রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ0%

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

লেখক: নূর হোসেন মজিদী
প্রকাশক: -
বিভাগ:

ভিজিট: 5930
ডাউনলোড: 889

পাঠকের মতামত:

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 15 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 5930 / ডাউনলোড: 889
সাইজ সাইজ সাইজ
রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

রাসূলুল্লাহর (ছ্বাঃ) আহলে বাইত ও বিবিগণ

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

কোরআন মজীদে ইমামত

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন নিজের পক্ষ থেকে হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)কে মানব জাতির জন্য ইমাম বা নেতা মনোনীতকরণ সম্পর্কে এরশাদ করেন :

) وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا(

“ আর ইবরাহীমকে যখন তার রব কয়েকটি কথা দ্বারা পরীক্ষা করলেন এবং সে তা (সাফল্যের সাথে) সমাপ্ত করলো (তাতে উত্তীর্ণ হলো) তখন তিনি (তার রব/ আল্লাহ্) বললেন : অবশ্যই আমি তোমাকে মানব জাতির জন্য নেতা (ইমাম) মনোনীতকারী। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ১২৪)

তখন হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ) বললেন :

) وَمِنْ ذُرِّيَّتِي(

“ আর আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও কি (ইমাম নিয়োগ করা হবে) ? (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ১২৪)

জবাবে আল্লাহ্ তা আলা বললেন :

) لا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ(

“ (হ্যা , অবশ্যই নিয়োগ করবো , তবে) আমার এ অঙ্গীকার যালেমদের জন্য নয়। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ১২৪)

এ থেকে সুস্পষ্ট যে , এখানে হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে পরিপূর্ণ নেককার ’ দের ব্যাপারে এ অঙ্গীকার করা হয়েছে। আর আমরা জানি যে , তাঁর বংশধরদের মধ্য থেকে বহু নবী-রাসূলের ( আঃ) আবির্ভাব হয়েছিলো এবং তাঁদের অনেকে নিজ নিজ যুগে দ্বীনী নেতৃত্বের (ইমাতের) অধিকারী ছিলেন। এছাড়াও তাঁদের মধ্যে অনেকে নবুওয়াত্ ছাড়াই ঐশী হেদায়াতপ্রাপ্ত ইমাম ছিলেন। অতএব , এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই যে , আমরা নামাযে যে দরূদ পাঠ করি তাতে যে আলে ইবরাহীম্ ” -এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার দ্বারা মূলতঃ হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)-এর বংশে আগত নবী-রাসূলগণ ও আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত নিষ্পাপ ইমামগণকে ( আঃ) বুঝানো হয়েছে। আর আলে মুহাম্মাদের (ছ্বাঃ) প্রতি আলে ইবরাহীমের ( আঃ) প্রতি কৃত ছালাতের অনুরূপ ছালাত্ করার জন্য আল্লাহ্ তা আলার কাছে আবেদন জানানোর মাধ্যমে কার্যতঃ আমরা আলে মুহাম্মাদের (ছ্বাঃ) জন্য আলে ইবরাহীমের সমতুল্য ’ মর্যাদার বিষয়টিই স্বীকার করে থাকি। অর্থাৎ আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর তথা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইত-এর সদস্যগণ নবী-রাসূল না হলেও তাঁদের মর্যাদা আলে ইবরাহীমের তথা হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)-এর বংশে আগত নবী-রাসূলগণের ও আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামগণের ( আঃ) সমতুল্য।

এখানে স্বভাবতঃই প্রশ্ন জাগে যে , আলে মুহাম্মাদ (ছ্বাঃ)-এর তথা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর আহলে বাইত-এর সদস্যগণ যখন নবী-রাসূল নন তখন কীভাবে ও কী কারণে তাঁদের মর্যাদা হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)-এর বংশে আগত নবী-রাসূলগণ ( আঃ)-এর মর্যাদার সমতুল্য হতে পারে ?

এ প্রশ্নের জবাব আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)কে নেতা বা ইমাম নিয়োগ এবং এরপর পরবর্তী নেতা বা ইমামগণ সম্বন্ধে তাঁর প্রশ্ন ও আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে প্রদত্ত জবাবের মধ্যে নিহিত রয়েছে।

হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)কে ইমাম নিয়োগের ঘটনা থেকে প্রমাণিত হয় যে , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত ” নেতা বা ইমামের মর্যাদা অত্যন্ত সমুন্নত।[ এখানে আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে যে , মর্যাদা কেবল আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামের ; কোনো পার্থিব নেতৃত্বের জন্য নয় , এমনকি মুসলিম জনগণের দ্বারা নির্বাচিত কোনো দ্বীনী নেতার জন্যও মর্যাদা নয় , তা সে নেতা মুসলিম জনগণের সর্বসম্মতিক্রমেই নেতৃত্বে অধিষ্ঠিত হোন না কেন। ] কারণ , হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ) দীর্ঘ বহু বছর যাবত রিসালাতের দায়িত্ব পালন করেন এবং বহু কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ; কেবল এর পরেই আল্লাহ্ তা আলা তাঁকে নেতা বা ইমাম মনোনীত করেন। তাই হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ) ও হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) সহ খুব সীমিত সংখ্যক রাসূলই ( আঃ) আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে ইমাম মনোনীত হয়েছিলেন।

