নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা0%

নাহজ আল-বালাঘা লেখক:
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ: হযরত আলী (আ.)

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক: আশ-শরীফ আর-রাজী
: জেহাদুল ইসলাম
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বিভাগ:

ভিজিট: 42196
ডাউনলোড: 1971

নাহজ আল-বালাঘা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 48 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 42196 / ডাউনলোড: 1971
সাইজ সাইজ সাইজ
নাহজ আল-বালাঘা

নাহজ আল-বালাঘা

লেখক:
প্রকাশক: র‌্যামন পাবলিশার্স
বাংলা

রাসূলের (সা.) ‘জ্ঞান নগরীর দ্বার’ আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিব ছিলেন তত্ত্বজ্ঞানী, দার্শনিক, সুলেখক ও বাগ্মী। আলঙ্কারিক শাস্ত্রে তার পান্ডিত্য ও নৈপুন্য অসাধারণ। তিনি নবুওয়াতী জ্ঞান ভান্ডার হতে সরাসরি জ্ঞান আহরণ করেন এবং সাহাবাদের মধ্যে তিনি শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পন্ডিত ছিলেন। এতে কারো দ্বিমত নেই। আরবী কাব্যে ও সাহিত্যে তার অনন্যসাধারণ অবদান ছিল। খেলাফত পরিচালনা কালে তিনি বিভিন্ন বিষয়ে ভাষণ (খোৎবা) দিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন এলাকার প্রশাসকগণকে প্রশাসনিক বিষয়ে উপদেশ ও নির্দেশ দিয়ে পত্র লিখেছিলেন। এমনকি বিভিন্ন সময়ে মানুষের অনেক প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত জবাব দিয়েছিলেন। তার এসব বাণী কেউকেউ লিখে রেখেছিল, কেউ কেউ মনে রেখেছিল, আবার কেউ কেউ তাদের লিখিত পুস্তকে উদ্ধৃত করেছিল। মোটকথা তার অমূল্য বাণীসমূহ মানুষের কাছে ছড়ানো ছিটানো অবস্থায় ছিল।

আশ-শরীফ আর-রাজী আমিরুল মোমেনিন আলী ইবনে আবি তালিবের ভাষণসমূহ (খোৎবা), পত্রাবলী, নির্দেশাবলী ও উক্তিসমূহ সংগ্রহ করে “নাহজ আল-বালঘা” নামক গ্রন্থটি সঙ্কলন করেন।

খোৎবা- ৪০

في الخوارج لما سمع قولهم «لا حكم إلا لله»

قَالَعليه‌السلام : كَلِمَةُ حَقٍّ يُرَادُ بِهَا بَاطِلٌ - نَعَمْ إِنَّه لَا حُكْمَ إِلَّا لِلَّه - ولَكِنَّ هَؤُلَاءِ يَقُولُونَ لَا إِمْرَةَ - إِلَّا لِلَّه - وإِنَّه لَا بُدَّ لِلنَّاسِ مِنْ أَمِيرٍ بَرٍّ أَوْ فَاجِرٍ - يَعْمَلُ فِي إِمْرَتِه الْمُؤْمِنُ - ويَسْتَمْتِعُ فِيهَا الْكَافِرُ - ويُبَلِّغُ اللَّه فِيهَا الأَجَلَ ويُجْمَعُ بِه الْفَيْءُ - ويُقَاتَلُ بِه الْعَدُوُّ وتَأْمَنُ بِه السُّبُلُ - ويُؤْخَذُ بِه لِلضَّعِيفِ مِنَ الْقَوِيِّ - حَتَّى يَسْتَرِيحَ بَرٌّ ويُسْتَرَاحَ مِنْ فَاجِرٍ.

