আল হাসানাইন (আ.)

উপহাস ও বিদ্রূপ করা

3 বিভিন্ন মতামত 04.3 / 5

মানুষকে উপহাস ও বিদ্রূপ করা খুবই কুৎসিত কাজ এবং বড় গুনাহ। এর মাধ্যমে মুমিন ব্যক্তিকে অসম্মান করা হয়ে থাকে অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন :

 وَلِلَّـهِ الْعِزَّةُ وَلِرَسُولِهِ وَلِلْمُؤْمِنِينَ

‘সম্মান কেবল আল্লাহ,তাঁর রাসূল ও মুমিনদের জন্য।’

আর তাই মুমিনদের প্রতি যে কোন অসম্মানজনক কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদিকে পবিত্র কুরআনের আরেকটি আয়াতে বলা হয়েছে :

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰ أَن يَكُونُوا خَيْرًا مِّنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِّن نِّسَاءٍ عَسَىٰ أَن يَكُنَّ خَيْرًا مِّنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُولَـٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

‘হে বিশ্বাসিগণ! কোন ব্যক্তি যেন অপর কোন ব্যক্তিকে উপহাস না করে,হয়তো তারা তাদের অপেক্ষা উত্তম এবং নারীদেরও একদল যেন অন্য দলকে উপহাস না করে,হয়তো তারা তাদের অপেক্ষা উত্তম। তোমরা নিজেদের (মধ্যে একে অপরের) ত্রুটি অন্বেষণ করবে না এবং কাউকে কদর্য নামে সম্বোধন করবে না। কারণ,বিশ্বাস স্থাপনের পর (কাউকে) কদর্য নামে ডাকা গর্হিত কর্ম,যারা এ কর্ম হতে নিবৃত্ত না হয় প্রকৃত পক্ষে তারাই অবিচারক।’

মহানবী (সা.) উপহাসকারীদের সম্পর্কে বলেছেন : ‘একজন উপহাসকারীর জন্য বেহেশতের দরজা খুলে দেয়া হবে এবং তাকে বলা হবে : ‘এস।’ সে তার দুঃখ ওঅসহায়ত্ব নিয়ে সামনে অগ্রসর হবে এবং যখন সে ভেতরে প্রবেশ করতে চাইবে তখনই তার সামনে বেহেশতের দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।’

 

কটু কথা বলা ও অশ্লীলতা

কটুকথা বলার অর্থ হল কাউকে গালি দেয়া বা অপমান করা। এটা নিঃসন্দেহে অন্যায়,কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এটা যুবকদের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

যখন মানুষের ক্ষেত্রে কোন খারাপ কিছু ঘটে অথবা যখন কেউ তাদের অপছন্দনীয় কোন কাজ করে তখন অধিকাংশ মানুষই গালিগালাজ করে। তারা বলে যে,গালি দেয়া তাদের ক্রোধ দমনে সাহায্য করে এবং তাদেরকে আরও খারাপ কোন কিছু করা থেকে বিরত রাখে। যদিও এটা কিছুটা হলেও সত্য কিন্তু ইসলাম একে প্রত্যাখ্যান করে। কেননা,যে ব্যক্তি তার ক্রোধকে কটু ভাষা প্রয়োগ ছাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না,তার ইচ্ছাশক্তি খুবই দুর্বল। ইসলামী আচরণের দৃষ্টিকোণ থেকে ঐ ব্যক্তিই মহৎ যে তার ক্রোধকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং ঐ অবস্থায়ও হাসিখুশী থাকে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন :

‘মুসলমানকে গালি দেয়া ফাসেকী এবং তাকে হত্যা করা কুফরী।’

তাই কাউকে অপমান করার জন্য গালি দেয়া যে কোন অবস্থায়ই অনুচিত। ইসলাম আমাদের কাউকে অসম্মানিত করার শিক্ষা দেয় না। যদি কেউ আমাদের প্রতি অন্যায় করে তাহলে প্রতিবাদ করতে হবে অথবা তাদের বলতে হবে যে,তারা যা বলে তা আমরা পছন্দ করি না।

কিন্তু তাদেরকে অপমান করা হল নিজেকে অতি নিম্ন স্তরে অবনমিত করা এবং ইসলামে এটা গ্রহণযোগ্য নয় যে,কেউ নিজেকে অসম্মানিত করবে।

অন্যকে ঠাট্টা করা বা উত্যক্ত করা থেকে বোঝা যায় যে,সেই ব্যক্তির চরিত্রের একটি অংশ ত্রুটিপূর্ণ। ঠাট্টা করাকে কৌতুক বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এটি চিন্তা করা উচিত যে,আমাকে কেউ এভাবে উত্যক্ত করলে আমার অনুভূতি কেমন হবে।

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘তোমরা অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাক। আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীলতা ও সীমাতিরিক্ত অনর্থক কথা বলা পছন্দ করেন না।’

