নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা0%

নাহজ আল-বালাঘা লেখক:
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ: হযরত আলী (আ.)

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক: আশ-শরীফ আর-রাজী
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ:

ভিজিট: 48189
ডাউনলোড: 2249

নাহজ আল-বালাঘা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 48 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 48189 / ডাউনলোড: 2249
সাইজ সাইজ সাইজ
নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক:
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বাংলা

রাসূলের (সা.) ‘জ্ঞান নগরীর দ্বার’ আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী, দার্শনিক, সুলেখক ও বাগ্মী। আলঙ্কারিক শাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ও নৈপুন্য অসাধারণ। তিনি নবুওয়াতী জ্ঞান ভান্ডার হতে সরাসরি জ্ঞান আহরণ করেন এবং সাহাবাদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পন্ডিত ছিলেন। এতে কারো দ্বিমত নেই। আরবী কাব্যে ও সাহিত্যে তার অনন্যসাধারণ অবদান ছিল। খেলাফত পরিচালনা কালে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ (খোৎবা) দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকগণকে প্রশাসনিক বিষয়ে উপদেশ ও নির্দেশ দিয়ে পত্র লিখেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে মানুষের অনেক প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছিলেন। তার এসব বাণী কেউকেউ লিখে রেখেছিল, কেউ কেউ মনে রেখেছিল, আবার কেউ কেউ তাদের লিখিত পুস্তকে উদ্ধৃত করেছিল। মোটকথা তার অমূল্য বাণীসমূহ মানুষের কাছে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল।

আশ-শরীফ আর-রাজী আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিবের ভাষণসমূহ (খোৎবা), পত্রাবলী, নির্দেশাবলী ও উক্তিসমূহ সংগ্রহ করে “নাহজ আল-বালঘা” নামক গ্রন্থটি সঙ্কলন করেন।

খোৎবা- ৩৩

قَالَ عَبْدُ اللَّه بْنُ عَبَّاسِرضي‌الله‌عنه - دَخَلْتُ عَلَى أَمِيرِ الْمُؤْمِنِينَعليه‌السلام بِذِي قَارٍ وهُوَ يَخْصِفُ نَعْلَه فَقَالَ لِي مَا قِيمَةُ هَذَا النَّعْلِ - فَقُلْتُ لَا قِيمَةَ لَهَا - فَقَالَعليه‌السلام واللَّه لَهِيَ أَحَبُّ إِلَيَّ مِنْ إِمْرَتِكُمْ - إِلَّا أَنْ أُقِيمَ حَقّاً أَوْ أَدْفَعَ بَاطِلًا - ثُمَّ خَرَجَ فَخَطَبَ النَّاسَ فَقَالَ:

إِنَّ اللَّه بَعَثَ مُحَمَّداًصلى‌الله‌عليه‌وآله - ولَيْسَ أَحَدٌ مِنَ الْعَرَبِ يَقْرَأُ كِتَاباً ولَا يَدَّعِي نُبُوَّةً - فَسَاقَ النَّاسَ حَتَّى بَوَّأَهُمْ مَحَلَّتَهُمْ وبَلَّغَهُمْ مَنْجَاتَهُمْ - فَاسْتَقَامَتْ قَنَاتُهُمْ واطْمَأَنَّتْ صَفَاتُهُمْ

أَمَا واللَّه إِنْ كُنْتُ لَفِي سَاقَتِهَاحَتَّى تَوَلَّتْ بِحَذَافِيرِهَا مَا عَجَزْتُ ولَا جَبُنْتُ وإِنَّ مَسِيرِي هَذَا لِمِثْلِهَا - فَلأَنْقُبَنَّ الْبَاطِلَ حَتَّى يَخْرُجَ الْحَقُّ مِنْ جَنْبِه.

আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস বলেন যে ,আমিরুল মোমেনিন যখন বসরার লোকদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য বেরিয়ে এলেন তখন তিনি (আবদুল্লাহ) যিকার নামক স্থানে আমিরুল মোমেনিনের বক্তব্য শুনতে এসে দেখলেন আমিরুল মোমেনিন তার জুতা সেলাই করছেন। তিনি আমাকে (আবদুল্লাহকে) বললেন , এ জুতার দাম কত ” ? আমি বললাম , এটার এখন কোন মূল্য নেই ” । তিনি বললেন , আল্লাহর কসম ,আমি ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করেছি এবং ভ্রান্তি প্রতিহত করেছি ; শুধুমাত্র এ বিষয়টি ব্যতীত তোমাদের শাসনকার্য চালনা অপেক্ষা এ জুতা আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয়। ” এরপর তিনি মানুষের সম্মুখে বেরিয়ে এসে বললেনঃ

নিশ্চয়ই ,আল্লাহ মুহাম্মদকে (সা.) যখন পাঠিয়েছিলেন তখন আরবদের মধ্যে কেউ বই পড়তে পারতো না অথবা কেউ নবুয়ত দাবি করেনি। তিনি মানুষকে পথ প্রদর্শন করেছিলেন যে পর্যন্ত না তারা সঠিক পথে এসে মুক্তির সন্ধান পেয়েছে। ফলে ,তাদের নেতাগণ সোজা হয়ে গেল এবং তাদের অবস্থা নিরাপদ হলো ।

আল্লাহর কসম ,আমি তাদের নেতৃত্বে ছিলাম। যতক্ষণ পর্যন্ত না দেওয়ালসহ (ঘরটি) সুন্দর আকৃতি সম্পন্ন হয়েছিল। আমি কখনো কোন প্রকার দুর্বলতা বা ভীরুতা প্রদর্শন করিনি। আমার বর্তমান পদচারণাও পূর্ববৎ রয়েছে। আমি ভ্রান্তি আর অন্যায়কে ততক্ষণ পর্যন্ত ভেদ করতে থাকবো যতক্ষণ পর্যন্ত না উহার পার্শ্বদেশ হতে ন্যায় বেরিয়ে আসে।

কুরাইশদের সাথে আমার বিবাদের কারণ কী ? আল্লাহর কসম ,যখন ওরা ইমানহারা ছিল তখন আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এবং যদি তারা এখনো ভ্রান্ত পথ অনুসরণ করে তবে আমি তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবো। তাদের জন্য বিগত দিনে আমি যেমন ছিলাম আজো তেমনই থাকবো।

আল্লাহর কসম ,আমাদের প্রতি কুরাইশগণের বিদ্বেষপরায়ণতার কারণ হলো আল্লাহ আমাদেরকে (রাসূল ও তার আহলুল বাইত দ্বারা) তাদের ওপর প্রাধান্য ও মর্যাদা প্রদান করেছেন। সুতরাং আমরা তাদেরকে আমাদের রাজ্যে প্রবেশ করার অনুমতি দিয়েছিলাম এবং তাতে তাদের অবস্থা এমন হলো যেমন এক কবি বলেছেনঃ

আমার জীবনের কসম ,তুমি প্রতিভোরে তাজা দুধ পান করতে থাকো ,এবং মাখন দিয়ে উত্তম মানের খেজুর খেতে থাকো ; আমরা তোমাকে মহত্ত্ব দিয়েছি যা তোমার কোনদিন ছিল না ,এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ঘোড়া আর শক্ত তীর দ্বারা তুমি এখন প্ররক্ষিত

____________________

১। আমিরুল মোমেনিনের এ খোৎবাটি ফাদাক রাষ্ট্রায়ত্ব করায় রাসূলের (সা.) পবিত্র কন্যা ফাতিমা যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার মতই। ফাতিমা বলেছিলেনঃ

