنْها مُتَزَوِّدٌ، وَ الْأَعْمَى لَها مُتَزَوِّدٌ.

وَ اعْلَمُوا أَنَّهُ لَيْسَ مِنْ شَىْءٍ إِلاّ وَ يَكادُ صاحِبُهُ يَشْبَعُ مِنْهُ وَ يَمَلُّهُ إِلاّ الْحَياةَ، فَإِنَّهُ لا يَجِدُ فِى الْمَوْتِ راحَةً. وَ إِنَّما ذَلِكَ بِمَنْزِلَةِ الْحِكْمَةِ الَّتِي هِيَ حَياةٌ لِلْقَلْبِ الْمَيِّتِ، وَ بَصَرٌ لِلْعَيْنِ الْعَمْيأِ، وَ سَمْعٌ لِلْأُذُنِ الصَّمَّأِ، وَ رِيُّ لِلظَّمْآنِ، وَ فِيهَا الْغِنَى كُلُّهُ وَ السَّلامَةُ.

هدایة القرآن

كِتابُ اللَّهِ تُبْصِرُونَ بِهِ، وَ تَنْطِقُونَ بِهِ، وَ تَسْمَعُونَ بِهِ، وَ يَنْطِقُ بَعْضُهُ بِبَعْضٍ، وَ يَشْهَدُ بَعْضُهُ عَلَى بَعْضٍ، وَ لا يَخْتَلِفُ فِي اللَّهِ، وَ لا يُخالِفُ بِصاحِبِهِ عَنِ اللَّهِ.

أسباب سقوط الامة

قَدِ اصْطَلَحْتُمْ عَلَى الْغِلِّ فِيما بَيْنَكُمْ، وَ نَبَتَ الْمَرْعَى عَلى دِمَنِكُمْ، وَ تَصافَيْتُمْ عَلَى حُبِّ الْآمالِ، وَ تَعادَيْتُمْ فِي كَسْبِ الْأَمْوالِ، لَقَدِ اسْتَهامَ بِكُمُ الْخَبِيثُ، وَ تاهَ بِكُمُ الْغُرُورُ، وَ اللَّهُ الْمُسْتَعانُ عَلَى نَفْسِي وَ أَنْفُسِكُمْ.

আল্লাহর মহিমা সম্পর্কে

ইহকাল ও পরকাল তাদের লাগাম আল্লাহর কাছে পেশ করেছে এবং আকাশমণ্ডলী ও বিশ্ব - ব্রহ্মাণ্ড তাদের কুঞ্জিকাঠি তাঁর দিকে ছুড়ে দিয়েছে। সজীব বৃক্ষাদি সকাল ও সন্ধ্যয় তাঁর প্রতি আনত হয় এবং তাঁরই আদেশে শাখাসমূহ অগ্নিশিখা দেয় ও তাদের নিজের খাদ্য পরিপক্ক ফলে রূপান্তরিত হয়।

কোরআনের বেশিষ্ট্য

আল্লাহর কিতাব তোমাদের মধ্যেই রয়েছে। তা কথা বলে এবং তার জিহবায় কোন জড়তা নেই। এটা এমন এক ঘর যার স্তম্ভ কখনো ধরাশায়ী হয় না এবং তা এমন এক শক্তি যার সমর্থক পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয় না।

নবীর (সা.) বৈশিষ্ট্য

পূর্ববর্তী নবীগণের পরে বেশ কিছুটা ব্যবধানে আল্লাহ্ রাসূলকে (সা.) প্রেরণ করেছিলেন যখন জনগণের মধ্যে নানা কথা (বিরোধ) বিরাজমান ছিল। তার সাথেই নবীদের ধারাবাহিকতা ও অহি প্রত্যাদেশের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। তারপর তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করেছিলেন যারা আল্লাহর পথ থেকে সরে গিয়ে তাঁর সমান অন্য কিছুকে মনে করেছিল।

দুনিয়ার সাথে আচরণ সম্পর্কে

নিশ্চয়ই ,যারা মানসিকভাবে অন্ধ তারা এ দুনিয়ার বাইরে কিছু দেখতে পায় না। যারা মনশ্চক্ষু দিয়ে দেখে তাদের দৃষ্টি দুনিয়া ভেদ করে যায় এবং তারা উপলব্ধি করতে পারে যে ,প্রকৃত বাসস্থান এ দুনিয়ার বাইরে রয়েছে। ফলে দৃষ্টিমানগণ এ দুনিয়া থেকে বেরিয়ে যেতে চায় আর অন্ধগণ এ দুনিয়াতে আবদ্ধ থাকতে চায়। দৃষ্টিমানগণ এ দুনিয়া থেকে পরকালের জন্য রসদ সংগ্রহ করে আর অন্ধগণ শুধু ইহকালের জন্যই রসদ সংগ্রহ করে।

জেনে রাখো ,মানুষ জীবন ব্যতীত অন্য সব কিছুতেই পরিতৃপ্তি পায় ও ক্লান্তি বোধ করে। কারণ সে মৃত্যুতে তার নিজের জন্য আনন্দ বোধ করে না। এটা মৃত হৃদয়ের জন্য জীবিত অবস্থা ,অন্ধ চোখের জন্য দৃষ্টিশক্তি ,বধির কানের জন্য শ্রুতিশক্তি ,তৃষ্ণার্তের জন্য তৃষ্ণা নিবারণ এবং এতে রয়েছে পূর্ণ পর্যাপ্তি ও নিরাপত্তা ।

কোরআনের উপহার

আল্লাহর কিতাবের সাহায্যেই তোমরা দেখ ,কথা বল ও শুন। এর এক অংশ অন্য অংশের জন্য কথা বলে এবং এক অংশ অন্য অংশের প্রমাণের কাজ করে। এটা আল্লাহ সম্বন্ধে কোন মতভেদ করে না এবং এর অনুসারীগণকে কখনো আল্লাহর পথ থেকে বিপথে পরিচালিত করে না।

মানব জাতির পতনের কারণ

তোমরা একে অন্যের প্রতি ঘৃণা পোষণে একত্রিত হয়েছো। তোমরা বাইরে ভালো মানুষ সেজে ভেতরের ময়লা ঢাকতে চাচ্ছ। কামনা - বাসনার পূজায় তোমরা একে অপরকে ভালোবাস এবং সম্পদ অর্জনে একে অপরের শক্রতা কর। শয়তান তোমাদেরকে কুঁকড়ে দিয়েছে এবং প্রবঞ্চনা তোমাদেরকে বিপথগামী করেছে। আমি নিজের জন্য ও তোমাদের জন্য আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করি।

