বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্0%

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্ লেখক:
প্রকাশক: -
বিভাগ: ধর্ম এবং মাযহাব

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

লেখক: নূর হোসেন মজিদী
প্রকাশক: -
বিভাগ:

ভিজিট: 6826
ডাউনলোড: 1058

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্
বইয়ের বিভাগ অনুসন্ধান
  • শুরু
  • পূর্বের
  • 18 /
  • পরের
  • শেষ
  •  
  • ডাউনলোড HTML
  • ডাউনলোড Word
  • ডাউনলোড PDF
  • ভিজিট: 6826 / ডাউনলোড: 1058
সাইজ সাইজ সাইজ
বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

বিচারবুদ্ধি ও কোরআনের দৃষ্টিতে ‘আালামে বারযাখ্

লেখক:
প্রকাশক: -
বাংলা

মৃত্যুপারের জীবন সম্পর্কে মানুষের ঔৎসুক্য চিরন্তন। এ ঔৎসুক্যের পরিপূর্ণ নিবৃত্তি জীবদ্দশায় সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভব নয় জেনেও মানুষ কখনোই এ বিষয়ে জানার আগ্রহ পরিত্যাগ করতে পারে না। এ ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মে যেমন বিভিন্ন ধারণা দেয়া হয়েছে, তেমনি এর সাথে যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা তথ্য ও কল্পনা। তাই এ ব্যাপারে সম্ভব সর্বাধিক মাত্রায় সঠিক ধারণার প্রয়োজনীয়তা সব সময়ই অনুভূত হয়ে আসছে।

ইসলামী মতে, সাধারণভাবে মৃত্যুপরবর্তী সময়ের দু’টি পর্যায় রয়েছে : মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান পর্যন্ত সময় এবং পুনরুত্থান পরবর্তী সময় অর্থাৎ শেষ বিচার ও তদ্পরবর্তী জান্নাতী বা জাহান্নামী অনন্ত জীবন। পুনরুত্থান, শেষ বিচার এবং বেহেশত বা দোযখ বাস তথা আখেরাতের ওপর ঈমান পোষণ ইসলামের মৌলিক চৈন্তিক ভিত্তি (উছূলে ‘আক্বাএদ্)-এর অন্যতম। এ কারণে এ সম্পর্কে কোরআন মজীদে বিস্তারিত বক্তব্য রয়েছে।

কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে নাফ্স্

কোরআন মজীদে হায়াত্ (জীবন) , নাফ্স্ (ব্যক্তিসত্তা) ও রূহের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু বিশেষভাবে রূহের স্বরূপ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলেও কোরআন মজীদে এর স্বরূপ সম্পর্কে কিছু বলা হয় নি। বলা হলে তৎকালীন মানুষদের বোধগম্য হতো না , বরং কোরআন মজীদের ঐশিতা প্রশ্নবিদ্ধ হতো। হয়তো এ কারণেই এ সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়া হয় নি (আল্লাহ্ই ভালো জানেন) । এ সম্পর্কে হযরত রাসূলে আকরাম (ছ্বাঃ)কে প্রশ্ন করা হলে তার জবাবে আল্লাহ্ তা আলা কোরআন মজীদে এরশাদ করেন :

) وَيَسْأَلُونَكَ عَنِ الرُّوحِ قُلِ الرُّوحُ مِنْ أَمْرِ رَبِّي وَمَا أُوتِيتُمْ مِنَ الْعِلْمِ إِلا قَلِيلا(

“ (হে রাসূল!) তারা আপনাকে রূহ্ সম্পর্কে প্রশ্ন করে ; আপনি বলুন : রূহ্ হচ্ছে আমার রবের আদেশ (বা কাজ) এবং তোমাদেরকে ইলম্ থেকে সামান্য বৈ দেয়া হয় নি। ” (সূরাহ্ আল্-ইসরা ’ / বানী ইসরাঈল্ : ৮৫)

