আল হাসানাইন (আ.)

প্রাক ইসলামী যুগে আরবের অবস্থা (১ম পর্ব)

2 বিভিন্ন মতামত 03.5 / 5

ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পূর্বে আরব জাতির অবস্থা জানার জন্য নিম্নোক্ত সূত্রসমূহ ব্যবহার করা যেতে পারে :

১. তাওরাত যদিও এতে সকল ধরনের বিকৃতি রয়েছে;

২. মধ্যযুগীয় গ্রীক ও রোমান সাহিত্য ও বিবরণাদি;

৩. মুসলিম পণ্ডিত ব্যক্তিবর্গ কর্তৃক প্রণীত ইসলামের ইতিহাস;

৪. প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও খনন কার্য এবং প্রাচ্যবিদগণের গবেষণার মাধ্যমে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শনাদি। আর এগুলো সীমিত পরিসরে হলেও বেশ কিছু অজানা বিষয়ের ওপর থেকে রহস্যের জট খুলেছে।

এ সব সূত্র থাকা সত্ত্বেও আরব জাতির ইতিহাসের অনেক দিক ও বিষয় এখনো অস্পষ্ট থেকে গেছে এবং এমন এক ঐতিহাসিক ধাঁধার রূপ পরিগ্রহ করেছে যা সমাধান করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু যেহেতু ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব জাতির অবস্থা কিরূপ ছিল তা  খুব সংক্ষেপে আমরা এখানে বর্ণনা করব।

নিঃসন্দেহে আরব উপদ্বীপে সুদূর অতীতকাল থেকেই বহু গোত্র বসতি স্থাপন করেছে। এ সব গোত্রের মধ্য থেকে কতিপয় গোত্র বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহে ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে কেবল তিনটি প্রধান গোত্র অন্য সকল গোত্রের চেয়ে বেশি খ্যাতি লাভ করেছে। আর এ তিন গোত্র থেকে বহু শাখাগোত্রের উৎপত্তি হয়েছিল। এ গোত্র তিনটি হলো :

১. বায়েদাহ্ (بائدة) : বায়েদাহ্ শব্দের অর্থ ধ্বংসপ্রাপ্ত। কারণ এ গোত্র অবাধ্যতা ও পাপাচারের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মাধ্যমে নিশ্চি‎‎‎হ্ন হয়ে গেছে। সম্ভবত ধ্বংসপ্রাপ্ত গোত্রগুলো আদ ও সামুদ জাতি হয়ে থাকবে-যাদের বর্ণনা পবিত্র কোরআনে বহুবার এসেছে।

২. কাহ্তানিগণ (القحطانيون) : এরা ইয়া’রব বিন কাহ্তানের বংশধর। এরা আরব ভূখণ্ডের দক্ষিণাঞ্চল অর্থাৎ ইয়েমেনে বসবাস করত। এদেরকেই খাঁটি আরব বলা হয়। আজকের ইয়েমেনের অধিবাসীরা এবং আওস ও খাযরাজ গোত্র যারা ইসলামের আবির্ভাবের শুরুতে মদীনায় বসবাস করত তারা কাহ্তানেরই বংশধর। কাহ্তানিগণ অনেক সরকার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিল। তারা ইয়েমেনকে সমৃদ্ধশালী ও আবাদ করার ক্ষেত্রে অনেক অবদান রেখেছে। তারা বহু সভ্যতারও গোড়াপত্তন করেছিল এবং সেগুলোর নিদর্শনাদি আজও বিদ্যমান। তাদের রেখে যাওয়া প্রাচীন শিলালিপিসমূহ বৈজ্ঞানিক নীতিমালার ভিত্তিতে পাঠোদ্ধার করা হচ্ছে। এর ফলে কাহ্তানীদের ইতিহাস কিছুটা হলেও পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরব জাতির সভ্যতা সম্পর্কে যা কিছু আলোচনা করা হয় আসলে তার সবই এ কাহ্তানীদের সাথেই সংশ্লিষ্ট এবং এ সভ্যতার বিকাশস্থল হচ্ছে ইয়েমেন।

৩. আদনানিগণ (العدنانيّون) : এরা হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর বংশধর। ইসমাঈল (আ.) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পুত্র। এ গোত্রের উৎসমূল আমরা পরবর্তী আলোচনাসমূহে স্পষ্ট করে দেব। তবে উক্ত আলোচনাসমূহের সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ : পুত্র ইসমাঈলকে তাঁর মা হাজেরাসহ পবিত্র মক্কায় পুনর্বাসন করার ব্যাপারে হযরত ইবরাহীম (আ.) আদিষ্ট হন। তিনি ইসমাঈল ও তাঁর মা হাজেরাকে ফিলিস্তিন থেকে একটি গভীর উপত্যকায় নিয়ে আসলেন যা মক্কা নামে অভিহিত। এ উপত্যকা ছিল পানি ও উদ্ভিদবিহীন মরুপ্রান্তর। মহান আল্লাহ্ তাঁদের ওপর করুণা ও রহমতস্বরূপ সেখানে ‘যমযম’ ঝরনা সৃষ্টি করে তাঁদের হাতে অর্পণ করেন। ইসমাঈল (আ.) মক্কার অদূরে বসতি স্থাপনকারী জুরহুম গোত্রের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন। তিনি অনেক সন্তান-সন্ততি লাভ করেছিলেন। হযরত ইসমাঈলের এ সব বংশধরের একজন ছিলেন আদনান। কয়েকজন ঊর্ধ্বতন পিতৃপুরুষের মাধ্যমে আদনানের বংশ হযরত ইসমাঈল (আ.)-এর সাথে মিলিত হয়।

আদনানের সন্তান ও বংশধরগণ বিভিন্ন গোত্রে বিভক্ত হয়ে যায়। এ সব গোত্রের মধ্যে যে গোত্রটি সর্বাধিক খ্যাতি লাভ করেছিল তা হলো কুরাইশ গোত্র। আর বনি হাশিম ছিল কুরাইশ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত।

আরব জীবনের  চিত্র

আরবদের ঐ সকল স্বভাব-চরিত্র এবং সামাজিক রীতি-নীতি তুলে ধরাই এখানে লক্ষ্য যা ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে তাদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। এ সব রীতি-নীতির মধ্যে বেশ কিছু রীতি গোটা আরব জাতির মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। সার্বিকভাবে আরবদের সাধারণ এবং প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্য নিম্নোক্ত কয়েকটি বাক্যের মাধ্যমে বর্ণনা করা যেতে পারে :

জাহেলীয়াতের যুগে আরবগণ, বিশেষ করে আদনানের বংশধরগণ স্বভাবতঃই দানশীল ও অতিথিপরায়ণ ছিল। তারা কদাচিৎ আমানতের খিয়ানত করত। তারা প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করাকে ক্ষমার অযোগ্য পাপ বলে গণ্য করত। তারা আকীদা-বিশ্বাসের জন্য আত্মোৎসর্গ করতে কুণ্ঠাবোধ করত না। তারা স্পষ্টভাষী ছিল। তাদের মাঝে শক্তিশালী ধী ও স্মরণশক্তিসম্পন্ন এমন ব্যক্তিবর্গ ছিল যারা আরবের কবিতা এবং বক্তৃতাসমূহ কণ্ঠস্থ করে রেখেছিল। আরবগণ কাব্যচর্চা এবং বক্তৃতায় সে যুগে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করেছিল। তাদের সাহস প্রবাদে পরিণত হয়েছিল। তারা অশ্বচালনা এবং তীর নিক্ষেপে সিদ্ধহস্ত ছিল। পলায়ন এবং শত্রুর প্রতি পৃষ্ঠপ্রদর্শনকে তারা মন্দ ও গর্হিত কাজ বলে বিবেচনা করত।

