ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা0%

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ইমাম হোসাইন (আ.)

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

লেখক: আল্লামা সাইয়েদ মুরতাজা আসকারী
প্রকাশক: -
বিভাগ:

ভিজিট: 10812
ডাউনলোড: 1199

পাঠকের মতামত:

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 16 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 10812 / ডাউনলোড: 1199
সাইজ সাইজ সাইজ
ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

ইসলামে শ্রেণী বৈষম্যের শুরু

১ বিশেষ আর্থিক সুবিধাদান

ইসলামে যাকে বাইতুল মাল ’ নামে অর্থাৎ সর্ব সাধারণের সম্পদ ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে তা আল্লাহর রাসূলের (সা:) যুগে এবং আবু বকরের দুই বছরের খিলাফতকালে সমানভাবে মুসলমানদের মাঝে বিতরণ করা হত। হযরত উমর এই পদ্ধতিকে অপছন্দ করেন এবং বলেন : প্রত্যেক ব্যক্তি বিশেষতঃ মদীনায় উপস্থিত ব্যক্তিদের জন্যে , তাদের নিজ নিজ মর্যাদা অনুযায়ী বার্ষিক ভাতা নির্ধারণ করতে হবে । অতঃপর তিনি নিজে বিভিন্ন ব্যক্তিকে শ্রেণীবিন্যস্ত করেন এবং বলেন : রাসূলের নিকটতম ব্যক্তি হওয়ার কারণে উম্মুল মু মিনীন আয়িশা (রাঃ) বার্ষিক বার হাজার দিরহাম , রাসূলের অপর সব স্ত্রী প্রত্যেকেই দশ হাজার দিরহাম , যারা বদর যুদ্ধে ঊপস্থিত ছিলেন তারা প্রত্যেকেই পাঁচ হাজার দিরহাম , ওহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীগণ চার হাজার দিরহাম , খন্দকে অংশগ্রহণকারীগণ আড়াই হাজার দিরহাম করে পাবেন । এইভাবে বণ্টন করতে করতে এমন কতিপয় ব্যক্তির অংশে নির্ধারিত হয় মাত্র দুইশত দিরহাম। লক্ষ্য করুন , পার্থক্যের সীমারেখা কোথা হতে কোথায় ?!এই ব্যাপক বৈষম্য কেন ও কোন ইসলামী মানদণ্ডের ভিত্তিতে হয়েছে ?

আচ্ছা , এইরূপ শ্রেণীবিন্যাস হতে কি ঘটনার অবতারণা হতে পারে ? স্পষ্ট যে , বিশেষ শ্রেণীকে সুবিধা দানের বিষয়টি যেমন ইসলাম পূর্ব যুগে মক্কায় ছিল , ঠিক তদ্রূপভাবে ইসলামের ছত্রছায়ায় পুনরায় সৃষ্টি হয়। ফলে তালহা , যুবাইর , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ এবং উছমানের মত ব্যক্তিরা এই সুবিধা লাভ করে অন্যদের থেকে নিজেদের বিশিষ্ট ভাবতে শুরু করেন !

২। বিশেষ বংশকে প্রাধান্য ও সুবিধাদান

সকীফা অভ্যুত্থানের প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে পরিষ্কারভাবে জানা যায় যে , কুরাইশ গোত্রপতিরা , বনী হাশিম গোত্রকে বাদ দেয়ার মাধ্যমে , অত্যন্ত সূক্ষ্ণভাবে হিসাব নিকাশ করে ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নেয় এবং ক্ষমতা শুধু তাদের মধ্যেই আবতির্ত হতে থাকে ; এই কারণেই দ্বিতীয় খলীফা ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরামর্শ পরিষদে কুরাইশ ব্যতীত একজনকেও স্থান দেন নি। ইসলামের প্রতি এত সব উৎসর্গ করার পরও আনসারগণকে তারা এমনভাবে পরিত্যাগ করেন যে , তাদের নিজেদের শহর মদীনার গভর্ণর হিসেবেও তাদের রাখা হয়নি । শুধুমাত্র ইমাম আলীর (আ.) যুগে সাহল ইবনে হুনাইফ আনসারী মদীনার গভর্ণর হন এবং উমর ইবনে আব্দুল আযীযের যুগেও একজন আনসার মদীনার গভর্ণর হয়েছিলেন।

হ্যাঁ , কুরাইশরা সরকারী সমস্ত পদ ও সুযোগ সুবিধাকে নিজেদের জন্যে নির্দিষ্ট করে বিশেষ বংশকে প্রাধান্য দানের মাধ্যমে ক্ষমতাকে ইসলামের বিকৃতির পথে ব্যবহার করে। এই কারণে শিয়াদের বিশেষ একটি অংশের উদ্দেশ্যে দেয়া ভাষণে আমীরুল মু মিনীন (আ.) এই বিচ্যুতি ও বিকৃতিগুলির অংশ বিশেষের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেন : আমার পূর্বের শাসকরা , জ্ঞাতসারে ও ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর রাসূলের বিরোধিতা করেছেন। তাঁর প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করেছেন এবং তাঁর সুন্নতকে পরিবর্তন করেছেন। এখন , জনগণকে যদি পূর্ব খলীফাদের নিয়ম নীতি হতে ফিরিয়ে আনতে চাই এবং শাসন প্রণালীকে আল্লাহর রাসূলের যুগের কক্ষপথে ফিরিয়ে আনি তবে আমার সৈন্যরা আমার চারপাশ হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন। শুধুমাত্র আমার স্বল্প সংখ্যক শিয়া (অনুসারী) যারা আল্লাহর কিতাব ও রাসূলের (সা.) সুন্নত হতে আমার ইমামতের অপরিহার্যতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে জানেন তারা আমার সঙ্গে থাকবেন । আপনারা কি জানেন ?! যদি আমি আদেশ দেই যে , মাক্বামে ইবরাহীমকে (আ.) সেই স্থানে স্থানান্তর করার যেইখানে আল্লাহর রাসূল (সা:) স্থাপন করেছিলেন , ফাদাক বাগানটি যদি ফাতিমার উত্তরসূরিদের নিকট ফিরিয়ে দেই , অনুদান ও অনুগ্রহের বহিগুলি যদি বন্ধ করি , বাইতুল মালকে আল্লাহর রাসূলের মত সমানভাবে যদি বণ্টন করি এবং তা বিত্তশালীদের হাতে অর্পণ না করি , আল্লাহর রাসূলের (সা.) মসজিদকে যদি প্রাথমিক অবস্থার ন্যায় উপস্থাপন করি এবং বন্ধকৃত দরজাগুলি খুলে দেই ও খোলা দরজাগুলিকে বন্ধ করি , অযুর ক্ষেত্রে পাদুকার উপর মসেহ্ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করি , নাবীয (খেজুর হতে প্রস্তুত মদ) পানকারীদের উপর যদি মদ্যপানের শাস্তি জারি করি , মোতা য়ে হজ্ব (উমরায়ে তামাত্তো সমাপ্ত করে এবং হজ্বে তামাত্তোর ইহরাম বাঁধার পূর্বে নিজ স্ত্রী কিংবা অপর কোন নারী হতে শরীয়ত সম্মতভাবে উপকৃত হওয়া)ও মোতায়ে নিসা কে (শরীয়ত সম্মতভাবে কোন নারীকে খণ্ডকালীন বিবাহ করা) বৈধ ঘোষণা করি , মৃত ব্যক্তির নামাযকে (সালাতুল জানাযা)যদি পাঁচ তকবীরে পড়ার আদেশ দেই এবং নামাযগুলিতে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম ’ কে ’ উচ্চৈঃস্বরে বলার জন্যে লোকজনকে আদেশ করি ; হ্যাঁ , এই সব বিষয়ের ব্যাপারে যদি আদেশ দেই তবে নিশ্চিত যে , তারা আমার চারপাশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

আল্লাহর কসম ! আমি জনগণকে আদেশ দিলাম , রমাযান মাসে শুধুমাত্র ওয়াজিব নামাযগুলিকে জামাতবদ্ধ হয়ে আদায় করার। তাদেরকে শিক্ষা দিলাম , মুস্তাহাব নামাযগুলি জামাতবদ্ধ হয়ে আদায় করা বিদ্আত ; হঠাৎ করে আমার সেনাবাহিনীর কতিপয় লোক যারা যুদ্ধক্ষেত্রে আমার সঙ্গে ছিলেন , তারা চিৎকার দিয়ে বলেন : হে ইসলামের অনুসারীরা ! উমরের সুন্নত রূপান্তরিত হয়ে গেল , আলী আমাদেরকে রমাযান মাসে মুস্তাহাব নামায আদায় হতে বারণ করছেন ! সত্যিই আমি ভীত এই জন্যে যে , আমার সেনাবাহিনীর কতিপয় সদস্য বিদ্রোহ করে বসবে। আহ্ ! এই জাতি হতে কত কষ্টই না পেলাম ! তাদের অনৈক্য ও নেতার অনুসরণের ক্ষেত্রে আচরণ দেখে! ২৯

মোট কথা , ইমাম অভিযোগ পেশ করছেন এবং স্পষ্টভাবে বলছেন : ইসলামী উম্মাকে , তাদের নবীর সুন্নতের প্রতি ফিরিয়ে আনতে তিনি কৃতকার্য হন নি । তিনি এই পথে এত অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেন যে , পরিশেষে মৃত্যু কামনা করে বলেন : তোমাদের মধ্যকার নিকৃষ্টকে কি তোমাদের হতে বিরত রেখেছে যার আগমন অবশ্যম্ভাবী এবং যা আমাকে মুক্তি দিবে ! হে আল্লাহ্ ! আমি এদেরকে ক্লান্ত করে তুলেছি এবং এরাও আমাকে ক্লান্ত করে তুলেছে , এদেরকে আমার নিকট হতে এবং আমাকে এদের নিকট হতে মুক্তি দান কর ! ৩০

উছমানের খিলাফত ও বনী উমাইয়্যাদের আধিপত্য

তরবারির আঘাতপ্রাপ্ত দ্বিতীয় খলীফা উমরের নির্দেশে আলী , উছমান , আব্দুর রহমান ইবনে আউফ , সা দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস , ত্বালহা ও যুবাইরের ” সমন্বয়ে গঠিত ছয় সদস্যের পরামর্শ বোর্ড খলিফা মনোনয়নের জন্য সমবেত হয় এবং উমরের পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্দুর রহমান ইবনে আউফ হযরত উছমানকে ’ খিলাফতের পদে অধিষ্ঠিত করেন।৩১

উছমান খিলাফতের পদ গ্রহণ করার পর প্রথম ছয় বছর তার সরকার জনগণের সাথে নরম ও সদাচার করেন। কিন্তু তার শাসন ব্যবস্থার দ্বিতীয়ার্ধে , দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমরের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বনী উমাইয়্যাদেরকে ব্যাপক ভাবে জনগণের কাঁধে আরোহণ করান। নাহ্জুল বালাগার ব্যাখ্যাতে ইবনে আবিল হাদীদ বলেন :