আরবী ভাষায় রূহ্ ” শব্দটি বিভিন্ন অর্থ বুঝাতে ব্যবহৃত হয় - যা প্রাণহীন জড় পদার্থের বেলায় প্রযোজ্য নয়। এর একটি অর্থ হচ্ছে শারীরিক অনুভূতি , যেমন : বলা হয় , নখ , দাঁত , হাড় ও চুলে রূহ্ (অনুভূতি) নেই। এর অন্য একটি অর্থ হচ্ছে মানসিক চেতনা , যেমন : আমরা বলি , খোদায়ী চেতনা , শয়ত্বানী চেতনা , আদর্শিক চেতনা ইত্যাদি। ওপরের আয়াতে যে রূহ্ ” সম্পর্কে প্রশ্ন করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে সম্ভবতঃ মানুষের মধ্যকার সেই মানবিক চেতনা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিলো যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে পৃথক করে। আর এটা হচ্ছে আল্লাহ্ তা আলার গুণাবলীর অনুরূপ গুণাবলী (যদিও অপূর্ণ মাত্রায়) এবং এটাই খোদায়ী চেতনা। এ খোদায়ী চেতনার কারণেই মানুষ বিচারবুদ্ধি ( আক্বল্) , ও স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী এবং সে তা কাজে লাগাতে পারে।

কোরআন মজীদে হযরত আদম ( আঃ)-এর মধ্যে এ ধরনের রূহ্ ফুঁকে দেয়ার কথাই বলা হয়েছে এবং হযরত ঈসা ( আঃ)কে এ অর্থেই রূহুল্লাহ্ বলা হয়েছে। কিন্তু আরবী ভাষা থেকে অন্য ভাষায় স্থানান্তরের সময় অসাবধানতাবশতঃ রূহ্ ” থেকে ব্যক্তিসত্তা ’ অর্থ গ্রহণ করা হয়েছে। আর এ থেকেই হযরত আদম ( আঃ) ও হযরত ঈসা ( আঃ)-এর মধ্যে আল্লাহর প্রবেশের এবং সকল মানুষের মধ্যে আল্লাহ্ আছেন - এমন উদ্ভট ধারণা সমূহ গড়ে উঠেছে।

প্রকৃত পক্ষে রূহ্ ফুঁকে দেয়ার বিষয়টি হচ্ছে আগুনের স্পর্শে কোনো দাহ্য পদার্থে আগুন ধরানোর মতো যার ফলে মূল আগুন স্বস্থানেই থেকে যায় , সংশ্লিষ্ট দাহ্য পদার্থে প্রবেশ করে না। অথবা এ যুগের পরিভাষায় এর অধিকতর উত্তম তুলনা হতে পারে কোনো কম্পিউটারের অনেকগুলো ফাইলের মধ্য থেকে অন্য কোনো কম্পিউটারে কোনো একটি ফাইল কপি করার সাথে - যার ফলে মূল কম্পিউটার থেকে ফাইলটি বিলুপ্ত হয়ে যায় না।

অতীতে বিভিন্ন অংশীবাদী ধর্মে যে পূর্ববর্তী ধর্মনেতার মৃত্যুতে তার আত্মা পরবর্তী ধর্মনেতার মধ্যে প্রবেশের ধারণা গড়ে ওঠে (যেমন : বৌদ্ধ ধর্মের লামা ’ ) - আরবী ভাষায় যাকেحلول روح (কারো শরীরে অন্য কারো রূহের প্রবেশ) বলা হয় , শুরুতে হয়তো তা থেকে পূর্ববর্তী ব্যক্তির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট চেতনা অর্থ বুঝানো হতো , কিন্তু পরে এ থেকে ব্যক্তিসত্তা অর্থ গ্রহণ করা হয়।

কোরআন মজীদে জীবন (হায়াত্)-এর কথা বলা হয়েছে , কিন্তু এর কোনো ব্যাখ্যা দেয়া হয় নি। প্রশ্ন হচ্ছে , দেহ ও আত্মা (নাফ্স্)-এর সংযুক্ত অবস্থার প্রতিক্রিয়াই কি জীবন , নাকি এ ছাড়াও জীবন বা প্রাণের স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব রয়েছে ? নাকি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলা থেকে গড়ে ওঠা দেহের সক্রিয়তারূপ আপেক্ষিক অস্তিত্বই প্রাণ এবং তা-ই জীবনের কারণ ?