এ সব গুণের পাশাপাশি অনেক চারিত্রিক দোষ তাদেরকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলেছিল যে, তাদের সব ধরনের মানবীয় পূর্ণতার দীপ্তি নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। আর অদৃশ্যলোক থেকে যদি তাদের ওপর করুণা ও দয়ার বাতায়ন উন্মুক্ত করা না হতো তাহলে নিঃসন্দেহে তাদের জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হতো। আপনারা বর্তমানে কোন আদনানী আরবের অস্তিত্বই খুঁজে পেতেন না এবং অতীতের বিলুপ্ত আরব গোত্রসমূহের কাহিনীরই পুনরাবৃত্তি হতো।

একদিকে যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ও সঠিক কৃষ্টি-সংস্কৃতির অনুপস্থিতি এবং অন্যদিকে চরিত্রহীনতা ও কুসংস্কারের ব্যাপক প্রসারের কারণে আরব জাতির জীবন মানবেতর জীবনে পরিণত হয়েছিল। ইতিহাসের পাতা আরবদের পঞ্চাশ বছর ও একশ’ বছর স্থায়ী যুদ্ধের কাহিনী ও বিবরণে পূর্ণ। এ সব যুদ্ধ তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয়েছে। বিশৃঙ্খলা ও গোলযোগ এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিদ্রোহীদেরকে দমন করতে সক্ষম কোন শক্তিশালী সরকার ও প্রশাসন না থাকার কারণে আরব জাতি যাযাবর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়েছিল। এর ফলে তারা প্রতি বছর তাদের পশু ও অশ্বসমেত মরুভূমিতে এমন সব এলাকার সন্ধানে ঘুরে বেড়াত যেখানে প্রচুর পানি ও লতাগুল্মের অস্তিত্ব আছে। এ কারণে যেখানেই তারা পানি ও বসতির নিদর্শন দেখতে পেত সেখানেই অবতরণ করে তাঁবু স্থাপন করত। আর যখনই অধিকতর উত্তম কোন স্থানের সন্ধান পেত তখনই সেখানে যাওয়ার জন্য মরুপ্রান্তর পাড়ি দিত।

তাদের এ যাযাবর জীবনের পেছনে দু’টি কারণ রয়েছে : ১. পানি, জলবায়ু-আবহাওয়া এবং চারণভূমির দিক থেকে আরবের খারাপ ও প্রতিকূল ভৌগোলিক অবস্থা এবং ২. প্রচুর রক্তপাত ও হানাহানি যা তাদেরকে ভ্রমণ ও এক জায়গা ত্যাগ করে অন্যত্র গমন করতে বাধ্য করত।

ইসলামপূর্ব আরব জাতি কি সভ্য ছিল?

‘তামাদ্দুনে ইসলাম ওয়া আরাব’ গ্রন্থের রচয়িতা জাহেলী যুগের আরব জাতির অবস্থা অধ্যয়ন ও গবেষণা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, আরবগণ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সভ্য ছিল। আরব ভূখণ্ডের বিভিন্ন স্থানে আরবদের বিদ্যমান বৃহৎ ও উঁচু ইমারতসমূহ এবং সে সময়ের সভ্য জাতিসমূহের সাথে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ক তাদের সভ্যতা ও সভ্য হওয়ার প্রমাণস্বরূপ। কারণ যে জাতি রোমান জাতির আবির্ভাবের আগে উন্নত শহর ও নগর স্থাপন করেছিল এবং বিশ্বের বড় বড় জাতির সাথে যাদের ব্যবসায়িক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল সে জাতিকে অসভ্য-বর্বর জাতি বলা যায় না।

পুনশ্চ, আরবী সাহিত্য এবং আরবদের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাষার অধিকারী হওয়া তাদের সভ্যতার শিকড় গভীরভাবে প্রোথিত হওয়ারই প্রমাণস্বরূপ। তাই লেখকের বক্তব্য : “আমরা যদি ধরেও নিই যে, আরব উপদ্বীপের প্রাচীন ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জ্ঞাত ছিলাম না, এরপরও আমরা আরব জাতির অসভ্য হওয়া সংক্রান্ত তত্ত্বটি প্রত্যাখ্যান করতে সক্ষম। একটি জাতির ভাষা সংক্রান্ত যে বিধান সে একই বিধান উক্ত জাতির সভ্যতা সম্পর্কেও প্রযোজ্য। উক্ত জাতির সভ্যতা ও ভাষা একই সাথে অস্তিত্ব লাভ করে থাকতে পারে। তবে তার ভিত্তিসমূহ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রাচীন এবং সুদূর অতীতকাল থেকে ধীরে ধীরে বিকাশ লাভ করেছে। কোন পূর্বপ্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপ ও ভূমিকা ছাড়াই সংশ্লিষ্ট সাহিত্যসহ কোন ভাষার উদ্ভব ও উন্মেষ সম্ভব নয়। অধিকন্তু সভ্য জাতিসমূহের সাথে সম্পর্ক স্থাপন একটি যোগ্যতাসম্পন্ন জাতির ক্ষেত্রে সর্বদা উন্নতি ও প্রগতির কারণ বলে গণ্য।” উপরিউক্ত লেখক ইসলামপূর্ব আরব জাতির একটি উন্নত ও সুদীর্ঘ সভ্যতা প্রমাণ করার জন্য গ্রন্থের কয়েকটি পৃষ্ঠা বরাদ্দ করেছেন। তাঁর তত্ত্ব তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। এগুলো হচ্ছে : ১. অতি উন্নত একটি ভাষার (আরবী ভাষা) অধিকারী হওয়া, ২. উন্নত দেশসমূহের সাথে সম্পর্ক স্থাপন এবং ৩. ইয়েমেনের আশ্চর্যজনক ইমারতসমূহ-যা খ্রিষ্টের জন্মের পূর্বে হেরোডোট (Herodote) ও আরটিমিডোর (Artemidor) নামীয় দু’জন প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক এবং মাসউদী ও অন্যান্য মুসলিম ঐতিহাসিক বর্ণনা করেছেন।৬

আলোচনার অবকাশ নেই যে, আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে সীমিত পরিসরে বিভিন্ন সভ্যতা ছিল। তবে লেখক যে সব দলিল-প্রমাণ তাঁর গ্রন্থে উপস্থাপন করেছেন তা থেকে প্রমাণিত হয় না যে, আরবের সর্বত্র সভ্যতা ছিল।

এটি ঠিক যে, সভ্যতার সকল নিদর্শনের সাথেই একটি ভাষার পূর্ণ বিকাশ হয়ে থাকে। তবে আরবী ভাষাকে স্বাধীন-স্বতন্ত্র এবং হিব্রু, সুরিয়ানী, আশুরী ও কালদানী ভাষার সাথে সংশ্লিষ্টহীন বলে বিশ্বাস করা যায় না। কারণ বিশেষজ্ঞদের সত্যায়ন ও সাক্ষ্য অনুসারে এ সব ভাষা এক সময় একীভূত একক ভাষা ছিল এবং একটি আদি ভাষা থেকে এগুলোর উৎপত্তি হয়েছে। এতদসত্ত্বেও ধারণা করা যায় যে, ইব্রানী (হিব্রু) অথবা অ্যাসীরীয় ভাষাসমূহের মাঝেই আরবী ভাষা পূর্ণতা লাভ করেছে। আর পূর্ণতা লাভ করার পর তা স্বাধীন-স্বতন্ত্র ভাষার রূপ পরিগ্রহ করেছে।