প্রকৃত ব্যাপার হলো , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত খাছ্ প্রতিনিধিত্বের বিষয়টি পরিস্থিতির প্রয়োজনভেদে বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। এ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কখনো নবী পাঠান , কখনো রাসূল পাঠান ও কখনো ইমাম নিয়োগ করেন ; কখনো রাসূলকে একই সাথে ইমাম হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন এবং কখনো নতুন কোনো ওয়াহীর প্রয়োজন না থাকায় মওজূদ ওয়াহীর ভিত্তিতে লোকদেরকে হেদায়াত ও পরিচালনার জন্য শুধু ইমাম নিয়োগ করেন।

আল্লাহ্ তা আলা হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)-এর নেককার বংশধরদেরকে ইমামত প্রদানের যে প্রতিশ্রুতি দেন তদনুযায়ী হযরত ইসহাক্ব ও হযরত ইয়া ’ ক্বূব্ ( আঃ) সহ-যারা ছিলেন নবী-অনেককে ইমামত প্রদান করেন। এরশাদ হয়েছে :

) وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ نَافِلَةً وَكُلا جَعَلْنَا صَالِحِينَ. وَجَعَلْنَاهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا وَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِمْ فِعْلَ الْخَيْرَاتِ وَإِقَامَ الصَّلاةِ وَإِيتَاءَ الزَّكَاةِ وَكَانُوا لَنَا عَابِدِينَ(

“ আর আমি তাকে (ইবরাহীমকে) দান করলাম ইসহাক্বকে ও অতিরিক্ত (দান করলাম) ইয়াকূবকে এবং (তাদের) প্রত্যেককেই আমি সৎকর্মশীল বানিয়েছি। আর তাদেরকে ইমাম বানিয়েছি যারা আমার আদেশে লোকদেরকে পরিচালিত করতো এবং তাদেরকে উত্তম কর্ম সম্পাদন , নামায ক্বায়েম রাখা ও যাকাত প্রদানের বিষয়ে ওয়াহী করেছি , আর তারা ছিলো আমার ইবাদতকারী (অনুগত বান্দাহ্) । (সূরাহ্ আল্-আম্বিয়া ’ : ৭২-৭৩)

উপরোদ্ধৃত আয়াত দু টির মধ্যে প্রথম আয়াতে দু জন নবীর কথা বলা হলেও দ্বিতীয় আয়াতে ইমাম বানানো প্রসঙ্গে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় যে , হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)-এর বংশধরদের মধ্য থেকে কেবল উপরোক্ত দু জন নবী ( আঃ)ই ইমাম মনোনীত হন নি , বরং দু জন নবীর নামোল্লেখ ও অন্য ইমামগণের নামোল্লেখ না করার ফলে এ সম্ভাবনা প্রবল হয়ে ওঠে যে , অন্য ইমামগণ নবী ছিলেন না , তবে নবী না হলেও তাঁরা মওজূদ ওয়াহীর পাশাপাশি ঐশী ইলহাম্-এর ভিত্তিতে লোকদেরকে পরিচালনা করতেন।

[প্রচলিত ইলহাম্ পরিভাষার অর্থে কোরআন মজীদে ওয়াহী শব্দ ব্যবহারের একাধিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। অর্থাৎ ইলহাম্ হচ্ছে ওয়াহীয়ে গায়রে মাত্লূ -যা পঠনযোগ্য আয়াত নয়। অন্যদিকে হেদায়াতের এক অর্থ নীতিগতভাবে পথনির্দেশ করা এবং আরেক অর্থ হচ্ছে কার্যতঃ পরিচালনা করা। প্রথমোক্ত ধরনের ওয়াহী-যাকে কোরআন মজীদের ভাষায় ও পারিভাষিক অর্থে উভয় ক্ষেত্রেই ওয়াহী বলা হয় তা হচ্ছে আল্লাহর কিতাবের আয়াত এবং দ্বিতীয়োক্ত ধরনের ওয়াহী-যাকে কোরআন মজীদের ভাষায় ওয়াহী ও পারিভাষিক অর্থে ইলহাম্ বলা হয় তা আল্লাহর কিতাবের আয়াত নয়। বরং এ হচ্ছে আয়াত থেকে সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ ও তার সঠিক বাস্তব প্রয়োগের জন্য পরোক্ষ ঐশী পথনির্দেশ। আল্লাহ্ তা আলা তাঁর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামগণ সম্পর্কে আমরিনা (আমার আদেশ) বলতে একেই বুঝিয়েছেন। এ ছাড়া এ থেকে ভিন্ন কোনো তাৎপর্য গ্রহণের সুযোগ নেই।]