وفِي رِوَايَةٍ أُخْرَى:

أَنَّهعليه‌السلام لَمَّا سَمِعَ تَحْكِيمَهُمْ قَالَ:

حُكْمَ اللَّه أَنْتَظِرُ فِيكُمْ.وقَالَ:

أَمَّا الإِمْرَةُ الْبَرَّةُ فَيَعْمَلُ فِيهَا التَّقِيُّ - وأَمَّا الإِمْرَةُ الْفَاجِرَةُ فَيَتَمَتَّعُ فِيهَا الشَّقِيُّ - إِلَى أَنْ تَنْقَطِعَ مُدَّتُه وتُدْرِكَه مَنِيَّتُه.

আমিরুল মোমেনিন যখন খারিজিদের চিৎকার শুনলেন যে , নির্দেশ শুধু আল্লাহরই। তখন তিনি বললেনঃ

তারা যে বাক্যটি উচ্চারণ করছে তা সঠিক কিন্তু এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য ভ্রান্ত। এ কথা সত্য যে ,আদেশ শুধু আল্লাহর। কিন্তু এ কথা দ্বারা এসব লোক বোঝাতে চায় শাসনকার্য শুধু আল্লাহর। বাস্তবক্ষেত্রে ,ভাল হোক আর মন্দ হোক ,শাসনকর্তা ব্যতীত মানুষের নিস্তার নেই । শাসক ভাল হলে ইমানদারগণ উত্তম আমল সাধন করে সমাজের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে। অপরদিকে মন্দ শাসকের শাসনকার্য থেকে ইমানহীনারা জাগতিক ফায়দা লুট করে। শাসনকাল ভালো হোক আর মন্দ হোক ,আল্লাহ সবকিছুরই সমাপ্তি টানেন। শাসক দ্বারা কর আদায় হয় ,শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয় ,রাস্তা - ঘাট রক্ষা করা হয় ,শক্তিমানদের হাত থেকে দুর্বলদের অধিকার আদায় করা হয় ,পরহেজগারগণ শান্তিতে থাকে এবং দুষ্টের অত্যাচার থেকে প্রতিরক্ষা লাভ করে।

অন্য একটা বর্ণনায়ঃ

আমিরুল মোমেনিন যখন খারিজিদের চিৎকার শুনলেন তখন তিনি বললেনঃ

তোমাদের ওপর আমি আল্লাহর রায় প্রত্যাশা করছি। তৎপর তিনি বললেনঃ

কল্যাণকর সরকার হলে পরহেজগারগণ কল্যাণকর আমল সাধন করতে পারে ; অপরপক্ষে অকল্যাণকর সরকারের শাসনে দুষ্ট লোকেরা আমৃত্যু ভোগ - বিলাসে মত্ত থাকে।

খোৎবা- ৪১

أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ الْوَفَاءَ تَوْأَمُ الصِّدْقِ ولَا أَعْلَمُ جُنَّةً أَوْقَى مِنْه - ومَا يَغْدِرُ مَنْ عَلِمَ كَيْفَ الْمَرْجِعُ - ولَقَدْ أَصْبَحْنَا فِي زَمَانٍ قَدِ اتَّخَذَ أَكْثَرُ أَهْلِه الْغَدْرَ كَيْساً ونَسَبَهُمْ أَهْلُ الْجَهْلِ فِيه إِلَى حُسْنِ الْحِيلَةِ - مَا لَهُمْ قَاتَلَهُمُ اللَّه - قَدْ يَرَى الْحُوَّلُ الْقُلَّبُ وَجْه الْحِيلَةِ ودُونَهَا مَانِعٌ - مِنْ أَمْرِ اللَّه ونَهْيِه - فَيَدَعُهَا رَأْيَ عَيْنٍ بَعْدَ الْقُدْرَةِ عَلَيْهَا - ويَنْتَهِزُ فُرْصَتَهَا مَنْ لَا حَرِيجَةَ لَه فِي الدِّينِ.

