আল হাসানাইন (আ.)

রক্তাক্ত ফিলিস্তিন ২য় পর্ব

0 বিভিন্ন মতামত 00.0 / 5

ইসলাম আগমনের পর বায়তুল মুকাদ্দাস
আল হোসাইন (আ.)
হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলেহী ওয়াসাল্লামের নবুয়্যত লাভের পরের তের বছরও নবীজী মক্কায় বসবাস করেন। এ সময় মসজিদুল আকসা মুসলমানদের কেবলা ছিল। মদীনায় নবীজীর হিজরত করার দ্বিতীয় বছরে মদীনার নিকটবর্তী বনি সালমা মসজিদে নবীজী সাহাবীদের নিয়ে নামাজ পড়া অবস্থায় আল্লাহ তায়ালার নির্দেশে মসজিদুল আকছার স'লে মসজিদুল হারামকে (মক্কায় কা’বা শরীফ) কেবলায় পরিণত করেন। হয়তো বা ইয়াহুদীদের নিরস্ত্র করার উদ্দেশ্যই আল্লাহ পাক এ নির্দেশ দেন। কেননা ইয়াহুদীদের কেবলার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করার কারণে ইয়াহুদীরা মুসলমানদের হেয় করতো।
রাসূলে খোদার ইনে-কালের পর প্রথম খলিফার সময় সিরিয়া ও ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে রোমকদের শত্রুতা দমনের জন্যে সৈন্য পাঠানো হয়। কিন্তু প্রথম খলিফার ইনে-কালের ফলে মুসলমানদের বিজয়াভিযান স'গিত হয়ে পড়ে । দ্বিতীয় খলিফার সময় সিরিয়া ও বায়তুল মুকাদ্দাস মুসলমানদের হস-গত হয়। রোমক সৈন্যরা মুসলমানদের হাতে পরাজয় বরণ করে। বায়তুল মুকাদ্দাসের বাশিন্দারা মুসলমানদের হাতে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী অবরোধ, খাদ্য সংকট ও রোগশোকের প্রাদুর্ভাব এদেরকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করে।
দ্বিতীয় খলিফা সাদাসিদে পোশাক গায়ে হাতে উটের রশি ধরে শহরে (জেরুজালেম) প্রবেশ করলে শহরবাসী বিস্ময় অভিভূত হয়ে পড়ে। তারা সানন্দে খলিফার সাথে শান্তি চুক্তি সম্পাদন করে। খলিাফা (হযরত ওমর) নাগরিকদের সাথে খুবই নরম ও সদয় ব্যবহার করেন। ওই বছর (১৫ হিজরী) থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস ও ফিলিস্তিন মুসলমানদের হাতেই ছিল। সন্ধি চুক্তি মুতাবিক খৃস্টানরা তাদের ধর্মীয় আচরণে স্বাধীনতা লাভ করে। পরবর্তীতে এ শহরের বাশিন্দারা বেশীর ভাগই ছিলেন আরব মুসলমান। কুদস মুসলমানদের পয়লা কেবলা হওয়ার ফলে তাদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও সম্মানীয় হয়ে ওঠে।
১০৯৫ খৃস্টাব্দ (৪৮৮ হিজরী) থেকে ইউরোপীয়রা মুসলমানদের উপর আগ্রাসন চালালে ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হয় এবং প্রায় দু’শ বছর যাবত তা অব্যাহত থাকে। ইউরোপীয়দের এসব আগ্রাসনের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল পাশ্চত্যে মুসলমানদের অতীত বিজয়ভিযানের কারণে খৃস্টানদের প্রতিশোধ গ্রহণ, প্রাচ্যের (মুসলিম জাহানের) সম্পদ-ভান্ডারের প্রতি ইউরোপীয়দের লালসা এবং ঈসার পাক মাটি জিয়ারতের মাধ্যমে বেহেশত গমন ইত্যাদি। তবে ঐতিহাসিকরা ক্রুসেড যুদ্ধের মূল কারণ হিসাবে ফিলিস্তিন ও বায়তুল মুকাদ্দাস ইস্যু, মুসলমানদের কাছে শহরের খৃস্টানদের পণদান এবং সম্ভবত ওদের সাথে অসদাচরণ ইত্যাদির