ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা0%

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ইমাম হোসাইন (আ.)

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

লেখক: আল্লামা সাইয়েদ মুরতাজা আসকারী
প্রকাশক: -
বিভাগ:

ভিজিট: 10730
ডাউনলোড: 1189

পাঠকের মতামত:

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 16 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 10730 / ডাউনলোড: 1189
সাইজ সাইজ সাইজ
ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

ধর্মের পুনর্জাগরণে ইমামগণের ভূমিকা

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

আশুরা দিবস

বর্ণনাকারী বলেন : উমর ইবনে সা দ মুহাররমের দশ তারিখ , জুমু আর দিনের ফজরের নামায আদায় করে ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে তার সৈন্যদেরকে প্রস্তুত করে। ইমামও বত্রিশজন অশ্বারোহী এবং চল্লিশজন পদাতিক সৈন্যের প্রত্যেকের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করেন , তাঁদের স্থান নির্ধারণ করেন এবং তাঁদের সাথে ফজরের নামায আদায় করেন। অতঃপর তিনি যুহাইর ইবনে কাইনকে ডান পার্শ্বের সেনাদলের সেনাপতির দায়িত্ব দেন এবং হাবীব ইবনে মাযাহিরকে বাম পার্শ্বের সৈন্যদলের পরিচালনার দায়িত্ব দেন আর পতাকাটি দেন তাঁর ভাই আব্বাসের হাতে। ইমামের পরিবারের তাঁবুগুলিকে সিপাহীদের পিছনে রাখেন এবং সেই রাত্রে খনন করা পরিখায় যুদ্ধের সময় আগুন জ্বালানোর জন্যে সৈন্য মোতায়েন করেন যাতে তাঁবুগুলি পিছন হতে শত্রুর আক্রমণ থেকে নিরাপদ থাকে।

উমর ইবনে সা দ তার ডান পার্শ্বের সৈন্যদলের সেনাপতির দায়িত্ব তার সিপাহী আমর ইবনে হাজ্জাজ যুবাইদীকে , বাম পার্শ্বের সেনাপতির দায়িত্ব শিমর ইবনে যিল জাওশানকে , অশ্বারোহী সৈন্যের সেনাপতির দায়িত্ব উযরা (আযরা) ইবনে ক্বায়েস আহমাসীকে এবং পদাতিক সৈন্যের সেনাপতির দায়িত্ব শাবাছ ইবনে রাবয়ী ইয়ারবুয়ীকে অর্পণ করে এবং পতাকাটিও তার দাস যূ ইয়াদ ’ এর হাতে দেয় ।

শাহাদতের সৌভাগ্য অর্জনে ইমাম হুসাইনের (আ.) সহযোগিদের আনন্দ

আব্দুর রহমান ইবনে আব্দে রাব্বাহ্ আনসারী ’ র একজন গোলামের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেন :

“ আমি আমার মালিক আব্দুর রহমান এর সঙ্গে ছিলাম। যখন ইবনে যিয়াদের সৈন্যবাহিনী ইমামের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্যে প্রস্তুত হল , তখন তিনি (ইমাম)পৃথক একটি তাঁবু খাটানোর আদেশ দিলেন। অতঃপর তিনি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্যে একটি লগন বা বড় আকারের পানি ভর্তি পাত্র তাঁবুর মাঝে রাখতে বললেন এবং তাতে পর্যাপ্ত পরিমাণ সুগন্ধি মিশ্রিত করা হল। প্রথম তিনি নিজে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হওয়ার জন্যে তাঁবুর মাঝে গমন করেন। আমার মালিক এবং বুরাইর একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলেন এজন্য যে , কখন ইমাম বেরিয়ে আসবেন আর তাঁরা তাঁবুতে প্রবেশ করবেন।

এই ফাঁকে বুরাইর , আব্দুর রাহমানের সাথে হাসি ঠাট্টা ও রসিকতা শুরু করেন। আব্দুর রহমান সম্ভবতঃ বুরাইরের হাসি ঠাট্টায় ধৈর্যচ্যুত হয়ে গিয়েছিলেন , তাই তিনি তাঁর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলেন : বিরত হও ! এখন কি হাসি ঠাট্টার সময় ! বুরাইর উত্তর দিলেন : আল্লাহ্ জানেন এবং আমার সমস্ত আত্মীয় স্বজনও সাক্ষী যে , আমি আমার যৌবন কালে এবং বৃদ্ধ বয়সেও হাসি ঠাট্টা ও রসিকতা করতাম না। কিন্তু আল্লাহর কসম আমরা এখন যে অবস্থায় আছি এবং ভবিষ্যতের যে সুসংবাদ পেয়েছি তাই আমাকে এরূপ করেছে। কারণ এখন আমাদের এবং আমাদের জন্যে অপেক্ষমান বেহেশ্তি হুরদের মাঝে শুধু এতটুকুই দূরত্ব যে , এই সব লোক ধারাল তরবারি দিয়ে আমাদের উপর আক্রমণ করবে ; আর এটিই আমার আনন্দের কারণ। আমি অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান যেন তারা তাদের এই কাজটি যত দ্রুত সম্ভব বাস্তবায়িত করে। ’

অতঃপর আব্দুর রাহমানের গোলাম বলেন : ইমাম যখন তাঁবু থেকে বেরিয়ে আসেন তখন আমরা ক্রমান্বয়ে প্রবেশ করি ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হই। কালবিলম্ব না করেই ইমাম ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করেন এবং একখানা কুরআন সম্মুখে রাখেন। তাঁর বন্ধুগণ , তাঁর পাশে পাশে তাঁর জন্যে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেন , আর সাহসিকতা ও বীরত্বের সাথে লড়াই করে শহীদ হন। আমি যখন দেখলাম যে , সেই সব যোদ্ধা ও সাহসী পুরুষরা শহীদ হয়ে স্বীয় রক্তে গড়াগড়ি খাচ্ছেন তখন আমি ভয়ে পলায়ন করি !

রাসূলের (সা.) পরিবারের সর্বপ্রথম শহীদ

খাওয়ারেযমী তার মাকতাল গ্রন্থে লিখেছেন : যখন হুসাইনের (আ.) জন্যে তাঁর পরিবার ব্যতীত কোনো সঙ্গী সাথি এবং কোনো সাহায্যকারী অবশিষ্ট ছিলেন না , তখন তাঁরা সবাই একত্রিত হলেন এবং পরস্পরকে বিদায় জানিয়ে যুদ্ধের ময়দানে রওনা হলেন । ৮৫

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন : সেই মর্মান্তিক ঘটনায় আবু তালিবের বংশধরের মধ্যে সর্ব প্রথম শহীদ হয়েছিলেন ইমাম হুসাইনের (আ.) পুত্র আলী আকবর। তাঁর মাতার নাম লাইলা (আবু মুররা ইবনে উরওয়া ইবনে মাসঊদ ছাক্বাফীর কন্যা)৮৬ এবং তাঁর নানীর নাম ছিল মাইমূনা (আবু সুফিয়ান ইবনে হারবের কন্যা) ।৮৭ বনী উমাইয়্যা বংশের সাথে এই আত্মীয়তার সম্পর্কের কারণে তারা আলী আকবরের উদ্দেশ্যে নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়ে এই মর্মে পত্র লিখে প্রেরণ করে যে , তিনি যেন তাঁর পিতাকে সাহায্য করা হতে বিরত থেকে শাসকগোষ্ঠীর আশ্রয় নেন এবং নিহত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করেন !

হুসাইনের (আ.) পুত্রের উদ্দেশ্যে উবাইদুল্লাহ্ ইবনে যিয়াদের প্রেরিত নিরাপত্তামূলক পত্রের বিষয়ে মুস্আব যুবাইরী ’ লিখেন যে , তারা আলী আকবরকে বলেছিল:

‘ আমীরুল মু মিনীন ইয়াযীদ ইবনে মুয়াবিয়ার সাথে তোমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা রয়েছে এবং আমরা এই সম্পর্ককে রক্ষা করতে চাই। সুতরাং তুমি যদি আগ্রহী হও তবে আমাদের নিরাপত্তায় থাকবে ।

আলী তাদের উত্তরে বলেন : আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখাই অধিকতর ভাল । ৮৮

খাওয়ারেযমী তার মাকতালে বলেন : হুসাইন (আ.) স্বীয় পুত্র আলীকে যুদ্ধ ক্ষেত্রে প্রেরণকালে নিজের দাড়ি মোবারককে হাত দ্বারা ধরেন এবং আকাশের দিকে মুখ করে বলেন :

“ হে আল্লাহ! তুমি এই লোকদের প্রতি সাক্ষী থাক ! চেহারা , আচার ব্যবহার ও কথা বার্তার দিক থেকে তোমার রাসূল মুহাম্মদের (সা.) সবচেয়ে সদৃশ এক যুবককে এই সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্যে যুদ্ধক্ষেত্রে প্রেরণ করছি। এ সেই যুবক যার বৈশিষ্ট্য হল , যখনই আমাদের কারো তোমার রাসূলকে দেখার আকাঙ্খা জাগত তখনই তাঁর চেহারার দিকে তাকাতাম !

হে আল্লাহ ! জমিনের বরকতকে তুমি তাদের উপর থেকে তুলে নাও ! তাদের সমাজকে ছত্রভঙ্গ করে দাও এবং তাদেরকে কঠিন দুরাবস্থার মধ্যে নিক্ষেপ কর ! তাদের চিন্তা ভাবনার মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে দাও এবং তাদেরকে তাদের শাসকদের নিকট রাগ ও ঘৃণার পাত্র বানাও যাতে তারা কখনই তাদের প্রতি সন্তুষ্ট না হয় ! আফসোস ! তারা আমাদের সাহায্যের জন্যে এগিয়ে আসবে বলে আমাদেরকে তাদের নিকট আহ্বান করেছে কিন্তু তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে আমাদের জীবনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং আমাদেরকে হত্যা করতে প্রস্তুত হয়েছে !

অতঃপর ইমাম হুসাইন (আ.) উমর ইবনে সা দকে সম্বোধন করে চিৎকার দিয়ে বলেন :

“ আমাদের জীবন নিয়ে কি করতে চাও ? মহান আল্লাহ্ তোমার বংশকে যেন সমূলে উৎপাটন করেন ! তোমার আশা আকঙ্খাকে যেন পূর্ণ না করেন ! তিনি তাঁর বরকতকে যেন তোমার উপর হতে ছিনিয়ে নেন ! তিনি এমন কাউকে তোমার উপর বিজয়ী করেন যে , সেই ব্যক্তি তোমার বিছানায় তোমার দেহ হতে মাথাকে বিচ্ছিন্ন করে ! কারণ তুমি আমার বন্ধনকে ছিন্ন করেছো এবং আল্লাহর রাসূলের (সা.) সাথে আমার নিকটাত্মীয়ের সম্পর্ককে ভ্রুক্ষেপ কর নি ।

অতঃপর তিনি উচ্চৈঃস্বরে সূরা আল ইমরানের এই আয়াতটি পাঠ করেন : ইন্নাল্লাহাস্তাফা আদামা ওয়া নূহাও ওয়া আলা ইব্রাহীমা ওয়া আলা ইমরানা ’ আলাল্ ’ আলামীন। যুররিয়্যাতান বা ’ যুহা মিন্ বা ’ য , ওয়াল্লাহু সামী ’ উন্ ’ আলীম । ৮৯ অপরদিক থেকে উমর ইবনে সা দের সৈন্যবাহিনীর উপর আলী আকবর আক্রমণ করেন এবং তিনি বলছিলেন :

“ আনা আলিয়্যুব্নুল হুসাইনুবনু আলী নাহনু ওয়া বাইতুল্লাহি আউলা বিন্নাবী

ওয়াল্লাহি লা ইয়াহ্কুমু ফীনা ইবনুদ্দায়ী আত্ব ’ আনুকুম বিররাহমি হাত্তা ইউনছানী

আযরিবুকুম বিসসাইফি হাত্তা ইয়াল্তাবী যারবু গুলামি হাশিমিয়্যি ’ আলাবী ।

অর্থাৎ আমি , আলীর পুত্র হুসাইনের সন্তান। কা বার খোদার শপথ , আমরা রাসূল (সা.) এর নিকটতম আত্মীয়। আল্লাহর শপথ , আমাদের উপর ব্যভিচারীর সন্তানের শাসন করার কোনই অধিকার নেই। আর এই কারণেই নিজেদের বর্শা দ্বারা তোমাদের উপর এমন আঘাত হানব যে , সেইগুলি বাঁকা হয়ে যাবে। এমনভাবে তরবারি দ্বারা তোমাদেরকে আঘাত করব যাতে তোমরা আলাভী (আলী বংশীয়) হাশিমী ষাটজন যুবকের আঘাতের সমান আঘাত উপলব্ধি কর ।

তিনি বিরতিহীনভাবে যুদ্ধ করতে করতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন। শেষ পর্যন্ত কুফাবাসীদের ফরিয়াদ ও চরম অসহায়ত্বের আর্তনাদ বাতাসে ভেসে উঠল এবং তারা কোনো আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছিল না।

অবশেষে হুসাইনের (আ.) এই নির্ভীক ও সাহসী যুবক , যিনি যুদ্ধের ময়দানে শত্রুর বিপক্ষে প্রাণপণ চেষ্টা করছিলেন ও নিজের জীবন প্রদীপকে নিভে যেতে দেখ ছিলেন শত্রুর তীর ও তরবারির আঘাতে ক্ষতবিক্ষত ও রক্তাক্ত শরীরে এবং পিপাসায় ক্লান্ত ও অসহায় অবস্থায় তাঁবুতে পিতার নিকট ফিরে আসলেন। তারপর বললেন : হে পিতা ! পিপাসা আমাকে কাবু করে ফেলেছে এবং এই সমস্ত রণসম্ভারের ভার আমার শক্তি সামর্থ্যকে ছিনিয়ে নিয়েছে। এ অবস্থায় , পানি কি পাওয়া যাবে যার মাধ্যমে পিপাসার জ্বালা নিবারণ করব এবং শত্রুদের বিপক্ষে লড়াই করার জন্যে নতুন শক্তি ফিরে পাব ?

ইমাম হুসাইন (আ.) সন্তানের এই কথায় কেঁদে বললেন : হে বৎস ! তুমি যা চাচ্ছ তা মুহাম্মদ (সা.) , আলী (আ.) ও তোমার পিতার জন্য অনেক কঠিন এবং অপ্রীতিকর কিন্তু তারপরও তোমার চাওয়া পূরণ করতে আমরা অপারগ ; তুমি তোমার বিপদে সাহায্য করার জন্যে আমাদেরকে আহ্বান করছ কিন্তু আমরা যে , তোমার আহ্বানে সাড়া দিতে পারছি না ! অতঃপর তিনি নিজের একটি আংটি তাঁর (আলী আকবর) হাতে দিয়ে বললেন :

“ এই আংটিটি নিয়ে মুখে রাখ এবং শত্রুদের বিপক্ষে লড়াই করতে যুদ্ধের ময়দানে ফিরে যাও। আশা করি অনতিবিলম্বে তোমার নানার হাতের শরবত পান করে পরিতৃপ্তি লাভ করবে এবং এর পর থেকে আর পিপাসা অনুভব করবে না ।

আলী আকবর পুনরায় যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করলেন এবং বলছিলেন :

আল্ হারবু ক্বাদ বানাত্ লাহা হাক্বাইক্ব ওয়া যাহারাত মিম্ বা ’ দিহা মাসাদিক্ব

ওয়াল্লাহি রাব্বিল ’ আরশি লা নুফারিক্ব জুমূউকুম আও তাগমিদুল বাওয়ারিক্ব।

“ যুদ্ধ সত্যকে পরিষ্কার করে দিয়েছে এবং তারপর থেকে সত্যবাদিতা প্রকাশ পেয়েছে। আরশের অধিপতি আল্লাহর শপথ ! তরবারিগুলি খাপে প্রবেশ না করা পর্যন্ত তোমাদের উপর থেকে হাত গুটিয়ে নিব না এবং তোমাদের থেকে পৃথক হব না । ৯০

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন : অতঃপর তিনি শত্রুসৈন্যের উপর আক্রমণ করলেন এবং তাদের রক্ষণব্যুহকে দ্বিধা বিভক্ত করে দিলেন। প্রথম আক্রমণেই তিনি কুফাবাসীদের সারিগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে দিলেন এবং তাদের প্রতিরক্ষা শক্তিতে ফাটল সৃষ্টি করে তাদের উপর মৃত্যুধূলা ছিটাচ্ছিলেন তখন নু ’ মান আব্দী লাইছীর পৌত্র মুররা ইবনে মুনকিয তাঁর প্রতি দৃষ্টি নিবদ্ধ করে বলল : সমস্ত আরবের পাপগুলি আমার কাঁধে বর্তাক। যদি সে আমার সামনে পড়ে তবে সে যেমনভাবে অন্যদেরকে রক্তাক্ত করে ধুলায় লুটাচ্ছে তেমনভাবে আমিও তাঁর পিতাকে তাঁর শোকগাঁথা গাইতে বসাব । আলী পূর্বানুরূপ কুফার সৈন্যদের ছিন্নভিন্ন করে , সামনে অগ্রসর হয়ে মুররাকে অতিক্রম করলেন। সেও এটাকে সুবর্ণ সুযোগ মনে করে তাঁর উপর হামলা করল এবং বর্শার ফলক দ্বারা তাঁকে আঘাত হানল। এর ফলে আলী নিস্তেজ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর মোকাবেলা করার ক্ষমতা তাঁর হারিয়ে গেল। কুফাবাসীরা তাঁর চারিদিকে ঘিরে ধরল এবং তাদের তরবারি দ্বারা তাঁর ক্ষতবিক্ষত শরীরে পুনঃ পুনঃ আঘাত করতে লাগল ।

খাওয়ারেযমী তার মাকতাল গ্রন্থে লিখেছেন : যখন আলী আকবর যুদ্ধ করতে করতে সামনে অগ্রসর হচ্ছিলেন তখন মুররা ইবনে মুনক্বিয আব্দী তাঁর উপর হামলা করে এবং তরবারি দ্বারা এমনভাবে তাঁর ললাটের উপরিভাগে আঘাত করে যে তিনি নিস্তেজ হয়ে পড়েন এবং তাঁর যুদ্ধ করার শক্তি হারিয়ে যায়। কুফাবাসীরাও তাঁকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরে এবং চারপাশ থেকে তাঁর নিথর শরীরে তরবারির আঘাত করতে থাকে । শেষ পর্যন্ত তাঁর আর কোনো উপায় রইল না। ফলে তিনি তাঁর ঘোড়ার ঘাড়ের উপর তাঁর হাত দু খানিকে ঝুলিয়ে দিলেন। কিন্তু ঘোড়াটি তাঁকে শত্রুদের মধ্যে নিয়ে চলে গেলে আলীর শরীর তীক্ষ্ণ তরবারিগুলির আঘাতের ফলে টুকরো টুকরো হয়ে যায়। অতঃপর তাঁর প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত অবস্থা তখন তিনি তাঁর সমস্ত শক্তি দ্বারা চিৎকার দিয়ে বললেন :

“ হে পিতা! আমার নানা আল্লাহর রাসূল আমাকে একটি পরিপূর্ণ পিয়ালাতে করে সুপেয় শরবত পান করালেন , আমি আর কখনও পিপাসার্ত হব না। তিনি আপনাকে বলছেন , তাড়াতাড়ি তুমি এস , তোমার জন্যেও একটি পেয়ালা পূর্ণ করে রাখা আছে । ৯১

হামিদ ইবনে মুসলিমের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেছেন : আমি নিজ কানে শুনেছি , সেইদিন হুসাইন (আ.) বলছিলেন , হে বৎস ! তোমাকে যারা হত্যা করল আল্লাহ্ তাদের হত্যা করুন ! বিষ্ময়কর এই যে , এই লোকেরা মহান আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের সম্মানকে ভূলুণ্ঠিত করতে এতদূর পর্যন্ত দুঃসাহস করেছে ! ? হে বৎস ! তোমার মৃত্যুর পর পৃথিবী ও পৃথিবীর জীবন অর্থহীন ।

হামিদ বলেন : মনে হচ্ছে এখনও দেখছি যে ,উজ্জ্বল সূর্যের ন্যায় এক সম্ভ্রান্ত নারী অতি দ্রুত গতিতে তাঁবু থেকে বাইরে দৌড়ে আসলেন এবং আলীর শোকে তিনি ফরিয়াদ করছিলেন ! জিজ্ঞাসা করলাম : এই নারী কে ? তারা বলল : যয়নব , আল্লাহর রাসূলের কন্যা ফাতিমার কন্যা !

যয়নব পূর্বানুরূপ অন্যান্য নারী ও বিলাপকারীদের সম্মুখে আসলেন এবং নিহত আলীর উপর লুটিয়ে পড়লেন। ইমাম হুসাইন এগিয়ে এলেন এবং যয়নবের নিকটে পৌঁছিলেন। তিনি তাঁর হাত ধরে তাঁকে নিহত আলীর উপর থেকে তুলে দাঁড় করালেন এবং তাঁবুতে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন। পুনরায় তিনি আলীর মৃতদেহের নিকট ফিরে এলেন। যুবকেরা তাঁর চারিদিকে ঘিরে ছিলেন। ইমাম তাদেরকে বললেন : তোমাদের নিহত ভাইকে তুলে নিয়ে যাও ! যুবকেরা এগিয়ে এসে আলীর মৃতদেহটিকে হাতে তুলে নিলেন। তিনি যে তাঁবুর সম্মুখে শত্রুদের বিপক্ষে লড়ছিলেন , সেই তাঁবুর নিকট মাটিতে তাঁকে রাখলেন ।

আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুসলিম ইবনে আকীলের শাহাদত

যখন আলী আকবর শাহাদত বরণ করলেন তখন মুসলিমের পুত্র এবং আকীল ইবনে আবী তালিবের পৌত্র আব্দুল্লাহ্৯২ যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করলেন। আমীরুল মু মিনীন আলী (আ.) এর কন্যা হযরত রুকাইয়া কোবরা তাঁর মাতা ছিলেন।৯৩ তিনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সময় নিুোক্ত পংক্তি দু টি আবৃত্তি করছিলেন :

আল্ ইয়াউমা উলাক্বী মুসলিমান্ ওয়া হুয়া আবী ওয়া ফিৎইয়াতান্ বাদূ ’ আলা দ্বীনিন্নাবী

অর্থাৎ আজ আমার পিতা মুসলিম এবং যেসব যুবক রাসূলের দ্বীনের উপর নিহত হয়েছেন তাঁদের সাথে সাক্ষাৎ করব।৯৪

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন : আব্দুল্লাহকে লক্ষ্য করে আমর ইবনে সাবীহ একটি তীর নিক্ষেপ করল। আব্দুল্লাহ্ নিজের মাথাকে তীরের আঘাত থেকে রক্ষা করার জন্যে নিজের হাতকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করলেন। ফলে আমরের তীরটি তাঁর হাত ও মাথাকে একইসাথে বিদ্ধ করল। এইরূপে যে , তীরটি তাঁর হাতের তালু অতিত্রুম করে গিয়ে তাঁর মাথায় বিদ্ধ হল। আব্দুল্লাহ্ বহু চেষ্টা করেও তাঁর হাতকে মুক্ত করতে পারলেন না এবং এই অবস্থায় আকষ্মিকভাবে অপর একটি তীর এসে তাঁর যকৃত ভেদ করল এবং তিনি শাহাদত বরণ করলেন ।

যখন আব্দুল্লাহ্ ইবনে মুসলিম শাহাদত বরণ করলেন তখন ইয়াযীদের সৈন্যরা ইমামের সঙ্গীদেরকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরল এবং তাঁদের উপর আত্রুমণ করল।

জা ফর ইবনে আকীলের শাহাদত

খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুব লিখেছেন : অতঃপর জা ফর ইবনে আকীল আক্রমণের জন্যে সামনে অগ্রসর হলেন এবং এই অবস্থায় তিনি নিচের কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন :

আনাল্ গুলামুল্ আব্তাহিউত্তালিবী মিন্ মা শারিন্ ফী হাশিমিন্ মিন্ গালিবি

ওয়া নাহনু হাক্কান সাদাতুয্ যাওয়ায়িবি হাযা হুসাইনুন্ আত্বইয়াবুল্ আত্বায়িবি।৯৫

অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন।

খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুব , জা ফরের হত্যাকারীকে বিশর ইবনে সাউত আল্ হামাদানী ’ বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য যে , তাবারী লিখেছেন : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উযরা খাছ্আমী যে তীরটি জা ফর ইবনে আকীলের উদ্দেশ্যে নিক্ষেপ করেছিল সেই তীরের আঘাতে তিনি শাহাদত বরণ করেছেন। ’

আব্দুর রাহমান ইবনে আকীলের শাহাদত

জা ফর ইবনে আকীল নিহত হওয়ার পর , তাঁর ভাই আব্দুর রাহমান ইবনে আকীল এই বীরত্বগাঁথাগুলো আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে অগ্রসর হলেনঃ

আবী আক্বীলুন ফা রিফূ মাকানী মিন্ হাশিমিন্ ওয়া হাশিমুন্ ইখ্ওয়ানী

কাহূলু সিদ্ক্বিন সাদাতুল্ আক্বরানি হাযা হুসাইনুন্ শামিখুল্ বুনয়ানি

ওয়া সায়্যিদুশ্ শাবাবি ফিল্ জানানি ।

অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে উছমান ইবনে খালিদ জাহানীর হাতে শাহাদত বরণ করেন।

তাবারী লিখেছেন: উছমান ইবনে খালিদ জাহানী ও বিশর ইবনে সাউত হামাদানী একই সাথে আব্দুর রাহমান ইবনে আকীলের উপর আক্রমণ করে তাঁকে হত্যা করে।

মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা ফরের শাহাদত

খাওয়ারেযমী ও ইবনে শাহরে আশুব লিখছেন : আব্দুর রাহমান ইবনে আকীল নিহত হওয়ার পর আবু তালিবের নাতি মুহাম্মদ ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা ফর ’ নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেনঃ

আশকূ ইলাল্লাহি মিনাল উদ্ওয়ানি ফা অ্যালু ক্বাউমিন্ ফিররাদিয়্যি আময়ানি

ক্বাদ বাদ্দালূ মা আলিমাল কুরআনি ওয়া মাহ্কামাত্ তান্যিলি ওয়াত্তিব্য়ানি

ওয়া আয্হারুল্ কুফরা মা আত্ তুগইয়ানি।

অতঃপর তিনি কুফার অধিবাসীদের বিপক্ষে প্রাণপণ যুদ্ধ করতে করতে আমিল ইবনে নাহ্হাশ তামীমীর ’ হাতে শাহাদত বরণ করেন।

আওন ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা ফরের শাহাদত

যখন মুহাম্মদ শাহাদত বরণ করলেন তখন তাঁর ভাই আওন ইবনে আব্দিল্লাহ্ ইবনে জা ফর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে ইবনে যিয়াদের সৈন্যদের উপর আক্রমণ করেন :

ইন্ তানকিরূনী ফা আনা ইবনু জা ফার শাহীদু সিদ্ক্বিন ফিল্ জিনানি আয্হার

ইয়াত্বীরু ফীহা বিজানাহিন্ আখ্যার কাফা বিহাযা শারাফান্ ফী মাহ্শার।

অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে আব্দুল্লাহ্ ইবনে কুতাইবা তায়ী ’ র হাতে শাহাদত বরণ করেন।৯৬

আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসানের শাহাদত

অতঃপর আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান নিম্নোক্ত বীরত্বগাঁথাটি আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে পদার্পণ করেন :

ইন্ তানকিরূনী ফা আনা ফার উল্ হাসান সিবতুন্নাবিয়্যিল মুস্তাফাল্ মু তামিন

হাযা হুসাইনুন্ কাল্আসীরিল্ মুরতাহান বাইনা উনাসিন্ লা সাকূ সাওবাল্ মুয্ন।

অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে হানী ইবনে শাবীব খাযরামী ’ র হাতে আঘাত প্রাপ্ত হন এবং শাহাদত বরণ করেন।৯৭

কাসিম ইবনে হাসানের শাহাদত

তাঁর মৃত্যুর পর , তাঁর নাবালক ভাই কাসিম ’ ময়দানে যাবার জন্যে প্রস্তুত হলেন।

যখন তাঁর উপর ইমামের দৃষ্টি পড়ল তখন তিনি তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। চাচা ও ভাতিজা উভয়েই প্রচণ্ড কান্নাকাটি করলেন। কাসিম যখন যুদ্ধে যাবার জন্যে আবেদন করলেন তখন ইমাম তাঁকে অনুমতি দিলেন না। কিন্তু কাসিমও নাছোড় বান্দা হয়ে তাঁর চাচা হুসাইনের (আ.) হাত পা ধরে অনুনয় বিনয় করে যুদ্ধে যাবার জন্যে অনুমতি কামনা করতে থাকলে , ইমাম নিরুপায় হয়েই তাঁকে যুদ্ধে যাবার অনুমতি দিলেন।

কাসিমের গণ্ডদেশ বেয়ে অশ্রু ঝরতে থাকা অবস্থায় তিনি যুদ্ধের ময়দানের দিকে রওনা হল ।৯৮ কুফার সৈন্যদের সাথে যুদ্ধের সময় তাঁর শরীরে কেবলমাত্র এক জোড়া জামা পায়জামা ও পায়ে এক জোড়া চটি জুতা ছিল। তাঁর মুখমণ্ডলের সৌন্দর্য যেন পূর্ণিমার চাঁদের অংশ বিশেষ ছিল। তিনি সামনে অগ্রসর হতে হতে বলছিলেন :

ইন্নী আনাল্ ক্বাসিমু মিন্ নাসলি আলী নাহলু ওয়া বাইতুল্লাহি আউলা বিন্নাবী

মিন্ শিমরা যিল্ জাওশান্ আউ ইবনিদ্দা য়ী৯৯

হামিদ ইবনে মুসলিমের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেছেন : ইমামের সৈন্যদল থেকে পূর্ণিমার চাঁদরূপ এক যুবক আমাদের বিপক্ষে যুদ্ধের ময়দানে অবতীর্ণ হলেন , তখন তাঁর শরীরে শুধুমাত্র এক জোড়া জামা পায়জামা , পায়ে এক জোড়া চটি জুতা এবং হাতে একখানা তরবারি ছিল। আমি কখনও ভুলব না যে , তাঁর বাম পায়ের জুতার ফিতা ছিঁড়ে গিয়েছিল। তিনি উদ্দীপনার সাথে যুদ্ধের ময়দানে পদার্পণ করে সামনে এগিয়ে আসছিলেন , আর আমর ইবনে সা দ নুফাইল আযদী আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল , বলল :

“ আল্লাহর শপথ ! আমি তাঁর উপর আক্রমণ করব এবং তাঁর মৃত্যুঘন্টা বাজাব ! আমি তাকে বললাম : সুবহানাল্লাহ্ ! তুমি তাঁর প্রাণ থেকে কি চাও ? যে সব লোকজন তাঁর চারিদিকে রয়েছে তারাই তাঁকে হত্যার জন্যে যথেষ্ট হবে ! আমর বলল : আল্লাহর শপথ ! আমি নিজেই তাঁর মৃত্যু ঘন্টা বাজাব ! এই কথা বলে সে , তাঁর দিকে ধাবিত হল এবং সে নিজ তরবারির আঘাতে সেই যুবকের মাথাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিল এবং তিনি মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে গেলেন ।

আমরের আঘাতে সেই যুবকটি মুষড়ে পড়লেন এবং উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে সাহায্যের জন্যে তাঁর চাচাকে আহ্বান করলেন। আমি নিজে দেখলাম যে , হুসাইন (আ.) দক্ষ শিকারী বাজ পাখির মত ছুটে আসলেন এবং রাগান্বিত সিংহের মত আমরের উপর আক্রমণ করলেন ও তার উপর তরবারির আঘাত হানলেন। ইমামের তরবারিখানা আমরের ঢালস্বরূপ ব্যবহারকৃত হাতের কব্জি পর্যন্ত নামিয়ে দিল। আমর এই আঘাতের ফলে এমনভাবে চিৎকার দিয়ে উঠল যে , উমর ইবনে সা দের সমস্ত সৈন্যবাহিনী তা শুনতে পেল।১০০

কুফার সৈন্যবাহিনী আমরের সাহায্যের জন্যে ইমামের অভিমুখে অগ্রসর হল এবং ইমামও নিরুপায় হয়ে তার থেকে সরে দাঁড়ালেন। কিন্তু আমর তার সহযোদ্ধা সৈন্যদের অশ্বসমূহের পায়ের নিচে পতিত হল ,যদিও তারা তার সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এসেছিল কিন্তু অতিদ্রুত ও তীব্রগতিতে সামনে অগ্রসর হওয়ার কারণে তাদের ঘোড়াগুলো আমরকে পায়ের নিচে দলিত মথিত করে এবং তার বুকের ও মাথার হাড়গুলোকে চূর্ণ বিচূর্ণ করে ফেলে ও তার প্রাণহীন দেহ মাটিতে পড়ে থাকে ।

কিছু সময় অতিবাহিত না হতেই ময়দানের ধুম্রতা কেটে গেলে আমি হুসাইনকে (আ.) দেখলাম : তিনি , প্রাণ ওষ্ঠাগত ও মাটির সাথে পিষ্ট তরুণটির মাথার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এবং বলছেন : তোমাকে যারা হত্যা করেছে এবং কিয়ামত দিবসে নিজেদেরকে তোমার নানার কৈফিয়ত তলবের পাত্রে পরিণত করেছে , তারা সব ধ্বংস হোক ! অতঃপর তিনি বললেন : আল্লাহর শপথ ! তোমার চাচার জন্যে অত্যন্ত কঠিন ও দুঃখজনক বিষয় যে , তুমি তাঁকে সাহায্যের জন্যে আহ্বান করেছিলে আর তিনি তোমাকে সাহায্য করতে পরেননি , অথবা তিনি তোমার সাহায্যের জন্যে এগিয়ে এসেছেন কিন্তু তা তোমার কোনো উপকারে আসে নি ! অতঃপর তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রের মৃতদেহটি উঠালেন। মনে হচ্ছে এখনও আমি দেখতে পাচ্ছি যে , সেই প্রাণহীন তরুণটির পা দু টি মাটির উপর ছেঁচড়ে যাচ্ছে আর ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরে আছেন। আমি নিজে নিজেই বললাম , দেখি হুসাইন (আ.) সেই যুবকের মৃতদেহটি কি করেন ? দেখলাম যে , হুসাইন (আ.) সেই তরুণের মৃতদেহটিকে এনে তাঁর পরিবারের অন্যান্য শহীদগণের মাঝে এবং তাঁর সন্তান আলী আকবরের পাশে শুইয়ে দিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম , এই তরুণটির নাম কি ? লোকেরা বলল : তাঁর নাম কাসিম , তিনি হাসান ইবনে আলী ইবনে আবী তালিবের সন্তান ।

আবু বকর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত

অতঃপর ভাইয়ের জন্যে নিজেদেরকে উৎসর্গ করার অভিপ্রায় নিয়ে ইমামের (আ.) ভাইগণ যুদ্ধের ময়দানে যাবার জন্যে প্রস্তুতি নিলেন। তাঁদের প্রথমজন ছিলেন আবু বকর ইবনে আলী (আব্দুল্লাহ্) । তাঁর মাতা ছিলেন মাসউদ ইবনে খালিদের কন্যা লাইলা। আবু বকর ময়দানে যাবার সময় নিম্নোক্ত কবিতাটি পাঠ করছিলেনঃ

শাইখী আলীয়্যুন্ যুলফিখারিল্ আত্বওয়াল মিন্ হাশিমিস্ সিদ্ক্বিল্ কারীমিল্ মুফায্যাল

হাযাল্ হুসাইনু ইবনুন্নাবিয়্যিল্ মুরসাল নাযূদু আনহু বিল্ হুসামিল্ ফাইসাল

তাফ্দীহি নাফ্সী মিন্ আখিন্ মুবাজ্জাল ইয়া রাব্বি ফামানহী আছ্ছাউবাল্ মুজায্যাল।১০১

অতঃপর তিনি যুদ্ধ করতে করতে শেষ পর্যন্ত যাহার ইবনে ক্বায়িস নাখয়ী ’ র হাতে আঘাত প্রাপ্ত হন এবং শাহাদত বরণ করেন।

উমর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত

আবু বকর ইবনে আলীর শাহাদতের পরে তাঁর ভাই উমর নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে ময়দান অভিমুখে রওনা করলেনঃ

আযরিবুকুম্ ওয়া লা আরা ফীকুম যুহুর যাকা আশ্বাক্কিয়ু বিন্নাবিয়্যী ক্বাদ্ কাফার

ইয়া যুহর ! ইয়া যুহর ! তাদানু মিন্ উমার লা আল্লাকা আল্ ইয়াউমা তাবুউ বিসাক্বার

শাররু মাকানিন্ ফী হারীক্বিন্ ওয়া সার্ ফাইন্নাকা আল্ জাহিদু ইয়া শাররাল্ বাশার।

অতঃপর তিনি তাঁর ভাইয়ের হত্যাকারীকে আক্রমণ করলেন এবং তরবারি দ্বারা তার উপর এমন আঘাত হানলেন যে , সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তিনি তাঁর আক্রমণের সময় আবৃত্তি করছিলেনঃ

খাল্লু আদাতাল্লাহি খাল্লু আন্ উমর খাল্লু আনিল্লাইছিল্ আবূসিল্ মুকফাহার ;

ইয়াযরিবুকুম্ বিসাইফীহি ওয়ালা ইয়াফির ওয়া লাইসা ইয়াগদু কালজাবানিল্ মুনজাহার।

আর এইভাবে তিনি গর্জন ও যুদ্ধ করতে করতে শাহাদত বরণ করেন।

উছমান ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত

উমর ইবনে আলী নিহত হবার পর উছমান ইবনে আলী (হিযাম ইবনে খালিদের কন্যা উম্মুল বানীন ছিলেন তাঁর মাতা।) নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতে করতে যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেনঃ

ইন্নী আনা উছমানু যুল্ মাফাখির শাইখী আলীয়্যুন্ যুল্ ফা আলিত্তাহির

সেনভুন্নাবিয়্যী যুর রাশাদিস্ সাঈর মা বাইনা কুল্লি গায়িবিন্ ওয়া হাযির।

অতঃপর তিনি আক্রমণ করেন এবং লড়তে লড়তে শেষ পর্যন্ত শাহাদত বরণ করেন।

জা ফর ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত

অতঃপর তাঁর ভাই জা ফর ইবনে আলী (তিনিও উম্মুল বানীনের সন্তান) নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করতে করতে শত্রুদের উপর আক্রমণ করেনঃ

ইন্নী আনা জা ফারুন্ যুল্ মা আলী নাজলু আলিয়্যিন্ আলখাইরু যুন্নাওয়ালি ;

আহমী হুসাইনান্ বিল্ ক্বানাল্ আসসালি ওয়া বিল্ হুসামিল্ ওয়াযিহিস্ সিক্বালি।

তিনিও যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত শাহাদত বরণ করেন।

আব্দুল্লাহ্ ইবনে আলীর (আ.) শাহাদত

জা ফরের শাহাদতের পরে , তাঁর ভাই আব্দুল্লাহ্ (উম্মুল বানীনের অপর এক সন্তান) যুদ্ধের ময়দানে প্রবেশ করেন এবং তিনি শত্রু সম্প্রদায়ের উপর হামলা করেন। হামলাকালে তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ

আনা ইবনু যিন্নজদাতি ওয়াল্ আফ্যালি যাকা আলিয়্যুন আল্ খাইরু ফিল্ ফাঅ্যালি

সাইফু রাসূলিল্লাহি যুন্নিকালি ওয়া কাশিফুল্ খুতূবি ওয়াল্ আহ্ওয়ালি।

অতঃপর তিনি কুফার অধিবাসীদের উপর আক্রমণ করেন এবং শেষ পর্যন্ত লড়াই করে শাহাদতের মর্যাদা লাভ করেন।১০২

হামিদ ইবনে মুসলিমের বরাত দিয়ে তাবারী লিখেছেন : সেইদিন ইমাম হুসাইন (আ.) বলতে শুনেছিলাম :

“ আল্লাহুম্মা আমসিক ’ আনহুম ক্বাত্বরাস্ সামায়ি ওয়ামনা ’ হুম্ বারাকাতিল্ আরযি , আল্লাহুম্মা ফাইন্ মাত্তা ’ তাহুম্ ইলা হীনা , ফাফাররিক্বহুম্ ফারক্বান্ ওয়াজ্ আলহুম্ ত্বারাইক্বা ক্বিদাদান্ ওয়া লা তারযা ’ আনহুমুল্ উলাতু আবাদান্ ফাইন্নাহুম্ দা ’ আওনা লিইয়ানসুরূনা ফা আদাও ’ আলাইনা ফাক্বাতালূনা !

হামিদ বলেছেন: ইতোমধ্যে পদাতিক বাহিনী তাঁদের উপর আক্রমণ করে ও তরবারির আঘাত হানে অথচ তখন ইমামের মাত্র তিন চার জনের বেশী সাথি অবশিষ্ট ছিলেন না। এই অবস্থায় ইমাম (আ.) তাঁর ইয়েমেনের মজবুত ও সূক্ষ্মভাবে বুননকৃত গেঞ্জিটি আনতে আদেশ দেন। অতঃপর তিনি নিজ হাতে সেইটির কয়েকটি স্থানে ছিদ্র করেন যাতে তাঁর নিহত হওয়ার পর শত্রুরা ছিঁড়া হওয়ার কারণে তাঁর শরীর হতে সেইটি খুলে না নেয়।

তাঁর একজন সাথি তাঁকে পরামর্শ দিলেন : তার ভিতরে একটি খাটো পায়জামা পরা শ্রেয় হবে । ইমাম উত্তর দিলেন : এই ধরনের কোনো পায়জামা পরা আমার ব্যক্তিত্বের ক্ষেত্রে শোভা পায় না। ঐরূপ পোশাক হচ্ছে লাঞ্ছনা ও অবমাননার নিদর্শন !

কিন্তু ইমাম যখন শাহাদত বরণ করেন তখন বাহার ইবনে কা ব ’ তাঁর শরীর থেকে সেই জামাটিও খুলে ফেলে তাঁকে বিবস্ত্র করে দেয় !

মুহাম্মদ ইবনে আব্দুর রাহমানের থেকে বর্ণিত আমর ইবনে শাবীবের ’ বরাত দিয়ে আবু মুখনিফ লিখেছেন যে , শীতকালে বাহার ইবনে কা বের ’ হাতগুলি থেকে পানি ঝরত আর গ্রীষ্মকালে , দু টি শুষ্ক কাঠের মত হয়ে যেত।১০৩

আবুল ফযলের (আ.) শাহাদত

মাকাতিলুত তালিবিয়্যীন গ্রন্থে এসেছে : হযরত আবুল ফযল আল আব্বাস একজন দীর্ঘ অবয়ব ও সুন্দর চেহারার অধিকারী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি যখন কোনো মোটা তাজা ও শক্তিশালী ঘোড়ার উপর বসতেন এবং রেকাব (পাদানী) থেকে পা বের করতেন তখন তাঁর পা দু খানি মাটির উপর ঘর্ষিত হত। এই উজ্জ্বল চেহারার কারণে তাঁকে ক্বামারে বানী হাশিম (বনী হাশিমের পূর্ণিমার চাঁদ) বলা হত। আশুরার দিনে ইমাম হুসাইনের সেনাবাহিনীর পতাকা তাঁর হাতে ছিল। তিনি হযরত আলীর স্ত্রী উম্মুল বানীনের ’ প্রথম সন্তান ছিলেন যিনি তাঁর সন্তানদের মধ্যে সর্বশেষ ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহর পথে এবং ইমামের প্রতিরক্ষায় শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। খাওয়ারিযিমীর মাকতালে এসেছে : হুসাইন (আ.) এর পরিবারবর্গের জন্য পানি আনার দায়িত্ব ছিল হযরত আব্বাসের কাঁধে। তিনি নিম্নোক্ত কবিতাটি আবৃত্তি করতে করতে কুফার সৈন্যদের উপর আক্রমণ করেন :

আক্বসাম্তু বিল্লাহিল্ আ আযযিল্ আ যাম ওয়া বিল্ হুজুনি সাদিক্বান্ ওয়া যামযামি

ওয়া বিল্ হাত্বীমি ওয়াল্ ফিনাল্ মুহাররাম লিইয়াখযিবান্নাল্ ইয়াউমা জিসমী বিদামী

দূনাল্ হুসাইনি যিল্ ফাখ্খারিল্ আক্বদাম ইমামু আহলিল ফায্লি ওয়াত্তাকাররুম।১০৪

কিতাবুল ইরশাদ , মাছীরুল আহযান এবং লুহুফ গ্রন্থে এসেছে : হুসাইন (আ.) পিপাসায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে , ঘোড়ায় আরোহণ পূর্বক ফোরাত অভিমুখে রওনা হলেন। এমতাবস্থায় তাঁর ভাই আব্বাস তাঁর সম্মুখপথে তরবারি চালাচ্ছিলেন এবং ইবনে সা দের সেনাবাহিনীকে ছত্রভঙ্গ করে দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। তারা সার্বিক শক্তি দিয়ে তাঁদের সম্মুখপথ রোধ করে রেখেছিল এবং তাঁদেরকে পানির নিকটে যেতে দিচ্ছিল না।১০৫

ইবনে শাহরে আশুবের মানাকিব ’ গ্রন্থে এসেছে : আবুল ফযল (আ.) পানি আনার সংকল্প নিয়ে ফোরাতকূল অভিমুখে অগ্রসর হলেন। ইবনে সা দের বাহিনী তাঁকে বাধা দেয়ার জন্যে তাঁর প্রতি আক্রমণ করল। আব্বাস (আ.)ও তাদের উপর পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেন এবং এই অবস্থায় তিনি নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করছিলেন :

লা আরহাবুল্ মাউতা ইযাল্ মাউতু রুক্বা হাত্তা উওয়ারিয়া ফিল্ মাসালীতি লাক্বা

নাফ্সী লিনাফসিল্ মুস্তাফা আত্তুহুরু ওয়াক্বা ইন্নী আনাল্ আব্বাসু আগদু বিসসাক্বা

ওয়া লা আখাফু আশ্ শাররা ইয়াউমাল মুলতাক্বা।

“ আক্রমণকারীদের মাঝে নিজেকে না হারানো পর্যন্ত আগত মৃত্যুকে আমি ভয় করব না ! নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েও পূত পবিত্র রাসূলের সন্তানকে আমি রক্ষা করব ! আমি পানি সংগ্রহকারী আব্বাস , যুদ্ধের দুঃখজনক দুর্ঘটনাকে ভয় পাই না !

তিনি পরস্পর সংঘবদ্ধ সৈন্যদের বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং আক্রমণকারীদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দেন। এভাবে ফোরাতের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় যায়িদ ইবনে ওয়ারাকা যে একটি খেজুর গাছের আড়ালে ওঁৎ পেতে বসে ছিল , সহসা বেরিয়ে এসে হাকীম ইবনে তুফাইলের সহযোগিতায় আবুল ফযল আল্ আব্বাসের উপর আক্রমণ করে এবং তাঁর ডান হাতটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। আবুল ফযল আল্ আব্বাস তড়িৎ বেগে তরবারিখানা বাম হাতে নেন এবং নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করতে করতে অশ্বারোহী শত্রুদের উপর হামলা চালান :

ওয়াল্লাহি ইন্ ক্বাত্তা তুম্ ইয়ামীনী ইন্নী উহামী আবাদান্ আন্ দ্বীনী

ওয়া আন্ ইমামি সাদিক্বিল্ ইয়াক্বীনি নাজলু আন্নাবিয়্যি আত্তাহিরিল্ আমীনি।

“ আল্লাহর শপথ ! তোমরা যদিও আমার ডান হাতখানা কেটে ফেলেছ তবুও সর্বদা আমি আমার ধর্ম ও বিশ্বস্ত নবীর পবিত্র সন্তান আমার সত্য ইমামের পৃষ্ঠপোষকতা করেই যাব ।

তিনি লড়াই করতে করতে (হাত থেকে অতিরিক্ত রক্ত ক্ষরণ ও কঠিন পিপাসার কারণে) চরম দুর্বল হয়ে পড়েন। এই অবস্থায় হাকীম ইবনে তুফাইল ’ একটি খেজুর গাছের আড়াল থেকে পুনরায় তাঁকে আক্রমণ করে এবং তাঁর বাম হাতটিকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সেই অবস্থায়ও হযরত আবুল ফযল আল্ আব্বাস (আ.) নিম্নোক্ত পংক্তিগুলি আবৃত্তি করছিলেনঃ

ইয়া নাফ্সু লা তাখ্শী মিনাল্ কুফ্ফারি ওয়াব্শিরী বিরাহমাতিল্ জাব্বারি ;

মাআন্নাবিয়্যিস্ সায়্যিদিল্ মুখ্তারি ক্বাদ্ ক্বাত্ত্বা ঊ বিবাগয়িহিম্ ইয়াসারী ;

ফাআসিলহুম্ ইয়া রাব্বি হাররান্নারি !

“ হে আমার আত্মা ! কাফিরদেরকে ভয় করো না এবং তোমার প্রতি সুসংবাদ হচ্ছে এই যে , তুমি মহান আল্লাহর করুণা লাভ করবে এবং তোমার স্থান হবে আল্লাহর রাসূলের পাশে। এই অন্ধ হৃদয়েরা অবিবেচকের ন্যায় আমার বাম হাতখানি কেটে ফেলেছে । সুতরাং হে আল্লাহ্ ! তাদেরকে তুমি নরকের আগুনে নিক্ষেপ কর !

কাল বিলম্ব না করে , অপর এক অভিশপ্ত ব্যক্তি তার লোহার মুগুর দ্বারা কঠিনভাবে তাঁর (আ) মাথায় আঘাত করে এবং তাঁকে শহীদ করে।১০৬

খাওয়ারেযমীর মাকতাল গ্রন্থে এসেছে : আবুল ফযল আল্ আব্বাস শহীদ হওয়াতে ইমাম হুসাইন (আ.) বললেন : এই মুহূর্তে আমার মেরুদণ্ড ভেঙ্গে গেল এবং আমার পরিকল্পনা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেল ! ১০৭

ইমাম হুসাইনের (আ.) দুগ্ধপোষ্য শিশুর শাহাদত

খাওয়ারেযমীর মাকতাল গ্রন্থে এবং অন্যান্য সূত্রসমূহে বর্ণিত হয়েছে যে , ইমাম হুসাইন (আ.) তাঁর পরিবারের তাঁবুগুলির সামনে আসেন এবং বলেন : আমার দুগ্ধপোষ্য সেই শিশু আলীকে ’ নিয়ে এসো , তাঁর সাথে বিদায়ী সাক্ষাৎ করি ।

তাঁরা শিশুটিকে তাঁর কোলে দেন ! ইমাম তাঁকে চুমু দেন এবং বলেন : এই জাতির উপর লানত হোক যাদের শত্রু হচ্ছেন তোমার নানা আল্লাহর রাসূল (সা.) ! তিনি আলীকে কোলে ধরে ছিলেন , এই অবস্থায় হারমালাহ্ ইবনে কাহিল আসাদী সেই শিশুটির গলাকে লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করে এবং সেই তীরটি তাঁর কণ্ঠ ভেদ করে। ইমাম (আ.) শিশুটির গলার নিচে হাত দিয়ে ধরলে তা রক্তে পূর্ণ হয়ে যায় এবং তিনি সেই রক্ত আকাশের দিকে ছুঁড়ে বলেন : হে আল্লাহ তোমার সাহায্যের মাধ্যমে ইয়াযিদের উপর বিজয়ী হওয়া হতে যদি আমাদের বঞ্চিত রাখো তাহলে তা আমাদের কল্যাণের উপকরণ হিসাবে নির্ধারণ করো এবং দ্রুত এই অত্যাচারীদের নিকট হতে আমাদের প্রতিশোধ গ্রহণ করো ।

তিনি তাঁর ঘোড়া থেকে নিচে নামলেন এবং তরবারির কোষ দ্বারা সেই শিশুটির জন্যে একটি ছোট গর্ত খুঁড়লেন । অতঃপর তাঁর জানাজার নামায আদায় করে তাঁর রক্তাক্ত দেহটিকে দাফন করলেন ।১০৮

ইমামের অপর একটি শিশুর শাহাদত

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন : আব্দুল্লাহ্ ইবনে উকবাহ্ গানাবী আবু বকর নামক ইমাম হুসাইন ইবনে আলীর অপর একটি শিশুকে লক্ষ্য করে একটি তীর নিক্ষেপ করে এবং তাঁকে শহীদ করে !

ফোরাতের পথে ইমামের যুদ্ধ

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে , যুদ্ধাঙ্গনের প্রত্যক্ষদর্শীদের একজনের বরাত দিয়ে লিখেছেন : যখন ইমাম হুসাইনের (আ.) সেনাবাহিনীতে পরাজয়ের নিদর্শন সুস্পষ্ট হল , তখন ইমাম ঘোড়ায় আরোহণ করলেন এবং ফোরাতের দিকে যাবার উদ্যোগ গ্রহণ করলেন। সেই সময় বনী আবান ইবনে দারিম গোত্রের এক লোক চিৎকার দিয়ে বলল : তোমাদের সর্বনাশ হোক ! তাঁর পথ রোধ কর ! তাঁর সঙ্গী সাথি ও অনুসারীগণ তাঁকে অনুসরণ করে ফোরাত অভিমুখে আসার ও পানিতে পৌঁছার পূর্বেই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি কর !

এই বলে তার ঘোড়াকে চাবুক দিয়ে আঘাত করতে করতে দ্রুত সামনে অগ্রসর হল ! সৈন্যরাও তাকে অনুসরণ করল এবং ইমাম ও ফোরাতের (নদী) মাঝে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করল ! ইমাম এরূপ অবস্থা দেখে লোকটিকে অভিশাপ দিয়ে বললেন : হে আল্লাহ্ ! তাকে পিপাসার্ত রাখ ! আবান গোত্রের লোকটিও এই কথা শুনে ধনুকে একটি তীর সংযোগ করে ইমামকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ল এবং তা তাঁর চোয়ালে আঘাত করল !

অপর একটি বর্ণনা অনুসারে : হুসাইন ইবনে তামীম ’ একটি তীর ছুঁড়ে এবং সেই তীরটি ইমামের মুখের ভেতর (অপর একটি বর্ণনা অনুসারে তাঁর চোয়ালের ভেতর) প্রবেশ করে !

বর্ণনাকারী বলেছেন : সেই তীরটিকে ইমাম টেনে বের করলেন (সেই স্থান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল) এবং তিনি সেই ছিদ্রের নিচে অঞ্জলী পেতে রক্তে পূর্ণ করলেন। অতঃপর সেই রক্তকে তিনি আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করলেন ! তারপর তিনি আকাশের দিকে হাত উঠিয়ে বললেন :

“ হে আল্লাহ্ ! এরা তোমার রাসূলের নাতির সাথে যে আচরণ করেছে সেই অভিযোগ তোমার নিকট পেশ করছি। হে আল্লাহ্ ! তাদেরকে তুমি সমূলে উৎপাটন কর এবং এক এক করে তাদেরকে ধ্বংস কর ! তাদের কাউকেই তুমি পৃথিবীর বুকে অবশিষ্ট রেখ না !

তাবারী বর্ণনা করেছেন : হুসাইন (আ.) তীরটিকে টেনে বের করলেন এবং তার নিচে (সেই স্থান থেকে যেই রক্ত ফিনকি দিয়ে বের হচ্ছিল) অঞ্জলী পাতলেন এবং তা রক্তে ভরে গেল। তখন তিনি অভিশাপ দিয়ে বললেন : হে আল্লাহ্ ! তোমার রাসূলের নাতির সাথে তারা যে আচরণ করেছে সেই অভিযোগ আমি তোমার নিকট পেশ করছি !

বর্ণনাকারী বলেন : আল্লাহর শপথ ! কিছু দিনের মধ্যেই সেই লোকটিকে মহান আল্লাহ্ পিপাসা জনিত একটি অসুখে ফেললেন। এমন অসুখ যে ,কোনো ক্রমেই তার পিপাসা মিটছিল না !

কাসিম ইবনে আসবাগ এই বিষয়ে বলছেন : যারা তার শুশ্রূষার জন্যে তার নিকট যেত আমিও তাদের সাথে তার শিয়রে উপস্থিত হলাম এবং দেখলাম যে , মিছরির ঠাণ্ডা শরবত , ঘোলের মশক এবং পানির একাধিক কলস তার চারপাশে রাখা হয়েছে ! সে সেগুলো থেকে অনবরত পান করছে এবং চিৎকার দিয়ে বলছে : আমাকে বাচাঁও , আমি পিপাসায় মরে গেলাম ! অথচ সে সব পাত্র , মশক ও কলসের একটিই , কোনো একটি পরিবারের পিপাসা মিটানোর জন্যে যথেষ্ট ছিল ! কিন্তু সে , সব কিছুর শেষ ফোটা পর্যন্ত পান করেও মাত্র সামান্য কিছু সময় বিশ্রাম নিচ্ছে , অতঃপর উচ্চৈঃস্বরে চিৎকার করে বলছে যে , আমাকে বাচাঁও , আমি পিপাসায় মরে গেলাম ! আর এইভাবে শেষ পর্যন্ত , সেই সব তরল পদার্থের চাপে তার পেটটি ফেটে যায় !

ভীতবিহ্বল একটি শিশুর শাহাদত

হানী ইবনে ছুবাইত হাযরামী ’ র উদ্ধৃতি দিয়ে তবারী বর্ণনা করেছেন সে বলেছে : হুসাইনের (আ.) হত্যার প্রত্যক্ষদর্শীদের মাঝে আমিও ছিলাম ! সেই সময় আমি অপর নয় জনের সাথে ছিলাম , আমরা প্রত্যেকেই এক একটি ঘোড়ায় আরোহী ছিলাম ; হৈ হুল্লোড় ও চিৎকার করে যখন ফিরে এলাম এবং একটি স্থানে স্থির হলাম , তখন হুসাইনের (আ.) পরিবারের একটি শিশুকে দেখলাম যে , হাতে একখানা লাঠি নিয়ে এবং কেবলমাত্র একজোড়া জামা পায়জামা পরিধান করে ভীত সন্ত্রস্ত হুসাইনের পরিবারের তাঁবু থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসল এবং ভীতি ও অস্থিরতার সাথে নিজের ডানে ও বামে ফিরে তাকাল !

মনে হয় এখনও দেখছি তার মাথা ঘুরানোর কারণে তার কানের দু টি মুক্তার দুল বাতাসে দোল খাচ্ছে !

ভীত সন্ত্রস্ত শিশুটি একইভাবে সম্মুখে এগিয়ে আসছিল। আমাদের মধ্যে থেকে একটি লোক তার ঘোড়া ছুটাল এবং শিশুটির নিকট পৌঁছল। অতঃপর তার ঘোড়া থেকে নিচে লাফ দিয়ে সেই শিশুটিকে আক্রমণ করল আর তরবারির একটি আঘাতে তাকে শহীদ করল !

অপর বর্ণনাকারী বলেন : সেই শিশুটির হত্যাকারী স্বয়ং হানী ইবনে ছুবাইত ছিল ! যখন সে এইরূপ একটি অপরাধের কারণে সমালোচনা ও অভিশাপের পাত্র হিসেবে পরিগণিত হয়েছে তখন সেইটিকে অপর একজনের প্রতি আরোপ করেছে !

ইমাম হুসাইনের (আ.) অন্য একটি শিশুর শাহাদত

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে লিখেছেন : সেই সময় শিমর ইবনে যিলজাওশান তার পদাতিক বাহিনীর সাথে , একত্রে ইমামকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে সামনে এগিয়ে আসল ! ইমাম তাদের উপর হামলা করলেন এবং তাদের সারিগুলিকে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন আর তাদেরকে পেছনে সরে যেতে বাধ্য করলেন ! কিন্তু কাল বিলম্ব না করে পুনরায় তারা চারিদিক থেকে সম্পূর্ণরূপে তাঁকে ঘিরে ফেলল ! তখন ইমাম হাসানের (আ.) সন্তানদের মধ্যে থেকে আব্দুল্লাহ্ ইবনে হাসান১০৯ নামের এক বালক নবীর আহলে বাইতের নারীদের তাঁবু থেকে দ্রুত দৌড়ে বাইরে এলো এবং তার চাচা হুসাইনের (আ.) উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলো । তাকে ধরার জন্যে আলীর (আ.) কন্যা যয়নবও দৌড়ে বেরিয়ে এলেন , ইমামও তাঁর বোনকে ডাক দিয়ে তাকে ধরতে বললেন! কিন্তু বালকটি নিজেকে তার ফুফুর হাত থেকে ছাড়িয়ে দ্রুত যুদ্ধের ময়দানের দিকে দৌড় দিল এবং হুসাইনের (আ.) নিকট পৌঁছে তাঁর পাশে স্থির হয়ে দাঁড়াল ।

এই সময় বনী তাইমুল্লাহ্ ইবনে ছা ’ লাবা গোত্রের বাহার ইবনে কা ব কোষমুক্ত তরবারি দ্বারা ইমামের উপর হামলা করল। বালকটি এইরূপ অবস্থা দেখে , তাঁর উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল : হে অপবিত্র সন্তান ! আমার চাচাকে তুই হত্যা করছিস ! ?

বাহার ইবনে কা আব্দুল্লাহর ’ কথাতে কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে বরং সে তার তরবারিখানা দিয়ে ইমামের উপর আঘাত হানল। আব্দুল্লাহ্ও তার হাতকে ইমামের ঢাল হিসেবে স্থাপন করল। সমস্ত শক্তি দিয়ে বাহারের তরবারিখানা নিচে নেমে আসল এবং আব্দুল্লাহর হাত কেটে নিচের চামড়ার সাথে ঝুলে গেল। আব্দুল্লাহ্ শিশুদের ভঙ্গিতে মায়ের সাহায্য চাইল। ইমাম তাকে তুলে নিলেন এবং বুকে জড়িয়ে ধরে বললেন :

“ হে আমার প্রিয় ভাতিজা ! উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরো এবং সেটিকে আল্লাহর কল্যাণ ও নেকীর হিসাবের উপর ছেড়ে দাও। কারণ , মহান আল্লাহ্ এখন তোমাকে তোমার উত্তম পিতাদের আল্লাহর রাসূল (সা.) , আলী ইবনে আবি তালিব , হামযা , জা ফর ও হাসান ইবনে আলী (আ.) সাথে মিলিত করবেন।

শাহাদতের পথে ইমাম

তাবারী লিখেছেন যে , হুসাইন (আ.) বেশ পূর্বেই নিস্তেজ হয়ে পড়েছিলেন কিন্তু যখনই কোনো ব্যক্তি তাঁর নিকট যাবার ইচ্ছে করছিল তখনই তাঁর হত্যার মহাপাপের চিন্তায় ফিরে আসছিল এবং তাঁকে হত্যা করতে সাহস করছিল না।

এরই মাঝে বনী বাদা ’ গোত্রের মালিক ইবনে নুসাইর ’ নামের এক লোক ইমামের নিকট পৌঁছে এবং তরবারি দ্বারা তাঁর মাথাতে আঘাত করে। মালিকের আঘাত ইমামের পরিধেয় বিশেষ টুপিটি ভেদ করে তরবারির প্রান্তভাগ তাঁর মাথার খুলিতে প্রবেশ করল। রক্তে টুপিটি পরিপূর্ণ হলে ইমাম তাকে সম্বোধন করে বললেন : এই হাত দিয়ে পানাহার করে যেন কোনদিন পরিতৃপ্ত না হও ! কিয়ামত দিবসে মহান আল্লাহ্ তোমাকে যেন অত্যাচারীদের কাতারে শামিল করেন !

অতঃপর তিনি সেই টুপিটি মাথা থেকে উঠিয়ে ফেলে দিলেন এবং একটি লম্বা টুপি চেয়ে সেইটি মাথার উপর রেখে তার চারিদিকে পাগড়ী বাঁধলেন কিন্তু তখন তাঁর আর কোনো শক্তিই অবশিষ্ট ছিল না !

কিন্দী বংশীয় লোকটি উপুড় হয়ে ইমামের ফেলে দেয়া পশমের তৈরীকৃত সেই টুপিটি উঠিয়ে নিল। কারবালার সেই হৃদয় বিদারক ঘটনার পর যখন সে টুপিটিকে নিয়ে বাড়ীতে তার স্ত্রীর (হুরের কন্যা এবং হুসাইন ইবনে হুরের ভগ্নী) নিকট গেল এবং সেই টুপিটি থেকে রক্ত ধুতে শুরু করল , তখন তার স্ত্রী তাকে চিৎকার করে বলল : তুমি , আল্লাহর রাসূলের নাতির টুপিটি ছিনতাই করে আমার বাড়ীতে নিয়ে এসেছ ?! যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সেইটিকে আমার বাড়ী থেকে বাইরে নিয়ে যাও !

মালিকের বন্ধুরা বর্ণনা করেছে যে , সেই ঘটনার পর থেকে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত মালিক সম্পূর্ণ নিঃস্ব ও নিদারুণ যন্ত্রণাময় জীবন ভোগ করেছে।১১০

হুসাইন পরিবারের তাঁবুগুলিতে পদাতিক সৈন্যদের আক্রমণ

আবু মাখনাফ তার বর্ণনায় এই বিষয়ে বলেন : শিমর ইবনে যিল জাওশান কুফার দশজন পদাতিক সৈন্যসহ হুসাইনী তাঁবুগুলোর উদ্দেশ্যে রওনা হলো। সেই তাঁবুগুলোতে ইমামের পর্দানশীন নারিগণ , আত্মীয় স্বজন ও সঙ্গী সাথি অবস্থান করছিলেন। ইমাম এই বিষয়টি বুঝতে পেরে চিৎকার করে বললেন :

“ ওয়াইলাকুম ! ইন্ লাম্ ইয়াকুন্ লাকুম্ দ্বীনুন ওয়া লা তাখাফাউনা ইয়াউমাল মা আদ , ফাকূনূ ফী আমরি দুনইয়াকুম্ আহরারান্ যাবী আহ্সাবিন্ ইমনাঊ রাহলী ওয়া আহলী মিন তুগামিকুম ওয়া জুহ্হালিকুম ।

অর্থাৎ তোমাদের সর্বনাশ হোক ! যদি তোমাদের দ্বীন ধর্ম না থাকে এবং কিয়ামত দিবসের ভয় না কর তবে তোমাদের পার্থিব বিষয়ে স্বাধীন ও উদার চিন্তার অধিকারী হও ! আমার তাঁবুগুলো ও পর্দানশীন নারিদেরকে ভণ্ড ও মূর্খদের হাত হতে নিরাপদ রাখ !

ইমামের বক্তব্য শুনার সাথে সাথে শিমার তাঁকে সম্বোধন করে বলল : তুমি সঠিক বলেছো হে ফাতিমার সন্তান ! সেই পদাতিক সৈন্যদের মাঝে আবুল জুনূব (আব্দুর রাহমান জু ’ ফী) , ক্বাশ্আম ইবনে আমর ইবনে ইয়াযীদ জু ’ ফী , সালিহ্ ইবনে ওয়াহাব ইয়ায্নী , সিনান ইবনে আনাস নাখ্য়ী ও খাওলা ইবনে ইয়াযীদ আসবাহীর মত ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছিল। শিমার তাদের সাথে নিয়ে হুসাইনের দিকে অগ্রসর হল এবং তঁকে ঘিরে ধরল । আর তাড়াহুড়া করে ইমামকে হত্যার কাজ সম্পন্ন করার জন্যে , শিমার তাদেরকে বার বার উৎসাহিত করছিল। তাদের মাঝে লোহা ইস্পাত ও বিভিন্ন সমর অস্ত্রে সুসজ্জিত আবুল জুনূবের ’ প্রতি দৃষ্টি পড়লে সে তাকে বলল : সামনে অগ্রসর হও ও তাঁর কাজ শেষ কর ! আবুল জুনূব উত্তর দিল : তুমি নিজে কেন যাচ্ছ না ? শিমার বলল : তুমি আমাকে ধৃষ্টতা দেখাচ্ছ ?! আবুল জুনূবও তার প্রতি উত্তরে বলল : তুমি আমাকে আদেশ করছো ?!

তারা পরস্পরকে গালিগালাজ ও অশ্লীল কথাবার্তা বলতে লাগল। আবুল জুনূব একজন সাহসী পুরুষ ও সৈনিক ছিল , অবশেষে সে শিমারের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল: বর্শার শীর্ষ দিয়ে তোমার চোখ উপড়িয়ে ফেলতে তুমি কি আমাকে বাধ্য করবে ?! শিমার এই হুমকি শুনার সাথে সাথে আবুল জুনূবের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে বলল : আল্লাহর শপথ , যদি পারতাম তাহলে তোমাকে কঠিন শাস্তি দিতাম ! ১১১

ইমামের (আ.) সর্বশেষ যুদ্ধ

তাবারী তার ইতিহাস গ্রন্থে আবু মাখনাফের উদ্ধৃতি দিয়ে আম্মার ইবনে ইয়াগুছ বারেক্বীর নাতি হাজ্জাজ ইবনে আব্দিল্লাহ্ হতে বর্ণনা করেছেন যে , তার পিতা আব্দুল্লাহ্ ইবনে আম্মারকে , হুসাইনের (আ.) নিহত হওয়ার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে আমর ইবনে সা দের সেনাবাহিনীর মধ্যে থাকার কারণে অন্যরা তিরস্কারের পাত্র হিসেবে চিহ্নিত করেন। আব্দুল্লাহ্ ইবনে আম্মার বলে : বনী হাশিমের উপর আমার অধিকার রয়েছে । আমরা জিজ্ঞাসা করলাম : কি অধিকার ? সে বলল : আমি বর্শা দ্বারা ইমাম হুসাইনের উপর হামলা করলাম , আল্লাহর শপথ ! যদি চাইতাম তাহলে তাঁকে একটি আঘাতে শেষ করতে পারতাম ; কিন্তু আমি এই কাজটি করি নি , তাঁর থেকে সামান্য দূরে সরে গেলাম এবং নিজে নিজেই বললাম , আমি তাঁকে হত্যা করব না , অন্য কেউ তাঁকে হত্যা করুক !!

এমতাবস্থায় পদাতিক বাহিনীরা ডান ও বাম দিক থেকে তাঁর উপর আক্রমণ করল। ইমাম , পশমের তৈরী একটি জামা শরীরে এবং একটি পাগড়ী মাথায় পরে ছিলেন। তাঁর ডান পার্শ্বের আক্রমণকারীদের প্রতি আক্রমণ করলেন এবং তাদেরকে ছত্রভঙ্গ করে দিলেন। অতঃপর বাম পার্শ্বের বিদ্রোহীদের প্রতি দৃষ্টি দিলেন। তাদের উপর তরবারি দিয়ে আঘাত হানলেন এবং তাদেরকে বিক্ষিপ্ত করে দিলেন।

আল্লাহর শপথ ! কখনও আমি তাঁর মত একক ও অদ্বিতীয় কোনো পুরুষ দেখি নি। যখন চতুর্দিক থেকে শত্রুরা তাঁকে পরিবেষ্টন করেছে এবং তাঁর সমস্ত সন্তান সন্ততি , আত্মীয় স্বজন ও সঙ্গী সাথিকে হত্যা করেছে তখনও তিনি নির্ভীক , সাহসী , শক্তিশালী , ধৈর্যশীল ও দৃঢ় সংকল্পী হিংস্র সিংহের ন্যায় প্রতিরোধ চালিয়ে গিয়েছেন ও যোদ্ধা হিসেবে দাঁড়িয়ে ছিলেন !

সত্যিই , আল্লাহর কসম ! হুসাইনের আগে এবং তাঁর পরে আর এমন কোনো রণকুশলী ব্যক্তিকে আমি দেখি নি! পদাতিক সৈন্যরা তাঁর তরবারির সামনে থেকে এবং তাঁর বীর পুরুষোচিত আক্রমণ থেকে এমনভাবে ডান ও বাম দিকে ছুটে পালাচ্ছিল যে , মনে হচ্ছিল , নেকড়ের আক্রমণ থেকে ছাগলছানার পাল ছুটে পালাচ্ছে !

আল্লাহর শপথ ! যুদ্ধ ও পলায়ন অনুরূপভাবে অব্যাহত ছিল। হঠাৎ করে হুসাইনের ভগ্নী ও ফাতিমার কন্যা যয়নব , হেরেমের তাঁবু হতে বেরিয়ে আসলেন। তিনি বলছিলেন : হায় ! আসমান যদি পৃথিবীর উপর নেমে আসত ! তারপর তিনি স্বয়ং উমর ইবনে সা দের নিকট গমন করলেন। হুসাইনের (আ.) প্রতি আক্রমণকারী সেনাদের সে তদারকি করছিল। যয়নব তাকে বললেন : হে উমর ! হুসাইনকে হত্যা করছে আর তুমি তাকিয়ে দেখছো ?!

বর্ণনাকারী বলেন : আমি নিজে দেখলাম যে , উমর ইবনে সা দের চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে গড়িয়ে তার গণ্ডদেশে ও দাড়িতে নেমে আসছিল আর এই অবস্থায় সে যয়নবের (আ.) দিক হতে মুখ ঘুরিয়ে নিল !