বিশ্বাসঘাতকতার প্রতি ঘৃণা

হে লোকসকল ,নিশ্চয়ই অঙ্গীকার পূর্ণ করা সত্যের যমজ। পাপের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য অঙ্গীকার পালন করা অপেক্ষা ভালো কোন ঢাল আছে বলে আমার জানা নেই। যে ব্যক্তি ফেরত আসার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে সে কখনো বিশ্বাসঘাতকতা করে না। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যখন বিশ্বাসঘাতকতাকে বুদ্ধিমত্তা বলে আখ্যায়িত করা হয়। একালে অজ্ঞরা বিশ্বাসঘাতকতাকে চাতুর্যের কৃতিত্ব বলে মনে করে। তাদের হয়েছে কী ? আল্লাহ তাদের ধ্বংস করুন!! যে ব্যক্তি জীবনের সকল অবস্থাতেই নীতির প্রতি অটল থাকে সে আল্লাহর আদেশ-নিষেধ পালনে বাধার সম্মুখীন হয় ,কিন্তু ক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও সে এসব বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করে চলে (বাধা-বিপত্তির চাপে মরে গেলেও আল্লাহর আদেশ অনুসরণ করে) । অপরপক্ষে যে ব্যক্তি ধর্মের বাধনের অধীন নয় ,সে এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত (এবং সে আল্লাহর আদেশ অনুসরণ না করার যে কোন ওজর গ্রহণ করে) ।

খোৎবা- ৪২

أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ أَخْوَفَ مَا أَخَافُ عَلَيْكُمُ - اثْنَانِ اتِّبَاعُ الْهَوَى وطُولُ الأَمَلِ فَأَمَّا اتِّبَاعُ الْهَوَى فَيَصُدُّ عَنِ الْحَقِّ - وأَمَّا طُولُ الأَمَلِ فَيُنْسِي الآخِرَةَ - أَلَا وإِنَّ الدُّنْيَا قَدْ وَلَّتْ حَذَّاءَ فَلَمْ يَبْقَ مِنْهَا إِلَّا صُبَابَةٌ كَصُبَابَةِ الإِنَاءِ - اصْطَبَّهَا صَابُّهَا أَلَا وإِنَّ الآخِرَةَ قَدْ أَقْبَلَتْ ولِكُلٍّ مِنْهُمَا بَنُونَ - فَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الآخِرَةِ ولَا تَكُونُوا مِنْ أَبْنَاءِ الدُّنْيَا - فَإِنَّ كُلَّ وَلَدٍ سَيُلْحَقُ بِأَبِيه يَوْمَ الْقِيَامَةِ - وإِنَّ الْيَوْمَ عَمَلٌ ولَا حِسَابَ وغَداً حِسَابٌ ولَا عَمَلَ.

হৃদয়ের আশা ও উচ্চাকাঙ্খা সম্পর্কে

হে লোকসকল ,তোমাদের ব্যাপারে আমি দুটি বিষয়কে বড় ভয় করি কামনা - বাসনার বশবর্তী হয়ে আমল করা এবং আশা - আকাঙ্ক্ষাকে প্রলম্বিত করা। কামনা - বাসনার বশবর্তী হয়ে কাজ করলে সত্যকে পাওয়া যায় না এবং আশা প্রলম্বিত করলে পরকালকে ভুলে থাকে। জেনে রাখো ,দুনিয়া অতি দ্রুত অন্তের দিকে চলে যাচ্ছে এবং শেষ কণিকা ছাড়া এতে আর কিছুই থাকছে না ; যেমন - কেউ ভাণ্ড নিঃশেষ করে ফেললে একটু তলানি থাকে। সাবধান ,পরকাল দ্রুত এগিয়ে আসছে। দুনিয়া ও পরকাল উভয়েরই পুত্র (অর্থাৎ অনুসারী) আছে। তোমরা পরকালের পুত্র হয়ো ,ইহকালের পুত্র হয়ে না। কারণ শেষ বিচারের দিন প্রত্যেক পুত্র তার মায়ের সাথে থাকবে। আজ হলো আমলের দিন - কোন হিসাব নেয়া হবে না ,আর আগামীকাল হলো হিসাব - নিকাশের দিন - কোন আমল থাকবে না।

খোৎবা- ৪৩

وقد أشار عليه أصحابه بالاستعداد لحرب أهل الشام بعد إرساله جرير بن عبد الله البجلي إلى معاوية ولم ينزل معاوية على بيعته