খোৎবা - ১৩৩

وَ قَدْ شاوَرَهُ عُمَرُ بْنُ الْخَطَابِ في الْخُرُوج إ لى غَزْوِ الرَّومِ)

وَ قَدْ تَوَكَّلَ اللَّهُ لِأَهْلِ هَذَا الدِّينِ بِإِعْزازِ الْحَوْزَةِ، وَ سَتْرِ الْعَوْرَةِ. وَ الَّذِي نَصَرَهُمْ وَ هُمْ قَلِيلٌ لا يَنْتَصِرُونَ، وَ مَنَعَهُمْ وَ هُمْ قَلِيلٌ لا يَمْتَنِعُونَ، حَيُّ لا يَمُوتُ. إِنَّكَ مَتى تَسِرْ إِلَى هذَا الْعَدُوِّ بِنَفْسِكَ فَتَلْقَهُمْ فَتُنْكَبْ لا تَكُنْ لِلْمُسْلِمِينَ كانِفَةٌ دُونَ أَقْصَى بِلادِهِمْ. لَيْسَ بَعْدَكَ مَرْجِعٌ يَرْجِعُونَ إِلَيْهِ. فَابْعَثْ إِلَيْهِمْ رَجُلاً مِحْرَباً، وَ احْفِزْ مَعَهُ أَهْلَ الْبَلأِ وَ النَّصِيحَةِ، فَإِنْ أَظْهَرَ اللَّهُ فَذاكَ ما تُحِبُّ، وَ إِنْ تَكُنِ الْأُخْرَى، كُنْتَ رِدْءا لِلنَّاسِ، وَ مَثابَةً لِلْمُسْلِمِينَ.

খলিফা উমর ইবনে খাত্তাব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে রোম (বাইজান্টাইন সাম্রাজ্য) অভিমুখে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে আমিরুল মোমেনিনের পরামর্শ চাইলে তিনি এ খোৎবা প্রদান করেন।

এ দ্বীনের অনুসারীদের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে গ্রহণ করেছেন। তিনিই তাদের সহায় ও তিনিই তাদের রক্ষাকর্তা । তারা যখন সংখ্যায় অল্প ছিল এবং নিজেদেরকে রক্ষা করার ক্ষমতা তাদের ছিল না। তখনো আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করেছেন। তিনি চিরঞ্জীব - তাঁর মৃত্যু নেই। শত্রুর দিকে এগিয়ে যাবার জন্য যদি তুমি ইচ্ছা পোষণ কর ও নিজেই যদি সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে পড় এবং তাতে যদি কোন বিপদ ঘটে যায় তাহলে প্রত্যন্ত অঞ্চল ছাড়া মুসলিমদের আর কোন আশ্রয়স্থল থাকবে না এবং তাদের প্রত্যাবর্তনেরও কোন স্থান থাকবে না। সুতরাং তুমি একজন অভিজ্ঞ লোকের অধীনে এমন সৈন্যদের প্রেরণ কর যাদের অতীত প্রতিপাদন সন্তোষজনক এবং যারা শুভাশয় সম্পন্ন। যদি আল্লাহ তোমাকে বিজয়ী করেন তবে তোমার মনোবাঞ্চা পূর্ণ হবে। অন্যথায় ,তুমি জনগণের সহায়ক হিসাবে থাকতে পারবে এবং মুসলিমগণ প্রত্যাবর্তনের স্থান পাবে।

____________________

১। আমিরুল মোমেনিন সম্পর্কে এক অদ্ভুত প্রচারণা চালানো হয়েছিল। একদিকে বলা হতো তিনি প্রায়োগিক রাজনীতিতে অদক্ষ ছিলেন ও প্রশাসনের বাস্তব পদ্ধতির সাথে পরিচিত ছিলেন না। উমাইয়াদের ক্ষমতা লিন্সাই যে তাদের বিদ্রোহের কারণ তা ধামাচাপা দেয়ার জন্যই বলা হতো আমিরুল মোমেনিনের দুর্বল শাসন ব্যবস্থাই তাদের ক্ষমতা গ্রহণের কারণ। অপরদিকে খলিফাগণ রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও মোশরেকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিষয়ে আমিরুল মোমেনিনের সাথে পরামর্শ করতেন। বস্তুত এহেন পরামর্শ দ্বারা আমিরুল মোমেনিনের চিন্তা ও বিচারের বিশুদ্ধতা বা তাঁর সুগভীর প্রজ্ঞা জনসমক্ষে তুলে ধরা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। বরং তারা দেখাতে চেয়েছিল যে ,আমিরুল মোমেনিনের সাথে তাদের কোন মতদ্বৈধতা নেই। খেলাফত বিষয়ে আলীকে বঞ্চিত করার ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে জনগণের দৃষ্টি সরিয়ে রাখাই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। অপরপক্ষে কেউ কোন উপদেশ বা পরামর্শ চাইলে সে বিষয়ে নীতিগতভাবে সৎপরামর্শ দেয়া থেকে আমিরুল মোমেনিন বিরত থাকতে পারেন না ,কারণ তিনি সুন্নাহর ধারক ও বাহক। খেলাফত বিষয়ে তার মতামত ও রোষ তিনি খোৎবাতুল শিকশিকিয়াতে জোর গলায় ব্যক্ত করেছেন। তাঁর এহেন ক্রোধের অর্থ এ নয় যে ,ইসলামের সামগ্রীক সমস্যায় তিনি যথাযথ পরামর্শ দ্বারা সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন না। আমিরুল মোমেনিনের চারিত্রিক মহত্ত্ব এত উচু - মাপের ছিল যে ,তার শত্রুও পরামর্শ চাইলে তিনি ক্ষতিকর কোন পরামর্শ দিতে পারতেন না। এ কারণে মতদ্বৈধতা থাকা সত্ত্বেও এবং নীতিগত বিরোধ থাকা সত্ত্বেও খলিফাগণ তার কাছে পরামর্শ চাইতেন। এটা তার চারিত্রিক মহত্ত্ব ,চিন্তা ও বিচারের বিশুদ্ধতা এবং গভীর প্রজ্ঞার প্রতি আলোকপাত করে। এটা রাসূলের (সা.) চরিত্রের একটা মহৎ বৈশিষ্ট্য ছিল। মোশরেকগণ তাঁকে নবী বলে স্বীকার করেনি ,তাঁর বাণী গ্রহণ করেনি। কিন্তু তাকে আল - আমীন বলে কখনো অস্বীকার করেনি। যখন তাদের সাথে রাসূলের (সা.) দ্বন্দ্ব - সংঘর্ষ চলছিলো তখনও তারা তাদের ধনসম্পদ তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখতো। এতে তারা এতটুকুও ভয় পেত না যে ,তাদের সম্পদ আত্মসাৎ হয়ে যেতে পারে। একইভাবে খলিফাদের সাথে যতই মতবিরোধ থাকুক না কেন জাতীয় ও উন্মাহর স্বার্থ - সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এবং ইসলামের অভিভাবক হিসাবে ইসলামের কল্যাণ ও সমৃদ্ধির জন্য শত্রু - মিত্র নির্বিশেষে অপ্রভাবিত পরামর্শ দান করে আমিরুল মোমেনিন রাসূলের সুন্নাহ পালন করেছেন। প্যালেষ্টাইন যুদ্ধে উমর নিজে যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার বিষয়ে আমিরুল মোমেনিনের পরামর্শ চাইলে তিনি ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে বারণ করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন , যদি তোমাকে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পিছু হটতে হয় তবে সৈন্যগণ ছত্রভঙ্গ হয়ে এখানে সেখানে বিশৃঙ্খলভাবে ছড়িয়ে পড়বে। এতে মুসলিমগণ সাহস হারিয়ে ফেলবে । তুমি কেন্দ্রে থাকলে তারা বিশৃঙ্খল না হয়ে তোমার কাছে ফিরে আসবে। অধিকন্তু কোন বিপর্যয় ঘটলে তুমি কেন্দ্রে থেকে আরো সৈন্য সংগ্রহ করে তাদের সাহায্যার্থে প্রেরণ করতে পারবে। ”