নিঃসন্দেহে বিশ্বের উন্নত জাতিসমূহের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রাখা উন্নতি ও সভ্যতার পরিচায়ক। কিন্তু সমগ্র আরব উপদ্বীপে কি ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল অথবা প্রধানত হিজায অঞ্চলটি কি এ ধরনের সম্পর্ক থেকে বঞ্চিত ছিল? অন্যদিকে ইরান ও রোম সাম্রাজ্যের সাথে হিজাযের দু’টি সরকার শাসিত অঞ্চলের (হীরা ও গাসসান) সম্পর্ক থেকে আরব জাতির সভ্যতার অস্তিত্ব প্রমাণিত হয় না। কারণ উক্ত সরকারদ্বয় সম্পূর্ণরূপে বিদেশী শক্তির সমর্থন ও মদদে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছিল। আজও আফ্রিকা মহাদেশের অনেক দেশই পাশ্চাত্য দেশসমূহের উপনিবেশ। কিন্তু ঐ সব দেশে প্রকৃত পাশ্চাত্য সভ্যতার কোন নিদর্শনই বিদ্যমান নেই।

তবে ইয়েমেনের সাবা ও মারিব-এর আশ্চর্যজনক সভ্যতাকে অস্বীকার করা যায় না। কারণ তাওরাতে যে বিবরণ রয়েছে তা এবং হেরোডোট ও অন্যান্য ঐতিহাসিক যা বর্ণনা করেছেন সেগুলো ছাড়াও প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক মাসউদী মারিব সম্পর্কে লিখেছেন : “সব দিক থেকে মারাব সুরম্য অট্টালিকা, ছায়াদানকারী বৃক্ষ, প্রবাহমান ঝরনা ও নদী দিয়ে পরিবেষ্টিত ছিল। আর দেশটি এত বড় ছিল যা একজন সামর্থ্যবান অশ্বারোহী এক মাসেও তা পাড়ি দিতে পারত না।

আরোহী ও পায়ে হেঁটে ভ্রমণকারী সকল পরিব্রাজক ও মুসাফির যারা এ দেশটির এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত গমন করত তাদের কেউই সূর্যালোক দেখতে পেত না। কারণ রাস্তার দু’পাশ জুড়ে থাকত ঘন ছায়াদানকারী বৃক্ষরাজি। দেশটির সবুজ-শ্যামল শস্যক্ষেত্রসমূহ এবং স্থায়ী রাজকীয় সরকার ও প্রশাসন সমগ্র বিশ্বে তখন খুবই প্রসিদ্ধ ছিল।

সংক্ষেপে এ সব দলিল-প্রমাণের অস্তিত্ব সমগ্র আরব ভূখণ্ড জুড়ে বিরাজমান সভ্যতার অস্তিত্ব প্রমাণ করে না; বিশেষ করে হিজায অঞ্চলে এ ধরনের সভ্যতার কোন অস্তিত্বই বিদ্যমান ছিল না, এমনকি গোস্তাব লোবোঁ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন : “আরব উপদ্বীপ কেবল উত্তরের সীমান্ত এলাকাসমূহ ব্যতীত সকল বৈদেশিক আক্রমণ ও জবরদখল থেকে মুক্ত থেকেছে এবং কোন ব্যক্তি সমগ্র আরব ভূখণ্ড নিজের করায়ত্তে আনতে পারেনি। পারস্য, রোম ও গ্রীসের বড় বড় দিগ্বিজয়ী যাঁরা সে যুগের সমগ্র বিশ্ব তছনছ করেছেন তাঁরা আরব উপদ্বীপের প্রতি খুব কমই দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছেন।”

যদি এ কথা স্বীকার করে নেয়া হয় যে, সমগ্র আরব উপদ্বীপব্যাপী ঐ সকল পৌরাণিক সভ্যতা বাস্তবতার নিকটবর্তী; তারপরেও অবশ্যই বলতে হয় যে, ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের সময় হিজায অঞ্চলে আসলে সভ্যতার কোন নিদর্শনই বিদ্যমান ছিল না। পবিত্র কোরআন এ বিষয়টি উল্লেখ করেছে :

و كنتم على شفا حفرة من النّار فأنقذكم منها

“হে আরব জাতি! (ইসলাম ধর্মে তোমাদের দীক্ষিত ও বিশ্বাস স্থাপনের পূর্বে) তোমরা জাহান্নামের আগুনের নিকটে ছিলে। অতঃপর মহান আল্লাহ্ তোমাদেরকে (ইসলামের মাধ্যমে) মুক্তি দিয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১০৩)

ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পূর্বে আরব জাতির অবস্থা বর্ণনা করে হযরত আলী (আ.)-এর যে সব বক্তব্য আছে সেগুলো হচ্ছে এতৎসংক্রান্ত জীবন্ত দলিল। এ সব বক্তব্য থেকে প্রমাণিত হয় যে, জীবনযাপন পদ্ধতি, চিন্তামূলক বিচ্যুতি ও নৈতিক অধঃপতনের দিক থেকে আরব জাতি অত্যন্ত দুঃখজনক অবস্থার মধ্যে ছিল। হযরত আলী তাঁর একটি ভাষণে ইসলামপূর্ব আরব জাতির অবস্থা ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছেন :

“মহান আল্লাহ্ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে বিশ্বাসীদের ভয় প্রদর্শনকারী ঐশী প্রত্যাদেশ ও গ্রন্থের (আল কোরআন) বিশ্বস্ত আমানতদার হিসাবে প্রেরণ করেছেন। হে আরবগণ! তখন তোমরা নিকৃষ্ট ধর্ম পালন ও নিকৃষ্টতম স্থানসমূহে বসবাস করতে। তোমরা প্রস্তরময় স্থান এবং বধির (মারাত্মক বিষধর) সর্পকুলের মাঝে জীবনযাপন করতে (সেগুলো এমন বিষধর সাপ ছিল যা যে কোন প্রকার শব্দে পলায়ন করত না), তোমরা নোংরা লবণাক্ত-কর্দমাক্ত পানি পান করতে, কঠিন খাদ্য (খেজুর বীজের আটা এবং গুঁইসাপ) খেতে, একে অপরের রক্ত ঝরাতে এবং নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের থেকে দূরে থাকতে। তোমাদের মধ্যে মূর্তি ও প্রতিমাপূজার ব্যাপক প্রচলন ছিল। তোমরা কুকর্ম ও পাপ থেকে বিরত থাকতে না।”

আমরা এখানে আসআদ বিন যুরারার কাহিনী উল্লেখ করব যা হিজাযের অধিবাসীদের জীবনের অনেক দিক উন্মোচন করতে সক্ষম।