إِنَّ اسْتِعْدَادِي لِحَرْبِ أَهْلِ الشَّامِ وجَرِيرٌ عِنْدَهُمْ - إِغْلَاقٌ لِلشَّامِ وصَرْفٌ لأَهْلِه عَنْ خَيْرٍ إِنْ أَرَادُوه - ولَكِنْ قَدْ وَقَّتُّ لِجَرِيرٍ وَقْتاً لَا يُقِيمُ بَعْدَه - إِلَّا مَخْدُوعاً أَوْ عَاصِياً - والرَّأْيُ عِنْدِي مَعَ الأَنَاةِ فَأَرْوِدُوا ولَا أَكْرَه لَكُمُ الإِعْدَادَ

ولَقَدْ ضَرَبْتُ أَنْفَ هَذَا الأَمْرِ وعَيْنَه وقَلَّبْتُ ظَهْرَه وبَطْنَه - فَلَمْ أَرَ لِي فِيه إِلَّا الْقِتَالَ أَوِ الْكُفْرَ - بِمَا جَاءَ مُحَمَّدٌصلى‌الله‌عليه‌وآله - إِنَّه قَدْ كَانَ عَلَى الأُمَّةِ وَالٍ أَحْدَثَ أَحْدَاثاً - وأَوْجَدَ النَّاسَ مَقَالًا فَقَالُوا ثُمَّ نَقَمُوا فَغَيَّرُوا.

জারীর ইবনে আব্দদিল্লাহ আল - বাজালীকে বায়াত আদায়ের জন্য মুয়াবিয়ার নিকট প্রেরণ করার পর আমিরুল মোমেনিনের কয়েকজন অনুসারী মুয়াবিয়ার সাথে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দিলে তিনি বলেনঃ

যেখানে জারীর ইবনে আবদিল্লাহ আল - বাজালী এখনো সিরিয়ায় ,সেখানে সিরিয়ার জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলে সিরিয়ার দরজা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে এবং সিরিয়ার জনগণ যদি বায়াত গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করে থাকে তাও রুদ্ধ হয়ে যাবে। যাহোক ,আমি জারীরকে একটা সময়সীমা বেঁধে দিয়েছি। প্রতারিত অথবা অবাধ্য না হলে সে সময়সীমার বেশি সেখানে অবস্থান করবে না। আমার অভিমত সর্বদাই ধৈর্যের অনুকূলে। সুতরাং একটু ধৈর্যধারণ কর। ইতোমধ্যে তোমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ আমাদের অপছন্দনীয় নয়।

এ বিষয়টি আমি সবদিক থেকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ করেছি। কিন্তু যুদ্ধ অথবা মুহাম্মদ (সা.) যা এনেছেন উহার অবাধ্যতা করা ছাড়া অন্য কোন পথ দেখিনা । নিশ্চয়ই ,আমার পূর্বেও জনগনের শাসক ছিল যারা অনৈসলামিক নতুন অনেক কিছু প্রবর্তন করেছিল যা সমালোচনা করতে জনগণ বাধ্য হয়েছিল । সুতরাং জনগণ সমালোচনা করলো ,তৎপর রুখে দাঁড়ালো এবং তাতে শাসন ক্ষমতা পরিবর্তিত হলো।

খোৎবা- ৪৪

لما هرب مصقلة بن هبيرة الشيباني إلى معاوية، وكان قد ابتاع سبي بني ناجية من عامل أمير المؤمنينعليه‌السلام وأعتقهم، فلما طالبه بالمال خاس به وهرب إلى الشام

قَبَّحَ اللَّه مَصْقَلَةَ - فَعَلَ فِعْلَ السَّادَةِ وفَرَّ فِرَارَ الْعَبِيدِ - فَمَا أَنْطَقَ مَادِحَه حَتَّى أَسْكَتَه - ولَا صَدَّقَ وَاصِفَه حَتَّى بَكَّتَه ولَوْ أَقَامَ لأَخَذْنَا مَيْسُورَه وانْتَظَرْنَا بِمَالِه وُفُورَه

