নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা0%

নাহজ আল-বালাঘা লেখক:
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ: হযরত আলী (আ.)

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক: আশ-শরীফ আর-রাজী
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ:

ভিজিট: 43912
ডাউনলোড: 2028

নাহজ আল-বালাঘা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 48 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 43912 / ডাউনলোড: 2028
সাইজ সাইজ সাইজ
নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক:
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বাংলা

রাসূলের (সা.) ‘জ্ঞান নগরীর দ্বার’ আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী, দার্শনিক, সুলেখক ও বাগ্মী। আলঙ্কারিক শাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ও নৈপুন্য অসাধারণ। তিনি নবুওয়াতী জ্ঞান ভান্ডার হতে সরাসরি জ্ঞান আহরণ করেন এবং সাহাবাদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পন্ডিত ছিলেন। এতে কারো দ্বিমত নেই। আরবী কাব্যে ও সাহিত্যে তার অনন্যসাধারণ অবদান ছিল। খেলাফত পরিচালনা কালে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ (খোৎবা) দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকগণকে প্রশাসনিক বিষয়ে উপদেশ ও নির্দেশ দিয়ে পত্র লিখেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে মানুষের অনেক প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছিলেন। তার এসব বাণী কেউকেউ লিখে রেখেছিল, কেউ কেউ মনে রেখেছিল, আবার কেউ কেউ তাদের লিখিত পুস্তকে উদ্ধৃত করেছিল। মোটকথা তার অমূল্য বাণীসমূহ মানুষের কাছে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল।

আশ-শরীফ আর-রাজী আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিবের ভাষণসমূহ (খোৎবা), পত্রাবলী, নির্দেশাবলী ও উক্তিসমূহ সংগ্রহ করে “নাহজ আল-বালঘা” নামক গ্রন্থটি সঙ্কলন করেন।

খোৎবা-১৭

في صفة من يتصدى للحكم بين الأمة وليس لذلك بأهل

إنَّ أَبْغَضَ الْخَلَائِقِ إِلَى اللَّه رَجُلَانِ - رَجُلٌ وَكَلَه اللَّه إِلَى نَفْسِه فَهُوَ جَائِرٌ عَنْ قَصْدِ السَّبِيلِ مَشْغُوفٌ بِكَلَامِ بِدْعَةٍ ودُعَاءِ ضَلَالَةٍ - فَهُوَ فِتْنَةٌ لِمَنِ افْتَتَنَ بِه ضَالٌّ عَنْ هَدْيِ مَنْ كَانَ قَبْلَه - مُضِلٌّ لِمَنِ اقْتَدَى بِه فِي حَيَاتِه وبَعْدَ وَفَاتِه - حَمَّالٌ خَطَايَا غَيْرِه رَهْنٌ بِخَطِيئَتِه.

ورَجُلٌ قَمَشَ جَهْلًا مُوضِعٌ فِي جُهَّالِ الأُمَّةِ عَادٍ فِي أَغْبَاشِ الْفِتْنَةِ عَمٍ بِمَا فِي عَقْدِ الْهُدْنَةِ قَدْ سَمَّاه أَشْبَاه النَّاسِ عَالِماً ولَيْسَ بِه - بَكَّرَ فَاسْتَكْثَرَ مِنْ جَمْعٍ مَا قَلَّ مِنْه خَيْرٌ مِمَّا كَثُرَ - حَتَّى إِذَا ارْتَوَى مِنْ مَاءٍ آجِنٍ واكْتَثَرَ مِنْ غَيْرِ طَائِلٍ.

جَلَسَ بَيْنَ النَّاسِ قَاضِياً ضَامِناً لِتَخْلِيصِ مَا الْتَبَسَ عَلَى غَيْرِه فَإِنْ نَزَلَتْ بِه إِحْدَى الْمُبْهَمَاتِ - هَيَّأَ لَهَا حَشْواً رَثًّا مِنْ رَأْيِه ثُمَّ قَطَعَ بِه - فَهُوَ مِنْ لَبْسِ الشُّبُهَاتِ فِي مِثْلِ نَسْجِ الْعَنْكَبُوتِ - لَا يَدْرِي أَصَابَ أَمْ أَخْطَأَ - فَإِنْ أَصَابَ خَافَ أَنْ يَكُونَ قَدْ أَخْطَأَ - وإِنْ أَخْطَأَ رَجَا أَنْ يَكُونَ قَدْ أَصَابَ - جَاهِلٌ خَبَّاطُ جَهَالَاتٍ عَاشٍ رَكَّابُ عَشَوَاتٍ لَمْ يَعَضَّ عَلَى الْعِلْمِ بِضِرْسٍ قَاطِعٍ - يَذْرُو الرِّوَايَاتِ ذَرْوَ الرِّيحِ الْهَشِيمَ لَا مَلِيٌّ.

واللَّه بِإِصْدَارِ مَا وَرَدَ عَلَيْه - ولَا أَهْلٌ لِمَا قُرِّظَ بِه لَا يَحْسَبُ الْعِلْمَ فِي شَيْءٍ مِمَّا أَنْكَرَه - ولَا يَرَى أَنَّ مِنْ وَرَاءِ مَا بَلَغَ مَذْهَباً لِغَيْرِه - وإِنْ أَظْلَمَ عَلَيْه أَمْرٌ اكْتَتَمَ بِه لِمَا يَعْلَمُ مِنْ جَهْلِ نَفْسِه - تَصْرُخُ مِنْ جَوْرِ قَضَائِه الدِّمَاءُ - وتَعَجُّ مِنْه الْمَوَارِيثُ إِلَى اللَّه أَشْكُو - مِنْ مَعْشَرٍ يَعِيشُونَ جُهَّالًا ويَمُوتُونَ ضُلَّالًا - لَيْسَ فِيهِمْ سِلْعَةٌ أَبْوَرُ مِنَ الْكِتَابِ إِذَا تُلِيَ حَقَّ تِلَاوَتِه - ولَا سِلْعَةٌ أَنْفَقُ بَيْعاً - ولَا أَغْلَى ثَمَناً مِنَ الْكِتَابِ إِذَا حُرِّفَ عَنْ مَوَاضِعِه - ولَا عِنْدَهُمْ أَنْكَرُ مِنَ الْمَعْرُوفِ ولَا أَعْرَفُ مِنَ الْمُنْكَرِ!

অযোগ্য ব্যক্তি কর্তৃক মানুষের মধ্যে ন্যায়ের বিধান প্রয়োগ সম্পর্কে

মানুষের মধ্যে দুব্যক্তিকে আল্লাহ অতিশয় ঘৃণা করেন। এদের একজন হলো সে যে আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত থাকে। সে ব্যক্তি সত্যপথ থেকে সরে চলে এবং মিথ্যা কোন কিছু উদ্ভাবন করে তা বলে বেড়াতে আনন্দ পায়। সে ব্যক্তি মানুষকে ভুল পথের দিকে আমন্ত্রণ জানায়। যারা তার প্রতি অনুরক্ত হয় তাদের জন্য সে অত্যন্ত ক্ষতিকর। সে নিজেই তার পূর্ববর্তীগণের নির্দেশিত পথ থেকে সরে গিয়ে বিপথে পরিচালিত। কাজেই সে জীবদ্দশায় তার অনুসারীদের গোমরাহির দিকে পরিচালিত করে এবং মৃত্যুর পর নিজের ও অনুসারীদের পাপের বোঝা বহন করে।

অপর ব্যক্তি সে যাকে মূর্খতা ও অজ্ঞতা ঘিরে আছে। সে অজ্ঞদের মাঝেই চলাফেরা করে এবং সে অমঙ্গল বিষয়ে জ্ঞানহীন ও শান্তিপূর্ণ অবস্থার সুবিধা সম্পর্কে অন্ধ। সাধারণ মানুষ তাকে পণ্ডিত মনে করে কিন্তু আসলে সে তা নয়। সে অতি প্রত্যুষে এমন কিছু সংগ্রহে করতে বেরিয়ে পড়ে যার প্রাচুর্য থেকে স্বল্পতা অনেক ভাল। সে দূষিত পানি দ্বারা তৃষ্ণা নিবারণ করে এবং যা অর্জন করে তা অর্থহীন।

জনগণের কাছে যা বিভ্রান্তিকর বলে মনে হয় তার সমাধান দেয়ার দায়িত্ব নিয়ে সে বিচারকের আসনে বসে। যদি কোন দ্ব্যর্থক সমস্যা তার সামনে তুলে ধরা হয় তবে সে তার মনগড়া খোড়া যুক্তি দাঁড় করিয়ে তার ভিত্তিতে রায় প্রদান করে। এভাবে সে ন্যায় - অন্যায় ও সত্য - মিথ্যা না বুঝে মাকড়সার জালের মতো সন্দেহ ও ভ্রান্তির জালে জড়িয়ে পড়ে। যখন সে সঠিক কাজ করে তখন সে ভয় করে পাছে ভুল হয়ে গেল কিনা। আবার যখন সে ভুল করে তখন মনে করে সে ঠিকই করেছে। সে জাহেল ,অজ্ঞতার মাঝেই ধ্বংস খুঁজে বেড়াচ্ছে এবং সে এমন বাহনের সওয়ার যা লক্ষ্যহীনভাবে অন্ধকারে চলছে। মজবুত দাঁত দ্বারা সে কখনো জ্ঞানকে আঁকড়ে ধরে নি। সে হাদিসকে এমন বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দেয় যেন বাতাস শুকনো পাতাকে ছড়িয়ে ফেলে।

আল্লাহর কসম ,যেসব সমস্যা তার কাছে আসে সেগুলোর সমাধান দেয়ার মতো যোগ্যতা তার নেই এবং যে মর্যাদাকর অবস্থানে তাকে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে তার উপযুক্ত সে নয়। যা সে জানে না তা জানা দরকার বলেও সে মনে করে না। এ কথা সে অনুভব করতে পারে না যে ,যা তার নাগালের বাইরে তা অন্যের নাগালের মধ্যে থাকতে পারে। যে বিষয় তার কাছে অস্পষ্ট মনে হয় সে বিষয়ে সে নিশ্চুপ থাকে কারণ সে নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল । হারানো জীবনগুলো তার অন্যায় রায়ের বিরুদ্ধে চিৎকার দিচ্ছে এবং সম্পদরাজী (যা অন্যায়ভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে) তার বিরুদ্ধে অসন্তোষ ভরে বিড়বিড় করছে।

যে সব লোক জীবনে অজ্ঞ ও মৃত্যুতে বিপথগামী তাদের বিরুদ্ধে আমি আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি। তাদের কাছে কুরআন অপেক্ষা মূল্যহীন আর কিছু নেই - কুরআনের আয়াত যথাস্থান থেকে সরিয়ে ফেলা অপেক্ষা মূল্যবান কিছু নেই - ধার্মিকতা অপেক্ষা খারাপ কিছু নেই - পাপ অপেক্ষা সুনীতিসম্পন্ন কিছু নেই।

___________________

১। আমিরুল মোমেনিন দু ’ শ্রেণির লোককে আল্লাহর অপছন্দনীয় ও জনগণের মধ্যে নিকৃষ্ট মনে করেছেন। প্রথমতঃ যারা মৌলিক বিষয়ে বিপথগামী এবং মন্দ বা পাপ ছড়াবার কাজে ব্যস্ত। দ্বিতীয়তঃ যারা কুরআন ও সুন্নাহকে পরিত্যাগ পূর্বক নিজের ইচ্ছামতো বিধি - নিষেধ জারি করে। তারা তাদের অনুরাগীর একটা পরিমণ্ডল তৈরি করে নেয় এবং তাদের নিজেদের বানানো ধমীয় বিধান জনপ্রিয় করে তোলে। এসব লোকের বিপথগামিতা ও ভ্রান্তি তাদের নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিপথগামিতার যে বীজ তারা বপন করে তা প্রকাণ্ড গাছে পরিণত হয়ে ফল দেয় এবং বিপথগামীদের আশ্রয় প্রদান করে। এভাবে বিপথগামীর সংখ্যা বেড়েই চলে। যেহেতু এসব লোক ভ্রান্তি ও বিপথ সৃষ্টির হতো সেহেতু অন্যদের পাপের বোঝা এরাই বহন করবে। কুরআন বলেঃ

এবং নিশ্চয়ই তারা তাদের পাপের বোঝা বহন করবে এবং নিজেদের বোঝার সাথে অন্যের বোঝাও। (২৯:১৩)

খোৎবা- ১৮

في ذم اختلاف العلماء في الفتيا

تَرِدُ عَلَى أَحَدِهِمُ الْقَضِيَّةُ فِي حُكْمٍ مِنَ الأَحْكَامِ - فَيَحْكُمُ فِيهَا بِرَأْيِه - ثُمَّ تَرِدُ تِلْكَ الْقَضِيَّةُ بِعَيْنِهَا عَلَى غَيْرِه - فَيَحْكُمُ فِيهَا بِخِلَافِ قَوْلِه - ثُمَّ يَجْتَمِعُ الْقُضَاةُ بِذَلِكَ عِنْدَ الإِمَامِ الَّذِي اسْتَقْضَاهُمْ فَيُصَوِّبُ آرَاءَهُمْ جَمِيعاً وإِلَهُهُمْ وَاحِدٌ - ونَبِيُّهُمْ وَاحِدٌ وكِتَابُهُمْ وَاحِدٌ! أَفَأَمَرَهُمُ اللَّه سُبْحَانَه بِالِاخْتِلَافِ فَأَطَاعُوه - أَمْ نَهَاهُمْ عَنْه فَعَصَوْه!

الحكم للقرآن أَمْ أَنْزَلَ اللَّه سُبْحَانَه دِيناً نَاقِصاً - فَاسْتَعَانَ بِهِمْ عَلَى إِتْمَامِه - أَمْ كَانُوا شُرَكَاءَ لَه فَلَهُمْ أَنْ يَقُولُوا وعَلَيْه أَنْ يَرْضَى - أَمْ أَنْزَلَ اللَّه سُبْحَانَه دِيناً تَامّاً - فَقَصَّرَ الرَّسُولُصلى‌الله‌عليه‌وآله عَنْ تَبْلِيغِه وأَدَائِه - واللَّه سُبْحَانَه يَقُولُ:( ما فَرَّطْنا فِي الْكِتابِ مِنْ شَيْءٍ ) - وفِيه تِبْيَانٌ لِكُلِّ شَيْءٍ - وذَكَرَ أَنَّ الْكِتَابَ يُصَدِّقُ بَعْضُه بَعْضاً - وأَنَّه لَا اخْتِلَافَ فِيه - فَقَالَ سُبْحَانَه:( ولَوْ كانَ مِنْ عِنْدِ غَيْرِ الله - لَوَجَدُوا فِيه اخْتِلافاً كَثِيراً ) - وإِنَّ الْقُرْآنَ ظَاهِرُه أَنِيقٌ وبَاطِنُه عَمِيقٌ - لَا تَفْنَى عَجَائِبُه ولَا تَنْقَضِي غَرَائِبُه - ولَا تُكْشَفُ الظُّلُمَاتُ إِلَّا بِه.

ফেকাহবিদগণের মধ্যে আমর্যাদাকর মতদ্বৈধতা সম্পর্কে

তাদের কোন একজনের কাছে যখন একটা সমস্যা উপস্থাপন করা হয় তখন সে অনুমান ভিত্তিক রায় প্রদান করে। একই সমস্যা যখন তাদের অন্য একজনের কাছে উপস্থাপন করা হয় তখন সে আগের জনের রায়ের বিপরীত সিদ্ধান্ত প্রদান করে। এ বিচারকদ্বয় যখন তাদের পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রধান বিচারকের কাছে যায় (যিনি প্রথমোক্তগণকে নিয়োগ করেছিলেন) তখন তিনি উভয়ের সিদ্ধান্তকেই সমর্থন ও অনুমোদন করেন। অথচ তাদের সকলের আল্লাহ এক ,রাসূল এক ও পবিত্র গ্রন্থ এক ।

তাদের এহেন মতো পার্থক্যের কারণ কী ? এটা কী এ জন্য যে ,আল্লাহ তাদেরকে মতদ্বৈধতা করতে নির্দেশ দিয়েছেন আর তারা তা পালন করছে ? অথবা তিনি মতদ্বৈধতা করতে নিষেধ করেছেন। কিন্তু তারা তাঁর অবাধ্যতা করছে ? অথবা আল্লাহ একটা অসম্পূর্ণ দ্বীন পাঠিয়েছেন এবং এখন তা সম্পূর্ণ করতে তাদের সহায়তা চান ? অথবা এসব বিষয়ে তারা কি আল্লাহর অংশীদার যে ,ভিন্ন ভিন্ন মত তুলে ধরা তাদের কর্তব্য আর তা সমর্থন করা আল্লাহর কর্তব্য ? অথবা এটা কি এমন যে ,মহিমান্বিত আল্লাহ পরিপূর্ণ দ্বীন প্রেরণ করেছেন। কিন্তু রাসূল (সা.) তা পরিপূর্ণভাবে মানুষের নিকট পৌছে দিতে পারেননি ? বস্তুত মহামহিম আল্লাহ বলেনঃ

আমরা এ কিতাবে কোন কিছুই বাদ দেই নি (কুরআন - ৬:৩৮) । আল্লাহ আরো বলেন যে ,কুরআনে প্রত্যেক বিষয়ের বর্ণনা রয়েছে এবং কুরআনের এক অংশ অন্য অংশকে সত্যায়ন করে এবং কুরআনে কোন এখতেলাপ (অপসারণ) নেই। আল্লাহ্ বলেনঃ

এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো কাছ থেকে এ কিতাব এলে তারা নিশ্চয়ই এতে অনেক গরমিল দেখতে পেতো (কুরআন - ৪ :৮২) ।

নিশ্চয়ই কুরআনের বাহ্যিক দিক বিস্ময়কর এবং এর অভ্যন্তর দিক গভীর অর্থবোধক। কুরআনের বিস্ময় কখনো হারিয়ে যাবে না এবং এর রহস্য কখনো বিলুপ্ত হবে না। কুরআনের জটিল বিষয়গুলো কুরআন (কুরআনিক জ্ঞান) ব্যতীত কেউ সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারবে না।

____________________

১। এটা একটা বিতর্কিত বিষয় যে , কোন বিষয়ে ধর্মীয় বিধানে স্পষ্ট কিছু বলা না থাকলে বাস্তব ক্ষেত্রে তা নিস্পত্তির উপায় সম্পর্কে কোন আদেশ নির্দেশ আছে কিনা। আবুল হাসান আশারী ও তার শিক্ষক আবু আলী যুব্বাই যে মত পোষণ করেন তা হলো , এরূপ বিষয়ে আল্লাহ্ কোন নির্দিষ্ট কর্মপদ্ধতির আদেশ দান করেন নি , তবে গবেষণা করে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হয়ে সে বিষয়ে রায় প্রদানের ক্ষমতা শাস্ত্রজ্ঞদের ওপর অর্পণ করা হয়েছে , যাতে করে যা তারা নিষিদ্ধ বলবেন তা নিষিদ্ধই মনে করতে হবে এবং যা তারা অনুমোদন করবেন তা জায়েজ মনে করতে হবে। এসব শাস্ত্রজ্ঞদের একজনের অভিমত যদি অন্যজনের বিপরীত হয় তবে একই বিষয়ে যতগুলো রায় পাওয়া যাবে তার প্রত্যেকটি চূড়ান্ত ও সঠিক বলে মেনে নিতে হবে। উদাহরণ স্বরূপ , যদি একজন শাস্ত্রজ্ঞ রায় দেন যে , যবের সিরা হারাম এবং অন্যজন বলেন এটা হালাল তবে এটাকে হারাম ও হালাল উভয়ই মেনে নিতে হবে। অর্থাৎ যে এটাকে হারাম মনে করবে তার জন্য হারাম আর যে হালাল মনে করবে তার জন্য হালাল। শাহরাস্তানী লিখেছেনঃ

একদল চিন্তাবিদ মনে করেন যে , কোন বিষয়ে ইজতিহাদ (গবেষণা) করার অনুকূলে কোন স্বতঃসিদ্ধ মতবাদ নেই । কিন্তু মুজতাহিদ (গবেষক) কোন বিষয়ে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তাই আল্লাহর আদেশ , কারণ মুজতাহিদের রায়ের ওপর আল্লাহর অভিপ্রায়ের অবধারণ নির্ভর করে। যদি এমনটি না হতো। তবে রায়ের মোটেই কোন প্রয়োজন থাকতো না । এ মতানুযায়ী প্রত্যেক মুজতাহিদ তার মতামতে সঠিক ও শুদ্ধ (পৃঃ ৯৮) ।

