আল হাসানাইন (আ.)

সূরা বাকারাহ; (১৭তম পর্ব)

0 বিভিন্ন মতামত 00.0 / 5
সূরা বাকারাহ; আয়াত ৪০-৪৩ (১৭তম পর্ব)

সূরা বাকারাহ'র ৪০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-
يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اذْكُرُوا نِعْمَتِيَ الَّتِي أَنْعَمْتُ عَلَيْكُمْ وَأَوْفُوا بِعَهْدِي أُوفِ بِعَهْدِكُمْ وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ

"হে বনী ইসরাইল, আমি তোমাদের যে সুখ ও সম্পদ দান করেছি তা স্বরণ কর এবং আমার অঙ্গীকার পূরণ কর। আমিও তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ করব। আর তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।" (২:৪০)

আল্লাহকে দেয়া অঙ্গীকার ভুলে যাওয়ায় হযরত আদম (আ.)-কে বেহেশত থেকে বহিষ্কার করা এবং হযরত আদমকে পৃথিবীতে আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব দেয়ার কাহিনী বর্ণনার পর, এই আয়াতে আল্লাহপাক আরেকটি কাহিনীর বর্ণনা দিয়েছেন। হযরত আদম (আ.)-এরই সন্তান অর্থাৎ বনী ইসরাইল গোত্র কি পরিণতির শিকার হয়েছিল সে কথাই এখানে বলা হয়েছে। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর অপর নাম ছিল ইসরাইল। বনী ইসরাইল বলতে তারই সন্তান-সন্ততি ও বংশধরদের বুঝানো হচ্ছে। ইতিহাসে এই গোত্রের রয়েছে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাইয়ের কাহিনী। কোরআনের বহু আয়াতে এই গোত্রের কাহিনী বলা হয়েছে।

এই আয়াতে তিনটি নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যা আল্লাহ প্রদত্ত সকল কর্মসূচীর উৎস।
প্রথমত: আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের কথা স্মরণ করতে হবে। এতে মানুষের মধ্যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অনুভূতি সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা ও তার আনুগত্যের স্পৃহা জেগে ওঠে।
দ্বিতীয়ত: আল্লাহর দেয়া নেয়ামত ও সুখ-সম্পদ শর্তহীনভাবে দেয়া হয়নি। একই সাথে আল্লাহ মানুষের কাছ থেকেও অঙ্গীকার নিয়েছেন। তাই মানুষের বিশেষ কিছু দায়িত্ব আছে। সে যদি আল্লাহ নির্দেশিত পথে চলে তাহলে আল্লাহর দেয়া অনুগ্রহ থেকে পুরোপুরি লাভবান হতে পারবে।
তৃতীয়ত: আল্লাহর দেয়া দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কোন শক্তিকে ভয় পেলে চলবে না। শত্রুদের হুমকি ও প্রচারণা যাতে মানুষের মধ্যে কোন প্রভাব ফেলতে না ফেলে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

এরপর ৪১ নং আয়াতে বলা হয়েছে,
وَآَمِنُوا بِمَا أَنْزَلْتُ مُصَدِّقًا لِمَا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرٍ بِهِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآَيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ

"আমি যা অবতীর্ণ করেছি (কোরআন) তাতে তোমরা বিশ্বাস স্থাপন কর,তোমাদের কাছে যা আছে (তওরাত) এটি তারই সমর্থক। আর তোমরাই এর প্রথম প্রত্যাখ্যানকারী হয়ো না এবং আমার আয়াতকে স্বল্প মূল্যে বিক্রি করো না। তোমরা শুধু আমাকেই ভয় করবে।" (২:৪১)

এই আয়াতে ইহুদী পণ্ডিতদের প্রতি উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছে, তোমরা তওরাতের সুসংবাদ অনুযায়ী ইসলামের নবীর আগমনের প্রতীক্ষায় ছিলে। এখন তার গ্রন্থ কোরআন যা কিনা তোমাদের তওরাতের সাথে সংগতিপূর্ণ তার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করো। নিজেদের অবস্থান জানার জন্য তওরাতের যেসব বাণীতে ইসলামের নবীর বিভিন্ন নিদর্শন উল্লেখ করা হয়েছে তা গোপন করো না এবং পার্থিব সম্পদের বিনিময়ে ধর্মকে বিক্রি করো না। কিংবা কোরআনকে তোমরা প্রথম অবিশ্বাস করো না। তাহলে অন্য ইহুদীরা তোমাদের অনুসরণে ইসলাম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানাবে। একজন মুসলমান সকল আসমানী গ্রন্থ ও পূর্ববর্তী নবীদের প্রতি বিশ্বাস রাখে। ইসলাম ধর্ম হলো সর্বশেষ ধর্ম। এর আগের সব ঐশী গ্রন্থ বিকৃতির শিকার হয়েছে। তাই একজন মুসলমান শুধুমাত্র ইসলামের নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসারী। এজন্যে কোরআন পূর্ববর্তী ধর্মের অনুসারীদেরকে কোরআনের প্রতি ঈমান আনতে বলে। একইসঙ্গে একথাও বলে যে, কোরআনের বিষয়বস্তু পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর সাথে সংগতিপূর্ণ। পার্থক্য হলো পবিত্র কোরআন বিকৃতির উর্ধ্বে। মহাগ্রন্থ কোরআনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের ক্ষেত্রে অন্য কাউকে নয় বরং শুধু আল্লাহর নির্দেশের প্রতি দৃষ্টি দিতে হবে।