মাসকালাহ ইবনে হুবায়রাহ ,আশ - শায়বানি আমিরুল মোমেনিনের একজন নির্বাহী অফিসারের নিকট থেকে বনি নাজিয়াহর কয়েকজন বন্দী ক্রয় করেছিল। যখন ক্রয়মূল্য দাবি করা হয়েছে তখন সে মুয়াবিয়ার কাছে সিরিয়ায় পলায়ন করলে আমিরুল মোমেনিন বলেনঃ

আল্লাহ মাসকালাহর মুখ মলিন (অমঙ্গল) করুন। সে উচ্চ মর্যাদাশীল ভদ্র লোকের মতো কাজ করে নেহায়েত ক্রীতদাসের মতে পালিয়ে গেল। তার প্রশংসাকারীকে সে কথা বলার পূর্বেই থামিয়ে দিল এবং তার প্রশংসাসূচক কবিতার ছন্দ বাঁধার আগেই সে কবির মুখ বন্ধ করে দিল। সে পালিয়ে না গিয়ে সাধ্যমত যা দিত আমরা তাই গ্রহণ করতাম এবং অবশিষ্ট টাকার জন্য ততদিন অপেক্ষা করতাম যতদিন পর্যন্ত না তার আর্থিক অবস্থা ভাল হয়।

