আল হাসানাইন (আ.)

সর্বশেষ ধর্মীয় ঐক্য (শেষ পর্ব)

0 বিভিন্ন মতামত 00.0 / 5

মূল আরবী থেকে মো. মুনীর হোসেন খান কর্তৃক অনূদিত

আয়াতুল্লাহ্ মুহাম্মদ বাকির আল হাকীম ছিলেন সমকালীন বিশ্বের সংগ্রামী আলেম সমাজের অন্যতম পুরোধা। তিনি ছিলেন ইরাকের অবিসংবাদিত নেতা। তিনি ১৯৩৯ সালে ইরাকের পবিত্র নাজাফ নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আয়াতুল্লাহ্ মুহসিন আল হাকীম ছিলেন অতি উচ্চ পর্যায়ের আলেম এবং তাঁর জীবদ্দশায় একক মারজা-ই তাকলীদ। হাকীম পরিবার ইরাকের অন্যতম প্রতিষ্ঠিত ও প্রভাবশালী ধর্মীয় পরিবার-যাঁদের ইসলামী জ্ঞান সাধনা এবং ইরাকের মুসলমানদের দিকনির্দেশনা দানের ক্ষেত্রে অনস্বীকার্য ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। শুধু তাই নয়,আল হাকীম পরিবার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইরাকের জাতীয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনেও পদাচারণা ও যথাযথ অবদান রেখেছে এবং রাখছে।

আয়াতুল্লাহ্ মুহাম্মদ বাকির আল হাকীম পবিত্র নাজাফেই তাঁর সকল শিক্ষা ও উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা সমাপ্ত করেন। এরপর তিনি সেখানে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। তিনি তাঁর পিতার জীবদ্দশায় তাঁর ধর্মীয়,সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সহকারীর দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সমসাময়িক কালে ইরাকের ইসলামী গণআন্দোলন ও সংগ্রামের পথিকৃৎ ও অগ্রনায়ক শহীদ আয়াতুল্লাহ্ মুহাম্মদ বাকির আস সাদরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।

ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে আয়াতুল্লাহ্ মুহাম্মদ বাকির আল হাকীম ১৯৭২ সালে সাদ্দাম সরকার কর্তৃক গ্রেফতার হন এবং বেশ কিছু দিন কারাভোগের পর জনগণের চাপের মুখে তাঁকে ছেড়ে দেয়া হয়। ১৯৭৭ সালে সাদ্দাম জান্তা কর্তৃক পুনরায় তিনি কারারুদ্ধ ও নির্যাতনের শিকার হন। এরপর জেল থেকে ছাড়া পেলে তিনি আয়াতুল্লাহ্ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আস সাদরের নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে ইরাকী জনগণের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। সাদ্দাম কর্তৃক গণঅভ্যুত্থান দমন এবং আয়াতুল্লাহ্ শহীদ মুহাম্মদ বাকির আস সাদরের গ্রেফতারের পর তিনি ইরাকে অবস্থান করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৯৮০ সালের এপ্রিল মাসে সাদ্দাম আয়াতুল্লাহ্ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আস সাদরকে কাপুরুষোচিতভাবে শহীদ করে। আয়াতুল্লাহ্ বাকির আল হাকীম ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরু হওয়ার কিছুদিনের মধ্যে বাধ্য হয়ে ইরানে হিজরত করেন। তিনি ‘আল-মজলিসুল্ আ’লা লিস্ সাওরাতিল্ ইসলামিয়াহ্ ফীল ইরাক বা Supreme Assembly of the Islamic Revolution in Iraq (SAIRI) গঠন করে ইরাকে একটি ইসলামী রাষ্ট্র ও সরকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য সাদ্দাম ও বাথ পাটির বিরুদ্ধে সগ্রাম শুরু করেন।

আয়াতুল্লাহ্ বাকির আল হাকীমের সুযোগ্য নেতৃত্বে আজ SAIRI ইরাকের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও সর্ববৃহৎ রাজনৈতিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে যা আমেরিকাসহ সকলেই এক বাক্যে স্বীকার করে। সে সাথে আয়াতুল্লাহ্ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আত্ তাবাতাবাঈ আল হাকীমও ইরাকের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক ধর্মীয় নেতা হিসেবে ইরাকী জনগণের মাঝে স্থান করে নিয়েছেন। এর প্রমাণ দীর্ঘ ২৩ বছর নির্বাসনে কাটিয়ে দেশে ফিরলে বসরা,কুফা,নাজাফ,কারবালা,নাসিরিয়া ও বাগদাদে তাঁকে প্রদত্ত লাখো জনতার উষ্ণ সম্বর্ধনা এবং তাঁর শাহাদাতের পর তাঁর স্মরণে কারবালা,নাজাফ,বাগদাদ,কাযিমাইন,নাসিরিয়াসহ ইরাকে ব্যাপক গণমাতম,লাখ লাখ জনতার মিছিল ও নাজাফের উদ্দেশে তাঁর জানাযার নামায ও দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে লাখো শোকার্ত নর-নারীর পদব্রজে যাত্রা।

তিনি দেশে ফিরে ইঙ্গ-মার্কিন দখলদার বাহিনীকে সে দেশ থেকে চলে যেতে এবং দেশের ক্ষমতা ও শাসনভার ইরাকীদের হাতে তুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি নাজাফে ইমাম আলী মসজিদের জুমআ নামাযের ইমামতি করতেন এবং জুমআ নামাযের খুতবাগুলোতে প্রতিনিয়ত সাদ্দাম ও বাথ পার্টির অপকর্ম এবং ইঙ্গ-মার্কিন দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখতেন এবং আপামর ইরাকী জনতার ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করতেন। আল হাকীম ইমাম খোমেইনী (রহ.) ও শহীদ আয়াতুল্লাহ্ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আস সাদরের বৈপ্লবিক আদর্শ ও চিন্তাধারার যোগ্য উত্তরসূরি হওয়ার কারণে তিনি বিশ্ব শয়তানী চক্রের মাথা ব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ান। এরই ফলশ্রুতিতে ২০০৩ সালের আগস্ট মাসে নাজাফে ইমাম আলী মসজিদে জুমআর নামাজ আদায়ের পর বেরিয়ে আসার পথে মসজিদ চত্বরেই তাঁকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়।

আল হাকীম পরিবারের আত্মত্যাগ এই প্রথম নয়। ১৯৮৩ সালে সাদ্দাম-জান্তা হাকীম পরিবারের ১২৫ জনকে গ্রেফতার করে। এর পরই তাঁদের মধ্য থেকে ১৮ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁর ভাই সাইয়্যেদ মাহ্দী আল হাকীমকে ১৯৮৮ সালের জানুয়ারীতে সাদ্দামের গুপ্তঘাতক এজেন্টরা হত্যা করে। এতদসত্ত্বেও তিনি সাদ্দাম ও বাথ পার্টিবিরোধী তৎপরতা চালিয়ে যান।

শহীদ আয়াতুল্লাহ্ সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকির আল হাকীম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি বিভিন্ন ইসলামী সংস্থা ও সংগঠনে একজন অগ্রণী সদস্য ছিলেন।

তিনি ইসলামী ঐক্য অর্থাৎ শিয়া-সুন্নী মাজহাবের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার সক্রিয় উদ্যোক্তা ছিলেন। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্যপ্রয়াসী সংস্থা ‘মাজমায়ে দারুত তাকরীব’-এর চেয়ারম্যান। তেহরানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য কনফারেন্সে ‘মুসলিম ঐক্য ও সংহতি’ বিষয়ক তাঁর প্রদত্ত ভাষণ ও বক্তব্যগুলো খুবই তাৎপর্যমণ্ডিত। এ ক্ষেত্রে তিনি প্রশংসাযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন। ঐক্য বিষয়ক তাঁর বহু জ্ঞানগর্ভমূলক প্রবন্ধও রয়েছে। তিনি ইসলামী ও রাজনৈতিক চিন্তাধারা বিষয়ক বহু গ্রন্থ রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থের মধ্যে বেশ কিছু সংখ্যক ইরান ও ইরাকের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে পড়ানো হয়।

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)