এ সম্পর্কে কোরআন মজীদে সরাসরি কিছু বলা হয় নি , তবে কোরআন মজীদের কোনো কোনো আয়াত থেকে এই শেষোক্ত তাৎপর্যই নিষ্পন্ন হয়। কারণ , কোরআন মজীদে হায়াত্ ” (জীবন) ছাড়াও নাফ্স্ ” (ব্যক্তিসত্তা)-এর কথা বলা হয়েছে , কিন্তু শরীর থেকে ব্যক্তিসত্তা (নাফ্স্) স্থায়ীভাবে বেরিয়ে যাবার কারণে মত্যু ঘটার কথা বলা হয় নি , বরং মৃত্যুঘটা তথা শরীরযন্ত্র অকেজো হয়ে যাবার কারণে ” শরীর থেকে ব্যক্তিসত্তা (নাফ্স্) স্থায়ীভাবে বেরিয়ে যাবার কথা বলা হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায় যে , আল্লাহ্ তা আলার সৃষ্ট সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক শৃঙ্খলা থেকে গড়ে ওঠা দেহের সক্রিয়তারূপ আপেক্ষিক অস্তিত্বই প্রাণ এবং তা-ই জীবনের কারণ।

কোরআন মজীদে রূহ্ ও হায়াত্ ছাড়াও নাফ্স্-এর কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে - যা থেকে প্রমাণিত হয় যে , নাফ্স্ এতদুভয় থেকে স্বতন্ত্র এবং এটাই হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিসত্তা। এরশাদ হয়েছে :

) اللَّهُ يَتَوَفَّى الأنْفُسَ حِينَ مَوْتِهَا وَالَّتِي لَمْ تَمُتْ فِي مَنَامِهَا فَيُمْسِكُ الَّتِي قَضَى عَلَيْهَا الْمَوْتَ وَيُرْسِلُ الأخْرَى إِلَى أَجَلٍ مُسَمًّى(

“ আল্লাহ্ নাফ্স্ সমূহকে ফওত্ করিয়ে দেন (অধিগ্রহণ করেন) তার মৃত্যুর সময় এবং যে মারা যায় নি তার ঘুমের মধ্যে , অতঃপর , যার ওপরে মৃত্যুর ফয়ছ্বালা কার্যকর হয়েছে তাকে রেখে দেন এবং অপরটিকে তার আজালে মুসাম্মা (মৃত্যুর সময়) না আসা পর্যন্ত সময়ের জন্য পাঠিয়ে দেন। ” (সূরাহ্ আয্-যুমার্ : ৪২)

এ আয়াত থেকে সুস্পষ্ট যে , ঘুমন্ত ও মৃত ব্যক্তি উভয়ের নাফসকেই আল্লাহ্ তা আলা এক বিশেষ ব্যবস্থাপনাধীনে অর্থাৎ আালামে বারযাখে নিয়ে নেন , তবে ঘুমন্ত ব্যক্তির নাফসকে পুনরায় ফিরিয়ে দেন , কিন্তু মৃত ব্যক্তির নাফসকে আর ফিরিয়ে দেন না। বলা বাহুল্য যে , নাফসকে অধিগ্রহণ করা সত্ত্বেও ঘুমন্ত ব্যক্তির শরীরের স্বয়ংক্রিয় কাজগুলো চলতে থাকে এবং সে জাগ্রত না থাকলেও জীবিত। অতএব , বুঝা যাচ্ছে যে , শরীর জীবিত থাকার কারণ (عامل -factor ) নাফ্স্ নয় , বরং অন্য কিছু। তা হচ্ছে শরীরের যান্ত্রিক ক্রিয়া (ন্যূনতম ক্রিয়াগুলো হলেও) চালু থাকা , আর এ থেকেই প্রাণের আপেক্ষিক ধারণা নিষ্পন্ন হয়। সুতরাং প্রাণ ও নাফ্স্ স্বতন্ত্র।