অবশ্য উপরোক্ত আয়াত দু টি থেকে এরূপ অর্থও গ্রহণ করা যেতে পারে যে , এতে স্বয়ং হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)কে শামিল করে বহুবচন ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এ থেকে প্রমাণিত হয় না যে , নবী নন আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত এমন কোনো ইমামের অস্তিত্ব ছিলো না। কারণ , আল্লাহ্ তা আলা অন্যত্র হযরত মূসা ( আঃ)কে কিতাব প্রদান ও তাঁকে বানী ইসরাঈলের জন্য পথপ্রদর্শক বানানোর কথা উল্লেখ করার পর এরশাদ করেছেন :

) وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ( .

“ আর যতোক্ষণ পর্যন্ত তারা (বানী ইসরাঈল) ধৈর্য ধারণ করে এবং আমার আয়াত সমূহের প্রতি ইয়াক্বীন পোষণ করতো ততোক্ষণ পর্যন্ত আমার আদেশক্রমে পথপ্রদর্শনের জন্য আমি তাদের মধ্য থেকে (বহু ব্যক্তিকে) ইমাম বানিয়েছিলাম। ” (সূরাহ্ আস্-সাজদাহ্ : ২৪)

এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে , হযরত ইবরাহীম্ ( আঃ)কে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী তাঁর বংশধরদের মধ্যকার নেককার ব্যক্তিদের মধ্য থেকে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে ইমাম নিয়োগের বিষয়টি কেবল নবী-রাসূলগণের ( আঃ) মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন যে , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নবী-রাসূল ও ইমাম মনোনয়নের উদ্দেশ্য বিনা কারণে কেবল তাঁর কতক বান্দাহকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা নয় , বরং এ সব পদ হচ্ছে কতক দায়িত্ব পালনের পদ ; দায়িত্বের প্রয়োজনে ব্যতীত আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে এ সব পদে কাউকে মনোনীতকরণ অকল্পনীয়। আর আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত নবী-রাসূলগণের ( আঃ) দায়িত্ব ছিলো তাঁর বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। অন্যদিকে আল্লাহর মনোনীত নেতা বা ইমামের দায়িত্ব ঐশী হেদায়াত অনুযায়ী আল্লাহর বান্দাহদেরকে সঠিক পথ দেখানো ও সে পথে পরিচালিত করা , আর যে সব নবী-রাসূল ( আঃ) একই সাথে ইমাম বা নেতা ছিলেন তাঁরা আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়ার সাথে সাথে এ দায়িত্বও পালন করেছেন।

এখানে বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য বিষয় হচ্ছে এই যে , আল্লাহ্ তা আলার পূর্ণাঙ্গ বাণী (কোরআন মজীদ) নাযিল করা ও তা সংরক্ষিত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার পর আর আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নতুন কোনো নবী বা রাসূল প্রেরণের প্রয়োজনীয়তা থাকে নি। কিন্তু আল্লাহ্ তা আলার বাণীর সঠিক তাৎপর্য গ্রহণ ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং তদনুযায়ী আল্লাহর বান্দাহদেরকে পরিচালনার প্রয়োজনীয়তা একইভাবে থেকে যায়। আর বলা বাহুল্য যে , পাপমুক্ততা ও নির্ভুলতার নিশ্চয়তা বিহীন কোনো ব্যক্তির পক্ষে এ দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়। অতএব , নবীর অবর্তমানে এ দায়িত্ব পালন করার জন্য আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত নিষ্পাপ ও ভুলমুক্ত নেতা বা ইমাম মনোনীত হওয়া অপরিহার্য। নচেৎ বান্দাহদের জন্য আল্লাহ্ তা আলার হুজ্জাত্ পূর্ণ হওয়া সম্ভব নয় , ফলে বান্দাহ্ ইখলাছ সহকারে সঠিক ফয়ছালায় উপনীত হবার চেষ্টা করা সত্ত্বেও ভ্রান্তিতে নিপতিত হলে সে জন্য পাকড়াও-এর উপযোগী হবে না। আরো এগিয়ে বলতে হয় যে , আল্লাহ্ তা আলা নবীর অবর্তমানে তাঁর বান্দাহ্দেরকে এরূপ একটি অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে ফেলে রাখবেন তিনি এ ধরনের দুর্বলতা থেকে প্রমুক্ত।