দ্বিতীয় উপাদান : তাওহীদী মূল্যবোধ ও নীতিমালা

এটি কোন গোপনীয় বিষয় নয় যে,তাওহীদী মূলনীতি ও মূল্যবোধ এবং ঐশ্বরিক চারিত্রিক নীতিমালা এমন এক মৌলিক সূত্র প্রণয়ন করে যার ওপর মানব সমাজ ইসলামী রিসালতে বিশ্বাস স্থাপনের পরই প্রতিষ্ঠিত হবে। এ কারণেই পবিত্র কোরআনের বেশ কিছু স্থানে পরিশুদ্ধকরণ ও পবিত্রকরণ সংক্রান্ত আলোচনার অবতারণা করা হয়েছে। যেমন :

خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِم بِهَا

“তাদের ধন-সম্পদ থেকে আপনি সাদাকাহ্ আদায় করুন যার মাধ্যমে আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন...।” (সূরা তাওবাহ্ : ১০৩)

আর গ্রন্থ (কিতাব) ও প্রজ্ঞা (হিকমত) শিক্ষা দেয়ার বিষয়টিও বর্ণিত হয়েছে। যেমন :   

هُوَ الَّذِي بَعَثَ فِي الْأُمِّيِّينَ رَسُولًا مِّنْهُمْ يَتْلُو عَلَيْهِمْ آيَاتِهِ وَيُزَكِّيهِمْ وَيُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَإِن كَانُوا مِن قَبْلُ لَفِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ

“তিনিই (মহান আল্লাহ্) উম্মীদের (নিরক্ষর জনপদ বা পবিত্র মক্কা নগরীর অধিবাসীদের) মধ্য থেকে তাদের মাঝেই একজন রাসূলকে প্রেরণ করেছেন যিনি তাদের কাছে মহান আল্লাহর আয়াতসমূহ পাঠ করবেন,তাদেরকে পরিশুদ্ধ করবেন এবং তাদেরকে কিতাব (আল কোরআন) ও প্রজ্ঞা (হিকমত) শিক্ষা দেবেন;আর এর আগে তারা স্পষ্ট পথভ্রষ্টতা ও গোমরাহীর মধ্যে আপতিত ছিল।” (সূরা জুমআ :২)

এ আয়াতটিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে,পরিশুদ্ধির পরপরই কিতাব শিক্ষা দেয়ার পাশাপাশি প্রজ্ঞা শিক্ষা দেয়ার বিষয়টিও এসেছে। আর প্রজ্ঞার অন্যতম স্পষ্ট নিদর্শন হচ্ছে আখলাক (নৈতিক চরিত্র)। মহানবী (সা.)-এর নিকট থেকে বর্ণিত হয়েছে :

 إنّما بعثت لإتمّم مکارم الأخلاق

“নিশ্চয়ই আমি উত্তম নৈতিক চরিত্রের পূর্ণতা বিধান করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।” উত্তম নৈতিক চরিত্রের মাধ্যমেই কেবল মানুষের পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতা অর্জিত হয়। এ নৈতিক চরিত্রই শরীয়তের মূলভিত্তি এতদর্থে যে,ঠিক যেমনি তা শরীয়তের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য,শরীয়তের দ্বারা যার বাস্তবায়নই হচ্ছে একান্ত কাম্য ঠিক তেমনি তা শরীয়তের অগ্রযাত্রার উৎপত্তিস্থলও বটে।

ইসলামী রিসালত স্পষ্টভাবে এ বিষয়টির (নৈতিক চরিত্র) ওপর যে গুরুত্ব আরোপ করেছে তা দ্বারা এ রিসালতটি অন্য (পূর্ববর্তী) সকল আসমানী রিসালত থেকে স্বতন্ত্র ও স্বকীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। কারণ ধর্ম বিষয়ক মতবিরোধের অন্যতম বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে ধর্মীয় সম্প্রদায়সমূহের নৈতিক-চারিত্রিক স্খলন ও বিশৃঙ্খলা। আর এ বিষয়টি আমরা ধর্ম বিষয়ক মতপার্থক্য ও বিভেদ সংক্রান্ত আলোচনা থেকে জেনেছি।

নিম্নোক্ত মূল্যবোধ ও মূলনীতিসমূহের ওপর গুরুত্ব আরোপের মধ্যে আমরা ইসলাম কর্তৃক নৈতিক চরিত্র ও মূল্যবোধসমূহের ওপর গুরুত্ব আরোপের বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি :

১. মহান আল্লাহর ইবাদত : আর সমুদয় খুঁটিনাটি দিকসহ মানব জীবন ও মানবীয় আচার-আচরণকে এ ইবাদত-বন্দেগীর ব্যাখ্যায় রূপান্তর ও ব্যবহার এবং ইবাদতের মধ্যে নৈকট্য লাভের সংকল্প ও ইচ্ছা অন্তর্ভুক্ত করা।

অধিকন্তু ইবাদতের খাঁটি নিদর্শন এবং এর সর্বসাধারণ রীতিনীতিসমূহের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত ও নিষ্ঠার পরাকাষ্ঠা ইসলাম প্রদর্শন করেছে তার কোন নজীর আমরা অন্য কোন রিসালত ও ধর্মে খুঁজে পাই না।

সকল সৃষ্টিজগত-ই যে মহান আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগী করে এবং আসমানসমূহ ও জমিন এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সেগুলো সবই যে মহান আল্লাহর তাসবীহ্ পাঠ করছে এতদসংক্রান্ত যে দৃশ্যটি পবিত্র কোরআন চিত্রিত ও রচনা করেছে তা এখানে উল্লেখ করা যায়। মহান আল্লাহ্ বলেছেন,

تُسَبِّحُ لَهُ السَّمَاوَاتُ السَّبْعُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ وَإِن مِّن شَيْءٍ إِلَّا يُسَبِّحُ بِحَمْدِهِ وَلَـٰكِن لَّا تَفْقَهُونَ تَسْبِيحَهُمْ إِنَّهُ كَانَ حَلِيمًا غَفُورًا

“সপ্ত আকাশ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে সবই তাঁর (মহান আল্লাহর) প্রশংসা ও তাসবীহ্ পাঠ করে। এমন কোন বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসার দ্বারা তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে না। তবে তোমরা তাদের তাসবীহ্ পাঠ বুঝতে পার না। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত সহিষ্ণু ও অত্যন্ত ক্ষমাশীল।” (সূরা ইসরা : ৪৪)

এ ইবাদত হচ্ছে মহান আল্লাহর আখলাক (বৈশিষ্ট্য ও গুণ) দ্বারা চরিত্রবান হওয়ার প্রতি মানুষের আত্মিক ঝোঁক ও প্রবণতা (মহান আল্লাহ্ই নিরঙ্কুশ পরম সর্বোচ্চ আদর্শিক ও নৈতিক নমূনা) এবং তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তন যা সার্বক্ষণিক,ব্যাপক ও স্থায়ী গতিসম্পন্ন। আর এ গতিতেই মানুষ তার জীবনের সমুদয় খুঁটিনাটি দিকসহ ও প্রতিনিয়ত তার সমুদয় কর্মতৎপরতা প্রদর্শন করেছে।

২. তাকওয়া : শরীয়তের পথে দৃঢ়পদ থাকা এবং মহান আল্লাহ্ যা নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন ও যা তিনি নিষেধ করেছেন তা থেকে বিরত থাকার জন্য মানুষের অভ্যন্তরীণ (আত্মিক) রক্ষাকারী শক্তির গঠনের বিকাশ এবং তা শক্তিশালী ও দৃঢ়ীকরণের উৎস হচ্ছে এই তাকওয়া। তাকওয়া-পরহেজগারীর ক্ষেত্রে মানুষকে মহান আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আর মহান আল্লাহ্ সকল গুপ্ত বিষয় ও রহস্য সম্পর্কে জ্ঞাত। আবার কখনো কখনো তাকওয়াকে ‘আদালত’(ন্যায়পরায়ণতা) বলেও অভিহিত করা হয়। আর আমরা যা উল্লেখ করেছি তদনুযায়ী এ আদালতই হচ্ছে মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচরণ সংক্রান্ত অন্যতম কার্যকরী জামানত (নিশ্চয়তা)।