মদীনায় বসবাসকারী আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে বহু বছর ধরে ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের লেলিহান শিখা প্রজ্বলিত ছিল। একদিন আসআদ বিন যুরারাহ্ নামক খাযরাজ গোত্রের একজন নেতা মক্কা গমন করল যাতে করে কুরাইশদের আর্থিক ও সামরিক সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে ১০০ বছরের পুরানো শত্রু আওস গোত্রকে পদানত করতে সক্ষম হয়। উতবাহ্ বিন রাবীয়ার সাথে তার পুরানো বন্ধুত্ব থাকার সুবাদে সে উতবার গৃহে গমন করল এবং তার কাছে নিজের মক্কা আগমনের কারণও উল্লেখ করল। সে উতবার কাছে সাহায্য চাইলে তার পুরানো বন্ধু উতবাহ্ তাকে বলল, “আমরা তোমার অনুরোধ ও আহ্বানে ইতিবাচক সাড়া দিতে পারব না। কারণ বর্তমানে আমরা এক অদ্ভুত অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জড়িয়ে পড়েছি। আমাদের মধ্য থেকে এক ব্যক্তি আবির্ভূত হয়ে আমাদের উপাস্যদের সম্পর্কে কটুক্তি করছে। সে আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে নির্বোধ ও স্বল্প বুদ্ধির অধিকারী বলে মনে করে এবং মিষ্টি-মধুর ভাষা ব্যবহার করে আমাদের একদল যুবককে তার নিজের দিকে টেনে নিয়েছে। আর এভাবে আমাদের নিজেদের মাঝে এক গভীর ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে। হজ্বের মৌসুম ব্যতীত অন্য সময় এ লোকটি শেবে আবু তালিবে (আবু তালিবের গিরিদেশে) বসবাস করে এবং হজ্বের মৌসুমে গিরিদেশ থেকে বের হয়ে হিজরে ইসমাঈলে (কাবা শরীফের কাছে) এসে বসে এবং জনগণকে (হজ্ব উপলক্ষে আগত ব্যক্তিদেরকে) তার ধর্মের প্রতি আহবান জানায়।”

আসআদ অন্যান্য কুরাইশ গোত্রপতির সাথে যোগাযোগ করার আগেই মদীনা প্রত্যাবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সে আরবদের সনাতন প্রথা অনুযায়ী কাবাঘর যিয়ারত করতে আগ্রহী হয়। তবে উতবাহ্ তাকে এ ব্যাপারে ভয় দেখিয়েছিল যে, সে তাওয়াফ করার সময় ঐ লোকটির (রাসূলের) কথা শুনবে এবং তার মধ্যে তার প্রভাব বিস্তার করবে। অন্যদিকে কাবাঘর তাওয়াফ ও যিয়ারত না করে পবিত্র মক্কা নগরী ত্যাগ করাও খুবই অশোভন ও মর্যাদাহানিকর বলে এ সমস্যা সমাধান করার উদ্দেশ্যে উতবাহ্ আসআদকে প্রস্তাব করল সে যেন তাওয়াফ করার সময় কানের ভিতর তুলা দিয়ে রাখে, তাহলে সে ঐ লোকটির কথা শুনতে পাবে না।

আসআদ ধীরে ধীরে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে তাওয়াফ করায় মশগুল হলো। প্রথম তাওয়াফেই তার দৃষ্টি মহানবী (সা.)-এর ওপর নিবদ্ধ হলো। সে দেখতে পেল এক ব্যক্তি হিজরে ইসমাঈলে বসে আছে। কিন্তু মহানবীর কথায় প্রভাবিত হওয়ার ভয়ে সে তাঁর সামনে আসল না। অবশেষে সে তাওয়াফ করার সময় ভাবল, এ কেমন বোকামিপূর্ণ কাজ করছি! আগামীকাল যখন মদীনায় এ ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞাসা করা হবে তখন আমি কি জবাব দেব। তাই আসআদ বুঝতে পারল যে, এ বিষয়ে তথ্য ও জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।

আসআদ একটু সামনে এগিয়ে এসে জাহেলী আরবদের চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী সালাম দিয়ে বলল, أنعم صباحا “আপনার প্রাতঃকাল মঙ্গলময় হোক।” মহানবী (সা.) এর জবাবে বললেন, “আমার প্রভু মহান আল্লাহ্ এর চেয়ে উত্তম সম্ভাষণ ও সালাম অবতীর্ণ করেছেন। আর তা হচ্ছে : سلام عليكم (আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক)।” তখন আসআদ মহানবীর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করল। মহানবী আসআদের এ প্রশ্নের জবাবে সূরা আনআমের ১৫১ ও ১৫২ নং আয়াত-যা আসলেই জাহেলী আরবদের মন মানসিকতা, আচার-আচরণ ও রীতিসমূহ চিত্রিত করেছে তা পাঠ করলেন। এ দু’আয়াত-যা ১২০ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত একটি জাতির সকল ব্যথা-বেদনা ও দুঃখ-দুর্দশা এবং এর উপশম ও সমাধান সম্বলিত ছিল তা আসআদের হৃদয়ে গভীর প্রভাব বিস্তার করল। এ কারণে সে তৎক্ষণাৎ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করল এবং মহানবীর কাছে আবেদন জানাল-যেন তিনি এক ব্যক্তিকে মুবাল্লিগ হিসাবে মদীনায় প্রেরণ করেন। মহানবী আসআদের অনুরোধে মুসআব ইবনে উমাইরকে পবিত্র কোরআন এবং ইসলামের শিক্ষক হিসাবে মদীনায় প্রেরণ করলেন।

উক্ত আয়াতদ্বয়ের অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই জাহেলী আরবদের অবস্থা সম্পর্কে গবেষণা ও অধ্যয়ন করার আর কোন প্রয়োজন থাকবে না। কারণ এ দু’আয়াত থেকে প্রতীয়মান হয় যে, দীর্ঘদিনের চারিত্রিক ব্যাধিসমূহ জাহেলী আরবদের জীবনকে হুমকির সম্মুখীন করেছিল। এ কারণে এখানে আয়াতদ্বয়ের আরবী ভাষ্য ও এর অনুবাদ সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যাসহ শ্রদ্ধেয় পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরা হলো :

“(হে মুহাম্মদ!) বলে দিন : আমার রিসালাতের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ ব্যাখ্যা করব। আমার রিসালাতের লক্ষ্যসমূহ নিম্নরূপ :

১. আমি শিরক ও মূর্তিপূজার মূলোৎপাটন করার জন্য প্রেরিত হয়েছি।

২. আমার কর্মসূচীর শীর্ষে আছে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করা।

৩. আমার ধর্মে দারিদ্র্যের ভয়ে সন্তান হত্যা সবচেয়ে মন্দ কাজ বলে বিবেচিত।

৪. মানব জাতিকে মন্দ কাজসমূহ থেকে দূরে রাখা এবং সকল প্রকার গুপ্ত ও প্রকাশ্য পাপ ও অন্যায় থেকে বিরত রাখার জন্য প্রেরিত হয়েছি।

৫. আমার শরীয়তে অন্যায়ভাবে মানব হত্যা ও রক্তপাত ঘটানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশ যাতে করে তোমরা চিন্তা-ভাবনা কর।

৬. ইয়াতীমের সম্পদ আত্মসাৎ করা হারাম।

৭. আমার ধর্মের ভিত্তি ন্যায়বিচার, এবং ওজনে কম দেয়া হারাম।

৮. আমরা কোন ব্যক্তিকে তার সাধ্য ও সামর্থ্যরে ঊর্ধ্বে দায়িত্ব ও কর্তব্য চাপিয়ে দেই না।

৯. মানুষের কথাবার্তা ও বক্তব্য-যা হচ্ছে তার সমগ্র মন-মানসিকতার আয়নাস্বরূপ তা সত্যের সমর্থনে ব্যবহৃত হওয়া আবশ্যক; আর সত্য ব্যতীত অন্য কিছু যেন মানুষের কণ্ঠে ধ্বনিত না হয়, এমনকি সত্য যদি তার ক্ষতিরও কারণ হয়।

