আল হাসানাইন (আ.)

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়াত-পূর্ব জীবন

2 বিভিন্ন মতামত 02.5 / 5
বক্ষ্যমান নিবন্ধটি রাসূল (সা.)-এর নবুওয়াত-পূর্ব জীবনের ওপর আলোকপাত করার একটি প্রচেষ্টা । এখানে রাসূল (সা.)-এর জন্ম, শৈশব, তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ হওয়া এবং পৌত্তলিকতা বিরোধী যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।

নবী (সা.)-এর জন্ম

নবী (সা.)-এর জীবনীকারদের মধ্যে তাঁর জন্মতারিখ নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভিন্নমত রয়েছে । সবগুলো একত্র করলে জন্মতারিখ নিয়ে প্রায় বিশটি মত পাওয়া যায় ১ যদিও সুন্নী ও শিয়া ঐতিহাসিক ও হাদীস বর্ণনাকারীদের মধ্যে এক বিরাট সংখ্যক হাতিবর্ষ অর্থাৎ ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের রবিউল আউয়াল২ মাসে রাসূল (সা.) জন্মগ্রহণ করেন এ ব্যাপারে ঐকমত্য৩ পোষণ করেন । শুরু থেকেই সুন্নী ও শিয়াদের মধ্যে রাসূল (সা.)-এর জন্মতারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে এবং এ মতভেদ তাদের রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে  যেখানে তাঁরা রাসূল (সা.)-এর জন্মতারিখ নিয়ে আলোচনা করেছেন৪ ।

শিয়ারা ১৭ রবিউল আউয়ালকে আর অধিকাংশ সুন্নী ১২ রবিউল আউয়ালকে রাসূল (সা.)-এর জন্মদিন হিসাবে গণ্য করে । শিয়াদের মধ্যে শুধু আল্-কুলাইনী৫ ১২ রবিউল আউয়ালকে৬ রাসূল (সা.)-এর জন্মদিন বলে সমর্থন করেছেন ।

সুন্নী জীবনীকারগণ রাসূল (সা.)-এর জন্মদিন নিয়ে ঐতিহাসিকদের৭ মধ্যে মতভেদের কথা উল্লেখ করলেও ইবনে ইসহাক এবং অন্য জীবনীকারগণ৮ বলেন, অধিকাংশ ঐতিহাসিক এ ব্যাপারে একমত যে, মুহাম্মাদ (সা.) ১২ রবিউল আউয়াল জন্মগ্রহণ করেন । ইবনে ইসহাকের মতে রাসূল (সা.) হাতিবর্ষের৯ ১২ রবিউল আউয়াল সোমবার জন্মগ্রহণ করেন । সুন্নীরা সাধারণভাবে সোমবারকে রাসূলের জন্মদিন১০ হিসাবে মানে অন্যদিকে শিয়ারা শুক্রবারকে১১ জন্মদিন হিসাবে গণ্য করে । বর্তমানে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানে প্রতি বছর ১২ থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল রাসূল (সা.)- এর জন্মবার্ষিকী হিসাবে পালিত হয়ে আসছে । এ সপ্তাহকে ‘ঐক্য সপ্তাহ’ ঘোষণা করা হয়েছে । এটি প্রমাণ করে যে, প্রত্যেক সম্প্রদায় নিজ নিজ বিশ্বাসের পাশাপাশি অন্যদের বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করতে পারে ।

তের শতকের শিয়া জীবনীকার আল্-ইরবিলি১২ বলেন যে, তিনি মনে করেন রাসূল (সা.)-এর জন্মদিন নিয়ে এরকম মতভেদ থাকা স্বাভাবিক । কারণ, দিন ও পঞ্জিকা সম্পর্কে ধারণা না থাকায় তখন আরবরা শিশুদের জন্মতারিখ সংরক্ষণ করতে পারত না । তাঁর কাছে বরং রাসূল (সা.)-এর মৃত্যুদিবস১৩ নিয়ে জীবনীকারদের মধ্যে মতভেদকে অযৌক্তিক বলে মনে হয় ।