মহানবী (সা.) বলেন : ‘আল্লাহ তা‘আলা অশ্লীল ও কটুভাষীকে ঘৃণা করেন।’

মহানবী (সা.) আরও বলেন : ‘লজ্জা-সম্ভ্রম ও স্বল্পবাক ঈমানের দু’টি শাখা। অশ্লীলতা ও বাকপটুতা (বাচালতা) নিফাকের (কপটতার) দু’টি শাখা।’

 

হাস্য-কৌতুক বা মজা করা

ইসলাম ধর্ম কট্টর ও কঠোর ধর্ম নয়। এটি মানুষের নির্মল আনন্দ উপভোগের বিরোধিতা করে না এবং এগুলোকে বৈধ বলেই মনে করে। কিন্তু বল্গাহীন যে কোনকিছু করাকে ইসলাম নিষেধ করেছে।

মানুষ মাঝে মাঝে কৌতুক করে থাকে মজা পাওয়ার জন্য। এটি ইসলামের বৈধ বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। যদি কৌতুকের মধ্যে মিথ্যার সংমিশ্রণ না থাকে,অশ্লীলতা না থাকে ও অন্যকে অপমান করার বিষয় জড়িত না থাকে,তাহলে তা অনিষ্টকর নয়। এমনকি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনীতেও আমরা কদাচিৎ এ বিষয়টি দেখতে পাই। যেমন হযরত আনাস বর্ণনা করেছেন,একবার এক মহিলা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নিকট এসে আরোহণের উপযোগী একটি উটের আবেদন করল। রাসূল (সা.) তাকে বললেন : ‘আমি তোমাকে একটি উটের বাচ্চা দেব।’ মহিলাটি বলল : ‘হে রাসূলাল্লাহ্! উটের বাচ্চা দিয়ে আমি কি করব?’ রাসূল জবাব দিলেন,‘বড় উটও তো উটের বাচ্চাই হয়ে থাকে।’

তবে যেহেতু কৌতুক বলার ক্ষেত্রে প্রায়শই মিথ্যার আশ্রয় নেয়া হয় এবং অন্যকে অপমান করার বিষয়টি চলে আসে,আর কৌতুককারীরও মর্যাদা ক্ষুন্ন হয় তাই ইসলাম বেশি বেশি হাস্য-কৌতুক করাকে পরিহার করতে বলেছে।

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন : ‘কৌতুক বলা পরিহার কর। কেননা,তা মানুষের মর্যাদাকে ধ্বংস করে।’

তিনি আরও বলেন : ‘মানুষ যেন তোমাকে তাচ্ছিল্য করতে না পারে সেজন্য কৌতুক বলা পরিহার কর।’১০

অনেক সময় কৌতুক করার বিষয়টি মানুষ সহজভাবে গ্রহণ করতে পারে না এবং ভুলবোঝার মাধ্যমে পারস্পরিক সম্পর্কের অবনতি হয়। এমনকি এর কারণে শত্রুতারও সৃষ্টি হয়।

ইমাম আলী (আ.) বলেছেন : ‘কৌতুক করা পরিহার কর। যেহেতু এটি শত্রুতা সৃষ্টির অন্যতম কারণ।’১১

সর্বক্ষণ কৌতুক করা বা হাসি-তামাশা করার ফলে মানুষ তার সত্যিকার পরিচয় ভুলে যায়। ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কে সে উদাসীন হয়ে পড়ে এবং তার দায়িত্ব সম্পর্কে অসচেতন হয়ে পড়ে।

মহানবী (সা.) বলেন : ‘আমি যা জানি তা যদি তোমরা জানতে তবে খুব কমই হাসতে ও খুব বেশি কাঁদতে।’১২

হযরত আলী (আ.) বলেন : ‘যে ব্যক্তি অতিরিক্ত হাসে তার আত্মা মরে যায়।’১৩

আর এজন্যই অতিরিক্ত হাস্য-কৌতুক থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে।

 

নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করা

নিজের গোপনীয়তা বজায় রাখা ইসলামের নৈতিক গুণাবলীর অন্যতম। ইসলাম একে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক সময় গোপন কথা জানানোর মাধ্যমে মানুষের মনের দুঃখবোধ লাঘব হয়;কিন্তু এ কাজের জন্য শর্ত হল এমন ব্যক্তির কাছে তা প্রকাশ করতে হবে যে হবে নির্ভরযোগ্য।

আলী (আ.) বলেন : ‘অনির্ভরযোগ্য লোকের নিকট তোমার গোপন বিষয় প্রকাশ কর না।’১৪

বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছেও সব গোপন বিষয় প্রকাশ করা উচিত নয়। কারণ,কোন কারণে তা প্রকাশ হয়ে পড়তে পারে। এ প্রসঙ্গে আলী (আ.) বলেন : ‘যে তার গোপন বিষয় সংরক্ষণ করে সে অন্যদের ওপর ক্ষমতার অধিকারী। যে কোন গোপন বিষয় যদি দু’জনের বেশি ব্যক্তির মধ্যে ঘটে তবে তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে।’১৫