হে লোক সকল ,তোমরা দোষাখের অগ্নিকুন্ডের প্রান্তে ছিলে (কুরআন ,৩:১০৩) । তোমরা এক ঢোক পানির মতো নগণ্য ছিলে । তোমরা ছিলে মুষ্টিমেয় লোভী এবং দ্রুতগামীর ঝলকের মত সংখ্যালঘিষ্ট। তোমরা ছিলো পায়ের নিচের ধূলিকণার মতো পদদলিত। তোমরা নোংরা পানি পান করতে। তোমরা টেনিং না করা চামড়া খেতে । তোমরা ছিলে হীনমনা ও ঘৃণিত । আল্লাহ তোমাদেরকে আমার পিতা মুহাম্মদের (সা.) মাধ্যমে উদ্ধার করেছেন ।

খোৎবা- ৩৪

أُفٍّ لَكُمْ لَقَدْ سَئِمْتُ عِتَابَكُمْ -( أَرَضِيتُمْ بِالْحَياةِ الدُّنْيا مِنَ الآخِرَةِ ) عِوَضاً - وبِالذُّلِّ مِنَ الْعِزِّ خَلَفاً - إِذَا دَعَوْتُكُمْ إِلَى جِهَادِ عَدُوِّكُمْ دَارَتْ أَعْيُنُكُمْ كَأَنَّكُمْ مِنَ الْمَوْتِ فِي غَمْرَةٍ ومِنَ الذُّهُولِ فِي سَكْرَةٍ - يُرْتَجُ عَلَيْكُمْ حَوَارِي فَتَعْمَهُونَ وكَأَنَّ قُلُوبَكُمْ مَأْلُوسَةٌ فَأَنْتُمْ لَا تَعْقِلُونَ - مَا أَنْتُمْ لِي بِثِقَةٍ سَجِيسَ اللَّيَالِي ومَا أَنْتُمْ بِرُكْنٍ يُمَالُ بِكُمْ - ولَا زَوَافِرُ عِزٍّ يُفْتَقَرُ إِلَيْكُمْ - مَا أَنْتُمْ إِلَّا كَإِبِلٍ ضَلَّ رُعَاتُهَا - فَكُلَّمَا جُمِعَتْ مِنْ جَانِبٍ انْتَشَرَتْ مِنْ آخَرَ.

لَبِئْسَ لَعَمْرُ اللَّه سُعْرُ نَارِ الْحَرْبِ أَنْتُمْ - تُكَادُونَ ولَا تَكِيدُونَ - وتُنْتَقَصُ أَطْرَافُكُمْ فَلَا تَمْتَعِضُونَ لَا يُنَامُ عَنْكُمْ وأَنْتُمْ فِي غَفْلَةٍ سَاهُونَ - غُلِبَ واللَّه الْمُتَخَاذِلُونَ - وايْمُ اللَّه - إِنِّي لأَظُنُّ بِكُمْ أَنْ لَوْ حَمِسَ الْوَغَى واسْتَحَرَّ الْمَوْتُ قَدِ انْفَرَجْتُمْ عَنِ ابْنِ أَبِي طَالِبٍ انْفِرَاجَ الرَّأْسِ واللَّه إِنَّ امْرَأً يُمَكِّنُ عَدُوَّه مِنْ نَفْسِه - يَعْرُقُ لَحْمَه ويَهْشِمُ عَظْمَه - ويَفْرِي جِلْدَه لَعَظِيمٌ عَجْزُه - ضَعِيفٌ مَا ضُمَّتْ عَلَيْه جَوَانِحُ صَدْرِه أَنْتَ فَكُنْ ذَاكَ إِنْ شِئْتَ - فَأَمَّا أَنَا فَوَاللَّه دُونَ أَنْ أُعْطِيَ ذَلِكَ ضَرْبٌ بِالْمَشْرَفِيَّةِ تَطِيرُ مِنْه فَرَاشُ الْهَامِ وتَطِيحُ السَّوَاعِدُ والأَقْدَامُ -( ويَفْعَلُ الله ) بَعْدَ ذَلِكَ( مِمَّا يَشاءُ ) -

أَيُّهَا النَّاسُ - إِنَّ لِي عَلَيْكُمْ حَقّاً ولَكُمْ عَلَيَّ حَقٌّ - فَأَمَّا حَقُّكُمْ عَلَيَّ فَالنَّصِيحَةُ لَكُمْ - وتَوْفِيرُ فَيْئِكُمْ عَلَيْكُمْ - وتَعْلِيمُكُمْ كَيْلَا تَجْهَلُوا وتَأْدِيبُكُمْ كَيْمَا تَعْلَمُوا - وأَمَّا حَقِّي عَلَيْكُمْ فَالْوَفَاءُ بِالْبَيْعَةِ - والنَّصِيحَةُ فِي الْمَشْهَدِ والْمَغِيبِ - والإِجَابَةُ حِينَ أَدْعُوكُمْ والطَّاعَةُ حِينَ آمُرُكُمْ.

সিরিয়ার (শ্যাম) জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার প্রস্তুতির জন্য নিজের লোকদেরকে আমিরুল মোমেনিন বলেনঃ

দুর্ভাগ্য তোমাদের । তোমাদেরকে তিরস্কার করতে করতে আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। তোমরা কি পরকালের পরিবর্তে ইহকালের জীবনকেই অধিক পছন্দ করে বসেছো ? তোমরা কি মর্যাদাকর অবস্থার স্থলে অমর্যাদাকর অবস্থাকে অধিক ভালোবেসেছে ? শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য যখন আমি তোমাদের আহ্বান করি তখন তোমরা এমনভাবে চোখ ছানাবড়া কর মনে হয় যমদূতকে দেখেছো এবং মুমূর্ষ লোকের মতো সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়। আমি যতই তোমাদেরকে যুক্তিতর্ক দিয়ে বুঝাই তা তোমাদের বোধগম্য হয় না ; তোমরা হতবুদ্ধি অবস্থাতেই থাকো। তোমাদের হৃদয় যেন মত্ততায় আচ্ছন্ন ,তাই তোমারা কিছুই বোঝ না। তোমরা চিরতরে আমার আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। না তোমরা এমন অবলম্বন যাতে নির্ভর করা যায় ,আর না তোমরা এমন উপায় যার দ্বারা সম্মান ও বিজয় অর্জন করা যায়। তোমাদের উপমা হচ্ছে সেই উটের পালের মতো যার রাখাল পালিয়ে গেছে ,ফলে একদিকে কতগুলোকে একত্রিত করলে বাকিরা অন্যদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

আল্লাহর কসম ,যুদ্ধানল প্রজ্জ্বলনের জন্য তোমরা বড়ই মন্দ লোক। তোমরা গুপ্ত চক্রান্তের শিকার হচ্ছো কিন্তু শক্রকে তোমাদের চক্রান্তের শিকার করতে পারছো না। তোমাদের এলাকার সীমানা ক্রমেই সংকীর্ণ হয়ে আসছে অথচ তোমরা তাতে ক্রুদ্ধ হচ্ছো না। তোমাদের বিরুদ্ধ পক্ষের চোখে ঘুম নেই অথচ তোমরা অমনোযোগী। আল্লাহর কসম ,অন্যলোকে করবে বলে যারা কর্মসাধনে লিপ্ত হয় না তাদের জন্য পরাজয় অবধারিত। আল্লাহর কসম ,তোমাদের হাবভাব দেখে আমার এ বিশ্বাস জন্মেছে যে ,যদি যুদ্ধ বাঁধে এবং তোমরা তোমাদের চারদিকে মৃত লাশ দেখো তবে তোমরা আবি তালিবের পুত্রকে ধড় থেকে দ্বীখণ্ডিত মস্তকের মতো পরিত্যাগ করে কেটে পড়বে।