এখানে পরিমাণগত দিক এবং সকল অবস্থা ও উপলক্ষে তা উল্লেখ করার দিক থেকেই হোক বা গুরুত্ব ও এর যে সব ফলাফল ও প্রভাব অর্জিত হয় সে দিক থেকেই হোক না কেন পবিত্র কোরআন ও মহানবীর সুন্নায় সর্বোচ্চ মাত্রা ও পরিসরে এ তাকওয়া-পরহেজগারী এবং ন্যায়পরায়ণতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে এবং বিধৃত হয়েছে : إنّ خیر الزاد التّقوی “সর্বোৎকৃষ্ট পাথেয়ই হচ্ছে তাকাওয়া।”

আর তাকওয়া ঐক্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। কারণ তা এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর জন্য। তাই এটি হচ্ছে কেবল এক দিক ও মাত্রাবিশিষ্ট।

৩. কর্ম সম্পাদন করার সংকল্প ও মানবীয় ইচ্ছাশক্তি দৃঢ়ীকরণ : আর প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে জিহাদের (জিহাদে আকবর) মাধ্যমে তা বাস্তবায়ন করতে হয়। এই জিহাদে আকবর (সবচেয়ে বড় জিহাদ) মানুষকে যেমন বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ চাপ ও তাড়না,যেমন রিপুর কামনা-বাসনা,ঝোঁক এবং প্রবৃত্তির অবাধ্যতা ইত্যাদি মোকাবিলা করতে সক্ষম করে ঠিক একইভাবে তা মানুষকে বিভিন্ন ধরনের বহিস্থ চাপ,যেমন সন্ত্রাস,ভয়-ভীতি এবং অত্যাচারী-সীমালঙ্ঘনকারীদের পক্ষ থেকে পরিচালিত দমননীতি মোকাবিলা করতেও সক্ষম ও পারদর্শী করে গড়ে তোলে।

অধিকন্তু কঠিন ও দীর্ঘ মেয়াদী কর্মসমূহ সম্পাদনের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও সামাজিক পরিবর্তনাদি স্বভাবত দ্রুত ও তাৎক্ষণিকভাবে অর্জিত হয় না;বরং তা ধীরে ধীরে আপেক্ষিকভাবে দীর্ঘ সময় ধরে বাস্তবায়িত হয়।

আর দু’টি দিক থেকে বড় বড় সামাজিক লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং ফলাফল বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানবীয় ইচ্ছাশক্তি দৃঢ়ীকরণের উৎস ও ভিত্তি তাকওয়ার ভিত্তি ও উৎসের সাথেই পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয় :

এ দু’টি দিকের একটি : ইচ্ছাশক্তি,তাকওয়া বাস্তবায়ন এবং সে সাথে শারয়ী বিধি-বিধান অর্থাৎ মহান আল্লাহর আদেশ ও নিষেধসমূহ পালন করার নিশ্চয়তা প্রদান করে।

দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে যে,তাকওয়া ও ঐশ্বরিক তাশরীয়ী ইচ্ছার সাথে মানুষের ইচ্ছাশক্তির সামঞ্জস্যশীলতা মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মতৎপরতা ও গতিময়তার পাশাপাশি মানুষের পারিপার্শ্বিক জগৎ ঐশ্বরিক সাহায্য ও বিজয়ের আগমন এবং ফেরেশতা ও আকাশসমূহ ও পৃথিবীর সেনাদলের অবতরণের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। আর এ বিষয়টি পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতেও স্পষ্ট বর্ণিত হয়েছে। যেমন মহান আল্লাহ্ বলেছেন,

وَلَوْ أَنَّ أَهْلَ الْقُرَىٰ آمَنُوا وَاتَّقَوْا لَفَتَحْنَا عَلَيْهِم بَرَكَاتٍ مِّنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ وَلَـٰكِن كَذَّبُوا فَأَخَذْنَاهُم بِمَا كَانُوا يَكْسِبُونَ

“আর যদি গ্রামসমূহের অধিবাসিগণ ঈমান আনত এবং তাকওয়া বা পরহেজগারী অবলম্বন করত তাহলে আমরা তাদের ওপর আকাশ ও পৃথিবীর বরকতসমূহ উন্মুক্ত করে দিতাম;কিন্তু তারা প্রত্যাখ্যান করল। তাই তারা যা অর্জন করেছিল সেজন্য আমরা তাদেরকে পাকড়াও করলাম।”-(সূরা আরাফ : ৯৬)

আর এভাবেই বিভিন্ন ঝোঁক ও প্রবণতাসমন্বিত মানবীয় ইচ্ছাশক্তি যা সাধারণত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের উদ্ভব ঘটায় তা তখনই তাওহীদ অর্থাৎ একত্ববাদে মানুষের বিশ্বাসেরও অন্যতম কারণ হবে যখন তা মহান আল্লাহর তাশরীয়ী ইচ্ছার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল হবে।

আর পবিত্র কোরআনের অগণিত আয়াত এবং মহানবী (সা.) ও ইমামদের অসংখ্য রেওয়ায়েতে এ মূলনীতিটির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। ধৈর্য,দৃঢ় সংকল্প ও সিদ্ধান্ত,স্থিরতা,অবিচলতা এবং জিহাদ... ইত্যাদি সম্পর্কেও সেখানে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।

৪. বিদ্যা,তত্ত্বজ্ঞান ও পরিচিতি এবং বিবেক : যা মহান আল্লাহ্ (শ্রেষ্ঠ আদর্শিক নমুনা),এক-অদ্বিতীয় (অভিন্ন) ঐশ্বরিক বিধি-বিধান,এক-অদ্বিতীয় শারয়ী পদক্ষেপ ও নীতি অবস্থান এবং (মানব জাতির) প্রকৃত কল্যাণ ও অকল্যাণসমূহ শনাক্তকরণ এবং এগুলোর (কল্যাণ ও অকল্যাণের) মধ্যে যথার্থ তুলনা এবং হতবিহ্বলতা,পথভ্রষ্টতা,বিচ্যুতি ও মতভেদ থেকে মানব জাতিকে রক্ষা করার পথ প্রদর্শন করে।

৫. প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকার পালন : আর এ বিষয়টি মানুষের মধ্যে মহান আল্লাহ্,প্রকৃতিজগৎ এবং মানব জাতির প্রতি ঐ সব ‘প্রাথমিক অঙ্গীকার ও বাধ্যবাধকতা’র অবকাঠামোর আওতায় ‘দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ’-এর উন্মেষ ঘটায় যেগুলোর প্রতি মানুষ মহান আল্লাহ্,তাঁর রাসূল ও উলূল আমরের (আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল কর্তৃক নিযুক্ত বৈধ কর্তৃপক্ষ) আনুগত্য ওয়াজিব হওয়ার মাধ্যমে অঙ্গীকারবদ্ধ,নিবিষ্ট ও নিবেদিত হয়ে থাকে এবং যেগুলো সে মেনে চলে ও রক্ষা করে। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের অঙ্গীকার ও বাধ্যবাধকতাসমূহের (অবকাঠামোর) ক্ষেত্রেও ঠিক একই কথা প্রযোজ্য। আর মানুষ প্রতিজ্ঞা,অঙ্গীকার,চুক্তি ও এক তরফা চুক্তির মাধ্যমে এগুলো (দ্বিতীয় পর্যায়ের অঙ্গীকার ও বাধ্যবাধকতা) নিজের ওপর বাধ্যতামূলক করে নেয়। মানুষ এমনভাবে এ সব কিছু সম্পাদন করে থাকে যে,এর ফলে সে তার ব্যক্তিগত ও সমাজ জীবনে তার বিভিন্ন সম্পর্ককে নিয়মিত,সুশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। আর এভাবে মানব সমাজে বৃহত্তর সার্বিক ঐক্য ও সাম্যঞ্জস্যশীলতা বাস্তবায়িত হয়।