এক্ষেত্রে মুজতাহিদগণকে সকল ভুলের উর্দ্ধে বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ তখনই ভুল সংঘটিত হয়েছে বলে মনে করা যায় যখন বাস্তবতার বিপরীতে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। যেখানে রায়ের বাস্তব অস্তিত্ব নেই সেখানে ভুল হয়েছে মনে করা অর্থহীন। তাছাড়া মুজতাহিদকে তখনই ভুল - ভ্রান্তির উর্দ্ধে মনে করা যাবে যখন ধরে নেয়া হবে যে , আল্লাহ্ তাদের সকল মতামত জ্ঞাত হয়ে অনেকগুলো চূড়ান্ত আদেশ দান করেছেন যার ফলে তাদের প্রত্যেকের অভিমত কোন না কোন আদেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। অথবা আল্লাহ এ মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করেছেন যে , মুজতাহিদদের কোন সিদ্ধান্ত আল্লাহর নির্দেশ বহির্ভূত হয় না। অথবা দৈবক্রমে তাদের প্রত্যেকের অভিমত কোন না কোন ঐশী নির্দেশের সাথে মিলে যায়।

ইমামিয়া দলের অবশ্য ভিন্ন মতবাদ আছে। তারা মনে করে ধমীয় বিধি - বিধান প্রণয়নের অধিকার আল্লাহ কাউকে অর্পণ করেন নি বা কোন বিষয়কে মুজতাহিদদের অভিমতের অধীন করে দেননি বা তাদের মতদ্বৈধতা সমন্বয় করার জন্য বিভিন্ন বাস্তব আদেশ দান করেননি। অবশ্য , যদি মুজতাহিদ একটা বাস্তব আদেশে উপনীত হতে না পারে তখন সে গবেষণা ও অনুসন্ধান করে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তা মেনে আমল করা তার নিজের ও তার অনুসারীদের জন্য যথেষ্ট। মুজতাহিদের এমন সিদ্ধান্ত প্রকৃত আদেশের বিকল্প হিসেবে ধরে নেয়া যায়। এক্ষেত্রে প্রকৃত আদেশ হতে সরে যাবার জন্য সে ক্ষমাপ্রাপ্ত হবে , কারণ সে মুক্তা আহরণের জন্য তার সাধ্যমতো গভীর সমুদ্রে ডুব দিয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয় সে মুক্তার বদলে ঝিনুক পেয়েছে। সে মানুষকে একথা বলে না। যে , সে যা পেয়েছে তাই মুক্তা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে বা সে ঝিনুককে মুক্তা বলে বিক্রি করে না। এটা ভিন্ন কথা যে , আল্লাহ তার প্রচেষ্টার প্রতিদান প্রদান করতে পারেন , কারণ কোন প্রচেষ্টাই বৃথা যায় না।

বিশুদ্ধতা মতবাদ যদি মেনে নেয়া হয় তাহলে প্রত্যেক রায় ও অভিমত শুদ্ধ বলে গ্রহণ করতে হবে। হুসায়েন মাবুদী তার ফাওয়াতিহ গ্রন্থে লিখেছেনঃ এ বিষয়ে আশারীর অভিমত সঠিক । তার অভিমত অনুযায়ী পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তের সব ক ’ টিই সঠিক। সাবধান , শাস্ত্রজ্ঞদের সম্পর্কে কোন খারাপ ধারণা পোষণ করো না এবং তাদের প্রতি কখনো কুবাক্য প্রয়োগ করো না ।

যখন পরস্পরবিরোধী মতবাদ ও বিপথগামী অভিমতকে শুদ্ধ বলে গ্রহণ করা হয় তখন কিছু বিশিষ্ট ব্যক্তির কর্মকাণ্ডকে সিদ্ধান্তের ভুল বলে ব্যাখ্যা দেয়া অদ্ভুত ব্যাপার। কারণ মুজতাহিদের সিদ্ধান্তের ভুল কল্পনাই করা যায় না। যদি বিশুদ্ধতা মতবাদ মেনে নেয়া হয় তাহলে মুয়াবিয়া ও আয়শার কর্মকাণ্ডগুলো সঠিক বলে ধরে নিতে হয়। যদি তাদের কর্মকাণ্ড ভুল বলে মনে করা হয় তাহলে মেনে নিতে হবে যে , ইজতিহাদও ভুল হতে পারে। কাজেই বিশুদ্ধতা মতবাদও ভুল। যা হোক , বিশুদ্ধতা মতবাদ প্রচারিত হয়েছিল ভুলকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য এবং এ মতবাদকে আল্লাহর আদেশের সাথে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে যেন উদ্দেশ্য হাসিলে কোন বাধা না আসে বা কোন কুকর্মের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা না বলতে পারে।

এ খোৎবায় আমিরুল মোমেনিন সে সব লোকের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যারা আল্লাহর পথ থেকে সরে পড়ে , আলোতে চোখ বুজে কল্পনার অন্ধকারে হাতড়ে বেড়ায় , ইমানকে অভিমত ও সিদ্ধান্তের শিকারে পরিণত করে , নতুন রায় ঘোষণা করে , নিজেদের কল্পনার ওপর ভিত্তি করে আদেশ জারি করে এবং বিপথগামী ফলাফল সৃষ্টি করে। তারপর তারা বিশুদ্ধতা মতবাদের ভিত্তিতে সকল বিপরীত ও বিপথগামী আদেশকে আল্লাহ থেকে প্রাপ্ত বলে চালিয়ে দেয়। এ মতবাদকে মিথ্যা প্রমাণ করে আমিরুল মোমেনিন বলেনঃ

( ১) যেখানে আল্লাহ এক , রাসূল এক ও কুরআন এক সেখানে অনুসরণীয় ধর্মও এক হতে হবে। যখন ধর্ম এক তখন তাতে একটা বিষয়ে বিভিন্ন আদেশ থাকবে কেমন করে ? একটা আদেশে বিভিন্নতা থাকতে পারে শুধুমাত্র তখন , যখন আদেশদাতা তার আদেশ ভুলে যায় অথবা বিস্মরণশীল হয় অথবা জ্ঞানহীনতা তাকে আঁকড়ে ধরে অথবা তিনি ইচ্ছা করে গোলক ধাধায় জড়িয়ে পড়েন। কিন্তু আল্লাহ ও রাসূল এসব কিছুর উর্দ্ধে। সুতরাং বিভিন্নতা ও বিপথগামিতা তাদের প্রতি আরোপ করা যায় না। এসব বিভিন্নতা বরং তাদের চিন্তা ও অভিমতের ফল যারা নিজেদের কল্পনাপ্রসূত কর্মপদ্ধতি দ্বারা দ্বীনের সহজ পথে জটিলতার সৃষ্টি করে।

( ২) এসব বিপথ হয় আল্লাহ্ নিষিদ্ধ করেছেন , না হয় এগুলো সৃষ্টির জন্য তিনি আদেশ দিয়েছেন। যদি তিনি এগুলোর অনুকূলে কোন আদেশ দিয়ে থাকেন তবে তা কোথায় , কোনখানে আছে ? এগুলো নিষিদ্ধকরণ সম্পর্কে কুরআন বলেঃ

বল , আল্লাহ কি তাঁর সম্বন্ধে মিথ্যারোপ করতে তোমাদের অনুমতি দিয়েছেন ? ( ১০ :৫৯) আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী না হলে সবকিছুই বানোয়াট উদ্ভাবন বই কিছু নয় এবং এহেন বানোয়াট উদ্ভাবন নিষিদ্ধ। যারা বানোয়াটিকারী পরকালে তাদের কোন কৃতকার্যতা ও কল্যাণ নেই। আল্লাহ বলেনঃ তোমাদের জিহ্বা মিথ্যারোপ করে বলে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করার জন্য এটা হালাল এবং ওটা হারাম ” - বলো না। আল্লাহ সম্বন্ধে যারা মিথ্যা উদ্ভাবন করে তারা সফলকাম হয় না। ” ( কুরআন - ১৬:১১৬)

( ৩) আল্লাহ্ যদি দ্বীনকে অসম্পূর্ণ রাখতেন এবং সে অসম্পূর্ণতার কারণ যদি এটা হতো যে , ধর্মীয় বিধান সম্পূর্ণ করতে তিনি মানুষের সহায়তা এবং বিধান প্রণয়নে তাঁর সাথে মানুষের অংশগ্রহণ আশা করেছিলেন , তাহলে এহেন বিশ্বাস বহু - আল্লাহবাদ ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যদি আল্লাহ্ পূর্ণাকারে দ্বিনের বিধান প্রেরণ করে থাকেন তা হলে রাসূল তা সঠিকভাবে মানুষের কাছে পৌছে দিতে ব্যর্থ হয়েছেন , যেজন্য অন্যদের কল্পনা ও মতামত প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। এমন ধারণায় রাসূলের দুর্বলতা বুঝায় এবং রাসূল হিসেবে তাঁর মনোনয়নের প্রতি এটা কলঙ্কারোপ (নাউজুবিল্লাহ) ।

( ৪) পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন যে , তিনি কুরআনে কোন কিছুই বাদ দেন নি এবং প্রতিটি বিষয় তাতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এখন যদি কোন আদেশ কুরআনের সাথে সাংঘর্ষিক করে বক্র করা হয় তবে তা হবে ধর্মের বিধি বহির্ভূত। এহেন বক্রতার ভিত্তি জ্ঞান বা কুরআন ও সুন্নাহ্ হতে পারে না। এটা কারো ব্যক্তিগত অভিমত বা বিচার - বিবেচনা হতে পারে , যা ধর্ম ও ইমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে গ্রহণ করা যায় না ।

( ৫) কুরআন ধর্মের উৎস ও ভিত্তি এবং শরিয়তের আইনের ঝরনাধারা। যদি শরিয়তের বিধানে মতদ্বৈধতা থাকতো তাহলে কুরআনেও তা থাকতো। কুরআনে মতদ্বৈধতা থাকলে তা আল্লাহর বাণী বলে গ্রহণ করা যেতো না। যেহেতু কুরআন আল্লাহর বাণী বলে সর্ব স্বীকৃত সেহেতু শরিয়তের বিধানে কোন মতদ্বৈধতা থাকতে পারে না।

খোৎবা- ১৯

قاله للأشعث بن قيس وهو على منبر الكوفة يخطب، فمضى في بعض كلامه شيء اعترضه الأشعث فيه، فقال: يا أمير المؤمنين، هذه عليك لا لك، فخفضعليه‌السلام إليه بصره ثم قال:

مَا يُدْرِيكَ مَا عَلَيَّ مِمَّا لِي - عَلَيْكَ لَعْنَةُ اللَّه ولَعْنَةُ اللَّاعِنِينَ - حَائِكٌ ابْنُ حَائِكٍ مُنَافِقٌ ابْنُ كَافِرٍ - واللَّه لَقَدْ أَسَرَكَ الْكُفْرُ مَرَّةً والإِسْلَامُ أُخْرَى - فَمَا فَدَاكَ مِنْ وَاحِدَةٍ مِنْهُمَا مَالُكَ ولَا حَسَبُكَ - وإِنَّ امْرَأً دَلَّ عَلَى قَوْمِه السَّيْفَ - وسَاقَ إِلَيْهِمُ الْحَتْفَ - لَحَرِيٌّ أَنْ يَمْقُتَه الأَقْرَبُ ولَا يَأْمَنَه الأَبْعَدُ!

قال السيد الشريف - يريدعليه‌السلام أنه أسر في الكفر مرة وفي الإسلام مرة -. وأما قولهعليه‌السلام دل على قومه السيف - فأراد به حديثا - كان للأشعث مع خالد بن الوليد باليمامة - غر فيه قومه ومكر بهم - حتى أوقع بهم خالد - وكان قومه بعد ذلك يسمونه عرف النار - وهو اسم للغادر عندهم.

কুফার মসজিদের মিম্বার থেকে আমিরুল মোমেনিন খোৎবা প্রদান করছিলেন। এমন সময় আশআছ । ইবনে কায়েস বাধা দিয়ে বললো , হে ,আমিরুল মোমেনিন ,এ কথা আপনার অনুকূলে নয় ,বরং আপনার বিরুদ্ধে যাবে ।

আমিরুল মোমেনিন রাগত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে বললেনঃ

তুমি কী করে জান কোন বিষয় আমার অনুকূলে আর কোনটি আমার প্রতিকূলে। আল্লাহ ও অভিশাপকারীদের অভিশাপ তোমার ওপর। তুমি তাতির পুত্র তাতি। তুমি একজন মোশরেকের পুত্র এবং নিজেও একজন মোনাফিক। তুমি মোশরেক থাকাকালে একবার এবং ইসলাম গ্রহণের পর আরেকবার গ্রেফতার হয়েছিলে ; তোমার সম্পদ ও জন্ম পরিচয় তোমাকে রক্ষা করতে পারেনি । যে ব্যক্তি নিজের লোকজনকে তরবারির নিচে ঠেলে দিয়ে তাদের মৃত্যু ও ধ্বংসের ফন্দি আঁটে সে নিকটবর্তীগণের ঘৃণা আর দূরবর্তীজনের অবিশ্বাসেরই যোগ্য।

__________________

১। আশআছ ইবনে কায়েসের আসল নাম সাদি কারিব এবং লকব আবু মুহাম্মদ। তার অবিন্যস্ত চুলের জন্য সে আশআছ নামেই সমধিক পরিচিত। নবুয়ত প্রকাশের পর সে একবার তার গোত্রের লোকজন নিয়ে মক্কায় এসেছিলো। রাসূল (সা.) তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু তারা সকলেই ইসলাম গ্রহণ না করে ফিরে গিয়েছিল। হিজরতের পর যখন ইসলাম প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল এবং দলে দলে লোক মদিনায় আসছিলো তখন আশআছ বনি। কিন্‌দাহর সাথে রাসূলের কাছে হাজির হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। বার লিখেছেন যে ,রাসূলের (সা.) তিরোধানের পর এ লোকটি ইসলাম ত্যাগ করে মোশরেক হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আবু বকরের খেলাফতকালে তাকে বন্দী করে মদিনায় আনা হলে সে পুনরায় ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এবারও তার ইসলাম গ্রহণ লোক দেখানো বই কিছু নয়। আবদুহ লিখেছেন :

রাসূলের সাহাবিদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনে উবাই ইবনে সালুল যেমন ছিল ,আলীর সার্থীগণের মধ্যেও আশআছ তদ্রূপ ছিল । এরা দুজনই কুখ্যাত মোনাফিক ছিল ।

ইয়ারমুকের যুদ্ধে আশআছ তার একটা চোখ হারিয়েছিল। কুতায়বাহ তাকে একচোখওয়ালা লোকদের তালিকার অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আশআছের গোত্রের লোকেরা তাকে নাম দিয়েছিল উরফ - আন - নার ” অর্থাৎ বিশ্বাসঘাতক। ইয়ামামার যুদ্ধে সে ফন্দি করে তার গোত্রকে খালেদ ইবনে অলিদ দ্বারা আক্রান্ত করিয়েছিল ! সে আবু বকরের বোন উম্মে ফারাওয়াহর তৃতীয় স্বামী হিসেবে তাকে বিয়ে করেছিল। ফরওয়াহর প্রথম স্বামী ছিল আল - আজদি এবং দ্বিতীয় স্বামী ছিল তামীম যারিমী। জীবনী গ্রন্থসমূহে দেখা যায় ফরওয়াহ অন্ধ ছিল এবং তার গর্ভে তিনটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। তারা হলো - মুহাম্মদ ,ইসমাঈল ও ইসহাক। হাদীদ আবুল ফারাজের উদ্ধৃতি দিয়ে যে বর্ণনা দিয়েছেন তাতে দেখা যায় আলীকে হত্যা করার বিষয়ে আশআছও সমভাবে জড়িত। তিনি লিখেছেন :

আলী নিহত হবার রাতে ইবনে মুলজাম। আশাআছ ইবনে কায়েসের কাছে এসেছিল । উভয়ে আলাদাভাবে মসজিদের এক কোণে চুপচাপ বসেছিল । হুজর ইবনে আদি তাদের পাশ দিয়ে যেতে যেতে শুনতে পেলো আশআছে মুলজামকে বলছে , তাড়াতাড়ি কর ; না হয় ভোরের আলো তোমার প্রতি নির্দয় হতে পারে। ” এ কথা শুনে হুজর আশআছকে বললো ,ওহে এক চোখা লোক ,তুমি আলীকে নিহত করার পরিকল্পনা করছো ৷ ” এ বলেই হুজর তাড়াতাড়ি আলীর দিকে এগিযে যেতে লাগল। কিন্তু ইবনে মুলাজাম হুজরের আগেই দৌড়ে গিয়ে আলীকে আঘাত করেছিল ।

এই আশআছের কন্যাই ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিল। মাসুদী লিখেছেনঃ ইমাম হাসানের স্ত্রী জায়েদাহ বিনতে আশআছ মুয়াবিয়ার ষড়যন্ত্রে ইমামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করেছিল । এক লক্ষ দিরহাম ও ইয়াজিদের সাথে বিয়ে দেয়ার কথা বলে মুয়াবিয়া জায়েদাহকে প্রলুব্ধ করেছিল (২য় খণ্ড ,পৃঃ ৬৫০)

আশআছের পুত্র মুহাম্মদ মুসলিম ইবনে আকিলের সাথে কুফায় প্রতারণা করেছিল এবং কারবালায় ইমাম হুসাইনের হৃদয় বিদারক শাহাদাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু এতসব সত্ত্বেও বুখারি ,মুসলিম ,আবু দাউদ ,তিরমিজি ,নাসাই ও ইবনে মাজাহ হাদিস গ্রন্থে আশআছের রিওয়াত গ্রহণ করা হয়েছে।

২। নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর একদিন আমিরুল মোমেনিন কুফার মসজিদে সালিসির কুফল সম্বন্ধে খোৎবা প্রদান করছিলেন। তখন একজন লোক (আশআছ) দাঁড়িয়ে বললো , হে আমিরুল মোমেনিন ,প্রথমে আপনি আমাদেরকে এ সালিসি মানতে নিবৃত্ত করেছিলেন ,কিন্তু পরবর্তীতে আপনি নিজেই তা মঞ্জুর করেছেন। আমরা বুঝতে পারছি না। আপনার এ দুটো অবস্থার কোনটি সঠিক ও শুদ্ধ। ” এ কথা শুনে আমিরুল মোমেনিন তাঁর এক হাতের ওপর অন্য হাত দিয়ে তালি বাজিয়ে বললেন , এটাই সে ব্যক্তির পুরস্কার যে দৃঢ় মতামত পরিহার করে ; অর্থাৎ এটা তোমাদের কৃতকর্মের ফল কারণ তোমরা দৃঢ়তা ও সতর্কতা পরিহার করে সালিসির জন্য গো ধরেছিলো। ” আমিরুল মোমেনিনের কথার মর্মার্থ বুঝতে না পেরে আশআছ বললো , হে আমিরুল মোমেনিন ,এতে আপনার নিজের ওপরই দোষ আসবে। ” আশআছের এ কথার প্রেক্ষিতে আমিরুল মোমেনিন কর্কশভাবে বললেনঃ

তুমি কি জান আমি কী বলছি ? তুমি কি করে বুঝলে কোনটা আমার অনুকূলে আর কোনটা আমার প্রতিকূলে ? তুমি তাঁতির পুত্র তাঁতি এবং মোশরেক দ্বারা লালিত পালিত। তুমি একজন মোনাফিক। তোমার ওপর আল্লাহ ও সারা জাহানের অভিশাপ।

আশআছকে তাঁতি বলার অনেক কারণ টীকাকারগণ লিখেছেন। প্রথমতঃ তার জন্মভূমির অধিকাংশ লোকের মত আশআছ ও তার পিতা কাপড় বুনতো। এ পেশায় অত্যন্ত নিচ শ্রেণির লোকেরা নিয়োজিত ছিল। ইয়েমেনের অধিকাংশ লোক এ পেশায় নিয়োজিত ছিল। জাহীজ ’ লিখেছেনঃ

এ জনগোষ্ঠী সম্পর্কে আমি কী আর বলব ,যাদের অধিকাংশই তাঁতি ,মুচি ,চামার ,বানর পালক ও গাধার সওয়ার। মাথায় বুটিওয়ালা পাখী তাদেরকে খুঁজে বের করে ,ইদুর তাদের চারপাশে অজস্র সংখ্যায় এবং তারা একজন নারী দ্বারা শাসিত (পৃঃ ১৩০)

দ্বিতীয়তঃ হিকায়া ’ শব্দের অর্ত হলো শরীরকে একদিকে বাঁকা করে হাটা। যেহেতু আশআছ গর্ব ও অহঙ্কার বশতঃ কাঁধ ঝাঁকিয়ে শরীর বাঁকিয়ে হাঁটতো সেহেতু তাকে হাইক ’ বলা হয়েছে।