অলৌকিক ঘটনাবলী

কিছু সংখ্যক জীবনীকারের মতে রাসূল (সা.)-এর জন্মের আগে-পরে কোনো অলৌকিক ঘটনা ঘটেনি । তাঁদের মতে আমেনার গর্ভধারণ এবং প্রসবের১৪ আগে-পরে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেনি । তথাপি কিছু সংখ্যক সুন্নী ও শিয়া জীবনীকার রাসূল (সা.)-এর জন্মের পূর্বে ও পরে১৫ কিছু অলৌকিক ঘটনা বর্ণনা করেছেন ।

রাসূল (সা.)-এর দুধপান

রাসূল (সা.) তাঁর মা ব্যতীত অন্য মহিলার দুধ কেনো পান করেছেন । জীবনীকারগণ একমত যে, রাসুল (সা.) স্বল্প সময়ের জন্য আবু লাহাবের দাসী শুয়াইবার দুধ পান করেছেন । অতঃপর আবু যোআইব-এর কন্যা হালিমা আল্ সাদিয়া এ ইয়াতিম ব্যতীত অন্য কোনো শিশু না পাওয়ায় রাসূল (সা.)-কে প্রতিপালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন । হালিমা বর্ণনা করেন যে, মুহাম্মাদ (সা.)-কে গ্রহণের পরপরই তিনি সব ধরনের আশীর্বাদ এবং কল্যাণপ্রাপ্ত হন । তিনি রাসূল (সা.)-কে পূর্ণ দুই বছর প্রতিপালন করে তাঁর মায়ের কাছে ফেরত দেন ।১৬

ইবনে ইসহাক হালিমা সম্পর্কে বলেন যে, তিনি বলেছেন, রাসূল (সা.) অন্য শিশুদের থেকে আলাদাভাবে বেড়ে ওঠেন । তাঁর কারণে প্রাপ্ত কল্যাণ থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশংকা সত্ত্বেও দুই বছর পর আমরা তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফেরত দিতে আসলাম । আমি তাকে বললাম, ‘আপনার শিশুটিকে আমার সাথে থাকতে দিন যতদিন না সে পরিপূর্ণ বালকে পরিণত হয় । কারণ, মক্কার দূষিত পরিবেশ তার ক্ষতি করবে বলে আশংকা করছি ।’ আমাদের কাছে তাকে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত এভাবে আমরা তাঁর মায়ের কাছে আবদার করতে থাকলাম ।১৭
 
রাসূল (সা.) কি ইয়াতিম বলে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিলেন?

হালিমা এবং অন্য ধাত্রী মায়েরা রাসূল (সা.) ইয়াতিম বলে তাঁর প্রতিপালনের বিনিময় পাওয়া যাবে না এ আশংকায় তাঁকে নিতে অস্বীকার করে । মোহাম্মদ হুসাইন হাইকেল (সুন্নী জীবনীকার) বলেন, ধাত্রী মায়েরা শিশুর পিতার১৮ কাছ থেকে ভালো বিনিময় না পাওয়ার আশংকায় ইয়াতিম শিশুদের প্রতিপালনে আগ্রহ দেখাত না । বিধবা মায়ের সন্তান মুহাম্মাদ এ জন্যই তাদের কাছে আকর্ষণীয় মনে হচ্ছিল না । তাদের মধ্যে কেউই জীবিত ও ধনী পিতাদের সন্তান রেখে মুহাম্মাদকে গ্রহণ করতে রাজী হচ্ছিল না ।১৯ সীরাত গ্রন্থে ইবনে ইসহাক হালিমার সম্পর্কে বলেন, ‘একজন ইয়াতিম! তার মা ও দাদা কি বিনিময় দিতে পারবে ? সে জন্যই আমরা তাঁকে প্রত্যাখ্যান২০ করলাম ।’