এই নিষ্ঠা এবং প্রতিজ্ঞা ও অঙ্গীকার পূরণ যদিও তা মানুষের ইচ্ছাশক্তির সুষ্ঠু প্রশিক্ষণ ও দৃঢ়ীকরণের অন্যতম উপকরণমাত্র তবুও তা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়। তাই পবিত্র কোরআন ও ইসলাম ধর্ম ‘ধর্মে মতভেদ ও মতবিরোধ’-এর পর্যায়ে সামাজিক ঐক্যের ভারসাম্যে সৃষ্ট বিঘ্ন ও ত্রুটি প্রতিকার করার জন্য এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছে। তাই এ ক্ষেত্রে ঐশ্বরিক প্রতিশ্রুতি ও অঙ্গীকার পালনের পাশাপাশি এ সামঞ্জস্যশীলতা ও ঐক্য বাস্তবায়িত হয়।

এ জন্য আমরা বনি ইসরাঈলের প্রতি ইতিবাচক ও নেতিবাচকভাবে এ বিষয়ে (প্রতিশ্রুতি পালনের ব্যাপারে) গুরুত্ব আরোপকারী ঐশী সম্বোধন প্রত্যক্ষ করি। আর বনি ইসরাঈল হচ্ছে ধর্মে মতভেদ ও মতবিরোধ পর্যায়ের সর্বোৎকৃষ্ট বাস্তব নমুনা।

ঠিক একইভাবে ঐ ইতিবাচক ও নেতিবাচকভাবে গুরুত্ব আরোপকারী সম্বোধন বিভিন্ন ধরনের মানবীয় ইচ্ছাশক্তির মধ্যকার পারস্পরিক দ্বন্দ্বকালীন সামাজিক ঐক্যের ভারসাম্যে সৃষ্ট বিঘ্নের প্রতিকার করে যার ফলে মানুষের মধ্যে অথবা উলূল আমর-এর সাথে কৃত অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি পালন করার মাধ্যমেও এ ঐক্য,সামঞ্জস্যশীলতা ও সংহতি বাস্তবায়িত হয়।

৬. সত্য ও ন্যায়পরায়ণতার মূলনীতি : যা ইসলাম ধর্মের বিধি-বিধানসমূহের মৌলিক দু’টি স্তম্ভ বা খুঁটি। কারণ এ সব বিধান সমুদয় বিস্তারিত ও খুঁটি-নাটি দিকসমেত ‘সত্য’ও ‘ন্যায়পরয়ণতা’র-ই অনুগামী।

আর এভাবে ইসলাম ধর্ম ঐক্যের এ দিকটিতে কাঙ্ক্ষিত পূর্ণতা ও ভারসাম্য সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। তাই ইসলাম কোন মূল্যবোধ,নীতিমালা ও আদর্শকে অস্পষ্টতা ও দুর্বোধ্যতার দোষে দুষ্ট হতে দেয়নি;বরং এগুলোকে বিভিন্ন নির্দিষ্ট ফর্মুলা বা ছকে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছে। আর এ সব ফর্মুলা-ই হচ্ছে শরীয়ত যা উপরোল্লিখিত মূল্যবোধ,নীতিমালা ও আদর্শের দিকে পরিচালিত করে। ঠিক যেমন ইসলামী শরীয়তকে কতগুলো বন্ধা অকার্যকর সীমা-পরিসীমা,ছক এবং ইস্পাৎ-কঠিন শর্তের নিগঢ়ে বেঁধে দেয়া হয়নি বরং তা সমুদয় মূল্যবোধ ও নীতিমালা ব্যাখ্যা করেছে মাত্র,তাই যাবতীয় মূল্যবোধ ও নীতিমালা এমন সব মাত্রা ও দিক সম্পন্ন হয়েছে যেগুলো এ সব শারয়ী ছকের গতিপথ স্পষ্ট করে ব্যক্ত ও ব্যাখ্যা করে। আর সে সাথে এ সব মূল্যবোধ ও মূলনীতির দিক ও মাত্রার সাথে শরীয়তের অনুগামিতা কেমন হবে সেটিও স্পষ্ট ও পরিষ্কার হয়ে যায়।

তাই ইসলামী শরীয়ত জীবন ও মূল্যবোধসমূহের একটি একক সুশৃঙ্খল ছক ও কাঠামো গঠন করার মাধ্যমে মানব জীবনে মূল্যবোধসমূহের ভূমিকাকে পূর্ণতা প্রদান করে। আবার এই মূল্যবোধগুলো শরীয়তের গতিপথ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে সকল যুগে ও সকল ক্ষেত্রে সৃষ্ট মতভেদ ও বিরোধের অবসান করার জন্য শরীয়তকে পর্যাপ্ত নমনীয়তা ও কমনীয়তা প্রদান করে।

তৃতীয় উপাদান : এক-অদ্বিতীয় ঐশ্বরিক শরীয়ত

আমরা দেখতে পাই যে,ঐশ্বরিক রিসালত ও ধর্মসমূহ এবং এগুলোর মধ্যে সর্বশেষ ধর্ম ও রিসালত বিধি-বিধান ও আইন প্রণয়নের ব্যাপারে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। তবে সর্বশেষ রিসালতের (ইসলাম ধর্ম) ক্ষেত্রে এ গুরুত্ব ও মনোযোগ সবচেয়ে ব্যাপক ও সবচেয়ে স্পষ্ট। আর এটি নিঃসন্দেহে সমগ্র মানব জাতির ঐক্য বাস্তবায়ন এবং এ পর্যায়ে মূল্যবোধসমূহের পদদলিত ও লঙ্ঘিত (হওয়া) এবং এগুলো ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রে মতভেদ ও পার্থক্য সৃষ্টি হওয়ার কারণে মানব সমাজ যে মতবিরোধ ও অনৈক্যের শিকার হয়েছে তা প্রতিকার ও নিরসন করার জন্যই। মানুষের সমুদয় কর্মকাণ্ড,প্রকৃতিজগৎ ও স্বজাতির সাথে তার সকল সম্পর্ক নিয়মিত ও সুশৃঙ্খলকারী শরীয়তসহ ঐশী প্রত্যাদেশ অবতীর্ণ হয়েছে। ঠিক তদ্রূপ মানুষের কর্মকাণ্ড ও অগ্রগতির পথে যে সব সমস্যা ও মতভেদ,অনৈক্য ও বিরোধের উদ্ভব হয় সেগুলোও এ শরীয়ত সমাধান করে দেয়।

তবে বেশ কতগুলো মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দ্বারা ইসলামী শরীয়ত (অন্য সকল আসমানী শরীয়ত থেকে) স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ও শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছে :

প্রথম বৈশিষ্ট্য : ইসলামী শরীয়তে বিদ্যমান স্বচ্ছতা : ইসলাম ধর্মে বিভিন্ন আইন ও বিধি প্রণয়ন প্রক্রিয়া এমন কতিপয় প্রধান উপাদান ও কারণের সাথে সম্পর্কিত হয়েছে যেগুলো এ ধর্মকে এ স্বচ্ছতা প্রদান করেছে। এগুলো নিম্নরূপ :

ক. প্রথম উপাদান : স্বয়ং মহানবী (সা.) কর্তৃক প্রদত্ত ইসলামী আইন ও বিধি-বিধান সংক্রান্ত ব্যাখ্যা ও বিবরণ। মহানবী (সা.) ইসলামী শরীয়তের অনুশাসন,বিধি-বিধান এবং আইন-কানুন জনগণের সামনে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করার জন্য ধর্মে গভীর বুৎপত্তিসম্পন্ন আলেম ও প্রচারক শ্রেণী গঠন করেছিলেন। আর এ বিষয়টির দিকে পবিত্র কোরআনেও ইঙ্গিত প্রদান করে বলা হয়েছে :

وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِن كُلِّ فِرْقَةٍ مِّنْهُمْ طَائِفَةٌ لِّيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ

“সকল মুমিনের (নিজেদের জনপদ ও ঘর-বাড়ী ছেড়ে) বের হওয়া সঙ্গত নয়। তাই তাদের প্রতিটি গোষ্ঠী ও জনপদ থেকে একটি অংশ ধর্ম সম্পর্কে গভীর বুৎপত্তি ও জ্ঞান অর্জন এবং (নিজ এলাকায়) প্রত্যাবর্তন করে নিজ নিজ সম্প্রদায়কে ভয় প্রদর্শন ও সতর্ক করার জন্য কেন বের হবে না? আশা করা যায়,তারা (সম্প্রদায়) ভয় পাবে ও সতর্ক হবে।” (সূরা তাওবা : ১২২)