তৃতীয়তঃ আশআছের বোকামি ও নীচতা বুঝানোর জন্যই তাকে তাঁতি বলা হয়েছে। কারণ যে কোন নীচ প্রকৃতির লোককে আরবদেশে তাঁতি বলা হতো। এটা উক্ত পেশার কারণে প্রবাদে পরিণত হয়েছিল।

চতুর্থতঃ এ শব্দটি দ্বারা সেসব লোককে বুঝানো হয়েছে যারা আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে ; বিশেষ করে মোনাফেকীর জাল বুনে। আমিলী লিখেছেনঃ

ইমাম জাফর সাদিকের সম্মুখে যখন বলা হয়েছিল যে , হাইক ’ কে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে তখন তিনি ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন , হাইক ’ সে ব্যক্তি যে আল্লাহ ও রাসূলের বিরুদ্ধে মিথ্যা উদ্ভাবন করে (খণ্ড ১২ ,পৃঃ ১০১)

মূলতঃ আমিরুল মোমেনিন। হাইক ’ বা তাঁতি ' শব্দ দ্বারা মোনাফিক বুঝিয়েছেন। সেজন্যই তিনি আশআছের ওপর আল্লাহ ও অন্য সকলের অভিশম্পাত দিয়েছেন। মহিমান্বিত আল্লাহ বলেনঃ

আমরা মানুষের জন্য যে সব স্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়েত কিতাবে নাজেল করেছি তা যারা গোপন করে আল্লাহ তাদের লা 'নত দেন এবং অভিশাপকারীগণও অভিশাপ দেয় (কুরআন - ২:১৫৯)

এরপর আমিরুল মোমেনিন বললেন , মোশরেক থাকাকালে বন্দী হবার অবমাননাকর অবস্থা তুমি মুছে ফেলতে পারনি। এমন কি ইসলাম গ্রহণের পরও বন্দী হবার কলঙ্কের ছাপ তোমাকে ত্যাগ করেনি। ’ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তার বন্দী হবার কাহিনী হলো - বনি মুরাদ যখন তার পিতা কায়েসকে হত্যা করলো তখন সে বনি কিনদাহ থেকে যোদ্ধা সংগ্রহ করে তাদের তিন দলে বিভক্ত করলো। এক দলের নেতৃত্ব সে নিজে গ্রহণ করলো ,আরেক দলকে কাব ইবনে হানীর নেতৃত্বাধীন এবং অন্য দলকে কাশআম ইবনে ইয়াজিদ আল - আরকামের নেতৃত্বাধীনে দিয়েছিল। তারপর সে বনি মুরাদের সাথে যুদ্ধ করতে যাত্রা করলো। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সে বনি মুরাদের পরিবর্তে বনি হারিছ ইবনে কাবকে আক্রমণ করে বসলো। ফলে কাব ইবনে হানী ও কাশআম ইবনে ইয়াজিদ নিহত হলো এবং সে জীবিত বন্দী হলো। সে তিন হাজার উট মুক্তিপণ দিয়ে পরবর্তীতে মুক্তিলাভ করলো ।

আশআছের দ্বিতীয়বার বন্দী হবার ঘটনা হলো - রাসূলের ইহধাম ত্যাগের পর খলিফা আবু বকরের একটা আদেশ বাতিলের জন্য হাদ্রামাউত অঞ্চলে বিদ্রোহ হয়েছিল। উক্ত আদেশে খলিফা হাদ্রামাউত অঞ্চলের গভর্ণর জিয়াদ ইবনে লাবিদ আল - বায়াদি আল আনসারীকে লেখেছিলেন ,সে যেন লোকদের কাছ থেকে তার বায়াত ও জাকাত আদায় করে। জিয়াদ জাকাত আদায় করতে গিয়ে শায়তান ইবনে হাজরের একটা মোটাতাজা ও সুন্দর উস্ট্রির ওপর লাফিয়ে ওঠে বসে পড়লো। শায়তান তার এ উস্ট্রিটি ছাড়তে চাইলো না এবং এটির বদলে যে কোন উস্ট্রি নিয়ে যেতে অনুরোধ করলো। কিন্তু জিয়াদ তাতে রাজি হলো না। শায়তান তার ভ্রাতা আদ্দা ইবনে হাজারকে ডেকে পাঠালো। সে এসে জিয়াদের সাথে কথা বললো কিন্তু জিয়াদ কিছুতেই উস্ট্রিটির লাগাম থেকে হাত সরাতে রাজি হলো না। অবশেষে উভয় ভ্রাতা সাহায্যের জন্য মাসরুক ইবনে মাদি কারিবের কাছে আবেদন করলো। মাসরুকেও তার প্রভাব খাটিয়ে চেষ্টা করে উস্ট্রিটি জিয়াদের দখল থেকে ছাড়াতে ব্যর্থ হলো। এতে মাসরুক ভীষণ রাগান্বিত হয়ে গেল এবং উস্ট্রিটির বাঁধন খুলে দিয়ে তা শায়তানের হাতে দিয়ে দিল। মাসরুকের এহেন ব্যবহারে জিয়াদ অপমান বোধ করলো এবং রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গেল । সে লোকজন সংগ্রহ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো। অপরদিকে বনি ওয়ালিয়াহ ও তাদেরকে মোকাবেলা করার জন্য জড়ো হলো কিন্তু জিয়াদকে পরাজিত করতে পারেনি ,বরং তার হাতে ভীষণ মার খেয়েছিল। জিয়াদ তাদের নারীগণকে নিয়ে গিয়েছিল এবং সমস্ত সম্পদ লুটপাট করেনিয়েছিল। দৈবক্রমে যারা বেঁচে গিয়েছিল তারা আশাআছের নিকট আশ্রয় গ্রহণ করেছিল। আশাআছ এক শর্তে তাদের সাহায্য করতে সম্মত হলো যে ,তারা তাকে সে এলাকার শাসনকর্তা বলে স্বীকৃতি দেবে। জনগণ সেই শর্ত মেনে নিয়ে আশআছের অভিষেক উদযাপন করলো। এরপর আশআছ সৈন্যবাহিনী প্রস্তুত করে জিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে যাত্রা করলো। অপরপক্ষে জিয়াদকে সাহায্য করার জন্য আবু বকর ইয়েমেনের প্রধান মুহাজির ইবনে আবি উমাইয়াকে পত্র দিয়েছিল। মুহাজির তার বাহিনীসহ জিয়াদের দিকে এগিয়ে যাবার সময় পথিমধ্যে যুরকান নামক স্থানে আশআছের বাহিনীর সাথে মুখোমুখি হয় এবং উভয় পক্ষে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। আশআছ বেশিক্ষণ টিকতে পারলো না। সে তার লোকজনসহ নুজায়ার নামক দুর্গে আশ্রয় গ্রহণ করলো। মুহাজিরও পিছু ধাওয়া করে দূর্গ অবরোধ করলো। আশআছ ভাবলো অস্ত্র আর জনবল ছাড়া এভাবে কতদিন সে দূর্গে আবদ্ধ হয়ে থাকবে। ফলে সে এক রাতে চুরি করে দূর্গের বাইরে এসে জিয়াদ ও মুহাজিরের সাথে দেখা করলো এবং তাদের সঙ্গে এ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো যে ,যদি তারা ,তার পরিবারের নয় জনের নিরাপত্তা বিধান করে তবে সে দূর্গের ফটক খুলে দেবে। জিয়াদ ও মুহাজির এতে রাজি হলো। আশআছ উক্ত নয় জনের নাম লেখে তাদের হাতে দিল কিন্তু তার নিজের নাম লেখতে ভুলে গিয়েছিল। এদিকে সে দুর্গে ফিরে গিয়ে বললো যে ,সে সকলের জীবনের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। সে দুর্গের ফটক খুলে দেয়ার নির্দেশ দিল। যেইনা ফটক খোলা হলো অমনি জিয়াদের বাহিনী তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। দূর্গের জনতা বললো তাদের জীবনের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। জিয়াদের সৈন্যরা বললো আশাআছ যে নয় জনের নিরাপত্তা চেয়েছে সে নয় জনের তালিকা তাদের কাছে রয়েছে। এ দূর্গে আটশত লোক হত্যা করা হয়েছিল এবং বেশ কজন মহিলার হাত কেটে ফেলা হয়েছিল । চুক্তি অনুযায়ী নয় জনকে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। কিন্তু আশআছের নাম তালিকায় না থাকায় তার বিষয়টি জটিল হয়ে পড়লো। অবশেষে তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে এক হাজার নারী বন্দিনীর সাথে মদিনায় আবু বকরের কাছে প্রেরণ করা হয়েছিল। পথিমধ্যে নারী - পুরুষ ,আত্মীয় - স্বজন সবাই তাকে অভিশম্পাত দিয়েছিল এবং মহিলারা তাকে উরফ - আন - নার ” (অর্থাৎ এমন বিশ্বাসঘাতক যে নিজের লোকদের তরবারির নিচে ঠেলে দেয়) বলে গালি দিয়েছিল। যাহোক মদিনায় পৌছার পর আবু বকর তাকে মুক্তি দিয়েছিল। এরপর সে আবু বকরের বোন উম্মে ফরওয়াহকে বিয়ে করেছিল।

খোৎবা- ২০

فَإِنَّكُمْ لَوْ قَدْ عَايَنْتُمْ مَا قَدْ عَايَنَ مَنْ مَاتَ مِنْكُمْ - لَجَزِعْتُمْ ووَهِلْتُمْ وسَمِعْتُمْ وأَطَعْتُمْ - ولَكِنْ مَحْجُوبٌ عَنْكُمْ مَا قَدْ عَايَنُوا - وقَرِيبٌ مَا يُطْرَحُ الْحِجَابُ - ولَقَدْ بُصِّرْتُمْ إِنْ أَبْصَرْتُمْ وأُسْمِعْتُمْ إِنْ سَمِعْتُمْ - وهُدِيتُمْ إِنِ اهْتَدَيْتُمْ - وبِحَقٍّ أَقُولُ لَكُمْ لَقَدْ جَاهَرَتْكُمُ الْعِبَرُ وزُجِرْتُمْ بِمَا فِيه مُزْدَجَرٌ - ومَا يُبَلِّغُ عَنِ اللَّه بَعْدَ رُسُلِ السَّمَاءِ إِلَّا الْبَشَرُ.

মৃত্যু ও তার শিক্ষা

যারা তোমাদের পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে তারা যা দেখেছে তা যদি তোমরা দেখতে পেতে তাহলে তোমরা বিচলিত ও অস্থির হয়ে পড়তে এবং তখন তোমরা কর্ণপাত করতে ও মান্য করতে। কিন্তু মৃতরা যা দেখেছে তা তোমাদের নিকট রহস্যাবৃত করা হয়েছে। সহসাই এ রহস্যের পর্দা উন্মোচন করা হবে। তোমাদেরকে সবকিছু দেখানো হয়েছে যদি তোমরা দেখে থাক ,সবকিছু শুনানো হয়েছে। যদি তোমরা শুনে থাক এবং হেদায়েতের পথ দেখানো হয়েছে। যদি তোমরা হেদায়েত গ্রহণ করা। আমি তোমাদের সঙ্গে যেসব কথা বলেছি তা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। বহু রকম নির্দেশমূলক দৃষ্টান্ত দিয়ে তোমাদের উচ্চস্বরে ডাকা হয়েছে এবং পরিপূর্ণ সাবধান বাণীর মাধ্যমে সাবধান করা হয়েছে। স্বগীয় বার্তাবাহকের (জিব্রাইল) পর শুধুমাত্র মানুষই আল্লাহর বার্তা পৌছে দিতে পারে। (সুতরাং আমি যা পৌছে দিচ্ছি তা আল্লাহর কাছ থেকেই প্রাপ্ত) ।

খোৎবা- ২১

وهي كلمة جامعة للعظة والحكمة

فَإِنَّ الْغَايَةَ أَمَامَكُمْ وإِنَّ وَرَاءَكُمُ السَّاعَةَ تَحْدُوكُمْ تَخَفَّفُوا تَلْحَقُوا فَإِنَّمَا يُنْتَظَرُ بِأَوَّلِكُمْ آخِرُكُمْ.

দুনিয়াতে নিজকে হালকা রাখার উপদেশ

নিশ্চয়ই ,তোমার লক্ষ্যবস্তু (পুরস্কার অথবা শাস্তি) তোমার সম্মুখে। তোমার পেছনে কেয়ামতের মুহুর্ত (মৃত্যু) যা তোমাকে দ্রুত অনুসরণ করে চলছে। নিজকে হালকা রাখো (পাপভার থেকে) তাহলে সামিল হতে পারবে (অগ্রবর্তীগণের সাথে) । তোমার পূর্ববর্তীরা তোমার জন্য প্রতীক্ষা রত আছে।

খোৎবা- ২২

حين بلغه خبر الناكثين ببيعته

وفيها يذم عملهم ويلزمهم دم عثمان ويتهددهم بالحرب

أَلَا وإِنَّ الشَّيْطَانَ قَدْ ذَمَّرَ حِزْبَه واسْتَجْلَبَ جَلَبَه لِيَعُودَ الْجَوْرُ إِلَى أَوْطَانِه ويَرْجِعَ الْبَاطِلُ إِلَى نِصَابِه واللَّه مَا أَنْكَرُوا عَلَيَّ مُنْكَراً - ولَا جَعَلُوا بَيْنِي وبَيْنَهُمْ نَصِفاً.

وإِنَّهُمْ لَيَطْلُبُونَ حَقّاً هُمْ تَرَكُوه ودَماً هُمْ سَفَكُوه - فَلَئِنْ كُنْتُ شَرِيكَهُمْ فِيه فَإِنَّ لَهُمْ لَنَصِيبَهُمْ مِنْه - ولَئِنْ كَانُوا وَلُوه دُونِي فَمَا التَّبِعَةُ إِلَّا عِنْدَهُمْ - وإِنَّ أَعْظَمَ حُجَّتِهِمْ لَعَلَى أَنْفُسِهِمْ - يَرْتَضِعُونَ أُمّاً قَدْ فَطَمَتْ ويُحْيُونَ بِدْعَةً قَدْ أُمِيتَتْ - يَا خَيْبَةَ الدَّاعِي مَنْ دَعَا وإِلَامَ أُجِيبَ - وإِنِّي لَرَاضٍ بِحُجَّةِ اللَّه عَلَيْهِمْ وعِلْمِه فِيهِمْ.

فَإِنْ أَبَوْا أَعْطَيْتُهُمْ حَدَّ السَّيْفِ - وكَفَى بِه شَافِياً مِنَ الْبَاطِلِ ونَاصِراً لِلْحَقِّ - ومِنَ الْعَجَبِ بَعْثُهُمْ إِلَيَّ أَنْ أَبْرُزَ لِلطِّعَانِ وأَنْ أَصْبِرَ لِلْجِلَادِ - هَبِلَتْهُمُ الْهَبُولُ لَقَدْ كُنْتُ ومَا أُهَدَّدُ بِالْحَرْبِ ولَا أُرْهَبُ بِالضَّرْبِ - وإِنِّي لَعَلَى يَقِينٍ مِنْ رَبِّي وغَيْرِ شُبْهَةٍ مِنْ دِينِي.

উসমানের হত্যার জন্য যারা তাকে দোষী করেছিল তাদের সম্বন্ধে

সাবধান! শয়তান তার সেনাবাহিনী সংগ্রহ করেনিশ্চয়ই তাদের প্ররোচিত ও সুসজ্জিত করতে আরম্ভ করেছে যেন অত্যাচার শেষ সীমায় পৌছায় এবং বিভ্রান্তি আসন গেড়ে বসতে পারে। আল্লাহর কসম ,তারা আমার ওপর যে দোষ আরোপ করছে তা সঠিক নয় এবং আমার ও তাদের মধ্যে ন্যায়বিচার করছে না।

তারা আমার কাছে একটা অধিকার দাবি করছে যা তারা প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা আমার কাছে এমন একটা রক্তপণ চাচ্ছে যা তারা নিজেরাই ঘটিয়েছে । আমি যদি সে রক্তপাতে তাদের অংশীদার হতাম। তাহলেও তাতে তাদের অংশ রয়েছে। কিন্তু তারা আমাকে ছাড়াই সে রক্তপাত ঘটিয়েছে। কাজেই তার ফলাফলও তাদের ভুগতে হবে। আমার বিরুদ্ধে সব চাইতে জোরালো যে যুক্তি তারা দাঁড় করিয়েছে প্রকৃত অর্থে তা তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে যায়। তারা এমন মায়ের স্তন চুষছে যার দুধ আগেই শুকিয়ে গেছে এবং এমন বানোয়াট বিষয়কে জীবন দান করতে চায় যা আগেই মরে গেছে। কত হতাশাব্যঞ্জক যুদ্ধের জন্য তাদের এ চ্যালেঞ্জ ? কে এই চ্যালেঞ্জার এবং কিসের জন্য সে সাড়া দিচ্ছে ? আমি খুশি এ জন্য যে ,তাদের সম্মুখে সকল যুক্তি নিঃশেষ করা হয়েছে এবং তাদের সম্বন্ধে আল্লাহ সবকিছু অবগত আছেন। (আমার নির্দোষ হবার যুক্তি মানতে) । যদি তারা অস্বীকৃতি জানায় তবে আমার তরবারি উন্মুক্ত রইল যা ভুলের চিকিৎসক ও ন্যায়ের সমর্থক হিসেবে যথেষ্ট।

এটা বিস্ময়কর যে ,বর্শা - যুদ্ধের জন্য এগিয়ে যেতে এবং তরবারি - যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে তারা আমাকে খবর পাঠিয়েছে। শোক প্রকাশকারী রমণীকুল তাদের জন্য ক্রন্দন করুক! আমি কি কখনো এমন ছিলাম যে ,যুদ্ধকে ভয় করেছি বা সংঘর্ষে আতঙ্কিত হয়েছি। আল্লাহ চিরকাল আমার সহায় এবং আমার ইমানে কোন প্রকার সংশয় নেই।

___________________

১ । উসমান নিহত হবার জন্য যখন আমিরুল মোমেনিনকে দোষারোপ করা হলো তখন তিনি অভিযোগ খণ্ডন করে এ খোৎবা প্রদান করেন। যারা তাকে দোষারোপ করেছিলো তাদের সম্বন্ধে তিনি বলেন , এ প্রতিশোধ গ্রহণেচ্ছুগণ একথা বলতে পারে না যে , আমি একাই হত্যা করেছি এবং অন্য কেউ এতে অংশ গ্রহণ করেনি। প্রত্যক্ষভাবে দেখা ঘটনা প্রবাহ তারা এ বলে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে পারবে না যে , তারা এ হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল না। তাহলে কেন তারা প্রতিশোধ গ্রহণে আমাকে সর্বাগ্রে ধরেছে ? আমার সাথে তাদের নিজদেরকেও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। যদি আমি এ অপবাদ থেকে মুক্তও হই তবু ওরা মুক্ত বলে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে না। সুতরাং তারা কিভাবে শাস্তি থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করবে ? সত্যি কথা কী , আমাকে এ অভিযোগে অভিযুক্ত করার পিছনে তাদের উদ্দেশ্য হলো - আমি যেন তাদের প্রতি সেরকম আচরণ করি যেরকম আচরণ পেয়ে তারা অভ্যস্ত হয়েছে। কিন্তু এটা তারা আমার কাছ থেকে আশা করতে পারে না যে , পূর্ববতী সরকারগুলোর নতুন প্রবর্তনগুলো আমি পুনরুজীবিত করবো। যুদ্ধের বিষয়ে আমি পূর্বেও কখনো ভীত ছিলাম না , এখানো ভীত নই। আমার মনোভাব সম্বন্ধে আল্লাহ জ্ঞাত আছেন। আর আল্লাহ এও অবহিত আছেন যে , আজ যারা প্রতিশোধ গ্রহণের ওজর দেখিয়ে আমার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে তারাই তার হত্যাকারী। ” ইতিহাসে বিধৃত আছে যে , গোলযোগ সৃষ্টি করে যারা উসমানকে হত্যা করার ব্যবস্থা করেছিল , এমনকি তার মৃতদেহের ওপর পাথর নিক্ষেপ করে মুসলিমদের কবরস্থানে তার দাফন প্রতিহত করেছিল তারাই তার রক্তের বদলা নিতে অগ্রণী ভূমিকা পালনে তৎপর হয়েছিল। এদের মধ্যে তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ , জুবায়ের ইবনে আওয়াম ও আয়শা বিনতে আবু বকরের নাম তালিকার শীর্ষে রয়েছে। হাদীদ লিখেছেঃ