১০. মহান আল্লাহর সাথে যে সব প্রতিজ্ঞা করেছ তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।

এগুলো হচ্ছে তোমার স্রষ্টার বিধি-নিষেধ ও নির্দেশাবলী যা তোমরা অবশ্যই মেনে চলবে।

এ আয়াতদ্বয়ের অন্তর্নিহিত অর্থ এবং আসআদের সাথে মহানবীর আলোচনাপদ্ধতি থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, এ সব হীন চারিত্রিক ত্রুটি অন্ধকার যুগের আরবদের আপাদমস্তক জুড়ে ছিল। আর এ কারণেই মহানবী (সা.) আসআদের সাথে প্রথম সাক্ষাতেই এ দু’আয়াত তেলাওয়াত করে শুনিয়েছিলেন। আর এভাবে তিনি আসআদকে তাঁর রিসালাতের মহান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ সম্পর্কে অবগত করেছিলেন।

আরবের ধর্মীয় অবস্থা

যখন হযরত ইবরাহীম (আ.) তাওহীদের পতাকা হিজায অঞ্চলে উড্ডীন এবং পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর সহায়তায় পবিত্র কাবা পুনঃর্নিমাণ করলেন তখন একদল লোক তাঁর সাথে যোগ দিয়েছিল এবং তাঁর বরকতময় পবিত্র অস্তিত্বের আলোক প্রভায় অনেক মানুষের অন্তর আলোকিত হয়েছিল। তবে সঠিকভাবে জানা যায় নি যে, স্বর্গীয় ব্যক্তিত্ব হযরত ইবরাহীম (আ.) কতদূর ও কি পরিমাণ তাওহীদী ধর্ম ও মতাদর্শ প্রচার এবং সেখানে তাওহীদবাদী পূজারীদের দৃঢ় সমাজ গঠন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হযরত আলী (আ.) আরব জাতি ও গোত্রসমূহের ধর্মীয় অবস্থার বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন :

و أهل الأرض يومئذ ملل متفرّقة و الهواء منتشرة و طوائف متشتّتة بين مشبّه لله بخلقه أو ملحد في اسمه أو مشير إلى غيره فهداهم به من الضّلالة و انقذهم من الجهالة

“তখন (অন্ধকার যুগে) আরব জাতি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী ছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন ধরনের বিদআত (ধর্ম বহির্ভূত প্রথা) প্রচলিত ছিল এবং তারা বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। একদল লোক মহান আল্লাহ্কে তাঁর সৃষ্টির সাথে তুলনা করত (এবং মহান আল্লাহর বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের অস্তিত্বে বিশ্বাস করত)। কেউ কেউ মহান আল্লাহর নামের ক্ষেত্রেও হস্তক্ষেপ করত [যেমন মূর্তিপূজকরা লাত (لات) মূর্তির নাম ‘আল্লাহ্’ শব্দ থেকে এবং প্রতিমা উয্যার (عزّى) নাম নবী ‘উযাইর’ (عزير) থেকে নিয়েছিল]। আবার কতিপয় ব্যক্তি আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য সত্তার দিকে ইশারা-ইঙ্গিত করত; অতঃপর এদের সবাইকে আল্লাহ্ মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে সৎ পথের সন্ধান দিলেন-সৎ পথে পরিচালিত করলেন এবং তাদেরকে পথভ্রষ্টতা ও অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দিলেন।”

আরবের চিন্তাশীল শ্রেণীও চাঁদের উপাসনা করত। আরবের প্রসিদ্ধ ঐতিহাসিক কালবী (মৃত্যু ২০৬ হি.) লিখেছেন : বনি মালীহ্ গোত্র (بني مليح) জ্বিনপূজারী ছিল। হিময়ার গোত্র  (حمير) সূর্য, কিনানাহ্ গোত্র  (كنانة) চাঁদ, তামীম গোত্র (تميم) আলদেবারান (Al-debaran), লাখম গোত্র (لخم) বৃহস্পতি, তাই গোত্র (طي) শুকতারা, কাইস গোত্র  (قيس)শে’রা নক্ষত্র (Dog star) এবং আসাদ গোত্র (أسد)বুধ গ্রহের পূজা করত।

কিন্তু নিম্নশ্রেণীর লোক যারা আরবের সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল তারা তাদের গোত্রীয় ও পারিবারিক প্রতিমা ছাড়াও বছরের দিবসসমূহের সংখ্যা অনুসারে ৩৬০টি মূর্তির পূজা করত এবং প্রতিদিনের ঘটনাসমূহকে ঐ ৩৬০টি মূর্তির যে কোন একটির সাথে জড়িত বলে বিশ্বাস করত।

হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পরে আমর বিন কুসাই-এর দ্বারা মক্কায় মূর্তিপূজার প্রচলন হয়েছিল। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে, শুরুতে তা ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল না; বরং প্রথম দিকে আরবগণ মূর্তিগুলোকে সুপারিশকারী বলে বিশ্বাস করত। এরপর তারা আরো এক ধাপ এগিয়ে এ সব প্রতিমাকে খোদায়ী শক্তির অধিকারী বলে ভাবতে থাকে। যে সব মূর্তি পবিত্র কাবার চারপাশে স্থাপিত ছিল সেগুলো আরবের সকল গোত্রের শ্রদ্ধাভাজন ও আরাধ্য ছিল। তবে গোত্রীয় প্রতিমাসমূহ ছিল কেবল নির্দিষ্ট কোন গোত্র বা দলের কাছেই শ্রদ্ধাভাজন ও পূজনীয়। প্রতিটি গোত্রের প্রতিমা ও মূর্তি যাতে সংরক্ষিত থাকে সেজন্য তারা প্রতিমাসমূহের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করত। মন্দিরসমূহের তদারকির দায়িত্ব উত্তরাধিকারসূত্রে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মের হাতে স্থানান্তর হতো।

পারিবারিক প্রতিমা ও মূর্তিসমূহের পূজা প্রতি দিন-রাত একটি পরিবারের মধ্যে সম্পন্ন হতো। ভ্রমণে যাওয়ার সময় তারা নিজেদের দেহকে পারিবারিক প্রতিমাসমূহের সাথে রগড়াতো। ভ্রমণ অবস্থায় তারা মরুভূমির পাথরসমূহের পূজা করত। যে স্থানেই তারা অবতরণ করত সেখানে চারটি পাথর বাছাই করে এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সুন্দরটিকে নিজের উপাস্য এবং অবশিষ্ট পাথরগুলোকে বেদীর পদমূল হিসাবে গণ্য করত।

মক্কার অধিবাসীদের হারাম শরীফের প্রতি চরম আকর্ষণ ছিল। ভ্রমণের সময় তারা হারামের পাথর সাথে নিয়ে যেত এবং যে স্থানেই তারা যাত্রাবিরতি করত সেখানে তা স্থাপন করে পূজা করত। সম্ভবত এগুলোই ‘আনসাব’(أنصاب) হতে পারে যেগুলোকে মসৃণ ও অবয়বহীন পাথর হিসাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর এগুলোর বরাবরে আছে ‘আওসান’(أوثان) যার অর্থ হচ্ছে আকার-আকৃতি ও নকশাবিশিষ্ট এবং চেঁচে ফেলা হয়েছে এমন পাথর। ‘আসনাম’(أصنام) হচ্ছে ঐ সকল প্রতিমা যা স্বর্ণ ও রৌপ্যকে গলিয়ে অথবা কাঠ খোদাই করে তৈরি করা হয়েছে।