________________

১ । সিফফিনের সালিশীর পর যখন খারিজিগণ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো তখন নাযিয়াহ গোত্রের খিররীট ইবনে রশিদ আন - নাযি নামক এক ব্যক্তি মাদায়েনে হত্যা ও লুণ্ঠন শুরু করে দিয়েছিল। তাকে বাধা দেয়ার জন্য আমিরুল মোমেনিন জিয়াদ ইবনে খোসাফাহর নেতৃত্বে তিন শত লোকের একটা বাহিনী প্রেরণ করলেন। মাদায়েনে দুপক্ষ তরবারি নিয়ে মোকাবেলা করলো ,কিন্তু অল্পক্ষণের মধ্যেই সন্ধ্যা নেমে এলো। পরদিন ভোরে জিয়াদ দেখলেন যে ,খারিজিদের পাঁচটি লাশ পড়ে আছে এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেছে। এ অবস্থা দেখে জিয়াদ তার লোকজন নিয়ে বসরা অভিমুখে রওয়ানা করলো। বসরায় সে জানতে পারলো খারিজিরা আহওয়াজ নামক স্থানে চলে গেছে। সৈন্যের স্বল্পতাহেতু জিয়াদ আর অগ্রসর না হয়ে আমিরুল মোমেনিনকে এ বিষয় অবহিত করলো। আমিরুল মোমেনিন। জিয়াদকে ফিরে যেতে বললেন এবং সাকিল ইবনে কায়েস আররিয়াহীর নেতৃত্বে দুহাজার সৈন্যের একটা বাহিনী আহওয়াজ অভিমুখে প্রেরণ করলেন। তাছাড়া বসরার গভর্ণর আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে লেখে পাঠালেন যে ,সাকিলকে সহায়তা করার জন্য তিনি যেন দুহাজার বসরি সৈন্য প্রেরণ করেন। বসরা থেকে প্রেরিত সৈন্যদল আহওয়াজে সাকিলের সঙ্গে মিলিত হয়েছিল। তারা আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হলো। ততক্ষনে খিররীট তার লোকজন নিয়ে রামহুরমুর্য নামক পাহাড়িয়া অঞ্চলে চলে গিয়েছিল। সাকিল৷ পিছু ধাওয়া করে সেই পাহাড়গুলোর নিকটবর্তী এলাকায় তাদের ধরে ফেললো। উভয়পক্ষ নিজেদের সৈন্য বিন্যস্ত করে একে অপরকে আক্রমণ করলো। এ যুদ্ধে তিন শত সত্তর জন খারিজি নিহত হলো এবং অবশিষ্টরা পালিয়ে গেল । সাকিল এ সংবাদ আমিরুল মোমেনিনকে জানালো । শত্রুর পশ্চাদ্ধাবন করে তাদের শক্তি নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার জন্য তিনি সাকিলকে নির্দেশ দিলেন। আদেশ পাওয়ামাত্র সাকিল খিররীটের পশ্চাদ্ধাবন করে পারস্য উপসাগরের উপকূলে তাকে ধরে ফেলে। এ এলাকার লোকজনকে প্রলুব্ধ করে খিররীটি তাদের সহযোগিতা লাভ করেছিল। সেখানে পৌঁছেই সাকিল শান্তির পতাকা তুলে ধরে ঘোষণা করলেন যে ,যারা এদিক সেদিক থেকে এসেছে তারা বেরিয়ে যেতে পারে- তাদেরকে কোন শাস্তি দেয়া হবে না। এ ঘোষণার ফলে খিররীটের নিজস্ব গোত্র ছাড়া অন্য সকলে তাকে ত্যাগ করে চলে গেল। খিররীটি অবশিষ্ট লোক নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লো এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই তার দলের একশত সত্তর জন নিহত হলো। নুমান ইবনে সুহবান খিররীটের মোকাবেলা করে তাকে নিহত করে। খিররীট নিহত হবার পর শত্রুপক্ষ যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। সাকিল শত্রুপক্ষের সকল নারী - পুরুষ ও শিশুকে ক্যাম্প থেকে এনে একস্থানে জড়ো করলো। তাদের মধ্যে যারা মুসলিম ছিল তাদেরকে বায়াতের শপথের পর মুক্ত করে দিয়েছিল। যারা মুসলিম ছিল না তাদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য বলা হলো। ফলে একজন বৃদ্ধ খৃষ্টান ব্যতীত সকলেই ইসলাম গ্রহণ করে মুক্তি পেল এবং বৃদ্ধ লোকটিকে হত্যা করা হলো। তারপর সাকিল বনি নাজিয়াহর যে সব খৃষ্টান এ বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করেছিল। তাদের পরিবার - পরিজনসহ কুফা অভিমুখে ফিরে চললো। পথিমধ্যে আরদাশির খুররাহ ( ইরানের একটা শহর ) নামক স্থানে পৌছলে বন্দীরা সেখানকার গভর্ণর মাসকালাহ ইবনে হুবায়রাহ ,আশ - শায়বানির সম্মুখে চিৎকার করে রোদন করতে লাগলো যেন তিনি তাদের মুক্তির জন্য কিছু করেন। মাসকালাহ যুহল ইবনে হারিছকে সাকিলের কাছে প্রেরণ করে প্রস্তাব দিল যে ,সে বন্দীদের ক্রয় করতে ইচ্ছুক। উভয়ের মধ্যে কথা হলো এবং বন্দীর মুক্তিপণ পাঁচ লক্ষ দিরহাম সাব্যস্ত হলো। পণের অর্থ আমিরুল মোমেনিনের নিকট প্রেরণ করতে বললে মাসকালাহ বললো যে ,সে প্রথম কিস্তি তখনই পাঠিয়ে দেবে এবং সহসাই অবশিষ্ট অর্থ পাঠিয়ে দেবে। কুফায় পৌছে সাকিল আমিরুল মোমেনিনকে সবিস্তারে ঘটনাবলী অবহিত করলে তিনি সাকিলের কার্যক্রম অনুমোদন করলেন। কিন্তু দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও মাসকালাহর কোন সাড়া না পেয়ে তার কাছে বার্তাবাহক প্রেরণ করে খবর দেয়া হলো যে ,সে যেন পণের অর্থ প্রেরণ করে ,না হয়নিজে এসে দেখা করে। মাসকালাহ কুফায় এসে আমিরুল মোমেনিনকে দুলক্ষ দিরহাম দিয়ে গেল এবং অবশিষ্ট অর্থ না দেয়ার কৌশল হিসাবে মুয়াবিয়ার কাছে চলে গেল। মুয়াবিয়া তাকে তাবারাস্তানের শাসনকর্তা হিসাবে নিয়োগে করলো। এ ঘটনা জানতে পেরে আমিরুল মোমেনিন এ ভাষণ দিয়েছিলেন।