খোৎবা - ১৩৪

وَ قَدْ وَقَعتْ مُشاجَرَةُ بَينَهُ وَ بَيْنَ عُثْمانَ، فَقالَالْمُغِيرَةُ بْنَ الاْخْنَس لِعُثْمانَ: أَنَاأَكْفِيكَهُ، فَقالَ عَلىعليه‌السلام لِلْمُغِيرَةِ

يَابْنَ اللَّعِينِ الْأَبْتَرِ، وَ الشَّجَرَةِ الَّتِي لا أَصْلَ لَها وَ لا فَرْعَ، أَنْتَ تَكْفِينِي؟ فَوَ اللَّهِ ما أَعَزَّ اللَّهُ مَنْ أَنْتَ ناصِرُهُ، وَ لا قامَ مَنْ أَنْتَ مُنْهِضُهُ. اخْرُجْ عَنَّا أَبْعَدَ اللَّهُ نَواكَ، ثُمَّ ابْلُغْ جَهْدَكَ، فَلا أَبْقَى اللَّهُ عَلَيْكَ إِنْ أَبْقَيْتَ!

খলিফা উসমানের সাথে একদিন আমিরুল মোমেনিনের কিছু কথা কাটাকাটি হয়। মুঘিরাহ ইবনে আখনাস উসমানকে বললো যে ,সে আমিরুল মোমেনিনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এতে আমিরুল মোমেনিন মুঘিরাহকে বললেনঃ

ওহে অভিশপ্ত ব্যক্তি ও অপুত্রকের পুত্র ,তোমার সাজারায় না আছে শিকড় আর না আছে শাখা। তুমি আমার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবে ? আল্লাহর কসম ,তুমি যাকে সমর্থন করবে। আল্লাহ তাকে জয়যুক্ত করবে না এবং তুমি যাদেরকে উত্তেজিত করে তুলবে তারা আমার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারবে না। আমাদের দুজনের মধ্য থেকে সরে পড়। আল্লাহ তোমার উদ্দেশ্য সফল হতে দেবেন না। এরপর যা খুশি কর। আমার প্রতি দয়াদ্র হলেও আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন না ।

____________________

১। মুঘিরাহ ইবনে আখনাস ছিল উসমানের চাচাতো ভাই ও অন্যতম চাটুকার। মুঘিরাহর ভাই আবুল হাকাম ওহুদের যুদ্ধে আমিরুল মোমেনিনের হাতে নিহত হয়েছিল। সেই কারণে সে সর্বদা আমিরুল মোমেনিনের বিরোধিতা করতো। তার পিতা আখনাস মক্কা বিজয়ের পর ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কিন্তু তার মন থেকে বিরোধিতা ও মোনাফেকি কখনো বিদূরিত হয়নি। এজন্যই আমিরুল মোমেনিন তাকে অভিশপ্ত বলেছেন এবং মুঘিরাহর মতো পুত্র যার আছে তাকে অপুত্রক বলা যায়।

(আমিরুল মোমেনিন মুঘিরাহকে অপুত্রকের পুত্র বলেছেন। তাঁর উক্তিটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারো পুত্রকে পুত্রহীনের (অপুত্রকের) পুত্র বলার মধ্যে গভীর অর্থ বহন করে। এ ধরনের একটি বাক্য কুরআনেও রয়েছে। সুরা কাউছারে বলা হয়েছে , আপনাকে যারা অবজ্ঞা করে তারা অপুত্রক। ” অথচ রাসূলকে (সা.) যারা অবজ্ঞা করেছিল তাদের প্রায় সকলেরই পুত্রসন্তান ছিল ,যেমন - আবু সুফিয়ান ,আবু জেহেল ,আবু লাহাব ,আখনস ইত্যাদি। উক্তিটির ভাবার্থ হলো - রাসূলকে অবজ্ঞাকারীগণ কখনো নূরে মুহাম্মাদির মহান পুত্র লাভ করবে না - বাংলা অনুবাদক) ।

খোৎবা - ১৩৫

البیعة الفریدة

لَمْ تَكُنْ بَيْعَتُكُمْ إِيّايَ فَلْتَةً، وَ لَيْسَ أَمْرِي وَ أَمْرُكُمْ واحِدا، إِنِّي أُرِيدُكُمْ لِلَّهِ، وَ أَنْتُمْ تُرِيدُونَنِي لِأَنْفُسِكُمْ! أَيُّهَا النَّاسُ أَعِينُونِي عَلَى أَنْفُسِكُمْ، وَ ايْمُ اللَّهِ لَأُنْصِفَنَّ الْمَظْلُومَ مِنْ ظَالِمِهِ وَ لَأَقُودَنَّ الظَّالِمَ بِخَزامَتِهِ حَتَّى أُورِدَهُ مَنْهَلَ الْحَقِّ وَ إِنْ كانَ كَارِها.