“ উছমানের ব্যাপারে উমরের মন্তব্য এবং ভবিষ্যদ্বাণী সঠিক ছিল। কারণ বনী উমাইয়্যাদেরকে উছমান জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেন । ইসলামী ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রদেশগুলিতে তাদেরকে কর্তৃত্ব প্রদান করেন। তাদের নেতৃস্থানীয়দের বিজিত ভূমিসমূহ এবং উর্বর কৃষিক্ষেত্রসমূহের মালিকানা ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধা প্রদান করেন। তার যুগে বিজিত আর্মেনিয়ার গনিমতের পুরোটাই তার চাচাতো ভাই মারওয়ান ইবনে হাকামকে দান করেন এবং আব্দুল্লাহ ইবনে খালিদ ইবনে উসাইদ তার নিকট অনুদান চাওয়ার কারণে তাকে তিনি চারলক্ষ দিরহাম প্রদান করেন। হাকাম ইবনে আবিল আস যাকে রাসূল (সা.) নির্বাসন দিয়েছিলেন এবং আবু বকর ও উমরও তাকে ফিরিয়ে আনতে রাজী হন নি , তিনি তাকে মদীনায় ফিরিয়ে আনেন এবং তৎসঙ্গে তাকে একলক্ষ দিরহাম দান করেন। নাহরয ’ নামক মদীনার বাজারের একটি অংশ , যেটি রাসূল (সা.) মুসলমানদেরকে ওয়াক্ফ করে দিয়েছিলেন , সেইটি তিনি মারওয়ানের ভাই হারিছ ইবনে হাকামকে দান করেন। ফাতিমার (আ.) নিকট হতে ছিনিয়ে নেয়া ফাদাক ’ বাগানটি মারওয়ানকে উপহার দেন।

মদীনার চতুষ্পার্শ্বস্থ চারণভূমি হতে মুসলমানদের মালিকানার অবসান ঘটিয়ে ইহ্শাম ইবনে উমাইয়্যার মালিকানায় দেন এবং তার একচেটিয়া অধিকার প্রতিষ্ঠা করেন। ত্রিপোলী হতে তানজা পর্যন্ত আফ্রিকা বিজয়ের ফলে অর্জিত গনিমত আব্দুল্লাহ্ ইবনে আবী সরাহকে দান করেন এবং তা হতে একজন মুসলমানকেও অংশ দেন নি। যে দিন তিনি মারওয়ানকে ’ এক লক্ষ দিরহাম প্রদান করেন সেই দিন আবু সুফিয়ানকেও ’ একলক্ষ দিরহাম দেন।

এ ছাড়া তিনি বেশ কিছু সমালোচনার যোগ্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন যেমন তার নির্দেশে সাহাবী আবুযর গিফারীকে রবাযা এলাকায় নির্বাসন দেয়া হয় এবং আব্দুল্লাহ্ ইবনে মাসউদকে এমনভাবে প্রহার করা হয় যে তাঁর পাঁজর ভেঙ্গে যায়। তাছাড়া ইসলামের বিধিবিধান ও দণ্ডসমূহ প্রয়োগ বন্ধ করে দেন , অত্যাচারীদেরকে প্রতিহত করা নিষিদ্ধ করেন , ইসলামী ভুখণ্ডের অধিবাসীদেরকে শাস্তি দেয়ার জন্যে অসৎ ব্যক্তিদেরকে নিয়োগ দান করেন। মুয়াবিয়াকে লেখা তার সর্বশেষ পত্রে তিনি একদল মুসলমানকে হত্যা করার আদেশ দেন। এই সব কারণে , উছমানকে তার বিদ্আত (নব উদ্ভাবন) সম্পর্কে অবগত করানোর উদ্দেশ্যে মিশর হতে আগত লোকদের সাথে মদীনার বহু লোক একত্রিত হন এবং তাকে তারা সতর্ক ও আচরণ সংশোধন করতে বলেন কিন্তু তিনি তার অপরাধ অব্যাহত রাখার কারণে তারা তাকে হত্যা করেন । ৩২

উছমান , আল্লাহর রাসূলের (সা.) সুন্নতের সাথে মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে , উপরোল্লেখিত আচারণগুলি করেই ক্ষান্ত হলেন না । তিনি খৃষ্টানপাদ্রী তামীমদারীকে চাকুরি প্রদান করেন। তামীমদারী বাহ্যত ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং উমরের যুগে জুমু আর নামাযের খুৎবার পূর্বে বক্তব্য দেয়ার অনুমতি পেয়েছিলেন । তাকে তিনি বিশেষ প্রাধান্য দেন , সপ্তাহে দু দিন বক্তব্য দেয়ার অনুমতি দেন এবং রাসূলের হাদীছের বর্ণনা ও প্রচার প্রসার নিষিদ্ধ থাকায় তদস্থলে বিকৃত ইসরাঈলি বর্ণনাসমূহ ইসলামী সমাজে প্রচার করেন ।৩৩

মুয়াবিয়ার খিলাফত ও ইসলামের বিরুদ্ধে নব্য পরিকল্পনা

তিন খলীফা ও হযরত আলীর (আ.) খিলাফতের সমাপ্তির পর মুয়াবিয়া খলীফা হন। তিনি ইসলামের আবির্ভাবের পরও দীর্ঘ একুশ বছর জাহিলিয়াতের যুগের ন্যায় কাফির অবস্থায় থাকেন এবং এক মুহূর্তের জন্যেও কাফির নেতাদের সংস্পর্শ হতে দূরে সরেন নি , এমনকি যেই দিন তিনি তার পিতাকে ইসলামের প্রতি বাহ্যতঃ আকৃষ্ট হতে দেখেন তখন তিনি তিরস্কারমূলক কবিতার দ্বারা তার পিতাকে সম্বোধন করে বলেন :

“ হে সখর ! ইসলাম গ্রহণ করো না ! কারণ এই ইসলাম আমাদেরকে অপমানিত ও লাঞ্ছিত করবে ! আমাদের প্রিয় ব্যক্তিত্বদের মৃত্যুর পর যারা বদর যুদ্ধে টুকরো টুকরো হয়েছেন। সেই নিহত ব্যক্তিদের মাঝে আমার মামা ও চাচা ছিলেন এবং আমার মায়ের চাচা ছিলেন তাদের তৃতীয় ব্যক্তি । আমার প্রিয় ভাই হানযালাও নিহতদের অন্তর্ভূক্ত ছিল ,আমাদের শত্রুরা হল তারাই যারা আমাদের প্রাতের ঘুমকে জাগরণে পরিণত করেছে । এক মুহূর্তের জন্যেও ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হবে না ! কারণ আমাদের কাঁধে অপমানের বোঝা চাপাবে ! সেই সব উটের কসম , যেগুলি দ্রুতগতিতে মক্কার পানে ধাবিত হয় এবং হাজীগণকে মক্কায় নিয়ে আসে । আমাদের মৃত্যু সহজতর , আমাদের সেই শত্রুদের তিরস্কারের চেয়ে যারা বলবে : হার্বের পুত্র আবু সুফিয়ান , ভয় ও আতঙ্কের কারণে উজ্জার প্রতিমা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । ৩৪

মক্কা বিজয়ের পর যেসব লোক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন তাদের মধ্যে মুয়াবিয়াও , বাহ্যতঃ এই ধর্ম গ্রহণ করেন এবং হুনাইন যুদ্ধের গনিমত , যেগুলি নতুন মুসলমান ও দুর্বল ঈমানদারদের অন্তর জয় করার জন্যে নির্ধারণ করা হয়েছিল অর্থাৎ মুয়াল্লাফাতি কুলুবিহিম ”৩৫ এর অংশ হতে তাকে একশতটি উট এবং বিপুল পরিমাণ রূপা প্রদান করা হয়। তারপর তিনি মদীনায় গমন করেন এবং দুই বছরের কিছু বেশী সময় রাসূলের (সা.) সাহচর্য লাভ করেন।৩৬

সিরিয়া বিজয়ের পর হিজরীর বিশ সালে উমরের পক্ষ হতে এবং পরবর্তীতে উছমানের পক্ষ হতে সিরিয়ার প্রাদেশিক গভর্ণর হন। হিজরী চল্লিশ সালে নিজেকে খলীফা হিসেবে ঘোষণা করেন , তার রাজধানী ছিল দামেশক।

বর্তমান সিরিয়া , জর্ডান , ফিলিস্তিন এবং লেবাননের সমন্বয়ে তৎকালীন শাম বা সিরিয়া গঠিত হয়েছিল। ঐ অঞ্চলের অধিবাসীরা ইসলাম সম্পর্কে ততটুকুই জানত যা মুয়াবিয়া তাদেরকে জানিয়েছিলেন।

সিরিয়া বিজয়ের পূর্বে সেখানে রোম সমরাটের দরবার যেরূপ ছিল মুয়াবিয়ার দরবারও তার অনুরূপ ছিল এবং প্রাক্তন খলীফাদের মত ছিল না। মুয়াবিয়া সবসময় চেষ্টা করতেন যে , সিরিয়াতে যেন রাসূলের কোনো সাহাবী উপস্থিত না থাকেন এবং সিরিয়াবাসীকে ইসলামী সংস্কৃতি শিক্ষা দিতে না পারেন।

রাসূলের সাহাবীদের মধ্যে উবাদাহ্ ইবনে সামিতের সাথে মুয়াবিয়ার আচরণটিও উল্লেখ্য। উবাদাহ্ আনসারদের সেই দলের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন যারা হিজরতের পূর্বে মিনার আকাবাতে রাসূলের হাতে বাইআত করেছিলেন। রাসূল তাঁকে আনসারগণের বারজন প্রতিনিধির অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে নির্ধারণ করেছিলেন।৩৭ দ্বিতীয় খলীফার যুগে উবাদাহ্ ’ একবার মুয়াবিয়ার সুদ খাওয়াকে কেন্দ্র করে তার সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন৩৮ এবং দ্বিতীয়বার ভারবাহী উষ্ট্রের পিঠে মশক ভর্তি মদ নিয়ে কিছু লোক মুয়াবিয়ার প্রাসাদে যাচ্ছে দেখে মশকগুলোকে ছুরি দিয়ে ছিদ্র করে দেন।৩৯

বাইতুল মালের যথেচ্ছ ব্যবহারের কারণে সাহাবী আবুযর প্রতিবাদ করেন। আর এই প্রতিবাদের কারণে আবুযরকেও উছমানের আদেশে , হাওদাবিহীন একটি উটের পিঠে আরোহণ করিয়ে সিরিয়া হতে মদীনায় প্রেরণ করা হয়।৪০ উছমান যখন কুফার অধিবাসী ক্বারী ও মুফাসসিরবৃন্দকে সিরিয়াতে নির্বাসন দেন তখন তাদের সাথেও মুয়াবিয়া দ্বন্দ্বে লিপ্ত হন। পরবর্তীতে উছমানের আদেশে তাদেরকে নিজ রাজধানী হতে হিমস শহরে নির্বাসিত করেন।৪১

ইসলামের উপর মুয়াবিয়া সর্বাধিক অলক্ষুণে যেই আঘাতটি হানেন তা হচ্ছে জাল হাদীস রচনার আদেশ প্রদান এবং সেই জাল হাদীসগুলি রাসূলের (সা.) পবিত্র হাদীসসমূহের সাথে সম্পৃক্ত করেন। আমরা নিম্নে সেই ঘটনা বর্ণনা করছি ।