‘ আারেফগণ (ইসলামী আধ্যাত্মসাধকগণ) অবশ্য একই ব্যক্তিসত্তায় একাধিক নাফ্স্-এর প্রবক্তা। তাঁরা নাফ্স্-এর ক্ষেত্রে নাফসে আম্মারাহ্ (কুপ্রবৃত্তি বা কুপ্রবণ নাফ্স্) , নাফসে লাওয়ামাহ্ (অনুগত নাফ্স্) ও নাফসে মুতমায়িন্নাহ্ (প্রশান্ত নাফ্স্) - এই তিন ধরনের নাফ্স্-এর কথা বলেন।

অবশ্য কোরআন মজীদে সুস্পষ্ট ভাষায় নাফসে আম্মারাহ্ ও নাফসে মুতমায়িন্নাহর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তা থেকে একই ব্যক্তির মধ্যে একাধিক নাফ্স্ রয়েছে এরূপ মনে করার কোনো সঙ্গত কারণ নেই। কারণ , এ সব ক্ষেত্রে আম্মারাহ্ ” , লাওয়ামাহ্ ” ও মুতমায়িন্নাহ্ ” হচ্ছে নাফ্স্ ” -এর বিশেষণ। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির পক্ষে ভালো বা মন্দ হওয়া সম্ভব , তেমনি অনুগত , বিদ্রোহী , অস্থিরচিত্ত ও প্রশান্তচিত্ত হওয়া সম্ভবপর। এ থেকে একটি দেহে একাধিক ব্যক্তিসত্তার উপস্থিতি প্রমাণিত হয় না। কারণ , নাফসকে বিভিন্ন ধরনের বিশেষণে বিশেষায়িত করা হলে তা থেকে নাফসের সংখ্যার একাধিক্য বুঝায় না। বস্তুতঃ কোনো নাফসের মধ্যে যেমন ভালো বা মন্দ কোনো একটি গুণের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে , তেমনি তাতে বিভিন্ন গুণের সংমিশ্রণও হতে পারে। তেমনি বিভিন্ন গুণের পরিবর্তন ও হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটতে পারে। সুতরাং একটি দেহে যে একটিমাত্র নাফ্স্ বা ব্যক্তিসত্তা থাকে এতে সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই।

প্রতিটি বস্তুকণাতেই চেতনা

এ প্রসঙ্গে চমক সৃষ্টিকারী একটি তথ্য হচ্ছে এই যে , সাম্প্রতিক কালে অনেকে অভিমত প্রকাশ করেছেন যে , প্রতিটি বস্তুকণাতেই চেতনা বিদ্যমান। এ কথা মেনে নিলে বলা যায় যে , অনেকগুলো বস্তুকণার সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের ফলে যেভাবে বিভিন্ন ধরনের বস্তুর একেকটি সুনির্দিষ্ট আকার-আকৃতি বিশিষ্ট একক গড়ে ওঠে অথচ মুল কণাগুলো কণাই থেকে যাচ্ছে ঠিক সেভাবে একটি সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় বস্তু-এককটি একটি উচ্চতর চেতনার অধিকারী হয় অথচ বস্তুকণাগুলোর মূল চেতনা যথাস্থানেই থেকে যাচ্ছে। একে বিভিন্ন সজীব কোষ এবং অণুজীব (যেমন : শ্বেতকণিকা) সমন্বয়ে গড়ে ওঠা আমাদের বস্তুদেহের সাথে তুলনা করা যায় - যাতে উচ্চতর স্বতন্ত্র প্রাণসত্তা গড়ে উঠেছে যদিও অণুজীবগুলোর প্রাণশীলতা বিলুপ্ত হয়ে যায় নি।

যদিও মুসলমানদের অধিকাংশের মধ্যে প্রচলিত ধারণা হচ্ছে এই যে , শরীর গঠনের এক পর্যায়ে বাইরে থেকে তাতে নাফ্স্ প্রবেশ করানো হয় , কিন্তু অনেক মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানী মনে করতেন যে , আল্লাহ্ তা আলা বস্তুর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে শরীর গঠনের এক পর্যায়ে তাতে নাফসের উদ্ভব হওয়ার ব্যবস্থা নিহিত রেখেছেন।

