নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা0%

নাহজ আল-বালাঘা লেখক:
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ: হযরত আলী (আ.)

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক: আশ-শরীফ আর-রাজী
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ:

ভিজিট: 42384
ডাউনলোড: 1974

নাহজ আল-বালাঘা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 48 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42384 / ডাউনলোড: 1974
সাইজ সাইজ সাইজ
নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক:
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বাংলা

রাসূলের (সা.) ‘জ্ঞান নগরীর দ্বার’ আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী, দার্শনিক, সুলেখক ও বাগ্মী। আলঙ্কারিক শাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ও নৈপুন্য অসাধারণ। তিনি নবুওয়াতী জ্ঞান ভান্ডার হতে সরাসরি জ্ঞান আহরণ করেন এবং সাহাবাদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পন্ডিত ছিলেন। এতে কারো দ্বিমত নেই। আরবী কাব্যে ও সাহিত্যে তার অনন্যসাধারণ অবদান ছিল। খেলাফত পরিচালনা কালে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ (খোৎবা) দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকগণকে প্রশাসনিক বিষয়ে উপদেশ ও নির্দেশ দিয়ে পত্র লিখেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে মানুষের অনেক প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছিলেন। তার এসব বাণী কেউকেউ লিখে রেখেছিল, কেউ কেউ মনে রেখেছিল, আবার কেউ কেউ তাদের লিখিত পুস্তকে উদ্ধৃত করেছিল। মোটকথা তার অমূল্য বাণীসমূহ মানুষের কাছে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল।

আশ-শরীফ আর-রাজী আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিবের ভাষণসমূহ (খোৎবা), পত্রাবলী, নির্দেশাবলী ও উক্তিসমূহ সংগ্রহ করে “নাহজ আল-বালঘা” নামক গ্রন্থটি সঙ্কলন করেন।

পত্র - ১

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلى أَهْلِ اَلْكُوفَةِ، عِنْدَ مَسِيرِهِ مِنَ ألْمَدِينَةٍ إلَى ألْبصْرةِ:

مِنْ عَبْدِ اللَّهِ عَلِيِّ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَ إِلَى أَهْلِ الْكُوفَةِ جَبْهَةِ الْأَنْصَارِ وَ سَنَامِ الْعَرَبِ.

أَمَّا بَعْدُ، فَإِنِّي أُخْبِرُكُمْ عَنْ أَمْرِ عُثْمَانَ حَتَّى يَكُونَ سَمْعُهُ كَعِيَانِهِ إِنَّ النَّاسَ طَعَنُوا عَلَيْهِ، فَكُنْتُ رَجُلاً مِنَ الْمُهَاجِرِينَ أُكْثِرُ اسْتِعْتَابَهُ، وَ أُقِلُّ عِتَابَهُ وَ كَانَ طَلْحَةُ وَ الزُّبَيْرُ أَهْوَنُ سَيْرِهِمَا فِيهِ الْوَجِيفُ، وَ أَرْفَقُ حِدَائِهِمَا الْعَنِيفُ. وَ كَانَ مِنْ عَائِشَةَ فِيهِ فَلْتَةُ غَضَبٍ، فَأُتِيحَ لَهُ قَوْمٌ قَتَلُوهُ وَ بَايَعَنِي النَّاسُ غَيْرَ مُسْتَكْرَهِينَ وَ لاَ مُجْبَرِينَ، بَلْ طَائِعِينَ مُخَيَّرِينَ.

وَ اعْلَمُوا أَنَّ دَارَ الْهِجْرَةِ قَدْ قَلَعَتْ بِأَهْلِهَا وَ قَلَعُوا بِهَا، وَ جَاشَتْ جَيْشَ الْمِرْجَلِ، وَ قَامَتِ الْفِتْنَةُ عَلَى الْقُطْبِ، فَأَسْرِعُوا إِلَى أَمِيرِكُمْ وَ بَادِرُوا جِهَادَ عَدُوِّكُمْ، إِنْ شَأَ اللَّهُ عَزَّ وَ جَلَّ.

মদিনা থেকে বসরাভিমুখে যাত্রাকালে কুফার জনগণকে লিখেছিলেন

আল্লাহর বান্দা ও মোমিনগণের কমাণ্ডার আলীর নিকট হতে কুফার জনগণের প্রতি যারা সহায়তা দানে অগ্রণী ও আরবদের প্রধান ।

উসমানের ওপর যা আপতিত হয়েছিল এখন আমি তা এমন সঠিকভাবে তোমাদের কাছে বর্ণনা করছি। যাতে তোমরা স্বচক্ষে দেখার মতো বুঝতে পার। জনগণ তার সমালোচনা করেছিল। মুহাজিরদের মধ্যে আমিই একমাত্র ব্যক্তি যে মুসলিমদের সন্তুষ্ট রাখার এবং ক্ষেপিয়ে না তোলার জন্য তাকে উপদেশ দিয়েছিল। তালহা ও জুবায়ের তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল এবং তারা তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল। আয়শাও তার ওপর খুব ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল। ফলে একটা দল তাকে আক্রমণ করে হত্যা করেছিল। তারপর জনগণ আমার কাছে বায়াত গ্রহণ করে। এ বায়াতে কোন প্রকার জোর - জবরদস্তি ছিল না বা কাউকে বায়াত গ্রহণে বাধ্য করা হয়নি। স্বেচ্ছায় ও স্বাধীনভাবে তারা বায়াত গ্রহণ করেছে।

তোমরা জেনে নাও ,মদিনা আজ জনশূন্য হয়ে পড়েছে। বিদ্রোহ দমনের জন্য মদিনা আজ বিশাল পাত্রের ফুটন্ত পানির ন্যায় উত্তপ্ত হয়ে আছে। অপরদিকে বিদ্রোহীরাও পূর্ণ শক্তি নিয়ে তাদের অক্ষরেখায় আবর্তিত হচ্ছে। সুতরাং তোমরা তোমাদের আমিরের (কমাণ্ডার) দিকে দ্রুত এগিয়ে এসো - এগিয়ে এসো তোমাদের শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদ করতে। যদি তোমরা তা কর তবে সর্বশক্তির আধার আল্লাহ তোমাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন।

__________________

১। বাহারানী (৪র্থ খণ্ড ,পৃঃ ৩৩৩) লিখেছেন যে ,তালহা ও জুবায়ের কর্তৃক ফেতনা সংঘটনের সংবাদ শুনেই আমিরুল মোমেনিন বসরা অভিমুখে যাত্রা করেছিলেন। পথিমধ্যে মা ’ আল আযাব নামক স্থান থেকে তিনি স্বীয় পুত্র ইমাম হাসান ও আম্মার ইবনে ইয়াসিরের মারফত কুফাবাসীদের নিকট এ পত্র প্রেরণ করেন।

হাদীদ (১৪শ খণ্ড ,পৃঃ ৮ - ১৬) ,আছীর ,(৩য় খণ্ড ,পৃঃ ২২৩) ও তাবারী (১ম খণ্ড ,পৃঃ ৩১৩৯) লিখেছেন যে ,বসরার বিদ্রোহ দমনের জন্য যাত্রা করে আমিরুল মোমেনিন পথিমধ্যে আর - রাবাযাহ নামক স্থানে ক্যাম্প করেছিলেন। সে ক্যাম্প থেকে তাঁর ভ্রাতুষ্পপুত্র মুহাম্মদ ইবনে জাফর ও মুহাম্মদ ইবনে আবু বকরের মারফত এ পত্র প্রেরণ করেছিলেন। এ পত্রে আমিরুল মোমেনিন প্রকাশ্যে বলেছেন যে ,উসমানের হত্যা মূলত আয়শা ,তালহা ও জুবায়েরের প্রচেষ্টার ফল এবং তারাই এ হত্যাকান্ডে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। বস্তুতঃপক্ষে আয়শা এতই উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলেন যে ,তিনি প্রকাশ্য জনসভায় উসমানের দোষত্রুটি প্রকাশ করে তাকে হত্যা করা জায়েজ বলে ঘোষণা করেছিলেন ।

আবদুহ (২য় খণ্ড ,পৃঃ ৩) ,ফিদা (১ খণ্ড ,পৃঃ ১৭২) ও বালাজুরী (৫ম খণ্ড ,পৃঃ ৮৮) লিখেছেনঃ

একদিন উসমান মিম্বারের ওপর ছিলেন । এমন সময় উন্মুল মোমেনিন আয়শা তার বোরখার ভেতর থেকে রাসূলের (সা.) জুতা ও কামিজ বের করে বললেন , এ জুতা ও কামিজ আল্লাহর রাসূলের যা এখনো বিনষ্ট হয়নি । এরই মধ্যে তোমরা তাঁর দ্বীনি ও সুন্নাহ পরিবর্তন করে ফেলেছো । ” আয়শার কথায় উসমান ক্ষেপে গিয়ে তার সাথে উচ্চবাচ্য শুরু করেছিল কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে আয়শা বললেন , এ নাছালিকে হত্যা করা জায়েজ ” (নাছালি অর্থ হলো - লম্বা দাড়িওয়ালা ইহুদী) ||

এমনিতেই জনগণ উসমানের ওপর অসন্তুষ্ট ও ক্ষিপ্ত ছিল। এ ঘটনা তাদের সাহস আরো বাড়িয়ে দিল এবং তারা তাকে ঘেরাও করে দুটি দাবী পেশ করেছিল। দাবী গুলো হলো - উসমান তার ভুল - ভ্রান্তি সংশোধন করবে ,না হয় খেলাফত হতে সরে যাবে। ঘেরাওকারীগণ এত বেশি ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছিল যে ,তাদের দুটো দাবীর যে কোন একটা মেনে না নিলে উসমান নিহত হবার সম্ভাবনা প্রকট হয়ে উঠেছিল। আয়শা অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছিলেন কিন্তু তিনি কোন কথা বলেন নি। বরং উসমানকে অবরোধে ফেলে তিনি মক্কা চলে যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। এ সময় মারওয়ান ইবনে হাকাম ও আত্তাব ইবনে আসিদ আয়শার কাছে এসে তাকে বললো , আপনি এখন মক্কা যাওয়া স্থগিত করলে উসমানের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং জনতা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ” তাদের কথায় আয়শা বললেন যে ,তিনি হজ্জ করার নিয়্যত করেছেন। কাজেই তা পরিবর্তন করা সম্ভব হবে না। এতে মারওয়ান একটা প্রবাদ বাক্য বললো ,যার অর্থ হলোঃ

কায়েস আমার নগরে আগুন লাগিয়ে দিলো ,

এবং যখন অগ্নিশিখা জ্বলে উঠলো ,

সে নিজকে রক্ষা করে কেটে পড়লো।

একইভাবে তালহা ও জুবায়ের উসমানের ওপর ক্ষিপ্ত ছিল এবং তারাই উসমানের বিরুদ্ধে অসন্তোষ ঘনীভূত করা ও বিদ্রোহের আগুন প্রজ্জ্বলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। এ দৃষ্টিকোণ থেকে তারাই উসমানের হত্যাকান্ডের জন্য দায়ী এবং তারাই তাতে অংশগ্রহণকারী। অধিকাংশ মানুষ তাদের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে অবহিত ছিল এবং তাদেরকেই উসমানের খুনি বলে মনে করতো। তাদের সমর্থকগণও তাদের এ অপরাধ খণ্ডন করে কোন ব্যাখ্যা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। কুতায়বাহ (১ম খণ্ড ,পৃঃ ৬০) লিখেছেনঃ