আল্লাহর কসম ,যে ব্যক্তি প্রতিপক্ষের জন্য এমন সুযোগ সৃষ্টি করে দেয় যাতে শত্রু তাকে পরাভূত করে ,মাংশ হাড় থেকে আলাদা করে ফেলে ,হাড়গোড় বিচূর্ণ করে দেয় ও চামড়া তুলে নেয় ,তার মতো নিঃসহায় আর কেউ নেই এবং বক্ষস্থলের অতি দুর্বল দিকে তার হৃদয় স্থাপিত। তোমরা ইচ্ছা করলে সেরকম দুর্বল ও নিঃসহায় হতে পার। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে আমি আল - মাশরাফিয়ার ধারালো তরবারির সদ্ব্যবহার করবো যা মাথার খুলি উড়িয়ে দেবে এবং হস্ত - পদ ব্যবচ্ছেদ করবে। তারপর আল্লাহ তাঁর ইচ্ছানুযায়ী যা করার তাই করবেন।

হে লোকসকল ,তোমাদের ওপর আমার অধিকার আছে আর আমার ওপরও তোমাদের অধিকার আছে। আমার ওপর তোমাদের অধিকার হচ্ছে তোমাদেরকে সৎপরামর্শ প্রদান ,তোমাদের ন্যায্য পাওনা সম্পূর্ণ পরিশোধ করা ,তোমাদেরকে শিক্ষা দেয়া যেন তোমরা অজ্ঞ না থাকো এবং আচরণের কার্যকারণনীতি বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া যাতে তোমরা আমল করতে পার। তোমাদের ওপর আমার অধিকার হচ্ছে তোমরা আনুগত্যে অটল থাকবে ,আমার সামনে অথবা পিছনে আমার শুভাকাঙ্খী হয়ে থাকবে ,আমার আহবানে সাড়া দেবে এবং আমার আদেশ মান্য করবে।

খোৎবা- ৩৫

الْحَمْدُ لِلَّه وإِنْ أَتَى الدَّهْرُ بِالْخَطْبِ الْفَادِحِ والْحَدَثِ الْجَلِيلِ وأَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَه إِلَّا اللَّه لَا شَرِيكَ لَه - لَيْسَ مَعَه إِلَه غَيْرُه - وأَنَّ مُحَمَّداً عَبْدُه ورَسُولُهصلى‌الله‌عليه‌وآله -

أَمَّا بَعْدُ فَإِنَّ مَعْصِيَةَ النَّاصِحِ الشَّفِيقِ الْعَالِمِ الْمُجَرِّبِ - تُورِثُ الْحَسْرَةَ وتُعْقِبُ النَّدَامَةَ - وقَدْ كُنْتُ أَمَرْتُكُمْ فِي هَذِه الْحُكُومَةِ أَمْرِي، ونَخَلْتُ لَكُمْ مَخْزُونَ رَأْيِي لَوْ كَانَ يُطَاعُ لِقَصِيرٍ أَمْرٌ - فَأَبَيْتُمْ عَلَيَّ إِبَاءَ الْمُخَالِفِينَ الْجُفَاةِ والْمُنَابِذِينَ الْعُصَاةِ - حَتَّى ارْتَابَ النَّاصِحُ بِنُصْحِه وضَنَّ الزَّنْدُ بِقَدْحِه فَكُنْتُ أَنَا وإِيَّاكُمْ كَمَا قَالَ أَخُو هَوَازِنَ

أَمَرْتُكُمْ أَمْرِي بِمُنْعَرَجِ اللِّوَى

فَلَمْ تَسْتَبِينُوا النُّصْحَ إِلَّا ضُحَى الْغَدِ

সালিশীর পর আমিরুল মোমেনিন এ ভাষণ দিয়েছিলেন

প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা আল্লাহর ,যদিও সময় আমাদের জন্য চরম দুর্যোগ ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা বয়ে এনেছে। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ ব্যতীত আর কোন মারুদ নেই ,তার কোন অংশীদার নেই ,তার সাথে আর কারো তুলনা হয় না এবং মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসূল ।

সমবেদী উপদেষ্টার জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তার অবাধ্যতা আমাদের জন্য নৈরাশ্য ও দুঃখজনক ফলাফল ডেকে আনলো। এ সালিশী সম্পর্কে আমি পূর্বাহ্নেই তোমাদের নির্দেশ দিয়েছিলাম এবং আমার গোপন মনোভাব তোমাদের কাছে ব্যক্ত করেছিলাম। কিন্তু তোমরা রূঢ় প্রতিপক্ষ ও জঘন্য অবাধ্যের মতো আমার আদেশ প্রত্যাখ্যান করেছো । আহা ! যদি কাসিরের আদেশ প্রতিপালিত হতো !! উপদেষ্টা নিজেই তার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছিল এবং তার বুদ্ধিমত্তা নিস্তেজ হয়ে গিয়েছিল। ফলে আমার ও তোমাদের অবস্থা যা কবি হাওয়াজিন বলেনঃ

মুনারাজিল লিওয়াদে আমি তোমাদেরকে আমার আদেশ দিয়েছিলাম ,কিন্তু তোমরা পরদিন দুপুরের পূর্ব পর্যন্ত আমার উপদেশের কল্যাণ দেখতে পাও নি ।

____________________

১। সিফফিনের যুদ্ধে ইরাকদের রক্ত - পিপাসু। তরবারি যখন সিরিয়দের উদ্দীপনা ও মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছিল এবং আল - হারিরের রাতের অবিরাম আক্রমণে তাদের উচ্চাকাঙ্খা গুড়িয়ে দিল ,তখন আমর ইবনে আস মুয়াবিয়াকে একটা কুটাচালের পরামর্শ দিয়ে বললো , বর্শার আগায় পবিত্র কুরআন তুলে ধরে ইরাকিদের কাছে দাবি করতে হবে - এ কুরআনকেই সালিস মেনে নাও - কুরআনই তোমাদের ও আমাদের মধ্যে ফয়সালা। এতে কিছু লোক যুদ্ধ বন্ধ করতে চেষ্টা করবে এবং কিছু লোক যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইবে। ফলে তাদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হয়ে যুদ্ধ স্থগিত হয়ে যাবে।"

আমরের পরামর্শ অনুযায়ী বর্শার অগ্রভাগে কুরআন বেঁধে উর্দ্ধে তুলে ধরা হলো। ফলে কিছু সংখ্যক জ্ঞানহীন লোক হৈ চৈ শুরু করে বিভেদ সৃষ্টি করে ফেললো এবং প্রায় জয়ের মুখে আমিরুল মোমেনিনের সৈন্যদের ক্ষিপ্রতা শ্লথ হয়ে গেল। তারা কিছুই না বুঝে চিৎকার করে বলতে লাগলো , যুদ্ধাপেক্ষা আমরা কুরআনের ফয়সালা অধিক ভালো বলে মনে করি। আমিরুল মোমেনিন যখন দেখলেন কুরআনকে চালাকির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে তখন তিনি বললেনঃ