বাইআত সম্পর্কে

কোন চিন্তা - ভাবনা ছাড়া তোমরা আমার বায়াত গ্রহণ করনি এবং আমার ও তোমাদের অবস্থান এক নয়। আল্লাহর জন্য আমি তোমাদেরকে চাই কিন্তু তোমরা নিজেদের স্বার্থে আমাকে চাও। হে জনমণ্ডলী ,সকল কামনা - বাসনার উর্দ্ধে ওঠে আমাকে সমর্থন দাও। আল্লাহর কসম ,আমি জালেম থেকে মজলুমের প্রতিশোধ নেব এবং নাকে দড়ি বেঁধে অত্যাচারীকে সত্যের ঝরনাধারার দিকে নিয়ে যাব যদিও সে সেদিকে যেতে অনিচ্ছুক।

____________________

১। সকিফাহর দিনে খলিফা আবু বকরের বায়াত গ্রহণ সম্পর্কে উমর ইবনে খাত্তাব যে উক্তি করেছিলেন আমিরুল মোমেনিন এখানে তৎপ্রতি ইঙ্গিত দিয়েছেন। উমর বলেছিলেন , আবু বকরের বায়াত গ্রহণ করা দারুণ ভুল হয়েছে ;কোন চিন্তা - ভাবনা (ফালতাহ) ছাড়াই তা করা হয়েছিল ,কিন্তু এরকম ভুল কাজের কুফল থেকে আল্লাহ আমাদেরকে রক্ষা করেছেন। সুতরাং যদি কেউ এরকম ভুল করতে চায়। তবে তোমরা তাকে কতল করো। ” (বুখারী ,৮ম খণ্ড ,পৃঃ ২১১ ;হিশাম ,৪র্থ খণ্ড ,পৃঃ ৩০৮ - ৩০৯ ;তাবারী ,১ম খণ্ড ,পৃঃ ১৮২২ ;আছীর ,২য় খণ্ড ,পৃঃ ৩২৭ ;কাছীর ,৫ম খণ্ড ,পৃঃ ২৪৫ - ২৪৬ ;হাম্বল ,১ম খণ্ড ,পৃঃ ৫৫ ;হাদীদ ,২য় খণ্ড ,পৃঃ ২৩) ।

খোৎবা - ১৩৬

معرفة طلحه و زبیر

وَ اللَّهِ ما أَنْكَرُوا عَلَيَّ مُنْكَراً، وَ لا جَعَلُوا بَيْنِي وَ بَيْنَهُمْ نِصْفاً. وَ إِنَّهُمْ لَيَطْلُبُونَ حَقّا هُمْ تَرَكُوهُ، وَ دَما هُمْ سَفَكُوهُ، فَإِنْ كُنْتُ شَرِيكَهُمْ فِيهِ فَإِنَّ لَهُمْ نَصِيبَهُمْ مِنْهُ، وَ إِنْ كانُوا وَلُوهُ دُونِي فَمَا الطَّلِبَةُ إِلا قِبَلَهُمْ. وَ إِنَّ أَوَّلَ عَدْلِهِمْ لَلْحُكْمُ عَلَى أَنْفُسِهِمْ وَ إِنَّ مَعِي لَبَصِيرَتِي، ما لَبَسْتُ وَ لا لُبِسَ عَلَيَّ. وَ إِنَّها لَلْفِئَةُ الْباغِيَةُ فِيهَا الْحَمَأُ وَ الْحُمَّةُ وَ الشُّبْهَةُ الْمُغْدِفَةُ؛ وَ إِنَّ الْأَمْرَ لَواضِحٌ وَ قَدْ زاحَ الْباطِلُ عَنْ نِصابِهِ، وَ انْقَطَعَ لِسانُهُ عَنْ شَغْبِهِ. وَ ايْمُ اللَّهِ لَأُفْرِطَنَّ لَهُمْ حَوْضا أَنَا ماتِحُهُ، لا يَصْدُرُونَ عَنْهُ بِرِيِّ، وَ لا يَعُبُّونَ بَعْدَهُ فِي حَسْيٍ!.

فَأَقْبَلْتُمْ إِلَيَّ إِقْبالَ الْعُوذِ الْمَطافِيلِ عَلَى أَوْلادِها، تَقُولُونَ: الْبَيْعَةَ الْبَيْعَةَ قَبَضْتُ كَفِّي فَبَسَطْتُمُوها، وَ نازَعَتْكُمْ يَدِي فَجَذَبْتُمُوها.

اللَّهُمَّ إِنَّهُما قَطَعانِي وَ ظَلَمانِى، وَ نَكَثا بَيْعَتِى، وَ أَلَّبَا النَّاسَ عَلَيَّ، فَاحْلُلْ ما عَقَدا، وَ لا تُحْكِمْ لَهُما ما أَبْرَما، وَ أَرِهِمَا الْمَسأَةَ فِيما أَمَّلا وَ عَمِلا، وَ لَقَدِ اسْتَثَبْتُهُما قَبْلَ الْقِتالِ، وَ اسْتَأْنَيْتُ بِهِما أَمامَ الْوِقاعِ، فَغَمِطَا النِّعْمَةَ، وَ رَدَّا الْعافِيَةَ.

তালহা ও জুবায়ের সম্পর্কে

আল্লাহর কসম ,তারা মর্যাদাহানিকর কোন কিছু আমার মধ্যে দেখতে পায়নি এবং তারা আমার ও তাদের মধ্যে ন্যায় বিচার করেনি। নিশ্চয়ই ,তারা এখন এমন এক অধিকার দাবি করছে যা তারা পরিত্যাগ করেছে এবং এমন এক রক্তের বদলা দাবি করছে যে রক্তপাত তারা নিজেরাই ঘটিয়েছে। যদি আমি এ কাজে তাদের সাথে জড়িত থাকতাম তা হলে তো এতে তাদেরও অংশ রয়েছে। আর যদি তারা আমাকে ছাড়া তা করে থাকে তাহলে রক্তের বদলার দাবি তাদের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত। তাদের বিচারের প্রথম পদক্ষেপেই তাদের রায় নিজেদের বিরুদ্ধে যাবে। ঘটনার বিস্তারিত তথ্য ও সমাচার আমার জানা আছে। আমি কখনো কোন বিষয়ে তালগোল পাকাইনি এবং তালগোল পাকানো কোন বিষয় আমার কাছে উপস্থাপিত হয়নি (অর্থাৎ আমি কোন কিছু নিয়ে বক্র চিন্তা করিনি এবং কুট কৌশলও আঁটিনি) । নিশ্চয়ই ,এ দলটি বিদ্রোহী যাদের মধ্যে রয়েছে নিকটজন (জুবায়ের) ,বৃশ্চিকের বিষ (আয়শা) এবং সংশয় যা সত্যকে ঢেকে দিয়েছে। কিন্তু বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে পড়েছে এবং অন্যায়ের ভিত কেঁপে উঠেছে। এর জিহবা ফেতনার প্রচারণা বন্ধ করেছে। আল্লাহর কসম ,আমি তাদের জন্য একটা জলাধার তৈরী করবো যেটা থেকে আমি একাই জল নিতে পারবো। না তারা এর পানি পান করতে সমর্থ হবে ,আর না তারা অন্য স্থান থেকে পান করতে পারবে।