বসরার পথে আওতাম নামক স্থানে আয়শার সাথে মুঘিরা ইবনে শুবাহর সাক্ষাত হলে মুঘিরা জিজ্ঞেস করেছিল , হে উন্মুল মোমেনিন ,আপনি কোথায় যাচ্ছেন ? উত্তরে আয়শা বললেন , আমি বসরা যাচ্ছি। ” মুঘিরা ,বসরা যাবার উদ্দেশ্য জানতে চাইলে আয়শা বললেন , উসমানের রক্তের বদলা নেয়ার জন্য যাচ্ছি। ” মুঘিরা স্তম্ভিত হয়ে বললেন , সে কী ,উসমানের হত্যাকারীগণ তো আপনার সাথেই আছে। ” তারপর মুঘিরা মারওয়ানের দিকে ফিরে তার গন্তব্যস্থল জানতে চাইলেন । উত্তরে মারওয়ান বললো , উসমানের রক্তের বদলা নিতে আমিও বসরা যাচ্ছি। ” মুঘিরা বললেন , উসমানের খুনিরা তো তোমার সাথেই রয়েছে - এ তালহা ও জুবায়ের তাকে হত্যা করেছে। ”

প্রকৃতপক্ষে যে দলটি উসমানকে হত্যা করেছিল এবং হত্যার সাথে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ছিল তারা উসমান হত্যার দোষ আমিরুল মোমেনিনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বসরা চলে গিয়েছিল এবং সেখানে ফেতনা সৃষ্টি করেছিল। আমিরুল মোমেনিনও বিদ্রোহ দমনের জন্য বসরা পৌছলেন। পথিমধ্যে উক্ত পত্রে কুফাবাসীদের সমর্থন চাইলেন। পত্র পাওয়া মাত্র কুফার যোদ্ধাগণ আমিরুল মোমেনিনের সৈন্যবাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। এ যুদ্ধ জামালের যুদ্ধ ’ নামে খ্যাত।

পত্র - ২

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلَيهِمْ بَعْدَ فَتْحِ ألْبَصْرةِ

وَ جَزَاكُمُ اللَّهُ مِنْ أَهْلِ مِصْرٍ عَنْ أَهْلِ بَيْتِ نَبِيِّكُمْ أَحْسَنَ مَا يَجْزِي الْعَامِلِينَ بِطَاعَتِهِ، وَ الشَّاكِرِينَ لِنِعْمَتِهِ، فَقَدْ سَمِعْتُمْ وَ أَطَعْتُمْ، وَ دُعِيتُمْ فَأَجَبْتُمْ.

বসরায় জামালের যুদ্ধে জয়লাভের পর কুফাবাসীদেরকে লিখেছিলেন

হে কুফার শহরবাসীগণ ,রাসূলের (সা.) আহলুল বাইতের পক্ষ থেকে আল্লাহ্ তাঁর সর্বোৎকৃষ্ট পুরস্কার দ্বারা তোমাদেরকে পুরস্কৃত করুন। যারা আল্লাহর আনুগত্যের জন্য কাজ করে তাদেরকে যে পুরস্কার দেয়া হয় ,সে পুরস্কার তোমাদেরকে প্রদান করুন। যারা আল্লাহর নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে তাদের পুরস্কারে তিনি তোমাদেরকে পুরস্কৃত করুন। নিশ্চয়ই ,তোমরা আমার ডাকে সাড়া দিয়েছে এবং আমাকে মান্য করেছো। আমার আহবানের সাথে সাথে তোমরা সাড়া দিয়েছে।

পত্র - ৩

من كتاب لهعليه‌السلام

( لِشُرَيْحِ بْنِ ألْحارِثِ )

رُوِيَ أَنَّ شُرَيْحَ بْنَ الْحَارِثِ قَاضِيَ أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَعليه‌السلام ، اشْتَرَى عَلَى عَهْدِهِ دَاراً بِثَمَانِينَ دِينَار، فَبَلَغَهُ ذَلِكَ فَاسْتَدْعَى شُرَيْحاً، فَاسْتَدْعَاهُ وَ قَالَ لَهُ:

بَلَغَنِي أَنَّكَ ابْتَعْتَ دَاراً بِثَمَانِينَ دِينَاراً، وَ كَتَبْتَ لَهَا كِتَاباً، وَ أَشْهَدْتَ فِيهِ شُهُوداً.

فَقَالَ لَهُ: شُرَيْحٌ قَدْ كَانَ ذَلِكَ يَا أَمِيرَ الْمُؤْمِنِينَ، قَالَ فَنَظَرَ إِلَيْهِ نَظَرَ الْمُغْضَبِ ثُمَّ قَالَ لَهُ: يَا شُرَيْحُ، أَمَا إِنَّهُ سَيَأْتِيكَ مَنْ لاَ يَنْظُرُ فِي كِتَابِكَ وَ لاَ يَسْأَلُكَ عَنْ بَيِّنَتِكَ حَتَّى يُخْرِجَكَ مِنْهَا شَاخِصاً، وَ يُسْلِمَكَ إِلَى قَبْرِكَ خَالِصاً. فَانْظُرْ يَا شُرَيْحُ لاَ تَكُونُ ابْتَعْتَ هَذِهِ الدَّارَ مِنْ غَيْرِ مَالِكَ، أَوْ نَقَدْتَ الثَّمَنَ مِنْ غَيْرِ حَلاَلِكَ! فَإِذَا أَنْتَ قَدْ خَسِرْتَ دَارَ الدُّنْيَا وَ دَارَ الْآخِرَةِ! أَمَا إِنَّكَ لَوْ كُنْتَ أَتَيْتَنِي عِنْدَ شِرَائِكَ مَا اشْتَرَيْتَ لَكَتَبْتُ لَكَ كِتَابا عَلَى هَذِهِ النُّسْخَةِ، فَلَمْ تَرْغَبْ فِي شِرَأِ هَذِهِ الدَّارِ بِدِرْهَمٍ فَمَا فَوْقَهُ.

وَانُّسْخَةُ هَذِهِ: هَذَا مَا اشْتَرَى عَبْدٌ ذَلِيلٌ مِنْ مَيِّتٍ قَدْ أُزْعِجَ لِلرَّحِيلِ، اشْتَرَى مِنْهُ دَارا مِنْ دَارِ الْغُرُورِ مِنْ جَانِبِ الْفَانِينَ، وَ خِطَّةِ الْهَالِكِينَ وَ تَجْمَعُ هَذِهِ الدَّارَ حُدُودٌ أَرْبَعَةٌ: الْحَدُّ الْأَوَّلُ -يَنْتَهِي إِلَى دَوَاعِي الْآفَاتِ، وَ الْحَدُّ الثَّانِي- يَنْتَهِي إِلَى دَوَاعِي الْمُصِيبَاتِ، وَ الْحَدُّ الثَّالِثُ -يَنْتَهِي إِلَى الْهَوَى الْمُرْدِي وَ الْحَدُّ الرَّابِعُ- يَنْتَهِي إِلَى الشَّيْطَانِ الْمُغْوِي، وَ فِيهِ يُشْرَعُ بَابُ هَذِهِ الدَّارِ. اشْتَرَى هَذَا الْمُغْتَرُّ بِالْأَمَلِ، مِنْ هَذَا الْمُزْعَجِ بِالْأَجَلِ، هَذِهِ الدَّارَ بِالْخُرُوجِ مِنْ عِزِّ الْقَنَاعَةِ، وَ الدُّخُولِ فِي ذُلِّ الطَّلَبِ وَ الضَّرَاعَةِ. فَمَا أَدْرَكَ هَذَا الْمُشْتَرِي فِيمَا اشْتَرَى مِنْهُ مِنْ دَرَكٍ، فَعَلَى مُبَلْبِلِ أَجْسَامِ الْمُلُوكِ، وَ سَالِبِ نُفُوسِ الْجَبَابِرَةِ، وَ مُزِيلِ مُلْكِ الْفَرَاعِنَةِ، مِثْلِ كِسْرَى وَ قَيْصَرَ، وَ تُبَّعٍ وَ حِمْيَرَ.

وَ مَنْ جَمَعَ الْمَالَ عَلَى الْمَالِ فَأَكْثَرَ، وَ مَنْ بَنَى وَ شَيَّدَ، وَ زَخْرَفَ وَ نَجَّدَ، وَ ادَّخَرَ وَ اعْتَقَدَ وَ نَظَرَ بِزَعْمِهِ لِلْوَلَدِ، إِشْخَاصُهُمْ جَمِيعا إِلَى مَوْقِفِ الْعَرْضِ وَ الْحِسَابِ، وَ مَوْضِعِ الثَّوَابِ وَ الْعِقَابِ، إِذَا وَقَعَ الْأَمْرُ بِفَصْلِ الْقَضَأِ( وَ خَسِرَ هُنالِكَ الْمُبْطِلُونَ ) . شَهِدَ عَلَى ذَلِكَ الْعَقْلُ إِذَا خَرَجَ مِنْ أَسْرِ الْهَوَى، وَ سَلِمَ مِنْ عَلاَئِقِ الدُّنْيَا.

কুফার কাজি শুরাইয়াহ ইবনে হারিছের (আল - কিন্দি) জন্য লিখেছিলেন

বর্ণিত আছে যে ,আমিরুল মোমেনিন কর্তৃক নিয়োজিত কুফার কাজী শুরাইয়াহ ইবনে হারিছ (আল - কিন্দি) আশি দিনার মূল্য দিয়ে একটা বাড়ি ক্রয় করেছিল । আমিরুল মোমেনিন এ সংবাদ অবগত হয়ে কাজীকে ডেকে এনে বললেন ,

“ আমি জানতে পেরেছি তুমি নাকি আশি দিনার মূল্যে একটা বাড়ি ক্রয় করেছে এবং সেজন্য একটা দলিল করে তাতেও স্বাক্ষার করেছো ৷ ”

শুরাইয়াহ বললেন , হ্যাঁ ;আমিরুল মোমেনিন ,আপনি যা শুনেছেন তা সত্য । ” আমিরুল মোমেনিন রাগত চোখে তার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

হে শুরাইয়াহ ,সাবধান হও ,সহসাই আজরাইল তোমার কাছে আসবে। সে তোমার দলিলের দিকে ফিরেও তাকাবে না বা তোমার স্বাক্ষর প্রদান বিষয়ে তোমাকে কোন কিছু জিজ্ঞেসও করবে না। কিন্তু সে তোমাকে তোমার ক্রয়কৃত বাড়ি থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে এবং তোমাকে নির্জন করবে: একাকী অবস্থায় রেখে দেবে। দেখ ,হে শুরাইয়াহ ,যদি তুমি তোমার হালাল উপার্জন ব্যতীত কোন অবৈধ উৎস থেকে প্রাপ্ত অর্থ দ্বারা বাড়ির মূল্য দিয়ে থাক তবে তোমার ইহকাল ও পরকাল বিনষ্ট করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছো। যদি তুমি বাড়ি ক্রয় করার আগে আমার কাছে আসতে তা হলে আমি তোমার জন্য একখানা দলিল লিখে দিতাম যা দেখলে তুমি ওই বাড়িটি এক দিনার মূল্যেও ক্রয় করতে না। এ কথা বলে আমিরুল মোমেনিনা একখানা দলিল শুরাইয়াকে দিলেন যাতে লেখা ছিলঃ