এ প্রসঙ্গে আরো লক্ষণীয় বিষয় এই যে , নবী-রাসূল নন এমন ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নেতা বা ইমাম নিয়োগের বিষয়টি যে কেবল হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ওফাতের পরেই প্রাসঙ্গিক হয়েছে , এর পূর্বে প্রাসঙ্গিক ছিলো না তা নয়-যা ইতিমধ্যেই আমরা কোরআন মজীদের আয়াত উল্লেখ করে প্রমাণ করেছি। বস্তুতঃ অতীতে বিভিন্ন নবী-রাসূলের ( আঃ) আবির্ভাবের মধ্যবর্তী অন্তর্বর্তী কালে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে এ ধরনের নেতা বা ইমাম নিয়োগ করা হয়েছে তা পুরোপুরি সুনিশ্চিত। তেমনি একজন নবীর উপস্থিতিতে তাঁর সহায়তার জন্য যেমন আরো নবী মনোনীত করার দৃষ্টান্ত রয়েছে[ যেমন : হযরত মূসা ( আঃ )- এর সাথে হযরত হারূন্ ( আঃ )] তেমনি একজন নবীর উপস্থিতিতে তাঁর সহায়তার জন্য ইমাম , নেতা বা প্রশাসক মনোনীত করণের দৃষ্টান্তও রয়েছে-যা আমরা পরে উল্লেখ করেছি।

আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন এরশাদ করেন :

) وَنُرِيدُ أَنْ نَمُنَّ عَلَى الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا فِي الأرْضِ وَنَجْعَلَهُمْ أَئِمَّةً وَنَجْعَلَهُمُ الْوَارِثِينَ(

“ আর আমি ইচ্ছা করি যে , ধরণীর বুকে যাদেরকে দুর্বল করে রাখা হয়েছে তাদের ওপর অনুগ্রহ করি এবং তাদেরকে নেতা (ইমাম) বানাই আর তাদেরকে উত্তরাধিকারী বানাই। ” (সূরাহ্ আল্-ক্বাছাছ ¡ : ৫)

এ আয়াতে যে কেবল এমন নেতার কথা বলা হয়েছে যারা একই সাথে নবী-রাসূল ছিলেন তা নয়। বরং বুঝা যায় যে , কোনো নবীর কাছে আগত হেদায়াত বিকৃত হওয়া ও নতুন করে হেদায়াত সহকারে নতুন নবীর আগমন ঘটার পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালে পূর্ববর্তী অবিকৃত হেদায়াত অনুযায়ী লোকদেরকে পরিচালনা করার জন্য আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নবী-রাসূলের গুণাবলী সম্পন্ন বিভিন্ন নেতা বা ইমাম মনোনীত করা হয়েছিলো এবং উক্ত আয়াতে তাঁদের কথাই বলা হয়েছে।

অন্যদিকে আয়াত সমূহের পূর্বাপর ধারাবাহিকতা অনুযায়ী দৃশ্যতঃ এ আয়াতে বানী ইসরাঈলকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার কথা বলা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হলেও এ থেকে আল্লাহ্ তা আলার একটি স্থায়ী নীতির দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় যা কোনো স্থান ও কালের গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

শুধু তা-ই নয় , বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয় এই যে , আল্লাহ্ তা আলা এ আয়াতে বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল (مضارع ) বাচক ক্রিয়াপদنُرِيدُ (আমি ইচ্ছা করি) ব্যবহার করেছেন , অতীত কাল বাচক ক্রিয়াপদ (ارادتُ/ ارادنا ) ব্যবহার করেন নি। এখানে কেবল বানী ইসরাঈলের বিষয়টি বুঝানো উদ্দেশ্য হলে অতীত কালের ক্রিয়াপদ ব্যবহার করাই বিধেয় হতো। তার পরিবর্তে বর্তমান ও ভবিষ্যতকাল (مضارع ) বাচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার থেকে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হয় যে , উক্ত আয়াত নাযিলকালের পরবর্তীকালের জন্যও আল্লাহ্ তা আলার এ ইচ্ছা প্রযোজ্য।

অবশ্য এখানে অতীত কালের ক্রিয়াপদ ব্যবহার করা হলেও তার প্রয়োগ ভবিষ্যতের সব সময়ের জন্য প্রযোজ্য হতো , কারণ , আল্লাহ্ তা আলা এ আয়াতে সুনর্দিষ্টভাবে বানী ইসরাঈলের কথা বলেন নি , বরং ধরণীর বুকে দুর্বল করে রাখা লোকদেরকে ’ ব্যবহার করেছেন-যা থেকে সুস্পষ্ট যে , এটি একটি সাধারণ নীতি। তা সত্ত্বেও কারো পক্ষে হয়তো তাঁর এ ইচ্ছা কেবল বানী ইসরাঈলের জন্য ছিলো বলে মনে করা সম্ভব হতো , কিন্তু বর্তমান ও ভবিষ্যত কাল বাচক ক্রিয়াপদ ব্যবহারের ফলে কোরআন নাযিলের সময় থেকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত এর প্রযোজ্যতা অস্বীকার করার আর কোনো সুযোগই থাকছে না।