হে সৈন্যগণ ,এ প্রতারণা ও চাতুরির ফাঁদে পড়ো না । পরাজয়ের গ্লানি থেকে রক্ষা পাবার জন্য তারা এ কৌশল অবলম্বন করেছে । তাদের প্রত্যেকের চরিত্র আমার জানা আছে । তারা প্রকৃতপক্ষে কুরআনের অনুগামী নয় ; দ্বিনি বা ইমানের সাথে তাদের কোন সংশ্রব নেই । আমাদের জিহাদের মূল কারণই হলো - তাদেরকে কুরআন মেনে চলতে এবং কুরআনের আদেশ - নিষেধ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য করা । আল্লাহর দোহাই ,তোমরা তাদের প্রতারণামূলক কৌশলের শিকার হয়ো না । তোমরা এগিয়ে চলো - তোমাদের উদম ,সংকল্প ও সাহস নিয়ে । তোমাদের শত্রুর অবস্থা মুমূর্ষ প্রায় - তাদের নিশ্চিহ্ন করা পর্যন্ত থেমে যেয়ো না । এতদসত্ত্বেও প্রতারণামূলক ও বিভ্রান্তিকর এ হাতিয়ার কার্যকর হলো । কিছু লোক অবাধ্য হয়ে বিদ্রোহের পথ বেছে নিল । এদের মধ্যে মিসার ইবনে ফাদকী। আত - তামিমী ও জায়েদ ইবনে হুসাইন আত - তাঈ বিশ হাজার সৈন্য নিয়ে এগিয়ে এসে আমিরুল মোমেনিনকে । বললো , হে আলী ,আপনি যদি কুরআনের ডাকে সাড়া না দেন। তবে আমরা উসমানের সাথে যেমন ব্যবহার করেছি আপনার সাথেও তেমন ব্যবহার করবো আপনি এখনি যুদ্ধ বন্ধ করুন এবং কুরআনের ফয়সালা মেনে নিন। আমিরুল মোমেনিন তাদেরকে বুঝাতে আপ্রাণ চেষ্টা করলেন। কিন্তু শয়তান তাদেরকে বুঝতে দেয়নি । মালিক ইবনে হারিছ আশাতীর বিপুল বিক্রমে তখন শত্রু নিধন করে এগিয়ে যাচ্ছিলো। মালিককে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফেরত আনার জন্য কাউকে পাঠাতে তারা আমিরুল মোমেনিনকে বাধ্য করলো ফলে ইয়াজিদ ইবনে হানিকে দিয়ে মালিককে ডেকে পাঠানো হলো মালিক এ আদেশ শোনা মাত্র হতভম্ব হয়ে বললেন , তাঁকে (আমিরুল মোমেনিনকে) আমার সালাম জানিয়ে বলো এখন অবস্থান ত্যাগ করার সময় নয় । তাঁকে একটু অপেক্ষা করতে বলো । আল্লক্ষণের মধ্যেই বিজয়ের সংবাদ নিয়ে আমি তাঁর কাছে হাজির হবো । ইবনে হানি এ বার্তা নিয়ে আমিরুল মোমেনিনের নিকট পৌছলে লোকেরা চিৎকার করতে লাগলো যে ,যুদ্ধ চালিয়ে যাবার জন্য তিনি গোপনে খবর দিয়েছেন । অথচ তিনি যা বলেছিলেন তাদের সামনেই বলেছেন লোকেরা তখন বললো ,যদি মালিক ফিরে আসতে বিলম্ব করে তবে আমিরুল মোমেনিন তাঁর জীবনের আশা ত্যাগ করতে পারেন । এরপর ইবনে হানিকে আবার পাঠানো হলো । তিনি মালিককে বললেন , তোমার কাছে কি আমিরুল মোমেনিনের জীবন অপেক্ষা বিজয় বেশি প্রিয় ? যদি তাঁর জীবন বেশি প্রিয় হয়ে থাকে। তবে যুদ্ধ ছেড়ে তাঁর কাছে চলে যাও। বিজয়ের সুযোগ ছেড়ে দিয়ে হতাশা আর দুঃখ ভারাক্রাক্ত মন নিয়ে মালিক আমিরুল মোমেনিনের সম্মুখে উপস্থিত হলেন । তিনি দেখলেন সেখানে গোলযোগ চলছে । তিনি সেখানে উপস্থিত। লোকদেরকে অনেক তিরস্কার করলেন। কিন্তু ব্যাপারটা এমনভাবে মোড় নিয়েছিল যা আর ঠিক করা সম্ভব হয়নি।

অবশেষে স্থির হলো যে ,উভয়ে একজন করে সালিস মনোনীত করবে। যারা কুরআন অনুযায়ী খেলাফতের বিষয় নিষ্পত্তি করবে। মুয়াবিয়ার পক্ষ থেকে আমর ইবনে আসকে মনোনয়ন দেয়া হলো। আমিরুল মোমেনিনের পক্ষ থেকে আবু মুসা আশআরীর নাম প্রস্তাব করা হলো। এ ভুল মনোনয়ন দেখে আমিরুল মোমেনিন বললেন , সালিসির ব্যাপারে তোমরা আমার আদেশ অমান্য করেছে। এখন অন্তত আমার এ কথাটি মান্য কর ,আবু মুসাকে সালিস মনোনীত করো না। সে বিশ্বস্ত লোক নয়। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস অথবা মালিক আশতার - এ দুজনের এক জনকে সালিস মনোনীত কর। কিন্তু তারা তাঁর কথা মানলো না এবং তার দেয়া নাম বাদ দিয়ে দিলো। আমিরুল মোমেনিন বললেন , ঠিক আছে ,তোমরা যা খুশি করো। তবে সেদিন বেশি দূরে নয় যখন তোমরা বুঝতে পারবে যে ,নিজেদের পায়ে নিজেরাই কুড়াল মেরেছে

সালিস মনোনয়নের পর যখন এতদসংক্রান্ত চুক্তিপত্র লেখা হলো তখন আলী ইবনে আবি তালিবের পর আমিরুল মোমেনিন শব্দগুলো লেখা হয়েছিল। এতে আমর ইবনে আস বললো , আমিরুল মোমেনিন মুছে ফেলো। যদি আমরা তাকে আমিরুল মোমেনিন বলেই স্বীকার করি তবে কেন এ যুদ্ধ লড়ছি ? প্রথমতঃ আমিরুল মোমেনিন আমরের প্রস্তাবে অস্বীকৃতি জানালেন। কিন্তু তারা কোনভাবেই এ শব্দগুলো চুক্তিতে রাখতে রাজি হয় না। দেখে আমিরুল মোমেনিন তা মুছে ফেলে বললেন , এ ঘটনা হুদায়বিয়ার সন্ধির মতোই যখন কাফেরগণ আল্লাহর রাসূল লেখা মানলো না এবং রাসূল (সা.) তা কেটে দিলেন। এ কথায় আমর ইবনে আস রাগান্বিত হয়ে বললো , আপনি কি আমাদেরকে কাফের মনে করেন ? আমিরুল মোমেনিন বললেন ,তুমি কি কোনদিন মোমেনদের সাথে কিছু করেছিলে ? তুমি কি কোনদিন মোমেনদের সমর্থক ছিলে ? যা হোক এ চুক্তির পর জনতা চলে গোল এবং সালিসীদ্বয় পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সাব্যস্ত করলো যে ,আলী ও মুয়াবিয়া উভয়কে খেলাফত থেকে সরিয়ে দিয়ে যাকে ইচ্ছা মনোনীত করার ক্ষমতা জনগণকে দেয়া হবে। এ সিদ্ধান্ত ঘোষণার জন্য ইরাক ও সিরিয়ার মধ্যবর্তী দুমাতুল জান্দাল নামক স্থানে একটা সভা আহবান করা হলো। সালিসদ্বয়ও তাদের রায় ঘোষণার জন্য সেখানে উপস্থিত হলেন। আমর ইবনে আস চাতুর্যের পথ অবলম্বন করে আবু মুসাকে বললো , আপনি বয়ঃজ্যেষ্ঠ ,আপনার আগে কথা বলা আমি বেয়াদবি মনে করি। কাজেই আপনি আগে ঘোষণা করুন। আবু মুসা আমরের তোষামোদে অভিভূত হয়ে জনতার সামনে গর্বভরে দাঁড়িয়ে বললেন , হে মুসলিমগণ ,আমরা উভয়ে যুগ্মভাবে সাব্যস্থ করেছি যে ,আলী ও মুয়াবিয়া খেলাফত থেকে সরে দাঁড়াবে এবং আপনারা আপনাদের পছন্দমত একজন খলিফা নিয়োগ করবেন। একথা বলে আবু মুসা বসে পড়লেন এবং আমর ইবনে আস দাঁড়িয়ে বললো , হে মুসলিমগণ ,আপনারা শুনলেন যে ,আবু মুসা আলী ইবনে আবি তালিবকে অপসারণ করেছেন। আমি তার সাথে একমত পোষণ করি। মুয়াবিয়াকে অপসারণ করার প্রশ্ন উঠে না (কারণ সে খলিফা নয়) । সুতরাং আলীর স্থলে আমি মুয়াবিয়াকে নিয়োগ করলাম। আমর ইবনে আস একথা বলা মাত্র চতুর্দিকে হৈ হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল। আবু মুসা চিৎকার করে বলতে লাগলেন যে ,এটা চাতুরি ,এটা প্রতারণা। কিন্তু কে শোনে কার কথা! তিনি ইবনে আসকে বললেন , তুমি চাতুরি করেছে। তোমার উপমা সেই কুকুরের মতো যার কাছে কোন কিছু রাখলে সে আত্মসাৎ করে। আমর ইবনে আস বললো , তোমার উপমা সেই গাধার মতো যার পিঠে পুস্তক বোঝাই করা হয়। আমরের এ চাতুর্যের ফলে মুয়াবিয়ার কম্পিত পা আবার কিছুটা শক্ত হলো ।