প্রতিটি অণুতে চেতনা থাকার ধারণা সঠিক হবার সম্ভাবনার সপক্ষে কোরআন মজীদ থেকে সমর্থন পাওয়া যায়। কারণ , আমরা যে সব অস্তিত্বকে স্রেফ্ বস্তুগত সত্তা বা জড়বস্তু বলে থাকি কোরআন মজীদের দৃষ্টিতে সেগুলোরও প্রাণ ও ব্যক্তিসত্তা আছে। কোরআন মজীদে বিভিন্ন প্রাকৃতিক অস্তিত্ব কর্তৃক আল্লাহ্ তা আলাকে সিজদাহ্ করার ও তাঁর তাসবীহ্ করার কথা বলা হয়েছে , যদিও সে সিজদাহ্ ও তাসবীহর ধরন আমাদের সিজদাহ্ ও তাসবীহ্ করার অনুরূপ নয় , তবে বিভিন্ন আয়াতের উক্তি থেকে প্রমাণিত হয় যে , তাদের সিজদাহ্ ও তাসবীহর কথা রূপক অর্থে বলা হয় নি , বরং আক্ষরিক অর্থেই বলা হয়েছে। যেমন , এরশাদ হয়েছে :

) تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالأرْضُ وَمَنْ فِيهِنَّ وَإِنْ مِنْ شَيْءٍ إِلا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَكِنْ لا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ(

“ সাত আসমান ও পৃথিবী এবং এ সবের মধ্যে যা কিছু আছে সব কিছুই তাঁর (আল্লাহর) তাসবীহ্ (মহিমা বর্ণনা) করে এবং এমন কোনো কিছু নেই যা (প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে) তাঁর তাসবীহ্ না করে। কিন্তু তোমরা তাদের তাসবীহ্ অনুধাবন করতে পারো না। ” (সূরাহ্ আল্-ইসরা ’ / বানী ইসরাঈল্ : ৪৪)

এখানে তাসবীহ্ করার কথাটা যদি রূপকার্থক হতো , অর্থাৎ সব কিছুই আল্লাহ্ তা আলার তৈরী প্রাকৃতিক বিধানের শৃঙ্খলে আবদ্ধ - এটা বুঝানোই উদ্দেশ্য হতো , তাহলে এ কথা বলার প্রয়োজন হতো না যে , আমরা তাদের তাসবীহ্ অনুধাবন করতে পারি না। বরং এ কথা থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে , সব কিছু স্বেচ্ছায় তাসবীহ্ করে।

অবশ্য কেউ হয়তো এ প্রশ্ন তুলতে পারে যে , কাফের-নাস্তিকরা তো আল্লাহ্ তা আলার অস্তিত্বকেই স্বীকার করে না , তাই তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহ্ তা আলার তাসবীহ্ করার কথা আসে কীভাবে ? এর জবাব হচ্ছে এই যে , তারা তাদের প্রবৃত্তির দাসত্বের কারণে আল্লাহকে স্বীকার করে না বটে , কিন্তু তারা তাদের সহজাত জ্ঞানের দ্বারা জানে যে , একজন মহাজ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত এ জগত অস্তিত্বলাভ করে নি। অন্যদিকে তারা যখন আল্লাহ্ তা আলার কোনো সৃষ্টির সৃষ্টিকুশলতা ও গুণাবলীর প্রশংসা করে তখন কার্যতঃ তারা আল্লাহ্ তা আলারই প্রশংসা করে , ঠিক যেভাবে কোনো শিল্পকর্মের প্রশংসা করা মানেই তার শিল্পীর প্রশংসা।

অন্য এক আয়াতে এরশাদ হয়েছে :

