রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ0%

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

লেখক: নূর হোসেন মজিদী
প্রকাশক: -
বিভাগ:

ভিজিট: 5929
ডাউনলোড: 889

পাঠকের মতামত:

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 15 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 5929 / ডাউনলোড: 889
সাইজ সাইজ সাইজ
রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত কারা ?

আমরা ভূমিকায় যেমন উল্লেখ করেছি , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর যুগ থেকে শুরু করে এ ব্যাপারে একান্ত বিরল ব্যতিক্রম বাদ দিলে প্রায় সর্বসম্মত যে মত (ইজমা) চলে এসেছে তা হচ্ছে , কোরআন মজীদে আহলে বাইত বলতে ন্যূনকল্পে হযরত ফাতেমাহ্ (সালামুল্লাহি আলাইহা) এবং হযরত আলী , হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসেন ( আঃ)-কে বুঝানো হয়েছে তেমনি আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) বলতেও ন্যূনকল্পে তাঁদেরকেই বুঝানো হয়েছে। এ বিষয়ের সমর্থনে বিভিন্ন সূত্রে বর্ণিত প্রচুর হাদীছ রয়েছে।

বর্ণনাসূত্রের বিচারে এ বিষয়ক হাদীছগুলো মুতাওয়াতির্ কিনা সে বিষয়ে পর্যালোচনায় না গিয়েও আমরা বলতে পারি যে , প্রথমতঃ এ সব হাদীছের বিষয়বস্তু ইসলামের চারটি অকাট্য জ্ঞানসূত্রের কোনোটির সাথেই সাংঘর্ষিক নয় এবং দ্বিতীয়তঃ সংশ্লিষ্ট আয়াত নাযিলকালে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর পুত্রসন্তান না থাকা ও কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে তাঁর বিবিগণ মা ছূম্ না হওয়া তথা আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত না হওয়ার প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ক হাদীছগুলো গ্রহণ করা ছাড়া সংশ্লিষ্ট আয়াতাংশের প্রায়োগিকতা থাকে না। কারণ , সে ক্ষেত্রে আদৌ তাঁর কোনো আহলে বাইত থাকে না এবং সংশ্লিষ্ট আয়াতাংশ অর্থহীন হয়ে যায়-যে ধরনের উক্তি থেকে চির জ্ঞানময় সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ্ তা আলা পরম প্রমুক্ত।

অধিকন্তু আয়াতে মুবাহালাহ্ (সূরাহ্ আলে ইমরান্ : ৬১) অনুযায়ী হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যে আমল করেন তদ্সংক্রান্ত যে তথ্যের ওপরে উম্মাহর মধ্যে ইজমা রয়েছে তা থেকেও উক্ত চারজন মহান ব্যক্তিত্বের আহলে বাইত বা আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) হওয়ার ব্যাপারে অকাট্য সমর্থন পাওয়া যায়।

নাজরানের খৃস্টান ধর্মনেতাদের কাছে ইসলামের সত্য দ্বীন ও হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর সত্যিকারের পয়গাম্বর হওয়ার বিষয়টি অকাট্যভাবে সুস্পষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও তারা ইসলাম ও হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর বিরোধিতার ব্যাপারে , বিশেষ করে হযরত ঈসা ( আঃ)-এর ব্যাপারে একগুঁয়েমি করতে থাকলে আল্লাহ্ তা আলা তাদেরকে লা ’ নতের চ্যালেঞ্জ দেয়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)কে নির্দেশ দেন ; এরশাদ করেন :

) فَمَنْ حَاجَّكَ فِيهِ مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ فَقُلْ تَعَالَوْا نَدْعُ أَبْنَاءَنَا وَأَبْنَاءَكُمْ وَنِسَاءَنَا وَنِسَاءَكُمْ وَأَنْفُسَنَا وَأَنْفُسَكُمْ ثُمَّ نَبْتَهِلْ فَنَجْعَلْ لَعْنَةَ اللَّهِ عَلَى الْكَاذِبِينَ(

“ (হে রাসূল!) আপনার কাছে প্রকৃত জ্ঞান এসে যাওয়ার পরেও যে আপনার সাথে এ ব্যাপারে ( ঈসার ব্যাপারে) বিতর্ক করে তাকে বলুন : এসো আমরা ডেকে নেই আমাদের পুত্রদেরকে ও তোমাদের পুত্রদেরকে , আমাদের নারীদেরকে ও তোমাদের নারীদেরকে এবং আমাদের নিজেদেরকে ও তোমাদের নিজেদেরকে , অতঃপর আমরা প্রার্থনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লা ’ নত করি। ” (সূরাহ্ আলে ইমরান্ : ৬১)