সংক্ষিপ্তাকারে সালিসির ফলাফল এটাই যা কুরআনের নামে করা হয়েছে। এহেন প্রতারণা কি কুরআনের শিক্ষা ? ইতিহাসের এ পাতাগুলো ভবিষ্যতের পথ - নির্দেশক হিসেবে গ্রহণ করা যায় কি ? আমিরুল মোমেনিন সালিসির এ দুঃখদায়ক সংবাদ পেয়ে মিম্বারে উঠে। এ খোৎবা প্রদান করেছিলেন।

২। এটা একটা আরবি প্রবাদ। কোন পরামর্শদাতার উপদেশ অমান্য করে পরে অনুশোচনা করলে এ প্রবাদ প্রয়োগ করা হয়। এ প্রবাদের ঘটনা হলো - হীরা অঞ্চলের শাসনকর্তা যাযিমাহ আল আব্রাশ জামিরাহ অঞ্চলের শাসনকর্তা আমর ইবনে যারিবকে হত্যা করে তার কন্যা যাব্বাহকে জামিরাহর শাসনকর্তা নিয়োগ করেন। সিংহাসনে আরোহণ করেই যাব্বাহ তার পিতার রক্তের বদলা নেয়ার পরিকল্পনা করে। ফলে সে যাযিমাহর নিকট এ বলে বার্তা প্রেরণ করলো যে ,একাকিনী অবস্থায় শাসনকার্য পরিচালনা করা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। সুতরাং যাযিমাহ যদি তাকে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করে শাসনকার্যে তার পৃষ্ঠপোষকতা করে তবে সে কৃতজ্ঞ থাকবে। যাযিমাহ এ প্রস্তাবে উৎফুল্ল হয়ে এক হাজার অশ্বারোহী নিয়ে জাযিরাহ অঞ্চলের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলো। যাযিমাহর ক্রীতদাস কাসির তাকে উপদেশ দিয়েছিল যে ,এ প্রস্তাব প্রতারণা ও চাতুরি ছাড়া আর কিছুই নয়। কাজেই যাযিমাহ এ বিপদে নিজেকে ঠেলে না দেয়াই মঙ্গল। কিন্তু যাযিমাহর বুদ্ধিমত্তা এমনভাবে লোপ পেয়েছিল যে ,সে চিন্তাই করতে পারেনি কেন যাব্বাহ তার পিতার হত্যাকারীকে স্বামী হিসাবে বরণ করবে ? সে জাযিরাহ রাজ্যের সীমান্তে পৌছে দেখলো যাব্বোহর সৈন্য তাকে সম্বর্ধনা দেয়ার অপেক্ষা করছে কিন্তু কোন বিশেষ সম্বর্ধনা বা অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করা হয়নি । এতে কাসিরের সন্দেহ আরো ঘনীভূত হলো। সে যাযিমাহকে ফিরে যেতে বললো। যাযিমাহ তার উপদেশ কর্ণপাত করলো না। ফলে শহরে পৌছা মাত্রই যাযিমাহকে হত্যা করা হলো । এতে কাসির বললো , আহা ,যদি কাসিরের উপদেশ মান্য করা হতো। এ থেকেই আরবি ভাষায় এ প্রবাদ প্রচলিত হয়েছে।

৩। হাওয়াজিনের কবি বলতে দুরায়েদ ইবনে সিন্মাহকে বুঝানো হয়েছে। তাঁর ভ্রাতা আবদুল্লাহ ইবনে সিম্মাহর মৃত্যুতে এ কবিতা লেখেছিল। ঘটনাটি হলো - আব্দুল্লাহ্ ও তার ভাই হাওয়াজিনের বনি জুশাম ও বনি নসর এর নেতৃত্ব দিয়ে একটা আক্রমণ পরিচালনা করে অনেক উট তাড়িয়ে নিয়ে এসেছিল। ফেরার পথে মুন আরাজিল লিওয়া নামক স্থানে বিশ্রাম গ্রহণের জন্য আবদুল্লাহ মনস্থির করলো। দুরায়েদ তাকে নিষেধ করলো কারণ পিছন থেকে শত্রু আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু আবদুল্লাহ কৰ্ণপাত না করে সেখানে রয়ে গেল। ফলে ভোরবেলা আক্রমণ করে শত্রু আবদুল্লাহকে হত্যা করলো। দুরায়েদ আহত হয়ে প্রাণে বাঁচালো। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুরায়েদ বেশ কয়েকটি কবিতা লেখেছিল। তন্মধ্যে খোৎবায় উল্লেখিত কবিতাটি জনপ্রিয়।

খোৎবা - ৩৬

في تخويف أهل النهروان

فَأَنَا نَذِيرٌ لَكُمْ أَنْ تُصْبِحُوا صَرْعَى بِأَثْنَاءِ هَذَا النَّهَرِ - وبِأَهْضَامِ هَذَا الْغَائِطِ عَلَى غَيْرِ بَيِّنَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ - ولَا سُلْطَانٍ مُبِينٍ مَعَكُمْ - قَدْ طَوَّحَتْ بِكُمُ الدَّارُ واحْتَبَلَكُمُ الْمِقْدَارُ وقَدْ كُنْتُ نَهَيْتُكُمْ عَنْ هَذِه الْحُكُومَةِ - فَأَبَيْتُمْ عَلَيَّ إِبَاءَ الْمُنَابِذِينَ - حَتَّى صَرَفْتُ رَأْيِي إِلَى هَوَاكُمْ - وأَنْتُمْ مَعَاشِرُ أَخِفَّاءُ الْهَامِ سُفَهَاءُ الأَحْلَامِ ولَمْ آتِ لَا أَبَا لَكُمْ بُجْراً ولَا أَرَدْتُ لَكُمْ ضُرّاً.

