আল হাসানাইন (আ.)

জার্মান নও-মুসলিম নারী ওয়াল্টরুর

0 বিভিন্ন মতামত 00.0 / 5
অস্তিত্বের জগত সম্পর্কে মানুষের সঠিক বা যথাযথ দৃষ্টিভঙ্গি হচ্ছে ঈমানের ফসল। মু'মিন বা বিশ্বাসী ব্যক্তি বিশ্বকে দেখেন সুদৃষ্টিতে এবং সৃষ্টি জগত গড়ার পেছনে কল্যাণকর মহান লক্ষ্য থাকার বিষয়টি তারা উপলব্ধি করেন। ফলে জীবন তার কাছে অর্থপূর্ণ ও প্রশান্তিময়। আর এভাবেই মানুষ ও সৃষ্টিজগত এগিয়ে চলছে পূর্ণতার দিকে। জার্মান নওমুসলিম ওয়াল্টরুর এ ধরনেরই একজন সৌভাগ্যবান নারী। তিনি বলেছেন, "আমি যখন আমার অতীতের দিকে তাকাই তখন দেখি যে, যেই মুহূর্তে আমি আল্লাহর আনুগত্য শুরু করেছি ঠিক সেই সময় থেকেই আমার প্রকৃত জীবন শুরু হয়েছে।"
 
 জার্মান নওমুসলিম ওয়াল্টরুর শৈশব কেটেছে দারিদ্রের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এক সময় ব্যাপক সম্পদ ও অর্থ-বিত্তের অধিকারী হওয়ার পরও অনুভব করছিলেন যে তিনি জীবনের প্রতি সন্তুষ্ট নন। কোথায় যেন কিছু ঘাটতি বা শুণ্যতা রয়েই গেছে। ওয়াল্টরুর এ প্রসঙ্গে বলেছেন,
 
 "আমার দারিদ্রময় শৈশবে ধর্মের কোনো ভূমিকাই ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও জীবনে আল্লাহর অস্তিত্ব কম-বেশি উপলব্ধি করতাম। বড় হওয়ার পর একটি কোম্পানিতে চাকরি করতাম সচিব হিসেবে। ধীরে ধীরে আমি অর্থশালী হচ্ছিলাম ও একইসঙ্গে বাড়ছিল দামি দামি জামাকাপড় কেনার মোহসহ চাকচিক্যের মোহ। কিন্তু সব কিছুর অধিকারী হওয়ার পরও মন আমার প্রশান্ত ছিল না। বস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার যেন কোনো শেষ ছিল না। কিন্তু সব সময় আত্মিক প্রশান্তির অভাবও অনুভব করতাম, আর এটাই সবচেয়ে বড় বেদনায় পরিণত হয়েছিল । এ অবস্থায় বিদেশে কয়েকটি সফরের পর আমার মধ্যে পরিবর্তনের ইচ্ছা জেগে ওঠে।"
 
 জার্মান নওমুসলিম ওয়াল্টরুর প্রথমবারের মত একটি মুসলিম দেশ সফর করতে গিয়ে এমন কিছু ঘটনার মুখোমুখি হন যে তা এই ইউরোপীয় নারীর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় এবং তিনি যেন নিজের প্রকৃত সত্ত্বাকে  খুঁজে পেতে সক্ষম হন। এ প্রসঙ্গে ওয়াল্টরুর বলেছেন,
 
 "তুরস্কে যেবার প্রথম গেলাম,সকালে ঘুম ভাঙ্গলো প্রাণ-জুড়ানো কিছু শব্দ শুনে। প্রথমে মনে হল আমার মধ্যে কিছু একটা যেন জীবিত হয়েছে। এরপর বুঝলাম এটা হচ্ছে মুসলমানদের ভোরের আজান। এর মাধ্যমে মানুষকে নামাজের দিকে আহ্বান জানানো হয়। এই আজানে আল্লাহকে সবচেয়ে বড় বলে স্মরণ করা হয়। এ ছাড়াও আল্লাহ যে এক ও অদ্বিতীয় এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যে তাঁর রাসূল ও নবী সেই সাক্ষ্যও দেয়া হয় এই আজানে। এই আজানের ধ্বনি আমার মনে গভীর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়। তুরস্কে আরো কয়েকবার সফর করেছি এবং অন্য কয়েকটি মুসলিম দেশেও সফর করেছি। ফলে মূল্যবোধের মানদণ্ডগুলো বদলে যায় আমার মধ্যে। আমি আগ্রহী হয়ে উঠি ইসলামকে নিয়ে। "
ইসলাম মানব-প্রকৃতির ধর্ম। নামাজ, রোজা, হজ্ব ও যাকাতের মত ইসলামের ইবাদত বা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানগুলো মানুষের আত্মিক চাহিদাগুলো মেটায়। এ প্রসঙ্গে জার্মান নওমুসলিম নারী ওয়াল্টরুর বলেছেন,
 