“ বায়াত ’ , বায়াত ” বলে তোমরা আমার দিকে এমনভাবে দৌড়ে এসেছো যেন উষ্ট্রি তার নব প্রসাবিত শাবকের দিকে দৌড়ে যায়। আমি আমার হাত গুটিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু তোমরা তা তোমাদের দিকে টেনে নিয়েছো। আমি আমার হাত আবার টেনে গুটিয়ে নিয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা তা আবার জোরে আকর্ষণ করেছো।

হায় আল্লাহ ,এরা দুজন আমার অধিকার উপেক্ষা করে আমার প্রতি অবিচার করলো। তারা উভয়ে বায়াত ভঙ্গ করেছে এবং জনগণকে আমার বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তুলছে। তারা যা বন্ধন করছে তুমি তা মুক্ত কর ;তারা যে মিথ্যার জাল বুনছে তুমি তা দুর্বল কর। যে উদ্দেশ্য নিয়ে তারা কাজ করছে তার কুফল তাদেরকে দেখিয়ে দাও। যুদ্ধের পূর্বে আমি তাদেরকে অনুরোধ করেছিলাম তাদের বায়াতে দৃঢ় থাকতে এবং আমি তাদের প্রতি কোমল আচরণ করেছিলাম। কিন্তু তারা এ আশীর্বাদ খাটো করে দেখলো এবং নিরাপত্তার পথ অবলম্বন করতে অস্বীকৃতি জানালো।

খোৎবা - ১৩৭

يَعْطِفُ الْهَوى عَلَى الْهُدَى إِذَا عَطَفُوا الْهُدى عَلَى الْهَوى، وَ يَعْطِفُ الرَّأْىَ عَلَى الْقُرْآنِ إِذا عَطَفُوا الْقُرْآنَ عَلَى الرَّأْىِ.مِنْهَا: حَتَّى تَقُومَ الْحَرْبُ بِكُمْ عَلَى ساقٍ، بادِيا نَواجِذُها، مَمْلُوءَةً أَخْلافُها، حُلْوا رَضاعُها، عَلْقَما عاقِبَتُها. أَلا وَ فِي غَدٍ -وَ سَيَأْتِي غَدٌ بِما لا تَعْرِفُونَ - يَأْخُذُ الْوالِى مِنْ غَيْرِها عُمّالَها عَلَى مَساوِئِ أَعْمالِها، وَ تُخْرِجُ لَهُ الْأَرْضُ أَفالِيذَ كَبِدِها، وَ تُلْقِي إِلَيْهِ سِلْما مَقالِيدَها فَيُرِيكُمْ كَيْفَ عَدْلُ السِّيرَةِ، وَ يُحْيِي مَيِّتَ الْكِتابِ وَ السُّنَّةِ.

كَأَنِّى بِهِ قَدْ نَعَقَ بِالشّامِ، وَ فَحَصَ بِراياتِهِ فِى ضَواحِي كُوفانَ، فَعَطَفَ عَلَيْها عَطْفَ الضَّرُوسِ، وَ فَرَشَ الْأَرْضَ بِالرُّؤُوسِ، قَدْ فَغَرَتْ فاغِرَتُهُ، وَ ثَقُلَتْ فِي الْأَرْضِ وَطْأَتُهُ، بَعِيدَ الْجَوْلَةِ، عَظِيمَ الصَّوْلَةِ. وَ اللَّهِ لَيُشَرِّدَنَّكُمْ فِى أَطْرافِ الْأَرْضِ حَتَّى لا يَبْقَى مِنْكُمْ إِلا قَلِيلٌ، كَالْكُحْلِ فِى الْعَيْنِ، فَلا تَزالُونَ كَذلِكَ حَتَّى تَؤُوبَ إِلَى الْعَرَبِ عَوازِبُ أَحْلاَمِها! فَالْزَمُوا السُّنَنَ الْقائِمَةَ، وَ الْآثَارَ الْبَيِّنَةَ، وَ الْعَهْدَ الْقَرِيبَ الَّذِي عَلَيْهِ باقِي النُّبُوَّةِ. وَ اعْلَمُوا أَنَّ الشَّيْطانَ إِنَّما يُسَنِّي لَكُمْ طُرُقَهُ لِتَتَّبِعُوا عَقِبَهُ.

ভবিষ্যৎ ঘটনা প্রবাহ সম্পর্কে

তিনি আকাঙ্খাকে হেদায়েতের পথের দিকে পরিচালিত করবেন যখন মানুষ হেদায়েতকে আকাঙ্খার দিকে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে। তিনি মানুষের উদ্দেশ্যকে কুরআনমুখি করবেন যখন মানুষ কুরআনকে উদ্দেশ্য সাধনের হাতিয়ার করবে। মঙ্গলের এ আদেশদাতার পূর্বেই পারিপার্শ্বিক অবস্থা সঙ্গীন হয়ে পড়বে। যুদ্ধ তার দাঁত বের করে সুমিষ্ট দুধ পূর্ণ বাঁট অথচ তিক্ত অগ্রভাগসহ তোমাদের মধ্যে প্রচণ্ডভাবে বিরাজ করবে। সাবধান ,এটা হবে আগামীকাল এবং সেদিন সহসাই আসবে এমন কিছু নিয়ে যা তোমরা জান না। সেই ক্ষমতাবান মানুষটি ,যিনি এ জনতা থেকে হবেন না ,পূর্ববর্তী সকলকে তাদের কুকর্মের জন্য বিচার করবেন এবং পৃথিবী তার অভ্যন্তরীণ সম্পদরাজী খুলে দিয়ে চাবি তার হাতে তুলে দেবে। তিনি তোমাদেরকে কেবলমাত্র আচরণ পদ্ধতি দেখিয়ে দেবেন এবং জীবনবীহীন কুরআন ও সুন্নাহকে পুনরুজ্জীবিত করবেন ।