নাহরাওয়ানের জনগণকে তাদের ভাগ্য সম্পর্কে সতর্কীকরণ

আমি তোমাদেরকে সতর্ক করে দিচ্ছি যে ,আল্লাহর কাছে যখন তোমাদের কোন স্পষ্ট ওজর থাকবে না এবং যখন তোমরা কোন প্রকাশ্য প্রামাণ্য দলিল উপস্থাপন করতে পারবে না (যা বল সে সম্পর্কে) তখন তোমরা এ খালের বাকের নিচু এলাকার বাকের ধারে নিহত হবে। তোমরা ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছো (মিথ্যামিথ্যি বিরুদ্ধাচরণ করার জন্য) এবং তাতে আল্লাহর ফয়সালা তোমাদেরকে ঘিরে ধরেছে। আমি এ সালিশীর বিপক্ষে তোমাদেরকে উপদেশ দিয়েছিলাম। কিন্তু তোমরা অঙ্গীকার ভঙ্গকারী বিরুদ্ধবাদীর মতো আমার উপদেশ প্রত্যাখ্যান করেছো । তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত আমার ওপর চাপ প্রয়োগ করেছো যতক্ষণ পর্যন্ত না আমার মতামত তোমাদের ইচ্ছার অনুকূলে এনেছি। তোমরা এমন একটা দল যাদের মাথা বোধশক্তি ও বুদ্ধিবিহীন। তোমাদের পিতা না থাকুক! (আল্লাহর অভিশাপ তোমাদের ওপর!!) । আমি তোমাদেরকে কোন বিপর্যয়ে ফেলিনি বা তোমাদের কোন ক্ষতি কামনা করি নি।

____________________

১। নাহরাওয়ানের যুদ্ধের কারণ হলো - সিফফিনের সালিশীর পর আমিরুল মোমেনিন যখন দুঃখভারাক্রান্ত মনে কুফায় ফিরে যাচ্ছিলেন তখন যারা সালিশ মান্য করার জন্য আমিরুল মোমেনিনের ওপর চাপ প্রয়োগে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল তারা বলাবলি করতে লাগলো যে ,আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে সালিশ মান্য করা ইমান হারানোর সামিল। আল্লাহ মাফ করুন ,সালিশ মান্য করে আমিরুল মোমেনিন ইমানহারা হয়ে গেছেন। ফলে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কোন কর্তৃত্ব নেই ” এ আয়াতের অর্থ বিকৃত করে তারা সাধারণ মুসলিমগণকে তাদের মতাবলম্বী করে হানিরা নামক স্থানে অবস্থিত আমিরুল মোমেনিনের ক্যাম্প থেকে বের করেনিয়ে যায়। আমিরুল মোমেনিন তাদের এহেন দুরভিসন্ধির কথা জানতে পেরে সা ’ সাআহ ইবনে সুহান আল - আবদি এবং যিয়াদ ইবনে নাদার আল - হারিছীকে ইবনে আব্বাসের সাথে তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন এবং পরবর্তীতে নিজেই তাদের অবস্থান স্থলে গিয়ে আলাপ - আলোচনা করে তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন।

এসব লোক কুফায় পৌছে ছড়াতে লাগলো যে ,আমিরুল মোমেনিন সালিশীর চুক্তি ভঙ্গ করে সিরিয়দের বিরুদ্ধে পুনরায় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আমিরুল মোমেনিন তাদের এসব প্রচারণার প্রতিবাদ করলে তারা বিদ্রোহ করলো এবং বাগদাদ থেকে বার মাইল দূরবর্তী নাহরাওয়ান নামক খালের নিচু এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করেছিল ।

অপরপক্ষে আমিরুল মোমেনিন সালিশীর রোয়েদাদ শুনে সিরিয় সৈন্যদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য মনস্থির করলেন। তিনি খারিজিদের পত্র দিয়ে জানালেন যে ,সালিশদ্বয় কুরআন ও সুন্নাহর পরিবর্তে তাদের ইচ্ছা মাফিক যে রোয়েদাদ দিয়েছে তা তার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে তিনি তাদের সাথে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। সুতরাং শক্রকে নির্মূল করার জন্য তাকে সমর্থন করতে তিনি তাদেরকে অনুরোধ করেন। প্রত্যুত্তরে খারিজিগণ বললো , আমাদের মতে ,সালিশ মান্য করে আপনি ইমানহারা হয়ে গেছেন। এখন যদি আপনি ইমান হারানোর কথা স্বীকার করে তওবা করেন তবেই আমরা চিন্তা করে দেখবো কী করা যায়। ” তাদের এহেন উত্তর থেকে আমিরুল মোমেনিন বুঝতে পারলেন যে ,তাদের অবাধ্যতা ও বিপথগামিতা চরমে উঠেছে। এ অবস্থায় তাদের কোন প্রকার সহায়তা গ্রহণ করা বিপদের কারণ হবে বলে তিনি বিবেচনা করলেন। ফলে তাদেরকে উপেক্ষা করে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রার উদ্দেশ্যে তিনি নুখায়লাহ উপত্যকায় ক্যাম্প স্থাপন করলেন। সৈন্যবাহিনী সজ্জিত করার পর আমিরুল মোমেনিন জানতে পারলেন যে ,তারা চায় প্রথমে নাহরাওয়ানের বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করার পর সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা করতে। আমিরুল মোমেনিন বললেন , নাহরাওয়ানের লোকেরা যেভাবে আছে সেভাবেই থাক। তোমরা প্রথমে সিরিয়া অভিমুখে যাত্রা কর এবং পরে নাহরাওয়ানের লোকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করো। ” লোকেরা বলল যে ,তারা আমিরুল মোমেনিনের প্রতিটি আদেশ তাদের সর্বশক্তি দিয়ে পালন করার জন্য ওয়াদাবদ্ধ ; কাজেই তিনি যেদিকে বলবেন সেদিকেই তারা চলবে। এরই মধ্যে সংবাদ এলো যে ,খারিজি বিদ্রোহীগণ নাহরাওয়ানের গভর্ণর আবদুল্লাহ্ ইবনে খাব্বাহ ইবনে আরাত ও তার গর্ভবতী কৃতদাসীকে হত্যা করেছে এবং বনি তাঈ ও উন্মে সিনান আস - সাইদাইয়াহ গোত্রের অপর তিনজন মহিলাকে হত্যা করেছে। এ সংবাদে আমিরুল মোমেনিনের সৈন্যগণ আর সিরিয়া অভিমুখে নড়াচড়া করেনি। তিনি বিষয়টি তদন্ত করে দেখার জন্য হারিছ ইবনে মুররাহ আল - আবদিকে প্রেরণ করলেন। কিন্তু খারিজিগণ হারিছকেও হত্যা করেছে। ফলে আমিরুল মোমেনিন কাল বিলম্ব না করে সসৈন্যে নাহরাওয়ান পৌছলেন এবং তাদের কাছে বার্তা প্রেরণ করলেন যে ,যারা আবদুল্লাহ ইবনে খাব্বাহ ও নির্দোষ মহিলাদের হত্যা করেছে কিসাসের জন্য তাদেরকে আমিরুল মোমেনিনের হাতে তুলে দিতে হবে। উত্তরে খারিজিগণ জানালো যে ,তারা সকলেই একযোগে এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এবং তারা মনে করে যে ,আমিরুল মোমেনিনের পক্ষের সকল লোককে হত্যা করা জায়েজ। এতেও আমিরুল মোমেনিন যুদ্ধের পদক্ষেপ না নিয়ে আবু আইউব আল - আনসারীকে শান্তির প্রস্তাব দিয়ে তাদের কাছে প্রেরণ করেছেন। আবু আইউব তাদের কাছাকাছি গিয়ে উচ্চঃস্বরে বললেন , যে কেউ সেপক্ষ ত্যাগ করে এ পতাকা তলে আসবে এবং কুফা অথবা মাদায়েন যাবে তাকেই সাধারণ ক্ষমার অন্তর্ভুক্ত করা হবে এবং কোন কিছুই জিজ্ঞেস করা হবে না। ” এতে ফরওয়া ইবেন নাওফাল আল - আশজাঈ বললো , তবে কেন আর আমিরুল মোমেনিনের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবো। ” এ বলে সে তার পাঁচশত লোকসহ বেরিয়ে এলো। এরপর কয়েকটি দল বেরিয়ে এসেছে এবং তাদের কেউ কেউ আমিরুল মোমেনিনের দলে যোগ দিয়েছে। কিন্তু চার হাজার লোক (তাবারীর মতে দুই হাজার আট শত) বিদ্রোহী রয়ে গেল। এরা কোনমতেই বেরিয়ে আসতে রাজি হলো না। তারা প্রতিজ্ঞা করে বসলো , হয় মারবো ,না হয় মরবো। ” আমিরুল মোমেনিন এসব বিদ্রোহীকে বুঝিয়ে - শুনিয়ে বের করে আনার কথা চিন্তা করেনিজের সৈন্যদের প্রদমিত করে রাখলেন। কিন্তু খারিজিগণ ধনুকে শর যোজনা করে এবং বর্শা ও তরবারি উন্মুক্ত করে প্রস্তুত হয়ে রইলো। এ সংকট মুহুর্তেও আমিরুল মোমেনিন এ ভাষণে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। কোন উপদেশ কার্যকর হয়নি ; তারা আচমকা আমিরুল মোমেনিনের সৈন্যদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তাদের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে ,আমিরুল মোমেনিনের পদাতিক বাহিনী দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই ধকল সামলে তারা পাল্টা আক্রমণ করলে মাত্র নয় জন পলাতক ব্যতীত সকলেই নিহত হলো। এ যুদ্ধে আমিরুল মোমেনিনের আট জন সৈন্য শহিদ হয়েছে। ৩৮ হিজরি সনের ৯ সফর এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল।