খ. দ্বিতীয় উপাদান : মহানবী (সা.)-এর যুগে ইসলামী শরীয়তের বাস্তব প্রয়োগ ও এর ফলে অর্জিত প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা। মুসলিম সমাজে শারয়ী আইন-কানুন প্রয়োগ ও বলবৎ করার জন্য একটি তুলনামূলক ব্যাপক সুযোগ মহানবী (সা.) পেয়েছিলেন। ইসলামী ফিকাহ্শাস্ত্র বিভিন্ন ধরনের সমস্যা কবলিত হওয়া সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহ্ যে সব ইবাদত এবং লেন-দেনের ক্ষেত্রে একমত সেগুলো সংক্রান্ত ইসলামী ফিকাহ্শাস্ত্রের প্রচুর মূলনীতি ও সর্বসাধারণ সূত্রের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি ফিকহীভাবে আমাদের দৃষ্টিগোচর হওয়া সম্ভব।

গ. তৃতীয় উপাদান : পবিত্র কোরআন ও মহানবীর পবিত্র বংশধরের মধ্যেই বৈধ ধর্মীয় ফিকহী প্রামাণিক কর্তৃপক্ষ চিহ্নিতকরণ;আর বিদ্যা,তত্ত্বজ্ঞান ও বিচারকার্য পরিচালনা করার বিষয়টি মহানবী (সা.)-এর সাহাবীদের মধ্যে কেবল হযরত আলী (আ.)-এর সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়া;আর হযরত আলী ও তাঁর পরে তাঁর বংশধরদের মধ্যে বাস্তবরূপ পরিগ্রহকারী এ বৈধ ধর্মীয় প্রামাণিক নেতৃত্ব ও কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্টকরণ;ইসলামী শরীয়ত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ,সম্যক পরিচিতি অর্জন এবং যথার্থভাবে বোঝা ও উপলব্ধি এবং যাবতীয় সমস্যা সমাধানে তাঁদের (হযরত আলী ও তাঁর বংশধরদের) শরণাপন্ন হওয়া এবং তাঁদের দিকে রুজূ করা ব্যতীত সম্ভব নয়। (এ বিষয়টি আমাদের স্বনামধন্য আলেমগণ বিস্তারিত আলোচনা করেছেন;আর আমরাও এ বিষয়টি কিছু কিছু বক্তৃতা এবং উলূমুল কোরআন গ্রন্থের ২৫৫-২৬২ পৃষ্ঠায় আলোচনা করেছি।)

দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্য : মানব জীবনের সকল দিক ও পর্যায় ইসলামী শরীয়তের আওতাধীন হওয়া। অথচ বৈশিষ্ট্যটি পূর্ববর্তী ঐশ্বরিক রিসালত ও ধর্মসমূহে আমরা পাই না। আর ইসলামী শরীয়তের এ ব্যাপকতা ব্যতিক্রম ছাড়াই মানুষের সমুদয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক আচার-আচরণকে শামিল করে তা তার ইবাদত,লেন-দেন,পানাহার,পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান,বাসস্থান এবং তার আচার-আচরণের সকল ধরন-ধারণের ক্ষেত্রেই হোক অথবা প্রকৃতিজগৎ বা তার স্বজাতি ভাইয়ের সাথে তার সম্পর্কের ক্ষেত্রে অথবা তা বিচার,রাজনীতি,অর্থনীতি,পরিবার অথবা সমাজের যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন।

এ ব্যাপকতা বাস্তবায়িত হয়েছে নিম্নোক্ত প্রক্রিয়াসমূহের দ্বারা :

ক. দৃষ্ট অভিপ্রেত ঘটনা ও বিষয়াদির ক্ষেত্রে বিস্তারিত বিধি-বিধান বর্ণনা করা;

খ. সর্বসাধারণ সূত্র ও মূলনীতিসমূহ বর্ণনা করা;অনভিপ্রেত ঘটনা ও বিষয়াদির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে মানুষ এ সব সাধারণ মূলনীতি ও সূত্রের দিকে রুজূ করতে পারবে;

গ. শরীয়তের ওয়াজিব,হারাম,মাকরুহ,মুস্তাহাব এবং মুবাহ্ বিধি-বিধানসমূহ বর্ণনা করা;

ঘ. কল্যাণ ও স্বার্থ এবং আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছাসমূহের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের পর্যায়ে বিধি-বিধানসমূহ বর্ণনা করা এবং সর্বাধিক প্রাধান্য ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিধি-বিধান এবং ব্যতিক্রম অবস্থা ও পরিস্থিতি,যেমন ক্ষতি,কষ্ট এবং চরম ক্রান্তি ইত্যাদি বর্ণনা করা।

তৃতীয় বৈশিষ্ট্য : ইসলামী শরীয়তে বিদ্যমান নমনীয়তা-কমনীয়তা যার ফলে তা অব্যাহতভাবে টিকে থাকতে এবং মানব সমাজের সমুদয় স্থায়ী চাহিদা ও প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যমে মানব জীবনের পরিবর্তনশীল ও নবোদ্ভূত অবস্থা ও পরিবেশ-পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে সক্ষম। আর ঐ সব স্থায়ী চাহিদা ও প্রয়োজন মেটানোর জন্য (অপরিবর্তনশীল) বিধি-বিধানসমূহও প্রণয়ন করা হয়েছে। যার ফলে শরীয়তের বিধি-বিধানসমূহের বিষয়বস্তুর এ পরিবর্তন সাধন এবং এ সব বিধি-বিধান স্ব-স্ব (সংশ্লিষ্ট) কারণ ও অন্তর্নিহিত কল্যাণাদির সাথে যুক্ত করে,এ দ্বিতীয় পর্যায়ের অর্থাৎ গৌণ ও অপ্রধান (আরোপিত ব্যতিক্রমধর্মী) শিরোনামগুলো সুনির্দিষ্ট করে উপস্থাপন এবং সাধারণ সূত্র এবং শারয়ী বিধানের বিভিন্ন মাত্রা,দিক ও লক্ষ্য-উদ্দেশ্যসমূহের কাঠামোর মধ্যে উলূল আমরকে কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা প্রদান করার মাধ্যমে শরীয়তগত এ সব ধ্রুব ও পরিবর্তনশীল চাহিদা ও প্রয়োজন মেটানোর সুবন্দোবস্তও করা হয়েছে।

চতুর্থ বৈশিষ্ট্য : বাস্তবায়ন ও প্রায়োগিকতার পর্যায়ে নিশ্চয়তা (জামানত) বিধান করা। আর এটি নিম্নোক্ত উপায়ে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা যায় :

ক. জিহাদে আকবর,প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ এবং রিপুর কামনা-বাসনার ওপর আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে তাকওয়া-পরহেজগারী অর্জন এবং মহান আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়াদি থেকে বিরত থাকা এবং মানবীয় ইচ্ছাশক্তির দৃঢ়ীকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ;

খ. (মহান আল্লাহর পথে) ব্যয়,দান,ত্যাগ,আনুগত্য ও পাপ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে ধৈর্যধারণ,মহান আল্লাহ্ ও অন্যদের (মুসলিম উম্মাহর) পথে এবং উম্মাহর স্বার্থ সংরক্ষণের পথে ক্লেশ,যাতনা ও কষ্ট ভোগ করার কারণে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে (পরকালে) নেক প্রতিদানের ওপর গুরুত্ব আরোপ। মহান আল্লাহ্ বলেছেন,.