এরপর এই সূরার ৪২নং আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন।
وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ

"তোমরা সত্যকে মিথ্যা দিয়ে আড়াল করো না এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করো না।" (২:৪২)

পন্ডিত ব্যক্তিদের যে বিষয়টি তাদের জাতি ও ধর্মকে হুমকিগ্রস্ত করে তাহলো সত্য গোপন করা কিংবা নিজেদের খেয়াল খুশীমত সত্য ও মিথ্যা বর্ণনা দেয়া। এর ফলে জনগণ অজ্ঞতা, মূর্খতা কিংবা বিভ্রান্তি ও সংশয়ের মধ্যে পড়ে। একটি জাতির পণ্ডিত ও শীর্ষ ব্যক্তিরা যেসব অপরাধ করে তার মধ্যে সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ হলো এটি।
আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) নাহজুল বালাগা গ্রন্থের ৪৯ নম্বর বাণীতে এ সম্পর্কে বলেছেন, মিথ্যা যদি সরাসরি বর্ণনা করা হয়, তাহলে ভয়ের কিছু নেই। কারণ মানুষ ওই বিষয়টি যে ভুল তা বুঝতে পারবে এবং নিজেরাই সেটি বর্জন করবে। আর যদি সত্য সরাসরি এবং অবিকৃতভাবে বর্ণনা করা হয়, তাহলে বিরোধীদের মুখ বন্ধ হয়ে যাবে এবং জনগণও তা মেনে নেবে। বিপদ ঘটে তখনই যখন সত্য-মিথ্যা মিশিয়ে বর্ণনা করা হয়। ওই অবস্থায় শয়তান সহজেই মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।


এবারে সূরা বাকারাহ'র ৪৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা যাক। এ আয়াতে বলা হয়েছে,
وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآَتُوا الزَّكَاةَ وَارْكَعُوا مَعَ الرَّاكِعِينَ

"তোমরা নামাজ কায়েম কর, যাকাত দাও এবং রুকুকারীদের সাথে রুকু কর।" (২:৪৩)

শুধু সত্যকে চেনা ও জানাই যথেষ্ট নয়। বরং আল্লাহর প্রতি বিশ্বাসী ব্যক্তিকে কাজের লোক হতে হবে। আর সর্বোত্তম কাজ হলো আল্লাহর এবাদত এবং তার সৃষ্টির সেবা করা।
কোরআনের অধিকাংশ আয়াতে নামাজ ও যাকাতের বিষয়টি পাশাপাশি এসেছে। এর অর্থ হলো নামাজ ও এবাদতের পাশাপাশি একজন মুসলমানকে মানুষের প্রতি সেবা ও গরীবের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করতে হবে। এমনকি নামাজ পড়ার পদ্ধতি সম্পর্কে বর্ণনায় জনগণের মধ্যে উপস্থিত হওয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। বলা হয়েছে জামাতে নামাজ পড়বে এবং অন্যান্য মুসলমানদের সাথে রুকু ও সেজদা করবে। এর কারণ হলো সমাজে নিঃস্বঙ্গ জীবন-যাপনকে ইসলাম অনুমোদন করে না।

সূরা বাকারাহ'র ৪০,৪১,৪২ ও ৪৩ নম্বর আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে-
এক. আল্লাহপাক আমাদের পরিবার ও সমাজকে যে সব নেয়ামত দিয়েছেন সেগুলো সব সময় স্মরণ করতে হবে। আল্লাহর নেয়ামতের কথা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করতে হবে, যাতে আল্লাহর শোকর আদায় এবং তাকে অনুসরণ ও ভালোবাসার স্পৃহা জন্ম নেয়।
দুই. দায়িত্ব পালনের জন্য আল্লাহপাক আমাদের ফিতরাত বা প্রকৃতি কিংবা ঐশী বিধানের মাধ্যমে আমাদের যে অঙ্গীকার নিয়েছেন সেই অঙ্গীকার আমাদের মেনে চলতে হবে। আর মনে রাখতে হবে আল্লাহর বিশেষ দয়া পেতে হলে তার নির্দেশিত পথে চলতে হবে।
তিন. আল্লাহর বিধান মেনে চলার ক্ষেত্রে কোন শক্তিকে ভয় পাওয়া চলবে না। এ ছাড়াও স্রেফ ধন-সম্পদ ও নিজেদের মর্যাদার জন্য আল্লাহর বাণী প্রত্যাখ্যানকারীদের মধ্যে যাতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে না যাই সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
চার. নামাজ মূলত: জামাতে পড়া উচিত। এটি মুসলমানদের একটি ধর্মীয় দায়িত্ব।

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)