) ثُمَّ اسْتَوَى إِلَى السَّمَاءِ وَهِيَ دُخَانٌ فَقَالَ لَهَا وَلِلأرْضِ اِئْتِيَا طَوْعًا أَوْ كَرْهًا قَالَتَا أَتَيْنَا طَائِعِينَ(

“ অতঃপর তিনি (আল্লাহ্) আসমানের প্রতি মনোযোগ দিলেন , আর তখন তা ছিলো ধূম্র (গ্যাসীয় আকারে) ; তখন তিনি তাকে ও পৃথিবীকে বললেন : উভয়ই (নিয়ন্ত্রণে) এসো স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছাক্রমে। তখন উভয় বললো : আমরা স্বেচ্ছায় (নিয়ন্ত্রণে) এলাম। ” (সূরাহ্ ফুছ্বছ্বিলাত্/ হা-মীম্-আস্-সাজদাহ্ : ১১)

এখানে উভয় স্বেচ্ছায় (নিয়ন্ত্রণে) এলো ’ না বলে উভয় বললো : বলা থেকে সুস্পষ্ট যে , বিষয়টি রূপক বা ভাবার্থক নয় , বরং আসমান ও যমীনের প্রাণ ও ব্যক্তিসত্তা আছে। সুতরাং যা কিছু তাসবীহ্ করে সেগুলোর প্রত্যেকটিরই প্রাণ ও ব্যক্তিসত্তা আছে - তা যে স্তরেরই হোক না কেন।

ইসলাম চৌদ্দশ ’ বছর আগে উদ্ভিদ কর্তৃক আল্লাহকে সিজদাহ্ করার কথা বলেছে এবং তাদের প্রাণ , চেতনা , সুখ-দুঃখ ও ব্যথা-বেদনা থাকার কথা বলেছে তথা তাদের প্রতি ব্যক্তিত্ব আরোপ করেছে - কেবল বিংশ শতাব্দীতে এসে বিজ্ঞানীরা যার সন্ধান পেয়েছেন। বর্তমান যুগের অনেক বিজ্ঞানী ভিন্ন মাত্রার (Dimension ) প্রাণের সম্ভাবনা স্বীকার করেছেন। অদূর ভবিষ্যতে হয়তো তাঁরা পৃথিবী , আগুন , বাতাস ইত্যাদিতেও প্রাণের ও ব্যক্তিসত্তার সন্ধান পাবেন।

সব কিছুতে প্রাণ থাকার বিষয়টি কোরআন মজীদের অন্য এক আয়াত থেকেও প্রমাণিত হয়। এরশাদ হয়েছে :

) وَمَا هَذِهِ الْحَيَاةُ الدُّنْيَا إِلا لَهْوٌ وَلَعِبٌ وَإِنَّ الدَّارَ الآخِرَةَ لَهِيَ الْحَيَوَانُ لَوْ كَانُوا يَعْلَمُونَ(

“ আর এ দুনিয়ার জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক বৈ নয় এবং নিঃসন্দেহে আখেরাতের গৃহ প্রাণময় ; যদি তারা জানতো! (সূরাহ্ আল্- আনকাবূত্ : ৬৪)

এ থেকে সুস্পষ্ট যে , সব কিছুতেই প্রাণ আছে , কিন্তু আমরা আমাদের শারীরিক ইন্দ্রিয়নিচয়ের ধারণক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে সকল কিছুর প্রাণ সম্পর্কে বুঝতে পারি না। আখেরাতের জীবনে এ সীমাবদ্ধতা থাকবে না বলেই সেখানে সকল প্রাণ সম্পর্কে বুঝতে পারা সম্ভব হবে।