সাইয়্যেদ জাফর মুরতাজা (শিয়া জীবনীকার) একইভাবে বর্ণনা করেন যে, হালিমা প্রথমে মুহাম্মাদ (সা.)-কে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁকে ব্যতীত ২১ অন্য কোনো বাচ্চা না পাওয়ায় তাঁকে গ্রহণ করেন । তথাপি তিনি অন্য শিয়া মনীষীদের মতো এ বর্ণনাকে পুরোপুরি সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নিতে পারেননি । কারণ, কেউ বর্ণনা করেন যে, রাসূল (সা.)-এর পিতা আবদুল্লাহ তাঁর জন্মের সময় বেচে ছিলেন এবং তাঁর জন্মের কয়েক মাস পর মৃত্যুবরণ করেন । কেউ বর্ণনা করেন, তাঁর পিতা রাসূল (সা.)-এর জন্মের ৭ মাস বা ১৭ মাস২২ পর মৃত্যুবরণ করেন । আবার কেউ
বলেন, রাসূল (সা.)-এর জন্মের২৩ ২৮ মাস পর তাঁর পিতা আবদুল্লাহ মৃত্যুবরণ করেন । সুতরাং রাসূল (সা.) জন্মের সময় ইয়াতিম ছিলেন কিনা এ ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই । যদিও আমরা ধরে নেই যে, তিনি জন্মের সময় ইয়াতিম ছিলেন তথাপি তিনি এক সম্মানিত এবং ধনাঢ্য ব্যক্তি আবদুল মুত্তালিব-এর উত্তরাধিকারী ছিলেন । হাতিবর্ষে২৪ যাঁর সম্পদের মধ্যে শুধু উটের সংখ্যা ছিল ২০০টি । লোকেরা তাঁকে দাতা এবং মহান ব্যক্তি হিসাবে জানত । তারা এও জানত যে, তাঁর পুত্রবধূ এক ধনী পরিবারের সন্তান । সুতরাং অন্যান্য ধনী পরিবারের শিশুদের মোকাবিলায় মুহাম্মাদ (সা.)-এর মতো একজন ইয়াতিম ধাত্রী মাতাদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হবার কোনো যুক্তি নেই । দাদার আশ্রয়ে২৫ থাকাকালে সম্পদের ওপর তাঁর অধিকার সম্পর্কে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই । তদুপরি আমাদের এ কথাও ভুলে গেলে চলবে না যে, মক্কায় শিশুদের ধাত্রী মায়ের কাছে রেখে প্রতিপালনকে আভিজাত্যের২৬ অংশ হিসাবে দেখা হতো যার অগ্রভাগে ছিলেন আবদুল মুত্তালিব ।

ধাত্রী মা নিয়োগের রেওয়াজ

অন্যান্য শিশুর মতো রাসূল (সা.) মরুচারী গোত্রের এক ধাত্রী মায়ের দুধ পান করেছেন । এটি ছিল তৎকালীন মক্কার অভিজাত পরিবারের একটি রেওয়াজ । তারা তাদের আট দিন বয়সের বাচ্চাকে দুধ পানের জন্য কোনো এক মরু পরিবারে পাঠাতো এবং সেখানে তারা আট/দশ বছর পর্যন্ত প্রতিপালিত হতো । কোনো কোনো মরু গোত্রের বিশেষ করে বনু সা‘দ২৭ গোত্রের ধাত্রী মায়েদের এ কাজে বেশ সুনাম ছিল । এ রেওয়াজের পেছনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণও নিহিত ছিল :
 
১. মরুভূমির নির্মল বায়ু সেবনের ফলে শিশুরা দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং মরুজীবনের কষ্টকর পরিবেশে বড় হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে বিভিন্ন পরিবেশে২৮ খাপ খাইয়ে চলার যোগ্যতা তৈরি হয়;