খোৎবা- ৩৭

فَقُمْتُ بِالأَمْرِ حِينَ فَشِلُوا وتَطَلَّعْتُ حِينَ تَقَبَّعُوا ونَطَقْتُ حِينَ تَعْتَعُوا ومَضَيْتُ بِنُورِ اللَّه حِينَ وَقَفُوا - وكُنْتُ أَخْفَضَهُمْ صَوْتاً وأَعْلَاهُمْ فَوْتاً فَطِرْتُ بِعِنَانِهَا واسْتَبْدَدْتُ بِرِهَانِهَا كَالْجَبَلِ لَا تُحَرِّكُه الْقَوَاصِفُ - ولَا تُزِيلُه الْعَوَاصِفُ - لَمْ يَكُنْ لأَحَدٍ فِيَّ مَهْمَزٌ ولَا لِقَائِلٍ فِيَّ مَغْمَزٌ الذَّلِيلُ عِنْدِي عَزِيزٌ حَتَّى آخُذَ الْحَقَّ لَه - والْقَوِيُّ عِنْدِي ضَعِيفٌ حَتَّى آخُذَ الْحَقَّ مِنْه.

رَضِينَا عَنِ اللَّه قَضَاءَه وسَلَّمْنَا لِلَّه أَمْرَه - أَتَرَانِي أَكْذِبُ عَلَى رَسُولِ اللَّهصلى‌الله‌عليه‌وآله - واللَّه لأَنَا أَوَّلُ مَنْ صَدَّقَه - فَلَا أَكُونُ أَوَّلَ مَنْ كَذَبَ عَلَيْه - فَنَظَرْتُ فِي أَمْرِي - فَإِذَا طَاعَتِي قَدْ سَبَقَتْ بَيْعَتِي - وإِذَا الْمِيثَاقُ فِي عُنُقِي لِغَيْرِي.

দ্বীনে ও ইমানে আমিরুল মোমেনিনের নিজের দৃঢ়তা ও অগ্রণী ভূমিকা সম্পর্কে

আমি আমার কর্তব্য পালনে তৎপর ছিলাম। যখন অন্যরা নিজেদের কর্তব্য পালনের সাহস হারিয়ে ফেলেছিল। আমি এগিয়ে এসেছিলাম যখন অন্যরা নিজেদেরকে গোপন করে রেখেছিল। আমি কথা বলেছিলাম যখন অন্যরা নীরবে মুখ বন্ধ করে বসেছিল। যখন আমি আল্লাহর নূর নিয়ে চলেছিলাম তখন অন্যরা বিফল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তাদের মধ্যে কণ্ঠস্বরে আমিই ছিলাম সবচেয়ে নিম্ন ; কিন্তু অগ্রগামীতায় আমি ছিলাম সর্বোর্ধে। একটা পর্বতকে যেমন বাতাস উড়িয়ে নিতে পারেনা বা ঝঞ্জা - বাতাস নাড়াতে পারে না তেমনি আমি অটলভাবে দ্বীনের রজ্জু ধরে রেখেছিলাম এবং নিজকে সম্পূর্ণরূপে দ্বীনের জামানত হিসাবে নিয়োজিত করেছিলাম। আমার কোন দোষ কেউ দেখতে পায় নি এবং কেউ আমার কোন বদনাম করতে পারেনি ।

আমার মতে একজন নিচ ব্যক্তিও সম্মানের যোগ্য যদি আমি তার অধিকার সংরক্ষণ করি ; আবার প্রতাপান্নিত ব্যক্তিও হীন বলে বিবেচিত হয় যদি আমি তার অধিকার তুলে নেই। আমরা আল্লাহ্ কর্তৃক নির্ধারিত ভাগ্যেই সন্তুষ্ট এবং তাঁর আদেশের প্রতি বিনয়াবনত। তোমরা কি মনে কর আমি আল্লাহর রাসূল (সা.) সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলবো ? আল্লাহর কসম ,আমিই সর্বপ্রথম রাসূলকে স্বীকার করেছি। কাজেই তার সম্পর্কে মিথ্যা বর্ণনাকারীদের প্রথম হতে চাই না। আমি আমার কার্যাবলীর প্রতি খেয়াল করে দেখলাম যে ,আমার আনুগত্য ও তার সাথে আমার অঙ্গীকার আমার ঘাড়ে বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খোৎবা- ৩৮

وإِنَّمَا سُمِّيَتِ الشُّبْهَةُ شُبْهَةً لأَنَّهَا تُشْبِه الْحَقَّ - فَأَمَّا أَوْلِيَاءُ اللَّه فَضِيَاؤُهُمْ فِيهَا الْيَقِينُ - ودَلِيلُهُمْ سَمْتُ الْهُدَى وأَمَّا أَعْدَاءُ اللَّه فَدُعَاؤُهُمْ فِيهَا الضَّلَالُ - ودَلِيلُهُمُ الْعَمَى - فَمَا يَنْجُو مِنَ الْمَوْتِ مَنْ خَافَه ولَا يُعْطَى الْبَقَاءَ مَنْ أَحَبَّه