অন্যদিকে যদিও অন্য অনেক ভাষার ন্যায় আরবী ভাষায়ও ক্ষেত্রবিশেষে অতীত কালের জন্য বর্তমান কালের ক্রিয়াপদ ব্যবহারেরও সুযোগ আছে , তবে তাতে যদি এমন নিদর্শন না থাকে যে , তার কার্যকরিতা কেবল অতীতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ সে ক্ষেত্রে তার কার্যকরিতা অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যত তিন কালেই পরিব্যাপ্ত হবে। আলোচ্য আয়াতের ক্ষেত্রেও তা-ই।

আল্লাহর পক্ষ থেকে শাসক মনোনয়ন : ত্বালূত্-এর দৃষ্টান্ত

আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নবী ছাড়াও ইমাম বা শাসক ও নেতা মনোনীত করার একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে আল্লাহর নবী হযরত শামূয়িল্ ( আঃ)-এর সহকারী হিসেবে বানী ইসরাঈলের ওপর ত্বালূত্-কে শাসক হিসেবে মনোনয়ন।

আল্লাহ্ তা আলা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর উদ্দেশে এরশাদ করেছেন :

) أَلَمْ تَرَ إِلَى الْمَلإ مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ مِنْ بَعْدِ مُوسَى إِذْ قَالُوا لِنَبِيٍّ لَهُمُ ابْعَثْ لَنَا مَلِكًا نُقَاتِلْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ قَالَ هَلْ عَسَيْتُمْ إِنْ كُتِبَ عَلَيْكُمُ الْقِتَالُ أَلا تُقَاتِلُوا قَالُوا وَمَا لَنَا أَلا نُقَاتِلَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَقَدْ أُخْرِجْنَا مِنْ دِيَارِنَا وَأَبْنَائِنَا فَلَمَّا كُتِبَ عَلَيْهِمُ الْقِتَالُ تَوَلَّوْا إِلا قَلِيلا مِنْهُمْ وَاللَّهُ عَلِيمٌ بِالظَّالِمِينَ. وَقَالَ لَهُمْ نَبِيُّهُمْ إِنَّ اللَّهَ قَدْ بَعَثَ لَكُمْ طَالُوتَ مَلِكًا قَالُوا أَنَّى يَكُونُ لَهُ الْمُلْكُ عَلَيْنَا وَنَحْنُ أَحَقُّ بِالْمُلْكِ مِنْهُ وَلَمْ يُؤْتَ سَعَةً مِنَ الْمَالِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ اصْطَفَاهُ عَلَيْكُمْ وَزَادَهُ بَسْطَةً فِي الْعِلْمِ وَالْجِسْمِ وَاللَّهُ يُؤْتِي مُلْكَهُ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ( .

“ (হে রাসূল!) আপনি কি মূসার পরবর্তী বানী ইসরাঈলের ঐ লোকদেরকে দেখেন নি ?-যখন তারা তাদের নবীকে বললো : আমাদের জন্য একজন রাজা নিযুক্ত করুন যাতে আমরা (তার অধিনায়কত্বে) আল্লাহর পথে যুদ্ধ করতে পারি। ” তখন সে (উক্ত নবী) বললো : তোমাদের বেলায় বিষয়টি এমন হবে না তো যে , তোমাদের ওপর যদি যুদ্ধ ফরয করে দেয়া হয় তখন তোমরা যুদ্ধ করবে না ? জবাবে তারা বললো : এটা কী করে সম্ভব যে , আমরা আমাদের বাড়ী-ঘর থেকে ও আমাদের সন্তানদের কাছ থেকে বহিষ্কৃত হওয়া সত্ত্বেও আমরা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করবো না ? কিন্তু এরপর যখন তাদের জন্য যুদ্ধকে ফরয করে দেয়া হলো তখন তাদের মধ্যকার স্বল্পসংখ্যক ব্যতীত তারা পৃষ্ঠপ্রদর্শন করলো ; আর আল্লাহ্ পাপাচারীদের ব্যাপারে অবগত আছেন। আর তাদের নবী যখন তাদেরকে বললো : অবশ্যই আল্লাহ্ তোমাদের জন্য ত্বালূতকে রাজা মনোনীত করেছেন। ” তখন তারা বললো : কী কারণে আমাদের ওপর তার রাজত্ব হবে ? বরং রাজা হওয়ার ক্ষেত্রে তার তুলনায় আমরাই অধিকতর হক্ব্দার , কারণ , তাকে অনেক বেশী ধনসম্পদ দেয়া হয় নি। ” তখন সে (নবী) বললো : আল্লাহ্ই তাকে তোমাদের ওপর মনোনীত করেছেন এবং তাঁকে অনেক বেশী জ্ঞান ও শারীরিক শক্তি প্রদান করেছেন। আর আল্লাহ্ তাঁর রাজত্ব যাকে ইচ্ছা প্রদান করেন এবং আল্লাহ্ প্রশস্ততা প্রদানকারী সর্বজ্ঞাতা। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২২৬-২২৭)