যে সব ঐতিহাসিক উসমান হত্যার বিস্তারিত লিখেছেন তাদের বর্ণনামতে উসমানকে হত্যা করার দিন নিজেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে রাখার জন্য তালহা কালো আবরণ দিয়ে মুখ ঢেকে উসমানের গৃহের দিকে তীর নিক্ষেপ করেছিল । ঐতিহাসিকগণ আরো বর্ণনা করেছেন যে , জুবায়ের বলেছিল , উসমানকে হত্যা কর । সে আমাদের ইমান পরিবর্তন করে দিয়েছে। ” তখন লোকেরা বলেছিল , হে জুবায়ের , তোমার পুত্র উসমানের দুয়ারে পাহারা দিচ্ছে ৷ ” উত্তরে জুবায়ের বলেছিল , আমার পুত্রকে হারালেও কোন দুঃখ নেই , কিন্তু উসমানকে হত্যা করতেই হবে। আগামীকাল যেন উসমান লাশ হয়ে সিরাতে পড়ে থাকে । (খণ্ড - ৯ , পৃঃ৩৫ - ৩৬)

আয়শা সম্পর্কে রাব্বিহ লিখেছেনঃ

মুঘিরাহ ইবনে শুবাহ একদিন আয়শার কাছে এসেছিল । তখন আয়শা বললেন , হে আবু আবদিল্লাহ , আমার মনে হয়। জামালের যুদ্ধের দিনে তুমি আমার সঙ্গে ছিলে । তুমি নিশ্চয়ই দেখেছে কী হারে তীর আমার হাওদা ভেদ করে চলে গিয়েছিল । কয়েকটি তীর আমার শরীরে সামান্য আঘাতও করেছে। ” মুঘিরাহ বললো , সেসব তীরের আঘাতে তোমার মৃত্যু হলে ভাল হতো ! আয়শা বললেন , আল্লাহ না করুন , তুমি আমন কথা বলছো কেন ? উত্তরে মুঘিরাহ বললো , উসমানের বিরুদ্ধে তুমি যা করেছে। তাতে তার কিছুটা প্রায়শ্চিত্ত৷ হতো। ” ( খণ্ড - ৪ , পৃঃ ২৯৪) |

খোৎবা - ২৩

وتشتمل على تهذيب الفقراء بالزهد وتأديب الأغنياء بالشفقة

أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ الأَمْرَ يَنْزِلُ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الأَرْضِ - كَقَطَرَاتِ الْمَطَرِ إِلَى كُلِّ نَفْسٍ بِمَا قُسِمَ لَهَا - مِنْ زِيَادَةٍ أَوْ نُقْصَانٍ - فَإِنْ رَأَى أَحَدُكُمْ لأَخِيه غَفِيرَةً فِي أَهْلٍ أَوْ مَالٍ أَوْ نَفْسٍ - فَلَا تَكُونَنَّ لَه فِتْنَةً - فَإِنَّ الْمَرْءَ الْمُسْلِمَ مَا لَمْ يَغْشَ دَنَاءَةً تَظْهَرُ - فَيَخْشَعُ لَهَا إِذَا ذُكِرَتْ ويُغْرَى بِهَا لِئَامُ النَّاسِ - كَانَ كَالْفَالِجِ الْيَاسِرِ الَّذِي يَنْتَظِرُ أَوَّلَ فَوْزَةٍ - مِنْ قِدَاحِه تُوجِبُ لَه الْمَغْنَمَ ويُرْفَعُ بِهَا عَنْه الْمَغْرَمُ - وكَذَلِكَ الْمَرْءُ الْمُسْلِمُ الْبَرِيءُ مِنَ الْخِيَانَةِ - يَنْتَظِرُ مِنَ اللَّه إِحْدَى الْحُسْنَيَيْنِ - إِمَّا دَاعِيَ اللَّه فَمَا عِنْدَ اللَّه خَيْرٌ لَه - وإِمَّا رِزْقَ اللَّه فَإِذَا هُوَ ذُو أَهْلٍ ومَالٍ - ومَعَه دِينُه وحَسَبُه - وإِنَّ الْمَالَ والْبَنِينَ حَرْثُ الدُّنْيَا - والْعَمَلَ الصَّالِحَ حَرْثُ الآخِرَةِ - وقَدْ يَجْمَعُهُمَا اللَّه تَعَالَى لأَقْوَامٍ - فَاحْذَرُوا مِنَ اللَّه مَا حَذَّرَكُمْ مِنْ نَفْسِه - واخْشَوْه خَشْيَةً لَيْسَتْ بِتَعْذِيرٍ واعْمَلُوا فِي غَيْرِ رِيَاءٍ ولَا سُمْعَةٍ - فَإِنَّه مَنْ يَعْمَلْ لِغَيْرِ اللَّه يَكِلْه اللَّه لِمَنْ عَمِلَ لَه - نَسْأَلُ اللَّه مَنَازِلَ الشُّهَدَاءِ ومُعَايَشَةَ السُّعَدَاءِ - ومُرَافَقَةَ الأَنْبِيَاءِ.

أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّه لَا يَسْتَغْنِي الرَّجُلُ - وإِنْ كَانَ ذَا مَالٍ عَنْ - عِتْرَتِه ودِفَاعِهِمْ عَنْه بِأَيْدِيهِمْ وأَلْسِنَتِهِمْ - وهُمْ أَعْظَمُ النَّاسِ حَيْطَةً مِنْ وَرَائِه وأَلَمُّهُمْ لِشَعَثِه وأَعْطَفُهُمْ عَلَيْه عِنْدَ نَازِلَةٍ إِذَا نَزَلَتْ بِه - ولِسَانُ الصِّدْقِ يَجْعَلُه اللَّه لِلْمَرْءِ فِي النَّاسِ - خَيْرٌ لَه مِنَ الْمَالِ يَرِثُه غَيْرُه.

ومنها أَلَا لَا يَعْدِلَنَّ أَحَدُكُمْ عَنِ الْقَرَابَةِ يَرَى بِهَا الْخَصَاصَةَ أَنْ يَسُدَّهَا بِالَّذِي لَا يَزِيدُه إِنْ أَمْسَكَه - ولَا يَنْقُصُه إِنْ أَهْلَكَه ومَنْ يَقْبِضْ يَدَه عَنْ عَشِيرَتِه - فَإِنَّمَا تُقْبَضُ مِنْه عَنْهُمْ يَدٌ وَاحِدَةٌ - وتُقْبَضُ مِنْهُمْ عَنْه أَيْدٍ كَثِيرَةٌ - ومَنْ تَلِنْ حَاشِيَتُه يَسْتَدِمْ مِنْ قَوْمِه الْمَوَدَّةَ.

ঈর্ষা পরিহার করে চলা এবং আত্মীয় - স্বজনের সাথে ভাল ব্যবহার করা সম্বন্ধে

নিশ্চয়ই ,আল্লাহর আদেশাবলী আকাশ থেকে বৃষ্টিবিন্দুর মতে পৃথিবীতে নেমে আসে। এতে পূর্বনির্ধারিত ভাগ্য - লিপি অনুযায়ী কারো জন্য বেশি কারো জন্য কম রহমত ও নেয়ামত আসে। সুতরাং যদি কেউ তার ভাইয়ের সন্তান - সন্ততি ও সম্পদের প্রাচুর্য আসতে দেখে ,তবে তার হতাশাগ্রস্ত বা উদ্বীগ্ন হবার কিছু নেই। এমনকি নিজের সন্তান - সন্ততি ও সম্পদের প্রাচুর্যের জন্য গর্ববোধ করার কিছু নেই। নিচ লোকেরাই এসব নিয়ে আত্ম - অহম বোধ করে। সম্পদের প্রাচুর্য দেখলে যতদিন পর্যন্ত একজন মুসলিম (লজ্জায়) চক্ষুবন্ধ না করবে ততদিন পর্যন্ত সে একজন জুয়াড়ি সদৃশ ; যে প্রথমবারের তীর নিক্ষেপেই লাভবান হয়ে পূর্বের লোকসান পুষিয়ে নেয়ার আশা পোষণ করে।

একইভাবে যে মুসলিম খেয়ানত মুক্ত সে দুটো ভাল জিনিসের একটা আশা করতে পারে। জিনিস দুটো হলো - (এক) আল্লাহর আহবান এবং সেক্ষেত্রে আল্লাহর কাছ থেকে যা কিছু আসে তাই তার জন্য সর্বোত্তম ধরে নেয়া ; (দুই) আল্লাহর রেজেক। তার সন্তান - সন্ততি ও বিষয় - সম্পদ যতই থাকুক না কেন তার ইমান ও সম্মান তার সাথেই থাকবে। নিশ্চয়ই ,সন্তান - সন্ততি ও ঐশ্বর্য ইহজগতের চাষাবাদ এবং আমলে সালেহা পরকালের চাষাবাদ। কখনো কখনো মহিমান্বিত আল্লাহ এর উভয়ই কোন কোন কওমিকে একত্রে দান করে থাকেন ।

যেসব বিষয়ে আল্লাহ তোমাদের সতর্ক করে দিয়েছেন সেসব বিষয়ে সাবধান থেকো এবং আল্লাহকে ভয় কর। কারণ এ বিষয়ে কোন ওজর কার্যকর হবে না। বে - রিয়া (লোক দেখানোর জন্য নয়) আমল কর: বাহবা শোনার জন্য করো না। কোন মানুষ যদি গায়রুল্লাহর আমল করে তবে যার উদ্দেশ্যে সে আমল করেছে তার কাছে আল্লাহ্ তাকে ন্যস্ত করেন। আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি যেন তিনি আমাদেরকে শহিদের মর্যাদা ,পরহেযগারগণের সাথে জীবন যাপন ও রাসূলগণের বন্ধুত্ব প্রদান করেন।

হে জনমণ্ডলী ,কেউ তার আপনজনের সহায়তা ব্যতীত চলতে পারে না (যদি সে ঐশ্বর্যবানও হয়) । তাদের সহায়তা হস্ত দ্বারা অথবা মুখের কথায়ও হতে পারে। শুধুমাত্র আপনজনই পিছন থেকে সমর্থনকারী এবং আপদে - বিপদে পক্ষ বিস্তার করে রক্ষাকারী। দুঃখ - দুর্দশায় নিপতিত হলে আপনজনই সদয় দৃষ্টিতে তাকায়। কোন মানুষের মঙ্গলময় স্মৃতি ,যা মানুষের মাঝেই আল্লাহ সংরক্ষণ করে রাখেন ,যেকোন ঐশ্বর্য থেকে উত্তম।

মনে রেখো ,তোমরা যদি তোমাদের আপনজনকে অভাবগ্রস্ত অবস্থায় অথবা উপোস করতে দেখ তাহলে তাদের সাহায্য করা থেকে একথা ভেবে বিরত থেকো না যে ,তুমি সাহায্য না করলে তাদের অভাব বেড়ে যাবে না অথবা তোমার সাহায্যে তাদের দুঃখ - দুর্দশা সামান্যই লাঘব হবে। যারা আপনজনকে সাহায্য করা থেকে হাত গুটিয়ে রাখে তারা প্রয়োজনের সময় অনেক হাত গুটানো দেখতে পাবে। যে কেউ মিষ্টি স্বভাবের হবে তার প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা - ভালবাসা চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।

খোৎবা- ২৪

وهي كلمة جامعة له، فيها تسويغ قتال المخالف، والدعوة إلى طاعة اللَّه، والترقي فيها لضمان الفوز

ولَعَمْرِي مَا عَلَيَّ مِنْ قِتَالِ مَنْ خَالَفَ الْحَقَّ وخَابَطَ الْغَيَّ مِنْ إِدْهَانٍ ولَا إِيهَانٍ فَاتَّقُوا اللَّه عِبَادَ اللَّه وفِرُّوا إِلَى اللَّه مِنَ اللَّه - وامْضُوا فِي الَّذِي نَهَجَه لَكُمْ وقُومُوا بِمَا عَصَبَه بِكُمْ فَعَلِيٌّ ضَامِنٌ لِفَلْجِكُمْ آجِلًا إِنْ لَمْ تُمْنَحُوه عَاجِلًا.

জনগণকে জিহাদের জন্য প্রেরণাদান

আমার জীবনের কসম ,যারা ন্যায়ের বিরোধিতা করে অথবা বিপথে হাতড়িয়ে বেড়ায় তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আমার কোন শিথিলতা নেই এবং তাদের প্রতি আমার সামান্যতম শ্রদ্ধাবোধও নেই। হে আল্লাহর বান্দাগণ ,তোমরা আল্লাহকে ভয় কর ; তাঁর রোষে পতিত হওয়া থেকে দূরে থাক এবং তাঁর করুণা যাচনা কর। তিনি তোমাদের জন্য যে সকল নির্দেশ দিয়েছেন সে পথে চল এবং যা তোমাদের আদেশ করেছেন তাতে দৃঢ়ভাবে অবস্থান কর। যদি তোমরা সেভাবে চল তবে এ আলী তোমাদের মুক্তির নিশ্চয়তা দিচ্ছে ; হতে পারে ইহজগতে তোমরা তা নাও পেতে পার ,কিন্তু পরকালের চিরস্থায়ী সুখ অবধারিত ।

খোৎবা- ২৫

وقد تواترت عليه الأخبار باستيلاء أصحاب معاوية على البلاد وقدم عليه عاملاه على اليمن وهما عبيد الله بن عباس وسعيد بن نمران لما غلب عليهما بسر بن أبي أرطاة فقامعليه‌السلام على المنبر ضجرا بتثاقل أصحابه عن الجهاد ومخالفتهم له في الرأي فقال:

مَا هِيَ إِلَّا الْكُوفَةُ أَقْبِضُهَا وأَبْسُطُهَا إِنْ لَمْ تَكُونِي إِلَّا أَنْتِ تَهُبُّ أَعَاصِيرُكِ فَقَبَّحَكِ اللَّه! وتَمَثَّلَ بِقَوْلِ الشَّاعِرِ

لَعَمْرُ أَبِيكَ الْخَيْرِ يَا عَمْرُو إِنَّنِي عَلَى وَضَرٍ مِنْ ذَا الإِنَاءِ قَلِيلِ ثُمَّ قَالَعليه‌السلام

أُنْبِئْتُ بُسْراً قَدِ اطَّلَعَ الْيَمَنَ وإِنِّي واللَّه لأَظُنُّ أَنَّ هَؤُلَاءِ الْقَوْمَ سَيُدَالُونَ مِنْكُمْ بِاجْتِمَاعِهِمْ عَلَى بَاطِلِهِمْ وتَفَرُّقِكُمْ عَنْ حَقِّكُمْ - وبِمَعْصِيَتِكُمْ إِمَامَكُمْ فِي الْحَقِّ وطَاعَتِهِمْ إِمَامَهُمْ فِي الْبَاطِلِ - وبِأَدَائِهِمُ الأَمَانَةَ إِلَى صَاحِبِهِمْ وخِيَانَتِكُمْ - وبِصَلَاحِهِمْ فِي بِلَادِهِمْ وفَسَادِكُمْ - فَلَوِ ائْتَمَنْتُ أَحَدَكُمْ عَلَى قَعْبٍ لَخَشِيتُ أَنْ يَذْهَبَ بِعِلَاقَتِه اللَّهُمَّ إِنِّي قَدْ مَلِلْتُهُمْ ومَلُّونِي وسَئِمْتُهُمْ وسَئِمُونِي - فَأَبْدِلْنِي بِهِمْ خَيْراً مِنْهُمْ وأَبْدِلْهُمْ بِي شَرّاً مِنِّي - اللَّهُمَّ مِثْ قُلُوبَهُمْ كَمَا يُمَاثُ الْمِلْحُ فِي الْمَاءِ - أَمَا واللَّه لَوَدِدْتُ أَنَّ لِي بِكُمْ أَلْفَ فَارِسٍ - مِنْ بَنِي فِرَاسِ بْنِ غَنْمٍ.

هُنَالِكَ لَوْ دَعَوْتَ أَتَاكَ مِنْهُمْ

فَوَارِسُ مِثْلُ أَرْمِيَةِ الْحَمِيمِ

যখন আমিরুল মোমেনিন উত্তরোত্তর সংবাদ পেতে লাগলেন যে ,মুয়াবিয়ার জনগণ একের পর এক শহর দখল করেনিচ্ছে এবং ইয়েমেন থেকে তার অফিসার উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাস ও সাঈদ ইবনে নিমরান মুয়াবিয়ার লোক বুসর ইবনে আরতাঁতের নিকট পরাজিত হয়ে পিছু হটে এসেছে ,তখন আমিরুল মোমেনিন। তাঁর লোকদের জিহাদে বিমুখতা ও তার সাথে মতদ্বৈধতার কারণে বিচলিত হলেন । তিনি মিম্বারে উঠে। এ খোৎবা প্রদান করেন।

কুফা ব্যতীত আমার জন্য আর কিছুই রইল না। যা আমি সংকীর্ণ ও প্রশস্ত করতে পারি। (হে কুফা) তোর দশা যদি এ রকমই হয় যে ,তোর ওপর দিয়ে ঘূর্ণিঝড় বইতেই থাকবে তবে আল্লাহ তোকে ধ্বংস করুক। তাৎপর তিনি একটা কবিতার দুটি পংক্তি আবৃত্তি করলেনঃ

হে আমর ! তোমার পরম পিতার দোহাই ,এ পাত্র থেকে আমি সামান্য একটুখানি চর্বি পেয়েছি ,যা পাত্র খালি করার পর পাত্রের গায়ে লেগেছিল ।

আমি জানতে পারলাম যে ,বুসর ইয়েমেন দখল করেনিয়েছে। আল্লাহর কসম ,এসব লোক সম্পর্কে আমি চিন্তা করে দেখেছি এরা সহসাই সারা দেশ কেড়ে নিয়ে যাবে। কারণ তারা বাতিলের ওপর প্রতিষ্ঠিত থেকেও একতাবদ্ধ। অথচ তোমরা সত্য ও ন্যায়ের পথে থেকেও ঐক্যবদ্ধ নও - তোমরা দ্বীধাবিভক্ত। ন্যায়ের পথে থাকা সত্ত্বেও তোমরা তোমাদের ইমামকে অমান্য কর। আর বাতিল পথে থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের নেতাকে মান্য করে। তারা তাদের নেতার প্রতি সম্পূর্ণরূপে আস্থাবান ; আর তোমরা তোমাদের ইমামের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা কর। তাদের শহরে তারা কল্যাণকর কাজ করে ; আর তোমরা তোমাদের শহরে অকল্যাণকর কাজ কর। যদি আমি তোমাদের একটা কাঠের গামলার দায়িত্বও দেই ,আমার মনে হয় ,তোমরা তার হাতল নিয়ে পালিয়ে যাবে।

হে আমার আল্লাহ ,তারা আমার প্রতি নিদারুণভাবে বিরক্ত ; আমিও তাদের প্রতি বিরক্ত। তারা আমাকে নিয়ে ক্লান্ত ; আমিও তাদের নিয়ে ক্লান্ত। তাদের চেয়ে ভালো কোন জনগোষ্ঠী আমাকে দিন এবং আমার চেয়ে মন্দ কোন নেতা তাদেরকে দিন। হে আল্লাহ ,তাদের হৃদয়কে বিগলিত করুন ,যেভাবে বিগলিত হয় লবন পানিতে। হায়! আল্লাহ ,যদি আমি এদের পরিবর্তে বনি ফিরাস ইবনে ঘানম - এর এক হাজার অশ্বারোহীও পেতাম। কবি বলেছিলেন ;

যদি তুমি তাদের আহবান কর

অশ্বারোহীগণ ধেয়ে আসবে

গ্রীষ্মের মেঘমালার মত।

____________________

১। সিফফিনের ছল - চাতুরিপূর্ণ সালিসির পর মুয়াবিয়ার অবস্থান মজবুত হয়ে উঠলো এবং সে আমিরুল মোমেনিনের শহরসমূহ একের পর এক দখল করে তার রাজত্ব বৃদ্ধির চিন্তা করতে লাগল। সে তার সৈন্যবাহিনী বিভিন্ন এলাকায় প্রেরণ করে জোরপূর্বক তার অনুকূলে জনগণের বায়াত আদায় করতে লাগল। এ উদ্দেশ্যে সে বুসর ইবনে আবি আরতাতকে হিজাজ এলাকায় প্রেরণ করেছিল। বুদ্সর হিজাজ থেকে ইয়েমেন পর্যন্ত হাজার হাজার নিরীহ - নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত ঘটিয়েছিল। গোত্রের পর গোত্রের জীবিত লোকদের আগুনে পুড়ে মেরেছিল এবং অসংখ্য শিশু হত্যা করেছিল। তার অত্যাচার এতদূর পর্যন্ত পৌঁছেছিল যে ,ইয়েমেনের গভর্ণর উবায়দুল্লাহ ইবনে আব্বাসের দু ’ টি শিশুপুত্রকে জুহারিয়া বিনতে খালিদ ইবনে কারাজ এর সম্মুখে জবাই করে হত্যা করা হয়েছিল।