এটা একটা ক্রয় দলিল যাতে আল্লাহর একজন দীনহীন বান্দা ক্রেতা এবং পরকালে প্রস্থানোদ্যত অন্য বান্দা বিক্রেতা । ক্রেতা ধ্বংসশীল স্থানের মরণশীলগণের এলাকার প্রবঞ্চনার বাড়িগুলোর মধ্য থেকে একটা বাড়ি খরিদ করেছে । এ বাড়িটির চারদিকের ঘোর - চৌহুদি নিম্নরূপ : প্রথম দিকের সীমানা - দুর্যোগের উৎসস্থলের অতি নিকটবর্তী ; দ্বিতীয় দিকের সীমানা - দুঃখ - দুর্দশার উৎসের সাথে যুক্ত ;তৃতীয় দিকের সীমানা - ধ্বংসাত্মক কামনা - বাসনার সাথে যুক্ত ;চতুর্থ দিকের সীমানা - প্রবঞ্চক শয়তানের সাথে যুক্ত এবং এদিকেই বাড়িটির দরজা খোলার পথ । এ বাড়িটি এমন এক ব্যক্তি ক্রয় করেছে যাকে কামনা - বাসনা আক্রমণ করে সর্বত্ব অপহরণ করে নিয়েছে এবং এমন এক ব্যক্তি বিক্রয় করেছে যাকে মৃত্যু তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে । বাড়িটির মূল্য হলো - পরিতৃপ্তির মর্যাদা পরিত্যাগ পূর্বক হতমান ও দুঃখ দুর্দশায় প্রবেশ । যদি ক্রেতা এ লেনদেনের কুফলের সম্মুখীন হয় তবে তা হবে সেব্যক্তির জন্য যে ( আজরাইল) রাজা - বাদশাদের সযত্নে লালিত দেহ গলিয়ে বিনষ্ট করে দিয়েছে ,স্বৈরশাসকদের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং ফেরাউন ,কিসরাস ,সিজার ,তুব্বা ও হিমায়ারদের বিশাল সাম্রাজ্য ধ্বংস করে দিয়েছে ।

তারা সকলেই সম্পদের পর সম্পদ স্তুপীকৃত করেছিল এবং সম্পদ বাড়িয়েই যাচ্ছিলো । তারা সুউচ্চ ইমারত নির্মাণ করেছিল এবং চোখ বালসানো সাজে তা সুসজ্জিত করেছিল । তারা ধন - রত্ব সংগ্রহ করেছিল এবং তাদের ধ্যান - ধারণা অনুযায়ী তারা দাবী করেছিল যে ,তাদের সন্তান - সন্ততিদের জন্য ওগুলো সঞ্চিত করেছিল যারা তাদেরকে হিসাব নিকাশ ও বিচারস্থলে পুরস্কার ও শাস্তির সময় সহায়তা করবে । তখন নির্দেশ হবে , যারা মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল তারা আজ ক্ষতিগ্রস্তু (কুরআন - ৪:৭৮) ।

এ দলিল প্রজ্ঞা দ্বারা স্বাক্ষরিত ,এটা কামনা - বাসনার শিকলমুক্ত এবং দুনিয়ার চাকচিক্য থেকে দূরে সরানো |

___________________

১। কিসরাসঃ এটা খুসরাও ’ শব্দের আরবি রূপান্তর ,যার অর্থ হলো - বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী রাজা। ইরানের শাসনকর্তাদের উপাধি ছিল খুসরাও ” ।

২। সিজারঃ রোমের শাসকদের উপাধি সিজার ’ । ল্যাটিন ভাষায় এর অর্থ হলো - যে শিশুর মাতা প্রসবের পূর্বে মারা গেছে এবং মাতার পেট কেটে তাকে বের করে আনা হয়েছে। রোমের শাসকদের মধ্যে অগাস্টাস এভাবে জন্মেছিল বলে তাকে সিজার ’ বলা হতো এবং পরবর্তীতে রোমের শাসকগণ এটাকে উপাধি হিসাবে গ্রহণ করে ।

৩। তুব্বাঃ ইয়েমেনের রাজাদের উপাধি ছিল তুব্বা ’ । তারা হিমায়ের ও হাদ্রামাউত দখল করেছিল। তাদের নাম পবিত্র কুরআনের ৪৪: ৩৭ ও ৫০:১৪ আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে।

৪ । হিমায়েরঃ দক্ষিণ - পশ্চিম আরবের প্রাচীন সাবাইন রাজ্যের একটি প্রসিদ্ধ গোত্রের নাম। খৃষ্টপূর্ব ১১৫ সান থেকে ৫২৫ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত তারা দক্ষিণ আরবের শক্তিশালী শাসক ছিল। হিমায়রগণ আজকের ইয়েমেনের উপকূলীয় অঞ্চল জুরায়দান (পরবর্তীতে কাতায়বান) নামক এলাকায় ঘনবসতি স্থাপন করেছিল। তারা সম্ভবত তাদের জ্ঞাতি সাবাইনদের ডিঙ্গিয়ে মিশর থেকে ভারত পর্যন্ত সমুদ্র পথে ব্যবসায় - বাণিজ্যের একটা পথ বের করেছিল। হিমায়রদের ভাষা ও কৃষ্টি ছিল সবাইনদের মতোই এবং তাদের রাজধানী ছিল জাফর। তাদের রাজ্য পূর্ব দিকে পারস্য উপসাগর ও উত্তর দিকে আরব মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। চতুর্থ শতাব্দীতে হিমায়রদের রাজধানী উত্তর দিকে সরিয়ে সানায় স্থানান্তরিত করা হয় এবং এ শতাব্দীর শেষভাগে ইহুদি ও খৃষ্টানগণ এ এলাকায় শক্ত সিড়ি গেড়ে বসেছিল। অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগে ৫২৫ খৃষ্টাব্দে আবিসিনিয়ানগণ হিমায়রদেরকে ধ্বংস করে দেয় (নিউ এনসাইক্লোপেডিয়া ব্রিটানিকা ,৫ম খণ্ড ,পৃঃ ৪৯) ।

পত্র - ৪

و من كتاب لهعليه‌السلام

(إلى بعض أمرأ جيشه)

فَإِنْ عَادُوا إِلَى ظِلِّ الطَّاعَةِ فَذَاكَ الَّذِي نُحِبُّ، وَ إِنْ تَوَافَتِ الْأُمُورُ بِالْقَوْمِ إِلَى الشِّقَاقِ وَ الْعِصْيَانِ فَانْهَدْ بِمَنْ أَطَاعَكَ إِلَى مَنْ عَصَاكَ، وَ اسْتَغْنِ بِمَنِ انْقَادَ مَعَكَ عَمَّنْ تَقَاعَسَ عَنْكَ، فَإِنَّ الْمُتَكَارِهَ مَغِيبُهُ خَيْرٌ مِنْ مَشْهَدِهِ، وَ قُعُودُهُ أَغْنَى مِنْ نُهُوضِهِ.

সেনাবাহিনীর একজন অফিসারকে লিখেছিলেন

যদি তারা ,আনুগত্যের ছাতার নিচে ফিরে আসে। তবে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করো না ;কারণ আমরা তো শুধু এটাই চাই যে ,তারা আনুগত্য ভঙ্গ না করুক। কিন্তু যদি এসব লোকের আচরণ গোলযোগ সৃষ্টি ও অনানুগত্যসূচক হয় তবে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ো। এদের মোকাবেলা করতে শুধু তাদের সঙ্গে রেখো ,যারা তোমাকে মান্য করে এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে যারা তোমার সাথে যাবে তারাই তোমার প্রকৃত অনুসারী। যারা তোমার সাথে যাওয়া থেকে পিছিয়ে থাকবে তাদের সম্বন্ধে উদ্বীগ্ন হয়ো না। কারণ স্বতঃস্ফুর্ত উদ্যমহীন লোকের উপস্থিতি অপেক্ষা অনুপস্থিতি অধিকতর ভালো। নিরুদ্যম লোকের বাগাড়ম্বর অপেক্ষা চুপচাপ বসে থাকা অনেক ভালো।

___________________

১। বসরার গভর্ণর উসমান ইবনে হুনায়ফ যখন তালহা ও জুবায়েরের উপস্থিতি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমিরুল মোমেনিনকে জানালেন তখন তিনি তাকে এ পত্র লিখেছিলেন। এ পত্রে আমিরুল মোমেনিন নির্দেশ দিয়েছিলেন যে শক্র যদি একান্তই যুদ্ধের দিকে ঝুকে পড়ে তবে তা যেন মোকাবেলা করা হয় এবং এতে উসমানের সৈন্য তালিকায় তাদের যেন না নেয়া হয় যারা একদিকে তালহা ,জুবায়ের ও আয়শার ব্যক্তিত্বের প্রতি গুরুত্ব দেয়। অপর দিকে শুধুমাত্র যুক্তির খাতিরে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রাজি হয়েছে। এ ধরনের লোক দৃঢ়পদে অবিচলিতভাবে যুদ্ধ করবে না এবং যুদ্ধের জন্য এ ধরনের লোক নির্ভরযোগ্যও নয়। বরং এ ধরনের লোক দলের অন্যদেরকে নিরুদ্যম করে ফেলে। সুতরাং এসব লোককে দল থেকে সরিয়ে রাখাই উত্তম।

পত্র - ৫

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلى أشعث بن قيس و هو عامل أذربيجان

وَ إِنَّ عَمَلَكَ لَيْسَ لَكَ بِطُعْمَةٍ، وَ لَكِنَّهُ فِي عُنُقِكَ أَمَانَةٌ، وَ أَنْتَ مُسْتَرْعىً لِمَنْ فَوْقَكَ. لَيْسَ لَكَ أَنْ تَفْتَاتَ فِي رَعِيَّةٍ، وَ لاَ تُخَاطِرَ إِلا بِوَثِيقَةٍ وَ فِي يَدَيْكَ مَالٌ مِنْ مَالِ اللَّهِ عَزَّ وَ جَلَّ، وَ أَنْتَ مِنْ خُزَّانِهِ حَتَّى تُسَلِّمَهُ إِلَيَّ وَ لَعَلِّي أنْ لا أَكُونَ شَرَّ وُلاَتِكَ لَكَ، وَ السَّلاَمُ.

আজারবাইজানের গভর্ণর আশআছ ইবনে কায়েসকে (আল - কিন্দি) লিখেছিলেন

নিশ্চয়ই ,তোমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব এক গ্রাস খাদ্য নয়। এটা এমন এক বিষয় যা তোমার গ্রীবা জড়িয়ে রয়েছে এবং জনগণের নিরাপত্তার জন্য তোমার উপরস্থদের পক্ষে তোমাকেই জবাবদিহি করতে হবে। জনগণের প্রতি অত্যাচারী হওয়া তোমার সাজে না ,আবার যথাযথ ক্ষেত্র ব্যতীত নিজকে বিপদাপন্ন করাও তোমার উচিত হবে না। তোমার হাতে যে পরিমাণ অর্থ - সম্পদের তহবিল আছে তা সর্বশক্তিমান ও ক্ষমতাশালী আল্লাহর সম্পদ। যে পর্যন্ত তুমি তা আমার কাছে পাঠিয়ে না দেবে সে পর্যন্ত তার দায় - দায়িত্ব তোমার। আমি কোনমতেই তোমার জন্য কুশাসকদের একজন হতে পারবো না এবং বিষয়টি এখানেই শেষ করলাম ।

___________________

১। জামালের যুদ্ধ শেষ হবার পর আজারবাইজানের গভর্ণর আশআছ ইবনে কায়েসকে (আল - কিন্দি) আমিরুল মোমেনিন এ পত্র লিখেছিলেন। আশাআছ উসমানের সময়কাল হতে আজারবাইজান এলাকার গভর্ণর ছিল। এ প্রদেশের রাজস্ব আয় প্রেরণ করার জন্য এ পত্রে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। উসমান হত্যার পর হতে আশআছ নিজের অবস্থা সম্পর্কে ভীত হয়ে পড়ে। ফলে উসমানের সময়কার অন্যান্য অফিসারের মতো সেও প্রাপ্ত রাজস্ব আত্মসাৎ করার ফন্দি এঁটেছিলো। এ পত্র পাওয়ার পর সে তার প্রধান আমাত্যগণকে ডেকে বললো , আমার ভয় হয় ,এ অর্থ আমার কাছ থেকে নিয়ে যাবে। কাজেই মুয়াবিয়ার সাথে যোগদান করাই বাঞ্ছণীয়। ” উপস্থিত সকলেই বললে , আমরা তোমার জ্ঞাতি গোষ্ঠী। আমাদেরকে ফেলে তুমি মুয়াবিয়ার আশ্রয়ে চলে যেতে চাচ্ছে - এটা বড়ই লজ্জার বিষয়। ” তাদের কথা শুনে আশআছ পালিয়ে যাবার ইচ্ছা পরিত্যাগ করলো। কিন্তু সে রাজস্ব প্রেরণ করতে রাজি হলো না। ইতোমধ্যে সংবাদ পেয়ে আমিরুল মোমেনিন তাকে কুফায় নিয়ে যাবার জন্য হুজর ইবনে আদি আল - কিন্দিকে প্রেরণ করলেন। হুজর তাকে বুঝিয়ে - শুজিয়ে কুফায় নিয়ে এলো। কুফায় এসে সে চার লক্ষ দিরহাম জমা দিলে আমিরুল মোমেনিন তাকে ত্রিশ হাজার দিরহাম দিয়ে দিলেন এবং অবশিষ্ট অর্থ সরকারি তহবিলে জমা দিয়েছিলেন।