ইসলামের সকল মাযহাব ও ফিরক্বাহর সূত্রে বর্ণিত হাদীছ সমূহের ভিত্তিতে সমগ্র উম্মাহর কাছে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত তথ্য অনুযায়ী হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) হযরত ফাতেমাহ্ (সালামুল্লাহি আলাইহা) এবং হযরত আলী , হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসেন ( আঃ)-কে স্বীয় চাদর বা আবা-র নীচে নিয়ে নাজরানের খৃস্টানদের সাথে মুবাহালাহ্ করতে যান এবং এ সময় আল্লাহ্ তা আলার কাছে যে দো ’ আ করেন তাতে তাঁদেরকে এরাই আমার আহলে বাইত ” বলে উল্লেখ করেন। এ সংক্রান্ত হাদীছগুলোরও বিষয়বস্তু এমন যা ইসলামের অকাট্য জ্ঞানসূত্র সমূহের কোনোটির সাথেই সাংঘর্ষিক নয় এবং এ ব্যাপারে এতদ্ব্যতীত অন্য কোনো বর্ণনা নেই। এমতাবস্থায় এটিকে গ্রহণ করা ছাড়া উপায় নেই। নচেৎ ধরে নিতে হয় যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) এ আয়াত অনুযায়ী আমল করেন নি-যে ধারণা নির্দ্বিধায় প্রত্যাখ্যানযোগ্য।

লক্ষণীয় যে , সংশ্লিষ্ট আয়াত অনুযায়ী হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর জন্য তাঁর সবচেয়ে কাছের মানুষগুলোকে নিয়ে মুবাহালাহ্ করতে যাওয়া অপরিহার্য ছিলো। এ আয়াতে উভয় পক্ষে মুবাহালায় অংশগ্রহণকারীকে তিন ধরনের লোকদেরকে নিয়ে এতে অংশগ্রহণ করতে বলা হয় , তা হচ্ছে :انفسنا (আমরা নিজেরা) ,ابنئنا (আমাদের পুত্রগণ/ বংশধর পুরুষগণ) ওنسائنا (আমাদের নারীগণ/ স্ত্রী-কন্যাগণ) । এ আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশের ভিত্তিতে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ) যাদেরকে নিয়ে মুবাহালাহ্ করতে গেলেন সুস্পষ্ট যে , তাঁদের মধ্য থেকে হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসেন ( আঃ)কেابنئنا (আমাদের পুত্রগণ/ পুরুষ বংশধরগণ) হিসেবে , হযরত ফাতেমাহ্ ( আঃ)কেنسائنا (আমাদের নারীগণ অর্থাৎ প্রিয়তম নারীগণ) ও হযরত আলী ( আঃ)কেانفسنا (আমরা নিজেরা) হিসেবে সাথে নিয়ে যান। অর্থাৎ তিনি তাঁর পুরো আহলে বাইতকে সাথে নিয়ে যান।