যখন আমিরুল মোমেনিন বুসরের এহেন নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও রক্তপাতের সংবাদ পেলেন তখন তাকে খতম করার জন্য একটা বাহিনী প্রেরণের বিষয় চিন্তা - ভাবনা করে স্থির করলেন। কিন্তু অনবচ্ছিন্ন যুদ্ধের ফলে মানুষ ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। আমিরুল মোমেনিনের আহবানে তারা আগ্রহের পরিবর্তে হৃদয়হীনতা দেখিয়েছিল। তাদের অনীহা লক্ষ্য করে তিনি এ খোৎবা প্রদান পূর্বক তাদের উদ্দীপনা ও আত্ম - সম্মানবোধ জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করলেন। তিনি তাদের সম্মুখে শত্রুর ভ্রান্ত দিকসমূহ ও তাদের নিজেদের দোষ - ত্রুটি বর্ণনা করে তাদেরকে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করতে চেষ্টা করলেন।

অবশেষে যারিয়াহ ইবনে কুদামাহ আমিরুল মোমেনিনের আহবানে সাড়া দিয়ে দু ’ হাজার সৈন্যের একটি বাহিনী নিয়ে বুসরের মোকাবেলা করেছিল এবং তাকে আমিরুল মোমেনিনের এলাকা থেকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছিল।

খোৎবা- ২৬

وفيها يصف العرب قبل البعثة ثم يصف حاله قبل البيعة له العرب قبل البعثة

إِنَّ اللَّه بَعَثَ مُحَمَّداًصلى‌الله‌عليه‌وآله نَذِيراً لِلْعَالَمِينَ - وأَمِيناً عَلَى التَّنْزِيلِ - وأَنْتُمْ مَعْشَرَ الْعَرَبِ عَلَى شَرِّ دِينٍ وفِي شَرِّ دَارٍ - مُنِيخُونَ بَيْنَ حِجَارَةٍ خُشْنٍ وحَيَّاتٍ صُمٍّ تَشْرَبُونَ الْكَدِرَ وتَأْكُلُونَ الْجَشِبَ وتَسْفِكُونَ دِمَاءَكُمْ وتَقْطَعُونَ أَرْحَامَكُمْ - الأَصْنَامُ فِيكُمْ مَنْصُوبَةٌ والآثَامُ بِكُمْ مَعْصُوبَةٌ

ومنها صفته قبل البيعة له فَنَظَرْتُ فَإِذَا لَيْسَ لِي مُعِينٌ إِلَّا أَهْلُ بَيْتِي - فَضَنِنْتُ بِهِمْ عَنِ الْمَوْتِ - وأَغْضَيْتُ عَلَى الْقَذَى وشَرِبْتُ عَلَى الشَّجَا وصَبَرْتُ عَلَى أَخْذِ الْكَظَمِوعَلَى أَمَرَّ مِنْ طَعْمِ الْعَلْقَمِ.

ومنها: ولَمْ يُبَايِعْ حَتَّى شَرَطَ أَنْ يُؤْتِيَه عَلَى الْبَيْعَةِ ثَمَناً - فَلَا ظَفِرَتْ يَدُ الْبَائِعِ وخَزِيَتْ أَمَانَةُ الْمُبْتَاعِ فَخُذُوا لِلْحَرْبِ أُهْبَتَهَا وأَعِدُّوا لَهَا عُدَّتَهَا - فَقَدْ شَبَّ لَظَاهَا وعَلَا سَنَاهَا واسْتَشْعِرُوا الصَّبْرَ فَإِنَّه أَدْعَى إِلَى النَّصْرِ.

নবুয়ত প্রকাশের পূর্বে আরবের অবস্থা সম্বন্ধে

আল্লাহ মুহাম্মদকে (সা.) জগতের সকল পাপের বিরুদ্ধে সতর্ককারী এবং তাঁর সকল প্রত্যাদেশের আমানতদার হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। সে সময়ে তোমরা (আরবের লোকেরা) একটা কদর্য ধর্মের অনুসারী ছিলে এবং তোমরা কদর্য পাথর (মূর্তি) ও বিদ্বেষ ভাবাপন্ন বিশ্বাসঘাতকদের মাঝে বাস করতে। তোমরা নোংরা পানি (মদ) পান করতে এবং অপবিত্র খাবার খেতে। তোমরা একে অপরের রক্তপাত ঘটাতে এবং আত্মীয়তার বন্ধনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে না । তোমরা সকলে প্রতিমা পূজা করতে এবং সর্বদা পাপে ডুবে থাকতে ।

রাসূলের ইনতিকালের পর আমি লক্ষ্য করে দেখলাম আমার পরিবার পরিজন ছাড়া আমার আর কোন সমর্থক নেই ,তাই আমার অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমি তাদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিতে বিরত রইলাম। পরিস্থিতি আমার চোখে ধুলিকণার মত বিধা সত্ত্বেও আমি আমার চোখ বন্ধ রাখলাম ,গলার শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা সত্ত্বেও আমি পান করলাম ,আমার শ্বাস - প্রশ্বাসে বিঘ্ন হওয়া এবং তিক্ত খাদ্য পাওয়া সত্ত্বেও আমি ধৈর্য ধারণ করলাম।

মুয়াবিয়া যথেষ্ট মূল্য দিয়ে আমর ইবনে আ 'সের বায়াত আদায় করেছে। এহেন বায়াত ক্রেতার হাত কৃতকার্য নাও হতে পারে এবং বিক্রেতাগণের চুক্তি অসম্মানজনকও হতে পারে। এখন তোমরা যুদ্ধের জন্য অস্ত্র ধারণ কর এবং নিজেদের সাজ - সরঞ্জামের ব্যবস্থা কর। যুদ্ধের শিখা অনেক উচুতে উঠেছে এবং তার ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। নিজকে ধৈর্যের পোষাক পরাও কারণ ধৈর্য জয় অপেক্ষা উত্তম।

____________________

১ । নাহরাওয়ানের যুদ্ধে যাত্রার প্রাক্কালে আমিরুল মোমেনিন এ খোৎবা প্রদান করেছিলেন। আমর ইবনে আসের বিষয়টি হলো আমিরুল মোমেনিনের অনুকূলে মুয়াবিয়ার বায়াত গ্রহণের জন্য তিনি যারীর ইবনে আবদুল্লাহ বাযালীকে মুয়াবিয়ার নিকট প্রেরণ করেছিলেন। মুয়াবিয়া যারীরকে জবাব দানের কথা বলে বিলম্ব করিয়েছিল। সিরিয়ার জনগণ ,মুয়াবিয়াকে কতটুকু সমর্থন করে তা সে ইতোমধ্যে পরীক্ষা করতে লাগলো। মুয়াবিয়া উসমানের রক্তের বদলা নেয়ার কথা বলে সিরিয়ার জনগণকে তার সমর্থক করতে সক্ষম হলো। তখন সে তার ভাই উতবাহ ইবনে আবু সুফিয়ানকে ডেকে আলোচনা করলো। উত্বাহ পরামর্শ দিল , যদি আমর ইবনে আস তোমার সাথে যোগ দেয়। তবে সে তার বিচক্ষণতা দ্বারা অনেক সমস্যার সমাধান করতে পারবে। কিন্তু উচ্চ মূল্য না পেলে সে তোমার কর্তৃত্ব মেনে নেবে না। যদি তুমি যথেষ্ট মূল্য প্রদান কর তবে সে সেরা সাহায্যকারী ও পরামর্শদাতা হবে। উতবাহর পরামর্শ মুয়াবিয়ার ভালো লেগেছিল। সে আমর ইবনে আসকে ডেকে পাঠালো এবং উভয়ের মধ্যে আলোচনা হলো। উভয়ের মধ্যে এ শর্তে চুক্তি হলো যে ,ইবনে আসকে মিশরের গভর্ণর করা হবে ; বিনিময়ে সে উসমানের হত্যার জন্য আমিরুল মোমেনিনকে দায়ী করে সিরিয়ায় মুয়াবিয়ার কর্তৃত্ব অক্ষুন্ন রাখবে এবং তারা এ চুক্তি পরিপূর্ণ করেছিল।

খোৎবা- ২৭

وفيها يذكر فضل الجهاد، ويستنهض الناس، ويذكر علمه بالحرب

أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ الْجِهَادَ بَابٌ مِنْ أَبْوَابِ الْجَنَّةِ - فَتَحَه اللَّه لِخَاصَّةِ أَوْلِيَائِه وهُوَ لِبَاسُ التَّقْوَى - ودِرْعُ اللَّه الْحَصِينَةُ وجُنَّتُه الْوَثِيقَةُ - فَمَنْ تَرَكَه رَغْبَةً عَنْه أَلْبَسَه اللَّه ثَوْبَ الذُّلِّ وشَمِلَه الْبَلَاءُ - ودُيِّثَ بِالصَّغَارِ والْقَمَاءَةِ وضُرِبَ عَلَى قَلْبِه بِالإِسْهَابِ وأُدِيلَ الْحَقُّ مِنْه بِتَضْيِيعِ الْجِهَادِ - وسِيمَ الْخَسْفَ ومُنِعَ النَّصَفَ

أَلَا وإِنِّي قَدْ دَعَوْتُكُمْ إِلَى قِتَالِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ - لَيْلًا ونَهَاراً وسِرّاً وإِعْلَاناً - وقُلْتُ لَكُمُ اغْزُوهُمْ قَبْلَ أَنْ يَغْزُوكُمْ - فَوَاللَّه مَا غُزِيَ قَوْمٌ قَطُّ فِي عُقْرِ دَارِهِمْ إِلَّا ذَلُّوا - فَتَوَاكَلْتُمْ وتَخَاذَلْتُمْ - حَتَّى شُنَّتْ عَلَيْكُمُ الْغَارَاتُ ومُلِكَتْ عَلَيْكُمُ الأَوْطَانُ - وهَذَا أَخُو غَامِدٍ [و] قَدْ وَرَدَتْ خَيْلُه الأَنْبَارَ وقَدْ قَتَلَ حَسَّانَ بْنَ حَسَّانَ الْبَكْرِيَّ - وأَزَالَ خَيْلَكُمْ عَنْ مَسَالِحِهَا ولَقَدْ بَلَغَنِي أَنَّ الرَّجُلَ مِنْهُمْ كَانَ يَدْخُلُ - عَلَى الْمَرْأَةِ الْمُسْلِمَةِ والأُخْرَى الْمُعَاهِدَةِ فَيَنْتَزِعُ حِجْلَهَا وقُلُبَهَا

وقَلَائِدَهَا ورُعُثَهَا مَا تَمْتَنِعُ مِنْه إِلَّا بِالِاسْتِرْجَاعِ والِاسْتِرْحَامِ ثُمَّ انْصَرَفُوا وَافِرِينَ مَا نَالَ رَجُلًا مِنْهُمْ كَلْمٌ ولَا أُرِيقَ لَهُمْ دَمٌ - فَلَوْ أَنَّ امْرَأً مُسْلِماً مَاتَ مِنْ بَعْدِ هَذَا أَسَفاً - مَا كَانَ بِه مَلُوماً بَلْ كَانَ بِه عِنْدِي جَدِيراً - فَيَا عَجَباً عَجَباً واللَّه يُمِيتُ الْقَلْبَ ويَجْلِبُ الْهَمَّ - مِنَ اجْتِمَاعِ هَؤُلَاءِ الْقَوْمِ عَلَى بَاطِلِهِمْ - وتَفَرُّقِكُمْ عَنْ حَقِّكُمْ - فَقُبْحاً لَكُمْ وتَرَحاً حِينَ صِرْتُمْ غَرَضاً يُرْمَى - يُغَارُ عَلَيْكُمْ ولَا تُغِيرُونَ - وتُغْزَوْنَ ولَا تَغْزُونَ ويُعْصَى اللَّه وتَرْضَوْنَ - فَإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِالسَّيْرِ إِلَيْهِمْ فِي أَيَّامِ الْحَرِّ - قُلْتُمْ هَذِه حَمَارَّةُ الْقَيْظِ أَمْهِلْنَا يُسَبَّخْ عَنَّا الْحَرُّ وإِذَا أَمَرْتُكُمْ بِالسَّيْرِ إِلَيْهِمْ فِي الشِّتَاءِ - قُلْتُمْ هَذِه صَبَارَّةُ الْقُرِّ أَمْهِلْنَا يَنْسَلِخْ عَنَّا الْبَرْدُ - كُلُّ هَذَا فِرَاراً مِنَ الْحَرِّ والْقُرِّ - فَإِذَا كُنْتُمْ مِنَ الْحَرِّ والْقُرِّ تَفِرُّونَ - فَأَنْتُمْ واللَّه مِنَ السَّيْفِ أَفَرُّ!

يَا أَشْبَاه الرِّجَالِ ولَا رِجَالَ - حُلُومُ الأَطْفَالِ وعُقُولُ رَبَّاتِ الْحِجَالِ لَوَدِدْتُ أَنِّي لَمْ أَرَكُمْ ولَمْ أَعْرِفْكُمْ مَعْرِفَةً - واللَّه جَرَّتْ نَدَماً وأَعْقَبَتْ سَدَماً قَاتَلَكُمُ اللَّه لَقَدْ مَلأْتُمْ قَلْبِي قَيْحاً وشَحَنْتُمْ صَدْرِي غَيْظاً - وجَرَّعْتُمُونِي نُغَبَ التَّهْمَامِ أَنْفَاساً وأَفْسَدْتُمْ عَلَيَّ رَأْيِي بِالْعِصْيَانِ والْخِذْلَانِ - حَتَّى لَقَدْ قَالَتْ قُرَيْشٌ إِنَّ ابْنَ أَبِي

طَالِبٍ رَجُلٌ شُجَاعٌ - ولَكِنْ لَا عِلْمَ لَه بِالْحَرْبِ.

لِلَّه أَبُوهُمْ - وهَلْ أَحَدٌ مِنْهُمْ أَشَدُّ لَهَا مِرَاساً وأَقْدَمُ فِيهَا مَقَاماً مِنِّي - لَقَدْ نَهَضْتُ فِيهَا ومَا بَلَغْتُ الْعِشْرِينَ - وهَا أَنَا ذَا قَدْ ذَرَّفْتُ عَلَى السِّتِّينَ ولَكِنْ لَا رَأْيَ لِمَنْ لَا يُطَاعُ!

জনগণকে জিহাদে উদ্বুদ্ধকরণ

নিশ্চয়ই ,জিহাদ বেহেশতের দ্বারসমূহের একটা যা আল্লাহ তাঁর বিশেষ বন্ধুদের জন্য খুলে রেখেছেন। জিহাদ হচ্ছে তাকওয়ার পোষাক এবং আল্লাহর নিরাপত্তামূলক বর্ম ও বিশ্বস্ত ঢাল। কেউ জিহাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলে আল্লাহ তাকে অসম্মানের পোষাকে আবৃত করেন এবং বালামুসিবতের কাপড় পরিয়ে দেন। তখন নিদারুণ অপমান ও ঘৃণা তার সঙ্গী হয়ে পড়ে এবং তার হৃদয়কে (অজ্ঞতার) পর্দাবৃত করে দেয়া হয়। জিহাদের প্রতি বিমুখতার কারণে তার কাছ থেকে মহাসত্য অপসারণ করা হয়। ফলে সে কলঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং সে ন্যায় - বিচার থেকে বঞ্চিত হয়।

সাবধান ,এসব লোকের বিরুদ্ধে দিনে - রাতে ,গোপনে - প্রকাশ্যে সংগ্রাম করার জন্য আমি তোমাদের দৃঢ়কণ্ঠে আহবান করেছিলাম। তোমরা আক্রান্ত হবার পূর্বেই আক্রমণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিলাম। কারণ আল্লাহর কসম ,যারা নিজেদের ঘরের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছে তারা দারুণভাবে অমর্যাদাকর অবস্থায় পড়েছে। তোমরা নিজের দায়িত্ব অন্যের দিকে ঠেলে দিয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত একে অপরকে অপদস্থ করছো। তোমাদের নগরীসমূহ শত্রুরা দখল করেনিয়েছে। বনি ঘামিদের অশ্বারোহীগণ আল - আনবারে পৌঁছে গেছে এবং তারা হাসান ইবনে হাসান বকরীকে হত্যা করেছে। তোমাদের অশ্বারোহীদের তারা দূর্গ থেকে বিতাড়িত করেছে।

আমি জানতে পেরেছি তারা মুসলিম রমণী ও ইসলামের নিরাপত্তাধীন রমণীদের ইজ্জত হরণ করেছে এবং হাত ,পা ,গলা ও কান থেকে অলঙ্কারাদি ছিনিয়ে নিয়েছে। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজিউন (২ : ১৫৬) কুরআনের এ আয়াত উচ্চারণ করা ছাড়া রমণীকুল কোন কিছুই করতে পারেনি। নিজেদের কোন প্রকার ক্ষয়ক্ষতি বা প্রাণহানি ব্যতিরেকে তারা ধন - সম্পদ নিয়ে চলে গেছে। এ ঘটনার কারণে কোন মুসলিম যদি শোকে মরে যায় তাহলে তাকে দোষ দেয়া যাবে না ; বরং আমার কাছে তার মৃত্যু ওজর হয়ে থাকবে।

কী আশ্চর্য! কী আশ্চর্য! আল্লাহর কসম ,অন্যায় সাধনের জন্য তাদের একতা আর ন্যায়ের পথে তোমাদের অনৈক্য দেখে আমার হৃদয় ব্যথাতুর হয়ে পড়ে। শোক আর দুর্দশা তোমাদেরকে ঘিরে ধরেছে ,তোমরা এমন নিশানা হয়ে গেছ যেখানে তীর নিক্ষেপ করা যায় ,তোমরা নিহত হচ্ছে অথচ হত্যা করনা । তোমরা আক্রান্ত হচ্ছো অথচ আক্রমণ করনা। আল্লাহকে অমান্য করা হচ্ছে অথচ তোমরা তাতে রাজি হয়ে রয়েছো। যখন আমি গ্রীষ্কালে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদে এগিয়ে যেতে বলি তখন তোমরা বল এখন আবহাওয়া গরম - উত্তাপ প্রশমিত হওয়া পর্যন্ত সময় দিন। যখন আমি শীতকালে যাত্রা করতে বলি তখন তোমরা বল এখন খুব ঠান্ডা - শীত যাওয়া পর্যন্ত সময় দিন। এভাবে শীত - গ্রীষ্ম এড়ানোর চেষ্টা ওজর মাত্র। আল্লাহর কসম ,ঠাণ্ডা আর গরম থেকে তোমরা যেভাবে পালিয়ে যাচ্ছো ,তরবারি (যুদ্ধ) থেকে তোমরা আরো অধিক পালিয়ে যাবে।

ওহে ,তোমরা মনুষ্যরূপী ,আসলে মানুষ নও ,তোমাদের বুদ্ধিমত্তা শিশুর মতো এবং তোমাদের জ্ঞানের পরিধি পর্দার অন্তরালে আবদ্ধ নারীর মতো (যারা বর্হিজগতের কোন খোজ রাখে না) । তোমাদের সঙ্গে আমার দেখা না হলে বা তোমাদেরকে আমি না চিনলে কতই না ভালো হতো। আল্লাহর কসম তোমদের সাথে পরিচিতি আমার কাছে লজ্জা আর অনুশোচনার কারণ হয়ে রইলো। আল্লাহ তোমাদের সাথে যুদ্ধ করুন! তোমরা আমার হৃদয়কে দুঃখ ভারাক্রান্ত করেছো এবং আমার বক্ষে রোষের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছো। তোমরা আমাকে একের পর এক দুঃখের শরাব পান করিয়েছো। তোমরা আমার অবাধ্য হয়ে আমার সকল উপদেশ অমান্য করেছো এবং এমন এক অবস্থার সৃষ্টি করেছো যাতে কুরাইশগন বলাবলি করছে যে ,আবি তালিবের পুত্র বীর বটে কিন্তু যুদ্ধ কৌশল জানেনা। তাদের উপর আল্লাহর আশীর্বাদ ! যুদ্ধক্ষেত্রে আমার চেয়ে অধিক ক্ষিপ্র আর অভিজ্ঞ তাদের কেউ আছে কি ? জিহাদের ময়দানে আমার চেয়ে পুরাতন কোন ব্যক্তি আছে কি ? বিশ বছর বয়স না হতেই আমি অস্ত্র ধারণ করেছি। আজ ষাটত্তোর বয়সেও একই রকম শৌর্য নিয়ে আছি ; কিন্তু যাকে মান্য করা হয়না তার অভিমতের মুল্য কি ?