২. মক্কার মিশ্র সাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং হজ্ব ও বাণিজ্যিক কাফেলার সাথে মেশার সুযোগ থেকে বহু দূরে মরুভূমির এককেন্দ্রিক সমাজ ব্যবস্থায় তারা শুদ্ধ এবং ধ্রুপদী আরবি ভাষা রপ্ত করার সুযোগ পায় । মক্কাবাসী অধিকাংশ ক্ষেত্রে বনু সা‘দ গোত্রের ধাত্রীদের কাছে বাচ্চা প্রতিপালনের দায়িত্ব দিতে পছন্দ করত । কারণ, আরবের শহর ও মরু২৯ এলাকার বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে বনু  সা‘দ ছিল শুদ্ধ আরবি সংস্কৃতির ধারক ।
সেজন্য রাসূল (সা.) তাঁর অনুসারীদের বলতেন, ‘আমি তোমাদের সবার চাইতে খাঁটি
আরব । আমি কুরাইশ এবং বনু  সা‘দ বিন বকর৩০ গোত্রের ধাত্রী মায়ের দুধ পান
করেছি এবং তাদের মাঝে বড় হয়েছি ।’

৩. মরুভূমির নির্মল পরিবেশ বেড়ে ওঠা শিশুরা সাহসী ও সিংহ হৃদয়ের অধিকার হয় এবং স্বাধীন ও মুক্ত৩১ মনের মানুষ হয়ে ওঠে;
৪. মরুভূমির সরল এবং নির্মল প্রাকৃতিক পরিবেশ শিশুদের মানসিক বিকাশের সহায়ক এবং এটি তাদের বুদ্ধিবৃত্তি এবং মেধা তৈরি করে । তারা হয় প্রকৃত বুদ্ধিমান ও মেধাবী । কারণ, তারা শহরের গ্লানি ও ক্লেশ থেকে মুক্ত এক সাধারণ ও অধিকতর
প্রাকৃতিক পরিবেশে৩২ বাস করে;

৫. বর্ণিত আছে যে, হালিমা যখন দুই বছর পর মুহাম্মাদ (সা.)-কে তাঁর মায়ের কাছে ফেরত দিতে আসেন তখন মক্কায়৩৩ মহামারী ছড়িয়ে পড়েছিল বলে তিনি আবার তাঁকে সাথে নিয়ে যেতে চেয়েছেন ।

গরমকালে মক্কায় উষ্ণ এবং খারাপ আবহাওয়া থাকায় শিশুরা বড়দের চাইতে বেশি রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকায় থাকে সেজন্য গরমকালে মক্কা নবজাতকদের জন্য মোটেই উপযোগী থাকে না । সেজন্য মক্কাবাসী তাদের নবজাতক বাচ্চাদের মরুভূমিতে পাঠায় যাতে তারা মক্কার গরম, উষ্ণ এবং অস্বাস্থ্যকর হাওয়া থেকে নিরাপদ থাকে । এজন্য তারা তাদের শিশুদের জন্য ধাত্রী মায়ের খোঁজ করে- যাতে তারা কয়েক বছর মক্কার বাইরে থেকে বেড়ে উঠতে পারে । উপরোল্লিখিত দু’টি কারণ নির্ভরযোগ্য হাদীসে বর্ণিত হয়েছে । দ্বিতীয় কারণটি ইবনে ইসহাকের ‘সিরাত’৩৪ গ্রন্থে একটি হাদীস হিসাবে এবং পঞ্চমটি ইবনে আসির হাদীস৩৫ হিসাবে বর্ণনা করেছেন । এটি তাবারী তাঁর নবীর ইতিহাস৩৬ গ্রন্থে এবং হাইকেল তাঁর হায়াত৩৭ গ্রন্থে হালিমা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেছেন । বাকী কারণগুলো জীবনীকারগণ তাঁদের অভিজ্ঞতা থেকে বর্ণনা করেছেন ।
 