মূর্তিসমূহের সামনে আরবদের বিনয়াবনত হওয়া আসলে মোটেও আশ্চর্যজনক বিষয় নয়। আরবগণ বিশ্বাস করত যে, কোরবানী করার মাধ্যমে এ সব মূর্তির সন্তুষ্টি অর্জন করা সম্ভব। কোরবানী করার পর তারা কোরবানীকৃত পশুর রক্ত প্রতিমার মাথা ও মুখমণ্ডলে মর্দন করত। গুরুত্বপূর্ণ কাজসমূহের ক্ষেত্রে তারা এ সব প্রতিমার সাথে পরামর্শ করত। তারা পরামর্শের জন্য কতগুলো কাঠ (লাঠি) ব্যবহার করত। এগুলোর একটিতে লেখা থাকত إفعل অর্থাৎ কর; অন্যটিতে লেখা থাকত لا تفعل (করো না)। এরপর তারা হাত বাড়িয়ে দিত, অতঃপর যে লাঠিটি বেরিয়ে আসত তাতে যা লেখা থাকত তদনুসারে তারা কাজ করত।

সংক্ষেপে : মূর্তিপূজা সমগ্র আরবে প্রচলিত হয়ে পড়েছিল। বিভিন্নরূপে তাদের মাঝে এ মূর্তিপূজা অনুপ্রবেশ করেছিল। পবিত্র কাবা জাহেলী আরবদের পূজ্য প্রতিমা ও বিগ্রহের আবাসস্থলে পরিণত হয়েছিল। প্রতিটি গোত্রেরই সেখানে একটি করে মূর্তি ছিল। কা’বাঘরে বিভিন্ন আকার-আকৃতির ৩৬০টির বেশি মূর্তি ছিল, এমনকি খ্রিষ্টানরাও কাবার স্তম্ভ ও দেয়ালসমূহে হযরত মরিয়ম ও হযরত ঈসা (আ.)-এর চিত্র, ফেরেশতাদের ছবি এবং হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কাহিনী চিত্রিত করে রেখেছিল।

লাত, মানাত ও উয্যা-এ তিন প্রতিমাকে কুরাইশরা আল্লাহর কন্যা বলে বিশ্বাস করত। কুরাইশরা বিশেষভাবে এ তিন প্রতিমার পূজা করত। লাত দেবতাদের মা হিসাবে গণ্য হতো। লাতের মন্দির তায়েফে অবস্থিত ছিল। এ লাত ছিল সাদা পাথরের মতো। মানাতকে ভাগ্যদেবী ও মৃত্যুর প্রভু বলে বিশ্বাস করা হতো। মানাতের মন্দির মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী একটি স্থানে অবস্থিত ছিল।

আবু সুফিয়ান উহুদের যুদ্ধের দিবসে লাত ও উয্যার মূর্তি সাথে নিয়ে এসেছিল এবং এগুলোর কাছে সাহায্য চেয়েছিল। কথিত আছে যে, আবু আহীহাহ্ সাঈদ বিন আস নামের এক উমাইয়্যা বংশীয় ব্যক্তি মৃত্যুশয্যায় শায়িত অবস্থায় কাঁদছিল। আবু জাহল তাকে দেখতে গেল। আবু জাহল তাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “এ কান্না কিসের জন্য? মৃত্যুকে ভয় করছ, অথচ এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কি কোন উপায় নেই?” সে বলল, “মৃত্যুর ভয়ে কাঁদছি না; বরং আমি ভয় পাচ্ছি যে, আমার মৃত্যুর পর জনগণ উয্যার পূজা করবে না।” তখন আবু জাহল বলল, “তোমার কারণে জনগণ উয্যার পূজা করেনি যে, তোমার মৃত্যুতেও তারা উয্যার পূজা করা থেকে বিরত থাকবে।”

এ সব মূর্তি ছাড়াও অন্যান্য দেবতার পূজা আরবদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। যেমন কুরাইশরা পবিত্র কাবার ভিতরে হুবাল (هبل) নামের একটি মূর্তি রেখেছিল। প্রতিটি গোত্রের নিজস্ব বিশেষ মূর্তিই ছিল না, বরং প্রতিটি পরিবারেরও গোত্রীয় প্রতিমার পূজা করা ছাড়াও নিজস্ব পারিবারিক প্রতিমা থাকত। নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য, পাথর, কাঠ, মাটি, খেজুর এবং বিভিন্ন ধরনের মূর্তি প্রতিটি গোত্রের কাছে আরাধ্য ও পূজনীয় ছিল। পবিত্র কাবা ও অন্যান্য মন্দিরে রক্ষিত এ সব প্রতিমা বা মূর্তি কুরাইশ ও সকল আরব গোত্রের নিকট পরম শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ছিল। এগুলোর চারদিকে তারা তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) করত এবং এগুলোর নামে পশু কোরবানী করত। প্রত্যেক গোত্র প্রতি বছর কোন না কোন ব্যক্তিকে আনুষ্ঠানিকতার দ্বারা নির্বাচিত করে তাদের দেবদেবী ও প্রতিমাসমূহের বেদীমূলে কোরবানী করত এবং তার রক্তাক্ত মৃতদেহ বলিদানের স্থানের নিকটেই দাফন করা হতো।

সংক্ষিপ্ত এ বর্ণনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সমগ্র জাযিরাতুল আরবের (আরব উপদ্বীপের) প্রতিটি গৃহ ও প্রান্তর, এমনকি বাইতুল্লাহ্ অর্থাৎ পবিত্র কাবাও সে যুগে দেবদেবী দিয়ে পরিপূর্ণ ছিল।

কবির ভাষায় :

“উপাসনাস্থলসমূহ বিরান ধ্বংসপ্রাপ্ত, কাবার পবিত্র অঙ্গন হয়ে গিয়েছিল প্রতিমালয়

তখন জনগণ ছিল মহান স্রষ্টা থেকে বিমুখ-কি সুখে কি দুঃখে সর্বাবস্থায়।”

এ সব অর্থহীন প্রতিমা ও দেবদেবীর পূজা করার ফলে আরবে দ্বন্দ্ব-সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, মতভেদ, হানাহানি ও হত্যাকাণ্ড বিরাজ করত। আর এর ফলে অসভ্য-বর্বর মরুচারী আরবদের জীবনে নেমে এসেছিল ভয়ঙ্কর দুর্ভাগ্য ও দুর্দশা এবং চরম পার্থিব ও আত্মিক ক্ষতি।

হযরত আলী (আ.) তাঁর এক ভাষণে ইসলামপূর্ব আরব জাতির অবস্থা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন : “মহান আল্লাহ্ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে রিসালাতের দায়িত্বসহকারে জগদ্বাসীকে ভয় প্রদর্শন করার জন্য প্রেরণ এবং তাঁকে তাঁর ঐশী বিধি-বিধান ও নির্দেশাবলীর বিশ্বস্ত সংরক্ষক হিসাবে নিযুক্ত করেছিলেন। হে আরব জাতি! তখন তোমরা নিকৃষ্টতম ধর্মের অনুসারী ছিলে; তোমরা সর্পকুলের মাঝে শয়ন করতে, ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি পান করতে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ও বন্ধন ছিন্ন করতে, তখন তোমাদের মধ্যে প্রতিমা ও মূর্তিসমূহ প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং তোমাদের আপদমস্তক জুড়ে ছিল পাপ, অন্যায় ও অপরাধ।”

মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আরবদের চিন্তা

আরবরা এই দার্শনিক সমস্যাকে ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছে : মানবাত্মা মৃত্যুর পর পেঁচাসদৃশ একটি পাখির আকৃতিতে দেহ থেকে বের হয়ে আসে যার নাম ‘হামা’(هامَة) ও ‘সাদা’ (صَدَى)। এরপর তা মানুষের নিস্প্রাণ দেহের পাশে অনবরত অত্যন্ত করুণ স্বরে ও ভয়ঙ্করভাবে কাঁদতে থাকে। যখন মৃতের আত্মীয়-স্বজনরা ঐ মরদেহকে কবরে শায়িত করে তখন যেভাবে বলা হয়েছে ঠিক সেভাবে তার আত্মা তার সমাধিস্থলে আবাসন গ্রহণ করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে থাকে। কখনো কখনো সন্তান ও বংশধরদের অবস্থা জানার জন্য তাদের ঘরের ছাদে এসে বসে।

মানুষ যদি অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করে তাহলে উক্ত প্রাণীটি (অস্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণকারী মানুষের আত্মা যা পেঁচাসদৃশ পাখির আকৃতি ধারণ করেছে) অনবরত চিৎকার করে বলতে থাকে, ‘আমাকে পান করাও, আমাকে পান করাও’ অর্থাৎ আমার হত্যাকারীর রক্তপাত করে আমার তৃষ্ণা নিবারণ কর। আর যতক্ষণ পর্যন্ত হত্যাকারী থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করা না হবে ততক্ষণ পর্যন্ত তা নীরব হবে না। ঠিক এভাবে সম্মানিত পাঠকবর্গের কাছে প্রকৃত অবস্থা পরিষ্কার হয়ে যাবে এবং তাঁরা অবগত হতে পারবেন যে, প্রাক-ইসলাম যুগে আরব জাতির ইতিহাস এবং ইসলামোত্তর আরব জাতির ইতিহাস আসলে দু’টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ইতিহাস।

কারণ প্রাক-ইসলাম অর্থাৎ অন্ধকার যুগে আরবগণ কন্যাসন্তানকে হত্যা করত এবং তাদেরকে জীবন্ত কবর দিত। অনাথ শিশুদেরকে দয়া-মায়া দেখানো হতো না। লুটতরাজ করা হতো এবং কাঠ ও পাথরের প্রতিমাসমূহের পূজা করা হতো। তখন এক-অদ্বিতীয় আল্লাহর ব্যাপারে বিন্দুমাত্র চিন্তা-ভাবনা করা হতো না। (অথচ ইসলামোত্তর যুগে এ সব কুসংস্কার ও কুপ্রথা সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। তাই ইসলাম ধর্মের আবির্ভাবের পরে আরব জাতির ইতিহাস প্রাক-ইসলাম যুগের আরব জাতির ইতিহাস থেকে সম্পূর্ণ আলাদা)।

জাহেলী আরব সমাজে নারীর মর্যাদা

কবি আবু তাম্মাম হাবিব ইবনে আওস কর্তৃক সংকলিত জাহেলিয়াত যুগের আরব কাব্য গ্রন্থের দশম অধ্যায় তদানীন্তন আরব সমাজে নারীর মর্যাদার প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করার একটি উজ্জ্বল প্রামাণ্য দলিল। গ্রন্থটির এই অধ্যায় পাঠ করলে প্রতীয়মান হয় যে, আরব সমাজে নারী এক আশ্চর্যজনক বঞ্চনার শিকার ছিল এবং তারা বেদনাদায়ক জীবনযাপন করত। এ ছাড়াও জাহেলিয়াত যুগের আরবদের নিন্দায় পবিত্র কোরআনের যেসব আয়াত অবতীর্ণ হয়েছে সেসব আয়াতে তাদের নৈতিক অধঃপতনের বিষয়টি স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে।

পবিত্র কোরআন কন্যাসন্তান হত্যা করার মতো আরবদের জঘন্য কাজকে ঠিক এভাবে বর্ণনা করেছে : কিয়ামত দিবস এমনই এক দিবস যে দিবসে যে সব কন্যাসন্তানকে কবরে জীবন্ত পুঁতে হত্যা করা হয়েছে তাদের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। সত্যিই মানুষ নৈতিকভাবে কতটা অধঃপতিত হলে তার নিজ কলিজার টুকরা সন্তানকে বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর অথবা জন্মগ্রহণ করার পরই মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে পারে এবং সন্তানের বুকফাটা করুণ চিৎকারেও তার পাষাণ হৃদয় বিন্দুমাত্র বিচলিত হয় না!

সর্বপ্রথম যে গোত্রটি এ জঘন্য প্রথাটির প্রচলন করেছিল তারা ছিল বনি তামীম গোত্র। ইরাকের শাসনকর্তা নূমান বিন মুনযির বিদ্রোহীদেরকে দমন করার জন্য এক বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে বিদ্রোহী তামীম গোত্রের ওপর আক্রমণ চালিয়ে সবকিছু ধ্বংস করে দেয়। তামীম গোত্রের যাবতীয় ধন-সম্পদ জব্দ করা হয় এবং নারীদেরকে বন্দী করা হয়। তামীম গোত্রের প্রতিনিধিগণ নূমান বিন মুনযিরের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের নারী এবং কন্যাসন্তানদেরকে বন্দীদশা থেকে মুক্তি দিয়ে ফেরত দেয়ার আবেদন করে। কিন্তু বন্দিশালায় তামীম গোত্রের কতিপয় যুদ্ধ-বন্দিনীর বিবাহ হয়ে যাওয়ায় নূমান তাদেরকে তাদের পিতা ও পরিবারের সাথে সম্পর্কচ্ছেদ করিয়ে স্বামীদের সাথে বসবাস অথবা স্বামীদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্কচ্ছেদ করে নিজেদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবর্তন করার স্বাধীনতা দেয়। কাইস বিন আসেমের মেয়ে বৈবাহিক সম্পর্ক অর্থাৎ স্বামীর সাথে বসবাস করাকে অগ্রাধিকার দিলে ঐ বৃদ্ধলোকটি অত্যন্ত ব্যথিত হয়। সে ছিল তামীম গোত্রের প্রেরিত প্রতিনিধিদের অন্যতম। সে এরপর প্রতিজ্ঞা করল যে, এখন থেকে সে তার কন্যাসন্তানদেরকে তাদের জীবনের ঊষালগ্নেই হত্যা করবে। ধীরে ধীরে এ জঘন্য প্রথা অনেক গোত্রের মধ্যেই প্রচলিত হয়ে যায়।