____________________

১। সিফফিনের যুদ্ধের পর মুয়াবিয়া চতুর্দিকে হত্যকাণ্ড ও রক্তপাত ঘটাতে থাকে। আমিরুল মোমেনিনের শাসনাধীন শহরগুলোতে অনধিকার প্রবেশ করে সে আক্রমণ করতে থাকে। হাইত , আনবার ও মাদাইন আক্রমণ করার জন্য আমিরুল মোমেনিন সুফিয়ান ইবনে আউফ ঘামিদীর নেতৃত্বে ছয় হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী প্রেরণ করেছিলেন। সুফিয়ান প্রথমে মাদাইন গমন করে শহরটি পরিত্যক্ত দেখে আনবারের দিকে অগ্রসর হন । আনবারে পাঁচশত সৈন্যের একটা রক্ষীবাহিনী রেখে সুফিয়ান চলে যান। কিন্তু মুয়াবিয়ার দুর্ধর্ষ বাহিনীর গতিরোধ করা এত ছোট বাহিনীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তবুও তাদের সাধ্যমতো তারা চেষ্টা করেছে। কিন্তু শত্রুর আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে , রক্ষী বাহিনীর প্রধান হাসান ইবনে হাসান বকরী ও অন্য ত্রিশজন নিহত হন। মুয়াবিয়ার বাহিনী আনবার লুণ্ঠন করে শহরটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে।

আমিরুল মোমেনিন এসব সংবাদ পেয়ে মিম্বারে উঠে জনগণকে জিহাদে অনুপ্রাণিত করার মানসে এ খোৎবা প্রদান করেন । কিন্তু তার আহবানে কেউ সাড়া না দেয়ায় তিনি বিরক্তি প্রকাশ করে মিম্বার থেকে নেমে পদব্রজে শত্রুর উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন এবং নুখায়লা নামক স্থান পর্যন্ত চলে গিয়েছিলেন। এ অবস্থা দেখে জনগণের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হলো এবং তারা আমিরুল মোমেনিনকে অনুসরণ করে নুখায়লায় উপস্থিত হলো। জনগণ আমিরুল মোমেনিনকে ঘিরে ধরলো এবং তাকে ফিরে যাবার জন্য অনুরোধ করতে লাগলো। অবশেষে তারা শত্রুর বিরুদ্ধে জিহাদে যাবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে চাপ প্রয়োগ করলে আমিরুল মোমেনিন ফিরে আসতে রাজি হলেন। তখন সাঈদ ইবনে কায়েস আট হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী নিয়ে আনবারের দিকে অগ্রসর হলেন। কিন্তু সুফিয়ান আনবার ত্যাগ করে চলে গেছে বলে সাঈদ শত্রুর মোকাবেলা না করেই ফিরে এসেছে। হাদীদ - বর্ণনা করেছেন - সাঈদ কুফায় ফিরে আসাতে আমিরুল মোমেনিন এত মর্মাহত হয়েছেন যে , কয়েকদিন তিনি মসজিদেও যাননি এবং মসজিদ সংলগ্ন ঘরের বারান্দায় বসে এ খোৎবা লিখে তার চাকর সা দকে দিয়েছিলেন যেন সে জনগণকে পড়ে শুনিয়ে দেয়। অপরপক্ষে মুবাররাদ বর্ণনা করেছেন যে , আমিরুল মোমেনিন যখন পদব্রজে নুখায়লাহ পৌছেন তখন তিনি একটা উচুস্থানে দাঁড়িয়ে এ ভাষণ দিয়েছিলেন (১ম খণ্ড , পৃঃ ১০৪ ১০৭) । ইবনে মায়ছামও এটা যুক্তিযুক্ত মনে করেন।

খোৎবা- ২৮

أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ الدُّنْيَا أَدْبَرَتْ وآذَنَتْ بِوَدَاعٍ - وإِنَّ الآخِرَةَ قَدْ أَقْبَلَتْ وأَشْرَفَتْ بِاطِّلَاعٍ أَلَا وإِنَّ الْيَوْمَ الْمِضْمَارَ وغَداً السِّبَاقَ - والسَّبَقَةُ الْجَنَّةُ والْغَايَةُ النَّارُ - أَفَلَا تَائِبٌ مِنْ خَطِيئَتِه قَبْلَ مَنِيَّتِه أَلَا عَامِلٌ لِنَفْسِه قَبْلَ يَوْمِ بُؤْسِه أَلَا وإِنَّكُمْ فِي أَيَّامِ أَمَلٍ مِنْ وَرَائِه أَجَلٌ - فَمَنْ عَمِلَ فِي أَيَّامِ أَمَلِه قَبْلَ حُضُورِ أَجَلِه - فَقَدْ نَفَعَه عَمَلُه ولَمْ يَضْرُرْه أَجَلُه - ومَنْ قَصَّرَ فِي أَيَّامِ أَمَلِه قَبْلَ حُضُورِ أَجَلِه - فَقَدْ خَسِرَ عَمَلُه وضَرَّه أَجَلُه - أَلَا فَاعْمَلُوا فِي الرَّغْبَةِ كَمَا تَعْمَلُونَ فِي الرَّهْبَةِ أَلَا وإِنِّي لَمْ أَرَ كَالْجَنَّةِ نَامَ طَالِبُهَا ولَا كَالنَّارِ نَامَ هَارِبُهَا - أَلَا وإِنَّه مَنْ لَا يَنْفَعُه الْحَقُّ يَضُرُّه الْبَاطِلُ - ومَنْ لَا يَسْتَقِيمُ بِه الْهُدَى يَجُرُّ بِه الضَّلَالُ إِلَى الرَّدَى - أَلَا وإِنَّكُمْ قَدْ أُمِرْتُمْ بِالظَّعْنِ ودُلِلْتُمْ عَلَى الزَّادِ - وإِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ اثْنَتَانِ اتِّبَاعُ الْهَوَى وطُولُ الأَمَلِ - فَتَزَوَّدُوا فِي الدُّنْيَا مِنَ الدُّنْيَا - مَا تَحْرُزُونَ بِه أَنْفُسَكُمْ غَداً.

ইহজগতের ক্ষণস্থায়ীত্ব ও পরকালের গুরুত্ব সম্পর্কে

নিশ্চয়ই ,ইহকাল পিছন ফিরে তার প্রস্থান ঘোষণা করছে এবং পরকাল অগ্রসরমান হয়ে তার উপস্থিতির জানান দিচ্ছে। মনে রাখবে ,আজই পরকালের জন্য প্রস্তুতি নেয়ার দিন এবং আগামীকাল যাত্রা করতে হবে। যারা আল্লাহর পথে অগ্রসর হয় তাদের স্থান বেহেশত ,আর যারা পিছনে পড়ে থাকে তাদের স্থান হলো দোযখ । এমন কেউ কি নেই যে মৃত্যুর পূর্বে তওবা করে ? এমন কেউ কি নেই যে কিয়ামতের পূর্বে কল্যাণকর কর্মসাধন করে ?

সাবধান ,তোমরা হয়তো আশায় বুক বেঁধে দিন গুনছো কিন্তু তোমাদের আশার পিছনে মৃত্যুদূত দন্ডায়মান। যে ব্যক্তি আশায় কালক্ষেপণ না করে মৃত্যুর পূর্বেই আমল করে তার আমল উপকারে আসে এবং মৃত্যু তার ক্ষতি সাধন করতে পারে না। আবার যে ব্যক্তি মৃত্যুর আগমনের পূর্বে আমল করতে ব্যর্থ হয় ,মৃত্যু তার জন্য ক্ষতিকর এবং তার লোকসানের অন্ত নেই। সাবধান ,মহা - আতঙ্কের সময় যেমন আমল কর ,সুখের সময়েও ঠিক তেমন আমল করো। নিশ্চয়ই ,কোন বেহেশত কামনাকারী ও দোযখের ভয়ে আতঙ্কগ্রস্থকে আমি ঘুমিয়ে থাকতে দেখি নি। মনে রেখো ,হক যার উপকারে আসেনি ,বাতিলের ভোগান্তি সে পোহাবে এবং হেদায়েত যাকে দৃঢ় রাখতে পারেনি ,গোমরাহি তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে নিয়ে যাবে।

সাবধান ,(সত্যের পথে থাকার জন্য) দৃঢ়ভাবে তোমাদেরকে আদেশ দেয়া হয়েছে এবং কিভাবে তোমরা যাত্রাপথের রসদ সংগ্রহ করবে। সে পথ সুস্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে। আমার ভীষণ ভয় হচ্ছে তোমরা তোমাদের কামনা - বাসনা সম্প্রসারিত করে তার অনুবর্তী হয়ে পড় কিনা। ইহকালেই রসদ সংগ্রহ কর যা তোমাদেরকে পরকালে রক্ষা করবে ।

খোৎবা- ২৯

أَيُّهَا النَّاسُ الْمُجْتَمِعَةُ أَبْدَانُهُمْ - الْمُخْتَلِفَةُ أَهْوَاؤُهُمْ كَلَامُكُمْ يُوهِي الصُّمَّ الصِّلَابَ وفِعْلُكُمْ يُطْمِعُ فِيكُمُ الأَعْدَاءَ – تَقُولُونَ فِي الْمَجَالِسِ كَيْتَ وكَيْتَ فَإِذَا جَاءَ الْقِتَالُ قُلْتُمْ حِيدِي حَيَادِ مَا عَزَّتْ دَعْوَةُ مَنْ دَعَاكُمْ - ولَا اسْتَرَاحَ قَلْبُ مَنْ قَاسَاكُمْ - أَعَالِيلُ بِأَضَالِيلَ وسَأَلْتُمُونِي التَّطْوِيلَ دِفَاعَ ذِي الدَّيْنِ الْمَطُولِ لَا يَمْنَعُ الضَّيْمَ الذَّلِيلُ - ولَا يُدْرَكُ الْحَقُّ إِلَّا بِالْجِدِّ - أَيَّ دَارٍ بَعْدَ دَارِكُمْ تَمْنَعُونَ - ومَعَ أَيِّ إِمَامٍ بَعْدِي تُقَاتِلُونَ - الْمَغْرُورُ واللَّه مَنْ غَرَرْتُمُوه - ومَنْ فَازَ بِكُمْ فَقَدْ فَازَ واللَّه بِالسَّهْمِ الأَخْيَبِ ومَنْ رَمَى بِكُمْ فَقَدْ رَمَى بِأَفْوَقَ نَاصِلٍ أَصْبَحْتُ واللَّه لَا أُصَدِّقُ قَوْلَكُمْ - ولَا أَطْمَعُ فِي نَصْرِكُمْ - ولَا أُوعِدُ الْعَدُوَّ بِكُمْ - مَا بَالُكُمْ مَا دَوَاؤُكُمْ مَا طِبُّكُمْ - الْقَوْمُ رِجَالٌ أَمْثَالُكُمْ - أَقَوْلًا بِغَيْرِ عِلْمٍ - وغَفْلةً مِنْ غَيْرِ وَرَعٍ - وطَمَعاً فِي غَيْرِ حَقٍّ!؟

জিহাদের সময় যারা মিথ্যা ওজর দেখিয়েছিল তাদের সম্বন্ধে

হে লোকসকল ,তোমরা শারীরিকভাবে ঐক্য দেখালেও তোমাদের মন - মানস ও কামনা বিবিধমুখি । তোমাদের কথায় কঠিন পাথর গলে যায় এবং তোমাদের কার্যকলাপ দেখে শত্রুপক্ষ প্রলুব্ধ হয়। তোমরা বসে বসে বাগাড়ম্বর কর ,এটা করবে ,ওটা করবে ; অথচ যুদ্ধ আরম্ভ হলেই নিরাপদ দূরত্বে শটকে পড়। কেউ সাহায্যের জন্য আহবান করলে তোমরা কর্ণপাত কর না । তোমাদের সাথে কঠোর আচরণ করেও কোন লাভ হয় না। তোমরা এমন সব ভ্রান্ত ওজর দাঁড় করাও যেন খাতক তার ঋণ পরিশোধ করতে চায় না। অপদস্ত লোক কখনো নির্যাতন প্রতিহত করতে পারে না। কঠোর প্রচেষ্টা ছাড়া সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করা যায় না। এ ঘর ছাড়া আর কোনটি তোমরা রক্ষা করবে ? আমার পরে কোন ইমামের নেতৃত্বে তোমরা যুদ্ধ করবে ?

আল্লাহর কসম ,তোমরা আমাকে প্রতারণা করতে গিয়ে নিজেরাই প্রতারিত হচ্ছো এবং সেও তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়ী হবে যে যুদ্ধক্ষেত্রে অকেজো তীর কুড়িয়ে জড়ো করে। তোমরা হলে শত্রুর উপর নিক্ষিপ্ত ভাঙ্গা তীরের মতো। আল্লাহর কসম ,বর্তমানে আমার অবস্থা এমন হয়েছে যে ,আমি না। পারি তোমাদের অভিমত গ্রহণ করতে ,না পারি তোমাদের সাহায্য বা সমর্থনের আশা করতে ,আর না পারি তোমাদেরকে নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে। তোমাদের হয়েছেটা কী ,শুনি ? তোমরা কি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছে ? তোমাদের রোগ নিরাময়ের উপায় কী ? বিরুদ্ধপক্ষও তোমাদের মতোই মানুষ কিন্তু বৈশিষ্ট্যে তারা তোমাদের চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। তোমরা কি কাজের চেয়ে কথাই বেশি বলতে থাকবে ? পরহেজগারি ছেড়ে গাফেল হয়ে থাকবে ? তোমরা কি (ন্যায়ের পথে) কাজ না করার প্রতি আসক্ত হয়েই থাকবে ?

____________________

১। নাহরাওয়ানের যুদ্ধের পর মুয়াবিয়া দাহহাক ইবনে কায়েস ফিহরীকে চার হাজার সৈন্যসহ কুফা এলাকায় প্রেরণ করেনির্দেশ দেয় যে , তারা যেন ওই এলাকায় সন্ত্রাস সৃষ্টি করে সর্বদা গোলযোগ লাগিয়ে রাখে , যাকে পায় হত্যা করে , রক্তপাত ও ধ্বংসযজ্ঞ এমনভাবে অব্যাহত রাখে যাতে আমিরুল মোমেনিন শান্তি ও মানসিক স্বস্তি না পান। দাহহাক এ উদ্দেশ্য সাধনে তৎপর হয়ে নিরীহ জনগণের রক্তপাত ঘটিয়ে একের পর এক এলাকা ধ্বংসস্তুপে পরিণত করে আছ - ছালাবিয়া নামক স্থানে উপনীত হলো। এখানে সে একটা হজযাত্রী কাফেলার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের সর্বস্ব লুণ্ঠন করেনিয়ে গেছে। তারপর সে কুতকুতানাহ এলাকায় প্রবেশ করে রাসূলের (সা.) সাহাবা আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসুদের ভ্রাতুষ্পুত্র আমর ইবনে উয়ায়েজ ও তার সঙ্গীদের হত্যা করেছিল। এভাবে সে চতুর্দিকে রক্তপাত ও ব্যাপক ধ্বংস সাধন করে চলেছিল। আমিরুল মোমেনিন সংবাদ পেয়ে নিজের লোকদের ডেকে এহেন বর্বরতা প্রতিহত করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে বললেন। কিন্তু তারা এমন ভাব দেখালো যেন তারা যুদ্ধ এড়িয়ে চলতে চায়। তাদের আচরণে আমিরুল মোমেনিন বিরক্ত হয়ে এ ভাষণ দেন। ভ্রান্ত ও খোড়া ওজর না দেখিয়ে মাতৃভূমি রক্ষার পবিত্র দায়িত্ব তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন। অবশেষে হাজার ইবনে আল - কিন্দি চার হাজার সৈন্য নিয়ে তাদমুর নামক স্থানে শক্রকে রুখে দাঁড়ালো। অল্পক্ষণ মোকাবেলার পর শত্রুপক্ষ পালিয়ে গেল। এ যুদ্ধে শত্রুপক্ষের উনিশ জন নিহত হয়েছে এবং আমিরুল মোমেনিনের পক্ষের দুজন শহিদ হয়েছে।

খোৎবা- ৩০

لَوْ أَمَرْتُ بِه لَكُنْتُ قَاتِلًا - أَوْ نَهَيْتُ عَنْه لَكُنْتُ نَاصِراً - غَيْرَ أَنَّ مَنْ نَصَرَه لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَقُولَ خَذَلَه مَنْ أَنَا خَيْرٌ مِنْه - ومَنْ خَذَلَه لَا يَسْتَطِيعُ أَنْ يَقُولَ نَصَرَه مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنِّي - وأَنَا جَامِعٌ لَكُمْ أَمْرَه اسْتَأْثَرَ فَأَسَاءَ الأَثَرَةَ وجَزِعْتُمْ فَأَسَأْتُمُ الْجَزَعَ ولِلَّه حُكْمٌ وَاقِعٌ فِي الْمُسْتَأْثِرِ والْجَازِعِ.

উসমানের হত্যার প্রকৃত ঘটনা প্রকাশ করে আমিরুল মোমেনিন বলেনঃ

আমি যদি তাকে হত্যা করার আদেশ দিয়ে থাকি তা হলে আমিই হত্যাকারী। আর আমি যদি হত্যাকান্ডে অন্যদের বাধা দিয়ে থাকি তবে আমি তার সাহায্যকারী ছিলাম। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে ,যে ব্যক্তি তাকে সাহায্য করেছে। সে এখন আর বলতে পারে না যে ,সে ওই ব্যক্তি অপেক্ষা উত্তম যে তাকে পরিত্যাগ করে চলে গিয়েছিল। আবার যে তাকে পরিত্যাগ করেছিল সেও বলতে পারে না যে ,সে তার সাহায্যকারী অপেক্ষা উত্তম। আমি তার বিষয়াবলী তোমাদের কাছে খুলে বলছি। সে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে এবং সম্পদ আত্মসাৎ করেছে। এ কাজগুলো সে অত্যন্ত ন্যাক্কার জনক ভাবে করেছিল। তোমরা তার এসব কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেছো । কিন্তু তাতে অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেলেছো। সম্পদ আত্মসাৎকারী ও প্রতিবাদীদের মধ্যে যা ঘটেছে তার প্রকৃত সত্য আল্লাহই জানেন।

____________________

১ । উসমান ইবনে আফফান উমাইয়া বংশের প্রথম খলিফা। তিনি সত্তর বছর বয়সে ১লা মুহররম ,২৪ হিজরি সনে খেলাফতে আরোহণ করেন। বার বছর মুসলিমদের শাসনকার্য পরিচালনার পর ৩৫ হিজরি সনের ১৮ জিলহজ্ব তারিখে জনগণের হাতে নিহত হন। হাশ্শ কাওকাবে তাকে সমাধিস্থ করা হয়।