আমি যেন দেখতে পাচ্ছি সেই পাপের আদেশদাতাকে । সে সিরিয়ায় চিৎকার করছে এবং কুফার উপকণ্ঠ পর্যন্ত তার ঝাণ্ডা প্রসারিত। উষ্ট্রির কামড়ের মতো সে এর দিকে বেঁকে আছে । সে নরমুন্ডে জমিন ঢেকে দিয়েছে। তার মুখগহবর প্রশস্থ এবং জমিনে তার পদচারণা ভারী হয়ে পড়েছে। বিস্তৃত এলাকা নিয়ে তার অগ্রযাত্রা এবং তার আক্রমণ তীব্র । আল্লাহর কসম ,সে তোমাদেরকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দেবে এবং চোখের সুর্মার মত তোমরা মুষ্টিমেয় কজন অবশিষ্ট থাকবে। আরব জাতির বোধশক্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত এ অবস্থা চলবে। কাজেই তোমরা প্রতিষ্ঠিত পথ অনুসরণ কর ,পাপ পরিষ্কার কর এবং নবুয়তের চিরস্থায়ী মহৎগুণাবলী অনুসরণ কর। মনে রেখো ,শয়তান তার পথকে সহজ করেছে যাতে তোমরা পদে পদে তাকে অনুসরণ করতে পার ।

____________________

১। আমিরুল মোমেনিনের এই ভবিষ্যদ্বাণী দ্বাদশ ইমাম আবুল কাসেম মুহাম্মদ ইবনে হাসান আল মাহদীর আগমণ সম্পর্কে।

২। এটা আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের প্রতি ইঙ্গিত। মারওয়ানের মৃত্যুর পর সে সিরিয়ার ক্ষমতা দখল করেছিল। তারপর সে মুসআব ইবনে জুবায়েরের সাথে যুদ্ধে মুখতার ইবনে আবি উবায়েদ আছ - ছাকাফিকে হত্যা করে ইরাকের দিকে অগ্রসর হয়েছিল। সে কুফার উপকণ্ঠে দায়রুল যাছালিক - এর নিকটবর্তী মাসকিন নামক স্থানে মুসআবের বাহিনীর সাথে যুদ্ধ করেছিল। মুসআবকে পরাজিত করে সে কুফায় প্রবেশ করে কুফাবাসীদের বায়াত আদায় করেছিলো। তারপর সে আব্দুল্লাহ ইবনে জুবায়েরের সাথে যুদ্ধ করার জন্য হাজাজ ইবনে ইউছুফ আছ ছাকাফিকে মক্কায় প্রেরণ করেছিল। ফলে হাজ্জাজ মক্কা অবরোধ করে কাবা ঘরে পাথর নিক্ষেপ করেছিল। সে করে তার লাশ ফাঁসি কাষ্ঠে ঝুলিয়ে রেখেছিল। সে এমন নৃশংসতা সংঘটিত করেছিল যে ,কেউ তার কথা মনে করলেই থারথার করে কেঁপে উঠতো।

খোৎবা - ১৩৮

لَنْ يُسْرِعَ أَحَدٌ قَبْلِي إِلَى دَعْوَةِ حَقِّ، وَ صِلَةِ رَحِمٍ وَ عائِدَةِ كَرَمٍ، فَاسْمَعُوا قَوْلِي، وَ عُوا مَنْطِقِى، عَسى أَنْ تَرَوْا هَذا الْأَمْرَ مِنْ بَعْدِ هَذا الْيَوْمِ تُنْتَضَى فِيهِ السُّيُوفُ، وَ تُخانُ فِيهِ الْعُهُودُ، حَتَّى يَكُونَ بَعْضُكُمْ أَئِمَّةً لِأَهْلِ الضَّلالَةِ، وَ شِيعَةً لِأَهْلِ الْجَهالَةِ.

খলিফা উমরের মৃত্যুর পর আলোচনা কমিটি উপলক্ষে

মানুষকে সত্যের দিকে আহবানে ,আত্মীয়তার বন্ধনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে ও উদারতা প্রদর্শনে আমার চেয়ে অগ্রণী আর কেউ নেই। সুতরাং আমার কথা শোন এবং আমি যা বলি তা মনে রেখো। এমনও হতে পারে ,তোমরা দেখবে আগামীকাল এ ব্যাপারে খোলা তরবারি হাতে নেয়া হবে এবং তোমরা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে । অবস্থা এতোদূর যাবে যে ,তোমাদের মধ্যে কেউ কেউ গোমরাহ লোকদের নেতা হবে এবং অজ্ঞ লোকদের অনুসারী হবে।

খোৎবা - ১৩৯

التحذیر من الغیبة و التیمیمة

وَ إِنَّما يَنْبَغِي لِأَهْلِ الْعِصْمَةِ وَ الْمَصْنُوعِ إِلَيْهِمْ فِى السَّلامَةِ أَنْ يَرْحَمُوا أَهْلَ الذُّنُوبِ وَ الْمَعْصِيَةِ، وَ يَكُونَ الشُّكْرُ هُوَ الْغالِبَ عَلَيْهِمْ، وَ الْحاجِزَ لَهُمْ عَنْهُمْ، فَكَيْفَ بِالْعائِبِ الَّذِي عابَ أَخَاهُ وَ عَيَّرَهُ بِبَلْواهُ! أَما ذَكَرَ مَوْضِعَ سَتْرِ اللَّهِ عَلَيْهِ مِنْ ذُنُوبِهِ مِمَّا هُوَ أَعْظَمُ مِنَ الذَّنْبِ الَّذِي عابَهُ بِهِ! وَ كَيْفَ يَذُمُّهُ بِذَنْبٍ قَدْ رَكِبَ مِثْلَهُ! فَإِنْ لَمْ يَكُنْ رَكِبَ ذَلِكَ الذَّنْبَ بِعَيْنِهِ فَقَدْ عَصَى اللَّهَ فِيما سِواهُ مِمّا هُوَ أَعْظَمُ مِنْهُ. وَ ايْمُ اللَّهِ لَئِنْ لَمْ يَكُنْ عَصاهُ فِي الْكَبِيرِ وَ عَصاهُ فِي الصَّغِيرِ، لَجُرْأَتُهُ عَلَى عَيْبِ النَّاسِ أَكْبَرُ!