কাইস বিন আসেম যখন মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হয়েছিল তখন একজন আনসার সাহাবী তাকে তার মেয়েদের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল। কাইস জবাবে বলেছিল, “আমি আমার সকল কন্যাসন্তানকে জীবন্ত দাফন করেছি, কেবল একবার ব্যতীত। আর কখনই এ কাজ করতে গিয়ে আমি একটুও কষ্ট পাই নি। আর সেটি ছিল : একবার আমি সফরে ছিলাম। আমার স্ত্রীর সন্তান প্রসবকাল অতি নিকটবর্তী হয়ে গিয়েছিল। দৈবক্রমে আমার সফর বেশ দীর্ঘায়িত হলো। সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর আমি আমার স্ত্রীকে সন্তান সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলাম। সে আমাকে বলল : কোন কারণে সে মৃত সন্তান প্রসব করেছে। আসলে সে একটি কন্যাসন্তান প্রসব করেছিল, কিন্তু সে আমার ভয়ে ঐ কন্যাসন্তানকে জন্মের পর পরই তার বোনদের কাছে রেখেছিল। অনেক বছর কেটে গেলে ঐ মেয়েটি যৌবনে পা দিল, অথচ তখনও আমি জানতাম না যে, আমার একটি মেয়ে আছে। একদিন আমি আমার ঘরে বসে আছি, হঠাৎ একটি মেয়ে ঘরে প্রবেশ করে তার মাকে খোঁজ করতে লাগল। ঐ মেয়েটি ছিল সুন্দরী। তার চুলগুলো বেনী করা ছিল এবং তার গলায় ছিল একটি হার। আমি আমার স্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই মেয়েটি কে? তখন তার নয়নযুগল অশ্রুজলে পূর্ণ হয়ে গেল এবং সে বলল : এ তোমার ঐ মেয়ে যখন তুমি সফরে ছিলে তখন তার জন্ম হয়েছিল। কিন্তু আমি তোমার ভয়ে তাকে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমার স্ত্রীর এ কথায় আমার নীরব থাকার বিষয়টি এতে আমার সন্তুষ্টি ও মৌন সম্মতি বলেই সে মনে করল। সে ভাবল যে, আমি এ মেয়েকে হত্যা করব না। এ কারণেই আমার স্ত্রী একদিন নিশ্চিন্ত মনে ঘর থেকে বাইরে গেল। আর আমিও যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম তা পালন করার জন্য আমার মেয়েকে হাত ধরে দূরবর্তী একটি স্থানে নিয়ে গেলাম। সেখানে আমি একটি গর্ত খুঁড়তে লাগলাম। গর্ত খোঁড়ার সময় সে আমাকে বার বার জিজ্ঞাসা করেছিল, কেন আমি এ গর্ত খনন করছি? খনন শেষে আমি তার হাত ধরে টেনেহিঁচড়ে গর্তের ভিতরে ফেলে দিলাম এবং তার দেহের ওপর মাটি ফেলতে লাগলাম। তার করুণ আর্তনাদের প্রতি মোটেও ভ্রুক্ষেপ করলাম না। সে কেঁদেই যাচ্ছিল এবং বলছিল : বাবা! আমাকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে এখানে একাকী রেখে আমার মায়ের কাছে ফিরে যাবে? আমি তার ওপর মাটি ফেলেই যাচ্ছিলাম এবং তাকে সম্পূর্ণরূপে মাটির মধ্যে জীবন্ত পুঁতেই ফেললাম। হ্যাঁ, কেবল এই একবারই আমার হৃদয় কেঁদেছিল-আমার অন্তর জ্বলে-পুড়ে গিয়েছিল।” কাইসের কথা শেষ হলে মহানবী (সা.)-এর দু’চোখ অশ্রুজলে ভরে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, “এটি পাষাণ হৃদয়ের কাজ। যে জাতির দয়া-মায়া নেই সে জাতি কখনই মহান আল্লাহর দয়া ও করুণা লাভ করতে পারে না।

আরব সমাজে নারীদেরকে পণ্যের মতো কেনা-বেচা করা হতো। তারা সব ধরনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক অধিকার, এমনকি উত্তরাধিকার থেকেও বঞ্চিত ছিল। আরব বুদ্ধিজীবীরা নারীদেরকে পশু বলে মনে করত। আর এ কারণেই তাদেরকে দৈনন্দিন জীবনের পণ্য-সামগ্রী ও আসবাবপত্রের মধ্যে গণ্য করা হতো। এ ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়েই و إنّما أمّهات النّاس أوعية ‘মায়েরা ঘটি-বাটি ও থালা-বাসনের মতো’-এ প্রবাদ বাক্যটি আরবদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে গিয়েছিল।

প্রধানত দুর্ভিক্ষের ভয়ে এবং কখনো কখনো কলুষতা ও অশূচিতার ভয়ে আরবরা মেয়েদেরকে জন্মগ্রহণের পর পরই হত্যা করে ফেলত। কখনো পাহাড়ের ওপরে তুলে সেখান থেকে নিচে ফেলে দিত এবং কখনো কখনো পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করত। আমাদের মহান ঐশী গ্রন্থ যা অমুসলিম প্রাচ্যবিদদের দৃষ্টিতে ন্যূনপক্ষে একটি অবিকৃত ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক গ্রন্থ যা এতৎসংক্রান্ত একটি অভিনব কাহিনী বর্ণনা করেছে। পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে : যখন তাদের কোন এক ব্যক্তিকে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণের সুসংবাদ দেয়া হতো তখন তার বর্ণ কালো হয়ে যেত এবং বাহ্যত সে যেন তার ক্রোধকে চাপা দিত। আর এই জঘন্য সংবাদ শোনার কারণে সে (লজ্জায়) তার সম্প্রদায়ের কাছ থেকে পালিয়ে বেড়াত। আর সে জানত না যে, সে কি অপমান ও লাঞ্ছনা সহকারে তার এ নবজাতক কন্যাসন্তান প্রতিপালন করবে, নাকি তাকে মাটির নিচে জীবন্ত পুঁতে ফেলবে? সত্যিই তাদের ফয়সালা কতই না জঘন্য!”

সবচেয়ে দুঃখজনক ছিল আরবদের বৈবাহিক ব্যবস্থা। পৃথিবীতে এর কোন নজির বিদ্যমান নেই। যেমন আরবদের কাছে স্ত্রীর কোন সুনির্দিষ্ট সংখ্যা ছিল না। স্ত্রীর মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা স্ত্রীদেরকে নির্যাতন ও উৎপীড়ন করত। কোন মহিলা চারিত্রিক সততার পরিপন্থী কোন কাজ করলেই তার মোহরানা সম্পূর্ণরূপে বাতিল হয়ে যেত। কখনো কখনো আরবরা এ নিয়মের অপব্যবহার করত। মোহরানা যাতে আদায় করতে না হয় সেজন্য তারা নিজেদের স্ত্রীদের ওপর অপবাদ আরোপ করত। পুত্রসন্তানগণ পিতার মৃত্যুর পর বা পিতা তালাক দিলে পিতার স্ত্রীদেরকে নিজের স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করতে পারত এবং এতে কোন অসুবিধা ছিল না। যখন মহিলা তার স্বামী কর্তৃক তালাকপ্রাপ্তা হতো তখন প্রাক্তন তথা প্রথম স্বামীর অনুমতির ওপর তার পুনর্বিবাহ নির্ভর করত। আর কেবল অর্থ প্রদানের মাধ্যমেই প্রথম স্বামীর অনুমতি পাওয়া যেত। উত্তরাধিকারিগণ ঘরের আসবাবপত্রের মতো উত্তরাধিকারসূত্রে মহিলাদের (পিতার স্ত্রীদের) মালিক হতো এবং তাদের মাথার ওপর রোসারী (Scarf) নিক্ষেপ করে উত্তরাধিকারিগণ তাদের নিজ নিজ স্বত্বাধিকার ঘোষণা করত।  (চিরভাস্বর মহানবী (সা.) গ্রন্থ থেকে সংকলিত)

 

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)