এখানে দেখা যাচ্ছে যে , আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে ত্বালূতকে শাসক হিসেবে মনোনয়নের সপক্ষে আল্লাহর নবী [শামূয়িল্ ( আঃ)]-এর পক্ষ থেকে দু টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে , তা হচ্ছে : অনেক বেশী জ্ঞান ও শারীরিক শক্তি।

কেউ হয়তো বলতে পারেন যে , কোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে ত্বালূত্-কে রাজা মনোনীত করার কথা বলা হয়েছে , ইমাম মনোনীত করার কথা বলা হয় নি। কিন্তু প্রকৃত ব্যাপার হলো এ ক্ষেত্রে মালেক্ ” শব্দটি এ শব্দের সাধারণ পারিভাষিক অর্থ সার্বভৌম রাজা/ বাদশাহ্ ’ থেকে ভিন্ন এক অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। আর যে কোনো ভাষায়ই একই পরিভাষা বিভিন্ন অর্থে ব্যবহারের প্রচলন আছে।

মূলতঃ ত্বালূত্ ছিলেন আল্লাহর নবী হযরত শামূয়িল্ ( আঃ)-এর নেতৃত্বাধীনে বানী ইসরাঈলের জন্য মনোনীত সেনাপতি ও প্রশাসনিক প্রধান মাত্র ; বানী ইসরাঈলের পক্ষ থেকে রাজা ’ দাবী করার জবাবে আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে তাঁকে রাজা ’ উপাধি সহ মনোনীত করা হয়।

তাছাড়া বানী ইসরাঈল রাজা ’ দাবী করলেও তাদের দাবীর উদ্দেশ্য কোনো স্বৈরাচারী সার্বভৌম রাজা মনোনীতকরণ ছিলো না , বরং তারা চাচ্ছিলো প্রতিপক্ষের রাজা-বাদ্শাহর মোকাবিলায় একজন শৌর্যবীর্য ও জাঁকমকের অধিকারী বীর শাসক ও সেনাপতি।

অন্যদিকে আল্লাহ্ তা আলা কাউকে স্বৈরাচারী সার্বভৌম রাজা তথা ত্বাগূত্ নিয়োগ করবেন এটা একেবারেই অকল্পনীয়। তাছাড়া ত্বালূত্ যখন তাঁর সৈন্যদেরকে বলেন :

إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِيكُمْ بِنَهَرٍ - অবশ্যই আল্লাহ্ তোমাদেরকে একটি নহরের দ্বারা পরীক্ষা করবেন। ” (সূরাহ্ আল্-বাক্বারাহ্ : ২৪৯) তখন এ থেকে সুস্পষ্ট যে , এমনকি নবীর ( আঃ) অধীনস্থ হওয়া সত্ত্বেও ত্বালূত্ কোনো সাধারণ শাসক বা সেনাপতি ছিলেন না , বরং তিনি ছিলেন ঐশী ইলহামের দ্বারা পরিচালিত একজন নেতা ও শাসক। বরং তিনি ছিলেন একজন নিষ্পাপ নেতা , কারণ , আল্লাহ্ তা আলা কোনো নিষ্পাপ ব্যক্তিকে ব্যতীত কোনো দায়িত্বের জন্য প্রত্যক্ষভাবে ’ মনোনীত করবেন-তাঁর সম্পর্কে এটা ভাবাই যায় না। (ক্ষেত্রবিশেষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনকে যে আল্লাহ্ তা আলার সাথে সংশ্লিষ্ট করা হয় এখানে তা আমাদের আলোচ্য বিষয় নয় এবং ত্বালূতের মনোনয়নের বিষয়টি সে ধরনের নয় , বরং প্রত্যক্ষ মনোনয়ন।)

অনুরূপভাবে আল্লাহর নবী হযরত দাউদ্ ( আঃ) ও হযরত সুলাইমান্ ( আঃ)-এর জন্যও রাজা ’ শব্দের ব্যবহার থাকলেও সুস্পষ্ট যে , রাজা ’ বা বাদশাহ্ ’ শব্দের আভিধানিক ও বহুলপ্রচলিত পারিভাষিক অর্থের দৃষ্টিতে তাঁরা রাজা বা বাদ্শাহ্ ছিলেন না , (যদিও বানী ইসরাঈলের চাওয়া পূরণের লক্ষ্যে তাঁদেরকে শৌর্যবীর্য ও জাঁকজমকের অনুমতি দেয়া হয়েছিলো) । কারণ , কোরআন মজীদের দলীল থেকে রাজতন্ত্র স্বৈরতন্ত্রের সমার্থক এবং যূলম ও নিপীড়ন মূলক হওয়ার বিষয়টি অকাট্যভাবে প্রমাণিত।