يا عَبْدَ اللَّهِ، لا تَعْجَلْ فِي عَيْبِ أَحَدٍ بِذَنْبِهِ فَلَعَلَّهُ مَغْفُورٌ لَهُ، وَ لا تَأْمَنْ عَلَى نَفْسِكَ صَغِيرَ مَعْصِيَةٍ، فَلَعَلَّكَ مُعَذَّبٌ عَلَيْهِ. فَلْيَكْفُفْ مَنْ عَلِمَ مِنْكُمْ عَيْبَ غَيْرِهِ لِما يَعْلَمُ مِنْ عَيْبِ نَفْسِهِ، وَ لْيَكُنِ الشُّكْرُ شاغِلاً لَهُ عَلَى مُعافاتِهِ مِمَّا ابْتُلِيَ بِهِ غَيْرُهُ.

গিবত সম্পর্কে

যারা পাপ করে না এবং পাপ থেকে যাদেরকে নিরাপত্তা দেয়া হয়েছে তাদের উচিত পাপী ও অবাধ্যগণের প্রতি করুণা প্রকাশ করা। কৃতজ্ঞতাই তাদের সবচেয়ে বড় পরিতৃপ্তি হওয়া উচিত এবং তা তাদেরকে অন্যের দোষ অন্বেষণ করা থেকে রক্ষা করবে। গিবতকারীর অবস্থা কী ,যে তার ভাইকে দোষারোপ করে এবং তার দোষ খুঁজে বেড়ায় ? সে কি ভুলে গেছে যে ,আল্লাহ তার পাপ গোপন করে রেখেছেন যা তার ভাইয়ের পাপ থেকেও গুরুতর ? যেখানে সে নিজেই পাপে লিপ্ত সেখানে সে কী করে অন্যকে পাপের জন্য নিন্দা করবে ? যদি সে অন্যের সমান পাপ নাও করে থাকে তবুও সে যে বড় ধরনের পাপ করেনি তার নিশ্চয়তা কোথায় ? আল্লাহর কসম ,যদি সে কবিরা গুনাহ না করে সগিরা গুনাহও করে থাকে। তবুও অন্যের গুনাহ চর্চা করে সে কবিরা গুনাহই করেছে।

হে আল্লাহর বান্দাগণ ,তোমরা অন্যের পাপ - চর্চায় তাড়াহুড়া করো না ,কারণ সে হয়তো এর জন্য ক্ষমা পেয়ে যেতে পারে এবং তোমার নিজের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পাপের জন্যও নিজেকে নিরাপদ মনে করো না ,কারণ তোমাকে হয়ত তার জন্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে কেউ অন্যের দোষ জানতে পারলে তা প্রকাশ করা উচিত নয় ,কারণ তার চিন্তা করা উচিত সে নিজের দোষ কতটুকুই বা জানে। তদুপরি তার উচিত শুকরিয়া আদায় করা এ জন্য যে তাকে এমন পাপ থেকে রক্ষা করা হয়েছে।

____________________

১। অন্যের ছিদ্রান্বেষণ ও গিবত এমনভাবে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে যে ,মানুষ এর কুফল বেমালুম ভুলে আছে। বর্তমানে অবস্থা এমন হয়েছে যে ,বড় ও ছোট ,সংক্রান্ত ও নিচ কেউ এ দোষ থেকে মুক্ত নয়। মিম্বারের উচ্চ মর্যাদা বা মসজিদের পবিত্রতা কোন কিছুই এ দোষ নিবৃত্ত করতে পারছে না। কয়েকজন বন্ধু - বান্ধব একত্রে বসলেই তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায় অতিরঞ্জিত করে অন্যের দোষ বের করে কুৎসা রটানো। ছিদ্রান্বেষী লোকের শত দোষ থাকলেও সে নিজের দোষ প্রকাশ হোক এটা কখনো চায় না ,কিন্তু সে অন্যের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ায় এবং রসিয়ে রসিয়ে তা প্রকাশ করে। নিজের জন্য যেমন অন্যের জন্যও ঠিক তেমন অনুভূতি থাকা উচিত। অন্যের অনুভূতিতে আঘাত করে কারো কিছু করা উচিত নয়। এ প্রবাদ সকলেরই মেনে চলা উচিত যে , তুমি অন্যের কাছ থেকে যা আশা কর না ,অন্যের প্রতিও তুমি তা করো না। ”

গিবতের সংজ্ঞা হলো ,কথায় হোক আর কর্মেই হোক মানহানি করার উদ্দেশ্যে কারো দোষ প্রকাশ করা যা তার দুঃখের কারণ হয়ে দাড়ায়। কেউ কেউ বলেন ,গিবত হবে তা যা মিথ্যামিথ্যি ও সত্যের বিপরীতভাবে প্রকাশ করা হয়। তাদের মতে যা দেখেছে বা শুনেছে তা অবিকল প্রকাশ করা গিবত নয়। তারা বলে তারা তো যা দেখেছে বা শুনেছে তাই প্রকাশ করেছে - এতে গিবত হবে কেন ? বস্তুত এহেন বাস্তব ঘটনা বর্ণনা করার নামই হলো গিবত কারণ ঘটনাটি যদি তথ্যগতভাবে মিথ্যা হতো। তবে তা হতো কাউকে মিথ্যা দোষারোপ করা - গিবত নয়। বর্ণিত আছে যে ,রাসূল (সা.) বলেছেনঃ

“ তোমরা কি জান গিবত কী ? লোকেরা বললো , আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন । ” তারপর তিনি বললেন , তোমরা তোমাদের ভাইদের সম্বন্ধে কিছু বললে যদি সে ব্যথিত হয় - উহাই গিবত ” কেউ একজন বললো , যদি আমি তার সম্বন্ধে যা বলি তা প্রকৃত পক্ষেই সত্য হয় তাহলে কী হবে ? রাসূল (সা.) জবাব দিলেন , গিবত হবে তখনই যখন তথ্যগতভাবে উহা সত্য হয় । অন্যথায় উহা মিথ্যা অপবাদ হবে । ”

গিবত নানা কারণে হয়ে থাকে ;সে জন্য মানুষ কখনো জ্ঞাতসারে আবার কখনো অজ্ঞাতসারে গিবতে জড়িয়ে পড়ে। আবু হামিদ আল - গাজ্জালী তার গ্রন্থ এহইয়া - এ উলুমেদীন" - এ গিবতের বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করেছেন ;যার প্রধান প্রধানগুলো নিম্নরূপ :