কথা লিখেছে। মধ্যযুগে অর্থাৎ ৩৯৫ খৃস্টাব্দে প্রাচীন রোম সাম্রাজ্য পশ্চিম রোম ও পূর্বরোমে বিভক্ত হয়ে পড়ার সময় থেকে ১৪৫৩ খৃস্টাব্দে সুলতান ফাতিহ মুহম্মদের হাতে কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) বিজয়ের আগ পর্যন্ত ইউরোপ ছিল গীর্জার স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের কেন্দ্র। পোপ যুদ্ধ শুরু করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন এবং পাদ্রীদের মাধ্যমে রটিয়ে দেন যে, ফিলিস্থিনে ঈসা (আঃ) -এর আর্বিভাবের নিদের্শনাদি প্রকাশ পেয়েছে। ফলে বহু সংখ্যক খৃস্টান হযরত ঈসার আবির্ভাব দেখার জন্য বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। আর পাদ্রীরা হযরত ঈসার আগমনকে বছরের পর বছর পিছিয়ে দিতে থাকে। এতে করে ফিলিস্তিনগামী জনতার সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে চলে। ওদের ওসব ষড়যন্ত্রের প্রথম দিকেই একজন পাদ্রী সাতশ’ তীর্থযাত্রী নিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। কিন্তু তিনি সাইপ্রাস হয়ে ইউরোপে ফিরে যান এবং গুজব ছড়িয়ে দেন যে মুসলমানরা তাদের শহরে প্রবেশ করতে দেয়নি। এসব পটভূমি ও ষড়যন্ত্রের ফলেই এমন এক যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে যার লেলিহান শিখা দুশ’ বছর পর্যন্ত দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। পাদ্রীদের প্রচরণা ও প্ররোচনায় তখন প্রায় সাত লাখ দরিদ্র নিঃস্ব খৃস্টান জনতা সামরিক দলপতি তথা নাইটদের সাথে আল কুদসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। পথে পথে এদর সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং কোন কোন সূত্রে এদের সংখ্যা কয়েক মিলিয়নে পৌঁছার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তিন বছরের এ পথচলা যুদ্ধ, লুটতরাজ ও ক্রমাগত অগ্রযাত্রার পর মাত্র চল্লিশ হাজার লোক বায়তুল মুকাদ্দাসে পৌঁছে। অন্যরা হয় মুসলমানদের সাথে যুদ্ধে নিহত হয়েছে কিংবা রোগে শোকে মারা গেছে।
বায়তুল মুকাদ্দাস দীর্ঘদিন অবরোধ থাকার পর তীব্র লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ক্রুসেড বাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং গণহত্যা ও সর্বস্ব লুন্ঠনে হাত দেয়। ক্রুসেড বাহিনীর অধিনায়ক গোডাফর পরবর্তীতে শহরের রাজা হয়। বিজয়ের পর পোপের কাছে লিখিত পত্রে সে জানায় আপনি যদি জানতে চান বায়তুল মুকাদ্দাসে আমাদের হাতে বন্দীদের সাথে কি আচরণ করা হয়েছে তাহলো এতটুকু জেনে নিনঃ ‘আমাদের সৈন্যরা মুসলমানদের রক্তের গভীর স্রোত পাড় হয়ে সুলায়মান মন্দিরে পৌঁছে। রক্ত ঘোড়াগুলোর উরু পর্যন্ত পৌঁছেছে।’