পত্র - ৬

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلى معاوية

إِنَّهُ بايَعَنِي الْقَوْمُ الَّذِينَ بايَعُوا أَبابَكْرٍ وَ عُمَرَ وَ عُثْمانَ عَلى ما بايَعُوهُمْ عَلَيْهِ، فَلَمْ يَكُنْ لِلشَّاهِدِ أَنْ يَخْتارَ، وَ لا لِلْغائِبِ أَنْ يَرُدَّ، وَ إِنَّمَا الشُّورى لِلْمُهاجِرِينَ وَ الْأَنْصارِ، فَإِنِ اجْتَمَعُوا عَلى رَجُلٍ وَ سَمَّوهُ إِماما كانَ ذلِكَ لِلَّهِ رِضىً، فَإِنْ خَرَجَ عَنْ أَمْرِهِمْ خارِجٌ بِطَعْنٍ أَوْ بِدْعَةٍ رَدُّوهُ إ لى ما خَرَجَ مِنْهُ، فَإِنْ أَبى قاتَلُوهُ عَلَى اتَّباعِهِ غَيْرَ سَبِيلِ الْمُؤْمِنِينَ، وَ وَلاّهُ اللَّهُ ما تَوَلّى. وَ لَعَمْرِي - يا مُعاوِيَةُ - لَئِنْ نَظَرْتَ بِعَقْلِكَ دُونَ هَواكَ لَتَجِدَنِّي أَبْرَأَ النَّاسِ مِنْ دَمِ عُثْمانَ، وَ لَتَعْلَمَنَّ أَنِّي كُنْتُ فِي عُزْلَةٍ عَنْهُ إِلاّ أَنْ تَتَجَنَّى، فَتَجَنَّ ما بَدا لَكَ! وَ السَّلاَمُ

মুয়াবিয়া ইবনে আবু সুফিয়ানকে লিখেছিলেন

নিশ্চয়ই ,যারা আবু বকর ,উমর ও উসমানের বায়াত গ্রহণ করেছিল তারা একই ভিত্তিতে আমার বায়াত গ্রহণ করেছে। (সে ভিত্তিতে) যারা উপস্থিত ছিল তাদের বিকল্প চিন্তা ছিল না এবং যারা অনুপস্থিত ছিল তাদের প্রত্যাখ্যান করার কোন অধিকার নেই এবং এ বিষয়ে আলাপ - আলোচনা মুহাজিরগণ ও আনসারগণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। যদি তারা ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাউকে খলিফা হিসাবে গ্রহণ করে তবে তা আল্লাহর সন্তুষ্টি বলেই মনে করতে হবে। যদি কেউ আপত্তি প্রদর্শনের জন্য দূরে সরে থাকে তাহলে তারা তাকে সে অবস্থা থেকে ফিরিয়ে দেবে যেখান থেকে সে দূরে সরে ছিলো। সে অস্বীকার করলে তারা তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। এ জন্য যে ,সে মোমিনের পথ ছেড়ে অন্য পথ অনুসরণ করেছে এবং আল্লাহ তাকে সেখানে ফিরিয়ে আনবেন যেখান থেকে সে পালিয়ে গেছে। আমার জীবনের শপথ ,হে মুয়াবিয়া ,যদি তুমি তোমার মস্তিস্ক থেকে সকল আবেগ ও রোষ বিদূরিত করে নিরপেক্ষভাবে দেখ ,তাহলে তুমি দেখতে পাবে যে ,উসমানের হত্যার জন্য আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। যা তোমার কাছে দিবালোকের মতো সত্য ,তা যদি তুমি গোপন না কর তাহলে নিশ্চয়ই ,তুমি জান আমি উসমানের সাথে সব কিছুতেই অসম্পৃক্ত ছিলাম এবং তার কাছ থেকে আমি দূরে সরে থাকতাম। এরপরও যদি তুমি ভালো মনে কর আমার ওপর আঘাত হানতে পার এবং এখানেই বিষয়টি শেষ করলাম ।

____________________

১। মদিনার সকল লোক যখন ঐকমত্যে আমিরুল মোমেনিনের বায়াত গ্রহণ করেছিলো তখন মুয়াবিয়া তার ক্ষমতা বিপদাপন্ন মনে করে চারদিকে ছড়াতে লাগলো যে ,আমিরুল মোমেনিন ঐকমত্যের ভিত্তিতে খলিফা নির্বাচিত হননি। এ ধুয়া তুলে সে পুনরায় সাধারণ নির্বাচন দাবী করতে লাগলো। আবু বকরের সময় থেকেই একটা রীতি প্রচলিত হয়ে এসেছিল যে ,মদীনাবাসীগণ যাকে খলিফা নির্বাচিত করবে। সে সমগ্র মুসলিম জাহানের খলিফা বলেই গণ্য হবে। এতে কারো কোন প্রশ্ন করার অধিকার থাকবে না। এ নীতি অনুযায়ী আমিরুল মোমেনিনের ক্ষেত্রে পুনঃনির্বাচন দাবী করার কোন অধিকার মুয়াবিয়ার নেই এবং মদিনাবাসীদের বায়াত অস্বীকার করার অধিকারও তার নেই। আমিরুল মোমেনিন এ পত্রে তাকে সে কথাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তার প্রচারণার প্রেক্ষিতে তাকে প্রদমিত করার জন্য আমিরুল মোমেনিন এ যুক্তি দেখিয়েছেন। মূলত তিনি কখনো গোত্র প্রধানদের আলোচনা বা সাধারণ লোকের ভোটের ভিত্তিতে খলিফা নির্বাচনের নীতি মেনে নিতেন না । সে কারণেই মুহাজির ও আনসারদের ঐকমত্যে মনোনীত খলিফার হাতে তিনি বায়াত গ্রহণ করেনি। তিনি খেলাফতের এ স্বরচিত নীতি - পদ্ধতি বৈধ মনে করতেন না। সে কারণেই তিনি সর্বদা খেলাফতে তার অধিকারের কথা বলতেন যা তাকে রাসূল (সা.) মুখে ও দলিলে দিয়েছিলেন। কিন্তু মুয়াবিয়ার প্রতিশ্রুতি ও বিশ্বাস মতে তার মুখ বন্ধ করার জন্যই ঐকমত্যের যুক্তি দেখিয়েছেন। বস্তুত মুয়াবিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল নানা প্রকার ছুতানাতা ধরে কালক্ষেপণ করা এবং তার অনুকূলে জনসমর্থন নেয়া।

পত্র - ৭

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلَيْهِ( معاویه) أَيْضا

أَمّا بَعْدُ، فَقَدْ أَتَتْنِي مِنْكَ مَوْعِظَةٌ مُوَصَّلَةٌ، وَ رِسالَةٌ مُحَبَّرَةٌ، نَمَّقْتَها بِضَلالِكَ، وَ أَمْضَيْتَها بِسُوءِ رَأْيِكَ، وَ كِتابُ امْرِئٍ لَيْسَ لَهُ بَصَرٌ يَهْدِيهِ، وَ لا قائِدٌ يُرْشِدُهُ، قَدْ دَعاهُ الْهَوى فَأَجابَهُ، وَ قادَهُ الضَّلالُ فَاتَّبَعَهُ، فَهَجَرَ لاغِطا وَ ضَلَّ خابِطاً.

لِأَنَّها بَيْعَةٌ واحِدَةٌ لا يُثَنَّى فِيهَا النَّظَرُ، وَ لا يُسْتَأنَفُ فِيهَا الْخِيارُ. الْخارِجُ مِنْها طاعِنٌ، وَ الْمُرَوِّي فِيها مُداهِنٌ.

মুয়াবিয়ার প্রতি

আমি তোমার প্রেরিত অলঙ্কারপূর্ণ পত্রে বর্ণিত অসংলগ্ন উপদেশের প্যাকেট পেয়েছি। তুমি তোমার গোমরাহির কারণে এসব লিখেছো এবং অজ্ঞতার কারণে তা আমার কাছে প্রেরণ করেছো। এ পত্রখানা এমন ব্যক্তির কাছ থেকে এসেছে অন্যকে পথ দেখাবার মতো আলো যার নেই এবং অন্যকে ন্যায় পথে পরিচালিত করার মতো নেতৃত্ব যার নেই। কামন - বাসনা - লালসা তোমাকে চেপে বসেছে ,আর তার তাড়নায় তুমি এ পত্র লিখেছো। গোমরাহি তোমাকে পেয়ে বসেছে ,তাই তুমি গোমরাহ হয়ে গেছে। সে কারণেই তুমি আবোল - তাবোল কথা বলেছো এবং বলগাহীনভাবে বিপথগামী হয়ে পড়েছো।

তোমার জানা উচিত ,বায়াত একবারই হয়ে থাকে। এটা পুনর্বিবেচনা করার কোন অবকাশ নেই এবং পুনঃ নির্বাচন করার কোন জো নেই। যে ব্যক্তি বায়াত থেকে সরে থাকে সে ইসলামের ক্ষতিকারক এবং যে ব্যক্তি কৌশলে সত্যকে এড়িয়ে যায় সে মোনাফিক ।

পত্র - ৮

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلى جَرِيرِ بْنِ عَبْدِ اللّهِ البَجَلِىّ لَمَا أَرْسَلَهُ إلى مُعاوِيَةَ

أَمّا بَعْدُ، فَإِذا أَتاكَ كِتابِي فَاحْمِلْ مُعاوِيَةَ عَلَى الْفَصْلِ، وَخُذْهُ بِالْأَمْرِ الْجَزْمِ، ثُمَّ خَيِّرْهُ بَيْنَ حَرْبٍ مُجْلِيَةٍ، أَوْ سِلْمٍ مُخْزِيَةٍ، فَإِنِ اخْتارَ الْحَرْبَ فَانْبِذْ إِلَيْهِ، وَ إِنِ اخْتارَ السِّلْمَ فَخُذْ بَيْعَتَهُ، وَالسَّلامُ.