খোৎবা- ৪৫

وفيها يحمد الله ويذم الدنيا حمد الله

الْحَمْدُ لِلَّه غَيْرَ مَقْنُوطٍ مِنْ رَحْمَتِه - ولَا مَخْلُوٍّ مِنْ نِعْمَتِه - ولَا مَأْيُوسٍ مِنْ مَغْفِرَتِه - ولَا مُسْتَنْكَفٍ عَنْ عِبَادَتِه - الَّذِي لَا تَبْرَحُ مِنْه رَحْمَةٌ - ولَا تُفْقَدُ لَه نِعْمَةٌ.

والدُّنْيَا دَارٌ مُنِيَ لَهَا الْفَنَاءُ - ولأَهْلِهَا مِنْهَا الْجَلَاءُ وهِيَ حُلْوَةٌ خَضْرَاءُ - وقَدْ عَجِلَتْ لِلطَّالِبِ - والْتَبَسَتْ بِقَلْبِ النَّاظِرِ - فَارْتَحِلُوا مِنْهَا بِأَحْسَنِ مَا بِحَضْرَتِكُمْ مِنَ الزَّادِ - ولَا تَسْأَلُوا فِيهَا فَوْقَ الْكَفَافِ ولَا تَطْلُبُوا مِنْهَا أَكْثَرَ مِنَ الْبَلَاغِ

আল্লাহর মহত্ত্ব ও দুনিয়ার হীনাবস্থা সম্পর্কে

প্রতিষ্ঠিত প্রশংসা আল্লাহর যার রহমত থেকে কেউ নিরাশ হয় না ,যার নেয়ামত থেকে কেউ বঞ্চিত হয় না ,যার ক্ষমা থেকে কেউ হতাশ হয় না এবং যার ইবাদত থেকে অহংকার বশত কেউ বিরত থাকতে পারে না। তাঁর রহমত কখনো নিরুদ্ধ হয় না এবং তাঁর নেয়ামত কখনো হারিয়ে যায় না।

এ দুনিয়া এমন এক জায়গা যার ধ্বংস অবধারিত এবং দুনিয়াবাসীর জন্য এখান থেকে প্রস্থান অনিবার্য। এ স্থান মধুর ও সবুজ। যারা দুনিয়াকে অন্বেষণ করে তাদের দিকে দুনিয়া দ্রুত এগিয়ে যায় এবং যারা দুনিয়াকে প্রত্যক্ষ করে তাদের কাছে দুনিয়া হৃদয়গ্রাহী হয়ে থাকে । সুতরাং তোমাদের কাছে উত্তম যা আছে তা নিয়ে এখান থেকে প্রস্থান কর এবং গন্তব্যে পৌছা পর্যন্ত যতটুকু প্রয়োজন তার বেশি চেয়ো না।

খোৎবা- ৪৬

عند عزمه على المسير إلى الشام

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وكَآبَةِ الْمُنْقَلَبِ وسُوءِ الْمَنْظَرِ - فِي الأَهْلِ والْمَالِ والْوَلَدِ - اللَّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِي السَّفَرِ - وأَنْتَ الْخَلِيفَةُ فِي الأَهْلِ - ولَا يَجْمَعُهُمَا غَيْرُكَ - لأَنَّ الْمُسْتَخْلَفَ لَا يَكُونُ مُسْتَصْحَباً - والْمُسْتَصْحَبُ لَا يَكُونُ مُسْتَخْلَفاً.