مَّن ذَا الَّذِي يُقْرِضُ اللَّـهَ قَرْضًا حَسَنًا فَيُضَاعِفَهُ لَهُ أَضْعَافًا كَثِيرَةً

“আর কে আছে যে মহান আল্লাহকে উত্তম কর্জ প্রদান করবে যার ফলে মহান আল্লাহ্ তার জন্য এর প্রতিদান বহু গুণ বৃদ্ধি করে দেবেন...?!” (সূরা বাকারা : ২৪৫)

নির্বাহী ক্ষেত্রে (প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন পর্যায়) এবং শরীয়তের সমুদয় পর্যায় ও দিক নির্দিষ্ট ও চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে এবং একইভাবে শারয়ী বিধি-বিধান ব্যাখ্যা ও উক্ত বিধানের অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা জানার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত জামানত প্রদানকারী ইসলামী মূল্যবোধ ও মূলনীতিসমূহের ওপর গুরুত্ব আরোপ।

গ. ইসলামী রাষ্ট্র ও ব্যবস্থা : আর আমরা অতি শীঘ্রই এতদ্সংক্রান্ত একটি স্বাধীন-স্বতন্ত্র আলোচনার অবতারণা করব। কারণ এটি হচ্ছে ঐক্য বাস্তবায়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌল ও উপাদান।

ঘ. স্বয়ং মুসলিম উম্মাহর পর্যবেক্ষণকারী ভূমিকা এবং একটি সর্বজনীন দায়িত্ব হিসাবে সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ সংক্রান্ত মূলনীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ;এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে,একদিকে শাসনকর্তার কর্মকাণ্ডের পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে মুসলিম উম্মাহ্ যেমন এ দায়িত্ব পালন করবে ঠিক তেমনিভাবে অন্য আরেকটি প্রেক্ষাপট থেকেও ব্যক্তি মানুষের আচার-আচরণ পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে এ দায়িত্বটি পালন করবে। আর আমরা চতুর্থ মৌল উপাদান সম্পর্কে আলোচনা করার সময় এ সংক্রান্ত আরো বিস্তারিত ব্যাখ্যার সাথে শীঘ্রই পরিচিত হব।

ঙ. জিহাদে আসগার অর্থাৎ ক্ষুদ্র জিহাদ যা কতিপয় বিশেষ নির্দিষ্ট ফিকহী ক্ষেত্র ও অবস্থায় যুদ্ধকেও শামিল করে।

ঐক্য এবং সত্য ন্যায়পরায়ণত ও সুবিচারের মূলনীতি

আমরা জেনেছি যে,সত্য ও ন্যায়পরায়ণতা ইসলামী শরীয়তের প্রকৃত তাৎপর্যের মূর্ত প্রতীক। কারণ এ দু’টি বিষয় ঠিক যেমন মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক পূর্ণতা এবং মহান আল্লাহর (সর্বোচ্চ আদর্শ ও উপমা) সান্নিধ্যে পৌঁছানোর পথ উপস্থাপন করে ঠিক তদ্রূপ এ দু’টি বিষয় মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মতৎপরতার সাথে সংশ্লিষ্ট যা কিছু আছে সেগুলোর ব্যাপারে বিদ্যমান সমুদয় ইসলামী মূল্যবোধ ও মূলনীতির সারবত্তাস্বরূপ। আমরা যাতে করে কাঙ্ক্ষিত ইসলামী ঐক্য বাস্তাবায়নের ক্ষেত্রে এ দু’টি বিষয়ের ভূমিকা স্পষ্ট করে তুলে ধরতে পারি সেজন্য এ দু’টি বিষয় নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করার প্রয়োজন আছে।

মহান আল্লাহ্ই চূড়ান্ত পরম সত্য (الحق المطق)। একমাত্র সত্য ছাড়া আর কিছুই তাঁর নিকট থেকে উৎপত্তি লাভ করে না। সমগ্র সৃষ্টিজগৎ ও জীবনের পরিক্রমণ পথে তিনিই ধ্রুব ও বাস্তব সত্য। আর তিনিই হচ্ছেন মানুষের সমুদয় চাওয়া-পাওয়া,আকাঙ্ক্ষা ও ঝোঁক-প্রবণতা থেকে স্বতন্ত্র বাস্তবতার মধ্যে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠিত এক-অদ্বিতীয় পরম সত্তা। শারয়ী বিধি-বিধানও এ সত্যটি আবিষ্কার ও উন্মোচন করতে সক্ষম-যা মানুষের সমুদয় লাভ-ক্ষতি এবং যা কিছু মানব জীবনকে সংশোধন করে এবং যা কিছু তার জীবনকে ধ্বংস করে সেগুলোর সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। তাই প্রকৃত কল্যাণ ও অকল্যাণসমূহের সাথে শরীয়তের বিধি-বিধানসমূহের পূর্ণ সামঞ্জস্যশীলতার ভিত্তিতে শারয়ী বিধি-বিধান ‘সত্য’প্রমাণের পদ্ধতি হবে। আর সে সাথে মহান আল্লাহ্ কর্তৃক প্রদত্ত শারয়ী বিধি-বিধান ও নীতিমালার সাথে মানুষের আচার-আচরণের সম্পর্কও হবে স্বয়ং মানুষের প্রকৃত স্বার্থ ও কল্যাণ বাস্তবায়নের মূল কারণ। আর পবিত্র কোরআনের বহু আয়াতে এ বাস্তব সত্য সম্পর্কে আলোচনা ও অনুসন্ধান করা হয়েছে। এ সব আয়াতের মধ্যে নিম্নোক্ত আয়াতটি নমুনাস্বরূপ উল্লেখ করা হলো :

... نَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَاكَ اللَّـهُ

“নিশ্চয়ই আমরা আপনার কাছে এ গ্রন্থটি (কোরআন) সত্যসহ অবতীর্ণ করেছি যাতে করে মহান আল্লাহ্ যা আপনাকে দেখিয়েছেন (শিখিয়েছেন) তা দিয়ে জনগণের মাঝে আপনি সুবিচার ও ফায়সালা করতে পারেন।”-(সূরা নিসা : ১০৫)

আর এটি আসলে মানুষ যা দেখে ও পছন্দ করে তদনুযায়ী নয়,বরং মহান আল্লাহ্ যে সত্যের শিক্ষা দিয়েছেন তদনুসারেই জনগণের মাঝে ফায়সালা এবং তাদের সমুদয় সম্পর্ক সুশৃঙ্খল ও সুবিন্যস্ত করার জন্যই। কারণ যা মানব জাতির ক্ষতি সাধন করে এবং তাদের উপকারে আসে না তারা তা কখনো কখনো নিজেদের জন্য পছন্দ করতে পারে। তাই এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ্ বলেছেন,.

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ

“আশা করা যায় যে,তোমরা এমন জিনিস অপছন্দ কর যা তোমাদের জন্য কল্যাণকর এবং সম্ভবত এমন জিনিস পছন্দ কর যা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর...।”-(সূরা বাকারা : ২১৬)

ঠিক এমনভাবেই পবিত্র কোরআন নিখিল বিশ্বের গতিপ্রবাহের মাঝে নিহিত এ পরম বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে বলেছে :

وَلَوِ اتَّبَعَ الْحَقُّ أَهْوَاءَهُمْ لَفَسَدَتِ السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ وَمَن فِيهِنَّ

“আর সত্য যদি তাদের প্রবৃত্তির কামনা-বাসনার আজ্ঞাবহ হতো ও অনুসরণ করত তাহলে আকাশসমূহ ও পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে তা সবাই ধ্বংস হয়ে যেত।”-(সূরা আল মুমিনুন : ৭১)

উভয় প্রকার ধরনসহ মতভেদ,মতপার্থক্য ও অনৈক্য নিরসন করার ক্ষেত্রে সত্যের ভূমিকার ওপর পবিত্র কোরআন বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। বলা হয়েছে :

كَانَ النَّاسُ أُمَّةً وَاحِدَةً فَبَعَثَ اللَّـهُ النَّبِيِّينَ مُبَشِّرِينَ وَمُنذِرِينَ وَأَنزَلَ مَعَهُمُ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ لِيَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ فِيمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ وَمَا اخْتَلَفَ فِيهِ إِلَّا الَّذِينَ أُوتُوهُ مِن بَعْدِ مَا جَاءَتْهُمُ الْبَيِّنَاتُ بَغْيًا بَيْنَهُمْ فَهَدَى اللَّـهُ الَّذِينَ آمَنُوا لِمَا اخْتَلَفُوا فِيهِ مِنَ الْحَقِّ بِإِذْنِهِ وَاللَّـهُ يَهْدِي مَن يَشَاءُ إِلَىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ

“মানব জাতি (আদিতে) এক-অভিন্ন জাতিই ছিল;অতপর মহান আল্লাহ্ নবীদেরকে সুসংবাদ দাতা ও ভয়প্রদর্শনকারী হিসাবে প্রেরণ করলেন;তাঁদের সাথে সত্যসহকারে কিতাব অবতীর্ণ করলেন যাতে করে তিনি জনগণ যে ব্যাপারে মতভেদ করেছে সে ব্যাপারে ফায়সালা করেন। আর এ ক্ষেত্রে নিজেদের মধ্যে অবাধ্যতা ও সীমা লঙ্ঘন করার জন্য ঐ সব লোক ব্যতীত আর কেউ মতপার্থক্য করেনি যাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শন ও দলিল-প্রমাণাদি আসার পর হতে যারা তা (কিতাব) প্রাপ্ত হয়েছিল;তাই মহান আল্লাহ্ যে সত্য নিয়ে মতভেদ করা হয়েছিল সে সত্যের দিকে যারা বিশ্বাস এনেছিল তাদেরকে পরিচালিত করলেন;আর মহান আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা তাকে সরল-সঠিক পথের দিকে হেদায়েত (পরিচালিত) করেন।”-(সূরা বাকারা : ২১৩)

এ আয়াতটি থেকেও স্পষ্ট হয়ে যায় যে,যে গ্রন্থ সত্য নিয়ে এসেছে তা মানব সমাজে বিদ্যমান মতপার্থক্য নিরসন করার জন্যই এসেছে চাই তা প্রাথমিক (আদি) বিরোধ অথবা ধর্মের ক্ষেত্রে বিরোধ হোক না কেন। আর এটি এ কারণে যে,প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা,ঝোঁক ও প্রবণতা এবং বিশেষ বিশেষ স্বার্থের বিপরীতে সত্য আসলেই একটি এক-অভিন্ন বিষয়। কারণ এগুলো (প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা ও প্রবণতাসমূহ) একাধিক ও ভিন্ন ধরনের। ঠিক একইভাবে এগুলো জনস্বার্থসমূহের সাথে সর্বসাধারণ পর্যায়ে খাপ খায় না। আর এ কারণেই যা কিছু সত্যের পরিপন্থি তা-ই বাতিল-যার স্থায়িত্ব নেই এবং যা অনুপযুক্ত ও অনুপকারী।

পবিত্র কোরআন ধর্মে ‘নিষিদ্ধ’মতভেদ ও অনৈক্যের বিষয়টি মিথ্যার সাথে সত্যের মিশ্রণ হিসাবে অভিহিত করেছে। মহান আল্লাহ্ বলেছেন,

وَلَا تَلْبِسُوا الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنتُمْ تَعْلَمُونَ

“তোমরা মিথ্যার সাথে সত্যের মিশ্রণ করো না এবং সত্য গোপন করো না,অথচ তোমরা তো সবাই জান।”-(সূরা বাকারা : ৪২)

ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচার

নিজ জাতির ভাইদের সাথে সকল সম্পর্ক এবং প্রকৃতিজগতের সাথে তার সমুদয় সম্পর্ক মহান আল্লাহ্ এবং তাঁর বন্দেগী করার সাথে তার সম্পর্কের অবকাঠামোর আওতায় সুশৃঙ্খল ও সুবন্যিস্ত করার জন্যই ঐশ্বরিক শরীয়তসমূহ অবতীর্ণ হয়েছে। কিন্তু এ সম্পর্ক কখনো কখনো মানব জাতির পারস্পরিক স্বার্থ এবং তাদের ইচ্ছা,আকাঙ্ক্ষা,আগ্রহ ও পছন্দসমূহের মধ্যকার অন্ত র্দ্বন্দ্ব থেকে সৃষ্ট মতপার্থক্য ও বিভেদজনিত সমস্যার সম্মুখীন হয়ে থাকে। তাই এ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য ও সাম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে ইসলামী শরীয়ত ও রিসালাতের অন্যতম বিশেষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

ন্যায়পরায়ণতার সমুদয় তাৎপর্য ও ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করার মাধ্যমে এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই পবিত্র কোরআনে এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে :

لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ

“আমরাই স্পষ্ট নিদর্শন ও দলিল-প্রমাণাদিসহ রাসূলদেরকে প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে কিতাব ও মানদণ্ড (নীতিমালা) অবতীর্ণ করেছি যাতে করে মানব জাতি ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন করে...।”-(সূরা হাদীদ : ২৫)

وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّـهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ

“আর যদি আপনি বিচার করেন তাহলে তাদের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে ফায়সালা করুন;নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণ ও সুবিচারকারীদেরকে ভালোবাসেন...।”-(সূরা মায়েদাহ্ : ৪২)

إِنَّ اللَّـهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَإِيتَاءِ ذِي الْقُرْبَىٰ وَيَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ وَالْبَغْيِﺇﹼ

“নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ ন্যায়পরায়ণতা অবলম্বন,পরোপকার সাধন এবং নিকটাত্মীয়দেরকে দান করার আদেশ দিচ্ছেন এবং অশ্লীল ও জঘণ্য কার্যকলাপ এবং অবাধ্যাচরণ করতে নিষেধ করছেন...।”-(সূরা নাহল : ২৮)

অথবা যে আইন ও বিধি-বিধান এ মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সংরক্ষণ এবং মানব সমাজে এ সাম্য প্রতিষ্ঠা ও বাস্তবায়ন করে সেই আইন ও বিধি-বিধান প্রণয়ন করার মাধ্যমে উপরিউক্ত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

ঠিক তেমনি মানব জীবনে ন্যায়পরায়ণতার ব্যাপক পরিব্যাপ্তি ও বিস্তৃতির সুষ্ঠু ব্যাখ্যা প্রদান করার মাধ্যমেও এ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তাই মানব রচিত বিধি-বিধানের মতো করে এ ক্ষেত্রে নিজ জাতির লোকদের সাথে মানুষের সম্পর্কটিকে নিছক বিবেচনা করা হয় নি,বরং মহান আল্লাহর সাথে,তার নিজের সাথে এবং প্রকৃতি জগতের সাথেও মানুষের সম্পর্কের মধ্যেও বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে যদি মানুষ কখনো কখনো মহান আল্লাহর সাথে সীমা লঙ্ঘন করে তাহলে তা নিঃসন্দেহে সবচেয়ে জঘণ্য জুলুমে পরিণত হবে। তাই পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে :

يَا بُنَيَّ لَا تُشْرِكْ بِاللَّـهِ إِنَّ الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ

“হে বৎস্য! মহান আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করো না;নিশ্চয়ই অংশীদার স্থাপন হচ্ছে সবচেয়ে জঘণ্য অন্যায় (জুলুম)।”-(সূরা লোকমান : ১৩)

আবার কখনো কখনো মানুষ নিজের প্রতিও জুলুমকারী হতে পারে যদি সে তার ব্যক্তিগত আচার-আচরণ,চলাফেরা ও কার্যকলাপের ক্ষেত্রে বেপরোয়াভাবে প্রবৃত্তির ও রিপুর তাড়নার বশবর্তী হয়ে তার প্রকৃত স্বার্থ ও কল্যাণসমূহের সীমা লঙ্ঘন করে। আবার কখনো কখনো সে তার চারপাশের প্রকৃতি ও জগতের প্রতিও জুলুমকারী হতে পারে অথবা সে তার নিজ ধন-সম্পদের প্রতি জুলুমকারী হতে পারে যদি সে তা ব্যবহার ও ভোগ করার ক্ষেত্রে সত্যের সীমা লঙ্ঘন করে। যেমন সম্পদ বিনষ্ট বা অপব্যয় করা ইত্যাদি।

যখন সামাজিক জীবনে ভারসাম্য ও ন্যায়পরায়ণতার সুষ্ঠু সংরক্ষণ অন্যদের জন্য অথবা সমাজের জন্য মানুষের প্রাণ,ধন-সম্পদ,পদমর্যাদা ও মান-সম্মান উৎসর্গের দাবি জানায় তখন পারলৌকিক জগতে এ ত্যাগ-তিতিক্ষা ও উৎসর্গের প্রতিদান প্রদানের মূলনীতির সাথে যেমন মানুষের যাবতীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য সৃষ্টি করার মূলনীতিটি পরিপূর্ণতা লাভ করে তদ্রূপ তা মানুষের যাবতীয় ব্যক্তিগত ও সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্টতার সকল সাধারণ ও বিশেষ কল্যাণ ও স্বার্থের নিশ্চয়তা বিধানকারী সত্যের (মূলনীতি) সাথেও পূর্ণতাপ্রাপ্ত হয়।