জারির ইবনে আবদিল্লাহ আল - বাজালীকে মুয়াবিয়ার কাছে প্রেরণ করলে তার ফিরে আসতে বিলম্ব দেখে আমিরুল মোমেনিন তাকে এ পত্র লিখেছেন

আমার এ পত্র পাওয়া মাত্র মুয়াবিয়াকে বলো যেন সে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং সে যেন একটা নির্দিষ্ট পথ অনুসরণ করে। তাকে স্পষ্ট করে জিজ্ঞেস করো - যে যুদ্ধের নেশা তাকে ঘরছাড়া করেছে সে কি তা চায় নাকি শান্তি (তার দৃষ্টিতে যা অপমানকর) চায়। যদি সে যুদ্ধ চায় তবে তাকে ত্যাগ করে চলে এসো ;আর যদি সে শান্তি চায়। তবে তার বায়াত গ্রহণ করো। বিষয়টি এখানে শেষ করলাম ।

পত্র - ৯

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلى مُعاوِيَة

فَأَرادَ قَوْمُنا قَتْلَ نَبِيِّنا، وَاجْتِياحَ أَصْلِنا، وَهَمُّوا بِنَا الْهُمُومَ، وَ فَعَلُوا بِنَا الْأَفاعِيلَ، وَ مَنَعُونَا الْعَذْبَ، وَ أَحْلَسُونَا الْخَوْفَ، وَاضْطَرُّونا إِلى جَبَلٍ وَعْرٍ، وَ أَوْ قَدُوا لَنا نارَ الْحَرْبِ،

فَعَزَمَ اللَّهُ لَنا عَلَى الذَّبِّ عَنْ حَوْزَتِهِ، وَالرَّمْي مِنْ وَرأِ حُرْمَتِهِ، مُؤْمِنُنا يَبْغِي بِذلِكَ الْأَجْرَ، وَ كافِرُنا يُحامِي عَنِ الْأَصْلِ، وَ مَنْ أَسْلَمَ مِنْ قُرَيْشٍ خِلْوٌ مِمّا نَحْنُ فِيهِ بِحِلْفٍ يَمْنَعُهُ، أَوْ عَشِيرَةٍ تَقُومُ دُونَهُ، فَهُوَ مِنَ الْقَتْلِ بِمَكانِ أَمْنٍ. وَ كانَ رَسُولُ اللَّهِ،صلى‌الله‌عليه‌وآله‌وسلم إِذا احْمَرَّ الْبَأْسُ، وَ أَحْجَمَ النّاسُ قَدَّمَ أَهْلَ بَيْتِهِ فَوَقَى بِهِمْ أَصْحابَهُ حَرَّ السُّيُوفِ وَالْأَسِنَّةِ، فَقُتِلَ عُبَيْدَةُ بْنُ الْحارِثِ يَوْمَ بَدْرٍ، وَ قُتِلَ حَمْزَةُ يَوْمَ أُحُدٍ، وَ قُتِلَ جَعْفَرٌ يَوْمَ مُؤْتَةَ، وَ أَرادَ مَنْ لَوْ شِئْتُ ذَكَرْتُ اسْمَهُ مِثْلَ الَّذِي أَرادُوا مِنَ الشَّهادَةِ، وَ لَكِنَّ آجالُهُمْ عُجِّلَتْ، وَ مَنِيَّتَهُ أُجِّرَتْ.

فَيا عَجَبا لِلدَّهْرِ! إِذْ صِرْتُ يُقْرَنُ بِي مَنْ لَمْ يَسْعَ بِقَدَمِي، وَ لَمْ تَكُنْ لَهُ كَسابِقَتِي، الَّتِي لا يُدْلِي أَحَدٌ بِمِثْلِها، إِلاّ أَنْ يَدَّعِيَ مُدَّعٍ مَا لا أَعْرِفُهُ، وَ لا أَظُنُّ اللَّهَ يَعْرِفُهُ. وَالْحَمْدُ لِلَّهِ عَلَى كُلِّ حالٍ.

وَ أَمَّا ما سَأَلْتَ مِنْ دَفْعِ قَتَلَةِ عُثْمانَ إِلَيْكَ، فَإِنِّي نَظَرْتُ فِي هَذا الْأَمْرِ، فَلَمْ أَرَهُ يَسَعُنِي دَفْعُهُمْ إِلَيْكَ وَ لا إِلى غَيْرِكَ، وَ لَعَمْرِي لَئِنْ لَمْ تَنْزِعْ عَنْ غَيِّكَ وَ شِقاقِكَ لَتَعْرِفَنَّهُمْ عَنْ قَلِيلٍ يَطْلُبُونَكَ، لا يُكَلِّفُونَكَ طَلَبَهُمْ فِي بَرِّ وَ لا بَحْرٍ وَ لا جَبَلٍ وَ لا سَهْلٍ إِلاّ أَنَّهُ طَلَبٌ يَسُوْءُكَ وِجْدانُهُ، وَ زَوْرٌ لا يَسُرُّكَ لُقْيانُهُ، وَالسَّلامُ لِأَهْلِهِ.

মুয়াবিয়ার প্রতি

কুরাইশগণ আমাদের রাসূলকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল এবং আমাদের মূলোৎপাটন করতে চেয়েছিল। তারা আমাদেরকে সর্বদা উদ্বীগ্ন অবস্থায় রাখতো ,আমাদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করতো ,আমাদের জীবনের আরাম - আয়েশ দূর করে দিয়েছিলো ,আমাদেরকে সর্বদা - আতঙ্কিত রাখতো ,পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করতে আমাদেরকে বাধ্য করেছিলো এবং আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধানল প্রজ্জ্বলিত করেছিলো ।

এ অবস্থায় মহান আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে রক্ষা করা ও তাঁর সম্মানকে সমর্থন করার জন্য আমাদেরকে দৃঢ় - সংকল্প - চিত্ত করে দিলেন। আমাদের মধ্যকার ইমানদারগণ ঐশী পুরস্কারের আশায় এবং অবিশ্বাসীগণ জ্ঞাতিত্বের টানে আমাদেরকে সমর্থন দিয়েছিল। কুরাইশদের মধ্যে যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা আমাদের চেয়ে অনেক কম দুঃখ - দুর্দশা ভোগ করেছিল। এর কারণ হলো - হয় তারা প্রতিরক্ষামূলক প্রতিশ্রুতির আওতাভুক্ত ছিল ,না হয় তাদের গোত্রগত অবস্থান (অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কিছু করলে গোটা গোত্র তার সমর্থনে চলে যাবে) । সেজন্য তারা হত্যা থেকে নিরাপদ ছিল। রাসূলের (সা.) হাতে যে একটা পথ ছিল তা হলো যুদ্ধ যখন ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করতো এবং তার যোদ্ধাদের যখন অবস্থান হারানোর উপক্রম হতো তখন তিনি স্বজনদেরকে অগ্রগামী করে পাঠাতেন এবং তাদের মাধ্যমে নিজের অনুচরদেরকে তরবারি ও বর্শা থেকে রক্ষা করতেন। এভাবেই বদরের যুদ্ধে উবাদাহ ইবনে আল - হারিছ ,ওহুদের যুদ্ধে হামজাহ্ ইবনে আবদুল মুত্তালিব এবং মুতা যুদ্ধে জাফর ইবনে আবি তালিব শহীদ হয়েছিলেন। রাসূল (সা.) তাঁর আপনজনদের মধ্যে আরেকজনকেও (যার নাম তুমি ভালোভাবে জান অর্থাৎ আলী) বারবার যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগামী করে প্রেরণ করেছিলেন। কিন্তু শাহাদত বরণ করার জন্য তার প্রবল ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মৃত্যু নির্ধারিত ছিল না বলে সে এখনো বেঁচে আছে।

এটা বড়ই আশ্চর্যের - বিষয় যে ,আমি কিরূপে এমন একজনের দলভুক্ত হতে পারি যে ধর্ম বিষয়ে আমার মতো কর্মচঞ্চল পদক্ষেপ কখনো দেখে নি অথবা এ বিষয়ে আমার মতো কোন অবস্থান যার নেই এবং সে এমন কিছু অবদান দাবী করে যা আমার জানা নেই এবং আমি মনে করি তাঁর এসব দাবী সম্পর্কে আল্লাহও অবহিত নন। যা হোক ,সকল প্রশংসা মহিমান্বিত আল্লাহর ।

উসমানের হত্যাকারীদেরকে তোমার হাতে তুলে দেয়ার জন্য তোমার অনুরোধের প্রেক্ষিতে আমি বলতে চাই যে ,আমি বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করে দেখেছি এবং তাদেরকে তোমার হাতে বা অন্য কারো হাতে তুলে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমার জীবনের শপথ ,যদি তুমি তোমার ভ্রান্ত পথ ও ফেতনামূলক কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ না কর তবে নিশ্চয়ই তুমি তাদেরকে চেন। তারা সহসাই তোমাকে খোজ করে নেবে। তাদেরকে জলে - স্থলে - পর্বতে - সমতলে খোঁজার কষ্ট তারা তোমাকে দেবে না। কিন্তু তাদের এ অনুসন্ধান তোমার জন্য বেদনাদায়ক হবে এবং তাদের সাক্ষাত তোমাকে আনন্দ দেবে না। যারা শান্তি চায় তাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক ।

____________________

১। আল্লাহ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে আল্লাহর রাসূল যখন আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য মানুষকে আহবান করেছিলেন তখন কাফের কুরাইশ গোত্র এ সত্যের বাণী স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য তাদের সমগ্র শক্তি দিয়ে রুখে দাড়িয়েছিল। এ প্রতিমা পূজারী দলের হৃদয়ে প্রতিমা - প্রীতি এত প্রকট ছিল যে ,তারা তাদের প্রতিমার বিরুদ্ধে একটা কথাও শুনতে রাজি ছিল না। এক আল্লাহর ধারণা তাদের সকল ধৈর্যচ্যুতির জন্য যথেষ্ট ছিল। এ অবস্থায় তারা শুনতে পেল তাদের দেবতাগুলো সামান্য নির্জীব ,নিশ্চল ও জড় পাথর ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন তারা দেখলো তাদের বিশ্বাস ও নীতি বিপদাপন্ন হয়ে পড়ছে তখন তারা রাসূলকে (সা.) বিপদগ্রস্থ করার জন্য সর্বশক্তি প্রয়োগ ও সকল উপায় অবলম্বন করতে লাগলো। তারা এমন সব ক্লেশদায়ক উপায় অবলম্বন করলো যে ,ঘরের বাইরে যাওয়া পর্যন্ত রাসূলের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়লো। এ সময় যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিল তাদের ওপর অবারিত অত্যাচার তারা চালিয়ে যাচ্ছিলো। এ সময় নওমুসলিমগণ সিজদা করলে তাদেরকে জ্ঞান হারানো পর্যন্ত বেত্রাঘাত ও প্রস্তরাঘাত করা হতো। কুরাইশদের এরূপ নিষ্ঠুর অত্যাচার দেখে রেসালতের পঞ্চম বছরে রাসূল (সা.) তাঁর অনুসারীগণকে আবিসিনিয়া হিজরত করার অনুমতি দিয়েছিলেন। নিষ্ঠুর কুরাইশগণ তাদের পিছু নিয়ে আবিসিনিয়াও গিয়েছিল ,কিন্তু আবিসিনিয়ার শাসক রাসূলের অনুসারীদেরকে কুরাইশদের হাতে তুলে দেননি এবং তার মহত্ত্বের ফলে তারা সেখানে কোন বিপদে পড়েনি।

এদিকে রাসূলের বাণী ক্রমাগত বেড়েই চলছে এবং সত্যের আকর্ষণ মানুষের মনে দোলা দিতে লাগলো। তাঁর বাণী ও ব্যক্তিত্বে মোহিত হয়ে মানুষ দলে দলে তাঁর ছাতার নিচে আশ্রয় গ্রহণ করতে দেখে কুরাইশগণ জ্বলে পুড়ে যাচ্ছিলো এবং তাদের অবলম্বিত সকল উপায় ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে দেখে বনি হাশিমের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো। তারা আশা করেছিল। সকল প্রকার সামাজিক সম্পর্ক ও লেনদেন বন্ধ করে দিলে বনি হাশিম ও বনি আবদ - আল মুত্তালিব রাসূলকে (সা.) সমর্থন দেয়া বন্ধ করে দেবে এবং তাতে স্বাভাবিকভাবেই রাসূল (সা.) দমে যাবেন। কুরাইশগণ নিজেদের মধ্যে এ বয়কট বাস্তবায়নের জন্য পরস্পর চুক্তিবদ্ধ হলো। এ চুক্তির ফলে বনি হাশিম একঘরে হয়ে পড়লো। কেউ তাদের সঙ্গে সাক্ষাত করে না - তাদের দেখলে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনকি তাদের সঙ্গে মালপত্র বেচাকেনা করাও বন্ধ করে দেয়। এ সময় বনি হাশিমের জন্য একটা দুশ্চিন্তা প্রকট হয়ে উঠেছিলো ;তা হলো শহরের বাইরের উপত্যকায় যে কোন সময় রাসূলের (সা.) আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। সবকিছু বিবেচনা করে বনি হাশিম আবি তালিবের শিব (বাসা) নামক স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। বনি হাশিমের যে সকল সদস্য ইসলাম গ্রহণ করেছিল তারা সকলেই শিব - ই - আবি তালিব ” - এ আশ্রয় নিয়েছিল। আর যারা তখনো ইসলাম গ্রহণ করেনি। তারা জ্ঞাতিত্ব ও গোত্র টানে তাদের প্রতিরক্ষা বিধান করেছিল। এ সময় হামজা ও আবি তালিব নিজেদের আরাম আয়েশ ত্যাগ করে রাসূলের (সা.) প্রতিরক্ষা বিধান করেছিল এবং তারা সারাক্ষণ রাসূলকে (সা.) সান্তুনা দিতেন। শত্রুর আক্রমণের ভয়ে প্রতিরাতে রাসূলকে কয়েকবার বিছানা বদল করে ঘুমাতে দিতেন। রাসূলকে একটা বিছানা থেকে সরিয়ে তাঁর স্থলে আলীকে শুইয়ে রাখতেন।