এ সত্য অস্বীকার করার কোন জো নেই যে ,উসমানের দুর্বলতা এবং তার অফিসারগণের (যাদের প্রায় সকলেই ছিল উমাইয়া গোত্রের) কুকর্ম মূলত তার হত্যার কারণ। উসমানকে হত্যা করার জন্য মুসলিমগণের সর্বসম্মত ঐকমত্যের পিছনে আর কোন কারণ ছিল না। মুসলিমগণের মধ্যে তার ঘরের মুষ্টিমেয় কয়েকজন ছাড়া আর কেউ তাকে রক্ষার্থে এগিয়ে আসে নি। তাকে হত্যার সিদ্ধান্তকালে মুসলিমগণ তার বয়স ,তার জ্যেষ্ঠত্ব ,তার মান - সম্ভ্রম এমনকি রাসূলের বিশিষ্ট সাহাবা হওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করেছিল। কিন্তু তার কর্মকাণ্ড পরিস্থিতিকে এমনভাবে ঘোলাটে করেছিল যে ,তার প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে একটা লোকও তার পক্ষে মত প্রকাশ করেনি। রাসূলের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন সাহাবাগণের প্রতি যে হারে নির্যাতন আর বাড়াবাড়ি করা হয়েছিল তা বর্ণনাতীত এবং তাতেই আরব গোত্রগুলোর মধ্যে শোক ও ক্রোধের উত্তাল উর্মি বয়ে চলেছিল। প্রত্যেককেই ক্রুদ্ধ করা হয়েছিল এবং সকলেই ঘৃণাভরে তার ঔদ্ধত্য ও ভ্রান্ত ক্রিয়াকলাপ দেখে যাচ্ছিলো । আবু জর গিফারীকে নির্মমভাবে অপমান করা হয়েছিল এবং গিফার গোত্রকে বহিষ্কার করার ফলে তাদের বন্ধুগোত্রগুলো ক্ষিপ্ত হয়েছিল। আবদুল্লাহ ইবনে মাসুদকে নির্দয়ভাবে প্রহার করায় হুজায়েল গোত্র ও তাদের বন্ধুগোত্রগুলো রুষ্ট ছিল। আম্মার ইবনে ইয়াসিরের পাঁজরের হাড় ভেঙ্গে দেয়ায় বনি মাখজুম ও তাদের বন্ধু বনি জুহরাহ ক্রোধে বারুদ হয়েছিল। মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরকে হত্যার ষড়যন্ত্র করায় বনি তায়েম ক্ষিপ্ত ছিল। এসব গোত্রের হৃদয়ে সর্বদা প্রতিশোধের ঝড় বইতো। অন্যান্য শহরের মুসলিমগণ উসমানের অফিসারদের হাতে নিগৃহীত হয়ে অসংখ্য অভিযোগ করেছিল। কিন্তু অভিযোগগুলোকে কখনো পাত্তা দেয়া হয়নি। অফিসারগণ সম্পদ আর জাকজমকের নেশায় যা ইচ্ছে তা করে বসতো। এমন কি যাকে খুশী যখন তখন অপমানিত ,লাঞ্ছিত ও ধ্বংস করে দিত। রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে কোন প্রকার তদন্ত বা শাস্তির ভয় তাদের ছিল না। তাদের অত্যাচারের যাতাকল থেকে নিস্কৃতি পাবার জন্য মানুষ চিৎকার করে কেঁদেছিলো কিন্তু তাদের কান্না শোনার মতো কেউ ছিল না। মানুষের মাঝে ঘৃণা আর অসন্তোষ ধূমায়িত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু এ রোষানল প্রশমিত করার মতো কেউ ছিল না। রাসূলের সাহাবাগণ যখন দেখলেন শান্তি বিনষ্ট হয়ে গেছে ,প্রশাসনে মারত্মক বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে এবং ইসলামের মূল বৈশিষ্ট্য পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে তখন তারা ক্ষোভে দুঃখে দারুণ বিরক্ত হয়ে পড়লেন। দীনহীন ও বুভুক্ষু লোকেরা যখন এক টুকরো রুটির জন্য হাহাকার করছিলো ,উমাইয়া গোত্রের লোকেরা তখন সম্পদের স্তুপে গড়াগড়ি যাচ্ছিলো। খেলাফত পরিণত হয়েছিল উদরপূর্তি আর সম্পদ স্তুপীকরণের হাতিয়ারে। ফলে এসব অত্যাচারিত ,নির্যাতিত ,নিগৃহীত ও বুভুক্ষু জনগণ উসমানের হত্যার ক্ষেত্র তৈরি করতে পিছে পড়ে থাকেনি । খলিফার বিভিন্ন পত্র ও বার্তায় দেখা যায় যে ,কুফা ,বসরা ও মিশর থেকে বহু মানুষ তাদের সমস্যা নিয়ে মদিনায় জড়ো হয়েছিল এবং মদিনাবাসীদের সহানুভূতি অর্জনে সমর্থ হয়েছিল। মদিনাবাসীদের এহেন আচরণ দেখে উসমান মুয়াবিয়াকে লেখেছিলঃ

মদিনার জনগণ মতবিরোধী হয়ে গেছে ,আমার অনুগত থাকার বিশ্বাস ভঙ্গ করেছে এবং আনুগত্যের শপথ ভঙ্গ করেছে। কাজেই তুমি আমাকে দ্রুতগামী বলিষ্ঠ আশ্বারোহী সৈন্য পাঠাও।

এ পত্র পেয়ে মুয়াবিয়াহ যে কার্যক্রম গ্রহণ করেছে তা থেকে সাহাবাগণের অবস্থা অনেকটা অনুমেয়। ঐতিহাসিক তারাবী লিখেছেনঃ

যখন মুয়াবিয়ার হাতে উসমানের পত্রখানা পৌছলো তখন সে বিষয়টি গভীরভাবে চিন্তা করে। দেখলো এবং রাসূলের সাহাবাগণের বিরোধিতা প্রকাশ্যে করা সঠিক পদক্ষেপ বলে বিবেচনা করেনি কারণ মদিনীয় সাহাবাগণের ঐকমত্য সম্পর্কে সে ভালোভাবে অবগত ছিল।

এ সকল অবস্থার বিবেচনায় উসমানের হত্যাকে কতিপয় অতি উৎসাহী লোকের তাৎক্ষণিক অনুভূতির ফল মনে করে মুষ্টিমেয় বিদ্রোহীর উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিলে সত্যকে অবগুণ্ঠিত করা হবে মাত্র। উসমানের বিরোধিতা করার মতো ক্ষেত্রসমূহ মদিনাতেই তিনি সৃষ্টি করেছিলেন। যারা বাইরের থেকে এসেছিল তারা শুধু তাদের দুর্দশা লাঘবের দাবি নিয়েই মদিনায় জড়ো হয়েছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল অবস্থার উন্নতি সাধন করা - রক্তপাত বা হত্যা নয়। যদি তাদের অভিযোগ শোনা হতো তাহলে হয়তো রক্তপাত ঘটতো না ।

প্রকৃতপক্ষে যা ঘটেছিল তা হলো - উসমানের বৈমাত্রেয় ভাই আবদুল্লাহ ইবনে সা দ ইবনে আবি সারোহর (মিশরের গভর্ণর) অত্যাচারে মিশরের জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে মদিনায় এসে শহরের অদূরে জাকুশুব নামক উপত্যকায় অবস্থান নিয়েছিল। তাদের স্মারকলিপিসহ তারা একজন নেতৃস্থানীয় লোককে উসমানের নিকট প্রেরণ করে সা ’ দের অত্যাচার বন্ধ করার দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু উসমান মিশরবাসীর প্রেরিত লোকটিকে কোন জবাব না দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেয় এবং এসব বিষয় দেখার যোগ্য নয় বলে মনে করে। এ ঘটনার পর মিশরবাসীগণ চিৎকার করতে করতে মদিনা শহরে ঢুকে পড়েছিল এবং উসমানের অহংকার ,ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও দুর্ব্যবহারের কথা মদিনাবাসীকে জানিয়ে প্রতিকার চাইতে লাগলো। অপরদিকে বসরা ও কুফার যেসব লোক অভিযোগ নিয়ে মদিনায় এসেছিল তারাও মিশরবাসীদের সাথে যোগ দিয়েছিল। এমনিতেই মদিনার জনগণ ক্ষুব্ধ ছিল । ফলে মদিনাবাসীদের সহায়তায় বহিরাগতগণ উসমানের ঘরের দিকে অগ্রসর হয়ে ঘর অবরোধ করে ফেলেছিল।

অবশ্য এ অবরোধে খলিফার মসজিদে আসা যাওয়ায় কোন বাধা ছিল না। এ অবরোধের প্রথম শুক্রবারে উসমান তার খোৎবায় অবরোধকারীদের সাংঘাতিকভাবে তিরস্কার করে তাদের সন্ত্রাসী ও অপরাধী চক্র বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এতে জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে তার প্রতি নুড়ি - চিল নিক্ষেপ করেছিল যাতে তিনি মিম্বার থেকে পড়ে গিয়েছিলেন। কয়েকদিন পর অবরোধকারীরা তার মসজিদে আসা যাওয়া নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল।

পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতির দিকে যাচ্ছে দেখে ,যেভাবে পারা যায় ,অবরোধকারীদের সরিয়ে দিয়ে তাকে উদ্ধার করার জন্য উসমান আমিরুল মোমেনিনকে সনির্বন্ধ অনুরোধ করেছিলেন। আমিরুল মোমেনিন বললেন , যেখানে দেখা যাচ্ছে তাদের দাবি - দাওয়া ন্যায়সঙ্গত সেখানে কী শর্তে তাদেরকে সরে যেতে বলবো । ” উসমান বললেন , এ বিষয়ে আমি আপনাকে সর্বময় ক্ষমতা অর্পণ করলাম। আপনি যে শর্তে নিষ্পত্তি করবেন। আমি তা - ই মেনে নিতে বাধ্য থাকবো । ” ফলে আমিরুল মোমেনিন মিশরিয়দের সাথে সাক্ষাত করে বিস্তারিত আলোচনা করলেন। আলোচনায় স্থির হলো - মিশরে স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধের লক্ষ্যে আবদুল্লাহ ইবনে সা ’ দের পরিবর্তে মুহাম্মদ ফিরে এসে তাদের দাবির কথা জানালেন। উসমান নির্দ্বিধায় তাদের দাবি মেনে নিতে স্বীকৃত হলেন এবং বললেন , এসব বাড়াবাড়ি ও ঝামেলা - ঝক্কি সামলে উঠতে দিন কয়েক সময় লাগবে। ” আমিরুল মোমেনিন বললেন , মদিনাবাসীদের দাবি - দাওয়া সংক্রান্ত বিষয়ে সময় চাওয়া অবান্তর হবে ; তবে অন্যান্য এলাকার বিষয়ে খলিফার নির্দেশ পৌছানো পর্যন্ত সময় নেয়া যাবে। ” উসমান বললেন , মদিনার জন্যও অন্তত তিন দিন সময়ের প্রয়োজন। ” যা হোক ,মিশরিয়দের সাথে আলাপ - আলোচনা করে আমিরুল মোমেনিন সকল শর্তের দায় - দায়িত্ব নিজেই গ্রহণ করলেন এবং তার নির্দেশে তারা অবরোধ তুলে নিয়ে জাকুশুব উপত্যকায় ফিরে গেল। তাদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোক মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরকে সঙ্গে নিয়ে মিশরের উদ্দেশ্যে চলে গেল। বিষয়টি এখানে নিম্পত্তি হয়ে গেল ।

অবরোধ তুলে নেয়ার দ্বিতীয় দিনে মারওয়ান ইবনে হাকাম উসমানকে বললো , আপদ দূর হয়ে গেছে ,ভালোই হলো। কিন্তু অন্যান্য শহর থেকে লোকজন আসা বন্ধ করার জন্য এখন আপনাকে একটা বিবৃতি দিতে হবে যে - কিছু অবান্তর কথা শুনে কতিপয় লোক মদিনায় জড়ো হয়েছিল। যখন তারা জানতে পারলো তারা যা শুনেছে তা সম্পূর্ণ ভুল তখন তারা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে চলে গেছে। ” উসমান প্রথমতঃ এমন একটা ডাহা মিথ্যা কথা বলতে রাজি হননি। কিন্তু মারওয়ানের প্ররোচনায় শেষ পর্যন্ত তিনি মসজিদ - ই - নববীতে বললেনঃ

মিশরিয়গণ তাদের খলিফা সম্পর্কে কতিপয় সংবাদ পেয়েছিল এবং যখন তারা সন্তোষজনকভাবে জানতে পারলো যে ,এসব কথা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তখন তারা নিজ শহরে ফিরে চলে গেছে।

“ উসমানের বক্তব্য শোনা মাত্র মসজিদে হৈ চৈ পড়ে গেল এবং মানুষ চিৎকার করে উসমানকে বলতে লাগলো , তওবা করুন ; আল্লাহকে ভয় করুন ,একি ডাহা মিথ্যা আপনার মুখ দিয়ে বের হচ্ছে। ” জনগণের চাপের মুখে সেদিন উসমান তওবা করে কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে বিলাপ করে আল্লাহর দরবারে কান্না - কাটি করে ঘরে ফিরে গেলেন ।

এ ঘটনার পর আমিরুল মোমেনিন উসমানকে উপদেশ দিয়ে বললেন , তোমার অতীত কুকর্মের জন্য সর্বসমক্ষে তওবা করা উচিত। তাতে এহেন বিদ্রোহ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। নচেৎ আগামীতে অন্য কোন এলাকার জনগণ বিদ্রোহী হয়ে এলে তোমাকে উদ্ধার করার জন্য তুমি আমার ঘাড়ে চেপে পড়বে। ” ফলতঃ উসমান মসজিদ - ই - নববীতে একটা খোৎবা প্রদান করেনিজের ভুল স্বীকার করে তওবা করলেন এবং ভবিষ্যতে সতর্ক থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেন। তিনি জনগণের প্রতিনিধিকে তার সাথে দেখা করার পরামর্শ দিলেন এবং জনগণের দাবি পূরণ ও তাদের দুঃখ - দুর্দশা দূরীভূত করার অঙ্গীকার করলেন। এতে জনগণ সন্তুষ্ট হয়ে তাদের মনের খারাপ অনুভূতি মুছে ফেলে উসমানের এ কাজের প্রশংসা করতে লাগলো। মসজিদ থেকে ঘরে ফেরার সঙ্গে সঙ্গে মারওয়ান উসমানকে কিছু বলার জন্য এগিয়ে গেলে উসমানের স্ত্রী নাইলাহ্ বিনতে ফারাফিসাহ বাধা দিয়ে বললো , আল্লাহর দোহাই ,তুমি চুপ কর। তুমি এমন সব কথা বলবে যা ওনার মৃত্যু ডেকে আনবে। ” মারওয়ান বিরক্ত হয়ে বললো , এসব বিষয়ে আপনার মাথা ঘামানো উচিত নয়। আপনি এমন এক লোকের কন্যা যে কোন দিন অজু করতেও শেখেনি। ” তাদের উভয়ের কথাবার্তা তিক্ততার দিকে যাচ্ছে দেখে উসমান উভয়কে থামিয়ে দিয়ে মারওয়ানকে তার কথা বলার অনুমতি দিলেন। মারওয়ান বললো , মসজিদে আপনি এসব কী কথা বললেন আর কিসেরই বা তওবা করলেন ? আমার মতে এ ধরনের তওবা অপেক্ষা পাপে লিপ্ত থাকা হাজার গুণ শ্রেয় । কারণ পাপ যত বেশিই হোক না কেন তাতে তওবার পথ সর্বদা খোলা আছে কিন্তু চাপের মুখে তওবা করা কোন তওবা - ই নয়। আপনি সরল বিশ্বাসে কথা বলেছেন। কিন্তু আপনার প্রকাশ্য ঘোষণার ফলাফল দেখুন - জনতা আপনার দুয়ারে হাজির হয়েছে ,এখন তাদের দাবি - দাওয়া পূরণ করুন। ” উসমান বললেন , ঠিক আছে ,আমি যা বলেছি - বলেছিই ; এখন তুমি জনগণকে ঠেকাও ৷ তাদের সাথে কথা বলা আমার সাধ্যাতীত। ” মারওয়ান এ সুযোগ হাত ছাড়া করলো না। সে বেরিয়ে এসে জনগণকে সম্বোধন করে বললো , তোমরা কেন এখানে জড়ো হয়েছে ? তোমরা কি লুটপাট করার জন্য আক্রমণ করতে চাও ? মনে রেখো ,তোমরা এত সহজে আমাদের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিতে পারবে না। তোমরা আমাদেরকে পরাভূত করতে পারবে ,এ ধারণা তোমাদের মন থেকে মুছে ফেল। কেউ বল প্রয়োগ করে আমাদেরকে অধীনস্থ করতে পারবে না। তোমাদের কৃষ্ণকায় চেহারা নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। আল্লাহ তোমাদেরকে অপমানিত করুন এবং তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমরা বঞ্চিত হও। ”

জনগণ এহেন পরিবর্তিত রূপ দেখে রোষে ফেটে পড়লো এবং সোজা আমিরুল মোমেনিনের কাছে গিয়ে হাজির হলো। আমিরুল মোমেনিন সব কথা শুনে অত্যন্ত বিরক্ত হলেন এবং তৎক্ষণাৎ উসমানের কাছে গিয়ে বললেন , হায় আল্লাহ ,তুমি মুসলিমদের সাথে একি দুর্ব্যবহার করলে! একজন বেইমান ও চরিত্রহীনের জন্য তুমি নিজেই ইমান পরিত্যাগ করলে! তোমার সব বোধশক্তি যেন হারিয়ে গেছে। অন্ততঃপক্ষে তুমি তোমার প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রক্ষা করতে। এটা কেমন কথা যে ,মারওয়ানের সকল কুকর্ম তুমি চোখ বুজে মেনে নিচ্ছ। মনে রেখো ,সে তোমাকে এমন অন্ধকার কুপে নিক্ষেপ করবে। যেখান থেকে তুমি আর বেরিয়ে আসতে পারবে না। তুমি মারওয়ানের বাহনে পরিণত হয়েছ। কাজেই সে তোমাতে চড়ে যেমন খুশি তেমন করছে। তার ইচ্ছানুযায়ী তোমাকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। ভবিষ্যতে আমি তোমার এসব কাজ কারবার সম্বন্ধে কোন কথাই বলবো না। এখন তুমি তোমার কাজ সামাল দাও ” ।

এসব কথা বলে আমিরুল মোমেনিন চলে এলেন এবং নাইলাহ সুযোগ পেয়ে উসমানকে বললো , আমি কি তোমাকে মারওয়ানের কাছ থেকে দূরে থাকতে বলি নি ? সে তোমাকে এমন ফাঁদে আটকিয়ে দিতে সর্বশক্তি প্রয়োগ করছে যেটা থেকে তুমি বের হয়ে আসতে পারবে না। যে লোকটি সমাজে নিকৃষ্ট ও হীন প্রকৃতির তার পরামর্শ গ্রহণ করে তোমার কোন কল্যাণ হতে পারে না। এখনো সময় আছে আলীর শরনাপন্ন হও ,তার পরামর্শ গ্রহণ কর। তা না হলে এ বিশৃংখল অবস্থা সামলানো তোমার অথবা মারওয়ানের ক্ষমতা বহির্ভুত। ” উসমান এতে প্রভাবিত হলেন এবং আমিরুল মোমেনিনের কাছে একজন লোক পাঠালেন। কিন্তু আমিরুল মোমেনিন তার সাথে সাক্ষাত করতে রাজি হন নি। এসময় কোন অবরোধ ছিল না। কিন্তু চারিদিকে লোকজন ঘৃণায় রি রি করছিলো। কোন মুখে উসমান বাইরে আসবে ? অথচ বাইরে না এসে তার কোন উপায়ও ছিল না। ফলত গভীর রাতে তিনি চুপি চুপি আমিরুল মোমেনিনের নিকট এসে কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে তার সহায়হীনতা ও একাকীত্বের কথা বলে রোদন করতে লাগলেন। আমিরুল মোমেনিন বললেন , তুমি মসজিদ - ই - নববীতে জনগণের সম্মুখে দাঁড়িয়ে ওয়াদা করে তা ভঙ্গ করেছ। জনগণ তোমার কাছে গেলে তাদেরকে গালি - গালাজ করে তাড়িয়ে দিয়েছে। এটাই যখন তোমার প্রতিশ্রুতির অবস্থা তখন আমি কি করে তোমার ভবিষ্যৎ কথায় আস্থা রাখতে পারি। আমাকে তুমি বাদ দাও। তোমার কোন দায় - দায়িত্ব গ্রহণ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তোমার সামনে অনেক পথ খোলা আছে। তোমার ইচ্ছানুযায়ী যে কোন পথ অবলম্বন করতে পার। ” আমিরুল মোমেনিনের এসব কথা শুনে উসমান ফিরে এলেন এবং তার বিরুদ্ধে গোলযোগের জন্য আমিরুল মোমেনিনকে দোষারোপ করতে লাগলেন। তিনি প্রচার করতে লাগলেন , সকল গোলযোগ প্রশমিত করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আলী কিছুই করছেন না ।