এখানে আরো গভীরভাবে তলিয়ে চিন্তা করার বিষয় হচ্ছে এই যে , মুবাহালাহর আয়াতে যাদেরকে সাথে নিয়ে মুবাহালাহ্ করার নির্দেশ দেয়া হয় তাঁদের সম্পর্কে আভিধানিক অর্থ গ্রহণ করা হলে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর জন্য কন্যাকে নয় , বরং তাঁর স্ত্রীগণকে সাথে নিতে হতো , অথবা কন্যার সাথে সাথে স্ত্রীগণকেও সাথে নিতে হতো। অবশ্য জীবিত পুত্রসন্তান না থাকা অবস্থায় নাতিদ্বয়কে নিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা থাকলেও আভিধানিক তাৎপর্যের দৃষ্টিতে জামাতাকে সাথে নেয়ার বিষয়টি এর আওতায় আসে না। কিন্তু যেহেতু মুবাহালাহর ক্ষেত্রে রক্ত বা বৈবাহিক সম্পর্কের নিকটতম ব্যক্তিদেরকে সাথে নেয়ার যৌক্তিকতা ছিলো না এবং প্রতিপক্ষও তা দাবী করতো না , বরং দু টি আদর্শিক পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নেতার জন্য আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে যারা তাঁর নিকটতম ও পরবর্তী উত্তরাধিকারী তথা নেতার সাথে যারা ধ্বংস হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট আদর্শের চিরবিলুপ্তি ঘটবে তাঁদেরকে সাথে নিয়েই মুবাহালাহ্ করা অপরিহার্য ছিলো।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , ইসলামের সকল মত-পথের সূত্রে বর্ণিত হাদীছ-ভিত্তিক সর্বসম্মত মত অনুযায়ী হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) হযরত আলী ( আঃ)-এর সাথে তাঁর সম্পর্ককে হযরত মূসা ও হযরত হারূন ( আঃ)-এর মধ্যকার সম্পর্কের অনুরূপ বলে উল্লেখ করেছেন। এর মানে হচ্ছে , হযরত হারূন ( আঃ) যেরূপ হযরত মূসা ( আঃ)-এর আদর্শিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন , ঠিক সেভাবেই হযরত আলী ( আঃ) হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর আদর্শিক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন। এমতাবস্থায় তাঁকে সাথে নিয়ে না গেলে মুবাহালাহ্ অসম্পূর্ণ থাকতো। সম্ভবতঃ প্রতিপক্ষও এ বিষয়টি অবগত ছিলো এবং এ কারণে তাঁকে সাথে নিয়ে না গেলে তা প্রতিপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য হতো না।

অনুরূপভাবে বুঝা যায় , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) জানতেন যে , তিনি তাঁর স্ত্রীদেরকে আমাদের নারীগণ ” হিসেবে তথা আহলে বাইতের নারী সদস্য হিসেবে সাথে না নেয়ায় প্রতিপক্ষের কাছ থেকে প্রতিবাদের আশঙ্কা ছিলো না অর্থাৎ প্রতিপক্ষও জানতো যে , তাঁর স্ত্রীগণ আদর্শিক-পারিভাষিক দিক থেকে তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।

এ থেকে আরো প্রমাণিত হয় যে , পারিভাষিক অর্থে কোনো নবী বা রাসূলের আহলে বাইত বা আলে রাসূলের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য অভিধানিক অর্থে পরিবারের সদস্য বা বংশধর হওয়া অপরিহার্য নয় , বরং এর বাইরে থেকেও অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। অর্থাৎ পারিভাষিক অর্থে একজন নবী বা রাসূলের আহলে বাইত বা আলে রাসূলের অন্তর্ভুক্ত তাঁরাই যারা তাঁর আদর্শিক সত্তার অংশ এবং তাঁর আদর্শিক উত্তরাধিকারী। হযরত মূসা ( আঃ) ও হযরত হারূন ( আঃ) এবং হযরত মূসা ও হযরত ইউশা ’ বিন্ নূন্ ( আঃ)-এর মধ্যে যে সম্পর্ক ছিলো তা এ ধরনেরই এবং এ কারণেই হযরত ইউশা ’ বিন্ নূন্ ( আঃ) হযরত মূসা ( আঃ)-এর পুত্র না হওয়া সত্ত্বেও তাঁর আদর্শিক নেতৃত্বের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন। একই কারণে হযরত আলী ( আঃ) হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর পুত্র না হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে আহলে বাইত-এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিষয়টি অধিকতর সুস্পষ্ট করে তুলে ধরার জন্য উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , পারিভাষিক অর্থে একজন নবীর আহলে বাইতের সদস্যগণের জন্য পবিত্র রক্তধারা থেকে আগত হওয়া অপরিহার্য হলেও (যে সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হয়েছে) কেবল নবীর বংশধর হওয়ার কারণেই যে কেউ তাঁর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। এ কারণেই আল্লাহ্ তা আলা যেমন হযরত ইবরাহীম ( আঃ)-এর পাপাচারী বংশধরদেরকে ইমামতের প্রতিশ্রুতির বাইরে রেখেছেন (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ১২৪) , অনুরূপভাবে তিনি হযরত নূহ্ ( আঃ)কে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে , তাঁর পাপাচারী পুত্র তাঁর আহল্-এর অন্তর্ভুক্ত নয় (সূরাহ্ হূদ্ : ৪৬) । এর মানে হচ্ছে , একজন নবীর আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্তি পবিত্র রক্তধারা থেকে হলেও কেবল পবিত্র রক্তধারার কারণে নয় , বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুণগত অবস্থার কারণে হয়ে থাকে।

বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের জবাব

রাসূলে আকরাম হযরত মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইত ও আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) কারা এ ব্যাপারে ইসলামের প্রথম যুগের মতৈক্যের বরখেলাফে কোনো কোনো মহল থেকে বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। অবশ্য তাদের বিভ্রান্তি এক ধরনের নয় , বরং বিভিন্ন ধরনের। এখানে আমরা তাদের কয়েকটি ব্যাপক প্রচারিত বিভ্রান্তির জবাব দেয়া প্রয়োজন মনে করছি।

তাদের একটি বিভ্রান্তিকর মত হচ্ছে এই যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইত হচ্ছেন কেবল তাঁর স্ত্রীগণ-যা কথাটির আভিধানিক অর্থের দাবী। তাদের আরেকটি বিভ্রান্তিকর মত হচ্ছে এই যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইত হচ্ছেন মূলতঃ তাঁর স্ত্রীগণ , তবে নবী করীম (ছ্বাঃ)-এর আবেদনের প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা আলা তাঁর কন্যা , জামাতা ও নাতিদেরকে এর অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছেন।

তাদের এ দাবী যে ভিত্তিহীন তা আমরা ওপরে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরেছি-যা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে , আহলে বাইতের শা নে নাযিলকৃত আয়াত্-যা আয়াতে তাতহীর্ ” নামে মশহূর্-হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর স্ত্রীদের বেলায় প্রযোজ্য নয়। সুতরাং তাঁরা এককভাবে বা হযরত ফাতেমাহ্ (সালামুল্লাহি আলাইহা) এবং হযরত আলী , হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হোসেন ( আঃ)-এর সাথে আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত নন।

তাদের সৃষ্ট আরেকটি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য হচ্ছে এই যে , ইসলামে রক্তধারার বিশেষ মর্যাদা নেই। এর ভিত্তিতে তারা প্রশ্ন তুলেছে যে , রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বংশধরদের মধ্যকার পাপাচারী লোকদেরকেও আহলে বাইত ও আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) হিসেবে সম্মান দিতে হবে কিনা ?

বলা বাহুল্য যে , তাদের এ বিভ্রান্তি একটি অপযুক্তি (ফ্যালাসি) মাত্র। কারণ , নবুওয়াত্ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামতের গুরুদায়িত্ব কেবল পবিত্র রক্তধারার মানুষের পক্ষেই বহন করা সম্ভব এবং এ কারণে আল্লাহ্ তা আলা এ দায়িত্ব কেবল পবিত্র রক্তধারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রেখেছেন। এ ব্যাপারে আমরা পরে আলোচনা করেছি। আর রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) বংশধরদের মধ্যকার পাপাচারীদেরকে সম্মান প্রদর্শনের প্রশ্নটি একটি অবান্তর প্রশ্ন। কারণ , আলোচ্য ক্ষেত্রে আহলে বাইত ও আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) কথাগুলো পারিভাষিক অর্থে ব্যবহার করা হয় , আভিধানিক অর্থে নয়। তাই কেউই রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) বংশধরদের মধ্যকার পাপাচারীদেরকে আহলে বাইত ও আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করেন না , বরং বিশেষভাবে ’ হযরত হযরত ফাতেমাহ্ (সালামুল্লাহি আলাইহা) ও হযরত আলী ( আঃ) এবং তাঁদের বংশে আগত এগারো জন ইমামকে এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা হয় , যদিও সম্প্রসারিত অর্থে ’ অনেকে রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) বংশধরদের মধ্যকার সমস্ত নেককার ও বুযুর্গ ব্যক্তিদেরকে আহলে বাইত ও আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করে থাকেন। আর হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)কে প্রদত্ত আল্লাহ্ তা আলার প্রতিশ্রুতি কেবল আহলে বাইত ও আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ক্ষেত্রে বিশেষ ও পারিভাষিক অর্থেই প্রযোজ্য।

তাদের আরেকটি বিভ্রান্তিকর বক্তব্য হচ্ছে এই যে , আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) বলতে রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় ছাহাবীও অন্তর্ভুক্ত। এমনকি কেউ কেউ এমনটিও দাবী করছে যে , আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ) বলতে গোটা উম্মাতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ)কেই বুঝানো হয়েছে। এ দু টি সংজ্ঞার মধ্যে কোনোটিই আল্ ” কথাটির প্রচলিত সংজ্ঞার পর্যায়ভুক্ত নয় এবং আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর ক্ষেত্রে কোনোটির প্রযোজ্যতার সপক্ষে কোনো অকাট্য দলীল নেই , তবে দ্বিতীয়টি নিয়ে আলোচনা অবান্তর। কারণ , জ্ঞানী-মূর্খ ও নেককার-বদকার নির্বিশেষে প্রচলিত সংজ্ঞার উম্মাতে মুহাম্মাদীর (ছ্বাঃ) সকলে আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর অন্তর্ভুক্ত এবং নামাযে আমরা তাঁদের প্রতি দরূদ পাঠাবার জন্য আল্লাহ্ তা আলার কাছে আবেদন জানাই এমন দাবী পাগল ছাড়া কারো কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।

তবে প্রথমটি যদি আমরা যুক্তির খাতিরে মেনে নেই তো সে ক্ষেত্রে আমরা এর প্রবক্তাদের কাছে সেই ব্যক্তিদের নামের তালিকা চাইতে পারি যাদেরকে তারা আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর অন্তর্ভুক্ত বলে দাবী করতে চাচ্ছে। অতঃপর তাঁদের আমল বিচার করে দেখতে হবে যে , আয়াতে তাতহীর্ তাঁদের বেলা প্রযোজ্য কিনা। তাঁদের কারো আমলে আল্লাহ্ তা আলার বিধানের লঙ্ঘন পাওয়া গেলে[ উদাহরণ স্বরূপ , ইসলাম গ্রহণের পূর্বে শিরকে লিপ্ত থাকা , ইসলাম গ্রহণের পরে নবী করীম ( ছ্বাঃ )- এর নবুওয়াতে সন্দেহ প্রকাশ করা বা তাঁর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা , শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকে প্রমাণিত যেনাকারকে শাস্তিদান থেকে বিরত থাকা , কারো বৈধ সম্পদ বাযেয়াফ্ত করা , কোরআনের সুস্পষ্ট বিধানের বরখেলাফে আইন জারী করা , কোরআনে ঘোষিত যাকাতের হক্ব্ থেকে কাউকে বঞ্চিত করা , স্বজনপ্রীতির পরিচয় দেয়া ইত্যাদি ] নিঃসন্দেহে আয়াতে তাত্বহীর্ তাঁর বেলা প্রযোজ্য হবে না। আমরা তাঁদের সমালোচনার দফতর খুলে বসতে চাই না , কিন্তু যে মর্যাদা তাঁদের নয় সে মর্যাদা তাঁদেরকে দিতে চাইলে অবশ্যই তাঁদেরকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অধিকার মানতে হবে। কারণ , তাঁরা আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী-রাসূল বা ইমাম ও মা ছূম্ নন যে , তাঁদেরকে সমালোচনার উর্ধে গণ্য করে চোখ বুঁজে আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর অন্তর্ভুক্ত বলে মেনে নিতে হবে।

প্রকৃত পক্ষে যারা রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর বিবিগণকে ও ছাহাবীদেরকে তাঁর আহলে বাইত ( আঃ)-এর বা আল্-এর অন্তর্ভুক্ত বলে দাবী করছে তাদের এ দাবীর সাথে সাধারণভাবে আহলে সুন্নাতের আহলে বাইত সংক্রান্ত আক্বীদাহর সম্পর্ক নেই। কারণ , আহলে সুন্নাতের মধ্যে নামাযের বাইরে বিভিন্নভাবে দরূদ পাঠ করতে দেখা যায়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে :

اللهم صل علی سيدنا و نبينا و شافعنا و مولانا محمد و علی آله و اصحابه و ازواجه اجمعين

“ হে আল্লাহ্! আমাদের নেতা , আমাদের নবী , আমাদের শাফা ’ আতকারী ও আমাদের মাওলা মুহাম্মাদের প্রতি এবং তাঁর আল্ , তাঁর ছাহাবীগণ ও তাঁর স্ত্রীদের-সকলের-প্রতি দরূদ প্রেরণ করো। ”

আবার এভাবেও পড়া হয় :

اللهم صل علی سيدنا و نبينا و شافعنا و مولانا محمد. صل الله عليه و علی آله و اصحابه و ازواجه اجمعين

“ হে আল্লাহ্! আমাদের নেতা , আমাদের নবী , আমাদের শাফা ’ আতকারী ও আমাদের মাওলা মুহাম্মাদের প্রতি দরূদ প্রেরণ করো ; আল্লাহ্ তাঁর প্রতি এবং তাঁর আল্ , তাঁর ছাহাবীগণ ও তাঁর স্ত্রীদের-সকলের-প্রতি দরূদ প্রেরণ করেন। ”

যারা এ দরূদ পাঠ করেন তাঁরা নিশ্চয়ই রাসূলুল্লাহ্ (ছ্বাঃ)-এর ছাহাবীগণকে ও তাঁর স্ত্রীগণকে তাঁর আল্-এর অন্তর্ভুক্ত মনে করেন না বলেই তাঁদের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেন।

বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের আরেকটি বিভ্রান্তিকর অপযুক্তি হচ্ছে এই যে , আয়াতে তাত্বহীরে আল্লাহ্ তা আলা আহলে বাইতকে পবিত্র করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন , তাঁদেরকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেন নি অর্থাৎ তাঁদেরকে পবিত্র হতে বলেছেন। তারা এ ব্যাপারে ওযূ প্রসঙ্গ উত্থাপন করে এবং বলে যে , আল্লাহ্ তা আলা সে ক্ষেত্রে মু মিনাদেরকে পবিত্র করার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন যার মানে তিনি মু মিনাদেরকে পবিত্র হতে বলেছেন , তাদেরকে পবিত্র বলে ঘোষণা করেন নি।

এদের এ অপযুক্তির প্রথম জবাব হচ্ছে এই যে , ওযূর মাধ্যমে পবিত্র করণের যে ইচ্ছা আল্লাহ্ তা আলা ব্যক্ত করেছেন তাতে আহলে বাইতের সদস্যগণও শামিল রয়েছেন , তাহলে আয়াতে তাত্বহীরে তাঁদেরকে পুনরায় পবিত্র করতে চাওয়ার মানে কী ? এ থেকে সুস্পষ্ট যে , এতদুভয় ক্ষেত্রে দুই ধরনের পবিত্রতার কথা বলা হয়েছে : সাধারণ ও বিশেষ। ওযূর ক্ষেত্রে পবিত্রতার মানে হচ্ছে ইবাদতের পূর্বপ্রস্তুতি ও পূর্বশর্ত হিসেবে এক ধরনের শারীরিক-মানসিক পবিত্রতা। আর আয়াতে তাত্বহীরে পরিপূর্ণরূপে পবিত্রতা ’ র মানে হচ্ছে সর্বাবস্থায় মানসিক , আত্মিক ও চৈন্তিক পবিত্রতা-যা গুনাহ্ ও ভুল থেকে ফিরিয়ে রাখে।

এদের অপযুক্তির দ্বিতীয় জবাব হচ্ছে এই যে , আল্লাহ্ তা আলা জানেন যে , আহলে বাইতের সদস্যগণ তাঁদের পবিত্র রক্তধারার কারণে সর্বাবস্থায় মানসিক , আত্মিক ও চৈন্তিক ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ পবিত্রতা ’ র অধিকারী থাকা এবং গুনাহ্ ও ভুল থেকে মুক্ত থাকার উপযুক্ততার অধিকারী ’ , অতঃপর তাঁরা চাইলে এরূপ থাকতে পারবেন। কিন্তু অন্যরা এ জন্য উপযুক্ততার অধিকারী ’ নয় , সুতরাং তারা চেষ্টা করলে পবিত্রতার অধিকারী থাকতে ও বড় বড় গুনাহ্ থেকে মুক্ত থাকতে পারবে বটে , তবে যে কোনো সময়ই তাদের ভুল ও বিচ্যুতির সম্ভাবনা রয়েছে , তাই তাদের পক্ষে পরিপূর্ণ ’ পবিত্রতার অধিকারী হওয়া সম্ভব হবে না।[ আল্লাহ্ তা আলা যে , তাঁর মনোনীত নবী - রাসূল ইমামগণ এবং অন্যান্য খাছ বান্দাহর কাছ থেকে গুনাহে লিপ্ত হবার ক্ষমতা কেড়ে নেন নি এবং কেন নেন নি সে সম্পর্কে পরে আলোচনা করা হয়েছে এবং তাঁদের ইছমাত্ বা পাপমুক্ততা অর্থেই। ]