হাদীস রচনার মাধ্যমে মুয়াবিয়ার উদ্দেশ্য

তাবারী লিখেছেনঃ মুগাইরা ইবনে শু ’ বাকে মুয়াবিয়া কুফার গভর্ণর হিসেবে নিয়োগ দান করেন। তিনি নিজ প্রশাসনিক রাজধানীর দিকে যাত্রার পূর্বেই মুয়াবিয়া তাকে তার নিজের নিকট আহ্বান করেন এবং তাকে বলেন : আমি তোমাকে বেশ কিছু দিক নির্দেশনা ও উপদেশ দিতে চাচ্ছিলাম কিন্তু তোমার গভীর অনুভব ক্ষমতা ও দূরদর্শিতার জন্যে আমি তা হতে বিরত থাকছি এবং সেই কর্মভার তোমার নিজ বোধশক্তির উপর অর্পণ করছি ! তবে আমি একটি বিষয় সম্পর্কে তোমাকে উপদেশ দিতে অবশ্যই পিছপা হব না , আর তা হচ্ছে এই যে ,সর্বপ্রথম আলীর প্রতি নিন্দা ও অপবাদ আরোপ করতে কখনই ভুলবে না এবং সদা সর্বদা উছমানের জন্যে মহান আল্লাহর নিকট রহমত ও মাগফিরাত কামনা করবে !৪২

দ্বিতীয়তঃ আলীর বন্ধু বান্ধব ও সাথিবর্গের দোষ ত্রুটি অন্বেষণ করা হতে এবং তাদের ব্যাপারে কঠোরতা আরোপ করতে কোনো ক্রমেই বিরত হবে না ! পক্ষান্তরে উছমানের বন্ধু বান্ধবদেরকে নিজের পাশে রাখবে এবং তাদের সাথে সদয় আচরণ করবে ! মুগাইরা বলেন : আমি আমার নিজ পরীক্ষা দিয়েছি এবং এই ক্ষেত্রে আমার বহু অভিজ্ঞতা আছে। তোমার পূর্বে অন্যান্যদের পক্ষ হতে দায়িত্ব পালন করেছি এবং কেউ আমাকে তিরস্কার ও ভর্ৎসনা করে নি ! তুমিও পরীক্ষা করলে হয়তো পছন্দ করবে এবং আমার প্রশংসা করবে অথবা তোমার নিকট আমার কাজ অপছন্দনীয় হবে এবং তুমি আমাকে তিরস্কার করবে !

মুয়াবিয়া বলেন : না ! ইনশা আল্লাহ্ , তোমার প্রশংসা করব ! ৪৩

ইহ্দাছ গ্রন্থে মাদায়েনী লিখেছেনঃ

মুয়াবিয়া খিলাফত হস্তগত করার পর , তার সমস্ত কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে এই বিষয়ে আদেশ দেন : আবু তুরাব (হযরত আলী) ও তাঁর পরিবারের মর্যাদা বর্ণনা করে কেউ কোনো কথা বললে তার জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা নেই এবং তার রক্ত বিফলে যাবে ! ৪৪

কুফার এই জনগণের মাঝে , আলী বংশের হিতাকাঙ্খীরা সর্বাধিক নির্যাতন ও কষ্ট ভোগ করেন ।

অন্যদিকে মুয়াবিয়া তার সমস্ত কর্মচারীদেরকে লিখিত আদেশ দেন: আলীর অনুসারী ও তাঁর পরিবারের কোনো ব্যক্তির সাক্ষ্য গ্রহণ করবে না ! আরও আদেশ দেন : উছমানের হিতাকাঙ্খী ও তাঁর প্রতি আগ্রহী প্রত্যেক ব্যক্তিকে এবং যারা তাঁর ফজিলতের উপর কোনো হাদীছ বর্ণনা করবেন ও তোমাদের শাসনের অধীনে জীবন যাপন করবেন , তাদের সবাইকে তোমাদের নিকটে টানবে এবং তাদেরকে সম্মান করবে। যখন কোনো ব্যক্তি উছমানের ফজিলত সম্পর্কে হাদীছ বর্ণনা করবে তখন তা আমাকে লিখে জানাবে এবং বক্তার নাম , তার পিতার নাম ও তার বংশের নাম নথিভুক্ত করবে !

এই আদেশটি কার্যকর হয় এবং আত্মবিক্রেতা ও প্রবৃত্তি পূজারীরা পার্থিব পদমর্যাদা লাভের আশায় হাদীছ জাল করা শুরু করে এবং উছমানের ফজিলত বর্ণনার মাত্রা বেড়ে যায় ! কারণ , মুয়াবিয়া টাকা পয়সা , পদমর্যাদা , রাষ্ট্রীয় সুবিধা এবং যা কিছু তার হাতে ছিল , সেইগুলিকে নির্দ্বিধায় এই পথে ব্যয় করেন। অপরিচিত ও অখ্যাত কোনো ব্যক্তিও যদি মুয়াবিয়ার কর্মচারীদের নিকট গমন পূর্বক উছমানের গুণ ও ফজিলতের ক্ষেত্রে হাদীছ হিসেবে কোনো কিছু বর্ণনা করতো তাদের পছন্দের পাত্রে পরিণত হত ; তারা তার নাম রেজিষ্ট্রি করত এবং সে লোক রাজদরবারে বিশেষ মর্যাদা ও প্রাধান্য পেত।

কিছু দিন পর মুয়াবিয়ার দ্বিতীয় আদেশ প্রেরিত হয়। এই আদেশপত্রে তিনি তার কর্মচারীদেরকে লিখলো : এখন উছমানের ফজিলত সম্পর্কে বহু হাদীছ সংগৃহীত হয়েছে এবং সব শহরেই তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ! অতএব , আমার পত্র যখন তোমাদের নিকট পৌঁছিবে তখন লোকজনকে আহ্বান করবে যে , তারা যেন প্রথম যুগের সাহাবী ও প্রথম তিন খলীফার ফজিলতের বিষয়ে হাদীছ বর্ণনা করেন , আর তাতে (হযরত আলী) আবু তুরাবের ফজিলত বর্ণনাকারী একটি হাদীছও যেন না থাকে । তার ফজিলতে বর্ণিত এমন কোন হাদীছ যেন না থাকে যার অনুরূপ হাদীছ প্রথম তিন খলীফা ও ইসলামের প্রথম যুগের সাহাবাদের শানে থাকবে না কিংবা তার সম্পর্কে ঐ ফজিলতের বিপরীত বৈশিষ্ট্যের হাদীছ বর্ণনা করবে ! এটি আমার নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় কাজ এবং আমাকে সর্বাধিক আনন্দিত করে ! কারণ এই কাজ আবু তুরাব ও তাঁর অনুসারীদের দলীল ও যুক্তিসমূহের ভিত্তি নস্যাৎ করার জন্যে অত্যন্ত শক্তিশালী ও ধারাল একটি হাতিয়ার হবে ! যেসব হাদীছ উছমানের ফজিলত বর্ণনা করে তাদের জন্যে তা কঠিনতর ও অধিকতর ধ্বংসাত্মক হবে !

জনগণের নিকট মুয়াবিয়ার আদেশ পাঠ করে শুনানো হয় এবং তার সাথে সাহাবীদের মর্যাদা বর্ণনা করে বহু মিথ্যা হাদীছও তৈরী করা হয় যেগুলিতে সত্যের কোনো গন্ধও ছিল না ! সরলপ্রাণ লোকেরাও এই হাদীছগুলি দেখার সাথে সাথে গ্রহণ করতেন। ক্রমান্বয়ে এই হাদীছগুলি এতটা প্রসিদ্ধি লাভ করে যে ,মিম্বরগুলিতে(বক্তব্যের মঞ্চ) পুনরাবৃত্তি হতে থাকে এবং তদনুযায়ী শিশুদেরকে শিক্ষা দেয়ার জন্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের হাতে অর্পণ করা হয় , যুবকরাও সেইগুলির প্রতি আসক্ত হয়। তখনকার লোকেরা যেমনভাবে কুরআন শিক্ষা করত তেমনিভাবে মিথ্যা হাদীছগুলিও মুখস্থ করত । অতপরঃ পুরুষদের সভা সমিতি অতিক্রম করে মহিলাদের শিক্ষাঙ্গন ও বৈঠক সমূহে পৌঁছে এবং শিক্ষকবৃন্দ সেইগুলিকে মুসলমান নারী ও বালিকাদের শিক্ষা দেন। অনুরূপভাবে ক্রীতদাস ও অধীনস্থদের মধ্যেও তা বিস্তৃতি লাভ করে।

ইসলামী সমাজ এইভাবে তার জীবনের সুদীর্ঘ সময় অতিবাহিত করে। আর এই কারণে অজস্র মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীছ , পরবর্তী বংশধরদের মানসপটে স্থান লাভ করে। ফলে ফিকাহবিদ ,আলেম , বিচারক ও প্রশাসকগণ সকলেই সেগুলিকে সত্য মনে করে আত্মস্থ করেন ,বিশ্বাস করে প্রচারে রত হন ।

ইবনে আরাফাহ্ , যিনি নাফ্তাওইয়াহ্ ’ নামে সমধিক খ্যাত এবং ইলমে হাদীছের মহান ও প্রখ্যাত ব্যক্তিগণের একজন , তিনি তার ইতিহাস গ্রন্থে কতকগুলি বিষয় লিখেছেন যেগুলি মাদায়েনীর বক্তব্যের সাথে মিলে যায়। তিনি লিখেন : সাহাবীগণের মর্যাদা সম্বলিত মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীছগুলির অধিকাংশই বনী উমাইয়্যাদের যুগে রচিত ও সংযোজিত হয়েছে । সেই হাদীছগুলির বক্তা ও রচয়িতারা উমাইয়্যা খলিফাদের নৈকট্য অর্জন , তাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার পাত্রে পরিণত হওয়ার উদ্দেশে তা রচনা করে। উমাইয়্যারা এর মাধ্যমে বনী হাশিম বংশের মর্যাদাকে ক্ষুন্ন করতে চেয়েছিলেন । ৪৫

মুয়াবিয়ার হাদীছ রচনার রাজনীতির ক্ষেত্রে যা কিছু বর্ণনা করা হল তার থেকেও তার বিষাক্ত উদ্দেশ্য ছিল । যেমন যুবাইর ইবনে বাক্কার তার আল্ মুওয়াফফাকিয়্যাত ’ গ্রন্থে মুগাইরা ইবনে শু ’ বার পুত্র মুর্তারাফ হতে বর্ণনা করেন , তিনি বলেন আমি আমার পিতা মুগাইরার সাথে সিরিয়ায় যাই এবং মুয়াবিয়ার নিকট উপস্থিত হই । আমার পিতা প্রত্যহ মুয়াবিয়ার নিকট যেতেন এবং কিছু সময় তার সাথে কাটাতেন ,আর যখন তিনি বাড়ীতে ফিরে আসতেন তখন অত্যন্ত বিস্ময়ের সাথে মুয়াবিয়ার বিচক্ষণতা ও দক্ষতার ব্যাপারে কথা বলতেন এবং তার যা কিছু দেখেছেন তা আশ্চর্যের সাথে স্মরণ করতেন। কিন্তু একরাত্রে , মুয়াবিয়ার নিকট হতে বাড়ীতে ফিরে এসে খাদ্য গ্রহণ হতে বিরত থাকেন এবং আমি তাকে কঠিন রাগান্বিত ও উদ্বিগ্ন দেখি। আমি ঘণ্টা খানেক বিলম্ব করি। কারণ আমি ভাবছিলাম যে ,আমাদের কোন আচরণে হয়তো আমার পিতা অসন্তুষ্ট হয়েছেন কিংবা আমাদের কাজের ক্ষেত্রে কোন সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। যখন আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম : আজ রাতে আপনার মন কেন এতটা খারাপ হয়ে আছে ? তিনি বললেন : হে পুত্র ! আমি সর্বাধিক নিকৃষ্ট ও সবচেয়ে বড় কাফিরের নিকট হতে ফিরে এসেছি ! আমি বললাম : হায় ! কি কারণে ?

তিনি বললেন : মুয়াবিয়ার বৈঠক জনশুন্য ছিল ,আমি তার নিকট এই প্রস্তাবটি পেশ করে বললাম : হে আমীরুল মু মিনীন ! আপনি আপনার উদ্দেশ্য ও কামনা বাসনায় পৌঁছে গিয়েছেন , এখন এই বৃদ্ধবয়সে যদি আপনি ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং অপরের সাথে সদয় আচরণ করেন তবে কতইনা ভাল হয় ! আপনার আত্মীয় স্বজনদের (বনি হাশিম) প্রতি যদি সুদৃষ্টি দেন এবং তাদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখেন তবে জনগণের নিকট আপনার সুনাম বাড়বে । আল্লাহর কসম ! তাদের বিষয়ে আপনি যে ভয় ও আশঙ্কা করতেন সে অবস্থা আজ আর তাদের নেই (অর্থাৎ বনি হাশিম খিলাফতের বাসনা ত্যাগ করেছে) । মুয়াবিয়া উত্তর দিলেন : তুমি যা বলছ তা অসম্ভব অসম্ভব ! আবু বকর ক্ষমতা পেয়ে ন্যায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এতসব কষ্ট সহ্য করেন ; আল্লাহর কসম ! তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তার নামও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় , তবে হঠাৎ কেউ যদি কোনো দিন বলে আবু বকর ’ ! যখন উমর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা পান তখন সুদীর্ঘ দশ বছর ধরে অনেক পরিশ্রম করেন ও দুঃখ কষ্ট ভোগ করেন। তার মৃত্যুর সাথে সাথে তার নামেরও সমাধি ঘটল , যদি না কেউ হঠাৎ তার নাম স্মরণ করে বলে উমর ’ !

অতঃপর আমাদের জ্ঞাতি ভাই উছমান ক্ষমতায় আসেন। বংশ কৌলিন্যের দিক হতে তার মত আর কোনো পুরুষ ছিল না ! তিনি যা কিছু করার তাই করেছিলেন এবং লোকেরাও তার সাথে যা কিছু করার তাই করেছিল। তবে যখন তিনি নিহত হলেন , আল্লাহর কসম ! তার নামও নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল এবং তার কর্ম ও আচরণও বিস্মৃত হল। পক্ষান্তরে হাশিমী এই পুরুষের (রাসূল) নাম প্রত্যহ পাঁচবার ইসলামী বিশ্বের সর্বত্র সম্মানের সাথে উচ্চারিত হয় এবং বলা হয় : আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ্ ” । তোমার মতে এই অবস্থাকে কি অব্যাহত থাকতে দেয়া যায় ? কিভাবে তা সহ্য করা যায় ? হে মাতৃহীন ?! না , আল্লাহর কসম ! ক্ষান্ত হব না , যতক্ষণ না এই নামটিকে দাফন করব এবং সেইটিকে নিশ্চিহ্ন করব !!৪৬

হ্যাঁ , রাসূলের (সা.) নামের ব্যাপক প্রসিদ্ধি মুয়াবিয়ার অন্তরকে অগ্নি অপেক্ষা বেশী দগ্ধ করত ! কারণ রাসুলের কারণেই বদর যুদ্ধে তার ভাই , মামা , দাদা এবং অন্যান্য আত্মীয় স্বজন নিহত হয়েছিল। তিনি নিজের খেয়াল খুশি মত এই নামটিকে দাফন করতে.চেয়েছিলেন এবং এই উদ্দেশ্যকে সফল করার জন্যে দু টি পরিকল্পনা করেছিলেন ! মুয়াবিয়ার প্রথম পরিকল্পনাটির লক্ষ্য ছিল বনি হাশিম বংশের একজন লোকও যেন জীবিত না থাকেন ! এটি শুধু আমাদের কথা নয় বরং এই ব্যাপারে আমীরুল মু মিনীন ইমাম আলী (আ.) স্বয়ং এইরূপ বলেছেন : আল্লাহর কসম ! মুয়াবিয়ার কামনা বাসনা হচ্ছে এই যে , বনি হাশিম বংশের একজন লোকও যেন জীবিত না থাকেন ! সে এর মাধ্যমে আল্লাহর নূরকে নিভাতে চায় ! কিন্তু মহান আল্লাহ্ নিজ নূরের পরিপূর্ণতা দান ব্যতীত কখনই সন্তুষ্ট হবেন না , যদিও কাফিররা তাঁর ইচ্ছার বাস্তবায়নে সন্তুষ্ট হবে না । ৪৭

রাসূলের (সা.) নামকে দাফন করার জন্যে মুয়াবিয়া কসম খেয়েছিলেন ! তার বানোয়াট ও মিথ্যা হাদীছ রচনার সহযোগী ও অনুচররা রাসূলের (সা.) ব্যক্তিত্বকে খলিফা ত্রয়ের মর্যাদা হতে নীচে নামিয়ে আনে ! যেমন বর্ণনা করা হয়েছে : রাসূল (সা.) গান বাজনা শুনতেন , ছোট ছোট মেয়েরা তাঁর নিকটে নাচত এবং বাদ্য বাজাত , কিন্তু আবু বকর ও উমর সেই কাজগুলি হতে বিরত থাকতেন , নিষেধ করতেন এবং নর্তকী ও বাদিকারা তাঁদের নিকট হতে পলায়ন করত ! আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে , রাসূল (সা.) এই ব্যাপারে বলেছেন : উমরের নিকট হতে শয়তান পলায়ন করে ! আরও বর্ণনা করা হয়েছে : বেগানা নারীদের বিবাহের অনুষ্ঠানে রাসূল (সা.) উপস্থিত হতেন ! আরও বর্ণনা করা হয়েছে : রাগান্বিত অবস্থায় রাসূল (সা.) মু মিনগণকে অভিসম্পাত করতেন এবং বলতেন , আমি আল্লাহর নিকট কামনা করেছি যে , মু মিনদের প্রতি আমার অহেতুক অভিসম্পাতগুলি যেন তাদের পবিত্রতার উপকরণ হয়ে যায় ! মদীনার অধিবাসী , খেজুরগাছ পরিচর্যা কারী কৃষকদেরকে বলেন : খেজুরগাছগুলিকে পরাগায়ন করো না ! এতে তোমাদের খেজুর অধিকতর ভাল হবে । সেই বছর তারা পরাগায়ন করল না , ফলে সেই বছর তাদের খেজুরগুলি নষ্ট হয়ে গেল। লোকেরা রাসূলকে (সা.) সংবাদ দিল , তিনি বললেন : আনতুম আ লামু বি উমূরি দুনিয়াকুম মিন্নী ! অর্থাৎ তোমরা তোমাদের দুনিয়াবী কাজ কর্মের ক্ষেত্রে আমার চেয়ে বেশী জান ! আরও বর্ণনা করা হয়েছে যে , রাসূল (সা.) একবার পবিত্র কাবা ঘরের নিকট সূরা নাজম তিলাওয়াত করতে গিয়ে যখন আফারাআইতুমুল্লাতা ওয়াল্ ’ উয্যা ওয়া মানাতাছ্ ছালিছাতাল্ উখরা ” এই আয়াতে পৌঁছেন , তখন শয়তান রাসূলের মুখ দিয়ে নিম্নোক্ত বাক্যটি বলিয়ে নেয় : তিলকাল্ গারানীকুল্ ’ উলা মিনহাশ্ শাফা আতুরতাজা । অর্থাৎ সেই সুশ্রী মূর্তিগুলি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ফলে তাদের প্রতি শাফাআতের আশা আছে । ৪৮ মুয়াবিয়া ও তার অনুচররা হযরত আলীর (আ.) নিন্দার ক্ষেত্রে , যতটা সম্ভব হয়েছে ততটা মিথ্যা হাদীছ রচনা করেছেন এবং রাসূলের (সা.) নাম দিয়ে মিথ্যা হাদীছসমূহকে মুসলমানদের মাঝে প্রচার করেছেন। কারণ তিনি হযরত আলীর উপর অভিসম্পাত করাকে জুমু আর নামাযের খুৎবার আবশ্যিক অংশ হিসেবে মুসলমানদের মাঝে প্রচলন করতে চেয়েছিলেন !

অপরদিকে , মুসলমানদেরকে বিশ্বাস করাতে চেয়েছিলেন যে , ধার্মিকতা হচ্ছে খলীফাদের আনুগত্য করা , বাস ! আর এই কারণেই মুয়াবিয়া ও পরবর্তী খলীফারা যা কিছু আদেশ দিতেন , মুসলমানরা তারই আনুগত্য করত। শুধু এই কারণেই , প্রকাশ্য পাপী ও মদ্যপায়ী ইয়াযীদের হাতে মুসলমানদের নিকট হতে বাইআত ও তার খেলাফতের পক্ষে স্বীকারোক্তি নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।

সারকথা , ইসলামী সমাজ সেই সময়ে এইরূপ হয়েছিল যে , রাসূল (সা.) সেই বিষয়ে পূর্বেই সংবাদ দিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন : সা ইয়া তী ’ আলা উম্মাতী যামানুন্ লা ইয়াব্ক্বা মিনাল্ কুরআনি ইল্লা রাসমুহু ওয়ালা মিনাল্ ইসলামি ইল্লা ইসমুহু । অর্থাৎ আমার উম্মতের উপর এমন একটি সময় আসবে যে , তখন নাম ব্যতীত ইসলামের এবং কাগজের পৃষ্ঠায় লিখিত রূপ ব্যতীত কুরআনের কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না । হ্যাঁ , ইসলামী সমাজ ও মুসলিম জনগণ এমন অবস্থার মধ্যেই জীবনযাপন করছিল , ফলে ষাট হিজরীতে মুয়াবিয়া মারা গেলে মুয়াবিয়ার পুত্র ইয়াযীদ তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার সুযোগ পায় । ৪৯

খলীফার আনুগত্যের বিষয়

পূর্বোল্লেখিত বিষয়গুলির উপর ভিত্তি করে বলা যায় , মুয়াবিয়া মুসলমানদেরকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন যে , সমসাময়িক খলীফার আনুগত্যের মাঝেই ইসলামের সবকিছু নিহিত বলে তারা জানত। প্রধান সমস্যাটা হচ্ছে এখানেই ! দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে , মুয়াবিয়ার পূর্ব পর্যন্ত ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রবিন্দু (রাজধানি) ছিল মদীনা এবং ইসলামী ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে বসবাসকারী মুসলমানরা সেইখানে কতিপয় সাহাবী ও তাবেঈনের সাক্ষাৎ পেত আর তাঁদের নিকট হতে ইসলামী আক্বীদা বিশ্বাস ও হুকুম আহ্কাম সম্পর্কে জেনে নিত। মুয়াবিয়া সিরিয়াকে রাজধানি হিসেবে নির্ধারণ করেন এবং সিরিয়ার অধিবাসীদেরকে এমনভাবে গড়ে তোলেন যে , নামায পড়া ও রোযা রাখা ব্যতীত , তার ও তার পূর্ববর্তী রোম সমরাটের সরকারের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।

“ খলীফা যা কিছু বলেন তাই ধর্ম এবং ধর্ম বলতে সেটিই বুঝায় যেটি খলীফা বলেন ” তাদের এই বিশ্বাসের অন্যতম পরিণতি ইয়াযীদের যুগে স্পষ্ট হয়ে উঠে , যখন সে তার সৈন্যবাহিনীকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরের সাথে যুদ্ধ করার জন্যে মক্কায় প্রেরণ করে তখন তার সৈন্যবাহিনী কিবলাহ্ অর্থাৎ কা বার ” দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নামায আদায় করে এবং তারপরই আবার সেই কিবলাতে কামানের গোলা নিক্ষেপ করে !

অনুরূপভাবে যখন আব্দুল মালিক হাজ্জাজের নেতৃত্বে আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে সৈন্যদল প্রেরণ করে , তখন কখনও কখনও সেনারা অলসতা করলে , হাজ্জাজ চিৎকার দিয়ে বলত : আত্তাআতু ! আত্তাআতু ! অর্থাৎ খলীফার আনুগত্য কর! খলীফার আনুগত্য কর! আর তারা বলত: ” ইজতামা আতিত্তাআতু ওয়াল্ হুরমাতু ফাগালাবাতিত্তাআতুল্ হুরমাতা ! অর্থাৎ খলীফার আনুগত্য আল্লাহর গৃহের মর্যাদার সাথে একত্রিত হয়েছে , কিন্তু খলীফার আনুগত্য আল্লাহ গৃহের মর্যাদার উপর প্রাধান্য পেল ! খলীফা আদেশ দিয়েছে যে , যেন আল্লাহর ঘরকে কামানের গোলায় উড়িয়ে দেই , আর আমরাও কামানের গোলায় তা উড়িয়ে দিচ্ছি !৫০ অনুরূপভাবে , মদীনার লোকেরা ইয়াজিদের খিলাফতের দ্বিতীয় বর্ষে যখন তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ্ করে , তখন ইয়াজিদ মদীনায় সৈন্যবাহিনী প্রেরণ করে এবং সে তিন দিনের জন্যে মদীনার অধিবাসীদের জান , মাল ও স্ত্রী কন্যাদেরকে তাদের জন্য হালাল করে দেয়।৫১ এভাবেই তার সেনাদল খলিফার আনুগত্যের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে সেখানে সকল প্রকার অন্যায় আচরণ ও অবৈধ কার্যকলাপ চালায় । ফলে রাসূলের (সা.) মসজিদে রক্তের স্রোত প্রবাহিত হয় এবং সেই ঘটনার পর সহস্র মহিলা এমন শিশুদের জন্ম দিয়েছিলেন যাদের পিতৃ পরিচয় ছিল না !৫২ সেনাপতি মুসলিম ইবনে উকবা ইতিহাসে যে মুসরিফ ’ বলে প্রসিদ্ধ সে ঐ ভয়ঙ্কর অপরাধ যজ্ঞ সম্পন্ন করার পর যখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মদীনা হতে মক্কার অভিমুখে যাত্রা করে এবং পথিমধ্যে মারা যায়। মুমূর্ষু অবস্থায় বলে : হে আল্লাহ্ ! খলীফার আনুগত্যের লক্ষ্যে মদীনার অধিবাসীদেরকে হত্যার পর যদি তুমি আমাকে জাহান্নামে পাঠাও তবে প্রমাণিত হবে যে , আমি অতি হতভাগ্য ! ৫৩

অর্থাৎ খলীফার আনুগত্যের পথে আমি মদীনার অধিবাসীদেরকে হত্যা করেছি এবং এর মাধ্যমে আমি আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করতে চেয়েছি।

শিমার ইবনে যিল জাওশান নিজেও যখন হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (ইমাম হুসাইন) শাহাদতের পর তিরস্কারের পাত্র হিসেবে চিহ্নিত হয় , তখন প্রতি উত্তরে বলে : ধিক তোমাদের প্রতি ! আমাদের কাজ ছিল খলীফার আনুগত্য করা। যদি আমরা খলীফার আনুগত্য না করতাম তবে এই চতুষ্পদ জন্তুগুলির মত হতাম ! ৫৪

অতএব , একদিকে খলীফার জন্যে মুসলমানদের আনুগত্য এই সীমায় পৌঁছেছিল এবং অপরদিকে খলীফা ইয়াযীদ এমন কেউ ছিল যে , ধারণা করত , সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর ইসলামের সমস্ত জিনিস শেষ হয়ে গেছে এবং তার বিপরীতে রুখে দাঁড়ানোর মত আর কেউ নেই। যে অনুষ্ঠানে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) মাথা আনা হয়েছিল সেইখানে এই কবিতাগুলি পাঠের দ্বারা সে স্বীয় বিশ্বাসকে প্রকাশ করে :

লা য়িবাত্ হাশিমু বিল্ মুলকি ফালা , খাবারুন্ জাআ ওয়া লা ওয়াহ্য়ুন্ নাযালা।

লাস্তু মিন্ খিন্দিফা ইনলাম্ আন্তাক্বিম্ , মিন্ বানী আহমাদা মা কানা ফা আলা।

ক্বাদ ক্বাতালনাল্ ক্বারমা মিন্ সাদাতিহিম্ , ওয়া আদালনা মাইলা বাদরিন ফা তাদালা।৫৫

“ সেই হাশিমী পুরুষটি ক্ষমতার সাথে খেলা করেছেন , তা ছাড়া , না কোনো ঐশী প্রত্যাদেশ এসেছে আর না কোনো সংবাদ !

বনী আহমাদ (রাসূলের বংশধর) বদরের দিন যেইরূপ কাজ করেছেন , আমি (ইয়াযীদ) যদি সেইরূপে প্রতিশোধ গ্রহণ না করি তবে আমি আমার দাদা বাবার সন্তান নই !

আমরা তাদের মহান ও নেতা ব্যক্তিদেরকে হত্যা করেছি এবং বদর দিনের প্রতিশোধ নিয়েছি , বদর প্রান্তরে সেদিন উৎবা , শাইবা ও হানযালা নিহত হয়েছিলেন ; আজ আমি পাল্লাকে সমান করেছি এবং শিরের বদলে শির নিয়েছি !

হযরত আবা আব্দিল্লাহর (আ.) বিদ্রোহের কারণ

মোট কথা , মুসলমানদের আক্বীদা বিশ্বাস এইরূপ হয়েছিল যে , ধর্ম তাই যা খলীফা বলে। তাহলে এই অবস্থায় ইসলামের কী কিছু অবশিষ্ট থাকবে ?! এই অবস্থার বর্ণনা , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) বক্তব্যে কতকটা ফুটে উঠেছেঃ

১। মদীনায় তিনি তাঁর ভাই মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়্যাকে তাঁর স্বহস্তে লিখিত যে অসিয়ত নামাটি দিয়েছিলেন , তার প্রারম্ভে বলেন : ইন্নাল্ হুসাইনা ইয়াশহাদু আন্ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আন্না মুহাম্মাদান্ আব্দুহু ওয়া রাসূলুহু । তাঁর অসিয়তনামার শুরুতে তিনি এইটি বলেন যাতে তাঁর মৃত্যুর পর লোকেরা না বলে যে , আলীর পুত্র হুসাইন একজন বিদ্রোহী ছিলেন। যিনি মুসলমানদের খলিফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দ্বীন হতে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি লিখেনঃ ওয়া ইন্নী লাম্ আখরুজ আশারান্ ওয়া লা বাত্বারান্ ওয়া লা মুফসিদান্ ওয়া লা যালিমান্ ওয়া আন্নামা খারাজতু লিত্বালাবিল্ ইসলাহি ফী উম্মাতি জাদ্দী । অর্থাৎ আমি নিছক বিদ্রোহের উদ্দেশ্যে , শখের বশে বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির লক্ষ্যে বের হই নি। বরং আমি আমার নানাজানের উম্মতকে সংশোধন করার জন্যে বের হয়েছি। উরীদু আন্ আসীরা বিসীরাতি জাদ্দী ওয়া আবী আলী ইব্নি আবী ত্বালিব । আমি আমার নানাজান (সা.) এবং আমার পিতা আলীর (আ.) পথের অনুসরণ করতে চাই । কিন্তু অন্যান্য খলীফাদের নাম উচ্চারণ করলেন না। উরীদু আন্ আ মুরা বিল্ মা রুফি ওয়া আনহা ’ আনিল্ মুনকারি ফামান ক্বাবিলানী বিক্বাবূলিল্ হাক্কি ফাল্লাহু আউলা বিল্ হাক্কি ওয়া মান্ রাদ্দা ’ আলায়্যা হাযা আস্বিরু হাত্তা ইয়াক্বযীয়াল্লাহু বাইনী ওয়া বাইনাল্ ক্বাউমি ওয়া হুআ খাইরুল্ হাকিমীন । আমি সৎ কাজের প্রতি আদেশ এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করতে চাই। অতএব , লোকেরা যদি আমাকে গ্রহণ করে তো করুক , আর গ্রহণ না করলে তাদেরকে আল্লাহর উপর অর্পণ করব , আর তিনি হচ্ছেন উত্তম বিচারক।৫৬

সুতরাং হযরত সাইয়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) এর আন্দোলনের কারণ ও হেতু এই অন্তিম বাণীতে ” বর্ণিত হয়েছে।

২। যে রাত্রে তাঁর থেকে বাইআত গ্রহণ করতে চাচ্ছিল এবং তিনি বাইআত করেন নি , তার পরের দিন মারওয়ান তাঁর সাথে দেখা করে এবং তাঁর নিকট আবেদন করে :

“ আমার একটি উপদেশ শুনুন! তিনি বললেন: বল! সে বলল: আসুন! ইয়াযীদের নিকট বাইআত করুন ; এটি আপনার দ্বীন ও দুনিয়ার জন্যে কল্যাণকর হবে! তিনি বললেনঃ ওয়া আলাল্ ইসলামি আসসালামু ইযা বুলিয়াতিল্ উম্মাতু বিরায়িন্ মিছলি ইয়াযীদা! অর্থাৎ যদি মুসলিম জাতি , ইয়াযীদের মত একজন প্রতিনিধি ও আমীরের আনুগত্য করে তাহলে ইসলামের সাথে খোদা হাফেযী করতে হবে এবং তাকে বিদায় জানাতে হবে! ৫৭

৩। অন্য এক স্থানে তিনি বলেন : ইন্না ইয়াযীদা রাজুলুন্ শারিবুল্ খামরি ক্বাতিলুন্ নাফসিল্ মুহতারামাতি ওয়া মিছ্লী লা ইউবায়ি ’ য়ু মিছ্লাহু! অর্থাৎ ইয়াযীদ একজন মদ্যপায়ী লোক। যাদেরকে হত্যা করা নিষেধ তাদেরকে সেই হত্যা করে। আমার মত লোক কখনই তার মত লোকের আনুগত্য করতে পারে না !৫৮

ইমাম হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণী

হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের উপর ভবিষ্যদ্বাণী সম্পর্কিত যে সব হাদীছ রাসূল (সা.)৫৯ এবং হযরত আলী (আ.)৬০ হতে বর্ণিত হয়েছে , সেগুলির প্রেক্ষিতে , সমস্ত মুসলমানই সেই বিদ্রোহের জন্যে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন ; আর যেহেতু তারা জানতেন এবং রাসূলের (সা.) নিকট হতে শুনেছিলেম যে , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) ইরাকের ভূমিতে শহীদ হবেন , তার জন্যে ইবনে আব্বাস ও অন্যান্যরা তাঁকে ইরাকে যেতে নিষেধ করছিলেন।৬১

রাসূল (সা.) কারবালার অল্প পরিমাণ মাটি , উম্মে সালমাকে দিয়েছিলেন , এই উদ্দেশ্যে যে , তিনি যেন তা একটি বোতলে সংরক্ষণ করেন এবং তিনি তাকে বলেছিলেন :৬২ যখন এই মাটি রক্তে পরিবর্তিত হবে তখন বুঝবে যে , আমার সন্তান ইমাম হুসাইন (আ.) শহীদ হয়েছে !

অতএব , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের খবরটি এমন এক ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যা রাসূল (সা.) কয়েকবার তাঁর সাহাবীদেরকে বলেন। প্রথমবার , হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.) জন্মের দিন জিবরাঈল (আ.) আগমন করেন এবং রাসূলকে (সা.) হুসাইনের (আ.) শাহাদতের খবর দেন। রাসূল (সা.) ক্রন্দন করেন এবং সংবাদটি অন্যদের দেন । তাঁর জন্মের দু বছর পর অপর একজন ফেরেশ্তা আগমন করেন এবং রাসূলকে (সা.) সংবাদ দেন। রাসূল (সা.) পুনরায় ক্রন্দন করেন এবং উপস্থিত জনতাকে সংবাদটি সম্পর্কে অবগত করেন। এই সংবাদটি অধিকাংশ সাহাবীই শুনেন।৬৩

মক্কা হতে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) যখন যাত্রা করেন তখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর ” তাঁর সমীপে আসেন এবং বিনীতভাবে তাঁকে ইরাকে যেতে বারণ করেন। কারণ এই পথে তিনি নিহত হবেন। তিনি তাকে এমনটি বলেন নি যে , তিনি নিহত হবেন না। বরং তিনি বলেন : মিন্ হাওয়ানিদ্ দুনিয়া আন্ য়ুহালা রা ’ সু ইয়াহ্ইয়া ইবনি যাকারিয়্যা ইলা বাগিয়্যিন মিন্ বাগায়া বানী ইসরাঈলা । অর্থাৎ পৃথিবীর হীন অবস্থার (বোঝার) জন্যে এতটুকুই যথেষ্ট যে , ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়ার মাথাকে বনী ইসরাঈলের নিকৃষ্টলোকদের অন্তর্ভূক্ত একজন নিকৃষ্ট ব্যক্তিকে উপহার দেয়া হয় । তিনি প্রার্থনা করলেন : এখন যদি যান , তবে আপনার শরীরের যে অংশটিতে রাসূল (সা.) চুমু খেতেন সে অংশটুকু বের করেন , আমি চুমু খাব । তিনি নিজ জামাটি উঁচু করলেন এবং ইবনে উমর তাঁর ক্বলবের উপর (তিরের স্থানটি , যেখানে রাসূলকে তিনি চুমু দিতে দেখেছিলেন সেখানে) চুমু দেন।৬৪

এই বিষয়ে অপর যে বর্ণনাগুলি এসেছে তার অন্যতম হচ্ছে যে , হযরত দাউদের সন্তানদের অবশিষ্ট এক ব্যক্তি যিনি ইহুদী আলেম ছিলেন যখন কারবালায় পৌঁছতেন তখন তিনি সেখান দিয়ে দ্রুত অতিক্রম করতেন এবং বলতেন : আমি পড়েছি ,এই ভূমিতে রাসূলের একজন সন্তান নিহত হবেন । তিনি ভয় করতেন যে , হয়তো রাসূলের সেই সন্তান তিনিই হবেন। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর তিনি বুঝলেন যে , তিনি সেই পুরুষ ছিলেন না এবং সেখান দিয়ে আর দ্রুত অতিক্রম করতেন না।৬৫

দ্বিতীয় এই যে , রাসূলের একজন সাহাবা তাঁর নিকট হতে শুনেছিলেন যে , কারবালাতে তাঁর সন্তান সন্ততিদের কেউ একজন নিহত হবেন। তিনি রাসূলের (সা.) সন্তান সন্ততিদের সাথে শহীদ হওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় ধরে কারবালাতে অবস্থান করেন। বনী আসাদ গোত্রের লোকেরা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে কারবালা প্রান্তরে আসেন এবং সেখানে সেই সাহাবীকে বাস করতে দেখেন। তারা তাঁর নিকট এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন : আমি রাসূলের (সা.) নিকট হতে শুনেছি যে , এইখানে তাঁর একজন সন্তান শহীদ হবেন। আমি তাঁর সঙ্গী হতে চাই । হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের পর বনী আসাদ গোত্রের লোকেরা পরস্পর বলাবলি করেন : চল আমরা দেখি যে , সেই লোকটি শহীদগণের মধ্যে আছেন কি না ? তারা এসে দেখেন , সে মরুভূমিতে সমস্ত শহীদের সাথে তাঁরও লাশ রয়েছে।৬৬

মদীনা হতে ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রস্থান

তিনি এমন এক সময় মদীনা হতে বের হয়ে মক্কায় পৌঁছেন যে , সেই সময় আরব দ্বীপের লোকেরা মুফরাদা উমরা পালনের জন্যে মক্কায় এসেছিলেন। এই কারণে তাঁর বাইআত না করার সংবাদটি হেজায হতে ইরাক , সিরিয়া ও ইয়েমেন তথা সমগ্র আরব দ্বীপে প্রচারিত হয়েছিল এবং উমরার উদ্দেশ্যে আসা লোকেরা ফিরে গিয়ে অপর লোকদেরকে সংবাদটি পরিবেশন করেছিলেন যে , রাসূলের (সা.) দৌহিত্র , ইয়াযীদের নিকট বাইআত না করে মক্কায় আশ্রয় নিয়েছেন এবং তিনি বলছেন ; ইয়াযীদু রাজুলুন্ শারিবুল্ খামরি ওয়া ক্বাতিলুন্ নাফ্সিল্ মুহতারামাতি ওয়া মিছ্লী লা ইউবায়ি ’ য়ু মিছ্লাহ্ । এই সংবাদটি সেখানকার সমস্ত অঞ্চলে প্রচারিত হয়। অতঃপর হজ্জ মৌসুমেও যেই সমস্ত লোক হজ্জ পালনে এসেছিলেন তারা পুনরায় তাঁর নিকট হতে কথাগুলি শুনেছিলেন। এর পূর্বেও কুফার লোকেরা , ইমাম হাসানের (আ.) শাহাদত বরণের পর হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) নিকট এই মর্মে পত্র লিখেছিল যে , আমরা আপনার নিকট বাইআত করার জন্যে প্রস্তুত এবং মুয়াবিয়ার বিপক্ষে বিদ্রোহ করতে চাই। তিনি প্রতি উত্তরে লিখেন যে , যতদিন পর্যন্ত মুয়াবিয়া জীবিত আছেন কূনূ হিলসান মিন্ আহলাসি বুয়ূতিকুম । অর্থাৎ যতদিন পর্যন্ত মুয়াবিয়া জীবিত আছেন ততদিন পর্যন্ত তোমরা তোমাদের গৃহের ব্যবহৃত চটের মত গৃহের কোণে বসে থাক।৬৭

মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পরও তারা পুনরায় তাঁর নিকট পত্র লিখে। তাঁর নিকট এত বেশী পত্র আসে যে , তা (বড় আকারের) দুইব্যাগ পরিমাণ হয়েছিল ।৬৮ পত্রগুলির বিষয়বস্তু ছিল এইরূপঃ আক্বদিম্ ’ আলা জুন্দিন্ লাকা মুজান্নাদুন্ । অর্থাৎ আপনি কুফাতে আসেন , আপনার জন্যে সৈন্য প্রস্তুত আছে।৬৯

তিনি তখন বাইআত গ্রহণ করার জন্যে মুসলিম ইবনে আক্বীলকে কুফায় প্রেরণ করেন। মুসলিম ইবনে আক্বীল সহস্র যোদ্ধা পুরুষের নিকট হতে বাইআত গ্রহণ করেন , সেইখানে বিশ হাজারেরও বেশী লোক তার নিকট বাইআত করেন।৭০

অতঃপর তিনি একখানা পত্রের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণ বিবরণ হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) জানান।৭১

অপরদিকে , মক্কায় হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) হত্যা করার জন্যে ইয়াযীদ বনী উমাইয়্যা গোত্রের একদল লোককে প্রেরণ করে এবং এই সংবাদটি তাঁর নিকট পৌঁছে যায়।৭২

যারা হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) ইরাকে যেতে বারণ করছিলেন , তাদের অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাও (আ.) প্রত্যেককেই যথোপযুক্ত জবাব দিচ্ছিলেন। যখন ইবনে যুবাইর তাঁর নিকট এই আবেদন করেছিলেন যে , এইখানে অবস্থান করেন , আমরাও আপনার সান্নিধ্যে থাকতে পারব । তিনি বললেনঃ রাসূলকে (সা.) বলতে শুনেছি : ইউক্বতালু ফিল্ বাইতি কাব্শুন্ মিন্ কুরাইশিন্ তুহ্তাকু বিহি হুরমাতুহু ফামা উহিব্বু আন্ আকূনা যা লিকাল্ কাবশ্ । অর্থাৎ আল্লাহর ঘরে কুরাইশগণের একজন প্রসিদ্ধ ব্যক্তি নিহত হবে এবং তাঁর হত্যার মাধ্যমে আল্লাহর ঘরের সম্মান বিনষ্ট হবে। আমি সেই ব্যক্তি হতে চাই না । ৭৩ । সে ব্যক্তিটি স্বয়ং আব্দুল্লাহ্ ইবনে যুবাইর ’ ছিলেন , যিনি ইয়াযীদ ও বনী উমাইয়্যাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন এবং এই কারণে তারা আল্লাহর ঘরে কামানের গোলা বর্ষণ করে ঐ গৃহের সম্মান নষ্ট করে।

দ্বিতীয় জন ছিলেন ইবনে আব্বাস , তিনি বিনীতভাবে প্রার্থনা করলেন : ইয়াবনা রাসূলিল্লাহ্ ! (হে আল্লাহর রাসূলের সন্তান) আপনি মক্কায় থাকেন কিংবা ইয়েমেনে যান , সেখানে আপনার অনুসারীগণ আছেন । তিনি বললেন : বনী উমাইয়্যারা আমার উপর থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত হাত গুটাবে না যতক্ষণ না আমি বাইআত করব , না হয় নিহত হব । ৭৪ কারণ যতদিন পর্যন্ত তিনি জীবিত ছিলেন এবং ইয়াযীদের নিকট বাইআত করছিলেন না ততদিন পর্যন্ত ইয়াযীদের খিলাফত দৃঢ় হয় নি। অতএব , হয় হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) ইয়াযীদের নিকট বাইআত করতে হত নতুবা যে অবস্থায় কল্যাণকর মনে করতেন সে অবস্থায় নিহত হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হত। এ ছাড়া আর বিকল্প কোনো পথ ছিল না !

পক্ষান্তরে , কুফার অধিবাসীরা সহস্র পত্র লিখেছিল এবং সহস্র যোদ্ধা পুরুষ তাঁর নিকট বাইআত করেছিল। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) যদি কুফায় না যেতেন , তবে কী ইতিহাসে লিখা হত না যে , কুফাবাসীরা বাইআত করা সত্ত্বেও তিনি কুফায় যান নি ? কিয়ামত দিবসে কুফাবাসীরা কী আল্লাহর নিকট এই কথা বলার অধিকার রাখত না ? : হে আল্লাহ্ ! আমরা বাইআত করেছি , পত্র লিখেছি ; কিন্তু তোমার রাসূলের সন্তান আমাদের দাওয়াত গ্রহণ করেন নি ।

খলীফাদের যুগে জিহাদের অর্থের পরিবর্তন

রাসূলের (সা.) যুগের যুদ্ধ ’ ও জিহাদ ’ , ধর্মের পথে যুদ্ধ ও জিহাদ ছিল। কিন্তু খলীফাদের যুগের যুদ্ধ ও জিহাদ ছিল রোম ও পারস্য সম্রাটদের ধনভাণ্ডারকে হস্তগত করার জন্যে। ফলে দ্বীন ও দুনিয়া তাদের জন্যে একত্রিত হয়ে ছিল। আর এই কারণে , হযরত আমীরুল মু মিনীন (আ.) যখনই সৈন্য সমাবেশ করতে চাইতেন তখন যেহেতু তিনি প্রতিপক্ষ মুসলমানদের ধন সম্পদ লুণ্ঠন ও আত্মসাত করার অনুমতি দিতেন না , তাই তাঁর খিলাফতের শেষদিকে লোকেরা তাঁকে গ্রাহ্য করছিল না। হযরত আমিরুল মু মিনীনের (আ.) যুগে জিহাদ , রাসূলের (সা.) যুগের জিহাদের মত , দ্বীনের পথে জিহাদ ছিল এবং দুনিয়া তার অন্তর্ভুক্ত ছিল না। কিন্তু খলীফাদের যুগের লোকেরা , দ্বীনের পথে জিহাদ করাকে ভুলে গিয়েছিল এবং দুনিয়া ব্যতীত দ্বীনের পুনর্জাগরণের জন্যে জিহাদ করা , তাদের নিকট কোনো অর্থ ছিল না।

জিহাদ , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) যুগেও এই অর্থে রূপান্তরিত হয়েছিল। অর্থাৎ দুনিয়ার জন্যে এবং দুনিয়াকে হস্তগত করার জন্যে যুদ্ধ বিগ্রহ ! আর এই কারণেই তাঁকে সবাই বলত : আপনি কুফায় যাবেন না ! ইবনে আব্বাস , আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমর , অন্যান্য সাহাবীরা এমনকি তাঁর ভাই উমর ইবনে আলী , তিনি মদীনাতে হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) সমীপে উপস্থিত হয়ে বিনীতভাবে প্রার্থনা করেন : ইয়া আখী ! সামি ’ তু আখিল হাসান এবং তাঁর শুনা কথাগুলি পুনর্ব্যক্ত করতে পারছিলেন না , তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদা (আ.) তাঁর ভাইকে বুকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন : ভাই ! তুমি ধারণা করছ আমার ভাই হাসান (আ.) তাঁর পিতার নিকট হতে কিছু শুনেছেন এবং তোমাকে বলেছেন আর আমাকে বলেন নি ? ৭৫ উমর ইবনে আলী উত্তরে বলেন : ভাই ! আসুন , (সে কথাগুলির) ভিন্নরূপ ব্যাখ্যা করেন এবং আপনি যাবেন না। তাহলে এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হবে না । তিনি তাকে বুঝাতে পারছিলেন না যে , বিদ্রোহ করা উচিত এবং নিহত হওয়া দরকার। আর তাঁর বিদ্রোহের মাঝে পার্থিব কোন উপকার নেই। তিনি তাকে বলতে পারছিলেন না : আমরা অবশ্যই বিদ্রোহ করব এবং রাসূলের (সা.) যুগের ন্যায় নিহত হব , তাহলে আল্লাহর দ্বীন পুর্নজীবিত হবে ।

রাসূলের (সা.) যুগে , বদরযুদ্ধে , আনসারগণের মধ্য হতে রাসূলের(সা.) একজন সাহাবী (উমাইর ইবনে হুমাম) খোরমা খেতে খেতে রাসূলের (সা.) সমীপে আসেন এবং বিনীতভাবে বলেনঃ ইয়া রাসূলাল্লাহ্ ! মা লিমান্ গামাসা ইয়াদাহু ফীহিম ওয়া ক্বাতালা হাত্তা কুতিলা ? হে আল্লাহর রাসূল ! যে ব্যক্তি তরবারিসহ তার হাতকে এদের দিকে বাড়াবে , যুদ্ধ করবে এবং শেষ পর্যন্ত নিহত হবে , তার বিনিময় কি ? তিনি উত্তর দিলেন : আল্ জান্নাহ্ । সেই সাহাবী বললেন : বাখ্যিন বাখ্যিন মা বাইনী ওয়া বাইনাল্ জান্নাতি ইল্লা হাযিহিত্তামারাতু আ কুলুহা । অর্থাৎ বাহ্ বাহ্ ! আমার এবং বেহেশ্তের মাঝে শুধুমাত্র এই খোরমাগুলির ব্যবধান রয়েছে যা আমি খাচ্ছি ! অতঃপর তিনি খোরমাগুলি হাত হতে ফেলে দেন এবং যুদ্ধ করে শহীদ হন।৭৬

রাসূলের যুগে জিহাদ ’ ছিল এরূপ। কিন্তু তাঁর পরে অবস্থা পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল ; পুরো ইসলামই পরিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) মুখ নিস্মৃত কবিতার এই পংক্তিটি তার প্রকৃতি তুলে ধরেছে :

ইন্ কানা দ্বীনু মুহাম্মাদিন্ লাম্ ইয়াস্তাক্বিম্ ইল্লা বিক্বাত্লী ইয়া সুয়ূফু খুযীনী। যদি মুহাম্মদের (সা.) দ্বীন আমার নিহত হওয়া ব্যতীত সুদৃঢ় না হয় তবে সাবধান , হে তরবারিসমূহ ! আমাকে গ্রহণ কর ! ৭৭

যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে , যখন তিনি মক্কা হতে ইরাকের উদ্দেশ্যে রওনা হচ্ছিলেন তখন তিনি হাজীগণের উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন এবং এইরূপ বলেন : খুত্তাল্ মাউতু ’ আলা উলদি আদামা মাখাত্তাল্ ক্বিলাদাতি ’ আলা জীদিল্ ফাতাতি । অর্থাৎ বনী আদমের জন্যে মৃত্যু , ঠিক যুবতী মেয়েদের গলে গলাবন্ধনির মত মানানসই। তিনি আরও বলেন : কাআন্নী বিআউসালী তাতাক্বাত্তা ’ উহা ’ আস্লানুল্ ফালাওয়াতি বাইনান্নাওয়াবীসি ওয়া কারবালা ! আমি যেন দেখতে পাচ্ছি আমার শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলিকে কারবালা এবং নাওয়াবিস ভূমির মাঝে মরুভূমির নেকড়েরা ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাচ্ছে ! লান্ তাশুয্যা ’ আন্ রাসূলিল্লাহি লুহমাতুহু বাল্ হিয়া মাজমু আতুন্ লাহু ফী হাযীরাতিল কুদ্সি । আল্লাহর রাসূলের (সা.) রক্ত মাংস , যা আবা আব্দিল্লাহর শরীরে আছে , তা রাসূল (সা.) হতে পৃথক হবে না এবং বেহেশ্তে তাঁর সাথে সম্মিলিত হবে । ৭৮

অনুরূপভাবে ,যখন তিনি মক্কা হতে বের হতে চাচ্ছিলেন তখন তিনি এক লাইনের এক খানা পত্রে বনী হাশিমদেরকে উদ্দেশ্য করে লিখেছিলেন : ইলাল্ মালাআ মিন্ বানী হাশিমিন্ আম্মা বা ’ দু মান্ লাহিক্বা বী মিনকুম ইস্তাশহাদা ওয়া মান্ তাখাল্লাফা আন্নী লাম্ ইয়াবলুগিল্ ফাত্হা । তোমাদের মধ্য হতে যে আমার সাথে মিলিত হবে সেই শহীদ হবে , আর যে আমাকে সহযোগিতা করা হতে বিরত থাকবে সে কৃতকার্য হবে না । ৭৯ অতএব , তিনি শাহাদতের মাঝেই কৃতকার্যতাকে দেখেছেন।

ইরাকের পথে ইমাম (আ.) যে স্থানেই যাত্রাবিরতি করতেন বলতেন : মিন্ হাওয়ানিদ্ দুনিয়া আন্ য়ুহমালা রা ’ সু ইয়াহ্ইয়া ইবনি যাকারিয়্যা ইলা বাগয়িন্ মিন্ বাগায়া বানী ইস্রাঈল । ৮০

দুনিয়ার অন্যতম অধমতা এই যে , ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়ার মাথাকে বনী ইস্রাঈলের নিকৃষ্টলোকদের মধ্য হতে একজন নিকৃষ্টলোকের জন্য বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ।

অতএব , প্রতীয়মান হয় যে , তিনি জানতেন যে , হয় তাঁকে নিহত হতে হবে , নতুবা বাইআত করতে হবে ; এই দু টি ভিন্ন অন্য কোন পথ তার ছিল না। যদি তিনি বাইআত না করতেন তবে ইয়াযীদের খিলাফত অনিশ্চিত হয়ে যেত এবং তাঁকে হত্যা না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হত না। সুতরাং বাইআত না করলে তাঁর নিহত হওয়াটা অবশ্যম্ভাবী ছিল , এমনকি যদি তিনি পবিত্র কা বার গেলাফের নিচেও আত্মগোপন করতেন এবং বাইআত না করতেন। আর তিনি বাইআত করলে , মুসলমানদের মধ্যে এই আক্বীদা বিশ্বাস জন্মাত যে , খলীফা ইয়াযীদ যা বলবে তাই ধর্ম । তাহলে আর ইসলামের কিছুই অবশিষ্ট থাকত না। সুতরাং তাঁর বাইআত করাও উচিত নয়। তিনি বাইআত করলে , মুসলমানদের বলার অধিকার ছিল যে , রাসূলের (সা.) নাতি ইয়াযীদের নিকট বাইআত করেছেন। সমস্ত পাপ তাঁর কাঁধের উপর বর্তাত। আর এইটি , রাসূলের (সা.) ভবিষ্যদ্বাণীসমূহ যা , মুসলমানদেরকে এই বিদ্রোহের জন্যে প্রস্তুত করে রেখেছিল , তার সাথে বিরোধ দেখা দিত।

লোকেরা এভাবেই হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শাহাদতের অপেক্ষায় ছিল। তিনি জানতেন যে , তাঁকে কারবালায় যেতে হবে , তাই তিনি লোকজনকে সেই বিদ্রোহের কারণ উপলব্ধি করানোর জন্যে , প্রস্তুত করছিলেন। অনরূপভাবে যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখ , যখন হাজীগণ আরাফা ময়দানে যাচ্ছেন , হাজীগণের অনেকেই আফ্রিকা হতে ইরান পর্যন্ত দূরবর্তী স্থানসমূহ থেকে প্রায় এক বছরের রাস্তা অতিক্রম করে মক্কায় পৌঁছেছিলেন , তারা আল্লাহর রাসূলের (সা.) দৌহিত্রের সাথে সাক্ষাত করেন , দেখেন এবং শুনেন যে , তিনি যিলহজ্জ মাসের ৮ তারিখে আরাফার ময়দানে যান নি এবং স্বীয় হজ্জকে মুস্তাহাব হজ্জ ’ হতে মুস্তাহাব উমরায় ’ পরিবর্তন করেছেন৮১ ও বলেছেন : তারা আমাকে এইখানে মেরে ফেলতে চায় , আমি বাইআত করব না ! এর মাধ্যমে তিনি মুসলমানদের নিকট চূড়ান্ত প্রমাণ উপস্থাপন করেন।

কারবালায় ইমাম হুসাইনের (আ.) প্রবেশ

তৎকালে রেডিও এবং টিভির মত কোনো মাধ্যম না থাকা সত্ত্বেও হযরত সায়্যিদুশ শুহাদা (আ.) গৃহিত পদক্ষেপগুলির মাধ্যমে তাঁর বিদ্রোহ ও ইরাকের দিকে রওয়ানা হবার সংবাদটি , সে যুগে বিশ্বের সমস্ত মুসলমানের নিকট পৌঁছে গিয়েছিল।

তিনি তখনও কারবালায় পৌঁছেন নি এবং হুর ইবনে ইয়াযীদ রিয়াহী ’ র সৈন্যবাহিনী তাঁর মুখোমুখি হয় নি ; ইতোমধ্যে কুফা অঞ্চলের দু জন লোক তাঁর নিকট আসেন এবং তাঁকে মুসলিম ইবনে আক্বীল এর নিহত হওয়া ও কুফার লোকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ব্যাপারে সংবাদ দেন।৮২ তিনিও তাঁর সঙ্গী সাথিদেরকে উক্ত সংবাদটি জানিয়ে দেন এবং বলেন : এরা কুফার অধিবাসীরা আমাদেরকে পরিত্যাগ করেছে এবং আমাদেরকে সাহায্য করবে না। তোমাদের কেউ যেতে চাইলে চলে যাও । সেইখানে লোকেরা তাঁর হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।৮৩ ইবনে যিয়াদ হুর ইবনে রিয়াহীকে একহাজার অশ্বারোহীর এক সুসজ্জিত বাহিনী সহ প্রেরণ করে এবং আদেশ দেয় যে , হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদাকে (আ.) যেখানেই দেখবে সেখানেই আটকে রাখবে এবং তাঁকে কুফায় আসার সুযোগ দিবে না। অতি প্রত্যূষে , হুরের সৈন্যবাহিনী পৌঁছার পূর্বেই তিনি (ইমাম হোসেন) পানির সমস্ত পাত্র পূর্ণ করার আদেশ দেন। উক্ত দিনেই , হুরের সৈন্যবাহিনী পৌঁছলে , তিনি তাদেরকে এবং তাদের ঘোড়াগুলিকে পিপাসায় অতিষ্ঠ অবস্থায় দেখেন , তখন তিনি তাদেরকে পানি পান করানোর জন্য সাথিদেরকে আদেশ দেন। অতঃপর তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং আল্লাহর স্তুতি ও গুণ গান এবং রাসূল (সা.) ও তাঁর বংশধরের প্রতি দুরূদ কামনার পর তিনি বলেন : আয়্যুহান্নাসু ইন্না রাসূলাল্লাহি (সা.) ক্বালা : মান্ রাআ সুলত্বানান্ জায়িরান্ মুস্তাহিলান্ লিহুরুমিল্লাহি নাকিছান্ লি ’ আহ্দিল্লাহি মুখালিফান্ লিসুন্নাতি রাসূলিল্লাহি ইয়া মালু ফী ’ ইবাদিল্লাহি বিল্ ইছ্মি ওয়াল্ ’ উদ্ওয়ানি ফালাম্ ইউগায়্যির ’ আলাইহি বিফি ’ লিন্ ওয়া লা ক্বাউলিন্ কানা হাক্কান আলাল্লাহি আন্ ইউদ্খিলাহু মুদ্খালাহ্ হে লোকসকল ! আল্লাহর রাসূল (সা). বলেন : কোনো ব্যক্তি যদি উদ্ধত কোনো শাসককে এই অবস্থায় দেখে যে , আল্লাহর কৃত হারামকে হালাল করে , আল্লাহর সাথে কৃত প্রতিশ্রুতিকে ভঙ্গ করে , আল্লাহর রাসূলের সুন্নতের সাথে বিরোধিতা করে এবং আল্লাহর বান্দাগণের মাঝে পাপ ও অন্যায়ের সাথে শাসনকার্য পরিচালনা করে ; আর তার সাথে কথা ও আচরণ কোনো কিছুর দ্বারাই কোনরূপ বিরোধিতা না করে , আল্লাহর অধিকার হল ,তাকে (কিয়ামতের দিন) সেই অত্যাচারী শাসকের সাথে তার প্রবেশের স্থানে প্রবেশ করাবেন ।

জেনে রেখ যে , এই অত্যাচারীরা শয়তানের আনুগত্য করেছে এবং রহমানের (আল্লাহর) আনুগত্যকে পরিত্যাগ করেছে। ফাসাদের বিস্তার ঘটিয়েছে এবং শরয়ী বিধানের প্রয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে (চোর ও মদ্যপায়ীদের উপর আল্লাহর বিধান কার্যকর করে না) । মুসলমানদের প্রাপ্য সম্পদ এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ,যেগুলি মুসলমানদের প্রয়োজনে ব্যয় হওয়া উচিত ছিল , সেগুলিকে নিজেদের করে নিয়েছে। আল্লাহর কৃত হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম করেছে। এই অবস্থায় , আমি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি যার রুখে দাঁড়ানো উচিত এমন কেউ যে , অবশ্যই আমি রুখে দাঁড়াব ।

অর্থাৎ দ্বিতীয় আর কেউ নেই , না হযরত আমীরুল মু মিনীন (আ.) , না ফাতিমা যাহরা (আ.) আর না ইমাম হাসান (আ.) । আহলে বাইতের (আ.) বিদ্যমান একক ব্যক্তিত্ব তিনি হুসাইন ইবনে আলী (আ.) । যদি তিনি রুখে না দাঁড়ান তবে তৎকালীন প্রশাসনের সমস্ত কাজকে তিনি অনুমোদন করলেন। এই দৃষ্টিকোণ হতে তিনি বলেন : আমি সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি যার রুখে দাঁড়ানো উচিত । অতঃপর তিনি বলেন : তোমাদের পত্রগুলি আমার নিকট পৌঁছেছে। তোমরা আমার নিকট এমন লোকদেরকে পাঠিয়েছিলে যারা বলেছে : আমাদের নিকট আসুন ! তোমাদের বাইআত করার সংবাদ দিয়েছে। তোমরা লিখেছো যে , আমাকে তোমরা সাহায্য করবে । এখন যদি তোমরা তোমাদের বাইআতকে পরিপূর্ণ কর তবে তোমরা সুপথ পেয়েছো । আমি হুসাইন , আলী ও আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার সন্তান ।

সুতরাং তিনি অত্যাচারী শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের জন্যে আহ্বান জানান এবং যেই ব্যক্তি এরূপ শাসকের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে না ও নীরব থাকবে , মহান আল্লাহ্ তাকে সেই অত্যাচারী শাসকের সাথে কিয়ামত দিবসে কবর হতে উঠাবেন। আর যেমন আমরা দেখছি , এই বক্তব্য এবং তার পূর্ব ও পরের বক্তব্যগুলির মাঝে , কখনই বিজয় সম্পর্কে কোনো কথা আসে নি।

বক্তব্যের শেষেও তিনি হুর ও তার সৈন্যবাহিনীকে বলেন : তোমরা যদি আমাকে সাহায্য করতে না চাও তবে আমাকে মদীনায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দাও ! হুর তা গ্রহণ করল না , তবে এই মর্মে সিদ্ধান্ত হল যে , এমন এক দিক দিয়ে যাবেন যে , কুফাতেও পৌঁছবেন না এবং মদীনাতেও যাবেন না। এইভাবে পথ পাড়ি দিয়ে তিনি কারবালা ভূমিতে উপস্থিত হন। সেখানেই ইবনে যিয়াদের পক্ষ হতে একখানা পত্র হুরের নিকট পৌঁছে । তাতে এই নির্দেশ ছিল যে , যেখানে আছ হুসাইনকে সেখানেই আটকে রাখ ! আর এই রূপই করা হয়।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন : এই ভূমির নাম কি ? লোকেরা উত্তর দিল : কারবালা । তিনি বললেন : আমাদের বোঝাগুলি নামাও , এইটি সেই স্থান , যার সম্পর্কে আমার নানাজান আমাকে সংবাদ দিয়েছেন !

উমর ইবনে সা দ সৈন্যবাহিনীসহ সেখানে আসার পর , পুনরায় হযরত হুসাইন (আ.) তার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন এবং বলেন : তোমরা আমার নিকট পত্র লিখেছো এবং তোমাদের নিকট আসার জন্যে ইচ্ছা ব্যক্ত করেছো। যদি এখন আমাকে না চাও তবে আমাকে ছেড়ে দাও , আমি যেইখান থেকে এসেছি সেইখানে ফিরে যাব অথবা ইসলামী ভূখণ্ডের কোন এক সীমান্তে গিয়ে কাফিরদের সাথে লড়াই করব । তারা বলে : আপনাকে অবশ্যই আমীরুল মু মিনীন ইয়াযীদের নিকট বাইআত করতে হবে এবং ইবনে যিয়াদের আদেশের আনুগত্য করতে হবে ! তিনি তাদের প্রতি উত্তরে বলেন : লা ওয়াল্লাহি ! লা উ ’ ত্বীহিম্ বিইয়াদী ই ’ ত্বাআয্ যালীলি ওয়া লা আফিররু মিনহুম ফিরারাল ’ আবীদি । না , আল্লাহর কসম ! হীন লোকদের হস্ত অর্পণ করার মত আমি তাদের হাতে আমার হাত অর্পণ করব না এবং বলদর্পীদের বিরুদ্ধে (যুদ্ধ করতে গিয়ে) যুদ্ধক্ষেত্র হতে ক্রীতদাসদের মত আমি পলায়ন করব না ।

আশুরার রাতেও , তিনি তাঁর সঙ্গী সাথিদেরকে বলেন : তোমাদের মাঝ হতে যারা যেতে চাও , চলে যাও ! যাতে এমনটি না হয় যে , তাদের মাঝে কেউ লজ্জার কারণে অথবা অজ্ঞাত অবস্থায় থাকে। আশুরার রাতেও তিনি তাঁর তাঁবুর চারপাশে পরিখা খনন করেন এবং তার মাঝে আগুন জ্বালান , যাতে শত্রুবাহিনী হঠাৎ করে তাঁদের উপর হামলা করতে না পারে এবং ইমাম (আ.) কে কথা বলা ও তাদের অজুহাত পেশের সকল পথ বন্ধ করা থেকে বিরত রাখতে না পারে ।

সেই আশুরার রাতে , উমর ইবনে সা দের কয়েকজন সৈন্য তাদের দল থেকে পৃথক হয়ে যান এবং হযরত সায়্যিদুশ্ শুহাদার (আ.) শিবিরে যোগ দেন।৮৪