খৃস্টানরা এভাবে (৯০) বছর ফিলিস্তিনের উপর শাসন চালায়। দ্বিতীয় ক্রুসেড যুদ্ধের শেষ দিকে (১১৪৭ খৃঃ-১১৪৯ খৃঃ তথা ৫৪২ হিঃ-৫৪৪ হিঃ) সুলতান সালাহুদ্দীন আইয়ুবী ক্রুসেড বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে বায়তুল মুকাদ্দাসকে উদ্ধার করেন এবং শক্রদেরকে সিরিয়া, মিশর ও অন্যান্য অঞ্চল থেকে বহিস্কৃত করেন। এরপর স্রোতের বেগে ইউরোপ থেকে সৈন্য সামন্ত  ক্রুসেডারদের সাথে যোগ দিতে থাকে। আবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে তৃতীয় ক্রুসেড যুদ্ধ শুরু হয় (১১৮৯ খৃঃ-১১৯২ খৃঃ/৫৮৫ হিঃ)। বায়তুল মুকাদ্দাসের পতনকে খৃস্টানদের অবমাননা বলে গণ্য করে পোপ যুদ্ধের ফতোয়া জারি করে। মুসলমানদের হাতে পরাজয়ের পর ইউরোপের সম্রাটগণ ও পোপের দল পারস্পরিক অনৈক্য ভুলে যায় এবং ফ্রান্স ও বৃটেনের রাজা উভয়ই সরাসরি যুদ্ধে নামে। এরা নিজেদের বিজয়াভিযান অব্যাহত রেখে মুসলমানদের খুনে বন্যা সৃষ্টি করতে থাকে। এদের পৈশাচিক বর্বরতার বিস্তারিত বিবরণ ইউরোপীয় ঐতিহাসিকদের যেমন, আলবার মালাহ, গোস্তাভ লোভোন ও অন্যান্যের গ্রনে' রয়েছে।
সালাহুদ্দীন আইয়ুবীর ইনে-কালের পর আইয়ুবী বংশ শাসন কার্য চালাতে থাকে। ইউরোপ ও পোপদের সাথে রাজা-বাদশাহের প্রচুর দ্বন্দ্ব সংঘাত চলার পর অবশেষে তৃতীয় পোপ এ্যানিউসান রাজাদের কাজের অংশ হিসাবে ঘোষণা দিয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নির্দেশ জারী করে। এভাবে তিন বছর সন্ধি চলার পর পুনরায় যুদ্ধের (চতুর্থ ক্রুসেড) আগুন জ্বলে উঠে। ক্রসেড বাহিনী কনস্টান্টিনোপল জয় করে নেয়, সেখানে নয়া রাজা বসায় এবং চতুর্থ ক্রুসেড যুদ্ধেরও অবসান ঘটে।
পোপ এ্যানিউসান ও তাঁর উত্তরাধিকারীর উস্কানিতে পঞ্চম ক্রুসেড যুদ্ধের (১২১৭-১২২১ খৃঃ/৬১৪-৬১৮ হিঃ) আগুন প্রজ্বলিত হয়। পোপগণ ইউরোপীয় রাজাদের প্রতি বায়তুল মুকাদ্দাস উদ্ধারের আহবান জানান। কিন্তু ওরা তা প্রত্যাখান করে। ফলে পোপ নিজেই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা দান করে। পঞ্চম ক্রুসেড যুদ্ধে খৃস্টান বাহিনী পরাজিত হয়ে ইউরোপ ফিরে যায়।
পোপ তৃতীয় এ্যানারিউসের উস্কানিতে ষষ্ঠ ক্রুসেড যুদ্ধ বাঁধে। জার্মানীর রাজা ফ্রেডারিক প্রথমতঃ পোপের আহবানে সাড়া দেন। কিন্তু পরে অনুতপ্ত হয়ে প্রত্যাখান করে। এতে পোপ তাকে কাফের বলে ঘোষণা দেন। এতে ফ্রেডারিক পোপকে বন্দী করে নিজেই বায়তুল মুকাদ্দাসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। সে সময় আইয়ুবী বংশীয় শাসকদের ভেতর তীব্র অনৈক্য ও মতভেদকারী মুসলমানগণ ক্রুসেডারদের সাথে সন্ধি করে বায়তুল মুকাদ্দাস ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। তবে শর্ত থাকে যে, মসজিদুল আকসা মুসলমানদের হাতে থাকবে।
সপ্তম ক্রুসেড যুদ্ধ সেন্ট লুইয়ের মিশর আক্রমনের মধ্য দিয়ে শুরু (১২৪৮-১২৫৪ খৃঃ/৬৪৬-৬৫২ হিঃ) হয়। গাজা উপত্যকায় খৃস্টান বাহিনী পরাজিত হলে নবম লুই এর প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য যুদ্ধে নামে। কিন্তু তিনি পরাজিত, বন্দী ও কারারুদ্ধ হন। পরে বিপুল পরিমাণে পণ দিয়ে মুসলমানদের হাত থেকে রেহাই পান। সপ্তম ক্রুসেড যুদ্ধের পর এবং আইয়ুবী বংশীয় শেষ সুলতানের ইনে-কাল ঘটলে দাস বংশীয় শাসকরা প্রায় তিন’শ বছর যাবৎ বায়তুল মুকাদ্দাসসহ সমগ্র অঞ্চলের শাসন কার্য চালান। এদিকে ইসলামী জাহানে আক্রমণকারী একের পর এক দেশ দখলকারী মঙ্গোল বাহিনী বায়তুল মুকাদ্দাস দখলের জন্য সেখানে পৌঁছলে দাস সুলতানদের সাথে লড়াই বাঁধে। লড়াইয়ে দাস বংশের পতন ঘটে এবং আকসায় ফিলিস্তিন বসবাসকারী অবশিষ্ট খৃস্টান ক্রুসেডপন্থীদেরও মূলোৎপাটন হয়ে যায়।