১. কারো সম্বন্ধে কৌতুক করা বা কারো মানহানি করার জন্য ;

২. মানুষকে হাসাবার জন্য এবং নিজের হাস্য - রসিকতা ও প্রাণ - চাঞ্চল্য প্রকাশ করার জন্য ;

৩.ক্রোধের বশবর্তী হয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশের জন্য ;

৪.অন্যের বদনাম করে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ;

৫.কোন বিষয়ে নিজের সংশ্লিষ্টতা ঢেকে রাখার জন্য ,যেমন - কোন অপরাধ অন্যের ওপর চাপিয়ে দেয়া ;

৬.কোন দলের সাথে জড়িত থেকেও তা ধামাচাপা দেয়ার জন্য ;

৭.কোন লোককে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য যার কাছ থেকে নিজের দোষ প্রকাশিত হয়ে পড়ার ভয় থাকে ;

৮.প্রতিযোগীকে পরাভূত করার জন্য ;

৯.ক্ষমতাসীন কারো কাছে নিজের স্থান করে নেয়ার জন্য ;

১০.অমুক ব্যক্তি অমুক পাপে লিপ্ত হয়েছে - এরূপ কথা বলে দুঃখ প্রকাশ করা জন্য ;

১১.বিস্ময় প্রকাশ করার জন্য ,যেমন - অমুক ব্যক্তি এ কাজ করেছে ;

১২.কোন কাজে ক্রোধ প্রকাশ করে কাজটি যে করেছে তার নাম প্রকাশ করার জন্য।

তবে কোন কোন ক্ষেত্রে ছিদ্রান্বেষণ বা সমালোচনা গিবত হয় না ,যেমন -

(১) অত্যাচার থেকে নিস্কৃতি পাবার জন্য মজলুম জালেমের বিরুদ্ধে নালিশ করলে গিবত হয় না ,যেমন - আল্লাহ বলেন ,

মন্দ কথার প্রচারণা আল্লাহ পছন্দ করেন না ;তবে যার ওপর জুলুম করা হয়েছে তার কথা স্বতন্ত্র (কুরআন - ৪৪:১৪৮)

(২) অন্যকে উপদেশ দেয়ার জন্য কারো দোষ উদাহরণ হিসাবে প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;

(৩) দ্বীনের অনুশাসন বলবৎ করার জন্য কারো বিশেষ দোষ প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;

(৪) কোন মুসলিমকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য আত্মসাৎ ও অসাধুতার কথা প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;

(৫) এমন কারো কাছে দোষ প্রকাশ করা যিনি বাধা দিয়ে দোষ করা থেকে রক্ষা করতে পারবেন ;

(৬) হাদিসের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য হাদিস বর্ণনাকারীর সমালোচনা ও ত্রুটি - বিচ্যুতি প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;

(৭) কারো শারীরিক সীমাবদ্ধতা (যেমন - বোবা ,অন্ধ ,কালা ,হাতবিহীন) ব্যক্তিত্ব ব্যাখ্যার জন্য প্রকাশ করা গিবত নয়:

(৮) চিকিৎসকের নিকট চিকিৎসার জন্য দোষ প্রকাশ করা গিবত নয় ;

(৯) কেউ মিথ্যা বংশ পরিচয় দিলে তার সঠিক বংশ পরিচয় প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;

(১০) কারো জীবন ,সম্পদ ও মর্যাদা রক্ষা করার জন্য তার দোষ প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;

(১১) যদি দু ’ ব্যক্তি কারো দোষ আলোচনা করে যা উভয়েরই জানা আছে। তবে তা গিবত হয় না ;

(১২) যে ব্যক্তি প্রকাশ্যে কুকর্ম করে তার আচরণ প্রকাশ করলে গিবত হয় না ;যেমন হাদিসে আছে ; যে লজ্জার ঘোমটা ছিড়ে ফেলেছে তার বেলায় গিবত নেই। ”

খোৎবা - ১৪০

التحذیر من سماع الغیبة

أَيُّهَا النَّاسُ، مَنْ عَرَفَ مِنْ أَخِيهِ وَثِيقَةَ دِينٍ وَ سَدادَ طَرِيقٍ، فَلا يَسْمَعَنَّ فِيهِ أَقاوِيلَ الرِّجالِ، أَما إِنَّهُ قَدْ يَرْمِي الرَّامِي وَ تُخْطِئُ السِّهَامُ، وَ يُحِيلُ الْكَلامُ، وَ باطِلُ ذَلكَ يَبُورُ، وَ اللَّهُ سَمِيعٌ وَ شَهِيدٌ. أَما إِنَّهُ لَيْسَ بَيْنَ الْحَقِّ وَ الْباطِلِ إِلاّ أَرْبَعُ أَصابِعَ.

فَسُئِلَ عليه‌السلام: عَنْ مَعْنى قَوْلِهِ هَذا، فَجَمَعَ أَصابِعَهُ وَوَضَعَها بَيْنَ أُذُنِهِ وَ عَيْنِهِ،ثُمَّ قَالَ: الْباطِلُ أَنْ تَقُولَ: سَمِعْتُ، وَ الْحَقُّ أَنْ تَقُولَ: رَأَيْتُ!.

গিবত শ্রবণকারীর ব্যাপারে সতর্কবাণী

হে লোকসকল ,যদি কেউ জানে যে ,তার ভাই ইমানে অটল এবং সত্য ও সঠিক পথে দৃঢ় তবে তার সম্বন্ধে মানুষ কিছু বললে তৎপ্রতি কান না দেয়া উচিত। তীরন্দাজের তীরও অনেক সময় লক্ষ্যভেদ করে না। একইভাবে মানুষের কথাও অসংলগ্ন হতে পারে। কথার ভুল নৈতিকতা বিনষ্ট করে। আল্লাহ সর্বশ্রোতা ও সর্ববিষয়ে সাক্ষী। সত্য ও মিথ্যার মধ্যে চার আঙ্গুল ব্যতীত কিছু নেই।

কেউ একজন এ কথাত্র অর্থ জিজ্ঞেস করলে আমিরুল মোমেনিন তার হাতের চারটি আঙ্গুল একত্রিত করে কান ও চোখের মধ্যবর্তী স্থানে রেখে বললেন ,এটাই মিথ্যা যখন তোমরা বল আমি এরূপ শুনেছি এবং তাই সত্য যখন তোমরা বল আমি দেখেছি।