[বলা বাহুল্য যে , আল্লাহর দুশমনরা যাতে আল্লাহর অনুগত বান্দাহদেরকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য না করতে না পারে এবং এর ফলে অগভীর চিন্তাচেতনার অধিকারী লোকেরা দ্বীন থেকে বিমুখ না হয় সে লক্ষ্যে আল্লাহর অনুগত বান্দাহদের জন্য সৌন্দর্যোপকরণ ধারণ ও জাঁকজমক শুধু বৈধই নয় , বরং ক্ষেত্রবিশেষে তা যরূরীও বটে।]

কোরআন মজীদে ইতিবাচকভাবে সাবা ’ র রাণী বিলক্বিসের উক্তি উদ্ধৃত করা হয়েছে :

) إِنَّ الْمُلُوكَ إِذَا دَخَلُوا قَرْيَةً أَفْسَدُوهَا وَجَعَلُوا أَعِزَّةَ أَهْلِهَا أَذِلَّةً وَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ)

“ রাজা-বাদ্শাহরা যখন কোনো জনপদে প্রবেশ করে তখন অবশ্যই তারা তাকে (ঐ জনপদকে) বিপর্যস্ত করে এবং তার (ঐ জনপদের) সর্বাধিক শক্তিশালী অধিবাসীদেরকে লাঞ্ছিত করে। আর তারা (সব সময়) এরূপই করে থাকে। ” (সূরাহ্ আন্-নামল্ : ৩৪)

এ আয়াতে যেوَكَذَلِكَ يَفْعَلُونَ - আর তারা (সব সময়) এরূপই করে থাকে। ” বলা হয়েছে তা থেকে প্রমাণিত হয় যে , যুলুম , বলদর্পিতা ও স্বৈরতান্ত্রিকতা রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার চিরাচরিত বৈশিষ্ট্য। সুতরাং এ ব্যাপারে সন্দেহের অবকাশ নেই যে , ত্বালূত্ প্রচলিত পারিভাষিক ও আভিধানিক অর্থের কোনো রাজা ছিলেন না , বরং তিনি ছিলেন আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে মনোনীত একজন ইমাম তথা নেতা , শাসক ও সেনাপতি। আর তিনি যে দু টি গুণে বানী ইসরাঈলের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন অর্থাৎ ইলমী যোগ্যতা এবং শক্তিমত্তা ও সাহসিকতা হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ছাহাবীগণের মধ্যে হযরত আলী ( আঃ) সে দু টি গুণেই শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী ছিলেন।

গাদীরে খূমে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ঘোষণা

কোরআন মজীদের উক্ত দলীল সমূহ এবং নামাযে পঠিত দরূদের (যা আমলের ক্ষেত্রে ইজমা প্রমাণ করে) বক্তব্যের আলোকে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর ওফাতের পরে তাঁর আহলে বাইত-এর আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত ইমামতের ব্যাপারে কোনোই সন্দেহ থাকে না। আর এ থেকে গাদীরে খুম্-এ হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যে , হযরত আলী ( আঃ)কে উম্মাতের জন্য মাওলা ’ বলে পরিচিত করিয়ে দেন তাতে মাওলা ’ শব্দের তাৎপর্য যে নেতা ও শাসক ’ তথা তাঁর পরে তাঁর খলীফাহ্ ’ এতেও সন্দেহের অবকাশ নেই।

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে , গাদীরে খুম্ সংক্রান্ত হাদীছগুলো মূল বিষয়বস্তুর বিচারে সর্বোচ্চ পর্যায়ের তাওয়াতুরের অধিকারী। এ সব হাদীছ প্রতিটি স্তরে বিপুল সংখ্যক বর্ণনাকারী কর্তৃক বর্ণিত হয়েছে এবং সকল মায্হাব্ ও ফিরক্বাহর ধারাবাহিকতায় সংকলিত প্রায় সকল হাদীছ-গ্রন্থেই স্থানলাভ করেছে।