অন্যত্র তিনি বলেন : ‘তোমার গোপন বিষয় হল তোমার দাস। যখন তা প্রকাশিত হয়ে পড়ে তখন তুমি তার দাসে পরিণত হবে।’১৬

তিনি আরও বলেন : ‘তোমার গোপন বিষয় যখন অপ্রকাশিত থাকে তখন তা তোমাকে সুখে রাখে। যখন তুমি তা প্রকাশ করবে,তা তোমাকে অসুখী ও দুঃখিত করবে।’১৭

অন্যদিকে মানুষ সব সময় একই রকম থাকে না। আজকে যে বন্ধু আগামীকাল সে শত্রুতে পরিণত হতে পারে। তখন সে ঐ গোপন বিষয়কে আমাদের মাথার ওপর মুগুরের মতো ব্যবহার করবে,আর আমাদের আঘাত করবে।

ইমাম সাদিক (আ.) বলেন : ‘তুমি তোমার বন্ধুর কাছে ঐ গোপন বিষয় ছাড়া আর কিছু প্রকাশ কর না যেটা তোমার শত্রু শুনলে তুমি কষ্ট পাবে না। হয়তো তোমার বন্ধু কোনদিন তোমার শত্রুতে পরিণত হতে পারে।’১৮

শেখ সাদী (র.) বলেছেন : ‘তোমার গোপন বিষয়াদি তোমার বন্ধুর কাছে প্রকাশ করনা। তুমি জান না যে,সে তোমার বিরুদ্ধে চলে যাবে কি না। তোমার শত্রুর ওপর কোন আঘাত কর না,সে হয়তো কোনদিন তোমার বন্ধু হতে পারে। যদি তুমি কোন বিষয় গোপন রাখতে চাও তাহলে তা প্রকাশ কর না,এমনকি যদি সে বিশ্বস্তও হয়। তোমার গোপন বিষয় সংরক্ষণের জন্য তোমার নিজের চেয়ে ভাল বন্ধু নেই।’

শেখ সাদী তাঁর একটি কবিতায় বলেন :

‘তোমার জন্য নীরব থাকা ভাল এর চেয়ে (যে),

কাউকে বলবে তোমার গোপন বিষয় এবং বলবে তা প্রকাশ না করতে;

হে জ্ঞানী! পানিকে বাধা দাও ঝরনার উৎসমুখে

কারণ,যখন তা উপচিয়ে পড়ে,তখন তুমি পারবে না তা থামাতে

তোমার কোন কিছু বলা উচিত নয় একান্তে

যা বলা যায় না মানুষের সমাবেশে।’

এজন্যই আলী (আ.) বলেছেন : ‘তোমার গোপন বিষয় সংরক্ষণ করার জন্য তোমার বক্ষই সবচেয়ে প্রশস্ত স্থান।’১৯

এ পর্যন্ত আমরা কথা বলা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। পরবর্তী সংখ্যা থেকে আমরা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ।

 

তথ্যসূত্র :

১. সূরা মুনাফিকুন : ৮

২. সূরা হুজুরাত : ১১

৩. কানজুল উম্মাল, হাদীস ৮৩২৮

৪. আধুনিক প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত সুনান ইবনে মাজা, ৪র্থ খণ্ড, হাদীস নং ৩৯৩৯

৫. মদীনা পাবলিকেশান্স কর্তৃক প্রকাশিত ইমাম গাযযালী প্রণীত এহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩১

৬. বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার কর্তৃক প্রকাশিত জামে তিরমিযী, ৩য় খণ্ড, হাদীস নং ১৯৫২

৭. প্রাগুক্ত, হাদীস নং ১৯৭৬

৮. মদীনা পাবলিকেশান্স কর্তৃক প্রকাশিত ইমাম গাযযালী প্রণীত এহইয়াউ উলুমিদ্দীন, ৩য় খণ্ড, পৃ. ৩৩৭

৯. উসূলে কাফী, ২য় খণ্ড, পৃ. ৬৬৫

১০. প্রাগুক্ত

১১. গুরারুল হিকাম

১২. আধুনিক প্রকাশনী কর্তৃক প্রকাশিত সহীহ আল বুখারী, ৬ষ্ঠ খণ্ড, হাদীস ৬০৩৫

১৩. গুরারুল হিকাম

১৪. প্রাগুক্ত

১৫. সাফিনাতুল বিহার, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৬৯

১৬. প্রাগুক্ত

১৭. সাফিনাতুল বিহার, ২য় খণ্ড, পৃ. ৪৬৯

১৮. প্রাগুক্ত

১৯. বিহারুল আনওয়ার, ৭৫তম খণ্ড, পৃ. ৭১

(লেখাটি ত্রৈমাসিক প্রত্যাশা, ২য় বর্ষ, ২য় সংখ্যা থেকে নেওয়া হয়েছে)

 

আপনার মতামত

মন্তব্য নেই
*
*

আল হাসানাইন (আ.)