রাসূলের বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার ঘটনা

সুন্নী এবং শিয়া উভয় সূত্রে বর্ণিত হাদীস থেকে রাসূল (সা.)-এর বক্ষ বিদীর্র্ণ হওয়ার ঘটনা জানা যায় । যদিও ঘটনাটি মূলত সুন্নীদের সংকলিত হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে; তথাপি এটি শিয়াদের গ্রন্থেও স্থান পেয়েছে । বিভিন্ন জীবনীকার এ অস্বাভাবিক ঘটনা সম্পর্কে নানা অভিমত পোষণ করেছেন । মোটের ওপর অধিকাংশ সুন্নী পন্ডিত এটিকে নির্ভরযোগ্য হিসাবে গণ্য করেছেন অপরদিকে শিয়া পন্ডিতগণ এ ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করেছেন ।

ইবনে ইসহাক হালিমা প্রসঙ্গে বর্ণনা করেন যে, হালিমা বলেন,
‘আমরা ফেরত আসার কয়েক মাস পর সে এবং তাঁর ভাই ভেড়া চরানোর জন্য তাঁবুর আড়ালে গিয়েছিল । হঠাৎ তার ভাই দৌড়ে আসল এবং বলল, ‘সাদা পোশাকধারী দু‘জন লোক আমার কুরাইশ ভাইকে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে তাঁর পেট চিরে ফেলেছে ।’ আমরা দৌড়ে তাঁর নিকট গেলাম এবং দেখতে পেলাম সে মলিন চেহারা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আমরা তাঁর হাত ধরে কি ঘটেছিল তা জানতে চাই । সে বলল, দুজন সাদা পরিচ্ছদধারী ব্যক্তি এসে আমাকে শুইয়ে দিল এবং আমার পেট চিরে কি যেন খোঁজাখুঁজি করল । অতঃপর আমরা তাঁকে তাবুতে ফেরত নিয়ে গেলাম ।৩৮
এ ঘটনার পর হালিমা মুহাম্মাদ (সাঃ)-কে তার মায়ের কাছে ফেরত দেয়ার জন্য উদগ্রীব হলেন । ইবনে ইসহাক খালিদ বিন মাদান নামক এক ব্যক্তি থেকে রাসূল (সা.)-এর কিছু সংখ্যক সাহাবীর উদ্ধৃতি দিয়ে বর্ণনা করেন যে, রাসূল বলেন :‘আমি যখন বনু সাদ বিন বকর গোত্রে দুগ্ধপোষ্য ছিলাম তখন একদিন আমার দুধ
ভাইসহ ভেড়ার পাল চরানোর জন্য তাঁবুর আড়ালে গেলাম । হঠাৎ দু‘জন সাদা পোশাকধারী লোক হাতে বরফ ভর্তি সোনার থালাসহ আমার নিকট আসল । তারা আমাকে ধরে শুইয়ে দিল এবং আমার পেট চিরে ফেলল; আমার হৃদয় বের করে চিরে ফেলল; ওটার ভেতর থেকে কালো কোনো বস্তু বের করে ছুঁড়ে ফেলল; আমার হৃদয় এবং পেট পূর্ণ পরিস্কার না হওয়া পর্যন্ত বরফ দিয়ে ধৌত করল৩৯ ।’
মুসলিমের সহীহ গ্রন্থে ঘটনাটি বর্ণনার ধারাক্রমে আনাস বিন মালিক থেকে উদ্ধৃত হয়েছে । আনাসের হাদীস মতে কালো বস্তুটি ছিল রাসূল (সা.)-এর হৃদয়ে শয়তানের অংশ । বর্ণনার শেষের দিকে আনাস বলেন যে, তিনি রাসূল (সা.)-এর বক্ষ বিদীর্ণ হওয়ার দাগ প্রায়ই দেখতে পেতেন ।৪০