বাস্তবে প্রয়োগ ও কার্যকর করার নিশ্চয়তাসসমূহ

সমুদয় মূল্যবোধ ও মূলনীতির ক্ষেত্রে সর্বশেষ আসমানী রিসালাত ও ধর্ম (ইসলাম) স্বচ্ছতা,ব্যাপকতা ও সর্বজনীনতার অধিকারী এবং গুরুত্বপূর্ণ হওয়া ছাড়াও এ ক্ষেত্রে অর্থাৎ বাস্তবায়ন ও কার্যকরীকরণের যাবতীয় নিশ্চয়তা প্রদানের মাধ্যমে পূর্ববর্তী সকল ধর্ম ও রিসালাত হতে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লাভ করেছে। যে সব বিষয়ের মাধ্যমে এ নিশ্চয়তাসমূহ প্রদান করা হয় সেগুলো আমরা নিচে উল্লেখ করতে পারি। যথা :

প্রথম বিষয় : পবিত্র কোরআন : যা এর সমগ্র মূলপাঠসহ (Text) অবিকৃত,অক্ষত ও সংরক্ষিত রয়েছে। আর মুসলিম উম্মাহর মাঝে এ গ্রন্থের সংস্কৃতি প্রচার ও প্রসারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যার ফলে এ গ্রন্থটি পুরোহিত ও যাজক শ্রেণীর মধ্যেই কেবল সীমাবদ্ধ থাকে নি,বরং এ গ্রন্থটির বিশুদ্ধতা ও অবিকৃত না হওয়ার ওপর বিশেষ গুরুত্ব ও নিশ্চয়তা বিধান করার কারণে উম্মাহর সকল শ্রেণীর মধ্যে এ গ্রন্থটি পঠন,মুখস্তকরণ,অনুধাবন ও অধ্যয়ন ব্যাপকভাবে প্রচলিত হয়েছে যা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি।

দ্বিতীয় বিষয় : সৎ,উপযুক্ত ও অগ্রগণ্য পথপ্রদর্শকগণ : যাঁদের বিভিন্ন বাস্তব উদাহরণ ও নমুনা নিচে পেশ করা হলো :

ক. আহলে বাইত : যাঁদের থেকে মহান আল্লাহ্ সব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা দূর করে দিয়েছেন এবং যাঁদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করে দিয়েছেন। যাঁরা ছিলেন এ সব মূল্যবোধ ও মূলনীতিসমূহের পূর্ণাঙ্গ বাস্তব রূপায়ন।

إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّـهُ لِيُذْهِبَ عَنكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا

“নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ্ চান হে আহলে বাইত! তোমাদের থেকে সকল পাপ-পঙ্কিলতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে পবিত্র করতে...।”-(সূরা আহযাব : ৩৩)

আর আহলে বাইতের শীর্ষে রয়েছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) যাঁকে মহান আল্লাহ্ সমগ্র মুসলিম উম্মাহর জন্য বরণীয় আদর্শ করেছেন। তাই পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে :

لَّقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّـهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّـهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّـهَ كَثِيرًا

“নিশ্চয়ই তোমরা যারা মহান আল্লাহ্ ও শেষ বিচার দিবসের প্রত্যাশা করো এবং মহান আল্লাহর অনেক অনেক স্মরণ করো,তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে সুন্দর আদর্শ।”-(সূরা আহযাব : ২১)

সর্বশেষ আসমানী রিসালাত অর্থাৎ ইসলাম ধর্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল আহলে বাইতের ওপর মহানবী (সা.)-এর গুরুত্বারোপ। আর আহলে বাইত বলতে মুসলিম উম্মাহর জীবনে ব্যবহারিক ক্রিয়াশীল (কার্যকর) নেতৃত্বের ধারাকেই বোঝানো হয়েছে। আর এটি আহলে বাইতের আরো দু’টি বৈশিষ্ট্য ও দিক অর্থাৎ নেতৃত্ব (ইমামত) ও ধর্মের বৈধ আদর্শিক কর্তৃপক্ষ হওয়া ছাড়া আরো একটি প্রধান দিক ও বৈশিষ্ট্য। আর ইতোমধ্যে আমরা তাঁদের ইমামত ও ধর্মের বৈধ কর্তৃপক্ষ হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছি।

আর এটি স্পষ্ট বিষয় যে,মানুষ তার জীবনে আহলে বাইতের মতো যে সমসাময়িক প্রাণবন্ত নেতৃত্ব প্রত্যক্ষ করছে তা মানুষ নির্দিষ্ট পদক্ষেপসমূহের মাধ্যমে যে অনুপস্থিত নেতৃত্ব ও আদর্শের কথা শুনে থাকে তার চেয়ে অধিকতর কার্যকরী প্রভাবসম্পন্ন।

খ. পূর্ববর্তী সকল নবী ও রাসূলের অনুসরণ,যেমন হযরত ইবরাহীম (আ.) অথবা তাঁর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নবিগণ। আর এ বিষয়টি পবিত্র কোরআনের নিম্নোক্ত আয়াতটিতে উল্লিখিত হয়েছে :

أُولَـٰئِكَ الَّذِينَ هَدَى اللَّـهُ فَبِهُدَاهُمُ اقْتَدِهْ قُل لَّا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرَىٰ لِلْعَالَمِينَ

“আর তাদেরকেই (নবিগণ) মহান আল্লাহ্ সুপথ প্রদর্শন করেছেন। তাই আপনি তাদের হেদায়েতের অনুসরণ করুন;আপনি বলে দিন : এ ব্যাপারে আমি তোমাদের কাছে কোন পারিশ্রমিক চাচ্ছি না;তা (আমার পারিশ্রমিক) জগতসমূহের ‘স্মরণ’ব্যতীত আর কিছুই নয়।”-(সূরা আনআম : ৯০)

এখানে দেখা যাচ্ছে যে,এ আয়াতটিতে হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পূর্ববর্তী ও পরবর্তী নবীদের অনুসরণের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে।

গ. সৎকর্মশীল অগ্রগামী মুহাজির,আনসার এবং নিষ্ঠার সাথে তাঁদের অনুসরণকারীদের মধ্য থেকে সৎকর্মশীল ব্যক্তিবর্গ,যেমন আলেমগণ,ফকীহ্-মুজতাহিদ,ইবাদতকারী ও বস্তুবাদিতা বর্জনকারী সাধকদের অনুসরণ-যাঁরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জ্ঞান ও উন্নত নৈতিক-আদর্শিক চরিত্রের অধিকারী হয়েছেন।

তৃতীয় বিষয় : অন্যান্য নিশ্চয়তা : এগুলো ইসলামী শরীয়ত বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার জন্যই প্রবর্তন করা হয়েছে। আর এগুলো আমরা আগেই উল্লেখ করেছি,যেমন মূল্যবোধ ও আদর্শিক নমুনাসমূহের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী ব্যবস্থা;আর যেমন সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজের নিষেধ,ধর্মীয় সংরক্ষণ ও প্রতিরক্ষামূলক শক্তির বিকাশ ইত্যাদি।

(সমাপ্ত)

তথ্যসূত্র:

১. মাজমাউল বায়ান,১০ : ৩৩৩;তাঁর থেকে বিহারুল আনওয়ার ১৬ : ২১০।

২. আমাদের লিখিত গ্রন্থ “সৎকর্মশীল জামায়াত নির্মাণে আহলে বাইতের ভূমিকা”-এর ২য় খণ্ডে ‘ইবাদত ও তৎসংক্রান্ত নিদর্শনাদি’সংক্রান্ত আলোচনা অধ্যয়ন করুন;এর ফলে ইসলামী ইবাদতের গভীরতা ও ব্যাপকতার একটি সংক্ষিপ্ত চিত্রের সাথে পরিচিত হওয়া যাবে।

(জ্যোতি বর্ষ ২ সংখ্যা ৩)

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)