অন্যদিকে মঙ্গোল বাহিনী ও গ্রীকদের সাথে উসমান গাজীর দীর্ঘ লড়াই ও একের পর এক বিজয়াভিযানের পর উসমানী বংশীয় খেলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। ৭২৭ হিঃ মুতাবিক ১৩২৬ খৃস্টাব্দে উসমান গাজীর মৃত্যু ঘটে। তার বংশধররা একের পর এক শাসন কার্য চালাতে থাকে এবং এরপর সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহের পালা আসে। সুলতান মুহাম্মদ ফাতেহ ১৪৫৩ খৃস্টাব্দে মুতাবিক ৮৫৭ হিজরীতে ক্রুসেডারদের শক্তিসামর্থ্যের কেন্দ্র ও পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টাটিনোপল (ইস্তাম্বুল) জয় করেন এবং খৃস্টান বাহিনীকে ইউরোপের ফটক পর্যন্ত তাড়িয়ে নিয়ে যান। তিনি ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকায় তার বিজয়াভিযান অব্যাহত রাখেন। কনস্টান্টিনোপলের বিজয় ছিল ইউরোপের ইতিহাসে এক মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।
ক্রুসেড যুদ্ধের সময়ে যেমন মুসলমানদের জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সভ্যতা ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে তেমনি এ ঘটনার ফলে ইউরোপে মধ্যযুগের অবসান ঘটে এবং রেঁনেসার বিশাল পরিবর্তন শুরু হয়ে যায়। পাঁচশ’ বছর যাবত কনস্টান্টিনোপল উসমানী সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল। এ সময়ে উসমানী খেলাফতের ভেতর শিল্প, সাহিত্য, স্থাপত্য, রাষ্ট্র পরিচালনা, উন্নয়ন, শহর স্থাপন প্রভৃতি ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। ইউরোপীয় সরকারগুলো সব সময়ই উসমানীদের ভয়ে ভীত সন্ত্রস- অবস্থায় ছিল।
ইরানে সাফাভী রাজবংশের পত্তন ঘটায় এবং শিয়া মাজহাবকে সরকারী মাজহাব বলে ঘোষণা দেয় এবং ইউরোপীয় সরকারগুলো, বিশেষ করে বৃটেনের প্রকাশ্য ও গোপন চক্রানে-  ইরান ও উসমানীদের ভেতর দু’শ বছর মেয়াদী বহু রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ অব্যাহত থাকে। উসমানীদের সাথে সন্ধি করার পর ইউরোপ যখন জ্ঞান্তবিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক (রেঁনেসা) আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠিক তখনি ইসলামী জাহানে বিশাল ও গভীর ফাটল সৃষ্টি হয় এবং মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ্য দীর্ঘ ধ্বংসাত্মক যুদ্ধে নষ্ট হয়ে যায়। মুসলমানরা ইসলামী সভ্যতা প্রতিরক্ষা করার বদলে অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ও মাজহাবী হিংসা-বিদ্বেষে মত্ত হয়। চলবে.............

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)