সংশয়ের নামকরণ ও সংশয়াসক্তকে অবজ্ঞা প্রসঙ্গে

সংশয়কে সংশয় বলা হয় এ জন্য যে ,এটা সত্যের সদৃশ বা সমরূপ। যারা অলি - আল্লাহ্ তাদের ইয়াকিন তাদের জন্য আলোর কাজ করে এবং সত্য পথের দিকে তাদের মনোযোগ দেশনা হিসাবে কাজ করে। অপরপক্ষে যারা আল্লাহর শত্রু তাদের সংশয় তাদেরকে পথভ্রষ্ট করে সন্দেহের অন্ধকারে নিয়ে যায় এবং অন্ধত্ব তাদের দেশনা। মৃত্যুকে ভয় করে এড়ানো যায় না ,আবার অনন্ত জীবন আশা করলেও তা পাওয়া যায় না ।

খোৎবা- ৩৯

مُنِيتُ بِمَنْ لَا يُطِيعُ إِذَا أَمَرْتُ ولَا يُجِيبُ إِذَا دَعَوْتُ - لَا أَبَا لَكُمْ مَا تَنْتَظِرُونَ بِنَصْرِكُمْ رَبَّكُمْ - أَمَا دِينٌ يَجْمَعُكُمْ ولَا حَمِيَّةَ تُحْمِشُكُمْ أَقُومُ فِيكُمْ مُسْتَصْرِخاً وأُنَادِيكُمْ مُتَغَوِّثاً فَلَا تَسْمَعُونَ لِي قَوْلًا ولَا تُطِيعُونَ لِي أَمْراً - حَتَّى تَكَشَّفَ الأُمُورُ عَنْ عَوَاقِبِ الْمَسَاءَةِ - فَمَا يُدْرَكُ بِكُمْ ثَارٌ ولَا يُبْلَغُ بِكُمْ مَرَامٌ - دَعَوْتُكُمْ إِلَى نَصْرِ إِخْوَانِكُمْ - فَجَرْجَرْتُمْ جَرْجَرَةَ الْجَمَلِ الأَسَرِّ وتَثَاقَلْتُمْ تَثَاقُلَ النِّضْوِ الأَدْبَرِ ثُمَّ خَرَجَ إِلَيَّ مِنْكُمْ جُنَيْدٌ مُتَذَائِبٌ ضَعِيفٌ –( كَأَنَّما يُساقُونَ إِلَى الْمَوْتِ وهُمْ يَنْظُرُونَ ) .

জিহাদে যাদের অনীহা তাদের প্রতি ভর্ৎসনা সম্পর্কে

আমি এমন সব লোক নিয়ে আছি। যারা আমার আদেশ অমান্য করে এবং আমার ডাকে সাড়া দেয় না। তোমরা পিতৃবিহীন হও (তোমাদের উপর লা 'নত) । আল্লাহর উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়াতে কিসে তোমাদেরকে বিলম্বিত করছে ? তোমাদের দ্বীন কি তোমাদেরকে একত্রিত করবে না ? তোমাদের লজ্জাবোধ কি তোমাদের উত্তোলিত করবে না ? আমি তোমাদের মাঝে দাড়িয়ে চিৎকার করে সাহায্যের আহবান করছি ,কিন্তু তোমরা আমার কথা শোন না এবং অবস্থা বেগতিক না হলে তোমরা আমার আদেশ মান্য কর না। তোমাদের দ্বারা কোন রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণ করা যায় না এবং কোন উদ্দেশ্য সাধন করা যায় না। তোমাদের ভ্রাতাদের সাহায্য করার জন্য আমি আহবান করেছিলাম ; কিন্তু তোমরা পেটের ব্যথায় কাতর উটের মতো গোঙ্গাতে লাগলে এবং পাছ - মরা উটের মতো দুর্বল হয়ে পড়লে । অতঃপর তোমাদের মধ্য থেকে কম্পমান - দুর্বল একদল সৈন্য আমার কাছে এলোঃ যেন তাদেরকে মৃত্যুর দিকে তাড়িয়ে নেয়া হচ্ছে এবং তারা যেন মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করছে। ” (কুরআন - ৮: ৬)

____________________

১। আয়নুত - তামর আক্রমণ করার জন্য নুমান ইবনে বশিরের নেতৃত্বে মুয়াবিয়া দু হাজার সৈন্যের একটা বাহিনী প্রেরণ করেছিলো। কুফার নিকটবর্তী এ স্থানটি ছিল আমিরুল মোমেনিনের সামরিক ঘাটি এবং মালিক ইবনে কা ব আল - আরহাবী ছিল এ ঘাটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। যদিও তার অধীনে এক হাজার যোদ্ধা ছিল তবুও ওই মুহুর্তে একশত লোক সেখানে উপস্থিত ছিল। আক্রমণকারী সৈন্যদের এগিয়ে আসতে দেখে মালিক সাহায্যের জন্য আমিরুল মোমেনিনকে পত্র লেখেছিল। বার্তা পাওয়ামাত্র মালিকের সাহাযার্থে এগিয়ে আসার জন্য আমিরুল মোমেনিন জনগণকে অনুরোধ করলেন। এতে মাত্র তিনশত লোক প্রস্তুতি নিয়েছিল। আমিরুল মোমেনিন বিরক্ত হয়ে এ ভাষণ দেন। ভাষণ শেষে আমিরুল মোমেনিন ঘরে পৌছার পর আদি ইবনে হাতিম তাঈ এসে বললো , হে আমিরুল মোমেনিন ,আমার অধীনে বনি তাঈ - এর এক হাজার লোক আছে। আপনি আদেশ দিলে আমি তাদের প্রেরণ করতে পারি। আমিরুল মোমেনিন বললেন , এটা খারাপ দেখায় যে শুধুমাত্র একটা গোত্রের লোক শত্রুর মোকাবেলা করবে। তুমি নুখায়ালা উপত্যকায় তোমার বাহিনী প্রস্তুত রাখো। সে তার লোকজনকে জিহাদের জন্য ডাক দিয়েছিল। ইতোমধ্যে বনি তাঈ ছাড়া আরো এক হাজার সৈন্য সেখানে প্রস্তুত হলো। এমন সময় মালিক সংবাদ দিল যে ,সে শত্রুকে বিতাড়িত করেছে - সাহায্যের প্রয়োজন নেই।

এর কারণ হলো - কুফা থেকে সাহায্য পেতে বিলম্ব হতে পারে ভেবে মালিক তৎক্ষণাৎ আবদুল্লাহ ইবনে হাওয়ালা আল - আজদীকে কারাজাহ ইবনে কা 'ব আল - আনসারী ও মিখনাফ ইবনে সুলায়মান আল - আজাদীর কাছে সাহায্যের জন্য প্রেরণ করলেন। কারাজাহ কোন সাহায্য করেনি। মিখনাফ তার পুত্র আবদার রহমানের নেতৃত্বে পঞ্চাশ জন সৈন্য প্রেরণ করেছিল এবং তারা সন্ধ্যা নাগাদ মালিকের কাছে পৌছলো। সে পর্যন্ত শত্রুর দুহাজার লোক মালিকের একশত সৈন্যকে পরাভূত করতে পারেনি । আবদার রহমানের পঞ্চাশ জন সৈন্য দেখেই নুমান মনে করলো মালিকের বাহিনী আসা আরম্ভ করেছে। ফলে সে যুদ্ধ ক্ষেত্র থেকে পালিয়ে গেলো। এমনকি পালিয়ে যাবার সময়ও মালিক তাড়া করে তাদের তিন জনকে হত্যা করেছে।