বয়কটের এ দিনগুলো বনি হাশিমের জন্য বড়ই কষ্টদায়ক ছিল। তারা দিনের পর দিন উপোস করে কাটিয়েছে - এমন কি গাছের পাতা খেয়েও দিনাতিপাত করেছে। তিন বছর এভাবে নিদারুণ কষ্টে কাটানোর পর জুহায়র ইবনে আবি উমাইয়া (যার মাতা ছিল আতিকা বিনতে আবদ আল মুত্তলিব) ,হিশাম ইবনে আমর ইবনে রাবিয়াহ (যে তার মায়ের দিক থেকে বনি হাশিমের আত্মীয়) ,আল মুতিম ইবনে আদি ইবনে নওফল ইবনে আবদ মনাফ ,আবুল বখতারী আল - আস ইবনে হিশাম ইবনে আল - মুঘিরাহ এবং জামাআহ ইবনে আল - আসওয়াদ ইবনে আল - মুত্তালিব বয়কট চুক্তি বাতিলের প্রস্তাব করলে কুরাইশ নেতাগণ কাবায় একটা আলোচনা বৈঠক করে। আবু তালিব উপত্যকার নির্বাসন স্থান থেকে এসে এ বৈঠকে হাজির হয়ে বললেন , আমার ভ্রাতুষ্পপুত্র মুহাম্মদ বলেছে তোমাদের চুক্তির সমুদয় লেখা সাদা - পিপীলিকায় খেয়ে ফেলেছে ;শুধুমাত্র আল্লাহর নামটুকু অবশিষ্ট আছে। তোমরা চুক্তিপত্রটি আনা। যদি তার কথা সত্য হয় তবে তোমরা তার শক্রতা পরিহার কর। আর যদি তার কথা সত্য না হয় তবে আমি তাকে তোমাদের হাতে তুলে দেব। ” এতে তারা রাজি হয়ে চুক্তিপত্র এনে দেখতে পেলো যে ,আল্লাহর নাম ব্যতীত অপর সকল লেখা সাদা - পিপড়ায় খেয়ে ফেলেছে। এ অবস্থা দেখে আল - মুতিম ইবনে আদি চুক্তি পত্রটি ছিড়ে ফেলে দিয়েছিলো। এভাবে বয়কট চুক্তির অবসান ঘটে এবং বনি হাশিম নিদারুণ দুঃখ কষ্ট হতে নিস্কৃতি পায়। এরপরও রাসূলের (সা.) প্রতি কাফেরদের আচরণে তেমন কোন পরিবর্তন আসে নি ;বরং তারা রাসূলের (সা.) প্রাণনাশের ফন্দি এটেছিল ,যে কারণে তাকে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছিল। অবশ্য এ সময় আবু তালিব জীবিত ছিলেন না। হিজরতের সময়ও আলী রাসূলের (সা.) বিছানায় শুয়ে থেকে রাসূলকে রক্ষা করার শেখানো পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন।

এসব ঘটনা মুয়াবিয়ার অজানা ছিল না। তবুও আমিরুল মোমেনিন তার পূর্ব পুরুষদের আচরণ তাকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন। যাতে সে সত্যের অনুসারী ও মিথ্যার অনুসারীদের আচরণ বুঝতে পেরে ন্যায় ,সত্য ও হেদায়েতের পথে আসতে পারে।

পত্র - ১০

و من كتاب لهعليه‌السلام

إليْهِ أَيْضَا

الکشف عن نفاق معاویة

وَ كَيْفَ أَنْتَ صانِعٌ إِذا تَكَشَّفَتْ عَنْكَ جَلابِيبُ ما أَنْتَ فِيهِ مِنْ دُنْيا قَدْ تَبَهَّجَتْ بِزِينَتِها، وَ خَدَعَتْ بِلَذَّتِها. دَعَتْكَ فَأَجَبْتَها، وَ قادَتْكَ فَاتَّبَعْتَها، وَ أَمَرَتْكَ فَأَطَعْتَها. وَ إِنَّهُ يُوشِكُ أَنْ يَقِفَكَ واقِفٌ عَلى ما لا يُنْجِيكَ مِنْهُ مُنْجٍ، فَاقْعَسْ عَنْ هَذا الْأَمْرِ، وَخُذْ أُهْبَةَ الْحِسابِ، وَ شَمِّرْ لِما قَدْ نَزَلَ بِكَ، وَ لا تُمَكِّنِ الْغُواةَ مِنْ سَمْعِكَ، وَ إِلاّ تَفْعَلْ أُعْلِمْكَ ما أَغْفَلْتَ مِنْ نَفْسِكَ فَإِنَّكَ مُتْرَفٌ قَدْ أَخَذَ الشَّيْطانُ مِنْكَ مَأْخَذَهُ، وَ بَلَغَ فِيكَ أَمَلَهُ، وَ جَرى مِنْكَ مَجْرَى الرُّوحِ وَالدَّمِ. وَ مَتى كُنْتُمْ يا مُعاوِيَةُ ساسَةَ الرَّعِيَّةِ، وَ وُلاةَ أَمْرِ الْأُمَّةِ، بِغَيْرِ قَدَمٍ سابِقٍ، وَ لا شَرَفٍ باسِقٍ، وَ نَعُوذُ بِاللَّهِ مِنْ لُزُومِ سَوابِقِ الشَّقأِ! وَ أُحَذِّرُكَ أَنْ تَكونَ مُتَمادِيا فِي غِرَّةِ الْأُمْنِيِّةِ، مُخْتَلِفَ الْعَلانِيَةِ وَالسَّرِيرَةِ.

وَ قَدْ دَعَوْتَ إِلَى الْحَرْبِ، فَدَعِ النّاسَ جانِبا وَاخْرُجْ إِلَيَّ، وَ أَعْفِ الْفَرِيقَيْنِ مِنَ الْقِتالِ لِيُعْلَمَ أَيُّنَا الْمَرِينُ عَلى قَلْبِهِ وَالْمُغَطّى عَلَى بَصَرِهِ! فَأَنَا أَبُو حَسَنٍ قاتِلُ جَدِّكَ وَ خالِكَ وَ أَخِيكَ شَدْخا يَوْمَ بَدْرٍ، وَ ذلِكَ السَّيْفُ مَعِي، وَ بِذلِكَ الْقَلْبِ أَلْقى عَدُوِّي، مَا اسْتَبْدَلْتُ دِينا، وَ لا اسْتَحْدَثْتُ نَبِيّا، وَ إِنِّي لَعَلَى الْمِنْهاجِ الَّذِي تَرَكْتُمُوهُ طائِعِينَ، وَ دَخَلْتُمْ فِيهِ مُكْرَهِينَ.

وَ زَعَمْتَ أَنَّكَ جِئتَ ثائِرا بدَمِ عُثْمانَ. وَ لَقَدْ عَلِمْتَ حَيْثُ وَقَعَ دَمُ عُثْمانَ فَاطْلُبْهُ مِنْ هُناكَ إِنْ كُنْتَ طالِباً، فَكَأَنِّي قَدْ رَأَيْتُكَ تَضِجُّ مِنَ الْحَرْبِ إِذا عَضَّتْكَ ضَجِيجَ الْجِمالِ بِالْأَثْقالِ، وَ كَأَنِّي بِجَماعَتِكَ تَدْعُونِي - جَزَعا مِنَ الضَّرْبِ الْمُتَتابِعِ، وَالْقَضأِ الْواقِعِ، وَ مَصارِعَ بَعْدَ مَصارِعَ - إِلى كِتابِ اللَّهِ وَ هِيَ كافِرَةٌ جاحِدَةٌ، أَوْ مُبايِعَةٌ حائِدَةٌ.

মুয়াবিয়ার প্রতি

মুয়াবিয়ার কপটতা উম্মোচন

এ দুনিয়ার যা কিছু তোমাকে ঘিরে রেখেছে তা থেকে যখন তোমাকে সরিয়ে নেয়া হবে তখন তুমি কী করবে ? দুনিয়া তার চাকচিক্য দিয়ে তোমাকে আকৃষ্ট করেছে এবং ভোগ - বিলাস ও আনন্দ - উল্লাস দিয়ে তোমাকে প্রতারিত করছে। দুনিয়া তোমাকে আহবান করেছে আর তুমি সে আহবানে উৎফুল্ল চিত্তে সাড়া দিয়েছো। দুনিয়া তোমাকে পরিচালিত করছে ,আর তুমি দুনিয়াকে অনুসরণ করে চলছো। দুনিয়া তোমাকে আদেশ দিচ্ছে ,আর তুমি সে আদেশ অবনত মস্তকে মেনে চলছো। সহসাই এক নকিব তোমাকে সব কিছু অবহিত করাবে যার হাত থেকে তোমাকে রক্ষা করার মতো কোন বর্ম নেই। সুতরাং দুনিয়ার ধান্দাবাজি থেকে দূরে সরে থাক ,শেষ - বিচারের হিসাব - নিকাশের প্রতি খেয়ালি হও ,মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত থাক যা তোমাকে যে কোন মুহুর্তে পরাভূত করবে এবং যারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে তাদের কথায় কান দিয়ে না। আমার উপদেশ মেনে চলো ;তোমার আরাম - আয়েশ ও বিলাসবহুল জীবন যাপনের ফলে তুমি যা ভুলে গেছ আমি শুধু তা তোমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। শয়তান তার দৃঢ় মুষ্টিতে তোমাকে এটে ধরেছে ,তোমার মাধ্যমে তার আকাঙ্খা পরিপূর্ণ করছে এবং তোমার আত্মা ও রক্তের যেরূপ নিয়ন্ত্রণ তোমার ওপর রয়েছে শয়তান তোমাকে তদ্রূপ নিয়ন্ত্রণ করছে।

হে মুয়াবিয়া ,কোন প্রকার অগ্রণী ভূমিকা ও বৈশিষ্ট্য ছাড়াই তুমি কখন জনগণের রক্ষাকর্তা ( ?) ও তাদের কর্মকান্ডের অভিভাবক ( ?) বনেছো ? অতীতে দুর্ভাগ্যজনক ধ্বংস থেকে আমরা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করি। আমি তোমাকে সর্তক করছি পাছে তুমি কামনা - বাসনার তাড়নায় আরো অধিক তাড়িত হও এবং তোমার বাতেন ও জাহের যেন ভিন্নধরনের না থাকে।