সিরিয়া অভিমুখে যাত্রাকালে আমিরুল মোমেনিন বলেনঃ

হে আল্লাহ ,পথ চলার কষ্ট থেকে আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি। প্রত্যাবর্তনের মর্মযন্ত্রণা ও পরিবার - পরিজন এবং সম্পদ ও সন্তানাদির ধ্বংস ও খারাপ দৃশ্য থেকে আমি তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করি। হে আল্লাহ ,তুমিই ভ্রমনকালের সহচর এবং আমাদের পরিজনদের রক্ষার জন্য তুমিই রয়েছ। তুমি ব্যতীত এ দুয়ের সঙ্গী আর কেউ নেই ,কারণ যাদেরকে পিছনে ফেলে আসা হয় তারা যাত্রাপথে সহচর হতে পারে না। আবার যারা যাত্রাপথের সহচর। তারা একই সময়ে পরিজনদের দেখাশুনাকারী হতে পারে না।

খোৎবা- ৪৭

كَأَنِّي بِكِ يَا كُوفَةُ تُمَدِّينَ مَدَّ الأَدِيمِ الْعُكَاظِيِّ تُعْرَكِينَ بِالنَّوَازِلِ وتُرْكَبِينَ بِالزَّلَازِلِ - وإِنِّي لأَعْلَمُ أَنَّه مَا أَرَادَ بِكِ جَبَّارٌ سُوءاً - إِلَّا ابْتَلَاه اللَّه بِشَاغِلٍ ورَمَاه بِقَاتِلٍ!

কুফায় দুর্যোগ আপতন সম্পর্কে

হে কুফা ,যদিও আমি দেখতে পাচ্ছি বাজারে উকাযি - এর পাকা চামড়ার মত তুমি আকর্ষিত হচ্ছো তবুও তুমি দুর্যোগ কবলিত ও সাংঘাতিক বিপদসঙ্কুল। আমি নিশ্চিতভাবে জানি যে ,কোন স্বেচ্ছাচারী যদি তোমার মন্দ করতে চায়। তবে আল্লাহ তাকে উদ্বীগ্নতার নিদারুণ যন্ত্রণা দেবেন এবং তার হত্যাকারী নিয়োজিত করে দেবেন।

____________________

১। প্রাক - ইসলামিক যুগে মক্কার সন্নিকটে প্রতি বছর একটা হাট বসতো। এর নাম ছিল উকায ’ এবং এ হাটে বেশির ভাগ চামড়া বেচাকেনা হতো। এছাড়া সাহিত্য সভাও এ হাটে অনুষ্ঠিত হতো এবং আরবগণ তাদের সাহিত্যকর্ম এতে আবৃত্তি করতো। ইসলামের যুগে হজ সমাবেশের ফলে এ হাট উঠে গেছে।

২। আমিরুল মোমেনিনের এ ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছিল। সারা দুনিয়া দেখেছে যারা ক্ষমতার দম্ভে স্বেচ্ছাচারিতা ও অত্যাচার করেছিল ,তারা কি মর্মন্তুদ ফল ভোগ করেছিল এবং রক্তপাত আর গণহত্যার দ্বারা তাদের ধ্বংস এসেছিল। জিয়াদ ইবনে আবিহ (পিতৃ পরিচয়হীন পুত্র) আমিরুল মোমেনিনের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তৃতা দেয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করলে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে পড়ে এবং সে জীবনে আর বিছানা ত্যাগ করে উঠতে পারেনি। উবায়দুল্লাহ ইবনে জিয়াদ শেষ রক্তপাত সংঘটিত করেছিল। সে কুষ্ঠরোগের শিকার হয়েছিল এবং পরিণামে রক্ত পিপাসু তরবারি তার মৃত্যু ডেকে আনলো। হাজ্জাজ ইবনে ইউছুফ আছ - ছাকাফীর নিষ্ঠুরতা তার ভাগ্যকে এমন দুরবস্থায় টেনে নিয়ে গেল যে ,তার পেটে অপ্রত্যাশিতভাবে সাপ আবির্ভূত হলো এবং নিদারুণ যন্ত্রণায় মারা গেল। উমর ইবনে হুবায়রাহ আল - ফাজারি শ্বেতীরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। খালিদ ইবনে আবদিল্লাহ আল - কাসরি বন্দী অবস্থায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে নিহত হলো। মুসাব ইবনে যুবায়ের এবং ইয়াযিদ ইবনে মুহাল্লাব তরবারির আঘাতে নিহত হয়েছিল।