"আমি এ সত্য বুঝতে পেরেছি যে আত্মিক প্রশান্তি রয়েছে ইসলামের মধ্যেই। আমি অতীতে তা অনেক খুঁজলেও নিজ দেশে তা খুঁজে পাইনি। ইসলামের সঙ্গে আমার পরিচয় আমাকে বদলে দিল। ফলে আমি অবসর সময়ে ইসলামী সংস্কৃতি সম্পর্কে পড়াশুনার সিদ্ধান্ত নেই। আমি আমার ছুটির দিনগুলো বা অবসরের বেশিরভাগ সময়ই কাটাতাম তিউনিশিয়াসহ মুসলিম দেশগুলোতে। তবে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে নয় বরং সময় কাটাতাম ঠিক জনগণের মধ্যে ও বিশেষ করে, ছোট ছোট গ্রাম ও শহরগুলোতে। আমি নানা শ্রেণী ও ধর্মের অনুসারী মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করতাম যাতে তাদের সঙ্গে  কথা বলা যায়।"
আর এইসব যোগাযোগের ফলে শেষ পর্যন্ত ইসলামের প্রতি ঈমান আনেন জার্মান নওমুসলিম নারী ওয়াল্টরুর।
 
মুসলমান হওয়ার কিছুদিন পর ওয়াল্টরুর জার্মানির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লব সম্পর্কে একটি ছায়াছবি দেখেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন,
 
"কমিউনিস্টরা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের সমালোচনা তুলে ধরার জন্যই তৈরি করেছিল এই ছায়াছবি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ বিপ্লব আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। আমার মতে ইরানের ইসলামী বিপ্লব এ বাস্তবতারই দৃষ্টান্ত যে, আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং আল্লাহর সাহায্য নিয়ে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটানো যায়।" ইসলামের শিক্ষায় উজ্জীবিত ইরানের বিপ্লব ওয়াল্টরুরকে গভীরভাবে প্রভাবিত করায় তিনি ওই ছায়াছবিটি দেখার পরই ভিয়েনাস্থ ইরানি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, এই যোগাযোগের মাধ্যমে আমি ইমাম খোমেনী (র.)'র বইগুলোসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ উতস হাতে পেয়েছি।  অধ্যাপক শহীদ মোতাহহারি লেখা বইগুলোও পেয়েছিলাম এ সময়। এইসব বই পড়ার পর আমার চিন্তাজগতেও ঘটেছে পরিবর্তন। অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মোতাহ্হারির কোনো একটি বইয়ের একটি বিশেষ বাক্য আমাকে বেশ নাড়া দিয়েছে। বাক্যটি হল,"সব ধরনের নৈতিক নীতিমালার অবকাঠামো বা ভিত্তি হল ধর্মের প্রতি ঈমান।" সম্মান, খোদাভীতি, সততা ও ত্যাগসহ সব ধরনের ভালো গুণের ভিত্তি হল ঈমান। বিশ্বাস বা ঈমান মানুষের মধ্যে জাগিয়ে তোলে প্রতিরোধের ক্ষমতা। তাই মজবুত ঈমানের অধিকারী ও ধার্মিক ব্যক্তিরা মানসিক রোগ থেকে মুক্ত থাকেন যা আধুনিক যুগের অন্যতম উপসর্গ।"
 
ওয়াল্টরুর বর্তমান নাম জয়নাব। তিনি এখন এমন প্রাণ-জুড়ানো প্রশান্তি অনুভব করছেন যে এই প্রশান্তি কঠিনতম বিপদেও নড়বড় হয় না।  এ প্রসঙ্গে সাবেক ওয়াল্টরুর বলেছেন, মুসলমান হওয়ার পর থেকে নিজেকে অন্য মানুষদের জন্য দান বা ওয়াকফ করার ও ইসলামী চিন্তাধারা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছি। আমি পর্দা বা হিজাব পালনের জন্য আমার অতীতের চাকরি ও উচ্চ আয়-উপার্জন হারিয়েছি। কিন্তু এইসব হারানোর বিষয় আমার জন্য খুবই মধুর। কারণ, বড় ধরনের লক্ষ্য অর্জনের জন্য এইসব সুবিধা হারানোর বিষয় সহ্য করেছি। অবশ্য মহান আল্লাহ আমাকে দয়া করেছেন। আমি অন্য জায়গায় উপযুক্ত চাকরি পেয়েছি। আমি বিশ্বাস করি মানুষ যদি আল্লাহর পথে ততপরতা চালায় তাহলে সে কখনও শুণ্যতা অনুভব করবে না। আমি যতই আল্লাহর পথে বেশি অগ্রসর হচ্ছি ততই বেশি প্রশান্তি অনুভব করছি। আমি যখন পাশ্চাত্যের যুব সমাজকে স্রোতের মত ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হতে দেখি,তখন পবিত্র কুরআনের সুরা নাসরের  কথা মনে হয়। এই সুরায় মহান আল্লাহ বলেছেন,
 
"যখন আল্লাহর সাহায্য ও বিজয় এল এবং দেখছ যে জনগণ দলে দলে আল্লাহর ধর্মে প্রবেশ করছে,এ অবস্থায় আল্লাহর প্রশংসা বা গুণগানে মশগুল হও ও (ভুল-ত্রুটির জন্য) আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাও,নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবা বা অনুশোচনা গ্রহণকারী।" (রেডিও তেহরান)

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)