তুমি আমাকে যুদ্ধে আহ্বান করছো। জনগণকে এক দিকে সরিয়ে রেখে তুমি নিজে আমার মোকাবেলা করলে ভালো হয়। উভয় পক্ষের জনগণকে যুদ্ধ থেকে অব্যাহতি দিয়ে আমার সম্মুখে চলে আসো। তোমার ও আমার যুদ্ধেই প্রমাণিত হবে কার হৃদয় মরচে পড়া এবং কার চোখ অজ্ঞতায় ঢাকা । মনে রেখো ,আমি আবুল হাসান যে তোমার পিতামহকে (উতবা ইবনে রাবিআহ) ,তোমার ভ্রাতাকে (হানযালাহ ইবনে আবি সুফিয়ান) ,তোমার চাচাকে (অলিদ ইবনে উতবা) বদরের যুদ্ধে খণ্ড বিখণ্ড করে হত্যা করেছিল। সে - ই তরবারিটি এখনো আমার কাছে আছে এবং আমি এখনো সে দিনের মতো একই মনোভাব নিয়ে শক্রর মোকাবেলা করি। আমি দ্বীনের কোন কিছুই পরিবর্তন করিনি এবং আমি কোন নতুন নবী নির্বাচন করিনি। নিশ্চয়ই ,আমি দ্বীনের রাজপথে চলছি যা তুমি ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করেছো এবং জোর জবরদস্তির পথ বেছে নিয়েছো।

তুমি প্রচার কর - তুমি উসমানের রক্তের বদলা নেয়ার জন্য বের হয়েছো। নিশ্চয়ই তুমি জান ,কিভাবে উসমানের রক্তপাত ঘটেছিল। যদি তুমি উসমানের রক্তের বদলা নিতে চাও তবে যেখানে তার রক্তপাত ঘটেছে সেখানে বদলা নাও । আমি দেখতে পাচ্ছি যুদ্ধ যখন দাঁত কটমটিয়ে তোমার দিকে তাকায় তখন তুমি সেরূপ চিৎকার কর ,বোঝার ভারে উট যেমন চিৎকার করে। আমি আরো দেখতে পাচ্ছি ,তরবারির অবিরাম আঘাতে মৃতদেহ পড়তে দেখে তোমার দল হতবুদ্ধি হয়ে আমাকে কুরআনের আহবান করছে। যদিও এসব লোক হয় অবিশ্বাসী ,না হয় সত্যত্যাগী ,না হয় বায়াত ভঙ্গকারী।

___________________

১। সিফফিনের যুদ্ধ যাত্রার আগে আমিরুল মোমেনিন মুয়াবিয়াকে এ পত্র লিখেছিলেন। এখানে অল্প কথায় তিনি সিফফিনের পূর্ণ দৃশ্য ব্যক্ত করেছেন। ইরাকিদের আক্রমণে সিরিয়া বাহিনী হতবুদ্ধি হয়ে পালিয়ে যাবার চিন্তা করছিলো। তখন রক্ষা পাবার জন্য বর্শার ডগায় কুরআন তুলে শান্তির জন্য চিৎকার করছিলো। হাদীদ লিখেছেনঃ

আমিরুল মোমেনিনের এ ভবিষ্যদ্বানি থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝা যায় যে ,তাঁর ইলমুল গায়েব অত্যন্ত প্রখর ছিল। এহেন ভবিষ্যদ্বানি প্রকৃতই একটা অত্যাশ্চার্য বিষয়।

পত্র - ১১

و من وصية لهعليه‌السلام

وصَى بِها جَيْشا بَعَثَهُ إلَى الْعَدُوِّ

فَإِذا نَزَلْتُمْ بِعَدُوِّ أَوْ نَزَلَ بِكُمْ، فَلْيَكُنْ مُعَسْكَرُكُمْ فِي قُبُلِ الْأَشْرافِ، أَوْ سِفاحِ الْجِبالِ، أَوْ أَثْنأِ الْأَنْهارِ، كَيْما يَكُونَ لَكُمْ رِدْءا، وَ دُونَكُمْ مَرَدّا، وَلْتَكُنْ مُقاتَلَتُكُمْ مِنْ وَجْهٍ وَاحِدٍ أَوِاثْنَيْنِ، وَاجْعَلُوا لَكُمْ رُقَبأَ فِي صَياصِي الْجِبالِ، وَ مَناكِبِ الْهِضابِ، لِئَلاّ يَأْتِيَكُمُ الْعَدُوُّ مِنْ مَكانِ مَخافَةٍ أَوْ أَمْنٍ. وَاعْلَمُوا أَنَّ مُقَدِّمَةَ الْقَوْمِ عُيُونُهُمْ، وَ عُيُونَ الْمُقَدِّمَةِ طَلائِعُهُمْ. وَ إِيّاكُمْ وَالتَّفَرُّقَ: فَإِذا نَزَلْتُمْ فَانْزِلُوا جَمِيعاً، وَ إِذا ارْتَحَلْتُمْ فَارْتَحِلُوا جَمِيعاً، وَ إِذا غَشِيَكُمُ الليْلُ فَاجْعَلُوا الرِّماحَ كِفَّةً، وَ لا تَذُوقُوا النَّوْمَ إِلاّ غِرارا أَوْ مَضْمَضَةً.

শক্রর মোকাবেলায় প্রেরিত সৈন্যবাহিনীর প্রতি

যখন তোমরা শত্রুর দিকে এগিয়ে যাও অথবা শক্র তোমাদের দিকে এগিয়ে আসে তখন তোমরা উচু স্থানের বা পাহাড়ের ঢালে অথবা নদীর বাঁকে এমন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করো যে স্থান তোমাদেরকে সুবিধাজনক অবস্থানে রাখবে এবং প্রয়োজনে একটু পিছিয়ে যাবার উপায় থাকে। তোমাদের আক্রমণ যেন এক দিক অথবা দুদিক থেকে রচিত হয়। পর্যবেক্ষকগণকে পাহাড়ের চূড়ায় অথবা এলাকার উচু স্থানে উঠে শত্রুর অবস্থান ও গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতে দিয়ো ;তাতে কোন দিক থেকেই তারা তোমাদের নিকটবর্তী হতে পারবে না এবং আচমকা তোমাদেরকে আক্রমণ করতে পারবে না। জেনে রাখো ,কোন সৈন্যবাহিনীর চক্ষু হলো তার অগ্রগামীদল এবং অগ্রগামীদলের চক্ষু হলো গুপ্তচর দল। সাবধান ,কখনো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থেকো না। যখন কোথাও থাম সকলে মিলে থেমো ,আবার যখন চলতে শুরু করো সকলে একত্রেই চলো। রাত্রি হলে তোমাদের বর্শাগুলো চক্রাকারে মাটিতে দাড় করে রেখো এবং রাত্রিকালে ঈষৎ তন্দ্রাচ্ছন্নতার বেশি ঘুমিয়ো না।

পত্র - ১২

و من وصية لهعليه‌السلام

وصی بها لِمَعْقلِ بْنِ قَيْسٍ الرَّياحِىِّ حِينَ أَنْفَذَهُ إلَى الشامِ فِي ثَلاثَةِ آلافٍ مُقَدِّمَةً لَهُ:

اتَّقِ اللَّهَ الَّذِي لا بُدَّ لَكَ مِنْ لِقائِهِ، وَ لا مُنْتَهَى لَكَ دُونَهُ. وَ لا تُقاتِلَنَّ إِلا مَنْ قاتَلَكَ، وَ سِرِ الْبَرْدَيْنِ، وَ غَوِّرْ بِالنّاسِ، وَ رَفِّهْ فِي السَّيْرِ، وَ لا تَسِرْ أَوَّلَ اللَّيْلِ، فَإِنَّ اللَّهَ جَعَلَهُ سَكَناً، وَ قَدَّرَهُ مُقاماً لا ظَعْناً، فَأَرِحْ فِيهِ بَدَنَكَ، وَ رَوِّحْ ظَهْرَكَ. فَإِذا وَقَفْتَ حِينَ يَنْبَطِحُ السَّحَرُ، أَوْ حِينَ يَنْفَجِرُ الْفَجْرُ، فَسِرْ عَلَى بَرَكَةِ اللَّهِ، فَإِذا لَقِيتَ الْعَدُوَّ فَقِفْ مِنْ أَصْحابِكَ وَسَطاً، وَ لا تَدْنُ مِنَ الْقَوْمِ دُنُوَّ مَنْ يُرِيدُ أَنْ يُنْشِبَ الْحَرْبَ، وَ لا تَباعَدْ عَنْهُمْ تَباعُدَ مَنْ يَهابُ الْبَأْسَ حَتَّى يَأْتِيَكَ أَمْرِي، وَ لا يَحْمِلَنَّكُمُ شَنَآنُهُمْ عَلَى قِتالِهِمْ، قَبْلَ دُعائِهِمْ وَالْإِعْذارِ إِلَيْهِمْ.

তিন হাজার সৈন্যের একটি অগ্রগামী বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে সিরিয়া অভিমুখে প্রেরণের প্রাক্কালে মাকিল ইবনে কায়েস আর - রিয়াহিকে বলেছিলেনঃ

আল্লাহকে ভয় কর যার সম্মুখে সকলেরই উপস্থিতি অবধারিত। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো সাথে সাক্ষাত অবধারিত নয়। যারা তোমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে তারা ব্যতীত অন্য কারো সাথে যুদ্ধ করো না। দুটি ঠাণ্ডা সময়ে (সকাল ও বিকাল) পথ চলো। সৈন্যগণকে দিনের মধ্যভাগে একটু ঘুমোতে দিয়ো। সহজভাবে এগিয়ে যেয়ো এবং রাতের প্রথমভাগে পথ চলো না ,কারণ আল্লাহ এ সময়কে বিশ্রামের জন্য নির্ধারিত করেছেন - ভ্রমণের জন্য নয়। সুতরাং রাতে শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে এবং বাহন পশুগুলোকেও বিশ্রাম করতে দিয়ো । ভোরের আগমন নিশ্চিত হয়ে সুবে সাদেকের সময় আল্লাহর নাম নিয়ে যাত্রা শুরু করো। শত্রুর মুখোমুখি হওয়া মাত্রই সাথীদের মাঝখানে অবস্থান গ্রহণ করো। আমার আদেশ না পাওয়া পর্যন্ত সে ব্যক্তির মতো শত্রুর নিকটবর্তী হয়ো না যে এখনই যুদ্ধ শুরু করতে চায় অথবা সে ব্যক্তির মতো শক্রর কাছ থেকে দূরে সরে পড়ো না যে যুদ্ধের ভয়ে ভীতসন্ত্রস্ত। শত্রুর প্রতি ঘৃণা যেন তোমাকে যুদ্ধের প্রতি তাড়িত না করে। যুদ্ধ শুরু করার আগে বারবার শক্রকে হেদায়েতের দিকে আহবান করো যাতে তাদের কাছে তোমার সকল ওজর নিঃশেষিত হয়।

পত্র - ১৩

و من كتاب لهعليه‌السلام

إلى أَمِيرَيْنِ مِنْ أُمَرأِ جَيْشِهِ

وَ قَدْ أَمَّرْتُ عَلَيْكُما وَ عَلى مَنْ فِي حَيِّزِكُما مالِكَ بْنَ الْحارِثِ الْأَشْتَرَ، فَاسْمَعا لَهُ وَ أَطِيعا، وَاجْعَلاهُ دِرْعاً وَ مِجَنّاً، فَإِنَّهُ مِمَّنْ لا يُخافُ وَهْنُهُ وَ لا سَقْطَتُهُ، وَ لا بُطْؤُهُ عَمَّا الْإِسْراعُ إِلَيْهِ أَحْزَمُ، وَ لا إِسْراعُهُ إِلى مَا الْبُطْءُ عَنْهُ أَمْثَلُ.