যা-ই হোক , প্রতিটি বস্তুকণায় চেতনা আছে , এর মানে হচ্ছে প্রতিটি বস্তুকণাকে জুড়ে একটি অবস্তুগত অস্তিত্বও রয়েছে। তেমনি সুনির্দিষ্ট প্রাকৃতিক বিধিবিধানের আওতায় যখন বস্তুকণাসমূহ মিলে একটি উচ্চতর বস্তু-একক গড়ে ওঠে , সাথে সাথে তার মধ্যে একটি উচ্চতর চেতনা ও ব্যক্তিসত্তা গড়ে ওঠে - যা বস্তু থেকে গড়ে উঠলেও এবং বস্তুকে আশ্রয় করে অবস্থান করলেও তা ভিন্ন মাত্রার অবস্তুগত স্বতন্ত্র অস্তিত্ব। ফলে বস্তুসত্তা বিশ্লিষ্ট ও বিক্ষিপ্ত হয়ে গেলেও সে অবস্তুগত সত্তা বিলুপ্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই , বরং তা এক ভিন্ন মাত্রার জগতে অবস্থান গ্রহণ করবে এটাই স্বাভাবিক।

এভাবে কার্যতঃ বস্তুগত এককসমূহ , বিশেষতঃ শরীর সমূহ যেমন বিভিন্ন বস্তুগত এককের সমন্বয়ে গঠিত অথচ সে এককগুলোর স্বতন্ত্র অস্তিত্বও অব্যাহত থাকে , তেমনি তাকে আশ্রয় করে স্বতন্ত্র উচ্চতর নাফ্স্ গড়ে উঠলেও তার এককসমূহের নাফ্স্ স্বতন্ত্রভাবে অস্তিত্বমান থাকে।

নাফসের এ ধরনের ধারণা কোরআন মজীদের আয়াত থেকেও পাওয়া যায়। এরশাদ হয়েছে :

) حَتَّى إِذَا مَا جَاءُوهَا شَهِدَ عَلَيْهِمْ سَمْعُهُمْ وَأَبْصَارُهُمْ وَجُلُودُهُمْ بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ. وَقَالُوا لِجُلُودِهِمْ لِمَ شَهِدْتُمْ عَلَيْنَا قَالُوا أَنْطَقَنَا اللَّهُ الَّذِي أَنْطَقَ كُلَّ شَيْءٍ(

“ আর তারা যখন তার (জাহান্নামের) কাছে পৌঁছবে তখন তাদের কান , চোখ ও ত্বক তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য দেবে। তখন তারা তাদের ত্বককে বলবে : কেন তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে ? তখন তারা (চামড়া সমূহ) বলবে : যে আল্লাহ্ সব কিছুকেই বাকশক্তি দিয়েছেন তিনিই আমাদেরকে বাকশক্তি দিয়েছেন। ” (সূরাহ্ ফুছ্বছ্বিলাত্/ হা-মীম্-আস্-সাজদাহ্ : ২০-২১)

এ থেকে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা এবং সেই সাথে ব্যক্তির নিজস্ব স্বতন্ত্র ও উচ্চতর ব্যক্তিসত্তা প্রমাণিত হয়। এটা অনেকটা একটা গাড়ীর ব্যাটারী , রেডিও , ইঞ্জিন , লাইট ইত্যাদির স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও এতদসহ গাড়ীটির স্বতন্ত্র উচ্চতর অস্তিত্বের ন্যায় , যদিও প্রাণীদেহের সাথে এর তুলনা এক ধরনের দুর্বল উপমা মাত্র।

মোদ্দা কথা , শরীর যেমন বিভিন্ন একক সমন্বয়ে গঠিত এককসমূহের স্বাতন্ত্র্য সহকারেই একটি উচ্চতর যৌগিক সত্তা তেমনি একটি প্রাণীর ব্যক্তিসত্তা (নাফ্স্)ও কতক স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তার স্বাতন্ত্র্য সহকারেই একটি উচ্চতর ব্যক্তিসত্তা (নাফ্স্) । আর আখেরাতে যেভাবে সকল কিছুতে প্রাণের অস্তিত্ব সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়বে এবং নাফসের এ ধরনের যৌগিকতার ওপর থেকে অজ্ঞানতার পর্দা উন্মোচিত হয়ে যাবে , আালামে বারযাখ্ আখেরাতের জীবনের অবস্তুগত নমুনা বিধায় সেখানেও এ পর্দা উন্মোচিত হয়ে যাবে বলে যৌক্তিক উপসংহারে উপনীত হওয়া যেতে পারে।