গাদীরে খুম্ সংক্রান্ত বিভিন্ন হাদীছের বর্ণনায় কতক বিষয়ে সামান্য বিভিন্নতা থাকলেও কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে কোনোই মতপার্থক্য নেই। সংক্ষেপে তা হচ্ছে , বিদায় হজ্বের পর হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) মক্কাহ্ ত্যাগ করে মদীনাহর উদ্দেশে রওয়ানা হয়ে ১৮ই যিল্-হাজ্ব তারিখে মক্কাহর অদূরে গাদীরে খুম্ নামক স্থানে উপনীত হওয়ার পরে প্রচণ্ড গরম সত্ত্বেও তাঁর সঙ্গীদেরকে যাত্রাবিরতি করার নির্দেশ প্রদান করেন এবং যে সব ছাহাবী এগিয়ে গিয়েছিলেন তাঁদেরকে ফিরিয়ে আনার জন্য লোক পাঠিয়ে দেন , আর যারা তখনো এসে পৌঁছেন নি তাঁদের আগমনের জন্য অপেক্ষা করেন। তাঁর নির্দেশে কতগুলো উটের হাওদার গদী একত্র করে একটি মঞ্চের মতো বানানো হয় এবং সকলে এসে পৌঁছলে তিনি হযরত আলী ( আঃ)কে সাথে নিয়ে সে মঞ্চে আরোহণ করেন। অতঃপর ভূমিকাস্বরূপ একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ প্রদানের পর তিনি হযরত আলী ( আঃ)-এর হাত উঁচু করে তুলে ধরে বলেন :

من کنت مولاه فهذا علی مولاه

আমি যার মাওলা , অতঃপর এই আলী তার মাওলা।

হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) যে গাদীরে খুমের সমাবেশে এ কথা বলেছিলেন এ ব্যাপারে কোনোই দ্বিমত নেই , কিন্তু এ কথার তাৎপর্য সম্পর্কে দ্বিমত করা হয়েছে। অনেকে এখানে মাওলা ” (مولی ) শব্দের অর্থ করেছেন বন্ধু ’ ও পৃষ্ঠপোষক ’ ; এর অন্যতম অর্থ শাসক হলেও তাঁরা তা গ্রহণ করেন নি। অবশ্য ব্যাপক অর্থবোধক এ শব্দটি কোরআন মজীদে বন্ধু ’ ও পৃষ্ঠপোষক ’ অর্থেও ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু তিনটি কারণে এ ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়।

প্রথমতঃ কোরআন মজীদে মু মিনাদেরকে পরস্পরের বন্ধু ’ ও পৃষ্ঠপোষক ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরাহ্ আল্-মাএদাহ্ : ৫৫) , ফলে স্বাভাবিকভাবেই হযরত আলী ( আঃ)ও মু মিনাদের অন্যতম বন্ধু ’ ও পৃষ্ঠপোষক ’ । এমতাবস্থায় হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) কর্তৃক হযরত আলী ( আঃ)কে মু মিনাদের বন্ধু ’ ও পৃষ্ঠপোষক ’ হিসেবে আলাদাভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কোনো মানে হয় না। আর বলা বাহুল্য যে , আল্লাহর নবী কোনো অর্থহীন কাজ করতে পারেন না।

দ্বিতীয়তঃ , কেউ কেউ যেমন দাবী করেন যে , হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ) বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ছাহাবীর শা নে উৎসাহব্যঞ্জক ও প্রশংসাসূচক কথা বলতেন এবং হযরত আলী ( আঃ) সম্পর্কে তাঁর এ উক্তিটিও তদ্রূপ। যদিও যথার্থতা ছাড়া কেবল উৎসাহ প্রদানের জন্য কোনো ভিত্তিহীন কথা বলা বা ভিত্তিহীন প্রশংসা করার মতো অভ্যাস থেকে নবী-রাসূলগণ ( আঃ) মুক্ত ছিলেন , তথাপি যুক্তির খাতিরে তা সম্ভব মনে করলেও এ জন্য প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ছাহাবীদেরকে সেখানে অপেক্ষা করতে বাধ্য করা সহ যে আনুষ্ঠানিকতার আশ্রয় নেয়া হয়েছিলো এরূপ একটি মামূলী বিষয়ের জন্য তার আশ্রয় নেয়া এক ধরনের রসিকতার শামিল-আল্লাহর মনোনীত যে কোনো নবী-রাসূলই ( আঃ) যা থেকে মুক্ত।

তৃতীয়তঃ বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্)-এর দাবী অনুযায়ী নবুওয়াতের ধারাবাহিকতা ও ওয়াহী নাযিল সমাপ্ত হওয়ার পরে মওজূদ ওয়াহীর সঠিক ব্যাখ্যা ও উম্মাতের পরিচালনার জন্য আল্লাহ্ তা আলার পক্ষ থেকে নিষ্পাপ ও নির্ভুল ইমাম মনোনীত হওয়া প্রয়োজন অথচ অন্য কাউকে এ দায়িত্বের জন্য মনোনীত করা হয় নি , এমতাবস্থায় গাদীরে খুমে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)-এর এ উক্তিতে উল্লিখিত মাওলা ” (مولی ) শব্দ থেকে শাসক অর্থ গ্রহণ করা ছাড়া গত্যন্তর নেই।