সৈন্যবাহিনীর অফিসারের প্রতি প্রেরিত পত্র

আমি মালিক ইবনে হারিছ আল - আশতারকে তোমাদের ও তোমাদের অধীনস্থ সকলের কমাণ্ডার হিসাবে নিয়োগ করেছি। সুতরাং তোমরা সকলেই তার আদেশ পালন করে চলবে এবং তাকে তোমাদের বর্ম ও ঢাল হিসাবে মনে করবে। কারণ সে এমন এক ব্যক্তি যার কাছ থেকে কোন ভীতি বা ভুলের আশঙ্কা নেই। যেখানে দ্রুততার দরকার সেখানে অলসতা অথবা যেখানে শিথিলতার প্রয়োজন সেখানে দ্রুততা তার কাছে পাওয়া যাবে না।

___________________

১। যিয়াদ ইবনে আন - নদীর আল - হারিছি ও শুরাইয়াহ ইবনে হানি আল - হারিছির নেতৃত্বে আমিরুল মোমেনিন বার হাজারের একটা অগ্রগামী সৈন্যবাহিনী সিরিয়া অভিমুখে প্রেরণ করেছিলেন। পথিমধ্যে সুর আর রুম নামক স্থানে তারা আবুল আওয়ার আস - সুলামির মোকাবেলা করলো। আবুল আওয়ার সেখানে একটা সিরিয় বাহিনী নিয়ে ক্যাম্প করেছিল। আমিরুল মোমেনিনকে এ সংবাদ আল - হারিছ ইবনে জুমহান আল - জুফির মাধ্যমে অবহিত করা হলে তিনি মালিক ইবনে আল হারিছ আল - আশতারকে এ পত্রসহ বাহিনী প্রধান করে প্রেরণ করেছিলেন। এ পত্রে অল্প কথায় অতিসুন্দর করে মালিকের বুদ্ধিমত্তা ,ব্যক্তিত্ব ,শৌর্য - বীর্য ,বীরত্ব ও গুরুত্ব ব্যক্তি করেছেন।

পত্র - ১৪

و من وصية لهعليه‌السلام

لِعَسْكَرِهِ قَبْلَ لِقأِ الْعَدُوُّ بِصِفَّينَ

لا تُقاتِلُوهُمْ حَتَّى يَبْدَؤُوكُمْ، فَإِنَّكُمْ بِحَمْدِ اللَّهِ عَلى حُجَّةٍ، وَ تَرْكُكُمْ إِيّاهُمْ حَتَّى يَبْدَؤُوكُمْ حُجَّةٌ أُخْرى لَكُمْ عَلَيْهِمْ. فَإِذا كانَتِ الْهَزِيمَةُ بِإِذْنِ اللّهِ فَلا تَقْتُلُوا مُدْبِراً، وَ لا تُصِيبُوا مُعْوِراً، وَ لا تُجْهِزُوا عَلى جَرِيحٍ. وَ لا تَهِيجُوا النِّسأَ بِأَذىً، وَ إِنْ شَتَمْنَ أَعْراضَكُمْ، وَ سَبَبْنَ أُمَرأَكُمْ، فَإِنَّهُنَّ ضَعِيفاتُ الْقُوى وَالْأَنْفُسِ وَالْعُقُولِ؛ إِنْ كُنّا لَنُؤْمَرُ بِالْكَفِّ عَنْهُنَّ وَ إِنَّهُنَّ لَمُشْرِكاتٌ؛ وَ إِنْ كانَ الرَّجُلُ لَيَتَناوَلُ الْمَرْأَةَ فِي الْجاهِلِيَّةِ بِالْفَهْرِ أَوِ الْهِراوَةِ فَيُعَيَّرُ بِها وَ عَقِبُهُ مِنْ بَعْدِهِ.

সিফফিনে শত্রুর সাথে যুদ্ধ শুরু করার পূর্বে সেনাবাহিনীকে এ নির্দেশ দিয়েছিলেন

শত্রুপক্ষ আঘাত হানার পূর্ব পর্যন্ত তোমরা আঘাত করো না। কারণ আল্লাহর অসীম রহমতে ,তোমরা ন্যায়ের পথে রয়েছে এবং তারা যুদ্ধ শুরু করার পূর্ব পর্যন্ত তাদেরকে অবকাশ দিলে তা তোমাদের পক্ষে আরো একটা পয়েন্ট হয়ে দাঁড়াবে। ইনশাল্লাহ ,যদি শত্রুপক্ষ পরাজিত হয় তবে তাদের মধ্যে যারা পলায়নপর তাদেরকে হত্যা করো না ,অসহায় কোন ব্যক্তিকে আঘাত করো না এবং আহতগণকে একেবারে শেষ করে দিয়ে না। কোন রমণী যদি তোমাদের সম্মান ক্ষুন্ন করে নোংরা কথা বলে বা তোমাদের অফিসারকে গালি দেয়। তবুও তাদেরকে কষ্ট দিয়ে না। কারণ জ্ঞানে ,মনে ও চরিত্রে তারা তোমাদের চেয়ে দুর্বল। (রাসূলের যুগে) তারা অবিশ্বাসী হওয়া সত্ত্বেও তাদের ওপর আপতিত না হবার জন্য আমাদেরকে আদেশ দেয়া হতো। এমনকি আইয়ামে জাহেলিয়াতেও যদি কোন পুরুষ কোন নারীকে পাথর অথবা ছড়ি দিয়ে আঘাত করতো। তবে তার চৌদ - পুরুষসহ তাকে গালাগালি করা হতো।

___________________

১। সিফফিনের যুদ্ধ আমিরুল মোমেনিন ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সংঘটিত হয়েছিল। এ যুদ্ধের জন্য মুয়াবিয়া এককভাবে দায়ী। কারণ সে উসমানের হত্যার জন্য আমিরুল মোমেনিনকে মিথ্যা দোষারোপ করে যুদ্ধ সংঘটিত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে কে বা কারা এবং কী কারণে হত্যা করেছিল তা মুয়াবিয়ার অজানা ছিল না। সে তার অবৈধ ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য উসমানের রক্তের বদলা নেয়ার ধুয়া তুলে বিদ্রোহ ও যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছিল। কিন্তু শরিয়তের বিধান মতে মুসলিমদের ঐকমত্যে প্রতিষ্ঠিত সত্যের অনুসারী ইমামের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা অবৈধ ,যেমন -

শাসনকার্যে নিয়োজিত কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো না । তাদের কোন কার্য ইসলাম বিরোধী ,এটা নিশ্চিত না হয়ে তাদের কাজে বাধার সৃষ্টি করো না । যদি তোমার দৃষ্টিতে তাদের কোন কাজ মন্দ বলে মনে হয় তবে সে বিষয়ে সত্য কথা বলে দিয়ো ;কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে উত্থান বা যুদ্ধ ঘোষণা মুসলিমদের ইজমায় নিষিদ্ধ (নাওয়াবী ,২য় খণ্ড ,পৃঃ ১২৫ ,বাকিলানী ,পৃঃ ১৮৬ তাফতাজনী ,২য় খণ্ড ,পৃঃ২৭২)

মুসলিমদের ঐকমত্যে প্রতিষ্ঠিত কোন ইমামের বিরুদ্ধে যে কেউ বিদ্রোহ করে সে সত্যত্যাগী খারিজি বলে পরিচিত হবে । সাহবিদের যুগে এটা প্রচলিত ছিল এবং তাদের পরেও একথা প্রযোজ্য (শাহরাস্তানী ,১ম খণ্ড ,পৃঃ ১১৪) ।

এতে কোন সন্দেহ নেই যে ,মুয়াবিয়ার কর্মকাণ্ড ছিল আমিরুল মোমেনিনের বিরুদ্ধে উত্থান ও তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা। একজন বিদ্রোহীর অগ্রগতি প্রতিরোধ করার জন্য অস্ত্রধারণ করা শান্তির পরিপন্থী কিছু নয়। বরং এটা মজলুমের স্বাভাবিক অধিকার। এ অধিকার থেকে তাকে বঞ্চিত করলে জুলুম ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিহত করার এবং অধিকার প্রতিষ্ঠা করার আর কোন পথ খোলা থাকবে না। সে কারণেই বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করার অনুমতি আল্লাহ নিজেই দিয়েছেন। আল্লাহ বলেনঃ

যদি বিশ্বাসীগণের দু দল দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে পড়ে। তবে তোমরা তাদের উভয় দলের মধ্যে মীমাংসা করে শক্তি স্থাপন করে দেবে ;কিন্তু যদি তাদের একদল অপর দলকে আক্রমণ করে। তবে তোমরা সকলে মিলে আক্রমণকারী দলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশের দিকে ফিরে না আসে - যদি তারা ফিরে আসে তবে তাদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত মীমাংসা করে দিয়ো এবং এতে সুবিচার করো । নিশ্চয়ই ,আল্লাহ সুবিচারকারীকে ভালোবাসেন (কুরআন - ৪৯:৯) |

এ কারণেই আমিরুল মোমেনিন - আল্লাহর ফজলে তোমরা ন্যায়ের পথে আছো | - মর্মে দাবী করেছিলেন। তাসত্ত্বেও তিনি তাঁর সৈন্যবাহিনীকে উপদেশ দিয়েছিলেন যেন তাদের পক্ষ থেকে যুদ্ধের সূচনা না হয়। কারণ তিনি শুধু আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন। কিন্তু যখন শান্তি - শৃংখলার জন্য তাঁর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো এবং শত্রু কোন কথা না শুনে যুদ্ধের দিকেই এগিয়ে গেল তখন জুলুম ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিহত করার জন্য তাদের মোকাবিলা করা তার দায়িত্ব হয়ে পড়েছিল যা মহান আল্লাহ স্পষ্টভাবে অনুমোদন করেছেনঃ

যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে ,তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর ,কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করো না । আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীকে ভালোবাসেন না (কুরআন - ২:১৯০) |

এ ছাড়াও আমিরুল মোমেনিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা মানেই হলো রাসূলের (সা.) বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা। রাসূল (সা.) বলেছেনঃ

হে আলী ,তোমার শক্তিই আমার শক্তি ,তোমার যুদ্ধই আমার যুদ্ধ (হাদীদ ,১৮শ খণ্ড ,পৃঃ২৪)

এ কারণে রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অপরাধে যে শাস্তি প্রাপ্য আমিরুল মোমেনিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে একই শাস্তি পাবার যোগ্য। রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হবার শাস্তি মহান আল্লাহ নির্ধারণ করে দিয়েছেনঃ

যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ফেতনা সৃষ্টি করে বেড়ায় তাদের শাস্তি হলো। - তাদের হত্যা করা হবে অথবা ক্রশ বিদ্ধ করা হবে অথবা বিপরীত দিক হতে তাদের হাত ও পা কেটে ফেলা হবে অথবা তাদের দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে । ইহকালে এটাই তাদের শাস্তি এবং পরকালে তাদের জন্য রয়েছে মহাশাস্তি (কুরআন - ৫:৩৩) |

এরূপ অনুমতি থাকা সত্ত্বেও পলায়নোন্মুখ ও আহত শক্রকে হত্যা না করার জন্য আমিরুল মোমেনিন তাঁর সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। তাঁর এহেন নির্দেশ নৈতিক মূল্যবোধ ও জিহাদের একটি মহোত্তম নিদর্শন। এ নির্দেশ তিনি শুধু মুখে বলেননি লিখেও দিয়েছেন। বস্তুতঃপক্ষে যুদ্ধে পলায়নপর ও অসহায় শত্রু এবং নারী হত্যা তিনি সহ্য করতে পারতেন না। জামালের যুদ্ধে তাঁর শত্রুপক্ষের নেতৃত্বে নারী থাকা সত্ত্বেও তিনি নীতি পরিবর্তন করেননি। পরাজিত হবার পর তিনি আয়শাকে দেহরক্ষী দ্বারা মদিনা প্রেরণ করেন। এ বিষয়ে হাদীদ (১৭শ খণ্ড ,পৃঃ ২৫৪) লিখেছেনঃ

আমিরুল মোমেনিনের সাথে আয়শা যেরূপ আচরণ করেছে উমরের সাথে যদি সেরূপ আচরণ করা হতো তাহলে জয়লাভের পর উমর তাকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলতো ।