বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্0%

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্ লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

লেখক: নূর হোসেন মজিদী
প্রকাশক: -
বিভাগ:

ভিজিট: 6828
ডাউনলোড: 1058

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 18 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 6828 / ডাউনলোড: 1058
সাইজ সাইজ সাইজ
বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

মৃত্যুপারের জীবন সম্পর্কে মানুষের ঔৎসুক্য চিরন্তন। এ ঔৎসুক্যের পরিপূর্ণ নিবৃত্তি জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভব নয় জেনেও মানুষ কখনোই এ বিষয়ে জানার আগ্রহ পরিত্যাগ করতে পারে না। এ ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মে যেমন বিভিন্ন ধারণা দেয়া হয়েছে, তেমনি এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা তথ্য ও কল্পনা। তাই এ ব্যাপারে সম্ভব সর্বাধিক মাত্রায় সঠিক ধারণার প্রয়োজনীয়তা সব সময়ই অনুভূত হয়ে আসছে।

ইসলামী মতে, সাধারণভাবে মৃত্যুপরবর্তী সময়ের দু’টি পর্যায় রয়েছে : মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সময় এবং পুনরুত্থান পরবর্তী সময় অর্থাৎ শেষ বিচার ও তদ্পরবর্তী জান্নাতী বা জাহান্নামী অনন্ত জীবন। পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং বেহেশত বা দোযখ বাস তথা আখেরাতের ওপর ঈমান পোষণ ইসলামের মৌলিক চৈন্তিক ভিত্তি (উছূলে ‘আক্বাএদ্)-এর অন্যতম। এ কারণে এ সম্পর্কে কোরআন মজীদে বিস্তারিত বক্তব্য রয়েছে।

আালামে বারযাখ্ প্রসঙ্গ ও তার পটভূমি

তাওহীদ ও নবুওয়াতের পাশাপাশি আখেরাত্ বা মৃত্যুর পরে পুনর্জীবন ও পার্থিব জীবনের ভালো-মন্দ কর্মের প্রতিদানের ধারণা ইসলামের তিনটি মূলনীতির অন্যতম। তবে মানুষের জীবনে প্রভাবের বিচারে আখেরাতের ধারণাই সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ , আখেরাতের ধারণা গ্রহণ না করলে তাওহীদ ও নবুওয়াতের ধারণার বাস্তব জীবনে কোনো প্রভাবই হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। সে ক্ষেত্রে তাওহীদ ও নবুওয়াতের ধারণা স্রেফ একটি তাত্ত্বিক জ্ঞানের বিষয়ে পর্যবসিত হতে বাধ্য।

মুসলমানদের মধ্যে আখেরাত্ সংক্রান্ত বিস্তারিত ধারণায় খুটিনাটি মতপার্থক্য থাকলেও , বিশেষ করে কোরআন মজীদের বহু আয়াতে এ সম্বন্ধে উল্লেখ থাকায় এ সংক্রান্ত মৌলিক ধারণা ও এর গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো সম্বন্ধে সকলেই অভিন্ন মত পোষণ করে থাকে। তা হচ্ছে , আল্লাহ্ তা আলার ইচ্ছায় এক সময় গোটা সৃষ্টিলোক ধ্বংস ও নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে এবং ঐ সময় জীবিত প্রতিটি প্রাণশীল সৃষ্টিই মৃত্যুবরণ করবে। এরপর আল্লাহ্ তা আলার ইচ্ছায় এক নতুন জগত সৃষ্টি হবে। তখন সৃষ্টির শুরু থেকে ক্বিয়ামত্ পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে আগত ও আগতব্য সকল প্রাণশীল সৃষ্টিকেই দেহধারী করে পুনর্জীবিত করা হবে। অতঃপর ইহজীবনে তারা যা কিছু করেছে তার ভালো-মন্দ বিচার করে পুরষ্কার ও শাস্তি প্রদান করা হবে।

কিন্তু ক্বিয়ামত্ সংঘটিত হতে এখনো বাকী আছে। ঠিক কী পরিমাণ সময় বাকী আছে তা স্বয়ং আল্লাহ্ তা আলা ব্যতীত কারো জানা নেই ; হতে পারে তা কয়েক বছর , হতে পারে কয়েক কোটি বছর। তবে এটা সুস্পষ্ট যে , যারা অনেক আগেই মৃতুবরণ করেছে তারা এখন শেষ বিচারের জন্য অপেক্ষা করছে এবং যারা এখন মৃত্যুবরণ করছে ও পরে মৃত্যুবরণ করবে তাদেরকেও অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু মৃত্যুর পরবর্তী ও পুনরুত্থানের পূর্ববর্তী সময়টা তাদের কী অবস্থায় কাটছে ও কাটবে - এ ব্যাপারে মানুষের ঔৎসুক্যের কোনো সীমা নেই।

আমাদের বাংলাভাষী মুসলমানদের মধ্যে প্রায় সর্বজনীনভাবে প্রচলিত সাধারণ আক্বীদাহ্ এই যে , মৃত্যুর পরে যখন একজন মানুষকে ক্ববর দেয়া হয় তখন দু জন ফেরেশতা এসে তাকে ঈমান ও আক্বীদাহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করে এবং গুনাহ্গার লোকেরা সে সব প্রশ্নের সঠিক জবাব দিতে পারে না বিধায় তাদেরকে ক্ববরে শস্তি দেয়া হয়। এরপর ভালো লোকদের আত্মাকে ইল্লীন্ (সমুন্নত ধাম) নামক উত্তম স্থানে আরামে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয় এবং গুনাহ্গারদের আত্মাকে সীজ্জীন্ (কারাগার) নামক এক কষ্টকর অবস্থায় রাখা হয় ; পুনরুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত তারা এ অবস্থায়ই থাকবে। অবশ্য কিছু কিছু বই-পুস্তকে মৃত্যুর পরবর্তী ও পুনরুত্থানের পূর্ববর্তী জগতকে আালামে বারযাখ্ বলে উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায় বটে - যার নামকরণ অবশ্যই সঠিক , কিন্তু এ জগতের অবস্থা সম্বন্ধে উপরোক্ত সওয়াল্-জবাব ও ক্ববর আযাব ছাড়া আর কোনো কিছুর উল্লেখ তেমন একটা দেখা যায় না।

এ বিষয়ে আমাদের দেশে প্রচলিত দ্বীনী বই-পুস্তকে ও ওয়ায্ মাহ্ফিলে মৃত্যুপরবর্তী জগত প্রসঙ্গে স্ববিরোধিতাও দেখা যায়। কারণ , অনেক সময় ক্ববরের সওয়াল-জবাবের পর পরই গুনাহ্গারদের জন্য ক্ববর আযাব ও এরপর দ্বীনদারদের জন্য ঈল্লীন্ ও গুনাহ্গারদের জন্য সিজ্জীনের কথা বলা হয়। আবার অনেক সময় গুনাহ্গারদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী আযাবের কথা এবং নেককারদের আত্মাকে কোনোরূপ পুরষ্কার না দিয়ে আচ্ছন্ন অবস্থায় রেখে দেয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু ক্ববরের জগতে অর্থাৎ আালামে বারযাখে যে সুখ-শান্তি আছে সে সম্পর্কে তেমন কোনো আলোচনা করা হয় না। এছাড়া দো ‘ আ ও দান-ছ্বাদাক্বাহ্ থেকে ছ্বাওয়াব্ পাওয়ার আশায় আত্মাদের স্বজনদের কাছে এসে ঘোরাফেরার কথাও বলা হয়।

মোদ্দা কথা , এ বিষয়ে প্রচলিত ধ্যানধারণায় কোনো একক ও সুনির্দিষ্ট কাঠামো অনুপস্থিত এবং এতে অস্পষ্টতা , বিক্ষিপ্ততা ও স্ববিরোধিতা লক্ষ্য করা যায়। তবে ক্ববর আযাব্ ” একটি সর্বজনীন ও বহুলপরিচিত পরিভাষা। যেহেতু এ বিষয়ে যারা আলোচনা করেন তাঁদের আলোচনার পিছনে মূল উদ্দেশ্য হয় মানুষকে ভয় দেখিয়ে গুনাহ্ থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করা , সেহেতু এতদসংক্রান্ত লেখা ও ওয়ায্-নছ্বীহতের শতকরা পঁচানব্বই ভাগই ক্ববর আযাব ” সংক্রান্ত।

এছাড়া একদিকে যেমন আালামে বারযাখ্ বা ক্ববরের জগতের প্রকৃত অবস্থা তথা সেখানকার সুখ-দুঃখ সম্বন্ধে যেমন অস্পষ্টতা ও বিতর্ক রয়েছে , তেমনি সাম্প্রতিক কালে ইসলাম-বিশেষজ্ঞ হবার দাবীদার কোনো কোনো লোকের পক্ষ থেকে এরূপ একটি জগতের অস্তিত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে অর্থাৎ তাঁরা আত্মার অস্তিত্ব ও শেষ বিচারের বিষয়টি স্বীকার করলেও আালামে বারযাখ্ বা ক্ববরের জীবনের অস্তিত্ব অস্বীকার করছেন।

এদের মতে , মৃত্যু ও পুনরুত্থানের মধ্যবর্তী সময়টা ঘুমের মতো। অর্থাৎ মৃতদের আত্মা কোটি কোটি বছর ঘুমের মতো অবস্থায় কাটিয়ে দেবে , এরপর তারা দেহধারী হয়ে পুনরুত্থিত হবে। তাঁরা মৃত্যুর পরে ও পুনরুত্থানের আগে মৃতদের নাফ্স্-এর (প্রচলিত কথায় আত্মার) জন্য কোনোরূপ আনন্দ-বিষাদ , ভালো-মন্দ বা পুরষ্কার ও শাস্তির ধারণা মেনে নিতে রাযী নন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা যুক্তি উপস্থাপন করেন যে , ব্যক্তি পাপ-পুণ্য যা-ই করে থাকুক না কেন , বিচারের আগে তাদের শাস্তি বা পুরষ্কার লাভের (অল্প মাত্রায় হলেও) ধারণা অযৌক্তিক।

বিষয়টি এখানেই শেষ নয় , সাম্প্রতিক কালে এ ব্যাপারে দৃশ্যতঃ বুদ্ধিবৃত্তিক ধরনের কিন্তু প্রকৃত পক্ষে ভ্রমাত্মক এমন ধরনের প্রচারণাও চালানো হয়েছে এবং প্রচারমাধ্যমের বদৌলতে তা বহু মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়েছে - যা অনেকের মনে সংশয় ও চৈন্তিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে থাকতে পারে।

অবশ্য আলমে বারযাখ্ অস্বীকারকারীদেরকে একতরফাভাবে দোষারোপ করা ঠিক হবে না। কারণ , ইসলামের দৃষ্টিতে আালামে বারযাখ্ সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ধারণা পেশ না করা এবং ক্ববরের জীবনের অবস্থা সংক্রান্ত প্রচলিত ওয়ায্-নছ্বীহত্ ও এতদসংক্রান্ত বই-পুস্তকে সুচিন্তিত ও সুবিন্যস্ত বক্তব্যের পরিবর্তে এলোমেলো ও অগভীর বক্তব্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও চিন্তাশীল লোকদের মনে এ ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করবে - এটাই স্বাভাবিক। বিশেষ করে ঐ সব ওয়ায্-নছ্বীহত্ ও এতদ্সংক্রান্ত বই-পুস্তকে আক্বল্ ও কোরআন মজীদের দলীল - যা অকাট্য দলীল - কদাচিৎ ব্যবহার করা হয় এবং যে সব হাদীছ উদ্ধৃত করা হয় সেগুলোর গ্রহণযোগ্যতা পরীক্ষা করা হয় না। এছাড়া কোরআন-হাদীছ বহির্ভূত এমন অনেক কিচ্ছা-কাহিনী জুড়ে দেয়া হয় যেগুলো প্রামাণ্য নয় এবং দলীল হিসেবে যেগুলোর কোনোই গ্রহণযোগ্যতা নেই। ফলে এ ধরনের দুর্বল উপস্থাপনা মূল প্রতিপাদ্য বিষয়কেই দুর্বল হিসেবে প্রতিপন্ন করে।

কিন্তু কোনো প্রতিপাদ্য বিষয়কে দুর্বলভাবে উপস্থাপন করা হলেই যে , মূল বিষয়টি বাত্বিল বলে গণ্য হবে এমন কোনো কথা নয়। বরং কোনো বিষয়কে (মূল বিষয়কে , বিস্তারিত বক্তব্যকে নয়) গ্রহণ ও বর্জন উভয় ক্ষেত্রেই অকাট্য দলীল-প্রমাণ অপরিহার্য। তাই মৃত্যুপরবর্তী ও পুনরুত্থানপূর্ববর্তী জগতের সুখ-দুঃখের বিষয়টিকেও কেবল অকাট্য দলীল-প্রমাণের আলোকে গ্রহণ বা বর্জন করতে হবে।

এখানে আলোচ্য বিষয়টিকে দুই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যেতে পারে : মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে সর্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে এবং বিশেষভাবে ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে , যেহেতু বিষয়টি জীবিত মানুষদের অভিজ্ঞতার জগতের বহির্ভূত একটি বিষয় সেহেতু এ ব্যাপারে সর্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ফয়ছ্বালায় উপনীত হওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে। আর সর্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে কোনো ফয়ছ্বালায় উপনীত হওয়া সম্ভব না হলে সে ক্ষেত্রে বিষয়টি যেমন সর্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য হওয়া অপরিহার্য হবে না তেমনি তা অকাট্যভাবে বাত্বিল বা বর্জনীয় বলেও গণ্য করা যাবে না। কারণ , কোনো বিষয়ে অকাট্য জ্ঞানে উপনীত হতে না পারার মানে কখনোই মূল জ্ঞাতব্য অজ্ঞেয় বিষয়টির অনস্তিত্ব নয়। অন্যদিকে বিষয়টি জীবিত মানুষদের অভিজ্ঞতার বহির্ভূত বিধায় এ ব্যাপারে ইসলামী সূত্রসমূহের অকাট্য ফয়ছ্বালা মেনে নেয়া মুসলমানদের জন্য অপরিহার্য। তবে কোনো ফয়ছ্বালা কেবল তখনই ইসলামী ফয়ছ্বালা হিসেবে পরিগণিত হবে যখন তা অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিষয়টি প্রমাণের জন্য অবশ্যই যে কোনো ধরনের দুর্বল , বিতর্কিত ও সংশয়মূলক দলীলের (তাকে যদি ছ্বহীহ্ বলে দাবী ’ করা হয়েও থাকে) আশ্রয়গ্রহণ পরিহার করতে হবে। কারণ , কোনো সঠিক বিষয় প্রমাণের ক্ষেত্রে দুর্বল , বিতর্কিত ও সংশয়মূলক দলীলের আশ্রয়গ্রহণ মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টির গ্রহণযোগ্যতাকেই সংশয়াপন্ন করে তোলে , এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে তাকে প্রত্যাখ্যাত করে তোলে। তাই এ বিষয়ে আলোচনার ক্ষেত্রে মূল প্রতিপাদ্য বিষয়টি প্রমাণের বেলায় কেবল অকাট্য ইসলামী জ্ঞানসূত্র অর্থাৎ আক্বল্ ও কোরআন মজীদ এবং এ দুই মানদণ্ডের বিচারে অকাট্য প্রমাণিত সূত্রের আশ্রয় নেয়া যাবে ; এর বহির্ভূত অন্য যে কোনো দলীল থেকে দূরে থাকাই বাঞ্ছনীয়। অবশ্য যে সব ক্ষেত্রে , প্রধানতঃ শাখা-প্রশাখাগত বিষয়ে , ফয়ছ্বালায় উপনীত হওয়ার জন্য অকাট্য দলীল পাওয়া যায় না সে সব ক্ষেত্রে কেবল সম্ভাব্য জবাব ’ হিসেবে অন্যান্য সূত্রের বক্তব্যকে বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্)-এর আলোকে বিশ্লেষণ করে গ্রহণ করা যেতে পারে।

বিচারবুদ্ধির মানদণ্ড কেন

আমরা আমাদের আলোচনায় প্রধানতঃ তিনটি অকাট্য জ্ঞানসূত্রের আশ্রয় নিয়েছি , তা হচ্ছে : বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্) , কোরআন মজীদ ও প্রথম যুগ থেকে চলে আসা মুসলমানদের সর্বসম্মত মত ও আমল - যাকে আমরা ইজমা ‘ এ উম্মাহ্ নামকরণ করেছি - যা অকাট্যভাবে সুন্নাতে রাসূল (ছ্বাঃ)-এর উদ্ঘাটনকারী। অবশ্য আমরা বস্তুবিজ্ঞানের ও অভিজ্ঞতার অকাট্য দলীলও বিবেচনায় নিয়েছি , তবে তা বিচারবুদ্ধির দলীলেরই সম্প্রসারণ হিসেবে মাত্র।

তিনটি কারণে আলোচ্য বিষয়ে বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্)কে অন্যতম মানদণ্ড বা অকাট্য জ্ঞানসূত্র হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। প্রথমতঃ প্রতিপাদ্য বিষয়কে সর্বজনীনকরণ অর্থাৎ বিষয়টিকে শুধু মুসলমানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখা , দ্বিতীয়তঃ সাম্প্রতিককালে মুসলমানদের মধ্যে পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী চিন্তাধারার প্রভাব বৃদ্ধির কারণে যে সব ক্ষেত্রে কোরআন মজীদে সুস্পষ্ট বক্তব্য রয়েছে এমন অনেক বিষয়েও বিচারবুদ্ধির দলীল ছাড়া অনেক লোকের পক্ষেই মানসিক নিশ্চিন্ততার অধিকারী হওয়া সম্ভবপর হয় না। তৃতীয়তঃ স্বয়ং কোরআন মজীদ বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্) কাজে লাগানোর ওপর বার বার তাকিদ করেছে।

বস্তুবাদীরা বস্তুর বাইরে কোনো অবস্তুগত অস্তিত্ব আছে বলে স্বীকার করে না। এ কারণে তারা মানুষ ও অন্যান্য প্রাণশীল অস্তিত্বকে বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ফল বলে দাবী করে অর্থাৎ তারা বস্তু-উর্ধ আত্মার (নাফ্স্-এর) এবং সৃষ্টিকর্তা ও পরকালের অস্তিত্ব স্বীকার করে না। ফলে স্বভাবতঃই তারা আালামে বারযাখ্ বা ক্ববরের জীবনের অস্তিত্বও স্বীকার করে না। কিন্তু সুস্থ বিচারবুদ্ধি মানুষের বস্তুগত শরীর জুড়ে অবস্থানরত বস্তু-উর্ধ সত্তা (নাফ্স্/ আত্মা) ও সৃষ্টিকর্তার অস্তিত্ব এবং পরকালের দৃঢ় সম্ভাবনার পক্ষে রায় প্রদান করে ; কেবল অন্ধ প্রবৃত্তিপূজারীদের পক্ষেই সে রায় প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব। [এ বিষয়ে আমি আমার জীবন জিজ্ঞাসা গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।]

দ্বিতীয়তঃ বিচারবুদ্ধির দলীল পাশ্চাত্যের বস্তুবাদী চিন্তাধারায় প্রভাবিত মুসলমানদের ঈমানী দুর্বলতা দূরীকরণে সহায়ক হয়। বিশেষ করে যারা বস্তুবাদী চিন্তাধারার প্রভাবে কোরআন মজীদের আয়াতের সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন বক্তব্যকেও রূপকভাবে ব্যাখ্যা করতে অভ্যস্ত বিচারবুদ্ধির দলীল তাদের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূরীকরণে সহায়ক হবে বলে আশা করা যায়।

বিচারবুদ্ধির মানদণ্ডের গ্রহণযোগ্যতা

[এ সম্পর্কে আমার জীবন জিজ্ঞাসা গ্রন্থের বিচারবুদ্ধি ও ইসলাম ’ শীর্ষক প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি ; এখানে সংক্ষিপ্ত আভাস দেয়া হলো।]

ইসলামের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে সুস্থ বিচারবুদ্ধির প্রয়োগে উৎসাহিত করা এবং ইসলাম তার মৌলিক দাও ‘ আত্-কে সুস্থ বিচারবুদ্ধির কাছেই উপস্থাপন করেছে। কিন্তু এ বিষয়টি সম্বন্ধে সচেতন না থাকার কারণে অনেকেই দ্বীনের মৌলিক উপস্থপনাসমূহের ব্যাপারে বিচারবুদ্ধির দ্বারস্থ হওয়ার বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে : বিচারবুদ্ধি ভুল করতে পারে।

তাঁদের এ যুক্তির জবাব হচ্ছে এই যে , জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত মহাসত্য সম্পর্কিত মৌলিক প্রশ্নাবলীর জবাবে সুস্থ বিচারবুদ্ধি ( আক্বলে সালীম্)-এর ভুল করার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। আর বিচারবুদ্ধি যদি ভুল করেও , তো তা বিচারবুদ্ধিভিত্তিক পর্যালোচনার সাহায্যে চিহ্নিত করতে সক্ষম। অর্থাৎ কেউ যদি বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে ভুল করে থাকে তো পরবর্তীতে তার নিজের বিচারবুদ্ধিই , অথবা অন্যদের কারো না কারো বিচারবুদ্ধি তা ধরতে সক্ষম হবে।

এ প্রসঙ্গে স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে , ইসলাম অন্যান্য ধর্মের ন্যায় কোনো ধর্ম নয়। অন্য সমস্ত ধর্ম অন্ধ বিশ্বাসের নিকট আবেদন করে , কিন্তু ইসলাম তার বিপরীতে মানুষের বিচারবুদ্ধির নিকট আবেদন করে। যারা একাধিক খোদার বা দেবদেবীর অস্তিত্বে বিশ্বাস পোষণ করে তাদের সে বিশ্বাসের পক্ষে কোনো যুক্তি নেই। আসলে একই বিষয়ে অন্ধ বিশ্বাস ও যুক্তি একত্রে চলতে পারে না। অন্যদিকে ইসলাম জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত মহাসত্য সম্বন্ধে বিচারবুদ্ধির দলীল অর্থাৎ যুক্তি উপস্থাপন করেছে। স্বয়ং কোরআন মজীদ আল্লাহ্ তা আলার অস্তিত্ব ও একত্ব প্রমাণ করার জন্য যুক্তি উপস্থাপন করেছে , যেমন , আল্লাহ্ তা আলার একত্ব প্রমাণের লক্ষ্যে বলেছে :

) لَوْ كَانَ فِيهِمَا آلِهَةٌ إِلا اللَّهُ لَفَسَدَتَا(

“ এতদুভয়ে (আসমান ও যমীনে) যদি আল্লাহ্ ব্যতীত আর কোনো ইলাহ্ থাকতো তাহলে এতদুভয় ধ্বংস হয়ে যেতো। ” (সূরাহ্ আল্-আম্বিয়া ’ : ২২)

এভাবে তাওহীদ , আখেরাত ও নবুওয়াত্ প্রশ্নে কোরআন মজীদ বহু বিচারবুদ্ধিগ্রাহ্য দলীল বা যুক্তি উপস্থাপন করেছে। এভাবে বিচারবুদ্ধির দলীল উপস্থাপনের কারণ এই যে , আল্লাহ্ তা আলা সকল মানুষকে জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত মহাসত্য খুঁজে পাবার ক্ষমতা স্বরূপই বিচারবুদ্ধি দান করেছেন। তাই সকল মানুষের নিকট অভিন্নভাবে গ্রহণযোগ্য মানদণ্ড হচ্ছে বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্) । অন্যান্য ধর্ম যেভাবে তাদের মৌলিক উপস্থাপনাগুলোকে অন্ধ বিশ্বাসের ওপর ভিত্তিশীল করেছে ইসলামও যদি সেভাবেই মানুষের কাছে অন্ধ বিশ্বাসের ভিত্তিতে আবেদন পেশ করতো তাহলে ইসলামের আবেদন সত্য হওয়া সত্ত্বেও কেউ তা গ্রহণ করতো না। কারণ , অন্ধ বিশ্বাসের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে এই যে , প্রতিটি ব্যক্তিই নিজ নিজ বিশ্বাসের অনুসরণ করবে। তাই কোরআন মজীদ বার বার বিচারবুদ্ধির কাছে আবেদন জানিয়েছে। কোরআন মজীদে কম পক্ষে তেরো বার এরশাদ হয়েছে :افلا تعقلون؟ - অতঃপর তোমরা কি বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাবে না ?

বিচারবুদ্ধি অবশ্য খুঁটিনাটি ও বিশেষজ্ঞত্ব পর্যায়ের বিষয়াদিতে স্বাধীনভাবে ফয়ছ্বালা দিতে সক্ষম নয় , কিন্তু জীবন ও জগতের পিছনে নিহিত মৌলিকতম সত্যসমূহ উদ্ঘাটনে সক্ষম। সুতরাং যে কেউ এ বিষয়ে বিচারবুদ্ধি কাজে লাগাবে সে-ই তাওহীদ , আখেরাত্ ও নবুওয়াতে মুহাম্মাদী (ছ্বাঃ)-এর সত্যতায় উপনীত হবে। অন্যদিকে কোরআন মজীদের তাৎপর্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও , বিশেষ করে মতপার্থক্যের ক্ষেত্রগুলোতে বিচারবুদ্ধি সহায়ক শক্তির ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

সুতরাং মত্যুপরবর্তী ও পুনরুত্থানের পূর্ববর্তী জগত - যা আখেরাত সংক্রান্ত ধারণারই একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা , সে সম্পর্কে প্রথমেই আমরা বিচারবুদ্ধির দ্বারস্থ হবো। কারণ , যদিও বিচারবুদ্ধি এতদসংক্রান্ত খুঁটিনাটি উদ্ঘাটনে সক্ষম নয় , তবে মত্যুপরবর্তী ও পুনরুত্থানের পূর্ববর্তী জগতের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব সম্পর্কে আমাদেরকে পথনির্দেশ দানে সক্ষম। এরপর আমরা দেখবো যে , এ সম্পর্কে কোরআন মজীদে কী আছে।