এ কাহিনী সম্পর্কে নেতিবাচক মূল্যায়ন

হাইকেল এ কাহিনী মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, ‘প্রাচ্যবিদগণ এবং অনেক মুসলিম পন্ডিত এটা বিশ্বাস করেন না এবং এটিকে বানানো গল্প বলে মনে করেন । জীবনীকারগণ এ ব্যাপারে একমত যে, দু’বছরের এক বালক সাদা পোশাকধারী দুজন লোক দেখেছেন বলে যে দাবী করা হয় তা মোটেও নির্ভরযোগ্য নয় । কারণ, মুহাম্মদ (সা.) মরুভূমির বনু সাদ গোত্রের সাথে পাঁচ বছর বয়স
পর্যন্ত বাস করেন । মুহাম্মদ (সা.)-এর আড়াই বছর বয়সে এ ঘটনা ঘটার পর হালিমা এবং তাঁর স্বামী তাঁকে তাঁর মায়ের কাছে ফেরত দিতে যান বলে যে দাবি করা হয় তা এ সাধারণ ঐকমত্যের বিপরীত । অপরদিকে কোনো কোনো লেখক এ ব্যাপারে নিশ্চিত করেছেন যে, মুহাম্মাদ (সা.) হালিমার কাছে তৃতীয় বারের৪১ মতো ফেরত আসেন ।

বাড়তি প্রমাণ হিসাবে হাইকেল দু‘জন প্রাচ্যবিদ ম্যুর এবং ডারমেনহেম-এর ধারণা তুলে ধরেছেন । ম্যুর বলেছেন, প্রকৃত ঘটনা উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন; কারণ, এ গল্পে অসংখ্য সুন্দর উপাখ্যান রয়েছে । তিনি ইতি টানেন এই বলে যে, মুহাম্মাদ (সা.)-এর স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো নেতিবাচক ধারণা পোষণ না করেও বলা যায় যে, এ গল্পের উৎপত্তি সম্ভবত ভীতি বা মৃগী রোগের উপসর্গ ।৪২
ডারমেনহেম বিশ্বাস করেন যে, কুরআনের সূরা আল্ ইনশিরাহ-র একটি আয়াতের ধারণাগত ব্যাখ্যা থেকে এ গল্পের উৎপত্তি হয়েছে- ‘আমরা কি তোমার বক্ষ উন্মুক্ত করিনি এবং আমরা কি তোমার পৃষ্ঠদেশে চেপে থাকা বোঝা লাঘব করিনি?’৪৩ ডারমেনহেম-এর কুরআনের আয়াতের৪৪ ব্যাখ্যাগত এ ধারণা থেকে হাইকেল এ বলে উপসংহার টেনেছেন যে, নিশ্চয়ই এ আয়াতে কুরআন কোনো একটি অলৌকিক ঘটনার প্রতি ইংগিত করেছে । এটি মুহাম্মাদ (সা.)-কে নবুওয়াতের দায়িত্ব ও বোঝা বহনের উপযোগী করার জন্য তাঁর আত্মিক পরিশুদ্ধিকে বুঝিয়েছে । এ সমস্ত প্রাচ্যবিদ এবং মুসলিম চিন্তাবিদের এ রকম ধারণার পেছনে অন্তর্নিহিত কারণ হলো তাঁরা মনে করতেন মুহাম্মাদ (সা.)-এর জীবন ছিল একজন মানুষের স্বাভাবিক জীবন এবং তাঁর নবুওয়াত এবং তিনি নিজে কখনও পূর্ববর্তী নবীদের অনেকের মতো অলৌকিকতার পেছনে ছুটতেন না ।