ওদিকে যারা মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরকে নিয়ে মিশর অভিমুখে চলে গিয়েছিল তারা হিজাজ সীমান্ত অতিক্রম করে লোহিত সাগর উপকূলে আয়েলা নামক স্থানে পৌছে দেখতে পেল একজন লোক বহুদূরে এত দ্রুত উট হাঁকিয়ে যাচ্ছে যেন শত্রু তাকে তাড়া করছে। লোকটির চালচলন ও হাবভাব দেখে সকলের সন্দেহের উদ্রেক হয়। তারা তাকে কাছে ডেকে এনে পরিচয় জিজ্ঞেস করলো। উত্তরে সে বললো ,সে উসমানের দাস। তারা জিজ্ঞেস করলো ,কোথায় সে যাচ্ছিলো। সে বললো ,মিশরে। তারা আবার জিজ্ঞেস করলো ,কার কাছে যাচ্ছে। সে বললো ,মিশরের শাসনকর্তার কাছে। তারা বললো ,শাসনকর্তা তাদের সাথেই রয়েছে ; তবু কার কাছে সে যাচ্ছিলো। সে বললো ,আবদুল্লাহ ইবনে সা ’ দের কাছে। তারা জিজ্ঞেস করলো ,কোন পত্র আছে কিনা। সে অস্বীকার করলো। তারা জিজ্ঞেস করলো ,কি উদ্দেশ্যে সে যাচ্ছিলো। সে বললো ,তা তার জানা নেই। তারা লোকটির কাপড় - চোপড় তল্লাশি করে কিছুই পেল না। তাদের মধ্যে কিনানাহ ইবনে বিশর তুজিবী বললো , লোকটির পানির মশক দেখা। ” অন্যরা হেসে উঠে বললো , তাকে ছেড়ে দাও । পানিতে কি করে পত্র রাখবে। ” কিনানাহ বললো , তোমরা জান না ,এরা কত ধূর্ত চাল চালতে পারে। ” ফলে পানির মশক তল্লাশি করে তাতে একটা সীসার নল পাওয়া গেল এবং সেই নলে একটা পত্র পাওয়া গেল। এ পত্রে খলিফার নির্দেশ লেখা ছিল - যখন মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর ও তার দল তোমার নিকট উপস্থিত হবে তখন তাদের মধ্যে অমুক অমুককে হত্যা করো ,অমুক অমুককে গ্রেপ্তার করো এবং অমুক অমুককে জেলে রেখো। তুমি তোমার পদে অধিষ্ঠিত থেকো। ” পত্র পড়ে সকলে হতভম্ব হয়ে গেল এবং তাজ্জব বনে গিয়ে একে অপরের মুখের দিকে তাকাতে লাগলো ।

তারা ভাবলো মিশরের দিকে এগিয়ে যাওয়া মানেই মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া। কাজেই তারা উসমানের দাসকে নিয়ে মদিনায় ফিরে এলো । মদিনায় এসেই তারা সাহাবাগণকে উসমানের পত্রখানা দেখালো। পত্র দেখে সকলেই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল এবং এমন কেউ বাকি রইল না যে উসমানকে গাল - মন্দ না করেছে। এরপর কয়েকজন সাহাবা মিশরিয়দের সঙ্গে নিয়ে উসমানের কাছে গেল। তারা জানতে চাইলো পত্রের গায়ে সীলটি কার । উসমান নির্দ্বিধায় বললো। ওটা তার নিজের সীল। তারা জানতে চাইলো পত্রখানা কার হাতের লেখা । উসমান জবাব দিলো ওটা তার সচিবের হাতের লেখা। তারা জিজ্ঞেস করলো ধূর্ত লোকটি কার দাস। তিনি বললেন ,দাসটি তার নিজের। তারা জিজ্ঞেস করলো ,লোকটিকে বহনকারী উটটি কার। তিনি জবাব দিলেন ,উটটি সরকারের। তারা জিজ্ঞেস করলো ,কে একে প্রেরণ করেছিল। তিনি উত্তর দিলেন তার জানা নেই। উপস্থিত জনগণ বললো ,"আশ্চর্য সব কিছু আপনার ; আর আপনি জানেন না কে তা প্রেরণ করেছে। আপনি যদি এতই অসহায় হয়ে থাকেন তবে খেলাফত ছেড়ে দিয়ে বেরিয়ে যান ,যাতে করে এমন একজন লোক আসতে পারেন যিনি মুসলিমদের বিষয়াদি পরিচালনা করতে পারবেন। ” তিনি বললেন , খেলাফতের এ পোষাক যেখানে আল্লাহ আমাকে পরিয়েছেন সেখানে এটা খুলে ফেলা কোনক্রমেই আমার পক্ষে সম্ভব নয়। অবশ্য ,আমি তওবা করবো। ” লোকেরা বললো , কেন আপনি তওবার কথা বলেন ; এইতো সেদিন আপনি অবজ্ঞাভরে তওবা ভঙ্গ করেছেন ,যে দিন আপনার দরজায় উপস্থিত জনগণকে আপনার প্রতিনিধি মারওয়ান গালাগালি দিয়ে অপমান করেছে। আপনি যা চেয়েছেন তা তো আপনার পত্রেই রয়েছে। আমরা আর কোন ধাপ্পাবাজিতে পড়তে চাই না। আপনি খেলাফত ছেড়ে দিন। আমাদের ভ্রাতৃগণ যদি আমাদের দাবি সমর্থন করে তবে আমরাও তাদেরকে সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসাবো। আর যদি তারা যুদ্ধ করতে চায়। তবে আমরাও প্রস্তুত আছি। আমাদের হাত এখানো আচল হয়ে যায় নি ,তরবারিও ভোতা হয়ে পড়েনি। যদি সকল মুসলিমের প্রতি আপনার সম্মানবোধ থেকে থাকে এবং ন্যায়ের প্রতি যদি আপনার সামান্যতম মনোযোগ থেকে থাকে। তবে মারওয়ানকে আমাদের হাতে তুলে দিন। আমরা তাকে জিজ্ঞেস করে দেখি কার শক্তি ও সমর্থনে সে মুসলিমদের মূল্যবান জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলে এমন পত্র লিখেছে। ” উসমান তাদের দাবি প্রত্যাখ্যান করে মারওয়ানকে তাদের সম্মুখে হাজির করতে অস্বীকৃতি জানালেন। এতে জনতার মনে বদ্ধমূল ধারণা হলো যে ,পত্রখানা উসমানের নির্দেশে লেখা হয়েছে।

শান্ত পরিবেশ আবার অশান্ত হয়ে উঠলো। যেসব বহিরাগত জাখুশুব উপত্যকায় অবস্থান করছিলো তারা স্রোতের মতো ছুটে এসে মদিনার রাস্তায় রাস্তায় ছড়িয়ে পড়লো এবং উসমানের ঘরে প্রবেশের পথ চতুর্দিক থেকে অবরোধ করে ফেললো। এ অবরোধ চলাকালে রাসূলের সাহাবা নিয়ার ইবনে ইয়াদ উসমানের সাথে কথা বলার ইচ্ছা পোষণ করে তার ঘরের সামনে গিয়েছিল। উসমান উপর থেকে উকি দিলে নিয়ার বললো , ওহে। উসমান ,আল্লাহর দোহাই খেলাফত ছেড়ে দিয়ে মুসলিমদেরকে রক্তপাত থেকে রক্ষা করুন। ” এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে উসমানের লোক তীর নিক্ষেপ করেনিয়ারকে হত্যা করলো। এতে জনতা আরো ক্ষিপ্ত হয়ে গেল এবং নিয়ারের হত্যাকারীকে তাদের হাতে সোপর্দ করার জন্য চিৎকার করতে লাগলো। উসমান সোজা জবাব দিলেন যে ,তার নিজের সমর্থককে তিনি তাদের হাতে তুলে দিতে পারবেন না। উসমানের এহেন একগুয়েমি আগুনে পাখার বাতাসের মতো কাজ করলো এবং প্রচণ্ড উত্তেজনায় জনতা তার দরজায় আগুন লাগিয়ে দিল এবং ভেতরে প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে যেতে লাগলো। এ অবস্থায় মারওয়ান ইবনে হাকাম ,সাইদ ইবনে আস ও মুঘিরাহ ইবনে আখনাস তাদের কিছু সৈন্য নিয়ে অবরোধকারীদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো এবং উসমানের দরজায় হত্যা ও রক্তপাত শুরু হয়ে গেল। একদিকে জনতা ঘরে প্রবেশ করার চেষ্টা করছে ,অপরদিকে উসমানের সৈন্যরা তাদের পিছনে হটিয়ে দিচ্ছে। উসমানের ঘর সংলগ্ন ঘরটি ছিল আমর ইবনে হাজম আল - আনসারীর। আমার তার ঘরের দরজা খুলে দিয়ে সেদিক দিয়ে অগ্রসর হবার জন্য অবরোধকারীদেরকে বললো। তারা সে পথে উসমানের ঘরের ছাদে উঠে গেল এবং উন্মুক্ত তরবারি হাতে ছাদ থেকে ভেতরে প্রবেশ করলো। কয়েক মুহুর্ত বিশৃংখল যুদ্ধের পর উসমানের তথাকথিত শুভাকাঙ্ক্ষীগণ তাকে ফেলে দৌড়ে রাস্তায় পালিয়ে গেল এবং কেউ কেউ উন্মে হাবিবা বিনতে আবি সুফিয়ানের ঘরে আত্মগোপন করলো। উসমানের পাশে যারা ছিল তাদের সকলকে উসমানের সাথে হত্যা করা হয়েছে। (সা দ ,৩য় খণ্ড ,পৃঃ ৫০ - ৫৮ ; তাবারী ,১ম খণ্ড ,পৃঃ ২৯৯৮ - ৩০২৫ ; আছীর ,৩য় খণ্ড ,পৃঃ ১৬৭ - ১৮০ ; হাদীদ ,২য় খণ্ড ,পৃঃ ১৪৪ - ১৬১)

এসব ঘটনা প্রবাহ থেকে আমিরুল মোমেনিনের অবস্থান সহজেই অনুমেয়। তিনি হত্যাকীদেরকে সমর্থনও দেননি আবার উসমানের প্রতিরক্ষার জন্য দন্ডায়মানও হননি। কারণ তিনি যখন দেখলেন উসমানের কথা ও কাজ এক নয় ,তখন তিনি নিজকে সম্পূর্ণ পৃথক করে রাখলেন।

খোৎবা - ৩১

لما أنفذ عبد الله بن عباس - إلى الزبير يستفيئه إلى طاعته قبل حرب الجمل

لَا تَلْقَيَنَّ طَلْحَةَ - فَإِنَّكَ إِنْ تَلْقَه تَجِدْه كَالثَّوْرِ عَاقِصاً قَرْنَه يَرْكَبُ الصَّعْبَ ويَقُولُ هُوَ الذَّلُولُ - ولَكِنِ الْقَ الزُّبَيْرَ فَإِنَّه أَلْيَنُ عَرِيكَةً فَقُلْ لَه يَقُولُ لَكَ ابْنُ خَالِكَ - عَرَفْتَنِي بِالْحِجَازِ وأَنْكَرْتَنِي بِالْعِرَاقِ - فَمَا عَدَا مِمَّا بَدَا.

জামালের যুদ্ধের প্রাক্কালে আমিরুল মোমেনিন আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে জুবায়ের ইবনে আওয়ামের নিকট প্রেরণ করেছিলেন যেন আনুগত্যে ফিরে আসার জন্য জুবায়েরকে সে উপদেশ দেয়। আবদুল্লাহকে তখন বলেছিলেনঃ

তালহা ইবনে উবায়দিল্লাহর সঙ্গে দেখা করো না। যদি তুমি দেখা কর তবে দেখবে সে একটা অবাধ্য ষাড়ের মত ,যার শিং বাকা হয়ে কানের দিকে চলে এসেছে। সে ভয়ানক অবাধ্য বাহনে আরোহন করে এবং বলে এটাকে পোষ মানানো হয়েছে। তুমি জুবায়েরের সাথে দেখা করো ,কারণ সে তুলনামূলকভাবে কোমল মেজাজের। তাকে বলো যে ,তোমার মামাত ভাই বলেন , হিজাজে তুমি আমাকে চিনেছিলে বা গ্রহণ করেছিলে ,কিন্তু ইরাকে তুমি আমাকে চেন না। তুমি আগে যা দেখিয়েছিলে কিসে তোমাকে তা থেকে বিরত করেছে।

খোৎবা - ৩২

وفيها يصف زمانه بالجور، ويقسم الناس فيه خمسة أصناف، ثم يزهد في الدنيا

أَيُّهَا النَّاسُ - إِنَّا قَدْ أَصْبَحْنَا فِي دَهْرٍ عَنُودٍ وزَمَنٍ - كَنُودٍ يُعَدُّ فِيه الْمُحْسِنُ مُسِيئاً - ويَزْدَادُ الظَّالِمُ فِيه عُتُوّاً - لَا نَنْتَفِعُ بِمَا عَلِمْنَا ولَا نَسْأَلُ عَمَّا جَهِلْنَا - ولَا نَتَخَوَّفُ قَارِعَةً حَتَّى تَحُلَّ بِنَا.

والنَّاسُ عَلَى أَرْبَعَةِ أَصْنَافٍ - مِنْهُمْ مَنْ لَا يَمْنَعُه الْفَسَادَ فِي الأَرْضِ - إِلَّا مَهَانَةُ نَفْسِه وكَلَالَةُ حَدِّه ونَضِيضُ وَفْرِه ومِنْهُمْ الْمُصْلِتُ لِسَيْفِه والْمُعْلِنُ بِشَرِّه - والْمُجْلِبُ بِخَيْلِه ورَجِلِه قَدْ أَشْرَطَ نَفْسَه وأَوْبَقَ دِينَه لِحُطَامٍ يَنْتَهِزُه أَوْ مِقْنَبٍ يَقُودُه أَوْ مِنْبَرٍ يَفْرَعُه - ولَبِئْسَ الْمَتْجَرُ أَنْ تَرَى الدُّنْيَا لِنَفْسِكَ ثَمَناً - ومِمَّا لَكَ عِنْدَ اللَّه عِوَضاً - ومِنْهُمْ مَنْ يَطْلُبُ الدُّنْيَا بِعَمَلِ الآخِرَةِ - ولَا يَطْلُبُ الآخِرَةَ بِعَمَلِ الدُّنْيَا - قَدْ طَامَنَ مِنْ شَخْصِه - وقَارَبَ مِنْ خَطْوِه وشَمَّرَ مِنْ ثَوْبِه - وزَخْرَفَ مِنْ نَفْسِه لِلأَمَانَةِ - واتَّخَذَ سِتْرَ اللَّه ذَرِيعَةً إِلَى الْمَعْصِيَةِ - ومِنْهُمْ مَنْ أَبْعَدَه عَنْ طَلَبِ الْمُلْكِ ضُئُولَةُ نَفْسِه وانْقِطَاعُ سَبَبِه فَقَصَرَتْه الْحَالُ عَلَى حَالِه - فَتَحَلَّى بِاسْمِ الْقَنَاعَةِ - وتَزَيَّنَ بِلِبَاسِ أَهْلِ الزَّهَادَةِ - ولَيْسَ مِنْ ذَلِكَ فِي مَرَاحٍ ولَا مَغْدًى

وبَقِيَ رِجَالٌ غَضَّ أَبْصَارَهُمْ ذِكْرُ الْمَرْجِعِ - وأَرَاقَ دُمُوعَهُمْ خَوْفُ الْمَحْشَرِ - فَهُمْ بَيْنَ شَرِيدٍ نَادٍّ وخَائِفٍ مَقْمُوعٍ وسَاكِتٍ مَكْعُومٍ ودَاعٍ مُخْلِصٍ وثَكْلَانَ مُوجَعٍ - قَدْ أَخْمَلَتْهُمُ التَّقِيَّةُ وشَمِلَتْهُمُ الذِّلَّةُ - فَهُمْ فِي بَحْرٍ أُجَاجٍ أَفْوَاهُهُمْ ضَامِزَةٌ وقُلُوبُهُمْ قَرِحَةٌ قَدْ وَعَظُوا حَتَّى مَلُّوا وقُهِرُوا حَتَّى ذَلُّوا وقُتِلُوا حَتَّى قَلُّوا.

فَلْتَكُنِ الدُّنْيَا فِي أَعْيُنِكُمْ - أَصْغَرَ مِنْ حُثَالَةِ الْقَرَظِ وقُرَاضَةِ الْجَلَمِ واتَّعِظُوا بِمَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ - قَبْلَ أَنْ يَتَّعِظَ بِكُمْ مَنْ بَعْدَكُمْ - وارْفُضُوهَا ذَمِيمَةً - فَإِنَّهَا قَدْ رَفَضَتْ مَنْ كَانَ أَشْغَفَ بِهَا مِنْكُمْ.

দুনিয়ার অবমূল্যায়ন ও মানুষের প্রকারভেদ সম্বন্ধে

হে লোকসকল ,আমরা এমন একটা বিভ্রান্তিকর ও অপ্রশংসনীয় সময়ে দিন কাটিয়ে যাচ্ছি। যখন ধার্মিকগণকে দুশ্চরিত্র মনে করা হয় এবং অত্যাচারী সীমালঙ্ঘন করে চলে। আমরা যা জানি তার দ্বারা যথাযথভাবে উপকৃত হই না ,আর যা জানি না সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে জেনে নিতে চাই না। বালা মুসিবত আপতিত হবার পূর্বে আমরা দুর্যোগকে ভয় করি না।

মানুষ চার শ্রেণির হয়ে থাকে। প্রথম শ্রেণি হচ্ছে তারা - যারা সম্পদের অভাবে ,উপায় - উপকরণের অভাবে ও সমাজে নিম্ন অবস্থানের (ক্ষমতার অভাবে) কারণে ফ্যাসাদ - বিবাদ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকে।

দ্বীতীয় শ্রেণি হচ্ছে তারা - যারা তরবারি উন্মুক্ত করে প্রকাশ্যে অন্যায় অবিচার করে এবং পদাতিক ও অশ্বারোহী সৈন্য সংগ্রহ করে এবং সম্পদ আহরণ ,ক্ষমতা দখল ও মিম্বারে আরোহণের জন্য নিজের দ্বীনকে বরবাদ করে। আল্লাহর কাছে যা রয়েছে তার পরিবর্তে দুনিয়া ক্রয় করা কতই না নিকৃষ্ট লেনদেন ।

তৃতীয় শ্রেণি হচ্ছে তারা - যারা পরকালের জন্য আমলের মাধ্যমে দুনিয়া অন্বেষণ করে (অর্থাৎ পার্থিব সুযোগ লাভের জন্য ধর্ম - কর্ম করে) । এরা ইহকালের ক্রিয়াকর্মের মাধ্যমে পরকালের মঙ্গল অন্বেষণ করে না। এরা নিজেদের দেহকে শান্ত - শিষ্ট রাখে ,ধীর পদক্ষেপে চলাফেরা করে ,বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য পোশাক - পরিচ্ছদে দেহকে সাজিয়ে রাখে এবং পাপ করার উপায় হিসেবে এমন অবস্থা দেখায় যেন সে আল্লাহর সাথে সম্পর্কযুক্ত (অর্থাৎ প্রকাশ্যে সাধু সেজে সৎ ব্যক্তির ছদ্মবেশে পাপে লিপ্ত থাকে) ।

চতুর্থ শ্রেণি হচ্ছে তারা - যারা দুর্বলতা ও উপায় - উপকরণের অভাবে রাজত্ব চাওয়া থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এতে তাদের অবস্থান হীন হয়ে রয়েছে ,আর তারা এ অবস্থাকে তৃপ্তি নাম দিয়েছে। তারা পরহেজগার ব্যক্তিদের আলখেল্লা পরিধান করে যদিও পরহেজাগারের গুণাবলীর সাথে তাদের কোন সম্পর্ক নেই।

এরপরও কিছু লোক থেকে যায় যারা ফেরত যাওয়াকে স্মরণ করে দৃষ্টি আনত রাখে এবং কেয়ামতের ভীতি তাদের চোখকে অশ্রুসিক্ত রাখে। তাদের কতেক লোক সমাজ থেকে ভয়ে সরে পড়েছে ও অদৃশ্য হয়ে রয়েছে ,কতেক ভয়ে বিহ্বল ও দমিত ,কতেক নিশ্চুপ যেন জন্তুর মুখবন্ধ মুখে আটা ,কতেক এখলাছের সাথে মানুষকে সত্যের দিকে আহবান করে এবং কতেক শোকাভিভূত ও দুঃখদুদর্শাগ্রস্ত। আত্মগোপনতা এদেরকে নামবিহীন করে দিয়েছে এবং সমাজে এদের কোন কদর নেই। সুতরাং তারা তিক্ত পানিতে বাস করে। তাদের মুখ বন্ধ এবং হৃদয় ভগ্ন ও ক্ষত বিক্ষত। তারা ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত মানুষকে নছিহত করেছে। তারা অপমানিত না হওয়া পর্যন্ত অত্যাচারিত হয়েছে এবং সংখ্যায় নগণ্য না হওয়া পর্যন্ত নিহত হয়েছে।

দুনিয়া তোমাদের চোখে বাবলা গাছের বাকল অথবা পশমের কর্তিত টুকরা অপেক্ষা মূল্যহীন হওয়া উচিত। তোমাদের পরবর্তীগণ তোমাদের কাছ থেকে উপদেশ গ্রহণ করার আগে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তীগণ থেকে উপদেশ গ্রহণ কর এবং দুনিয়াকে নিকৃষ্ট মনে করে তা থেকে দূরে থাকো। মনে রেখো ,দুনিয়ার সাথে যারা তোমাদের চেয়েও অধিক বন্ধুত্ব করেছে ,দুনিয়া তাদের সাথেও সম্পর্ক ছেদ করেছে।