এ আবিস্কার আরব ও মুসলিম ঐতিহাসিকদের দ্বারা সমর্থিত যারা ক্রমাগত জোর দিয়ে এসেছেন যে, নবীর জীবন যে কোনো অযৌক্তিক বিষয় বা রহস্য থেকে মুক্ত এবং উল্লিখিত ঘটনা ‘আল্লাহর সৃষ্টি যৌক্তিকভাবে বিশ্লেষণযোগ্য, তাঁর আইন অপরিবর্তনীয় এবং বিধর্মীরা ঘটনার স্বাভাবিকতায় বিশ্বাসী নয়৪৫ বলে নিন্দনীয়’- কুরআনের এ দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত । হাইকেলের মতে নবী (সা.) কখনও অযৌক্তিক এবং অলৌকিক কোনো ব্যাপারে জড়িত ছিলেন না ।

সহীহ মুসলিম থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে এস. জাফর মুরতাজা মন্তব্য করেন যে, সুন্নী হাদীস ও সিরাত গ্রন্থে সাধারণত এ গল্প বর্ণিত আছে । এ সকল গ্রন্থের বর্ণনা মোতাবেক নবী (সা.)-এর বক্ষ বহুবার বিদীর্ণ করা হয়েছে । প্রথমবার তাঁর তিন বছর বয়সে যখন তিনি বনু  সা‘দ গোত্রে বাস করেন; দ্বিতীয়ত তাঁর ১০ বছর বয়সে; তৃতীয়বার তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময় এবং চতুর্থবার তাঁর মেরাজে গমন এবং বেহেশতে ভ্রমণের সময় । বর্ণনাকারিগণ সম্ভবত তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধির চিন্তা করে একই ঘটনা বারংবার বর্ণনা করেছেন । মুরতাজা এ কাহিনীর মাধ্যমে কিছু দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা করেছেন যা
নিম্নরূপ :
 
১. এ কাহিনীর মাধ্যমে নবুওয়াত প্রাপ্তির বহু পূর্বেই তাঁর নবুওয়াতের নিশানা এবং এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে তাঁর নবুওয়াত প্রাপ্তি সম্পর্কে ধারণা দেয়া;

২. এটি আল্ কুরআনের সূরা ইনশিরাহর একটি আয়াতের ধারণাগত ব্যাখ্যা, যা পূর্বেই
  উল্লেখ করা হয়েছে;

৩. এ কাহিনী সত্য ও নির্ভরযোগ্য নয় বলেই প্রতিপন্ন হয় । কারণ, নবী (সা.) পবিত্র সত্তা নিয়ে এবং সকল ত্রুটি, অসম্পূর্ণতা ও অপবিত্রতা থেকে মুক্ত হিসাবে জন্মগ্রহণ করেন ।

৪. এটি অমুসলিম পন্ডিতদের বানানো একটি অসত্য কাহিনী যা তাঁরা পরিহাসচ্ছলে অথবা তাঁদের কোনো অসত্য ধারণার প্রমাণ স্বরূপ দাঁড় করিয়েছেন । উদাহরণস্বরূপ, খ্রিস্টানরা এটি বলে থাকে যে, কোনো মানুষ এমনকি ইসলাম ধর্মের নবী অভ্রান্ত নয়
বরং যীশু (যাঁকে কখনই শয়তান স্পর্শ করেনি) ছাড়া প্রত্যেকেই ত্রুটিপূর্ণ কাজ করেছেন । তারা উপসংহার টানে এভাবে যে, একমাত্র যিশু ছিলেন মানব সত্তার ঊর্ধ্বে এবং প্রকৃত অর্থে তিনি মানবের আকৃতিতে ছিলেন এক ঐশী সত্তা । সুতরাং তাদের মতে মুহাম্মাদ (সা.) ছিলেন অপবিত্র যা বক্ষ বিদীর্ণের গল্প ফেদে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে ।
প্রাচ্যবিদদের মধ্যে ডারমেনহেম তাঁর ‘দি লাইফ অব মোহামেট’ গ্রন্থে লিখেছেন,‘বক্ষ বিদীর্ণের উপাখ্যানের মাধ্যমে একটি গোঁড়া মতবাদ তুলে ধরা হয়েছে । কালো দাগ মুছে ফেলার মাধ্যমে আদমের আদি পাপের সাথে এর যোগসূত্র স্থাপন করা হয়েছে যা থেকে তাদের দাবি মতে শুধু মেরী ও যীশু মুক্ত ছিলেন ।’

অন্যদিকে মুরতাজা এ কাহিনীর সত্যতা সরাসরি অস্বীকার করে একে একটি জাহেলী হাদীস বলেছেন যার শিকড় জাহেল লোকের জাহেলী চিন্তার মধ্যে নিহিত । ‘আগানী’-কে উদ্ধৃত করে তিনি দেখিয়েছেন যে, জাহেলী যুগে এ ধরনের গল্পের অস্তিত্ব ছিল । আগানীর মতে উমাইয়্যা বিন আবি আল্ সালত নামক এক জাহেল (অজ্ঞ) লোকের ক্ষেত্রে চার বার এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে যখন সে তার বোনের বাড়িতে ঘুমাচ্ছিল । তার বেলায় দুটি পাখি অবতীর্ণ হয় এবং এদের মধ্যে একটি তার বক্ষ বিদীর্ণ করে । তার দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে এস. জাফর মুরতাজা প্রশ্নাকারে সাতটি কারণ উল্লেখ
করেছেন যা নিম্নরূপ :

১. ইবনে ইসহাক-এর সিরাত গ্রন্থে এক জ্ঞানী ব্যক্তির উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, যে ঘটনার কারণে হালিমা নবী (সা.)-কে তাঁর মায়ের কাছে ফেরত দিতে যান তা উপরোল্লিখিত কাহিনীর কারণের চাইতে ভিন্ন ছিল । তাঁর মতে কারণটি ছিল- ‘কিছু সংখ্যক আবিসিনীয় খ্রিস্টান তাঁকে দুধ ছাড়ানোর পর ফেরত দেয়ার সময় হালিমার সাথে দেখেছে । তারা হালিমার দিকে তাকিয়ে তাঁর সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিল এবং তাঁকে সতর্কতার সাথে পরীক্ষা করেছিল এবং হালিমাকে বলেছিল, ‘চল আমরা বালকটিকে আমাদের দেশের রাজার কাছে নিয়ে যাই; কারণ, তাঁর ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল । আমরা তাঁর
সম্পর্কে সবই জানি ।’ যে লোক আমাকে এ ঘটনা বর্ণনা করেছে সে বলেছে, হালিমা তাঁকে কোনোক্রমে তাদের হাত থেকে রক্ষা করতে পেরেছিল ।
সুতরাং যে হাদীস দ্বারা এটি প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়েছে যে, তাঁর দুধ-মা তাঁকে মরুভূমিতে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণের ঘটনার পর তাঁর মায়ের কাছে ফেরত দিতে আসেন তা সন্দেহযুক্ত ।

২. এটি কি করে সম্ভব যে, নবী (সা.)-কে তাঁর বক্ষ বিদীর্ণের কারণে মায়ের কাছে ফেরত প্রদান করা হলো ? একদিকে বলা হচ্ছে এ ঘটনার সময় তাঁর বয়স ছিল দুই বা তিন বছর কয়েক মাস । অন্যদিকে বলা হচ্ছে তাঁর পাঁচ বছর বয়সের সময় মায়ের কাছে ফেরত দেয়া হয় । এ দু’টি বর্ণনাকে কী করে এক করা সম্ভব ?

৩. এটি কি বিশ্বাসযোগ্য যে, হৃদয়ের কালো দাগ যা আদি পাপের সাথে সংশ্লিষ্ট তা অপসারণের জন্য বক্ষ বিদীর্ণের মতো দৈহিক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন ? এতে ক